![]() |
| চঞ্চল কান্তি চাঙমা |
মানুষের জীবন কতটা বড়, তা তার ঘরের আয়তনে, ব্যাংকের হিসাবের অঙ্কে কিংবা পদ-পদবির উচ্চতায় মাপা যায়না। মানুষের জীবন বড় হয়ে ওঠে অন্য মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়ে।নিজের প্রাপ্তিকে কতটা অন্যের জন্য বিলিয়ে দেওয়া যায়, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে জীবনের প্রকৃত মহত্ত্ব।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দিঘীনালা উপজেলার উত্তর কামুক্কোছড়া গ্রামের চঞ্চল কান্তি চাঙমা তেমনই একজন মানুষ। তিনি কোনো বিত্তবান সমাজপতি নন, নন কোনো বড় প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। একজন সাধারণ চাকরিজীবী হিসেবে কর্মজীবন শেষ করে পাওয়া পেনশনের সামান্য অর্থ দিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছেন অসহায় প্রবীণ মানুষের পাশে। তাঁর এই ছোট্ট উদ্যোগের মধ্যে যে বিশাল মানবিকতার পরিচয় রয়েছে, সেটিই তাঁকে অসাধারণ করে তুলেছে।
তাঁর জীবনদর্শনের একটি বাক্য যেন তাঁর সমগ্র জীবনকে ধারণ করে, “মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো পরিশ্রম ও সদাচরণ।” এই কথাটি তিনি শুধু বলেননি; নিজের জীবন দিয়ে তার অর্থ বুঝিয়েছেন।
চঞ্চল কান্তি চাঙমার জন্ম ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দিঘীনালা উপজেলার বোয়ালখালী ইউনিয়নের কামুক্কোছড়া গ্রামে। তাঁর পিতা মৃত নিরতা রঞ্জন চাঙমা এবং মাতা সুনীতি বালা চাঙমা।
তাঁর সহধর্মিণীর নাম শান্তি রাণী চাঙমা। তাঁদের দাম্পত্য জীবনে চার সন্তানের জন্ম—দুই কন্যা ও দুই পুত্র। সন্তানরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত।
১. বিটি চাঙমা — অ্যাকাউন্টেন্ট, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর, রাঙামাটি।
২. ইতি চাঙমা — সিনিয়র স্টাপ নার্স, রাঙামাটি।
৩. মুক্তা চাঙমা — উপ-মেডিকেল অফিসার, সিভিল সার্জন অফিস, রাঙামাটি।
৪. সুমন চাঙমা — যুগ্ম পরিচালক, ক্ষুদ্রঋণ বিভাগ, হেড অফিস, ঢাকা।
সংসার, কর্মজীবন ও সন্তানদের দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়ে চঞ্চল কান্তি চাঙমার পারিবারিক জীবন যেমন পূর্ণতা পেয়েছে, তেমনি সন্তানদের নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে ওঠাও তাঁর দীর্ঘ জীবনের শ্রম, দায়িত্ববোধ ও মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
একটি সাধারণ ও সীমিত সামর্থ্যের পরিবারে তাঁর বেড়ে ওঠা। জীবনের শুরু থেকেই তাঁকে বুঝতে হয়েছে অভাবের ভাষা। তবু স্বপ্ন ছিল, পড়াশোনা করবেন, নিজের ভবিষ্যৎ গড়বেন। সেই স্বপ্নের পথে তিনি এগিয়েছিলেনও। ১৯৭৫ সালে এসএসসি পাস করেন। কিন্তু বাস্তবতা সব স্বপ্নকে সমান সুযোগ দেয় না। পরিবারের আর্থিক অনটন তাঁর উচ্চশিক্ষার পথ থামিয়ে দেয়। বই-খাতা সরিয়ে তাঁকে হাতে তুলে নিতে হয় কর্মজীবনের দায়িত্ব। ১৯৭৬ সালের ১ জানুয়ারি কেপিএমে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর কর্মজীবন।
পরে ১৯৭৯ সালের ২০ ডিসেম্বর রাঙামাটি মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরে যোগ দেন। দীর্ঘদিন হিসাবরক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ২০১৮ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর অবসর গ্রহণ করেন।
কর্মজীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি যখন অবসরে ফিরলেন, তখন তাঁর সামনে ছিল নিজের জন্য একটু স্বস্তির জীবন কাটানোর সুযোগ। কিন্তু চঞ্চল কান্তির হৃদয়ের ভেতর তখনও বেঁচে ছিল আরেকটি পুরোনো স্বপ্ন—মানুষের জন্য কিছু করা।
চাকরির ব্যস্ততায় মানুষের জন্য কিছু করার ইচ্ছেটা হয়তো সবসময় বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু কোনো কোনো স্বপ্ন মানুষের ভেতরে নীরবে বেঁচে থাকে। সময়ের অপেক্ষা করে। চঞ্চল কান্তির সেই স্বপ্নও বেঁচে ছিল। অবসর তাঁকে সেই সুযোগ এনে দিল।
