শনিবার, ৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

জ্যোতিপ্রভা লারমা: পাহাড়ি জীবনের আলো ও সংগ্রামের দীপ্ত প্রদীপ - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের রূপ-মাধুর্যের আড়ালে যে দীর্ঘ ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তা কেবল সবুজ পাহাড়, কুলকুল ধ্বনিতে বহমান নদী কিংবা কুয়াশাঘেরা অরণ্যের সৌন্দর্য নয়; সে ইতিহাস মানুষের অধিকারবোধ, আত্মপরিচয়ের অস্তিত্ব রক্ষা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও এক চিরন্তন সংগ্রামের ইতিহাস। ইতিহাস কোনো কেবল নিরপেক্ষ ঘটনাপঞ্জি নয়, তা গড়ে ওঠে কিছু আত্মনিবেদিত প্রাগ্রসর মানুষের যৌথ পদচিহ্নে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক ও সামাজিক-রাজনৈতিক রূপান্তরের সেই দীর্ঘ আলোকিত অধ্যায়ে একজন জ্যোতিপ্রভা লারমা কেবল একটি ব্যক্তিনাম নন; তিনি পার্বত্য জনপদের চেতনা, নারীজাগরণের পথিকৃৎ এবং প্রজ্ঞার এক দীপ্ত শিখা।  

১৯৩৮ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের এক শান্ত থমথমে বৃহস্পতিবার। রাঙামাটি জেলা সদরের অদূরে সবুজে ঘেরা ছোট্ট গ্রাম ‘মহাপুরম’ (স্থানীয়দের প্রিয় ‘মাওরুম’)। সেই রূপময় গ্রামে শিক্ষক চিত্তকিশোর চাঙমা ও ধার্মিক সমাজসেবিকা সুভাষিনী দেওয়ানের ঘর আলো করে ভূমিষ্ঠ হন জ্যোতিপ্রভা লারমা। চার ভাই-বোনের মধ্য তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ।  পিতৃগৃহের পরিমণ্ডলটি ছিল মুক্তচিন্তা ও বিদ্যানুরাগের এক অপূর্ব তীর্থভূমি। পিতা চিত্তকিশোর চাকমার শিক্ষার প্রতি অপরিসীম দরদ ও দূরদর্শিতা কেবল জ্যোতিপ্রভাকেই আলোর মুখ দেখায়নি, বরং তাঁর অনুজ ভাইদেরও প্রস্তুত করেছিল এক ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য। তাঁর তিন অনুজ- শুভেন্দু প্রভাষ লারমা (বুলু), পার্বত্য জনপদের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা) এবং জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)- প্রত্যেকেই পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতীয়তাবাদী ও বৈষম্যবিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্বের শীর্ষ শিখরে আরোহণ করেন। জ্যোতিপ্রভা ছিলেন এই বিপ্লবী পরিবারের জ্যেষ্ঠ কাণ্ডারী ও চেতনার মূল অনুপ্রেরণাদাত্রী।  

চল্লিশের দশকের পাহাড়ি সমাজে কন্যাসন্তানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল সুদূরপরাহত এক স্বপ্ন। সামাজিক রক্ষণশীলতা ও ভৌগোলিক প্রতিকূলতাকে জয় করে জ্যোতিপ্রভা লারমা ভর্তি হন মহাপুরম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি শুধু সেখানে বিদ্যা অর্জন করতে যাননি, বরং সেই বিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে নাম লিখিয়ে ইতিহাসের সূচনা করেন।

বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ শেষ করার পর জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সংসার ও কাজের ব্যস্ততার মাঝেও শিক্ষার প্রতি তাঁর অন্তহীন তৃষ্ণা ম্লান হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর, প্রতিকূল সময় ও বয়সের হিসাবকে তুচ্ছ জ্ঞান করে ১৯৮০ সালে তিনি কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে সাফল্যসূচকভাবে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। প্রথাগত বয়সের সীমানা ডিঙিয়ে তাঁর এই শিক্ষাগত সাফল্য প্রমাণ করে- জ্ঞানের অনুসন্ধান কোনো নির্দিষ্ট বয়সের গণ্ডিতে বন্দি থাকে না।

১৯৫৪ সালে তিনি রাঙামাটিতে এসে জীবনসংগ্রামের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। ক্যাথলিক মিশন স্কুলে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর ব্রত। শিক্ষকতাকে তিনি কোনো সাধারণ অর্থ উপার্জনের জীবিকা হিসেবে নেননি, গ্রহণ করেছিলেন মানুষ গড়ার এক পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে। নিজেকে একজন নিপুণ শিক্ষিকা হিসেবে গড়ে তুলতে রাঙামাটি টিচার্স ট্রেনিং সেন্টার থেকে তিনি এক বছরের পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

শিক্ষকতার গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর বিস্তৃত মন চাইল গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার শিকড়ে গিয়ে কাজ করতে। তিনি ঢাকায় ভিলেজ এইড (V.A.I.D.)-এর অধীনে এক বছর মেয়াদী নিবিড় প্রশিক্ষণ নেন এবং খাগড়াছড়িতে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ভিলেজ এইডের হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে কাজ করার সময় তিনি পাহাড়ের অনগ্রসর নারীদের ক্ষুধা, অশিক্ষা, স্বাস্থ্যহীনতা ও বঞ্চনাকে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেন। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, চিকিৎসা, খেলাধুলা ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করার কাজে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন।

