সিএইচটি নিউজ ডটকম, রবিবার, ফেব্রুয়ারি ১৯, ২০১৭, আপডেট: ৪:০০ অপরাহ্ণ
ডেস্ক রিপোর্ট।। ২০১০
সালের এ দিনে (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক
ইউনিয়নে সেনা ও সেটলার বাঙালিরা যৌথভাবে পাহাড়িদের ওপর বর্বরোচিত হামলা
লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে তাণ্ডবলীলা চালায়। পরদিন ২০ ফেব্রুযারিও পাহাড়িদের
উপর হামলা চালানো হয়। সেনা জওয়ানরা নিরস্ত্র পাহাড়ি জনগণের ওপর নির্বিচারে
গুলি বর্ষণ করলে ঘটনাস্থলে নিহত হন বুদ্ধপুদি চাকমা ও লক্ষী বিজয় চাকমা
নামে দু’জন স্থানীয় বাসিন্দা।
হামলার ধারাবাহিকতায় খাগড়াছড়িতেও ২২-২৩ ফেব্রুয়ারী
সাতভাইয়্যাপাড়া-মা’জনপাড়ায় সেটলাররা সেনা সহায়তায় হামলা চালায়।
সাতভাইয়্যাপাড়ায় বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। মা’জনপাড়ায় দোকানপাটসহ পাহাড়িদের
বসতবাড়ি পুড়িয়ে দেয়। পরের দিন খবংপুজ্যায় সেনাবাহিনী অভিযান চালিয়ে
নির্বিচারে গ্রামবাসীদের ধরপাকড় চালিয়ে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে।
হামলাকারী দুর্বৃত্তরা সাজেকে ২টি বৌদ্ধ বিহার ও ৩টি গীর্জাসহ ১১টি
গ্রামের পাহাড়িদের পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি পুড়ে ছাই করে দেয়। এছাড়া শিশুতলি
গ্রামের বাসিন্দা রূপন চাকমাকে গুম করে ফেলে। এটা ছিল সাজেকের দ্বিতীয়
বারের মত হামলা। এর আগে ২০০৮ সালেও সাজেকে সেনা সহায়তায় সেটলাররা পাহাড়িদের
কয়েকটি গ্রামে হামলা চালিয়ে ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছিল। # সেনাবাহিনীর গুলিতে নিহত লক্ষ্মী বিজয় চাকমা। ফাইল ছবি।
সাজেকে হামলার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল পাহাড়িদের ভূমি বেদখল করে সেখানে
সেটলার জনবসতি গড়ে তোলা। মূলতঃ এ ষড়যন্ত্র শুরু হয় বিএনপি-জামাত জোট
সরকারের সময়। পরে ২০০৭ সালে-২০০৮ সালে সেনানিয়ন্ত্রিত মঈন উদ্দিন –
ফখরুদ্দীনের সরকারের আমলে উক্ত ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নের চুড়ান্ত পদক্ষেপ গৃহীত
হয়। সে সময় সেনা সহায়তায় নতুন করে বিভিন্ন এলাকা থেকে সেটলারদের সাজেক
এলাকায় পুনর্বাসন করা হয়।
এর আগেও ২০০৮ সালের ২০ এপ্রিল সেনাবাহিনী ও সেটলাররা পাহাড়িদের গ্রামে
হামলা চালায়। সে সময় ৪টি গ্রামের ৭৭টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এ ঘটনার পর
পার্বত্য চট্টগ্রাম কমিশনের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। কিন্তু তারা
ফিরে যেতে না যেতেই সেটলাররা সেনা সহায়তায় ৯ আগষ্ট আবার গঙ্গারামদোরের ৪টি
বাড়িতে হামলা ও লুটপাট চালায়। এরপর ১৯ আগষ্ট সেটলাররা অপর এক হামলায়
রেতকাবা গ্রামের লাদুমনি চাকমাকে কুপিয়ে খুন করে। বাঘাইহাট সেনা জোন এই
ষড়যন্ত্র বাস্তবায়নে প্রধান ভূমিকায় থেকে নেতৃত্ব দেয়। সাজেক জনগণের প্রতিবাদ। ফাইল ছবি
উক্ত হামলার প্রতিবাদে সাজেকের জনগণ ব্যাপক গণ প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
পার্বত্য চট্টগ্রামসহ দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ বিক্ষোভ দেখা দেয়। ভূমি
বেদখল বিরোধী আন্দোলনের প্রক্রিয়ায় বাঘাইহাট বাজার বয়কট করে গঙ্গারাম দোরে
উজো বাজার নামে একটি জনগণের বাজার গড়ে তোলা হয়। এই উজো বাজার সাজেকের
জনগণের সংগ্রামের এক মূর্ত প্রতীক। উজো একটি চাকমা শব্দ, যা যুদ্ধে বা
সংগ্রামে রণধ্বনি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের আন্দোলনের
ইতিহাসে উজো বাজারের এক বিশেষ তাৎপর্য আছে বলেই সরকার ও সেনাবাহিনী এ
বাজারকে ধ্বংস করার জন্য শুরু থেকেই উঠেপড়ে লেগে যায়। তারা জনগণকে ভয়ভীতি,
হুমকি প্রদর্শনের মাধ্যমে বাজারটি বন্ধ করে দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
এদিকে হামলার ৭ বছর অতিক্রান্ত হলেও বিচার ও শাস্তি হয়নি হামলায় জড়িত
সেনা-সেটলারদের। উপরন্তু পর্যটন কেন্দ্র নির্মাণের মাধ্যমে সাজেক থেকে
পাহাড়ি উচ্ছেদসহ নতুন নীল-নক্সা বাস্তবায়ন করছে সরকার-সেনাবাহিনী।