তবে মানুষের সেবায় তাঁর প্রথম পদক্ষেপ ছিল নিজের বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালন। অবসরজীবনের শুরুতেই তিনি বাবা-মায়ের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করেন। তাঁদের জন্য গড়ে তোলেন ‘অবসর ভবন’।
বাবা-মায়ের পাশে বসে, তাঁদের বার্ধক্যের দিনগুলো কাছ থেকে দেখে তিনি যেন নিজের চারপাশের আরও অনেক প্রবীণ মানুষের মুখ দেখতে পেলেন। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া মানুষ, চিকিৎসার অর্থ নেই; প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনার সামর্থ্য নেই; ছোটখাটো প্রয়োজন মেটানোরও ক্ষমতা নেই—এই বাস্তবতা তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। তিনি উপলব্ধি করলেন, প্রবীণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন শুধু অর্থ নয়—প্রয়োজন একজন মানুষের হাত, যে বলবে, “আপনি একা নন।”
এই উপলব্ধি থেকেই চঞ্চল কান্তি চাঙমা গড়ে তোলেন ‘পেনশন’ নামে একটি সংগঠন। আর নিজের অবসর ভাতার অর্থ থেকেই শুরু করেন অসহায় প্রবীণদের জন্য ভাতা দেওয়ার উদ্যোগ। ২০১৯ সালের ১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবসে দিঘীনালা উপজেলা ভবনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি প্রকাশ্যে এই উদ্যোগের ঘোষণা দেন।
সেদিন তাঁর হাতে ছিল না কোনো বিশাল তহবিল। ছিল না বড় কোনো প্রতিষ্ঠানের পৃষ্ঠপোষকতা। ছিল শুধু নিজের পেনশনের টাকা এবং মানুষের জন্য কিছু করার অদম্য ইচ্ছা। তিনি চেয়েছিলেন, তাঁর এই উদ্যোগ দেখে অন্যরাও এগিয়ে আসুক। সমাজের সামর্থ্যবান মানুষগুলো যেন বুঝতে পারেন, প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানো শুধু রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি আমাদের প্রত্যেকের মানবিক দায়িত্ব।
আজও নিজের অবসর ভাতা থেকে তিনি প্রতি মাসে পাঁচজন প্রবীণকে ৫০০ টাকা করে মোট ২,৫০০ টাকা সহায়তা দিয়ে যাচ্ছেন। অর্থের অঙ্কটি হয়তো খুব বড় নয়। কিন্তু ভালোবাসার অঙ্কে এর মূল্য অনেক বেশি।
কারণ, এই টাকা কোনো দানশীল প্রদর্শনের অর্থ নয়; এটি একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষের নিজের প্রাপ্য অর্থ থেকে অন্যের জন্য তুলে রাখা অংশ। নিজের আরামের ভেতর থেকে অন্যের প্রয়োজনকে জায়গা করে দেওয়া, এটাই তো মানবতার সবচেয়ে সুন্দর রূপ।
চঞ্চল কান্তি চাঙমার পেনশন তাঁর নিজের বার্ধক্যের নিরাপত্তার জন্যও ব্যবহার করা যেত। নিজের ঘর, নিজের প্রয়োজন, নিজের স্বাচ্ছন্দ্য, সবকিছুই হতে পারত সেই অর্থের স্বাভাবিক গন্তব্য। কিন্তু তিনি অন্য একটি পথ বেছে নিয়েছেন। তাঁর কাছে পেনশন শুধু অবসরজীবনের প্রাপ্য অর্থ নয়; এটি হয়ে উঠেছে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার একটি মাধ্যম। এখানেই তাঁর জীবন আমাদের সামনে একটি গভীর প্রশ্ন রাখে, আমরা যা পেয়েছি, তার কতটুকু অন্যের জন্য রাখতে পারি? চঞ্চল কান্তির উত্তর তাঁর কর্মেই রয়েছে।
তিনি জানেন, পাঁচজন প্রবীণকে মাসে ৫০০ টাকা করে দেওয়া দিয়ে সমাজের সব দুঃখ দূর হবে না। কিন্তু একজন অসহায় মানুষের প্রয়োজনের সময়ে পাশে দাঁড়ানো মানে শুধু অর্থ দেওয়া নয়; তাঁর আত্মমর্যাদাকে একটু শক্ত করে দেওয়া, তাঁর মনে একটু আশার আলো জ্বালানো।
মানুষের জন্য করা কাজ কখনো কখনো মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চঞ্চল কান্তি চাঙমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। তাঁর এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়ে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর মানবিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ জনপ্রিয় টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে এবং এক লাখ টাকা পুরস্কার দেয়।
