বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কিশলয় চাঙমা : চাঙমা সাহিত্যের এক নিবেদিত কবি - ইনজেব চাঙমা


“বিঝু গেল, বিঝু এল,

ফাওন গেল, ফাওন এল—
তুইওদ তুই ন’ এলে চম্পা,
তুই কুধু গেলে।”

    চাঙমা ভাষার জনপ্রিয় এই গানের পঙ্‌ক্তিতে ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে মিশে আছে অপেক্ষা, ভালোবাসা ও বিরহের অনুভূতি। বিঝু ও ফাল্গুন আসে-যায়, সময় এগিয়ে চলে, অথচ প্রতীক্ষিত মানুষটির দেখা মেলে না। সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ প্রকাশের এই ক্ষমতাই কবি কিশলয় চাঙমার সৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

    চাঙমা সাহিত্যজগতে কিশলয় চাঙমা একজন কবি ও গীতিকার হিসেবে সুপরিচিত। শৈশব থেকেই কবিতার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ, যা পরবর্তীকালে নিয়মিত সাহিত্যচর্চায় পরিণত হয়। চাঙমা ভাষায় প্রথম সনেট রচনার কৃতিত্বও তাঁর সঙ্গে যুক্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি, মানুষের জীবন, সামাজিক বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাঁর সৃষ্টির প্রধান অনুষঙ্গ। নিজের মাতৃভাষাকে সৃজনের মাধ্যম করে তিনি পাহাড়ের জীবন ও মানুষের অনুভূতিকে সাহিত্যে রূপ দিয়েছেন। তাঁর এই নিরন্তর প্রয়াস চাঙমা ভাষার সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

    কিশলয় চাঙমার সার্টিফিকেট অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ (১৯৭০, ফাল্গুন/এপ্রিল) সালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মাটিরাঙ্গা থানার বলিপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতা সুধীর কুমার চাঙমা এবং মাতা চিবনবি চাঙমা

    তাঁরা ছিলেন ২ ভাই ও ৩ বোন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে কিশলয় চাঙমা দ্বিতীয়। পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সময় তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং পাহাড়ি সমাজের জীবনযাত্রা। এসব অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যিক ভাবনায় প্রভাব ফেলেছে।

    তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু মাটিরাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি কবিতা লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। প্রকৃতি ও চারপাশের জীবন তাঁকে ভাবতে শেখায়, আর সেই ভাবনাই ধীরে ধীরে কবিতার ভাষা পেতে থাকে।

    ১৯৮৫ সালে শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি রাঙামাটিতে যান এবং সেখানে সুপরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মোনঘরে পড়াশোনা করেন। মোনঘরে থাকাকালে তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভার বিকাশ ঘটে। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি একাধিকবার পুরস্কৃত হন।

    ছাত্রজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর একটি হলো ফ্যামিলি প্ল্যানিং কর্তৃক আয়োজিত কবিতা রচনা প্রতিযোগিতায় অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে রাঙ্গামাটি জেলায় প্রথম স্থান অর্জন। এই স্বীকৃতি তাঁর সাহিত্যচর্চায় নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করে।

    কিশলয় চাঙমার কবিতার প্রধান বিষয় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন। পাহাড়, নদী, বন, ঝরনা কিংবা ঋতু তাঁর কবিতায় কেবল দৃশ্যপট হিসেবে উপস্থিত হয় না; এগুলোর সঙ্গে মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি ও জীবনযাত্রার সম্পর্কও তিনি তুলে ধরেন।

    চাঙমা সমাজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, উৎসব, সামাজিক সম্পর্ক, মানুষের সুখ-দুঃখ এবং প্রেম-বিরহ তাঁর কবিতায় বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ফলে তাঁর রচনায় ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি একটি জনগোষ্ঠীর জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও প্রতিফলন ঘটে।

তাঁর দেশাত্মবোধের ভিত্তিও এই মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর সম্পর্ক। পার্বত্য চট্টগ্রাম তাঁর কাছে শুধু জন্মভূমি নয়; এটি তাঁর স্মৃতি, অনুভব ও আত্মপরিচয়ের অংশ। সেই কারণে তাঁর কবিতায় স্বদেশপ্রেম কোনো আলাদা বিষয় হয়ে ওঠে না, বরং জীবনবোধের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে আসে।

    কিশলয় চাঙমার সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো চাঙমা ভাষায় প্রথম সনেট রচনার কৃতিত্ব তাঁর সঙ্গে যুক্ত। প্রচলিত কাব্যরীতিকে নিজের মাতৃভাষায় প্রয়োগের এই উদ্যোগ চাঙমা কবিতার প্রকাশভঙ্গিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।

এতে তাঁর সৃজনশীলতা ও নতুন কাব্যরীতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। মাতৃভাষাকে শুধু দৈনন্দিন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করার আকাঙ্ক্ষা তাঁর কাজে প্রতিফলিত হয়েছে।

    কবিতার পাশাপাশি গান রচনাতেও কিশলয় চাঙমার আগ্রহ রয়েছে। তাঁর জনপ্রিয় গানের পঙ্‌ক্তিতে ঋতু, প্রেম ও অপেক্ষার মতো সার্বজনীন অনুভূতি চাঙমা জীবন ও সংস্কৃতির অনুষঙ্গের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।

    “বিঝু গেল, বিঝু এল...” গানটির মধ্য দিয়ে সময়ের প্রবাহ এবং প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষার যে আবেগ প্রকাশ পেয়েছে, তা শ্রোতার কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। তাঁর গানগুলোতে ভাষার সরলতা ও অনুভূতির স্বাভাবিক প্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

    তাঁর সাহিত্যজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘মোনবী’। গ্রন্থটি প্রকাশের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যসচেতন মহলে পরিচিতি লাভ করেন এবং প্রশংসা অর্জন করেন।

    ‘মোনবী’-তে তাঁর কাব্যভাবনা, ভাষার ব্যবহার এবং জীবন ও প্রকৃতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। এটি তাঁর দীর্ঘদিনের সাহিত্যচর্চাকে পাঠকের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

    প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিশীলতার বড় একটি অংশ এখনও অপ্রকাশিত। বর্তমানে তাঁর কাছে চাঙমা ভাষায় কবিতা ও গানের তিনটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে সেগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।

একজন সাহিত্যিকের সৃষ্টিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকাশনার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিশলয় চাঙমার অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো প্রকাশিত হলে চাঙমা ভাষার সাহিত্য ও গানের ভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। তাঁর দীর্ঘদিনের সৃষ্টিশীল শ্রমও বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে।

    সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি কিশলয় চাঙমা পারিবারিক জীবনেও দায়িত্বশীল। তাঁর স্ত্রী সুচরিতা চাঙমা। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন কন্যা বনরূপা চাঙমা, যিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবনে যুক্ত, এবং পুত্র বেবিলন চাঙমা

    পরিবার ও জীবনের নানা দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে সৃষ্টির মাধ্যমে ধারণ করার চেষ্টা তাঁর সাহিত্যিক নিষ্ঠার পরিচয় বহন করে।

    কিশলয় চাঙমার সাহিত্যিক গুরুত্ব শুধু একটি কাব্যগ্রন্থ বা কয়েকটি জনপ্রিয় গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বিশেষত্ব হলো—তিনি নিজের মাতৃভাষায় সমকালীন জীবন, প্রকৃতি, অনুভূতি ও সংস্কৃতিকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন।

চাঙমা ভাষায় সনেট রচনা তাঁর সৃজনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে কবিতা ও গানে পাহাড়ি সমাজজীবনের নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরে তিনি নিজস্ব সাহিত্যিক স্বর নির্মাণ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনাগুলো চাঙমা ভাষার সাহিত্যভাণ্ডারের সম্ভাবনাকেই নির্দেশ করে।

    কিশলয় চাঙমার সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছিল শৈশবের কবিতা লেখা দিয়ে। ছাত্রজীবনের পুরস্কার, মোনঘরের সাহিত্যচর্চা, চাঙমা ভাষায় সনেট রচনার প্রয়াস এবং ‘মোনবী’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে সেই পথ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে।

    তাঁর সৃষ্টিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি উঠে এসেছে প্রেম, বিরহ, সংস্কৃতি ও স্বদেশচেতনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি এসব অনুভূতিকে নিজের মাতৃভাষায় প্রকাশ করেছেন।

    অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর তিনটি পাণ্ডুলিপি এখনও প্রকাশের অপেক্ষায়। যথাযথ সহযোগিতা পেলে এসব সৃষ্টি পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং চাঙমা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।

    বিঝু আসে, ফাল্গুন আসে, সময়ের স্রোত এগিয়ে যায়। কিন্তু কবির সৃষ্ট শব্দ থেকে যায়। কিশলয় চাঙমার সাহিত্যসাধনার মূল্যও সেখানেই—নিজের মাটি, মানুষ ও ভাষার স্মৃতিকে তিনি শব্দে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। সেই প্রয়াস তাঁকে চাঙমা সাহিত্যজগতে স্বতন্ত্র ও স্মরণীয় করে রাখবে।

তথ্যসূত্র

১. রাণ্যাফুল — কবিতা গ্রন্থ।
২. কবির সাক্ষাৎকার — কবির জীবন, সাহিত্যচর্চা ও সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কিত তথ্য।
৩. কবির সাক্ষাৎকার গ্রহণে সহযোগিতা করেছেন সোহেল চাঙমা, কার্বারি

 

চাঙমা ভাষার লেখকদের নিরুৎসাহিত নয়, উৎসাহিত করাই সময়ের দাবি - ইনজেব চাঙমা

 

কোনো ব্যক্তিকে ‘কবি’ বলা যাবে কি না, এ নিয়ে সাহিত্যিক বা একাডেমিক আলোচনা হতেই পারে। একজন কবির কবিত্ব, তাঁর সৃষ্টির পরিমাণ, মান, প্রকাশনা কিংবা সাহিত্যিক অবদান নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনারও একটি পরিমিতি, সৌজন্য ও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা থাকা প্রয়োজন।  বিশেষ করে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালার বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল।
 
আজকের বাস্তবতা হলো, চাঙমাদের নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা থাকা সত্ত্বেও চাঙমা ভাষায় নিয়মিত লেখালেখির চর্চা অত্যন্ত সীমিত। বর্ণমালার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয়ও দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। চর্চার অভাবে অনেক তরুণ-তরুণীর কাছেই নিজস্ব বর্ণমালা অপরিচিত হয়ে উঠছে। এটি হয়তো আমাদের জন্য অপ্রিয় সত্য, কিন্তু এই সত্যকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
 
এমন বাস্তবতায় কেউ যখন চাঙমা ভাষায় লিখতে শুরু করেন, কবিতা লেখার চেষ্টা করেন, নিজের ভাবনা নিজের মাতৃভাষায় প্রকাশ করেন, তখন তাঁর প্রথম প্রয়োজন কঠোর বিচার নয়, বরং উৎসাহ। কারণ আজ যে তরুণটি দু-একটি কবিতা লিখছে, আগামী দিনে সেই হয়তো আরও ভালো লিখবে, আরও বেশি লিখবে এবং অন্যদেরও চাঙমা ভাষায় লিখতে অনুপ্রাণিত করবে।
 
একজন নতুন লেখকের লেখাকে সাহিত্যিক বিচারে দুর্বল মনে হলে তা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করা যায়। কিন্তু তাঁর মাতৃভাষায় লেখার উদ্যোগকে খাটো করা বা তাঁর লেখার সংখ্যা দিয়ে তাঁর ভাষাচর্চার গুরুত্বকে অস্বীকার করা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের নিজেদের ভাষার জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।
‘কবি’ অভিধাটি নিয়ে বিতর্কের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—চাঙমা ভাষায় আমরা কতজনকে লিখতে উৎসাহিত করছি? কতজন তরুণকে চাঙমা বর্ণমালা শেখাচ্ছি?  কতজন নতুন লেখককে আমরা বলছি, ‘লিখুন, ভুল হলেও লিখুন; আপনার ভাষায় লিখুন’?  চাঙমা ভাষার ভবিষ্যৎ শুধু প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের হাতে নয়; বরং যারা আজ প্রথমবার মাতৃভাষায় একটি কবিতা, গল্প, নিবন্ধ কিংবা ছোট্ট কোনো অনুভূতি লিখতে বসেছে, তাদের হাতেও নিহিত।
 
