পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ক্রীড়াঙ্গনের বিস্তৃত পরিসরে কিছু মানুষ তাঁদের কর্মের মধ্য দিয়ে সময়কে অতিক্রম করে স্মরণীয় হয়ে থাকেন। কুমার সমিত রায় ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার, সাহিত্যপ্রেমী, শিক্ষক, ক্রীড়াবিদ ও সংগঠক। জন্মসূত্রে চাকমা রাজপরিবারের সন্তান হয়েও তাঁর জীবন ছিল রাজকীয় আড়ম্বর থেকে অনেক দূরে, ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতা, পাহাড়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সৃষ্টিশীলতার এক নিরন্তর সাধনা।
চাকমা সঙ্গীতজগতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত-
“আজার বজর ধরি”, “কোচপানা কারে কয়”, “গাজ ফাগন্দি জুনান যেক্কে উদে”, “ও বার্গী তুই যা উরি”
সহ অসংখ্য গান আজও চাকমা তরুণদের কণ্ঠে বেঁচে আছে। তাঁর গান কেবল বিনোদনের জন্য রচিত হয়নি; সেখানে ধরা পড়েছে পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের প্রেম-বিরহ, লোকজ ঐতিহ্য, রাধামন-ধনপুদি ও শিবচরণ-চান্দবীর মতো লোককাহিনি এবং হারিয়ে যেতে বসা এক রাঙামাটির স্মৃতি।
১৯৪৩ সালের ২২ আগস্ট চাকমা রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কুমার সমিত রায়। তিনি ছিলেন ৪৯তম চাকমা রাজা নলিনাক্ষ রায় ও রানী বিনীতা রায়ের দ্বিতীয় সন্তান। তাঁর ডাকনাম ছিল জনি। দুই ভাই ও তিন বোনের স্নেহে, রাজপরিবারের সাংস্কৃতিক আবহে এবং রাঙামাটির প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে তাঁর শৈশব কেটেছিল।
তাঁর সহোদরদের মধ্যে ছিলেন কুমারী অমিতি রায়, রাজা ত্রিদিব রায়, কুমারী মৈত্রী রায়, কুমারী রাজশ্রী রায় এবং কুমার নন্দিত রায়। ছোটবেলা থেকেই সমিত রায় ছিলেন অত্যন্ত মিশুক, প্রাণবন্ত ও প্রকৃতিপ্রেমী।
তবে শৈশবেই তাঁকে পিতৃবিয়োগের বেদনা বহন করতে হয়। ১৯৫১ সালের ৭ অক্টোবর মাত্র ৪৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন রাজা নলিনাক্ষ রায়। পিতার এই অকালপ্রয়াণ তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
কুমার সমিত রায়ের শিক্ষাজীবনের সূচনা কলকাতায়। পরবর্তীতে দার্জিলিংয়ের ভিক্টোরিয়া স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৬২ সালে সেখান থেকে সিনিয়র ক্যামব্রিজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিএ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নকালে এক বছর আইন বিষয়েও পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু আইনশাস্ত্রের প্রতি আগ্রহ অনুভব না করায় পরে সেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। শিক্ষাজীবনের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু একজন জ্ঞানী মানুষই করেনি, বরং তাঁর চিন্তা, সাহিত্যবোধ, ইতিহাসচেতনা ও সাংস্কৃতিক মননকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।
মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর কুমার সমিত রায় দুবার সিএসপি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বলে জানা যায়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ফরেন অ্যাফেয়ার্স বিভাগে করাচিতে চাকরির সুযোগও তিনি লাভ করেছিলেন। কিন্তু সেই চাকরিতে যোগ দেননি। কারণ, তাঁর কাছে চাকরির মর্যাদার চেয়েও প্রিয় ছিল নিজের পাহাড়, নিজের রাঙামাটি এবং নিজের মানুষ। দূরদেশের আরাম-আয়েশের জীবন তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। তাঁর মন পড়ে ছিল কর্ণফুলীর তীরে, পাহাড়ের সবুজ ঢালে, রাঙামাটির মানুষের কাছে। জীবনের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও প্রমাণ করেছে- নিজের মাটির প্রতি তাঁর এই টান ছিল গভীর ও আজীবন।
১৯৭২ সালে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে রাঙামাটি সরকারি কলেজে যোগ দেন কুমার সমিত রায়। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ২০০৪ সালে সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন। শ্রেণিকক্ষে তিনি শুধু ইতিহাস পড়াতেন না; শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানবিকতা ও স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাতেন। তাঁর অনেক ছাত্রের কাছে তিনি ছিলেন শুধু শিক্ষক নন, ছিলেন অভিভাবকের মতো একজন মানুষ।
তাঁর মৃত্যুর পর এক ছাত্র এসে তাঁর স্ত্রী জয়তি রায়ের কাছে তাঁর স্মৃতিচারণ করেছিলেন। সেই ছাত্রকে কলেজজীবনে সমিত রায় নিয়মিত আর্থিক সহায়তা করতেন। পরবর্তীকালে সেই ছাত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। এমন অসংখ্য মানুষের জীবনে তিনি নীরবে আলো জ্বেলেছেন- যার অনেক গল্প তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশই পায়নি।
কুমার সমিত রায়ের ব্যক্তিজীবনেও ছিল এক মায়াময় প্রেমকাহিনি। রাঙামাটির পুরোনো দিনের কর্ণফুলীর তীর, হাজারীবাগের মাঠ, রাজবাড়ির আশপাশের সেই পরিচিত পরিবেশেই তাঁর সঙ্গে জয়তি রায়ের পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে। জয়তি রায় ছিলেন তখন অল্পবয়সী। বান্ধবীদের সঙ্গে তিনি মাঠে খেলতে যেতেন। সমিত রায় ছিলেন রসিক ও বন্ধুত্বপরায়ণ। একদিন মাঠে আসা মেয়েদের জন্য তিনি চুড়ি কিনে আনেন। অন্যরা চুড়ি নিলেও জয়তি প্রথমে নিতে অস্বীকার করেন। পরে বান্ধবীদের অনুরোধে চুড়ি গ্রহণ করলে সমিত রায় আনন্দিত হন। সেই ছোট্ট স্মৃতিই পরবর্তীতে তাঁর গানে রূপ পায়-
“ইধোত আগেনি নেই? পূণ্যামেলাত্তুন।
কিনি দিদুং বাঙুরী, পিনেই দিদুঙ মুই!!”
পরিবারের সম্মতিতে ১৯৬৫ সালে তাঁদের প্রণয় পরিণয়ে রূপ নেয়। জয়তি রায় হয়ে ওঠেন তাঁর জীবনসঙ্গী।