২০২০ সালের ১৪ জানুয়ারি ঢাকার কৃষিবিদ ইনস্টিটিউটে ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ তাঁকে প্রদান করে ‘মানবাধিকার পদক’। স্বীকৃতি তাঁকে সম্মানিত করেছে, কিন্তু তাঁর কাজের আসল পুরস্কার হয়তো কোনো পদক বা অর্থ নয়। তাঁর আসল পুরস্কার সেই প্রবীণ মানুষের মুখের স্বস্তি, যিনি মাসের শেষে তাঁর কাছ থেকে পাওয়া সামান্য সহায়তায় প্রয়োজনীয় একটি জিনিস কিনতে পারেন।
চঞ্চল কান্তি চাঙমার জীবন কোনো রাজকীয় কাহিনি নয়। এটি একজন সাধারণ মানুষের অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প। তিনি আমাদের শেখান, মানুষের কল্যাণে কাজ করার জন্য বিপুল সম্পদের মালিক হতে হয় না। বড় পদে অধিষ্ঠিত হতে হয় না। প্রয়োজন শুধু একটি সংবেদনশীল হৃদয়।
তিনি আরও শেখান, মানুষের জন্য কাজ করার সময় কখনোই ‘সময় নেই’ কথাটি চূড়ান্ত অজুহাত হতে পারে না। চাকরিজীবনে সুযোগ কম ছিল, কিন্তু অবসরে এসে তিনি তাঁর বহুদিনের ইচ্ছাকে কাজে পরিণত করেছেন।
জীবনের শেষভাগে এসে তিনি যেন নিজের কাছে ফিরে পেয়েছেন সেই তরুণ চঞ্চলকে, যে একদিন অভাবের কারণে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন থামিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু মানুষের জন্য ভালো কিছু করার স্বপ্নটি কখনো থামায়নি।
চঞ্চল কান্তি চাঙমার জীবনকে তাই শুধু একজন অবসরপ্রাপ্ত হিসাবরক্ষকের জীবনী হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাঁর জীবন একটি মূল্যবোধের গল্প। এটি এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ মানবিক হয়ে ওঠার গল্প।
একদিকে তাঁর জীবনের শুরু, অভাব, সীমিত শিক্ষা, কর্মজীবনের সংগ্রাম। অন্যদিকে জীবনের শেষ অধ্যায়, নিজের পেনশনের টাকা দিয়ে অসহায় প্রবীণদের পাশে দাঁড়ানো। জীবন যেন তাঁকে একটি পূর্ণ বৃত্ত দিয়েছে।
যে মানুষটি একসময় অভাবের কারণে নিজের পড়াশোনা এগিয়ে নিতে পারেননি, সেই মানুষটিই পরবর্তীকালে বুঝেছেন, অভাবের কষ্ট কী। আর সেই উপলব্ধিই তাঁকে নিয়ে গেছে অন্যের অভাবের পাশে দাঁড়াতে। তাই চঞ্চল কান্তি চাঙমা কেবল একজন ব্যক্তি নন; তিনি একটি মানবিক দর্শনের নাম।
তাঁর হাতে হয়তো বিপুল অর্থ নেই, কিন্তু আছে দেওয়ার মানসিকতা। তাঁর কাছে হয়তো বিশাল প্রতিষ্ঠান নেই, কিন্তু আছে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। তাঁর কণ্ঠে হয়তো বড় কোনো বক্তৃতা নেই, কিন্তু তাঁর কর্মই তাঁর সবচেয়ে শক্তিশালী বক্তব্য।
মানুষ পৃথিবী থেকে চলে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া মানবিকতার আলো থেকে যায়। চঞ্চল কান্তি চাঙমার জীবনও তেমন এক আলোর গল্প। তাঁর পেনশনের সামান্য অর্থ হয়তো একদিন শেষ হয়ে যাবে, কিন্তু তিনি যে দৃষ্টান্ত রেখে যাচ্ছেন, তার মূল্য শেষ হওয়ার নয়।
তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন—
নিজের জন্য বাঁচা জীবনের স্বাভাবিকতা, কিন্তু অন্যের জন্য বাঁচতে শেখাই জীবনের মহত্ত্ব। একজন অবসরপ্রাপ্ত মানুষের পেনশন যখন পাঁচজন অসহায় প্রবীণের মুখে স্বস্তির কারণ হয়ে ওঠে, তখন সেই অর্থ আর শুধু টাকা থাকে না—তা হয়ে ওঠে মানবতার অমলিন দলিল।
চঞ্চল কান্তি চাঙমার জীবন তাই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
মানুষ বড় হয় সম্পদে নয়, হৃদয়ের উদারতায়। মানুষ স্মরণীয় হয় পদে নয়, কর্মে। আর জীবন সার্থক হয় নিজের জন্য নয়, অন্যের জন্য কিছু করতে পারলে।
তাঁর নিজের ভাষায়—“মানুষের জীবনমান উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো পরিশ্রম ও সদাচরণ।”
এই বিশ্বাসকে বুকে ধারণ করে চঞ্চল কান্তি চাঙমা আজও হেঁটে চলেছেন—নীরবে, নিরবে; কিন্তু তাঁর সেই নীরব পদচিহ্নে জেগে থাকে মানবতার এক উজ্জ্বল পথরেখা।