তাই কোনো লেখকের কবিত্ব নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতভেদ যেন চাঙমা ভাষায় লেখার আগ্রহকে নিরুৎসাহিত না করে। একজন লেখককে ‘কবি’ বলা হলো কি না, সেটি সময় ও সাহিত্যই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে। কিন্তু একজন মানুষ মাতৃভাষায় লিখতে শুরু করলেন, এই ঘটনাটিই ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে মূল্যবান।
 
আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ভাষা কেবল ব্যাকরণ, অভিধান কিংবা বর্ণমালার সমষ্টি নয়। ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের মুখে, কলমে, বইয়ে, গানে, কবিতায় এবং নতুন প্রজন্মের সৃষ্টিশীলতায়। সুতরাং চাঙমা ভাষার একজন লেখককে নিয়ে বিতর্ক করার আগে আমাদের ভাবা উচিত—তাঁকে থামিয়ে দিচ্ছি, নাকি আরও লিখতে উৎসাহিত করছি? কারণ আমাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট ‘কে কবি’- এই প্রশ্ন নয়; বরং আগামী প্রজন্মের হাতে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা আদৌ কতটা জীবন্ত থাকবে, সেই প্রশ্ন।
 
তাই আসুন, কবির অভিধা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি চাঙমা ভাষায় যারা লিখছেন, তাদের উৎসাহ দিই। ভুল হলে সংশোধন করি, দুর্বল হলে উন্নতির পথ দেখাই, কিন্তু কলমটি থামিয়ে না দিই। কারণ একটি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো, সেই ভাষায় মানুষকে লিখতে শেখানো এবং লিখতে উৎসাহিত করা।

বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রগতি খীসা: প্রতিকূলতার পথ পেরিয়ে সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে এক অভিযাত্রা - ইনজেব চাঙমা


জীবন
কখনো সরলরেখায় এগিয়ে চলে না কখনো তা কণ্টকাকীর্ণ পথ, কখনো অন্ধকার গিরিপথ, আবার কখনো প্রতিকূলতার বুক চিরে উঠে আসা আলোর রেখা মানুষের জীবনকে বুঝতে হলে শুধু তার সাফল্যের দিকে তাকালে চলে না; জানতে হয় সেই সাফল্যের পেছনে থাকা দীর্ঘ সংগ্রাম, বঞ্চনা, স্বপ্ন অদম্য পথচলার ইতিহাস প্রগতি খীসার জীবনও তেমনই এক পাঠক্রমযেখানে পারিবারিক ঐতিহ্য, শিক্ষার সাধনা, সাহিত্যচর্চা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে নিরন্তর লড়াই পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে

প্রগতি খীসা জন্মগ্রহণ করেন মার্চ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার ৫৯ নম্বর বন্দুকভাঙ্গা মৌজার দুরখেয়া গ্রামে পিতা কংশসুর খীসা এবং মাতা তনুপতি খীসা পাহাড়, নদী, ঝরনা প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে তাঁর শৈশবের শিকড় বিস্তৃত তাঁর মাতৃপরিবারের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে চাকমা সমাজের একটি ঐতিহ্যবাহী বংশপরম্পরা তাঁর মা তনুপতি খীসার জন্ম বেড়ে ওঠা চেঙীনদীর তীরে, বুড়িঘাটের অনতিদূরের ছোট মহাপ্রুম গ্রামে চাকমা গোজাগোষ্ঠীর বিবেচনায় তিনি ওয়াংজাগোজা কালাহাঙারা গোষ্ঠীর রনুখাঁ দেওয়ানের রক্তসম্পর্কীয় সদস্য ছিলেন ফলে প্রগতির পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে পাহাড়ের সামাজিক-ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের একটি গভীর যোগসূত্রও বিদ্যমান

তাঁদের পরিবার ছিল বড় পরিবার ভাই-বোনের মধ্যে ছিলেনচন্দ্র হংস খীসা, সুনীতি বিকাশ খীসা, সুমিত্রা খীসা, পদ্মশোভা খীসা, জ্ঞান বিকাশ খীসা, প্রগতি খীসা, জ্যোৎস্না দেবী খীসা এবং বিজয় খীসা তাঁদের বোন সুমিত্রা খীসা অকালেই, ১৯৮১ সালে, যৌবন বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই অকালবিয়োগও পারিবারিক জীবনে রেখে যায় গভীর শূন্যতার স্মৃতি