—————– সিএইচটি নিউজ ডটকম’র প্রচারিত কোন সংবাদ, তথ্য, ছবি ব্যবহারের প্রয়োজন দেখা দিলে যথাযথ সূত্র উল্লেখপূর্বক ব্যবহার করুন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন , যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তাঁদের নিরলস কর্মে নির্মাণ করেছেন এক অনন্য অধ্যায়। তাঁরা বিশ্বাস করেন , সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের বিষয় নয় ; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় , আত্মমর্যাদা , ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। চাঙমা ভাষা , সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার এই দীর্ঘ সংগ্রামে যাঁরা নীরবে আজীবন কাজ করে চলেছেন , তাঁদের অন্যতম জ্ঞান কীর্তি চাকমা । তিনি একাধারে কবি , নাট্যকার , চিত্রনাট্যকার , অভিনেতা , চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক — সব পরিচয়ের সমন্বয়ে এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক। জ্ঞান কীর্তি চাকমার জন্ম ( সার্টিফিকেট অনুসারে ) ২০ জানুয়ারি ১৯৮৪ সালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উপজেলার উদাল বাগান গ্রামে। তাঁর পিতা সুপেন্দ্র চাকমা এবং মাতা তৃপ্তি বালা চাকমা। তাঁর সহধর্মিণী মধুমিতা মারমা। তাঁদের দুই কন্যা — রাশিয়া চাকমা ( দীঘিনালা সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ) এবং এশিয়া ...
সেদিন ছিল ১৭ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, এক অলস বুধবার। চারদিকের আকাশ সকাল থেকেই মেঘের ঘন চাদরে ঢাকা। মাঝে মাঝে সেই মেঘের বুক চিরে সূর্য তার তেজস্বী উপস্থিতি জানান দিতে চাইছে বটে, কিন্তু তাতে আলো ছড়ানোর চেয়ে গুমোট ভ্যাপসা গরমই বাড়ছিল কেবল। প্রকৃতির এই অস্বস্তিকর আবহাওয়ার মাঝেই আমি ডুবে ছিলাম প্রিয় কাজে—চাকমা সাহিত্য পত্রিকা ‘চাদি’ ও চাঙমা সংবাদ পত্র “হিলর পচ্জন”র প্রকাশনা নিয়ে টেবিলজুড়ে আমার ব্যস্ততা। বেলা ঠিক ১১:৫৬ মিনিটে হাতের মুঠোফোনটি তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল দীঘিনালা উপজেলার কবাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জ্ঞান চাকমা (নলেজ)-এর নাম। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর ও কিছুটা তাড়া মেশানো কণ্ঠ ভেসে এল, "জেএসএস অফিসে আসো।" সকালে স্রেফ নুন দিয়ে ভাত খাইয়ে আমার ছোট্ট মেয়ে জধা চাকমাকে সবেমাত্র ঘুম পাড়িয়েছিলাম। একটু ইতস্তত করে বললাম, "মেয়েটা ঘুমাচ্ছে তো, একটু পরে আসলে হয় না?" উত্তর এল সংক্ষিপ্ত ও অনমনীয়, "তাড়াতাড়ি আসলে ভালো হয়।" মনটা কু ডাকল। এক টা সংশয় মনের কোণে উঁকি দিল—কী এমন জরুরি দরকার, যা আমার জন্য অপেক্ষা করছে? আবার ভাবলাম, কদিন আগেই তো ...
পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু পাহাড় , অরণ্য আর নদীর ভূগোল নয় ; এটি ইতিহাস , সংস্কৃতি , ভাষা , আত্মপরিচয় এবং অধিকার - চেতনার এক দীর্ঘ অভিযাত্রার নাম। এই ভূখণ্ডের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে আছে প্রকৃতি , জুমচাষ , নিজস্ব ভাষা , বর্ণমালা , গান , নৃত্য , সাহিত্য ও ঐতিহ্য। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই আত্মপরিচয় বহন করে চলেছে জুম্ম জনগোষ্ঠী। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন প্রজন্মের যে কজন তরুণ - তরুণী শিক্ষা , সংস্কৃতি , মানবিকতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে জীবনের অনুষঙ্গ করে সামনে এগিয়ে চলেছেন , হেমা চাকমা তাঁদের অন্যতম। পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদ পানছড়ির ২ নম্বর চেঙ্গী ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের তারাবন জগৎ মোহন পাড়ার মাটিতে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০২ সালে হেমা চাকমার জন্ম। তাঁর শৈশবের প্রথম পাঠশালা বনশ্রী শিশু নিকেতন। তাঁর পিতা অনিল চন্দ্র চাকমা (সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান)। মা, মিনতি চাকমা। বড় ভাই অমর প্রিয় চাকমা। হেমার শৈশব কেটেছে পাহাড়ের প্রকৃতি , মানুষের জীবন এবং সমাজের বাস্তবতার খুব কাছাকাছি। ...
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন