শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬

মাচাং মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা: গিরি-কন্যা খাগড়াছড়ির এক আলোকবর্তিকা - ইনজেব চাঙমা

সবুজ অরণ্যে ঘেরা, মেঘের চাদরে মোড়া খাগড়াছড়ি। যেখানে পাহাড়েরা ফিসফিসিয়ে গল্প বলে, ঝর্ণার জল সুর তোলে। সেই মায়াবী ভূমির কোলে, ১৯৭৪ সালের ২৬শে মে, এক নবজাতকের কান্না পাহাড়ি বাতাসে মিশে গিয়েছিল। কে জানত, সেই কান্নাই একদিন পাহাড়ের ভাষার কান্না হয়ে বাজবে, আবার সেই কণ্ঠই হবে পাহাড়ের জয়গান?
পিতা মাচাং বরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার সুবোধ আর মাতা সবিতা রাণী ত্রিপুরার কোমল স্নেহের ছায় তাঁর শৈশব। চেঙের ধুলো-মাটি গায়ে মেখে, খাগড়াছড়ির পাঠশালার চৌকাঠে তাঁর প্রথম বর্ণপরিচয়। কিন্তু এই বর্ণমালা তাঁর তৃষ্ণা মেটাতে পারেনি। বিদ্যার অদম্য পিপাসা তাঁকে টেনে নিয়ে গেল চট্টগ্রামের সবুজ চত্বরে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে তিনি এক গভীর সত্য আবিষ্কার করলেন, যে জাতি তার শিকড়কে ভোলে, তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ২০০০ সালে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি ফিরে এলেন। তবে চাকরির মোহে নয়, ফিরে এলেন ঋণ শোধ করতে, মাটির ঋণ, মায়ের ভাষার ঋণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চকচকে স্বপ্নকে পেছনে ফেলে তিনি জড়িয়ে পরেন, ‘জাবারাং কল্যাণ সমিতি’। জাবারাং মানে কি কেবল একটি এনজিও? না। জাবারাং হলো পাহাড়ি শিশুর মুখে তার মায়ের ভাষায় প্রথম বুলি ফোটানোর এক নীরব বিদ্রোহ। ২০০২ সাল থেকে যখন চারপাশে উন্নয়নের কোলাহলে মাতৃভাষা হারিয়ে যেতে বসেছিল, তখন তিনি বিশেষ করে চাঙমা, মারমা, ককবরক শিশুদের হাতে তুলে দিলেন তাদের মাতৃভাষার বই। তিনি প্রমাণ করলেন, শিক্ষা মানে পরের ভাষায় মুখস্থ করা নয়, শিক্ষা মানে নিজের ভাষায় জগৎকে চেনা। আজ তিনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে ককবরক ভাষার একজন অতন্দ্র প্রহরী।
মাচাং মথুরা বিকাশ কেবল সংগঠক নন, তিনি শব্দের কারিগর। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, গবেষক ও অনুবাদক। ককবরক, বাংলা ও ইংরেজি - এই তিন ভাষার মোহনায় তিনি নির্মাণ করেছেন এক বিশাল সাহিত্য-সাম্রাজ্য। তাঁর কলম থেকে জন্ম নিয়েছে চল্লিশের অধিক গ্রন্থ। কখনো তিনি ‘ককবরক ককলব খল’ -এ কবিতার সুর বুনেছেন, কখনো ‘অরণ্যকথা’য় পাহাড়ের দীর্ঘশ্বাসকে গল্প করেছেন, কখনো ‘ককবরক শব্দ ভান্ডার’ রচনা করে হারিয়ে যাওয়া শব্দদের জন্য একটি ঘর বানিয়েছেন।
তিনি বঙ্গবন্ধুর অগ্নিঝরা ৭ই মার্চের ভাষণকে, অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে ককবরক ভাষায় অনুবাদ করে পাহাড় আর সমতলকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। তাঁর ‘আমানি কক’ সিরিজের বইগুলো আজ পাহাড়ের শিশুদের কাছে কেবল পাঠ্যবই নয়, মায়ের কোলে শোনা রূপকথা।
এই নিরলস সাধনা একদিন রাষ্ট্রের হৃদয় ছুঁয়েছিল। ২০২১ সালে, যখন প্রথমবারের মতো ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক’ প্রদান করা হলো, তখন জাতীয় অধ্যাপক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের পাশে উচ্চারিত হলো এই পাহাড়ি সন্তানের নাম। স্থানীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থেকে কুড়িয়েচিল সম্মাননা। এ পুরস্কার কেবল একজন মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার নয়, এ পুরস্কার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি পাহাড়ের, প্রতিটি ঝর্ণার, প্রতিটি মাতৃভাষার জয়ধ্বনি।
আজ মাচাং মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা কোনো একক নাম নয়। তিনি পাহাড়ের ইতিহাস, পাহাড়ের বর্তমান এবং পাহাড়ের ভবিষ্যৎ। যতদিন পাহাড়ে মেঘ জমবে, যতদিন ককবরক ভাষায় একটি শিশু ’মা’ বলে মাকে ডাকবে, ততদিন এই নামটি ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করবে।


১. এককভাবে রচিত গ্রন্থ (১৯টি)

ক. কাব্যগ্রন্থ

১. ককবরক ককলব খল (ককবরক কবিতা সংকলন), ১৯৯৪
২. Jorani Khorang (ককবরক কবিতা সংকলন), ২০১৪
৩. Ungbale E Hu Hu Hu (ককবরক কাব্যগ্রন্থ), ২০১৮
৪. Tete Tuai (তেতে তুয়াই), ২০২২
৫. ককবরক কাব্যসাহিত্য, ২০২৩
৬. রাইবতি, ২০২৬

খ. গল্পগ্রন্থ

৭. অরণ্যকথা, ২০২৬

গ. শিশু সাহিত্য

৮. Chini Emangni Ha (শিশুতোষ ছড়া সংকলন), ২০১৫

ঘ. অভিধান ও ভাষাবিজ্ঞান

৯. Kokborokni Kokthaih Khutruk (Kokborok-English-Bangla Word Book), ২০০২
১০. ককবরক শব্দভান্ডার (ককবরক-ইংরেজি-বাংলা), ২০১১
১১. Roman Suithaihbai Kokborok Sunai Raida (রোমান হরফে ককবরক লেখার কৌশল), ২০০৭

ঙ. জীবনী ও গবেষণা

১২. গুরুনি য়াপ্রি (বলংরাই সন্ন্যাসির জীবন ও কর্ম), ২০১৫
১৩. ত্রিপুরা : সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবিকা, ২০১৯

চ. প্রবন্ধ

১৪. এ কথা সে কথা – পাহাড়ের কথা, ২০১৬

ছ. মাতৃভাষার শিশু শিক্ষা

১৫. AMANI KOK (প্রথম শ্রেণি), ২০০৭
১৬. AMANI KOK (দ্বিতীয় শ্রেণি), ২০০৭
১৭. AMANI KOK (তৃতীয় শ্রেণি), ২০০৭

জ. অনুবাদ

১৮. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ (ককবরক অনুবাদ), ২০২০
১৯. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী (ককবরক অনুবাদ), ২০২৩


২. যৌথভাবে রচিত গ্রন্থ (১৫টি)

জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)

  • ANI BIJAP Swrwng Sakang (প্রাক-প্রাথমিক মাতৃভাষার বই)
  • PHAIDI SUINI SWRWNGNO Swrwng Sakang
  • MWSA BAI KERANG
  • SWICHA BAI TOKLA
  • BUJU GANANG SIAL
  • MASANDWI BAI MAYUNG
  • GONG BAI POYABOTHOP
  • RISA HACHUK KAMIO THANGMANI
  • MAMU HATIO THANGO
  • ANI KOKBOROK BIJAP Rwngrem Sa
  • THIKIMUNG BIJAP Rwngrem Sa
  • ANI KOKBOROK BIJAP Rwngrem Nwi
  • THIKIMUNG BIJAP Rwngrem Nwi
  • ANI KOKBOROK BIJAP Rwngrem Tham

অন্যান্য

  • Ani Gam Nangjakmani (শিশুতোষ গল্প), ২০১২

৩. একক সম্পাদিত গ্রন্থ ও সাময়িকী (২৭টি)

গবেষণা ও প্রবন্ধ

  • Society and Culture: The Indigenous Peoples in Bangladesh
  • Land, Culture and Indigenous Peoples
  • Indigenous Peoples: Life and Livelihood
  • Indigenous Peoples of the World: Culture and Rights
  • Mother Tongue and Culture: Indigenous Peoples of Bangladesh
  • ভাষা, শিক্ষা ও সাহিত্য : বাংলাদেশের আদিবাসী
  • আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার অধিকার : মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে
  • Indigenous Children's Rights to Education: Mother Tongue Matters
  • সমাজ পরিবর্তনের জন্য যুব নেতৃত্ব
  • বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আদিবাসী জীবন সংস্কৃতি

সাময়িকী ও জার্নাল

  • Santua Journal
  • পাহাড়কথা (সংখ্যা ১, ৩, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯ ও বিশেষ সংখ্যা)
  • গিরিপাঠ
  • গিরিজা
  • RUANG (প্রতিধ্বনি)
  • উন্নয়ন বুলেটিন
  • Jora (সময়)

পরিবেশ ও উন্নয়ন

  • পরিবেশের অ আ ক খ

কোভিড-১৯ তথ্যপত্র

  • জরুরি বার্তা (সংখ্যা ১–৫), ২০২০

৪. যৌথ সম্পাদিত গ্রন্থ (৫৯টি)

ক. শিক্ষা ও মাতৃভাষা

  • প্রাথমিক শব্দভান্ডার
  • শিক্ষা আইন ২০১৩ (খসড়া)
  • প্রাথমিক শিক্ষা চিত্র : বাংলাদেশের আদিবাসী
  • Grassroots Voice
  • Thikimwng Swrwngmwng
  • ANI LEKHAMUNG BIJAP
  • AMANI KOK Rwngrem Tham

খ. সাহিত্য সংকলন

  • হিরন্ময়
  • প্রকৃতি
  • পাহাড়িয়া কাব্য
  • BOROK HODANI KOK
  • পঞ্চাশের হাওয়ায় আজাদ বুলবুল
  • Nonaya Khorang

গ. শিশু সাহিত্য

  • মনিমালানি কক
  • Nokha Kusum Chakha
  • Amani Kokkotor
  • NOKHAI RAJA
  • Kiching Kaithamni Kok
  • Ang Malmatakhor Naimani
  • Yak Baksa Samung Tangno
  • Wak Bok Sajakmani Kok
  • Twi Gam Nungdi
  • Thaipung Chanai
  • TOKBAK ROKNI KOK
  • TAKHUK BUKHUK
  • SIALSA SUMUR SUBO
  • SAMUNG NI KOK
  • RINA BAI RIPO ISKULO THANGDOK
  • RINAI RISA
  • RI CHUM
  • PUTHI AA
  • NOK HUG
  • Kiching Kamarni Kok
  • Lairang Twi Balmani
  • Lechu Kumun
  • Lopha Tormani Gamya
  • Makhara Dormai Khogo
  • Mokol Phungwi Thwngmani
  • Khumni Bagan
  • Khorgoni Bari
  • Kaisani Bipodu Tamunwidi
  • Jirok Toksa
  • Hor Bai Thungmani Gamya
  • HANYA CHAYA
  • Gobing Bai Puthi Aa
  • DUDU KARABO
  • CHINI NOK HUG
  • Chini Nok
  • Chini Aphak
  • Bwisu
  • Atoini Nuk
  • Anaji Thalwi
  • Bolongni Atoi

সাহিত্যকর্মের পরিসংখ্যান

বিভাগসংখ্যা
এককভাবে রচিত গ্রন্থ১৯টি
যৌথভাবে রচিত গ্রন্থ১৫টি
একক সম্পাদনা২৭টি
যৌথ সম্পাদনা৫৯টি
মোট প্রকাশনা১২০টি


বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬

চাঙমা উপন্যাস সাহিত্যের অগ্রদূত ও ভাষা-নবজাগরণের নির্মাতা: আর্য্যমিত্র চাঙমা - ইনজেব চাঙমা

 



চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের আধুনিক ইতিহাসে যে কজন সাহিত্যসাধক তাঁদের সৃষ্টিশীল কর্মে এক নতুন যুগের সূচনা করেছেন, তাঁদের অগ্রভাগে উচ্চারিত হয় কবি, ঔপন্যাসিক, অভিধানকার, অনুবাদক ও শিক্ষাবিদ আর্য্যমিত্র চাঙমা-এর নাম। চাঙমা ঔপন্যাসিক ধারার কথা উঠলেই সর্বাগ্রে স্মরণ করা হয় তাঁকে। কারণ, তিনি কেবল একজন ঔপন্যাসিক নন; বরং চাঙমা ভাষার সাহিত্যভুবনে উপন্যাসের স্বতন্ত্র ভিত্তি নির্মাণকারী এক অগ্রদূত। বহুদিন ধরে যে শূন্যতা চাঙমা সাহিত্যে অনুভূত হচ্ছিল, তাঁর কলমেই তার পূর্ণতা লাভ করে। বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একসময় চাঙমা ভাষায় মৌলিক উপন্যাস রচিত হওয়ার যে প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছিলেন, আর্য্যমিত্র চাঙমা তাঁর সৃষ্টিশীল প্রতিভায় সেই প্রত্যাশাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন। নিজস্ব চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালায় ধারাবাহিকভাবে উপন্যাস রচনা করে তিনি ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
 
আনুমানিক ১৯৬২ সালের ২১ জুন (৭ আষাঢ়) খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার মিঙিনি নদীর তীরবর্তী মনোরম কাঠালতলী গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা বৈরেন্দ্র চাকমা এবং মাতা আনন্দবালা চাকমা। প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা তাঁর শৈশব পরবর্তী সাহিত্যজীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। পাহাড়, নদী, জনজীবন, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং জাতিসত্তার বেদনাবোধ তাঁর সাহিত্যচেতনার অন্তঃসলিল স্রোত হয়ে প্রবাহিত হয়েছে।
 