প্রগতি খীসার পারিবারিক ইতিহাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় তাঁর পিতামহ স্বর্গীয় নবীনা খীসাকে ঘিরে তিনি ছিলেন গ্রামের কার্বারী বা গ্রামপ্রধান কার্বারী হিসেবে স্থানীয় সমাজে তাঁর ছিল বিশেষ মর্যাদা এবং দায়িত্ব সেই সূত্রে চাকমা রাজপরিবারের সঙ্গেও তাঁদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল

পারিবারিক স্মৃতিতে সংরক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো১৯৫৮ সালে নবীনা খীসার সাদর আমন্ত্রণে তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় তাঁদের আতিথ্য গ্রহণ করেন সে সময় তিনি বন্দুকভাঙ্গার বিরেজমরা তানজাং জলপ্রপাত বন্দুককানা মোন (যমচুগ) দর্শন করেন বহু বছর পর ২০২১ সালে চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ও বিরেজমরা তানজাং দর্শন করেন এবং তাঁদের বাড়িতে রাত্রিযাপন করেন এই ঘটনাগুলো শুধু একটি পরিবারের স্মৃতি নয়; এর মধ্যে পাহাড়ের সামাজিক সম্পর্ক, আতিথেয়তা এবং ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিকতাও প্রতিফলিত হয় এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বুকে নিয়েই প্রগতি খীসার বেড়ে ওঠা কিন্তু ঐতিহ্যের মর্যাদা থাকলেও তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল সহজ মসৃণ নয়

জীবনের প্রথম পাঠ শুরু হয় করল্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এরপর তিনি মাচ্ছ্যা পাড়া (চারিখ্যং) নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, বন্দুকভাঙ্গা থেকে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন

পরবর্তী সময়ে রাঙ্গামাটির শাহ (বহুমুখী) উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে ১৯৯০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এরপর রাজানগর রাণীরহাট কলেজ থেকে ১৯৯২ সালে এইচএসসি পাস করেন উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চট্টগ্রামের নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৯৫ সালে দ্বিতীয় বিভাগে বি.. ডিগ্রি অর্জন করেন

তাঁর শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা এখানেই থেমে থাকেনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এম.. অধ্যয়নরত অবস্থায় ভদন্ত সুমনালঙ্কার মহাথেরের আহ্বানে তিনি খাগড়াছড়ির পিবিএম আবাসিক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হয়ে ওঠার এই পরিবর্তন তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক এর পাশাপাশি ধর্মীয় পালি শিক্ষার প্রতিও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ পালি সংস্কৃত শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা থেকে বিনয় উপাধি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন

তবে তাঁর নিজের ভাষায়, কার্বারী পরিবারের সন্তান হয়েও তাঁর পড়াশোনার সময়টি সঙ্গত কারণে সুখকর ছিল না নানা প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে তাঁকে শিক্ষার পথ এগিয়ে নিতে হয়েছে তাই তাঁর শিক্ষাজীবনের সাফল্য কেবল কয়েকটি সনদ অর্জনের ইতিহাস নয়; এটি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার এক নীরব কাহিনি

প্রগতি খীসার সাহিত্যচর্চার শুরু স্কুলজীবন থেকেই শৈশব-কৈশোরে যে অনুভব, প্রকৃতি জীবনবোধ তাঁর মনে সঞ্চিত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোই কবিতার ভাষা পেয়েছে পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের জীবন, ভালোবাসা, বেদনা, স্বপ্ন সামাজিক বাস্তবতা তাঁর সাহিত্যচিন্তার পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে তাঁর প্রকাশিত একক কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে. মনচিদ আহ্ঙী যায় . জুম পাহাড়ের সংলাপ . বেদনার পদাবলি