১৯৬০ সাল জ্যোতিপ্রভা লারমা তথা সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের সূচনা করে। কাপ্তাই বাঁধের জলে নিমজ্জিত হয় তাঁদের পৈতৃক ভিটেমাটি ‘মহাপুরম’ গ্রাম। শৈশবের স্মৃতি, স্মৃতির আঙিনা আর প্রিয় মাতৃভূমি জলের তলায় হারিয়ে গেলে পরিবারসহ তিনি উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নেন খাগড়াছড়ির পানছড়িতে। এই মর্মান্তিক বাস্তুচ্যুতি কেবল এক পরিবারের গৃহহীন হওয়া ছিল না, এটি ছিল হাজার হাজার জুম্ম জনগোষ্ঠীর মূল উপড়ে ফেলার যৌথ ট্র্যাজেডি।

পানছড়িতে এসে তিনি খাগড়াছড়ি এম.ই. স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। তবে শিক্ষকতার ক্লাসরুম থেকে তাঁর সামাজিক চেতনা ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ক্যানভাসে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যে ঐতিহাসিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, জ্যোতিপ্রভা লারমা তাতে নিঃশব্দে কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।  

পারিবারিক জীবন ও সামাজিক দায়িত্বকে তিনি সুষম ভারসাম্যে বেঁধেছিলেন। স্বামী চিরঞ্জীব তালুকদারের সঙ্গে সাংসারিক জীবনে তিনি দুই কন্যা ও তিন পুত্রসন্তানের জননী। মাতৃত্বের দায়িত্ব, গৃহস্থালি সামলানো, শিক্ষকতা ও সমাজসেবা- সবকিছুর পাশাপাশি তিনি পাহাড়ের নারী আন্দোলনকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যান। 

তাঁর মতে, কেবল রাজনৈতিক স্বশাসন অর্জন করলেই মুক্তি আসে না; যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রান্তিক মানুষ ও নারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে, ততক্ষণ সমাজ অসম্পূর্ণ। ফলে তাঁর সংগ্রাম ছিল একাধারে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন ও নারীর মানবিক মর্যাদা রক্ষার লড়াই।
 

জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে জ্যোতিপ্রভা লারমা তাঁর অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও সমাজচিন্তাকে সাহিত্যের ভাষায় প্রকাশ করতে শুরু করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে স্বজাতির সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, নারীজীবন ও অধিকারচেতনার প্রতি গভীর অনুরাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তাঁর লেখার মূল উদ্দেশ্য নিছক সাহিত্যচর্চা নয়; বরং সমাজের বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি, নারী-পুরুষের অসমতা দূরীকরণ, অধিকারহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নিপীড়ন-বঞ্চনামুক্ত একটি মানবিক সমাজ নির্মাণে ভূমিকা রাখা।

২০১৯ সালের অক্টোবরে তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘চাঙমা পজ্জন’র ফুলবারেং’ প্রকাশিত হয়। এর পর ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্রজ্জ্বল সূর্যের প্রতীক্ষায়’। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের স্মৃতি ধারণ করে ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘একজন সংগ্রামী নারীর আত্মকথন’

এই গ্রন্থগুলো তাঁর ব্যক্তিজীবনের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি একটি সময়, একটি সমাজ এবং একটি জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রামেরও সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর লেখায় ব্যক্তির গল্প বৃহত্তর সমাজের গল্পে রূপ নেয়; ব্যক্তিগত বেদনা হয়ে ওঠে সামষ্টিক স্মৃতির অংশ।

 
পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার, স্বশাসন প্রতিষ্ঠা ও নারী জাগরণে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি সম্মানিত হয়েছেন- চট্টগ্রামের প্রীতিলতা ট্রাস্ট সম্মাননা বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ সম্মাননা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম (পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল) সম্মাননা, তবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্মাননা বা উপাধিতে জ্যোতিপ্রভা লারমার জীবনব্যাপ্তিকে আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তাঁর আসল পরিচয়- তিনি প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে হেঁটে যাওয়া এক অগ্রগামী নারী, যিনি পাহাড়ের নতুন প্রজন্মকে পথ দেখিয়েছেন।

জ্যোতিপ্রভা লারমা সময়কে কেবল অতিক্রম করেননি, তিনি সময়কে নিজের চেতনায় ধারণ করেছেন। জীবনের উত্থান-পতন, ভিটেমাটি হারানোর কষ্ট, আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে সাহিত্যসাধনার শান্ত আশ্রয়ে পৌঁছানো- সব মিলিয়ে তাঁর জীবন পার্বত্য চট্টগ্রামের একেঁবেঁকে চলা পাহাড়ি নদীর মতোই বহমান। আজ বয়সের ভারে শরীর হয়তো কিছুটা শ্লথ, কিন্তু তাঁর চিন্তার জ্যোতি অমলিন। পার্বত্য জনপদের ইতিহাসে সংগ্রামী নারী জ্যোতিপ্রভা লারমা এক অবিনাশী প্রদীপ হয়ে জাগ্রত থাকবেন বহুকাল।

তথ্যসূত্র: তাঁর প্রকাশিত বই বিভিন্ন সময় প্রকাশিত খবর 

তিন পার্বত্য জেলার সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট: মাতৃভাষার জন্য কী রেখে যাচ্ছে?