শিক্ষাজীবনের সূচনা দীঘিনালা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে দীঘিনালা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৯৮৪–৮৫ শিক্ষাবর্ষে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করলেও তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর শিক্ষাজীবনে বিঘ্ন সৃষ্টি করে। ১৯৮৬ সালে বিরাজমান পরিস্থিতে শতপরিবারের মতো তাঁকে ভারতের তাকুমবাড়ি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে হয়। প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও তিনি শিক্ষার পথ থেকে বিচ্যুত হননি; ১৯৮৮ সালে বান্দরবান সরকারি কলেজ থেকে বহিরাগত পরীক্ষার্থী হিসেবে বিএ ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীকালে চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের অধীনে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়ন করেন।
 
কর্মজীবনের সূচনায় বান্দরবানের বাঘমারা জুনিয়র বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন। পরে কিছুদিন চট্টগ্রাম বেতারে খণ্ডকালীন কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ সালে খাগড়াছড়ি কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ তিন দশকেরও অধিক সময় শিক্ষকতার মাধ্যমে অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন আলোকিত করার পর ১ অক্টোবর ২০২৫ সালে অবসর গ্রহণ করেন। শিক্ষকতা তাঁর পেশা হলেও ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সাধনাই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত।
 
চাঙমা ভাষার বিকাশ ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি অর্জনের আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)-এর চাঙমা ভাষার লেখক সদস্য হিসেবে তিনি মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন চাঙমা একাডেমি, যা চাঙমা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির গবেষণা, সংরক্ষণ ও প্রসারে এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
সাহিত্যসৃষ্টির ক্ষেত্রে আর্য্যমিত্র চাঙমার অবদান বহুমাত্রিক। তাঁর রচিত উপন্যাস ‘মনবি’ (২০২০), ‘তিন ফাগালা’ (২০২৩), ‘অঃমা কবি’ (২০২৩) এবং কিশোর উপন্যাস ‘মালাচান’ (২০২৪) চাঙমা উপন্যাস সাহিত্যের মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত। ভাষার শব্দসম্পদ সংরক্ষণে তিনি রচনা করেছেন ‘চাকমা শব্দভাণ্ডার’ (২০১১) ও ‘ভাচ আলাম’ (২০১৫) অভিধান। ভাষা শিক্ষার জন্য সম্পাদনা করেছেন ‘এয চাঙমা লেঘা শিখি’, ‘মিল কধা নকভাচ’ এবং ‘মাতৃভাষা’ সাময়িকী।
 
অনুবাদক হিসেবেও তাঁর অবদান সমানভাবে উল্লেখযোগ্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ চাঙমা ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে তিনি বিশ্বসাহিত্য ও জাতীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ পাঠকে মাতৃভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। পাশাপাশি ব্র্যাক, সেভ দ্য চিলড্রেনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনাও তিনি চাঙমা ভাষায় অনুবাদ করেছেন ও গল্প, ছড়া, প্রবন্ধ ও ভাষা-শিক্ষাবিষয়ক রচনায়ও তাঁর সৃজনশীলতার স্বাক্ষর সুস্পষ্ট।
 
ব্যক্তিজীবনে তিনি শুক্লা চাকমার সহধর্মী। তাঁদের কন্যা অমিতা চাকমা ইতিহাসে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী এবং বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। পুত্র ত্রিলোক চাকমা প্রজ্জ্বল ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের চারুকলা বিভাগে অধ্যয়নরত।
 
আর্য্যমিত্র চাঙমা কেবল একজন সাহিত্যিক নন; তিনি ভাষার প্রহরী, সংস্কৃতির ধারক, জাতিসত্তার ইতিহাসসংরক্ষক এবং চাঙমা নবজাগরণের অন্যতম নির্মাতা। তাঁর সাহিত্যকর্মে ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস, পাহাড়ের সৌন্দর্য, মানুষের সংগ্রাম, ভাষার আত্মমর্যাদা এবং জাতিসত্তার স্বপ্ন এক অনন্য শিল্পরূপে ধরা পড়েছে। চাঙমা ভাষায় উপন্যাসের যে দীপশিখা তিনি প্রজ্বলিত করেছেন, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সাহিত্যপথকে দীর্ঘদিন আলোকিত করবে।

চাকমা নাট্যসাহিত্যের অন্যতম প্রধান রূপকার: সুনানু মৃত্তিকা চাঙমা - ইনজেব চাঙমা

 

বাংলাদেশের আদিবাসী সাহিত্য ও নাট্যধারায় মৃত্তিকা চাকমা এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি কবি, নাট্যকার, অনুবাদক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক সংগঠক ও নাট্যআন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-সংস্কৃতির বিকাশে নিরলস অবদান রেখে চলেছেন। বিশেষত চাকমা ভাষায় আধুনিক নাট্যসাহিত্যের বিকাশ, লোকঐতিহ্যকে নাট্যরূপ প্রদান, শিক্ষা, পরিবেশ, জাতিসত্তা, সামাজিক পরিবর্তন ও মানবিক মূল্যবোধকে নাটকের বিষয়বস্তু হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং সাংগঠনিক নাট্যচর্চার প্রসারে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। নাট্যসাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০২৩ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন।
মৃত্তিকা চাকমা ১৯৫৮ সালের ১২ জানুয়ারি রাঙামাটি সদর উপজেলার বন্দুকভাঙ্গা মৌজার মুগছড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই তিনি পাহাড়ি সমাজের লোকসংস্কৃতি, মৌখিক ঐতিহ্য, জুমজীবন ও প্রকৃতিনির্ভর জীবনধারার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন। পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যসৃষ্টিতে এই অভিজ্ঞতার সুস্পষ্ট প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।
তিনি লোগাং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে অধ্যয়ন করে ১৯৮৪ সালে বি.এ. (সম্মান) এবং এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৮৫ সাল থেকে তিনি রাঙামাটির মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত। একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক চেতনাবোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পাশাপাশি তিনি আদিবাসী সমাজের সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণে একজন নিবেদিতপ্রাণ সংগঠক হিসেবে কাজ করে চলেছেন।
মৃত্তিকা চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক সংগঠন জুম ইসথেটিক কাউন্সিল (জাক)-এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও নীতিনির্ধারকদের একজন। জাকের মাধ্যমে চাকমা নাটক, লোকসাহিত্য, সংগীত ও শিল্পচর্চাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এছাড়া তিনি আদিবাসী কবিতা পরিষদ, হিল চাদিগাং থিয়েটারসহ বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন। তাঁর সাংগঠনিক নেতৃত্ব পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক নাট্যচর্চাকে সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি প্রদান করেছে।
মৃত্তিকা চাকমার সাহিত্যসাধনার প্রধান ক্ষেত্র নাটক। তাঁর নাটকে পাহাড়ি সমাজের জীবনসংগ্রাম, জুমচাষ, লোকবিশ্বাস, ইতিহাস, জাতিগত পরিচয়, নারীজীবন, সামাজিক বৈষম্য, পরিবেশ সংকট এবং মানবিক মূল্যবোধ শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি লোকঐতিহ্য ও আধুনিক নাট্যরীতির সৃজনশীল সমন্বয়ের মাধ্যমে চাকমা নাটককে একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যধারায় উন্নীত করার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন।
তাঁর নাট্যচিন্তার কেন্দ্রে রয়েছে জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক পরিচয়, মানবিক মুক্তি, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং শিল্পের রূপান্তরমূলক শক্তি। লোককথা, কিংবদন্তি, ইতিহাস ও সমকালীন বাস্তবতাকে তিনি নাট্যভাষায় এমনভাবে রূপ দিয়েছেন, যা চাকমা নাট্যসাহিত্যে নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে।
প্রকাশিত নাট্যগ্রন্থ
মৃত্তিকা চাকমার উল্লেখযোগ্য নাট্কসমূহ—
দেবঙসি আহধর কালা ছাবা (১৯৮৯)
গোঝেন (১৯৯০)
মহেন্দ্রর বনবাঝ (১৯৯২)
একজুর মান্নেক (১৯৯৩)
জোঘ্য (১৯৯৯)
হককানির ধনপানা (২০০১)
একাত্তর তরুণী (২০০২)
ভূত
থবাক (২০০৫)
বান (২০০৮)
কর্মফল (২০১২)
নির্বাচিত নাটক (বাংলা একাডেমি, ২০২৬)
মঞ্চনাটক ও নাটিকা
তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য মঞ্চনাটক ও নাটিকার মধ্যে রয়েছে—
মোনফুল, উদোশিঙর খানা গুদি, তুলোপুধি বাবর মাধা ধনা, গুণমনে স্কুলত যেব, নেতার চবাত, থগ, জামেই মারা, কুন্ডলী বালার অর্হত, আভা, শান্তি দেবী জদন হলা, আঙস্যা সদগ, জামুরো, শিদোলো তাবা দি' বিনি ভাত, পার্বতী মা, চন্ডি চরনার খানাগুলি, কাবাহুল, ছি মোকে লাদি ভাত, নিজ অহরখ শিখিবং এবং তানজাং।
চাকমা ভাষাভাষী পাঠকদের বিশ্বনাট্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে মৃত্তিকা চাকমা গুরুত্বপূর্ণ অনুবাদকর্ম সম্পাদন করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য অনুবাদগ্রন্থ—
গ্রিক নাট্যকার সফোক্লিসের ইডিপাস (১৯৮৪)
জাপানি নাট্যকার ইয়ামামতো ইউজোর নাটক অবলম্বনে একশ বস্তা চোল (২০১৮)
কাব্যগ্রন্থ
বাংলা ভাষায় এখনো পাহাড় কাঁদে (২০০২), চাকমা ভাষায়- দিকবন সেরেত্তুন (১৯৯৫), মেঘ সেরে মোনো চুক (২০১১)।
হাজার বছরের বাংলা কবিতা (অনুবাদ, মোনঘর, ২০২৬)
এছাড়া তাঁর বাংলা নাটক শান্তির সন্ধানে বিশেষভাবে সমাদৃত।
মৃত্তিকা চাকমার সাহিত্যচিন্তার মূলভিত্তি হলো জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়, মানবিক মুক্তি এবং শিল্পের সামাজিক দায়বদ্ধতা। তাঁর নাটকে একদিকে যেমন লোকঐতিহ্য, পুরাণ, লোককথা ও কিংবদন্তির পুনর্নির্মাণ ঘটেছে, অন্যদিকে সমকালীন সামাজিক বৈষম্য, রাজনৈতিক সংকট, পরিবেশবিনাশ, নারী-অধিকার ও মানবিক মূল্যবোধও শক্তিশালীভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ফলে তাঁর নাটক কেবল শিল্পসৃষ্টি নয়, বরং সমাজ-ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবেও বিবেচিত।
পুরস্কার ও সম্মাননা-
সাহিত্য ও নাট্যচর্চায় বিশেষ অবদানের জন্য তিনি দেশ-বিদেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে বহু পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেছেন। উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
তোলবিচ সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১)
জাতীয় সাহিত্য পরিষদ সাহিত্য সম্মাননা, ঢাকা (২০০৩)
জাপান–বাংলাদেশ কালচারাল ফোরাম সাহিত্য সম্মাননা পদক (২০০৮)
স্বাধীনতা সংসদ সম্মাননা, ঢাকা (২০১০)
আন্তর্জাতিক জলঙ্গী কবিতা উৎসব সম্মাননা, নদীয়া, ভারত (২০১০)
দক্ষিণ এশিয়ার শান্তির জন্য কবিতা সম্মাননা, নেপাল (২০১৩)
রাঙামাটি শিল্পকলা একাডেমি নাট্যসাহিত্য পুরস্কার (২০১৩)
মুনীর চৌধুরী পদক (২০১৪)
বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার (২০২৩)
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী পরবর্তীকালে তিনি বাংলা একাডেমির ফেলো হিসেবেও নির্বাচিত হন।
মৃত্তিকা চাকমা কেবল একজন নাট্যকার নন; তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-সংস্কৃতির একজন প্রাতিষ্ঠানিক নির্মাতা। চাকমা ভাষায় আধুনিক নাট্যধারার বিকাশ, বিশ্বনাট্যের অনুবাদ, সাংস্কৃতিক সংগঠন গঠন এবং নতুন প্রজন্মকে সাহিত্য-নাট্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর সাহিত্যকর্ম আদিবাসী সমাজের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনবোধকে জাতীয় সাহিত্যভাণ্ডারে সমৃদ্ধ করেছে। এ কারণে তিনি সমকালীন চাকমা সাহিত্য এবং বাংলাদেশের আদিবাসী নাট্যধারার অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত।
তথ্যসূত্র
১. বাংলা উইকিপিডিয়া, “মৃত্তিকা চাকমা”।
২. রাণ্যাফুল (কবিতাগ্রন্থ)।
৩. বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার-সংক্রান্ত প্রকাশিত তথ্য।
 