সমিত রায়ের শিল্পীসত্তার ভিত গড়ে উঠেছিল শৈশবেই। তাঁর মা বিনীতা রায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। তাঁর কাকা সলিল রায় ছিলেন চাকমা সমাজের প্রথমদিককার কবিদের একজন। রাজপরিবারে শিল্পী-সাহিত্যিকদের যাতায়াত ছিল। কলকাতায় পড়াশোনার সময়ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নিতেন।এই পরিবেশ তাঁর ভেতরে যে সৃজনশীল বীজ বপন করেছিল, পরবর্তী জীবনে তা মহীরুহে পরিণত হয়।
১৯৭০-এর দশকে কুমার সমিত রায় তাঁর ছোট ভাই কুমার নন্দিত রায় (রেনি) এবং কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘উন্মাদ শিল্পীগোষ্ঠী’। শুরুতে তাঁরা অন্য শিল্পীদের গান পরিবেশন করতেন। পরে ১৯৮০-এর দশকে নিজেদের গান নিয়ে নতুন পথচলা শুরু হয়। এই সময় থেকেই সমিত রায়ের গীতিকার ও সুরকার হিসেবে পূর্ণ বিকাশ ঘটে।
রাজবাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে তিনি আপনমনে গানের কথা লিখতেন, তারপর নিজের গানের সুর নিজেই গুনগুন করে তৈরি করতেন। বন্ধুদের সঙ্গে চলত জ্যামিং। সেই সৃজনমগ্ন পরিবেশ থেকেই জন্ম নিয়েছে চাকমা সংগীতের বহু স্মরণীয় গান। সমিত রায়ের সৃষ্টিশীলতার একটি অনন্য ঘটনা জড়িয়ে আছে “হোজপানা হারে হই” গানটির সঙ্গে।
১৯৮০-এর দশকে ক্যাসেটে গান রেকর্ডের সময় গানটি গাওয়ার কথা ছিল উত্তম দেওয়ান মানি। কিন্তু কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি স্টুডিওতে পৌঁছাতে কিছুটা দেরি করেন। এর মধ্যে চিজিমনি বাবু গানটি নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর কণ্ঠেই গানটি রেকর্ড হয়। পরে মানি এসে গানটি অন্যের কণ্ঠে রেকর্ড হয়ে গেছে দেখে মন খারাপ করেন। সমিত রায় তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে সেখানেই নতুন একটি গান লিখে ফেলেন-
“মোনতোলা আদামর টান্নেবি,
কুধু আগচ কিঝানি।”
পরবর্তীতে সেই গানটি মানি দেওয়ানের কণ্ঠে রেকর্ড হয়। একই দিনে জন্ম নেয় দুটি স্মরণীয় চাকমা গান,যার একটির জন্ম হয়েছিল নির্ধারিত পরিকল্পনায়, আর অন্যটির জন্ম হয়েছিল একজন শিল্পীর বন্ধুর মন ভালো করার আন্তরিক প্রয়াস থেকে। এ ঘটনা কুমার সমিত রায়ের শিল্পীসত্তার একটি বিশেষ দিক উন্মোচন করে, তিনি গানকে শুধু শিল্প হিসেবে দেখতেন না; গান ছিল তাঁর অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।
সমিত রায়ের গান শুনলে মনে হয়, রাঙামাটির পাহাড়, নদী, বন, ঝিরি, ফুল, মানুষের হাসি-কান্না, সবকিছু যেন সুর হয়ে কথা বলছে। কাপ্তাই বাঁধের আগে যে রাঙামাটি তিনি দেখেছিলেন, সেই হারিয়ে যাওয়া জনপদের স্মৃতি তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে ছিল। তাই তিনি লিখেছিলেন-
“কিল্লে আদি্যিা স্ববনত দেক্কোং, পুরোন রাংগামাত্যা।”
এই পঙ্ক্তির ভেতর শুধু স্মৃতিচারণ নেই; আছে একটি হারিয়ে যাওয়া ভূগোলের জন্য দীর্ঘশ্বাস। সুবলংয়ের গভীরে ‘আলাম্বা’ নামের এক গ্রামে গিয়ে সেখানকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ফিরে তিনি লিখেছিলেন-
“এঞ্জান দোল জাগা গান কুধু আঘে কিঝানি,
রং-বেরঙর তেংতেমুরি বংপাদারে যাদন উরি...”