 

[অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতার বাইরে নজর দেওয়া হোক মাতৃভাষা, বর্ণমালা ও প্রকাশনায়]
পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান- তিন জেলাতেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য পৃথক সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট রয়েছে। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রশিক্ষণ, প্রতিযোগিতা, গবেষণা ও প্রকাশনা- এসব তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমের অংশ। তবে এই বিস্তৃত কর্মকাণ্ডের মধ্যে মাতৃভাষা ও বর্ণমালা সংরক্ষণ বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। কারণ একটি জনগোষ্ঠীর ভাষার সঙ্গে তার ইতিহাস, সাহিত্য, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গভীরভাবে যুক্ত। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হতে পারে- মাতৃভাষা ও বর্ণমালার জন্য তারা কী প্রকাশ করেছে এবং সেই কাজের ধারাবাহিকতা কতটা?
 
রাঙামাটি ও বান্দরবান ইনস্টিটিউটের সরকারি তথ্যেই মাতৃভাষা, বর্ণমালা, সাহিত্য ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং গবেষণার কথা উল্লেখ রয়েছে। তিন জেলার কার্যক্রমের দিকে তাকালে কিছু পার্থক্যও চোখে পড়ে। বান্দরবান ইনস্টিটিউটের সরকারি ওয়েবসাইটে মাতৃভাষা শিক্ষা কোর্স, মাতৃভাষায় সাহিত্য প্রতিযোগিতা, রচনা ও বক্তৃতাসহ পৃথক মাতৃভাষাভিত্তিক কার্যক্রমের তথ্য রয়েছে; ২০২৬ সালেও ম্রো ভাষা শিক্ষা কোর্সের অক্ষরজ্ঞান ব্যাচের পরীক্ষার ফল প্রকাশিত হয়েছে। রাঙামাটি ইনস্টিটিউটে গবেষণা ও প্রকাশনার পৃথক শাখা রয়েছে, যা ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রকাশনার সুযোগ তৈরি করে। খাগড়াছড়ি ইনস্টিটিউটেও প্রকাশনা ও লাইব্রেরির ব্যবস্থা রয়েছে এবং অতীতে ‘মাতৃভাষা’ নামে একটি ম্যাগাজিনের তিনটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল বলে জানা যায়; কিন্তু এর পর আর ধারাবাহিকতা দেখা যায়নি। এসব উদ্যোগ ও কাঠামো গুরুত্বপূর্ণ হলেও মূল প্রশ্ন থেকে যায়- মাতৃভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে নিয়মিতভাবে কতটি বই, সাময়িকী ও শিক্ষাসামগ্রী প্রকাশিত হচ্ছে?
 
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতা প্রয়োজনীয়; এগুলো মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ায় এবং সাংস্কৃতিক চর্চাকে জীবন্ত রাখে। কিন্তু একটি অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়, একটি প্রতিযোগিতার সময়ও সীমিত। বিপরীতে একটি মাতৃভাষার বই, বর্ণমালার গ্রন্থ, ভাষাশিক্ষার উপকরণ কিংবা সাময়িকী দীর্ঘদিন সংরক্ষণ ও ব্যবহার করা যায়। তাই মাতৃভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে প্রকাশনা একটি স্থায়ী ও দৃশ্যমান ফলাফল।
 
এক্ষেত্রে মূল্যায়নের জন্য কয়েকটি সহজ প্রশ্নই যথেষ্ট- কতটি মাতৃভাষার বই ও সাময়িকী প্রকাশিত হয়েছে, কতটি বর্ণমালা ও ভাষাশিক্ষার উপকরণ তৈরি হয়েছে, কতগুলো ভাষা ও জনগোষ্ঠী এতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং প্রকাশনার ধারাবাহিকতা কতটা বজায় রয়েছে?
 
তিন ইনস্টিটিউট চাইলে যৌথভাবে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম মাতৃভাষা ও বর্ণমালা প্রকাশনা কর্মসূচি’ গ্রহণ করতে পারে। এর আওতায় মাতৃভাষার বই, বর্ণমালা ও ভাষাশিক্ষার উপকরণ, সাময়িকী এবং পুরোনো গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ বা পুনর্মুদ্রণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি প্রতিবছর একটি সংক্ষিপ্ত প্রকাশনা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলে সাধারণ মানুষ সহজেই জানতে পারবেন- কোন ভাষায় কী প্রকাশিত হয়েছে এবং আগের বছরের কাজ কতটা এগিয়েছে। এ ধরনের উদ্যোগ প্রতিযোগিতার জন্য নয়; বরং পারস্পরিক অভিজ্ঞতা বিনিময় ও ভাষা সংরক্ষণের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে।
 