জুমপাহাড়ের শব্দসারথি- কেভি দেবাশীষ চাঙমা : ইনজেব চাঙমা

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের রক্তিম ও সবুজ শৈলশ্রেণির বুক চিরে যে জীবনধারা প্রবহমান, তার সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও সংবেদনশীল রূপকার কেভি দেবাশীষ চাঙমা। সমকালীন চাঙমা সাহিত্যের অঙ্গনে তিনি কেবল একজন স্রষ্টা নন, বরং এক আলোকবর্তিকা—যিনি একাধারে কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সম্পাদক ও সংগঠক। জুম্ম জনগোষ্ঠীর শতাব্দীর প্রাচীন ইতিহাস, আদিভিটা হারানোর বুকফাটা আর্তনাদ, শরণার্থী জীবনের অনিশ্চয়তা, জুমচাষের আদিম ও কঠোর সংগ্রাম, জাতিসত্তার অস্তিত্বের সংকট এবং পার্বত্য অঞ্চলের জটিল সামাজিক-political বাস্তবতা তাঁর লেখনীর প্রধান চালিকাশক্তি। তিনি ব্যক্তিক যন্ত্রণাকে সামষ্টিক ইতিহাসের ক্যানভাসে এমন এক গভীর মানবিক বোধে উন্নীত করেছেন, যা তাঁর সৃষ্টিকে দিয়েছে কালজয়ী শিল্পরূপ।
 