তাঁর গানে প্রকৃতি কখনো শুধু দৃশ্য নয়; প্রকৃতি সেখানে প্রেম, স্মৃতি, পরিচয় এবং অস্তিত্বের অংশ। কুমার সমিত রায়ের গানের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল চাকমা লোকঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক সংগীতবোধের সমন্বয়। তিনি রাধামন-ধনপুদি, শিবচরণ-চান্দবীর মতো লোককথার চরিত্রকে নিজের গানে স্থান দিয়েছেন-
“আজার বজর ধরি, এলুং ইধু মুই,
রাধামন-ধনপুদি, শিবচরন-চান্দোবি,
বেগে মিলি আঘি ইধু, আজার বজর ধরি।”
ফলে তাঁর গান হয়ে উঠেছে একই সঙ্গে আধুনিক, লোকজ এবং মাটির গভীর শিকড়ে প্রোথিত।
কুমার সমিত রায়ের প্রতিভা শুধু সাহিত্য ও সংগীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন দুর্দান্ত ক্রীড়াবিদ এবং ক্রীড়া সংগঠক। ফুটবল ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়। তিনি বলতেন, একদিন ফুটবলে লাথি না মারলে তাঁর মনে হতো যেন একদিন ভাত খাননি। গ্রামে গ্রামে গিয়ে তিনি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন, প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাছাই করে দল গড়তেন এবং অনেক সময় খেলোয়াড় ও দলের যাবতীয় খরচ নিজেই বহন করতেন। তিনি ক্রিকেট, হকি, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন ও টেবিল টেনিসে পারদর্শী ছিলেন। চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি দীর্ঘদিন প্রেস্টিজিয়াস স্টার ক্লাবের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন। রাঙামাটির শহীদ শুক্কুর ক্লাব ও রাজবাড়ী স্টার ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে।তিনি শুধু নিজে খেলতেন না, অন্যের প্রতিভা বিকাশেও সহযোগিতা করতেন। কোনো মেধাবী খেলোয়াড়ের সন্ধান পেলে তাঁকে উৎসাহিত করতেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতেন এবং কোচ হিসেবে দীর্ঘদিন বিভিন্ন খেলাধুলা ও অ্যাথলেটিকসে কাজ করেছেন। ১৯৭৬ সালের মন্ট্রিয়াল অলিম্পিকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার গৌরবও তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
রাঙামাটির ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি রাঙামাটিতে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণের দাবি ও প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীকালে রাঙামাটিতে মারী স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। এ ঘটনাও প্রমাণ করে, নিজের জন্য নয়, নিজের এলাকার মানুষের জন্যই তিনি তাঁর পরিচিতি ও প্রভাবকে কাজে লাগাতে চাইতেন।
জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন রাজকুমার। কিন্তু তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে। রাজকীয় পরিচয় তাঁকে কখনো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। তিনি ছিলেন অমায়িক, দয়ালু ও প্রচারবিমুখ। মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর স্বভাব। অনেককে তিনি নীরবে আর্থিক সহায়তা করতেন, এমনও ঘটেছে, তাঁর পরিবারের সদস্যরাও সেই সাহায্যের কথা জানতেন না। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ছিল মানুষ হওয়া। রাজপরিবারের সদস্য হয়েও তিনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যেতে পারতেন। তাঁর মানবিকতার গল্প তাই আজও রাঙামাটির মানুষের স্মৃতিতে ছড়িয়ে আছে।
স্বাধীনতার পর সমিত রায় স্বপরিবারে ভারতে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিদেশের মাটিতে তাঁর মন টেকেনি। কয়েক বছর পর পরিবার নিয়ে আবার ফিরে আসেন রাঙামাটিতে। দেশে ফিরে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে একাধিকবার মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু মন্ত্রী হলে হয়তো রাঙামাটির বাইরে থাকতে হবে, এই আশঙ্কায় তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ক্ষমতার কেন্দ্রের চেয়ে তাঁর কাছে পাহাড়ের মানুষের ভালোবাসা ছিল বড়। এই সিদ্ধান্ত তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচয়গুলোর একটি।
১৯৮০ ও ৯০-এর দশক ছিল তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়। পরবর্তী সময়ে তিনি খুব বেশি গান লেখেননি। ২০০২-০৪ সালের দিকে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি যে গানটি লিখেছিলেন, সেখানে যেন নিজের জীবনকে ফিরে দেখেছিলেন-
“মোন-মুরো, ছড়া-গাং ফেলেই যাংগোল্লোই,
চিগোন চিগোন কধানি ইদোত উদেল্লোই।
জিঙ্ঘানির ভালুদ্দুর পথ ফেলেই ইচ্চোং মুই,
কি চেয়োং কি পেয়োং, ইজেব রাক্কোনি হেউ?”
এই গানের ভেতর যেন এক পথিকের দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি, অর্জন ও অনন্ত প্রশ্ন মিশে আছে। জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত কী খুঁজল, কী পেল- সেই হিসাব কি কেউ রাখে?
