বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬

ইতিহাসকে কি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য অস্বীকার করা যায়? -ইনজেব চাঙমা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্য- বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই, সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী- নতুন করে একটি পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।

প্রশ্নটি হলো- একটি শব্দের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা পরিবর্তন করলেই কি সেই শব্দের সঙ্গে যুক্ত মানুষের ইতিহাস, আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বও মুছে ফেলা যায়?
আরও বড় প্রশ্ন- একই রাজনৈতিক ধারার নেতৃত্বের অতীত বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান বক্তব্যের এই পার্থক্য আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব?
 
২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধ ও দেশগঠনে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্বীকার করেছিলেন—এমন নথির উল্লেখ বিভিন্ন প্রকাশিত সূত্রেও পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পাশে যদি ২০০৩ সালের সেই দলিলটি রাখা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—তখন কি তাঁরা আদিবাসী ছিলেন, আর আজ হঠাৎ করে তাঁরা ‘অধিবাসী’ হয়ে গেলেন?
 
রাজনীতি পরিবর্তিত হতে পারে। সরকার পরিবর্তিত হতে পারে। রাষ্ট্রীয় নীতির ভাষাও সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। কিন্তু ইতিহাসকে সুবিধামতো পুনর্লিখন করা যায় না। একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় কোনো সরকারি বিবৃতির ওপর নির্ভর করে জন্ম নেয় না; তার পেছনে থাকে দীর্ঘ ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক কাঠামো, ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা নিজস্ব পরিচয়।
বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, গারো, সাঁওতালসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক পরিচয় রয়েছে। তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক—এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু নাগরিকত্ব এবং জাতিসত্তার পরিচয় এক জিনিস নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক এবং নিজের জাতিসত্তার পরিচয়ে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর সদস্য হতে পারেন।
তাই ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়কে সামনে এনে অন্য পরিচয়গুলোকে অস্বীকার করার প্রয়োজন কোথায়?
বরং একটি পরিণত রাষ্ট্রের শক্তি হলো—সে তার নাগরিকদের বহুমাত্রিক পরিচয়কে সম্মান করতে পারে। জাতীয় পরিচয় কাউকে তার মাতৃভাষা, সংস্কৃতি কিংবা জাতিসত্তা ভুলে যেতে বাধ্য করে না।
 
এখানেই ২০০৩ সালের বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এটি কোনো সাধারণ ব্যক্তির মন্তব্য নয়; এটি ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বাণী হিসেবে প্রচারিত বক্তব্য। অতএব আজ যদি রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই, তাহলে নাগরিক হিসেবে আমরা বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইতেই পারি—রাষ্ট্রের আগের অবস্থান কি ভুল ছিল? যদি ভুল হয়ে থাকে, তবে কেন ভুল ছিল—তার ব্যাখ্যা কোথায়? আর যদি তখনকার স্বীকৃতি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে, তবে আজকের অস্বীকৃতির ভিত্তি কী?
 
কোনো জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া মানেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়। বরং নিজের দেশের মানুষের ইতিহাস ও বৈচিত্র্যকে স্বীকার করাই রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাসের পরিচয়।
আমরা চাই না ‘আদিবাসী’ শব্দটি কোনো দলীয় রাজনৈতিক বিতর্কের অস্ত্র হয়ে উঠুক। এই শব্দকে নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, সাংবিধানিক ও আইনগত ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনা হওয়া উচিত ইতিহাস, নথি, গবেষণা, সংবিধান এবং মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে—রাজনৈতিক সুবিধার জন্য নয়।
 
আজকের বক্তব্য যদি গতকালের দলিলকে অস্বীকার করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। কারণ ইতিহাসের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ইতিহাসকে রাজনীতির প্রয়োজনে মিথ্যা বানিয়ে দেওয়া যায় না।
কিছু সত্য শুধু রাজনীতির জন্য রাজনীতি করে মিথ্যা বানিয়ে দেওয়া যায় না।
রাষ্ট্রের কাছে আমাদের দাবি খুব সাধারণ—আমাদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না, আমাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না; কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের জাতিসত্তা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকেও অস্বীকার করবেন না।
 
বাংলাদেশ সবার। এই ‘সবার’ মধ্যেই রয়েছে বহুজাতিক, বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক মানুষের বাংলাদেশ।
তাই আজকের প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রের নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে—
২০০৩ সালের দলিল যদি সত্য হয়, তাহলে ২০২৬ সালের অস্বীকৃতির ভিত্তি কী?
রাষ্ট্রের কাছ থেকে এই প্রশ্নের উত্তর আমরা চাই। কারণ ইতিহাস কোনো দলীয় ইশতেহার নয়—যে সরকার বদলালে তার সত্যও বদলে যাবে।

মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীর : এক জীবনের বহমান মানবতীর্থ - Injeb changma

এযাবৎ আমি যে কাজগুলো করতে পেরেছি, তার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান আমার প্রিয় দাদা মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীরের ঐকান্তিক সহযোগিতা ও ভালোবাসার। আজ তাঁকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় করিয়ে দিয়ে তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার সামান্য ঋণ শোধের প্রয়াসেই এই লেখা। তাঁর এই ঋণ কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়; শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় তাঁকে স্মরণ করাই আমার একমাত্র সামর্থ্য।

মানুষের জীবন কখনো কখনো কেবল একটি জীবনের পরিসরে আবদ্ধ থাকে না কোনো কোনো মানুষ তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, পেশা কিংবা ব্যক্তিগত সাফল্যের সীমানা অতিক্রম করে হয়ে ওঠেন অন্যের স্বপ্নের সহযাত্রী তাঁদের জীবন ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে বৃহত্তর কোনো মানবিক প্রত্যয়ের কাছে নিজেকে সমর্পণ করে তাঁরা নিজের জন্য যতটা বাঁচেন, তার চেয়ে অনেক বেশি বাঁচেন অন্যের জন্য তাঁদের পদচিহ্নে থাকে বিদ্যালয়ের উঠোন, দরিদ্র মানুষের কুঁড়েঘর, পথশিশুর মলিন মুখ, গ্রামবাংলার মাটির গন্ধ, লোকসংস্কৃতির অনুচ্চারিত সুর এবং মানুষের প্রতি এক অদম্য ভালোবাসার দীপ্তি

মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীর সেই বিরল জীবনগুলোরই একজন তিনি একই সঙ্গে সাহিত্যিক, সমাজসংগঠক, শিক্ষানুরাগী, সংস্কৃতিসেবী, মানবতাবাদী এবং প্রান্তিক মানুষের নীরব সহযোদ্ধা সুদীর্ঘ প্রবাসজীবন তাঁকে ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের মাটি থেকে দূরে রেখেছে; কিন্তু তাঁর মনোজগতের মানচিত্রে বাংলাদেশ কখনো দূরদেশ হয়ে ওঠেনি বরং জন্মভূমির প্রতি তাঁর দায়, মানুষের প্রতি তাঁর মমতা এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ তাঁকে বারবার ফিরিয়ে এনেছে মানুষের কাছে, কখনো কলম হাতে, কখনো শিক্ষাবৃত্তির সহায়তা নিয়ে, কখনো চিকিৎসার ব্যবস্থা করে, কখনো পথশিশুর হাতে বই তুলে দিয়ে, আবার কখনো লোকসংস্কৃতির বিলীয়মান প্রদীপে নতুন করে সলতে পাকিয়ে

তাঁর জীবন যেন এক দীর্ঘ নদী, যার এক তীরে সাহিত্য, অন্য তীরে সমাজসেবা; কোথাও শিক্ষা, কোথাও সংস্কৃতি; কোথাও দলিত মানুষের দীর্ঘ অবহেলার ইতিহাস, কোথাও আদিবাসী শিক্ষার্থীর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ; আর সবকিছুর গভীরে অবিরাম প্রবাহিত একটি শব্দ, মানবতা

১৯৬২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকার ধানমন্ডি থানার সেন্ট্রাল রোডে মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীর জন্মগ্রহণ করেন পিতা কে আহম্মদ ছিলেন শিক্ষক; মাতা মাসুদা খাতুন ছিলেন গৃহিণী একদিকে শিক্ষকের ঘর, অন্যদিকে সংসার-সচেতন মায়ের স্নেহময় আবহ- এই দুইয়ের সম্মিলিত পরিবেশেই তাঁর মানসিক গঠনের প্রথম ভিত নির্মিত হয়

তাঁর জন্ম ঢাকায় হলেও আত্মপরিচয়ের গভীরে তিনি বহন করে চলেছেন মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার হোগলাকান্দী গ্রামের মাটি জন্মভূমির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কখনো কেবল ভৌগোলিক নয়; তা স্মৃতি, শিকড়, শৈশব, মানুষ এবং মাটির এক অদৃশ্য বন্ধনে গাঁথা আলমগীরের জীবনেও সেই বন্ধন ছিল গভীর অটুট

পরবর্তীকালে দীর্ঘ প্রবাসজীবন তাঁকে সুইডেনের নাগরিক পরিসরে নিয়ে গেলেও হোগলাকান্দী তাঁর হৃদয়ের ভেতরে রয়ে গেল এক অনিঃশেষ আলোকস্তম্ভ হয়ে তাঁর কাছে গ্রামের মানুষ মানে শুধু আত্মীয়স্বজন নয়, দল-মত, শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে একটি বৃহত্তর মানবসমাজ, যাদের শিক্ষিত, স্বনির্ভর মানবিক করে তোলার স্বপ্ন তিনি নিজের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন

দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে সুইডেনে বসবাস করছেন মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীর পৃথিবীর চল্লিশটিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন তিনি বিশ্বকে দেখেছেন বিস্ময়ের চোখে, বিভিন্ন সমাজ সংস্কৃতির মানুষকে কাছ থেকে দেখেছেন, নানা ভূখণ্ডের জীবনযাত্রা পর্যবেক্ষণ করেছেন কিন্তু পৃথিবীর যত পথই অতিক্রম করেছেন, তাঁর হৃদয়ের পথটি শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছে বাংলাদেশে- তার মানুষে, তার গ্রামে, তার প্রান্তিক জনপদে

প্রবাস অনেক মানুষকে শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করে; কিন্তু আলমগীরের ক্ষেত্রে ঘটেছে যেন উল্টোটি দূরত্ব তাঁকে শিকড়ের প্রতি আরও সচেতন করেছে সুইডেনের উন্নত নগরসভ্যতার মধ্যে থেকেও তিনি ভুলে যাননি বাংলাদেশের সেই মানুষদের, যাদের কাছে একটি বই, একটি বৃত্তি, একটি চিকিৎসা সহায়তা, একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ কিংবা একটি বিদ্যালয়- জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা হয়ে উঠতে পারে

তাই তাঁর প্রবাসজীবন কেবল ব্যক্তিগত জীবিকার ইতিহাস নয়; এটি হয়ে উঠেছে দূরদেশে থেকেও জন্মভূমির মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক অনন্য অধ্যায়

মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীরের আরেকটি পরিচয়- তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ সাহিত্যিক পর্যন্ত তাঁর রচিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক সাহিত্য তাঁর কাছে নিছক শব্দবিন্যাস নয়, আত্মপ্রকাশের একটি মাধ্যম; আর সেই আত্মপ্রকাশের অন্তর্গত সুরে রয়েছে সমাজ মানুষের প্রতি গভীর দায়বোধ তিনি সাহিত্যচর্চা করেছেন, সাহিত্য-সংস্কৃতির সংগঠন গড়ে তুলেছেন, নাট্যদল প্রতিষ্ঠা করেছেন, পুরস্কার সম্মাননা পেয়েছেন কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক সত্তার সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক হলো- কলমের সঙ্গে তিনি জীবনকে বিচ্ছিন্ন করেননি

তিনি বুঝেছিলেন, সমাজের যে মানুষটি ইতিহাসের মূল স্রোতের বাইরে পড়ে আছে, তার গল্পও সাহিত্য যে শিশুটি বিদ্যালয়ের দরজায় পৌঁছাতে পারে না, তার ভবিষ্যৎও সাহিত্যিকের বিবেকের বিষয় যে দলিত মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী সামাজিক অবজ্ঞা বহন করে চলেছে, তার মর্যাদার প্রশ্নও মানবিক সাহিত্যের প্রশ্ন যে আদিবাসী শিক্ষার্থী মাতৃভাষা প্রান্তিকতার দ্বৈত সংকট নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকায়, তার স্বপ্নও একজন লেখকের বিবেককে নাড়া দিতে পারে এই বোধ থেকেই আলমগীরের সাহিত্যিক পরিচয় ক্রমে সামাজিক দায়িত্বের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে

২০০৩ সাল নিজের গ্রাম হোগলাকান্দীতে প্রতিষ্ঠা করলেন হোগলাকান্দী সমাজকল্যাণ সংস্থা উদ্দেশ্য ছিল মানুষকে শুধু দান দেওয়া নয়- কর্মসংস্থানের মাধ্যমে স্বনির্ভর করে তোলা এই উদ্যোগের মাধ্যমে গজারিয়া আশপাশের এলাকায় প্রায় এক হাজার মানুষকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস নেওয়া হয় সাহায্যের দর্শনটিও ছিল ভিন্ন- কারও হাতে সাময়িকভাবে কিছু তুলে দিয়ে দায়িত্ব শেষ করা নয়; বরং তাকে এমনভাবে দাঁড় করানো, যাতে সে নিজের জীবনের ভার নিজেই বহন করতে পারে এর পরের বছর, ২০০৪ সালে, তাঁর আরেকটি বড় স্বপ্ন বাস্তব রূপ নেয়- Student Welfare Council এই সংগঠনের উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে সহায়তা করা, মেধাবীদের উৎসাহিত করা এবং উচ্চশিক্ষার পথকে সহজতর করা পাঁচ শতাধিক ছেলে-মেয়েকে কলেজ থেকে উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে নেওয়ার যে প্রয়াস তিনি গ্রহণ করেছিলেন, তার ফল আজও বিভিন্ন পেশায় প্রতিষ্ঠিত মানুষের জীবনে দৃশ্যমান

Student Welfare Council-এর সঙ্গে যুক্ত তরুণদের অনেকে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ সেনাবাহিনীর সদস্য কেউ কেউ পিএইচডি অর্জন করে আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া সুইডেনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন কেউ লন্ডনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন তাঁদের একজন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে সারা বাংলাদেশের মধ্যে প্রথম হওয়ার গৌরবও অর্জন করেছেন

এই অর্জনগুলো আলমগীরের কাছে হয়তো কোনো ব্যক্তিগত পুরস্কারের চেয়েও বড় কারণ তিনি জানতেন- একজন মানুষের হাতে বই তুলে দেওয়া মানে কেবল তাকে একটি বই দেওয়া নয়; তার সামনে খুলে দেওয়া এক সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ যে শিক্ষার্থীরা একদিন তাঁর সংগঠনের উঠোনে দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখেছিল, আজ তাদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে জ্ঞান বিতরণ করছে, কেউ হাসপাতালের শয্যার পাশে মানুষের সেবা করছে, কেউ দেশের প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করছে, কেউ বিদেশের মাটিতে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখছে

একজন মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিস্তম্ভ হয়তো পাথর দিয়ে তৈরি হয় না তা তৈরি হয় মানুষের জীবনে আলমগীরের স্মৃতিস্তম্ভও যেন ছড়িয়ে আছে তাঁর শিক্ষার্থীদের সাফল্যের ভেতরে

Student Welfare Council-এর উদ্যোগে প্রতিবছর গজারিয়ার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে বৃত্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো আজকের দিনে ফিরে তাকালে সেই আয়োজন যেন এক হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণযুগের স্মৃতি গজারিয়ার প্রায় সব বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এতে অংশ নিত পরীক্ষা শেষ হলে তা কেবল ফলাফল ঘোষণার আনুষ্ঠানিকতায় থেমে থাকত না; পরিণত হতো এক বিশাল সামাজিক শিক্ষামূলক উৎসবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, জাতীয় সংসদ ভবনের প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ঢাকা কলেজ তিতুমীর কলেজের অধ্যক্ষসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, অধ্যাপক বিশিষ্ট ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আয়োজনটি পেত অন্যরকম মর্যাদা

এত গুণী মানুষের সমাবেশে যেন একটি ছোট্ট গ্রাম তার ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে দাঁড়াত আর ছিল আপ্যায়নের সেই অপূর্ব স্মৃতি- নদীর রুই, চিংড়ি, কাঁচকি, বোয়াল, ইলিশ, নানা রকম ভর্তা, খাসির মাংস; বিকেলে ত্রিশ-চল্লিশ রকমের পিঠা, চা, কফি; তারপর নৌপথে ভ্রমণ একেকটি নদীর রুই মাছ আজকের বাজারমূল্যে হয়তো বিশ-বাইশ হাজার টাকারও বেশি হতে পারে কিন্তু সেই দিনের আসল সম্পদ ছিল মাছ-মাংস-পিঠা নয়; ছিল মানুষের মিলন, শিক্ষার স্বপ্ন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ঘিরে এক অদ্ভুত উচ্ছ্বাস

সেই সময়ের মানুষগুলো আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছেন তাঁদের কেউ অধ্যাপক, কেউ চিকিৎসক, কেউ প্রকৌশলী, কেউ সরকারি কর্মকর্তা, কেউ প্রবাসী সময় তাঁদের বিচ্ছিন্ন করেছে, কিন্তু স্মৃতি তাঁদের এখনও এক অদৃশ্য সুতোয় বেঁধে রেখেছে তাই একদিন সেই পুরোনো মানুষদের পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষা জাগে- একটি পুরোনো উঠোনে আবার যদি সবাই ফিরে আসা যায়!

বাংলাদেশের বন্যা শুধু নদীর পানি বাড়ার ঘটনা নয়; তা বহু মানুষের জীবনে অনাহার, গৃহহীনতা অনিশ্চয়তার নাম সেই দুর্দিনেও মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীর মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন বন্যার আগে চাল, ডাল, তেলসহ খাদ্যসামগ্রী এবং বিপুল পরিমাণ শাড়ি-লুঙ্গি বিতরণ করেছেন বন্যার পর মানুষের পুনর্বাসনের জন্য গরু, ছাগল, রিকশা এবং আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন কারও ঘরে যখন চুলা জ্বলে না, তখন সাহিত্যিকের কলমও যেন যথেষ্ট নয়- প্রয়োজন এক মুঠো চাল কারও সন্তান যখন বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়ার মুখে, তখন প্রয়োজন বৃত্তি কেউ যখন অসুস্থ হয়ে চিকিৎসার অভাবে কাতর, তখন প্রয়োজন ওষুধ চিকিৎসার ব্যবস্থা আলমগীর মানুষের প্রয়োজনকে সেই বাস্তবতার জায়গা থেকেই দেখেছেন