তিন সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউটের দায়িত্ব বিস্তৃত। তাই তাদের সামগ্রিক সাফল্য শুধু মাতৃভাষার কাজ দিয়ে বিচার করা যাবে না। কিন্তু মাতৃভাষা ও বর্ণমালা যদি প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বের অংশ হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক ফলাফল প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক। প্রশ্নটি তাই সরল-
অনুষ্ঠান ও প্রতিযোগিতার পাশাপাশি মাতৃভাষা ও বর্ণমালার জন্য কী প্রকাশনা রেখে যাচ্ছে তিন প্রতিষ্ঠান?
কারণ একটি অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়, কিন্তু একটি বই থেকে যায়। একটি বর্ণমালার গ্রন্থ শুধু অক্ষর শেখায় না, একটি ভাষার লিখিত অস্তিত্বও ধরে রাখে। ভাষা শুধু মুখে বেঁচে থাকে না; বইয়ে, বর্ণমালায় এবং ধারাবাহিক প্রকাশনায়ও বেঁচে থাকে।

বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কিশলয় চাঙমা : চাঙমা সাহিত্যের এক নিবেদিত কবি - ইনজেব চাঙমা


“বিঝু গেল, বিঝু এল,

ফাওন গেল, ফাওন এল—
তুইওদ তুই ন’ এলে চম্পা,
তুই কুধু গেলে।”

    চাঙমা ভাষার জনপ্রিয় এই গানের পঙ্‌ক্তিতে ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে মিশে আছে অপেক্ষা, ভালোবাসা ও বিরহের অনুভূতি। বিঝু ও ফাল্গুন আসে-যায়, সময় এগিয়ে চলে, অথচ প্রতীক্ষিত মানুষটির দেখা মেলে না। সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ প্রকাশের এই ক্ষমতাই কবি কিশলয় চাঙমার সৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

    চাঙমা সাহিত্যজগতে কিশলয় চাঙমা একজন কবি ও গীতিকার হিসেবে সুপরিচিত। শৈশব থেকেই কবিতার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ, যা পরবর্তীকালে নিয়মিত সাহিত্যচর্চায় পরিণত হয়। চাঙমা ভাষায় প্রথম সনেট রচনার কৃতিত্বও তাঁর সঙ্গে যুক্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি, মানুষের জীবন, সামাজিক বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাঁর সৃষ্টির প্রধান অনুষঙ্গ। নিজের মাতৃভাষাকে সৃজনের মাধ্যম করে তিনি পাহাড়ের জীবন ও মানুষের অনুভূতিকে সাহিত্যে রূপ দিয়েছেন। তাঁর এই নিরন্তর প্রয়াস চাঙমা ভাষার সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

    কিশলয় চাঙমার সার্টিফিকেট অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ (১৯৭০, ফাল্গুন/এপ্রিল) সালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মাটিরাঙ্গা থানার বলিপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতা সুধীর কুমার চাঙমা এবং মাতা চিবনবি চাঙমা

    তাঁরা ছিলেন ২ ভাই ও ৩ বোন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে কিশলয় চাঙমা দ্বিতীয়। পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সময় তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং পাহাড়ি সমাজের জীবনযাত্রা। এসব অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যিক ভাবনায় প্রভাব ফেলেছে।

    তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু মাটিরাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি কবিতা লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। প্রকৃতি ও চারপাশের জীবন তাঁকে ভাবতে শেখায়, আর সেই ভাবনাই ধীরে ধীরে কবিতার ভাষা পেতে থাকে।

    ১৯৮৫ সালে শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি রাঙামাটিতে যান এবং সেখানে সুপরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মোনঘরে পড়াশোনা করেন। মোনঘরে থাকাকালে তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভার বিকাশ ঘটে। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি একাধিকবার পুরস্কৃত হন।

    ছাত্রজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর একটি হলো ফ্যামিলি প্ল্যানিং কর্তৃক আয়োজিত কবিতা রচনা প্রতিযোগিতায় অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে রাঙ্গামাটি জেলায় প্রথম স্থান অর্জন। এই স্বীকৃতি তাঁর সাহিত্যচর্চায় নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করে।

    কিশলয় চাঙমার কবিতার প্রধান বিষয় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন। পাহাড়, নদী, বন, ঝরনা কিংবা ঋতু তাঁর কবিতায় কেবল দৃশ্যপট হিসেবে উপস্থিত হয় না; এগুলোর সঙ্গে মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি ও জীবনযাত্রার সম্পর্কও তিনি তুলে ধরেন।

    চাঙমা সমাজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, উৎসব, সামাজিক সম্পর্ক, মানুষের সুখ-দুঃখ এবং প্রেম-বিরহ তাঁর কবিতায় বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ফলে তাঁর রচনায় ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি একটি জনগোষ্ঠীর জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও প্রতিফলন ঘটে।

তাঁর দেশাত্মবোধের ভিত্তিও এই মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর সম্পর্ক। পার্বত্য চট্টগ্রাম তাঁর কাছে শুধু জন্মভূমি নয়; এটি তাঁর স্মৃতি, অনুভব ও আত্মপরিচয়ের অংশ। সেই কারণে তাঁর কবিতায় স্বদেশপ্রেম কোনো আলাদা বিষয় হয়ে ওঠে না, বরং জীবনবোধের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে আসে।

    কিশলয় চাঙমার সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো চাঙমা ভাষায় প্রথম সনেট রচনার কৃতিত্ব তাঁর সঙ্গে যুক্ত। প্রচলিত কাব্যরীতিকে নিজের মাতৃভাষায় প্রয়োগের এই উদ্যোগ চাঙমা কবিতার প্রকাশভঙ্গিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।