তাঁর কবিতা বিভিন্ন সংকলন সাহিত্যপত্রে স্থান পেয়েছে রান্ন্যাফুল কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত চাকমা শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলন, উপজাতীয় কালচারাল ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিংশ শতাব্দীর কবিতা গ্রন্থ এবং ত্রিপুরা রাজ্য থেকে প্রকাশিত চাকমা সাহিত্যপত্র মাদি-তে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে কলকাতার বোধিভারতী বৌদ্ধ সাহিত্যপত্রেও তাঁর সাহিত্যকর্ম প্রকাশের উল্লেখ পাওয়া যায় এছাড়া বাংলা একাডেমি কর্তৃক ২০২৬ সালে প্রকাশিত চাকমা সাহিত্যবিষয়ক গ্রন্থেও তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে

কবিতার পাশাপাশি বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকীতে তাঁর বহু মননশীল কবিতা, প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ফলে তিনি শুধু কবি নন; সাহিত্যচর্চার বিস্তৃত পরিসরেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে

সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীতের প্রতিও প্রগতি খীসার রয়েছে গভীর অনুরাগ ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বেতার, রাঙ্গামাটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে আধুনিক গানের তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্তি তাঁর সৃজনশীল জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন শব্দ সুরের জগতে তাঁর এই সম্পৃক্ততা তাঁর বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে আরও সমৃদ্ধ করেছে

১৯৯৮ সালে বনিতা চাকমার সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক জীবন শুরু হয় দাম্পত্য জীবনে তাঁদের তিন পুত্রসন্তানপ্রমী খীসা, অতীন্দ্রিয় খীসা কৌশিক এবং পত্থম খীসা সাহিত্য, শিক্ষা সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবারও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন ব্যক্তিজীবনের দায়িত্ব এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে সমান্তরালে এগিয়ে নেওয়া তাঁর জীবনযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য দিক

প্রগতি খীসার কর্মপরিসর কেবল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয় বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি চাকমা রাজবিহার, রাঙ্গামাটির কার্যনির্বাহী পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এরপর ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত রাজবন বিহারের উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন

তিনি তাঞ্জাং শিল্পীগোষ্ঠী, রাঙ্গামাটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একইভাবে পার্বত্য শিক্ষা সহায়ক ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট, রাঙ্গামাটির সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ এসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন বর্তমানে তিনি CHT Writers Union-এর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন এসব দায়িত্বের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠেসাহিত্য তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত সৃষ্টির ক্ষেত্র নয়, বরং সমাজ সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতারও একটি মাধ্যম

সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা লাভ করেছেন তাঁর এই স্বীকৃতিগুলো ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি পাহাড়ের সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অবদানেরও স্বীকৃতি বহন করে

প্রগতি খীসার জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ কবিতা বলা হয়, তবে তার প্রতিটি স্তবকে রয়েছে সংগ্রামের ছাপ, শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার এবং সৃষ্টিশীলতার আলো কার্বারী পরিবারের ঐতিহ্য তাঁকে দিয়েছে শিকড়ের পরিচয়; প্রতিকূল শিক্ষাজীবন তাঁকে দিয়েছে দৃঢ়তা; সাহিত্য তাঁকে দিয়েছে আত্মপ্রকাশের ভাষা; আর সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তাঁকে দিয়েছে মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ

তাঁর জীবন তাই কেবল একজন কবি বা শিক্ষিত মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকথা নয় এটি পাহাড়ের এক প্রজন্মের সংগ্রাম, স্বপ্ন সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়েরও একটি প্রতিচ্ছবি জীবনের শুরুতে যে পথ ছিল বন্ধুর, সেই পথেই তিনি ধীরে ধীরে নিজের জন্য নির্মাণ করেছেন আলোর সিঁড়ি প্রতিকূলতা তাঁকে থামাতে পারেনি; বরং প্রতিটি বাধা তাঁর পথচলাকে আরও দৃঢ় করেছে তাই প্রগতি খীসার জীবন-পাঠক্রম শেষ হয়ে যায় কোনো একটি ডিগ্রি, পদ বা পুরস্কারে নয়এটি চলমান, যেমন পাহাড়ের ঝরনা চলতে থাকে আপন গতিতে

শিকড় থেকে উঠে এসে শব্দের ভুবনে নিজের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রেখে যাওয়াএই হলো প্রগতি খীসার জীবনযাত্রার মূল সুর

 

সার্টিফিকেটের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষিত মানুষ - ইনজেব চাঙমা