শিক্ষার পাশাপাশি সংস্কৃতির প্রতি তাঁর অনুরাগও গভীর তিনি জানতেন, একটি জাতির আত্মপরিচয় কেবল তার অর্থনৈতিক উন্নতিতে নয়; তার গান, নাচ, লোককথা, কারুশিল্প, নকশিকাঁথা, নাটক পল্লীজীবনের ঐতিহ্যের মধ্যেও নিহিত থাকে ২০০৮ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠা করেন পঞ্চবেদানাম নামের নাট্যদল একই বছর শিশুদের মনোজগৎকে নির্মল, সৃজনশীল ও মানবিক মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করার অভিপ্রায়ে তিনি প্রকাশের উদ্যোগ নেন ত্রৈমাসিক শিশুসাহিত্য পত্রিকা ‘লালসবুজের দেশ’। তাঁর বিশ্বাস ছিল- শিশুর কোমল হৃদয়ে সাহিত্য, কল্পনা ও সৃজনশীলতার বীজ রোপণ করা গেলে ভবিষ্যতের মানুষ আরও মানবিক, উদার ও আলোকিত হয়ে উঠবে। সেই বিশ্বাস থেকেই শিশুমনের সুকুমার বৃত্তির বিকাশে এই পত্রিকার আত্মপ্রকাশ। ২০০৯ সালে গড়ে তোলেন নয়াকার সাহিত্য-সংস্কৃতি সংগঠন ২০১৬ সালে খুলনার ফুলতলা উপজেলায় নাচ-গান নকশিকাঁথা তৈরির প্রশিক্ষণকেন্দ্রিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন ২০১৮ সালে নড়াইল সদর উপজেলার এগারোখাঁনের হাতিয়ায় বাংলার পল্লীসংস্কৃতির ঐতিহ্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠা করেন আলকাপুরী সংস্কৃতি একাডেমি ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীর জ্ঞান তপস্যা কেন্দ্র এবং মাগুরার মোহাম্মদপুর নবনগরে রয়েছে আনন্দভুবন বিদ্যানিকেতন এসব প্রতিষ্ঠান তাঁর কাছে কেবল স্থাপনা নয়; এগুলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে অতীতের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার সেতু

একটি সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড তার অট্টালিকার উচ্চতায় নয়; বরং তার পথশিশুর মুখে কতটা হাসি আছে, তার প্রান্তিক শিশুর হাতে বই আছে কি না, তার দরিদ্র শিশুর স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে কি না- সেখানে এই উপলব্ধি থেকেই তিনি পথশিশুদের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান- আনন্দ বিদ্যানিকেতন, তুলারামপুর, যশোর; শেখেরটেক পথশিশু পাঠশালা, মোহাম্মদপুর, ঢাকা; এবং বেড়িবাঁধ শিশু আনন্দালয় এই বিদ্যালয়গুলোর প্রতিটি শিশুর চোখে তিনি দেখেছেন সম্ভাবনার দীপ্তি

শিশু হয়তো আজ ফুটপাতে থাকে, হয়তো তার ঘর নদীর পাড়ের ভাঙনে বিলীন হয়েছে, হয়তো তার বাবা-মায়ের হাতে সংসারের ন্যূনতম নিশ্চয়তাও নেই- তবু শিশুটির মেধা তো দরিদ্র নয় তার স্বপ্নকে দরিদ্র করে রাখা কোনো সভ্যতার পক্ষে গৌরবের নয়

মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীরের মানবিক কর্মযজ্ঞের অন্যতম গভীর অধ্যায় দলিত জনগোষ্ঠীকে ঘিরে ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি দলিত মানুষের শিক্ষা সংস্কৃতি নিয়ে নিবিড়ভাবে কাজ করেন ২০১৪ সাল থেকে দলিত সম্প্রদায়ের ভাগ্যোন্নয়ন সামাজিক মর্যাদার প্রশ্নে তাঁর কাজ আরও বিস্তৃত হয় ঢাকার বিভিন্ন দলিত কলোনিতে দীর্ঘদিন কাজ করতে গিয়ে তিনি উপলব্ধি করেন- শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবারও তীব্র প্রয়োজন রয়েছে বিশেষ করে শিশু নারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে সবচেয়ে বেশি থাকে