এতে তাঁর সৃজনশীলতা ও নতুন কাব্যরীতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। মাতৃভাষাকে শুধু দৈনন্দিন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করার আকাঙ্ক্ষা তাঁর কাজে প্রতিফলিত হয়েছে।

    কবিতার পাশাপাশি গান রচনাতেও কিশলয় চাঙমার আগ্রহ রয়েছে। তাঁর জনপ্রিয় গানের পঙ্‌ক্তিতে ঋতু, প্রেম ও অপেক্ষার মতো সার্বজনীন অনুভূতি চাঙমা জীবন ও সংস্কৃতির অনুষঙ্গের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

    “বিঝু গেল, বিঝু এল...” গানটির মধ্য দিয়ে সময়ের প্রবাহ এবং প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষার যে আবেগ প্রকাশ পেয়েছে, তা শ্রোতার কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। তাঁর গানগুলোতে ভাষার সরলতা ও অনুভূতির স্বাভাবিক প্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

    তাঁর সাহিত্যজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘মোনবী’। গ্রন্থটি প্রকাশের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যসচেতন মহলে পরিচিতি লাভ করেন এবং প্রশংসা অর্জন করেন।

    ‘মোনবী’-তে তাঁর কাব্যভাবনা, ভাষার ব্যবহার এবং জীবন ও প্রকৃতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। এটি তাঁর দীর্ঘদিনের সাহিত্যচর্চাকে পাঠকের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

    প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিশীলতার বড় একটি অংশ এখনও অপ্রকাশিত। বর্তমানে তাঁর কাছে চাঙমা ভাষায় কবিতা ও গানের তিনটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে সেগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

একজন সাহিত্যিকের সৃষ্টিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকাশনার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিশলয় চাঙমার অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো প্রকাশিত হলে চাঙমা ভাষার সাহিত্য ও গানের ভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। তাঁর দীর্ঘদিনের সৃষ্টিশীল শ্রমও বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে।

    সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি কিশলয় চাঙমা পারিবারিক জীবনেও দায়িত্বশীল। তাঁর স্ত্রী সুচরিতা চাঙমা। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন কন্যা বনরূপা চাঙমা, যিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবনে যুক্ত, এবং পুত্র বেবিলন চাঙমা

    পরিবার ও জীবনের নানা দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে সৃষ্টির মাধ্যমে ধারণ করার চেষ্টা তাঁর সাহিত্যিক নিষ্ঠার পরিচয় বহন করে।

    কিশলয় চাঙমার সাহিত্যিক গুরুত্ব শুধু একটি কাব্যগ্রন্থ বা কয়েকটি জনপ্রিয় গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বিশেষত্ব হলো—তিনি নিজের মাতৃভাষায় সমকালীন জীবন, প্রকৃতি, অনুভূতি ও সংস্কৃতিকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন।

চাঙমা ভাষায় সনেট রচনা তাঁর সৃজনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে কবিতা ও গানে পাহাড়ি সমাজজীবনের নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরে তিনি নিজস্ব সাহিত্যিক স্বর নির্মাণ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনাগুলো চাঙমা ভাষার সাহিত্যভাণ্ডারের সম্ভাবনাকেই নির্দেশ করে।

    কিশলয় চাঙমার সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছিল শৈশবের কবিতা লেখা দিয়ে। ছাত্রজীবনের পুরস্কার, মোনঘরের সাহিত্যচর্চা, চাঙমা ভাষায় সনেট রচনার প্রয়াস এবং ‘মোনবী’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে সেই পথ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে।

    তাঁর সৃষ্টিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি উঠে এসেছে প্রেম, বিরহ, সংস্কৃতি ও স্বদেশচেতনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি এসব অনুভূতিকে নিজের মাতৃভাষায় প্রকাশ করেছেন।

    অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর তিনটি পাণ্ডুলিপি এখনও প্রকাশের অপেক্ষায়। যথাযথ সহযোগিতা পেলে এসব সৃষ্টি পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং চাঙমা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।

    বিঝু আসে, ফাল্গুন আসে, সময়ের স্রোত এগিয়ে যায়। কিন্তু কবির সৃষ্ট শব্দ থেকে যায়। কিশলয় চাঙমার সাহিত্যসাধনার মূল্যও সেখানেই—নিজের মাটি, মানুষ ও ভাষার স্মৃতিকে তিনি শব্দে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। সেই প্রয়াস তাঁকে চাঙমা সাহিত্যজগতে স্বতন্ত্র ও স্মরণীয় করে রাখবে।

তথ্যসূত্র

১. রাণ্যাফুল — কবিতা গ্রন্থ।
২. কবির সাক্ষাৎকার — কবির জীবন, সাহিত্যচর্চা ও সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কিত তথ্য।
৩. কবির সাক্ষাৎকার গ্রহণে সহযোগিতা করেছেন সোহেল চাঙমা, কার্বারি

 

চাঙমা ভাষার লেখকদের নিরুৎসাহিত নয়, উৎসাহিত করাই সময়ের দাবি - ইনজেব চাঙমা

 