১৯৭৬ সালের ২৮ মে, রাঙামাটি পার্বত্য জেলার লংগদু উপজেলার রাঙাপানিছড়া গ্রামের এক শান্তিময় সকালে এই শব্দশিল্পীর জন্ম। পিতা সরেন্দ্র লাল চাকমা এবং মাতা বিজয়মুখী চাঙমার স্নেহছায়ায় বেড়ে ওঠা সাত ভাই-বোনের পরিবারে তিনি ষষ্ঠ সন্তান। ২০১১ সালে তিনি তুষিতা চাকমার সাথে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন এবং তাঁদের যৌথ জীবনের আঙিনা আলো করে আসে কন্যাসন্তান 'অঝরা চাঙমা'। বর্তমানে তিনি খাগড়াছড়ির দিঘীনালা বনবিহার পাড়ার নিভৃত আশ্রয়ে থেকে তাঁর সাহিত্যসাধনা ও সাংগঠনিক কাজ নিরলসভাবে চালিয়ে যাচ্ছেন।
 
কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস একবার পরম ব্যাকুলতায় চাঙমা ভাষায় একটি নিরেট, শক্তিশালী উপন্যাস রচনার প্রয়োজনীয়তার কথা ব্যক্ত করেছিলেন। ইতিহাসের সেই অমোঘ আহ্বান যেন ধ্বনিত হয়েছিল কেভি দেবাশীষ চাঙমার অন্তরে। ২০০২ সালে তাঁর ক্ষুরধার লেখনী থেকে নিঃসৃত হয় যুগান্তকারী উপন্যাস ‘কোচপানা দুঘ’। এই একটিমাত্র সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি চাঙমা কথাসাহিত্যের বন্ধ্যাত্ব ঘুচিয়ে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেন। মাতৃভাষায় দীর্ঘ আখ্যান রচনার যে স্পর্ধা ও শৈল্পিক ধী তিনি দেখিয়েছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য এক আলোকোজ্জ্বল পথ তৈরি করেছে।
 
তিনি শুধু নিভৃত প্রকোষ্ঠের সাধক নন, বরং সংস্কৃতির মাঠপর্যায়ের এক অতন্দ্র প্রহরী। আদিবাসী সাহিত্য-সংস্কৃতির চারাগাছটিকে মহীরূহে পরিণত করতে এবং নতুন প্রজন্মের মগজে পাঠাভ্যাসের বীজ বুনে দিতে তিনি অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। বর্তমানে তিনি অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, বাংলাদেশ আদিবাসী কবি পরিষদ (সভাপতি), চাঙমা সাহিত্য বাহ্ (সভাপতি), থিংকার্স লাইব্রেরি (সভাপতি) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী লেখক ফোরামে। 
 
কেভি দেবাশীষ চাঙমার সৃজনশীলতার আকাশ অত্যন্ত সুবিস্তৃত। তাঁর কবিতা ও উপন্যাসের পরতে পরতে মিশে আছে পাহাড়ি জীবনের ঘাম, রক্ত ও স্বপ্নের ঘ্রাণ। তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত সাহিত্যের খতিয়ান নিচে বিন্যস্ত হলো:
১. কোচপানা দুঘ (উপন্যাস, ২০০২) — চাঙমা কথাসাহিত্যের মাইলফলক। ২. তুই এবে (২০০৩) ৩. ব্যর্থ জীবনের কষ্টের কাহিনি (২০০৪) ৪. এক ফোঁটা চোখের পানি (২০০৫) ৫. অধিকার (২০০৭) ৬. সুখে থেচ (২০০৭) ৭. বেল্যামাধান (২০০৮) ৮. মুই মত্যেই বা আমি আমার (২০১৩) ৯. আওচ/ইচ্ছা (২০১৭) ১০. আঝা পুরেবং (২০১৮) ১১. কেচ্ছে ফুল/কাশফুল (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৯), ১২. ফিরে পেতে চাই (২০২৫)।
সম্পাদক হিসেবে তিনি সবসময়ই চেয়েছেন সমকালের কণ্ঠস্বরকে ধরে রাখতে। তাঁর সুনিপুণ সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে: ধল পহ্’র (ম্যাগাজিন, ২০০৪), ফুদন্দি ফুল তুম্বাজ (সাহিত্যপত্রিকা, ২০১৬), সম্বোধি (২০১৮), পার্বত্য জ্যোতি (ভদন্ত মণিপাল ভান্তের মহাস্থবির বরণ স্মারকগ্রন্থ, ২০২৫)ও সংঘরাজ দেবতিষ্য লুরি স্মারকগ্রন্থ (২০২৫)।
 
প্রকাশের আলো না দেখলেও তাঁর টেবিল আলো করে আছে ‘জুম্ম দেচ’-সহ বেশ কিছু অসামান্য ছোটগল্প ও কবিতা পাণ্ডুলিপি, যা জুম্ম জীবনের যাপিত চালচিত্রকে আরও নিবিড়ভাবে ধারণ করে আছে।
 