এই উপলব্ধি থেকেই চিকিৎসা ক্যাম্পের উদ্যোগ নেওয়া হয় চিকিৎসক, সমাজকর্মী, সরকারি কর্মকর্তা, লেখক, প্রকৌশলী এবং সাধারণ মানুষের সহযোগিতাকে একত্র করে গড়ে ওঠে মানবিক সহায়তার এক অনন্য বলয় মিরপুরের লালমাটি রবিদাস পাড়া, গাবতলী বেড়িবাঁধ সিটি কলোনি কিংবা পোস্তগোলা ডোম কলোনি, শহরের প্রান্তিক মানুষের কাছে গিয়ে তিনি শুধু সহায়তা দেননি; তাঁদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁদের জীবনকে বুঝতে চেয়েছেন, তাঁদের শিশুদের হাতে বই তুলে দিয়েছেন

মানুষকে জাতের খাঁচায় বন্দি করার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান ছিল অকপট তাঁর উচ্চারণ- জাতপাত নিপাত যাক, মানবতা মুক্তি পাক এই বাক্য তাঁর কাছে কেবল স্লোগান নয়; ছিল একটি জীবনদর্শন ২০১৯ সালকে জাতপাতবিরোধী বর্ষ হিসেবে সামনে রেখে তিনিজাতপাত বিরোধী অভিযাত্রা সঙ্গে যুক্ত হন সিলেট যাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় সেই অভিযাত্রা উদ্দেশ্য ছিল সামাজিক বৈষম্য, জাতপাতের অহংকার এবং জন্মপরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে ছোট করার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে মানবিক বিবেককে জাগিয়ে তোলা

একজন সাহিত্যিক যখন জাতপাতের বিরুদ্ধে দাঁড়ান, তখন তাঁর কলম কেবল কবিতা বা গল্প লেখে না- তা সমাজের বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে

দলিত জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাংলাদেশের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও তিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে চলেছেন ২০১৪ সাল থেকে খাসি, গারোসহ সমতলের বিভিন্ন আদিবাসী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাবৃত্তি দেওয়া শুরু করেন পরবর্তীকালে ২০১৯ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি আদিবাসী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সহায়তার আওতায় আনেন এখানেও তাঁর দর্শন একই- শিক্ষা হলো মুক্তির সবচেয়ে স্থায়ী পথ

যে শিক্ষার্থী অর্থাভাবে উচ্চশিক্ষা থেকে ঝরে পড়তে পারত, তার হাতে একটি বৃত্তি পৌঁছে দেওয়া মানে কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের আর্থিক সহায়তা নয়; বরং একটি পরিবারকে দারিদ্র্যের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনা দেওয়া এই সহযোগিতাগুলো প্রমাণ করে- ভালো কাজের জন্য কেবল অর্থের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন একজন মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং অন্য মানুষের হৃদয়ে মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আলমগীর সেই কাজটিই করেছেন

২০১১ সালে বাংলাভিশন তাঁর কর্মজীবন সমাজসেবাকে কেন্দ্র করেদিনবদলের মানুষশিরোনামে প্রায় আধঘণ্টাব্যাপী একটি প্রতিবেদন প্রচার করে এই অভিধাটি তাঁর জীবনকর্মের সঙ্গে অদ্ভুতভাবে মানানসই কারণ তিনি যে পরিবর্তনের কথা বলেছেন, তা কোনো রাজনৈতিক স্লোগানের পরিবর্তন নয়; তা মানুষের জীবনের পরিবর্তন একজন দরিদ্র তরুণ যখন উচ্চশিক্ষা লাভ করে ডাক্তার হয়- সেটি দিনবদল একজন শিক্ষার্থী যখন বৃত্তির সহায়তায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে যায়- সেটি দিনবদল একজন বেকার মানুষ যখন কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়ে নিজের পরিবারকে দাঁড় করায়- সেটি দিনবদল একটি পথশিশু যখন প্রথমবার বই হাতে নেয়- সেটিও দিনবদল একজন দলিত শিশু যখন মাথা উঁচু করে বলে, “আমিও পারব”, সেটিই হয়তো সবচেয়ে বড় দিনবদল

তাঁর সাহিত্য সমাজসেবামূলক কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি সম্মাননা লাভ করেছেন ২০১৭ সালে কলকাতায় ভারতীয় দলিত সংগঠনের পক্ষ থেকে তাঁকে সম্মানিত করা হয় ২০১৮ সালে শান্তিনিকেতনেরখোয়াইপত্রিকার পক্ষ থেকেও তিনি সম্মাননা পান তাঁর সাহিত্যকর্ম মানবিক কর্মকাণ্ডের জন্য বিভিন্ন সংগঠন প্রতিষ্ঠান থেকে তিনি আরও বহু পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কিন্তু মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনার যে আনন্দ, কোনো পুরস্কারই তার সমান হতে পারে না একজন শিক্ষার্থীর সফলতার সংবাদ, একজন অসুস্থ মানুষের সুস্থ হয়ে ওঠা, একজন দরিদ্র পরিবারের মুখে স্বস্তির হাসি কিংবা কোনো শিশুর হাতে নতুন বই- সম্ভবত তাঁর কাছে এগুলোই সবচেয়ে বড় পুরস্কার

মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীরের জীবনকে যদি একটি বই হিসেবে পড়া যায়, তবে তার প্রতিটি অধ্যায়েই অন্য মানুষের গল্প কোথাও একজন শিক্ষার্থীর গল্প, কোথাও একজন রোগীর; কোথাও একজন পথশিশুর, কোথাও একজন দলিত মানুষের; কোথাও গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা সংস্কৃতির, কোথাও প্রবাসের মাটিতে থেকেও স্বদেশকে ভালোবাসা এক মানুষের তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এখানেই- তিনি নিজেকে কেন্দ্র করে জীবনকে নির্মাণ করেননি তিনি বরং অন্য মানুষদের কেন্দ্র করে নিজের জীবনকে অর্থপূর্ণ করেছেন

যে মানুষটি একদিন নিজের গ্রামের ছেলেমেয়েদের নিয়ে শিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর স্মৃতিতে আজও বেঁচে আছে সেই দিনগুলোর উজ্জ্বলতা Student Welfare Council-এর সঙ্গে যুক্ত তরুণরা আজ পৃথিবীর নানা প্রান্তে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন, কেউ চিকিৎসক, কেউ সরকারি চাকরিতে, কেউ বিদেশে সময়ের স্রোত তাঁদের ছড়িয়ে দিয়েছে পৃথিবীর নানা ভূখণ্ডে তবু স্মৃতি কি কখনো সত্যিই দূরে যায়?

হয়তো একদিন আবার তারা মিলিত হবে কোনো এক বিকেলে পুরোনো দিনের কথা উঠবে কেউ বলবে বৃত্তি পরীক্ষার কথা, কেউ বলবে নৌভ্রমণের কথা, কেউ মনে করবে নদীর রুই মাছ, কেউ পিঠার আয়োজনের কথা আর সবাই হয়তো একবার নীরবে ফিরে যাবে সেই দিনগুলোর কাছেযখন একটি সংগঠন ছিল, একটি স্বপ্ন ছিল, আর একজন মানুষ ছিলেন, যিনি বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষিত মানবিক মানুষ তৈরি করা যায় সেই পুনর্মিলন হবে শুধু মানুষের দেখা হওয়ার অনুষ্ঠান নয়; হবে একটি সময়ের সঙ্গে আরেকটি সময়ের পুনঃসাক্ষাৎ

মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীরের জীবনদর্শনের গভীরে যে কথাটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তা হলো- মানুষের উপকার করা সম্ভব না হলে অন্তত তার ক্ষতি না করা এই সহজ বাক্যের মধ্যে রয়েছে গভীর মানবতাবাদ আজকের পৃথিবীতে মানুষ যেখানে পরিচয়, মত, ধর্ম, জাত, শ্রেণি ক্ষমতার নানা বিভাজনে বিভক্ত, সেখানে এই দর্শন এক ধরনের নৈতিক আশ্রয়

তিনি এমন একটি সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে মানুষ সুশিক্ষিত হবে, ভালো মানুষ হবে, অন্যের জন্য কিছু করবে যেখানে সাহায্য হবে স্বাভাবিক, মানবিকতা হবে সহজাত, আর মানুষের পরিচয়ের আগে মানুষ শব্দটি উচ্চারিত হবে এই স্বপ্নই তাঁকে কখনো বিদ্যালয়ের উঠোনে, কখনো গ্রামের মাঠে, কখনো দলিত পল্লিতে, কখনো পথশিশুর পাশে, কখনো আদিবাসী শিক্ষার্থীর পাশে, কখনো সংস্কৃতির মঞ্চে নিয়ে গেছে

একজন সাহিত্যিক কতটি বই লিখেছেন- এই হিসাব সাহিত্যিকের পরিচয়ের একটি অংশ মাত্র আসল প্রশ্ন হলো- তাঁর সাহিত্য কতটা মানুষের কাছে পৌঁছেছে? তাঁর চিন্তা কতটা সমাজকে স্পর্শ করেছে? তাঁর কলমের বাইরে তাঁর জীবন কতটা মানবিক হয়ে উঠেছে? মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীরের ক্ষেত্রে এই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কর্মের ভেতরেই পাওয়া যায় শতাধিক গ্রন্থ তাঁর সাহিত্যিক সৃষ্টির সাক্ষ্য বহন করে কিন্তু তাঁর আরেকটি অদৃশ্য গ্রন্থ রচিত হয়েছে মানুষের জীবনে- যার পৃষ্ঠা সংখ্যা গোনা যায় না সেই গ্রন্থের কোনো মলাট নেই নেই প্রকাশকের নাম নেই বাজারমূল্য