কোনো ব্যক্তিকে ‘কবি’ বলা যাবে কি না, এ নিয়ে সাহিত্যিক বা একাডেমিক আলোচনা হতেই পারে। একজন কবির কবিত্ব, তাঁর সৃষ্টির পরিমাণ, মান, প্রকাশনা কিংবা সাহিত্যিক অবদান নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনারও একটি পরিমিতি, সৌজন্য ও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা থাকা প্রয়োজন।  বিশেষ করে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালার বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল।
 
আজকের বাস্তবতা হলো, চাঙমাদের নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা থাকা সত্ত্বেও চাঙমা ভাষায় নিয়মিত লেখালেখির চর্চা অত্যন্ত সীমিত। বর্ণমালার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয়ও দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। চর্চার অভাবে অনেক তরুণ-তরুণীর কাছেই নিজস্ব বর্ণমালা অপরিচিত হয়ে উঠছে। এটি হয়তো আমাদের জন্য অপ্রিয় সত্য, কিন্তু এই সত্যকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
 
এমন বাস্তবতায় কেউ যখন চাঙমা ভাষায় লিখতে শুরু করেন, কবিতা লেখার চেষ্টা করেন, নিজের ভাবনা নিজের মাতৃভাষায় প্রকাশ করেন, তখন তাঁর প্রথম প্রয়োজন কঠোর বিচার নয়, বরং উৎসাহ। কারণ আজ যে তরুণটি দু-একটি কবিতা লিখছে, আগামী দিনে সেই হয়তো আরও ভালো লিখবে, আরও বেশি লিখবে এবং অন্যদেরও চাঙমা ভাষায় লিখতে অনুপ্রাণিত করবে।
 
একজন নতুন লেখকের লেখাকে সাহিত্যিক বিচারে দুর্বল মনে হলে তা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করা যায়। কিন্তু তাঁর মাতৃভাষায় লেখার উদ্যোগকে খাটো করা বা তাঁর লেখার সংখ্যা দিয়ে তাঁর ভাষাচর্চার গুরুত্বকে অস্বীকার করা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের নিজেদের ভাষার জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।
‘কবি’ অভিধাটি নিয়ে বিতর্কের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—চাঙমা ভাষায় আমরা কতজনকে লিখতে উৎসাহিত করছি? কতজন তরুণকে চাঙমা বর্ণমালা শেখাচ্ছি?  কতজন নতুন লেখককে আমরা বলছি, ‘লিখুন, ভুল হলেও লিখুন; আপনার ভাষায় লিখুন’?  চাঙমা ভাষার ভবিষ্যৎ শুধু প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের হাতে নয়; বরং যারা আজ প্রথমবার মাতৃভাষায় একটি কবিতা, গল্প, নিবন্ধ কিংবা ছোট্ট কোনো অনুভূতি লিখতে বসেছে, তাদের হাতেও নিহিত।
 
তাই কোনো লেখকের কবিত্ব নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতভেদ যেন চাঙমা ভাষায় লেখার আগ্রহকে নিরুৎসাহিত না করে। একজন লেখককে ‘কবি’ বলা হলো কি না, সেটি সময় ও সাহিত্যই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে। কিন্তু একজন মানুষ মাতৃভাষায় লিখতে শুরু করলেন, এই ঘটনাটিই ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে মূল্যবান।
 
আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ভাষা কেবল ব্যাকরণ, অভিধান কিংবা বর্ণমালার সমষ্টি নয়। ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের মুখে, কলমে, বইয়ে, গানে, কবিতায় এবং নতুন প্রজন্মের সৃষ্টিশীলতায়। সুতরাং চাঙমা ভাষার একজন লেখককে নিয়ে বিতর্ক করার আগে আমাদের ভাবা উচিত—তাঁকে থামিয়ে দিচ্ছি, নাকি আরও লিখতে উৎসাহিত করছি? কারণ আমাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট ‘কে কবি’- এই প্রশ্ন নয়; বরং আগামী প্রজন্মের হাতে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা আদৌ কতটা জীবন্ত থাকবে, সেই প্রশ্ন।
 
তাই আসুন, কবির অভিধা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি চাঙমা ভাষায় যারা লিখছেন, তাদের উৎসাহ দিই। ভুল হলে সংশোধন করি, দুর্বল হলে উন্নতির পথ দেখাই, কিন্তু কলমটি থামিয়ে না দিই। কারণ একটি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো, সেই ভাষায় মানুষকে লিখতে শেখানো এবং লিখতে উৎসাহিত করা।

বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রগতি খীসা: প্রতিকূলতার পথ পেরিয়ে সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে এক অভিযাত্রা - ইনজেব চাঙমা


জীবন
কখনো সরলরেখায় এগিয়ে চলে না কখনো তা কণ্টকাকীর্ণ পথ, কখনো অন্ধকার গিরিপথ, আবার কখনো প্রতিকূলতার বুক চিরে উঠে আসা আলোর রেখা মানুষের জীবনকে বুঝতে হলে শুধু তার সাফল্যের দিকে তাকালে চলে না; জানতে হয় সেই সাফল্যের পেছনে থাকা দীর্ঘ সংগ্রাম, বঞ্চনা, স্বপ্ন অদম্য পথচলার ইতিহাস প্রগতি খীসার জীবনও তেমনই এক পাঠক্রমযেখানে পারিবারিক ঐতিহ্য, শিক্ষার সাধনা, সাহিত্যচর্চা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে নিরন্তর লড়াই পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে

প্রগতি খীসা জন্মগ্রহণ করেন মার্চ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার ৫৯ নম্বর বন্দুকভাঙ্গা মৌজার দুরখেয়া গ্রামে পিতা কংশসুর খীসা এবং মাতা তনুপতি খীসা পাহাড়, নদী, ঝরনা প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে তাঁর শৈশবের শিকড় বিস্তৃত তাঁর মাতৃপরিবারের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে চাকমা সমাজের একটি ঐতিহ্যবাহী বংশপরম্পরা তাঁর মা তনুপতি খীসার জন্ম বেড়ে ওঠা চেঙীনদীর তীরে, বুড়িঘাটের অনতিদূরের ছোট মহাপ্রুম গ্রামে চাকমা গোজাগোষ্ঠীর বিবেচনায় তিনি ওয়াংজাগোজা কালাহাঙারা গোষ্ঠীর রনুখাঁ দেওয়ানের রক্তসম্পর্কীয় সদস্য ছিলেন ফলে প্রগতির পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে পাহাড়ের সামাজিক-ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের একটি গভীর যোগসূত্রও বিদ্যমান

তাঁদের পরিবার ছিল বড় পরিবার ভাই-বোনের মধ্যে ছিলেনচন্দ্র হংস খীসা, সুনীতি বিকাশ খীসা, সুমিত্রা খীসা, পদ্মশোভা খীসা, জ্ঞান বিকাশ খীসা, প্রগতি খীসা, জ্যোৎস্না দেবী খীসা এবং বিজয় খীসা তাঁদের বোন সুমিত্রা খীসা অকালেই, ১৯৮১ সালে, যৌবন বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই অকালবিয়োগও পারিবারিক জীবনে রেখে যায় গভীর শূন্যতার স্মৃতি

প্রগতি খীসার পারিবারিক ইতিহাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় তাঁর পিতামহ স্বর্গীয় নবীনা খীসাকে ঘিরে তিনি ছিলেন গ্রামের কার্বারী বা গ্রামপ্রধান কার্বারী হিসেবে স্থানীয় সমাজে তাঁর ছিল বিশেষ মর্যাদা এবং দায়িত্ব সেই সূত্রে চাকমা রাজপরিবারের সঙ্গেও তাঁদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল

পারিবারিক স্মৃতিতে সংরক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো১৯৫৮ সালে নবীনা খীসার সাদর আমন্ত্রণে তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় তাঁদের আতিথ্য গ্রহণ করেন সে সময় তিনি বন্দুকভাঙ্গার বিরেজমরা তানজাং জলপ্রপাত বন্দুককানা মোন (যমচুগ) দর্শন করেন বহু বছর পর ২০২১ সালে চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ও বিরেজমরা তানজাং দর্শন করেন এবং তাঁদের বাড়িতে রাত্রিযাপন করেন এই ঘটনাগুলো শুধু একটি পরিবারের স্মৃতি নয়; এর মধ্যে পাহাড়ের সামাজিক সম্পর্ক, আতিথেয়তা এবং ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিকতাও প্রতিফলিত হয় এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বুকে নিয়েই প্রগতি খীসার বেড়ে ওঠা কিন্তু ঐতিহ্যের মর্যাদা থাকলেও তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল সহজ মসৃণ নয়

জীবনের প্রথম পাঠ শুরু হয় করল্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এরপর তিনি মাচ্ছ্যা পাড়া (চারিখ্যং) নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, বন্দুকভাঙ্গা থেকে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন

পরবর্তী সময়ে রাঙ্গামাটির শাহ (বহুমুখী) উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে ১৯৯০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এরপর রাজানগর রাণীরহাট কলেজ থেকে ১৯৯২ সালে এইচএসসি পাস করেন উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চট্টগ্রামের নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৯৫ সালে দ্বিতীয় বিভাগে বি.. ডিগ্রি অর্জন করেন

তাঁর শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা এখানেই থেমে থাকেনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এম.. অধ্যয়নরত অবস্থায় ভদন্ত সুমনালঙ্কার মহাথেরের আহ্বানে তিনি খাগড়াছড়ির পিবিএম আবাসিক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হয়ে ওঠার এই পরিবর্তন তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক এর পাশাপাশি ধর্মীয় পালি শিক্ষার প্রতিও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ পালি সংস্কৃত শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা থেকে বিনয় উপাধি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন

তবে তাঁর নিজের ভাষায়, কার্বারী পরিবারের সন্তান হয়েও তাঁর পড়াশোনার সময়টি সঙ্গত কারণে সুখকর ছিল না নানা প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে তাঁকে শিক্ষার পথ এগিয়ে নিতে হয়েছে তাই তাঁর শিক্ষাজীবনের সাফল্য কেবল কয়েকটি সনদ অর্জনের ইতিহাস নয়; এটি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার এক নীরব কাহিনি