সমিত রায়ের শেষদিকের এই সৃষ্টিকে তাই শুধু একটি গান হিসেবে দেখলে তার গভীরতা ধরা পড়ে না; এটি যেন তাঁর নিজের জীবনদর্শনের এক অন্তর্মুখী স্বীকারোক্তি।
কুমার সমিত রায় লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে ২০০৮ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম হারায় এক অসাধারণ শিক্ষক, গীতিকার, সুরকার, ক্রীড়াবিদ ও মানবিক মানুষকে। মৃত্যুর পর চাকমা রাজবাড়িতে তাঁর মায়ের পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ। সেই স্মৃতিফলকে স্থান পেয়েছে তাঁরই লেখা একটি গান-
“দগিনো বইয়ের বার,
বিজু ফুল উন ঝড়ি যার,
এঞ্জান ফাগুনো দিনোত,
গিত্তুন ইদোত গরিচ মর।”
এই পঙ্ক্তিগুলো যেন তাঁর জীবনকেই ধারণ করে- বসন্ত আসে, বিঝুর ফুল ঝরে যায়, দিন ফুরিয়ে যায়; কিন্তু মানুষের সৃষ্টি, ভালোবাসা ও স্মৃতি থেকে যায়।
কুমার সমিত রায় ছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর জীবনে রাজকীয় পরিচয় ও সাধারণ মানুষের জীবনবোধ একাকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি ক্ষমতা চাননি, খ্যাতির পেছনে ছুটেননি; বরং নিজের জ্ঞান, প্রতিভা ও সামর্থ্যকে বিলিয়ে দিতে চেয়েছেন তাঁর প্রিয় রাঙামাটি এবং পাহাড়ের মানুষের জন্য।
তাঁর গান তাই কেবল গান নয়, এগুলো এক হারিয়ে যাওয়া রাঙামাটির দলিল। তাঁর সুরে আছে কর্ণফুলীর কলতান, পাহাড়ি ঝিরির শব্দ, বিঝুর রঙ, প্রেমের কোমলতা, বিচ্ছেদের ব্যথা এবং মানুষের প্রতি গভীর মমতা। তাঁর লেখায় আছে চাকমা লোকঐতিহ্যের স্মৃতি; তাঁর কর্মে আছে ক্রীড়াঙ্গনের উন্মেষ; তাঁর শিক্ষকতায় আছে প্রজন্ম গড়ার স্বপ্ন; আর তাঁর জীবনযাপনে আছে নিঃস্বার্থ মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কুমার সমিত রায়ের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহত্ত্ব জন্মপরিচয়ে নয়, কর্মে; রাজকীয় মর্যাদায় নয়, মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়াতেই। তাই তিনি আজ শুধু চাকমা রাজপরিবারের এক রাজকুমার নন; তিনি পাহাড়ের মানুষের স্মৃতিতে এক সুরের মানুষ, মাটির মানুষ, ভালোবাসার মানুষ।
সময় তাঁর শরীরকে নিয়ে গেছে, কিন্তু তাঁর গান নিয়ে যেতে পারেনি। কর্ণফুলীর ঢেউ থেমে যায়, পুরোনো রাঙামাটি জলের নিচে হারিয়ে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়, তবু কোনো এক তরুণের কণ্ঠে যখন ভেসে ওঠে তাঁর গান, তখন মনে হয় কুমার সমিত রায় এখনো আছেন। পাহাড়ের বাতাসে, পুরোনো রাজবাড়ির স্মৃতিতে, বিঝুর ফুলে, রাঙামাটির নদীতে, আর সবচেয়ে বেশি আছেন মানুষের হৃদয়ে। এই কারণেই কুমার সমিত রায় কেবল একজন গীতিকার নন; তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের এক বিস্মৃতপ্রায় সময়ের কণ্ঠস্বর।
তথ্যসূত্র: জুমজার্নাল ও বাবলি ফেসবুক পোস্ট
বি.দ্র.: লেখাটিতে তথ্যগত অসংগতি, অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। কোনো কোনো বক্তব্য আপনার জানা তথ্য বা মতের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তাই লেখাটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে, নিজস্ব জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের আলোকে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করার অনুরোধ রইল।