তার পৃষ্ঠাগুলোতে লেখা আছে- একজন শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা লাভের গল্প, একজন দরিদ্র মানুষের কর্মসংস্থানের গল্প, একজন অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা পাওয়ার গল্প, একজন পথশিশুর হাতে বই পাওয়ার গল্প, একজন দলিত শিশুর স্বপ্ন দেখার গল্প, একজন আদিবাসী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন এগিয়ে যাওয়ার গল্প, একটি বিলীয়মান লোকসংস্কৃতির পুনর্জাগরণের গল্প এই অদৃশ্য গ্রন্থই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সৃষ্টি

মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীরকে এক কথায় সংজ্ঞায়িত করা কঠিন তিনি সাহিত্যিক- কিন্তু শুধু সাহিত্যিক নন তিনি সমাজকর্মী- কিন্তু শুধু সমাজকর্মী নন তিনি সংস্কৃতিসেবী- কিন্তু শুধু সংস্কৃতিসেবী নন তিনি প্রবাসী- কিন্তু স্বদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন নন তিনি দাতা- কিন্তু কেবল দানের মধ্যে তাঁর মানবতা সীমাবদ্ধ নয় তিনি মূলত একজন মানুষের মানুষ

জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে তিনি আজ যে জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন, সেখানে তাঁর সঙ্গে হাঁটছে অসংখ্য মানুষের স্মৃতি কোনো শিক্ষার্থীর কৃতজ্ঞতা, কোনো মায়ের আশীর্বাদ, কোনো রোগীর সুস্থতার হাসি, কোনো পথশিশুর হাতে বই, কোনো দলিত পল্লির শিশুর চোখে স্বপ্ন, কোনো গ্রামের মানুষের ভালোবাসা- এসবই তাঁর জীবনের প্রকৃত সঞ্চয়

সুইডেনের দূর আকাশের নিচে থেকেও তাঁর হৃদয়ের একটি অংশ যেন এখনও হোগলাকান্দীর মাটিতে পড়ে আছে কোনো অংশ গজারিয়ার নদীর জলে, কোনো অংশ পথশিশুর বিদ্যালয়ের বেঞ্চে, কোনো অংশ দলিত পল্লির সরু গলিতে, কোনো অংশ আদিবাসী শিক্ষার্থীর বইয়ের পাতায়, কোনো অংশ বাংলার লোকসংস্কৃতির হারিয়ে যাওয়া সুরে

একজন মানুষের জীবনের শেষ হিসাব যখন একদিন কষা হবে, তখন তাঁর কতটি বই ছিল, কতটি পুরস্কার ছিল, কত দেশে তিনি গিয়েছিলেন- এসব হয়তো গুরুত্বপূর্ণ থাকবে; কিন্তু তার চেয়েও বড় হয়ে উঠবে অন্য একটি প্রশ্ন-  তিনি কতটি জীবনকে স্পর্শ করেছিলেন?

মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীরের জীবন সেই প্রশ্নের সামনে দাঁড়িয়ে এক দীর্ঘ, দীপ্ত মানবিক উত্তর হয়ে থাকে তিনি প্রমাণ করেছেন, মানুষের জন্য কাজ করতে হলে সবসময় মানুষের পাশে শারীরিকভাবে থাকা জরুরি নয়; হৃদয় যদি মানুষের কাছে থাকে, পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকেই মানবতার জন্য হাত বাড়ানো যায় তিনি প্রমাণ করেছেন- শিক্ষার একটি বৃত্তি একটি জীবন বদলাতে পারে, একটি বই একটি শিশুর ভবিষ্যৎ বদলাতে পারে, একটি বিদ্যালয় একটি প্রজন্মের ভাগ্য বদলাতে পারে, আর একজন মানুষের নিষ্ঠা একটি সমাজে পরিবর্তনের বীজ বুনে দিতে পারে তাঁর জীবন তাই কোনো একক ব্যক্তির সাফল্যের আখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক দীর্ঘ ইতিহাস সাহিত্য তাঁর নেশা, শিক্ষা তাঁর স্বপ্ন, সংস্কৃতি তাঁর উত্তরাধিকার, মানবতা তাঁর ধর্ম, আর মানুষ- তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘ কবিতা এই কবিতার কোনো শেষ পঙ্ক্তি নেই

কারণ মানুষকে ভালোবাসার যে অভিযাত্রা, তার শেষ কোথায়তা কোনো সত্যিকারের মানবতাবাদী জানেন না মোয়াজ্জেম হোসেন আলমগীরের জীবন তাই এক চলমান মানবতীর্থ- যেখানে মানুষই পথ, মানুষই যাত্রা, মানুষই গন্তব্য

 

ইতিহাসকে কি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য অস্বীকার করা যায়? -ইনজেব চাঙমা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্য- বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই, সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী- নতুন করে একটি পুরোনো ...