শিক্ষিত মানুষ কি সত্যিই শিক্ষিত? প্রশ্নটি খুব সাধারণ। অথচ এর উত্তর খুঁজতে গেলেই আমরা যেন এক গভীর অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়ে যাই। ঘরে ঘরে আজ শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই। দেওয়ালে ঝুলছে একের পর এক সার্টিফিকেট, নামের পাশে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন ডিগ্রি, পরিচয়ের সঙ্গে বাড়ছে শিক্ষাগত যোগ্যতার তালিকা। কিন্তু সেই শিক্ষার কতটুকু মানুষের আচরণে, কথায়, বিবেকে কিংবা মানবিকতায় ফুটে উঠছে—সেই হিসাবটি যেন কেউ রাখে না।

আমরা কাগজে শিক্ষিত হচ্ছি, কিন্তু হৃদয়ে কতটা? আমরা অক্ষর চিনতে শিখছি, কিন্তু মানুষ চিনতে শিখছি তো? আমরা বইয়ের পাতা মুখস্থ করছি, কিন্তু জীবনের পাতাগুলো পড়তে পারছি তো?

আজকাল কখনো কখনো মনে হয়, সার্টিফিকেট যেন শিক্ষার পরিচয়পত্র নয়—অহংকারের অলংকার হয়ে উঠেছে। যার নামের পাশে যত বেশি ডিগ্রি, তার কণ্ঠে কখনো কখনো তত বেশি আত্মম্ভরিতা। অথচ সত্যিকারের জ্ঞান তো মাথা উঁচু করার আগে মাথা নত করতে শেখায়। জ্ঞান যার গভীর, তার বিনয়ও তত গভীর।

সমুদ্র কখনো তার গভীরতার শব্দ করে না। বিশাল বৃক্ষ কখনো নিজের ছায়ার বিজ্ঞাপন দেয় না। আকাশ কখনো তার বিশালত্ব নিয়ে গর্ব করে না। প্রকৃত বড়ত্বের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়, নীরবতা। মানুষের ছায়া যখন অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ হয়ে যায়, তখন বুঝতে হয়, সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। জীবনের অহংকারও অনেকটা তেমন। অহংকারের ছায়া যত দীর্ঘ হয়, পতনের সূর্য ততই অস্তমুখী হয়।

তবু মানুষ অহংকার করে- তার অর্থ নিয়ে, তার ক্ষমতা নিয়ে, তার পদ নিয়ে, তার সৌন্দর্য নিয়ে, তার জ্ঞান নিয়ে, এমনকি তার সার্টিফিকেট নিয়েও। কিন্তু মানুষ কি কখনো ভেবে দেখে—
যে জ্ঞান আমাকে অন্যকে ছোট করতে শেখায়, সে জ্ঞান কি সত্যিই জ্ঞান? যে শিক্ষা আমাকে বিনয়ী করতে পারে না, সে শিক্ষা কি সত্যিই শিক্ষা?

সিদ্ধার্থের কথা মনে পড়ে। যে মানুষটির সামনে ছিল রাজপ্রাসাদের সমস্ত সুখ, মাথার ওপর ছিল রাজমুকুটের সম্ভাবনা, চারপাশে ছিল ঐশ্বর্যের অঢেল আয়োজন—তিনি একদিন সেই সবকিছুর মায়া পেছনে ফেলে বেরিয়ে গেলেন। রাজ্য ছেড়েছিলেন, প্রাসাদ ছেড়েছিলেন, পরিচিত পৃথিবী ছেড়েছিলেন- খুঁজেছিলেন এমন এক সত্য, যা মানুষের অন্তরকে মুক্ত করতে পারে।

তিনি বুঝেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাসাদও মানুষের অস্থির মনকে শান্ত করতে পারে না, যদি সেখানে সত্যের আলো না থাকে। ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা একই শিক্ষা পাই।

রামায়ণ থেকে মহাভারত- কত রাজ্য ধ্বংস হয়েছে, কত পরিবার ভেঙে গেছে, কত স্বপ্ন মাটিতে মিশে গেছে! অথচ সব ধ্বংসের শুরু তলোয়ারের ঝলকে হয়নি। অনেক ধ্বংসের শুরু হয়েছিল একটি কথা থেকে। একটি কুমন্ত্রণা থেকে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত থেকে।