প্রগতি খীসার সাহিত্যচর্চার শুরু স্কুলজীবন থেকেই শৈশব-কৈশোরে যে অনুভব, প্রকৃতি জীবনবোধ তাঁর মনে সঞ্চিত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোই কবিতার ভাষা পেয়েছে পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের জীবন, ভালোবাসা, বেদনা, স্বপ্ন সামাজিক বাস্তবতা তাঁর সাহিত্যচিন্তার পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে তাঁর প্রকাশিত একক কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে. মনচিদ আহ্ঙী যায় . জুম পাহাড়ের সংলাপ . বেদনার পদাবলি

তাঁর কবিতা বিভিন্ন সংকলন সাহিত্যপত্রে স্থান পেয়েছে রান্ন্যাফুল কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত চাকমা শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলন, উপজাতীয় কালচারাল ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিংশ শতাব্দীর কবিতা গ্রন্থ এবং ত্রিপুরা রাজ্য থেকে প্রকাশিত চাকমা সাহিত্যপত্র মাদি-তে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে কলকাতার বোধিভারতী বৌদ্ধ সাহিত্যপত্রেও তাঁর সাহিত্যকর্ম প্রকাশের উল্লেখ পাওয়া যায় এছাড়া বাংলা একাডেমি কর্তৃক ২০২৬ সালে প্রকাশিত চাকমা সাহিত্যবিষয়ক গ্রন্থেও তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে

কবিতার পাশাপাশি বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকীতে তাঁর বহু মননশীল কবিতা, প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ফলে তিনি শুধু কবি নন; সাহিত্যচর্চার বিস্তৃত পরিসরেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে

সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীতের প্রতিও প্রগতি খীসার রয়েছে গভীর অনুরাগ ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বেতার, রাঙ্গামাটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে আধুনিক গানের তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্তি তাঁর সৃজনশীল জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন শব্দ সুরের জগতে তাঁর এই সম্পৃক্ততা তাঁর বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে আরও সমৃদ্ধ করেছে

১৯৯৮ সালে বনিতা চাকমার সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক জীবন শুরু হয় দাম্পত্য জীবনে তাঁদের তিন পুত্রসন্তানপ্রমী খীসা, অতীন্দ্রিয় খীসা কৌশিক এবং পত্থম খীসা সাহিত্য, শিক্ষা সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবারও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন ব্যক্তিজীবনের দায়িত্ব এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে সমান্তরালে এগিয়ে নেওয়া তাঁর জীবনযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য দিক

প্রগতি খীসার কর্মপরিসর কেবল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয় বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি চাকমা রাজবিহার, রাঙ্গামাটির কার্যনির্বাহী পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এরপর ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত রাজবন বিহারের উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন

তিনি তাঞ্জাং শিল্পীগোষ্ঠী, রাঙ্গামাটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একইভাবে পার্বত্য শিক্ষা সহায়ক ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট, রাঙ্গামাটির সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ এসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন বর্তমানে তিনি CHT Writers Union-এর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন এসব দায়িত্বের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠেসাহিত্য তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত সৃষ্টির ক্ষেত্র নয়, বরং সমাজ সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতারও একটি মাধ্যম

সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা লাভ করেছেন তাঁর এই স্বীকৃতিগুলো ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি পাহাড়ের সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অবদানেরও স্বীকৃতি বহন করে

প্রগতি খীসার জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ কবিতা বলা হয়, তবে তার প্রতিটি স্তবকে রয়েছে সংগ্রামের ছাপ, শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার এবং সৃষ্টিশীলতার আলো কার্বারী পরিবারের ঐতিহ্য তাঁকে দিয়েছে শিকড়ের পরিচয়; প্রতিকূল শিক্ষাজীবন তাঁকে দিয়েছে দৃঢ়তা; সাহিত্য তাঁকে দিয়েছে আত্মপ্রকাশের ভাষা; আর সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তাঁকে দিয়েছে মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ

তাঁর জীবন তাই কেবল একজন কবি বা শিক্ষিত মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকথা নয় এটি পাহাড়ের এক প্রজন্মের সংগ্রাম, স্বপ্ন সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়েরও একটি প্রতিচ্ছবি জীবনের শুরুতে যে পথ ছিল বন্ধুর, সেই পথেই তিনি ধীরে ধীরে নিজের জন্য নির্মাণ করেছেন আলোর সিঁড়ি প্রতিকূলতা তাঁকে থামাতে পারেনি; বরং প্রতিটি বাধা তাঁর পথচলাকে আরও দৃঢ় করেছে তাই প্রগতি খীসার জীবন-পাঠক্রম শেষ হয়ে যায় কোনো একটি ডিগ্রি, পদ বা পুরস্কারে নয়এটি চলমান, যেমন পাহাড়ের ঝরনা চলতে থাকে আপন গতিতে

শিকড় থেকে উঠে এসে শব্দের ভুবনে নিজের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রেখে যাওয়াএই হলো প্রগতি খীসার জীবনযাত্রার মূল সুর

 

জ্যোতিপ্রভা লারমা: পাহাড়ি জীবনের আলো ও সংগ্রামের দীপ্ত প্রদীপ - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের রূপ-মাধুর্যের আড়ালে যে দীর্ঘ ইতিহাস লুকিয়ে আছে, তা কেবল সবুজ পাহাড়, কুলকুল ধ্বনিতে বহমান নদী কিংবা কুয়াশাঘেরা অরণ্যের স...