কৈকেয়ীর কানে মন্ত্রার কথাগুলো পৌঁছেছিল- আর তার পরিণতিতে রামের বনবাস। রাবণের কাছে পৌঁছেছিল ভুল পরামর্শ, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অন্ধ অহংকার—শেষ পর্যন্ত সোনার লঙ্কাও রক্ষা পেল না। দুর্যোধন শুনেছিল শকুনির কূটবুদ্ধির কথা। বিবেকের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলাফল- কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে রক্তাক্ত হয়ে পড়েছিল এক বিশাল বংশের অহংকার। ইতিহাস তাই শুধু অতীতের গল্প নয়। ইতিহাস হলো সময়ের রেখে যাওয়া আয়না। সে আয়নায় আমরা চাইলে অন্যের মুখ দেখতে পারি, আবার চাইলে নিজের মুখটিও দেখতে পারি। দুঃখ শুধু একটাই- আমরা ইতিহাস পড়ি, কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করি না।

আমরা রাবণের পতনের গল্প বলি, কিন্তু নিজের অহংকারের দিকে তাকাই না। আমরা দুর্যোধনের ভুল নিয়ে কথা বলি, কিন্তু নিজের চারপাশের কুমন্ত্রণাকে প্রশ্ন করি না। আমরা রামের বনবাসের কথা জানি, কিন্তু ভুল কথা শুনে নিজের জীবনে কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি- সেই প্রশ্নটি করি না। তাহলে আমাদের শিক্ষার আলো কোথায়?

শিক্ষা তো শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার নাম নয়। শিক্ষা হলো, কথা বলার আগে ভাবতে শেখা অন্যের কথা শোনার পর সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে শেখা। ভুল করলে মাথা নত করে বলতে শেখা—“আমি ভুল করেছি।” শিক্ষা হলো এমন এক আলো, যে আলো প্রথমে অন্যের পথ নয়—নিজের ভেতরের অন্ধকারকে আলোকিত করে। আমাদের ঘরে সার্টিফিকেট থাকুক, ডিগ্রি থাকুক, জ্ঞানের ভাণ্ডার থাকুক—কিন্তু তার সঙ্গে যদি একটু বিনয় থাকে, একটু মায়া থাকে, একটু বিবেক থাকে, একটু মানবিকতা থাকে, তাহলেই সেই শিক্ষা পূর্ণতা পায়। কারণ জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কেউ জিজ্ঞেস করবে না—তোমার কতগুলো সার্টিফিকেট ছিল?

মানুষ মনে রাখবে- তুমি কেমন মানুষ ছিলে। তোমার কথায় কেউ ভেঙে পড়েছিল, নাকি সাহস পেয়েছিল। তোমার জ্ঞানে কেউ অপমানিত হয়েছিল, নাকি আলোকিত হয়েছিল। তোমার উপস্থিতিতে কেউ ছোট হয়ে গিয়েছিল, নাকি নিজেকে মূল্যবান মনে করেছিল। সার্টিফিকেট দেয় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শিক্ষিত হওয়ার স্বীকৃতি দেয় মানুষের হৃদয়।

তাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি সার্টিফিকেট নয়, একটু আত্মজিজ্ঞাসা। নিজেকে একবার নিঃশব্দে প্রশ্ন করা,  “আমি কতটা শিক্ষিত?” নয়, “আমার শিক্ষা আমাকে কতটা মানুষ করেছে?” হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমরা একদিন বুঝতে পারব, ডিগ্রির চেয়ে বড় জ্ঞান আছে, জ্ঞানের চেয়ে বড় বিনয় আছে, আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে আছেমানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা। সেই শিক্ষাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। সেই সার্টিফিকেটই সবচেয়ে মূল্যবান, যার কোনো কাগজ লাগে না।

কিশলয় চাঙমা : চাঙমা সাহিত্যের এক নিবেদিত কবি - ইনজেব চাঙমা

“বিঝু গেল, বিঝু এল, ফাওন গেল, ফাওন এল— তুইওদ তুই ন’ এলে চম্পা, তুই কুধু গেলে।”      চাঙমা ভাষার জনপ্রিয় এই গানের পঙ্‌ক্তিতে ঋতুর পরিবর্তনের ...