কেভি দেবাশীষ চাঙমা কেবল একজন লেখক নন, তিনি চাঙমা ভাষা ও সংস্কৃতির আত্মপরিচয় রক্ষার এক অবিনাশী সুর। তাঁর প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি পঙক্তি জুম্ম মানুষের বেঁচে থাকার লড়াই, তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং একটি সাম্য ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজের স্বপ্নকে ধারণ করে। পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঝরনার মতোই তাঁর সাহিত্যধারা বহমান, যা সমকালীন চাঙমা সাহিত্যকে বিশ্বমানের উচ্চতায় আসীন করতে প্রতিনিয়ত প্রাণরস জুগিয়ে চলেছে।
লেখা: ১৫ জুলাই ২০২৬ 

রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬

পাহাড়ের বুক চিরে জেগে ওঠা ত্রিশটি দীপশিখা (নলবনিয়ার চাকমা তরুণদের উচ্চশিক্ষা জয়ের মহাকাব্য) - ইনজেব চাঙমা

 

যে জাতির ভিটে কেড়েছে কাপ্তাইয়ের নীল সলিল, যে জাতির স্বপ্ন পিষেছে সেটেলার পুনর্বাসনের লৌহচাকা—সেই চাকমা জাতির ললাটে বিধাতা বুঝি হীরকের কলমে লিখে দিয়েছেন একটিমাত্র শব্দ: ‘মেধা’। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ—শাসকের রং বদলায়, বদলায় না পাহাড়কে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টা। তবু পাহাড় নত হয় না। বরং শতাব্দীর শোষণ ডিঙিয়ে সে আকাশ ছোঁয় আপন শিরদাঁড়ার জোরে।
বাঘাইছড়ির অরণ্যচারী পথের শেষে ঘুমিয়ে আছে নলবনিয়া—একটি গ্রাম, না-কি একখণ্ড কবিতা? চারপাশে ধ্যানমগ্ন গিরিশ্রেণি, বুকের ওপর দিয়ে বয়ে চলে কাজালং স্রোতস্বিনী। এখানে ভোর হয় জুমের ধোঁয়ায়, সন্ধ্যা নামে কৃষকের কপালের ঘামে। বর্ষায় পথ ডোবে কর্দমাক্ত দীর্ঘশ্বাসে, শীতে হিম ঝরে টিনের চালে। কলেজ নেই, লাইব্রেরি নেই, আলোর চেয়ে অন্ধকারই বেশি।
তবু এই গ্রামের ঘরে ঘরে জ্বলে অন্য এক প্রদীপ—অক্ষরের প্রদীপ, স্বপ্নের প্রদীপ।
দুঃসময়ের মেঘে ঢাকা পার্বত্যের আকাশে হঠাৎই বেজে উঠল বাঁশি। ফেসবুকের পাতায় ভেসে এলো খবর , নলবনিয়ার ত্রিশটি ছেলেমেয়ে এবার দেশের নয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহদ্বার পেরিয়েছে (১২ জুলাই ২০২৬ খ্রি. বরিবার)। কেউ শুনবে রোগীর হৃদস্পন্দন, কেউ গড়বে সেতু, কেউ লিখবে কোড, কেউবা লিখবে জাতির না-বলা ইতিহাস।
ভাবো একবার—যে গ্রামে কলেজে যেতে পাড়ি দিতে হয় কাজালং নদী, সেই গ্রামের সন্তানেরা আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে পা রাখবে। এ কেবল ভর্তি নয়, এ এক নীরব বিপ্লব। এ কেবল সংখ্যা নয়, এ এক মহাকালের প্রতিশোধ।
এই অগ্ন্যুৎসবের সলতে কারা?
জুমের ধান বেচে যে মা ছেলের ফর্ম ফিলাপের টাকা জোগায়, সেই মা।
যে বাবা খালি পেটে লাঙল ঠেলে মেয়ের কোচিং ফি পাঠায়, সেই বাবা।
যে দাদা শহর থেকে ফিরে হ্যারিকেনের আলোয় অঙ্ক কষায়, সেই দাদা।
আর পুরো নলবনিয়া—যারা একবাক্যে উচ্চারণ করেছে, “আমরা হারব না”।
এখানে দারিদ্র্য অভিশাপ নয়, দীক্ষা। বঞ্চনা কান্না নয়, কণ্ঠ।
আমরা চাই, নলবনিয়ার এই দীপাবলি হোক পার্বত্যের দাবানল। প্রতিটি জুমঘর থেকে উঠে আসুক পাবলিকিয়ান, প্রতিটি মাচাং ঘর হোক পাঠশালা। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বমসহ সকল জাতিসত্ত্বা—সব পরিচয় মিলে যাক একটিই পরিচয়ে: ‘শিক্ষিত পাহাড়’।
কারণ কলমের কালি দিয়েই শুকাতে হয় কাপ্তাইয়ের জল, ডিগ্রির সনদ দিয়েই রুখতে হয় উচ্ছেদের বুলডোজার।
হে রাষ্ট্র, নলবনিয়াকে ‘আদর্শ শিক্ষা গ্রাম’ ঘোষণা করো। এখানে কলেজ দাও, পাঠাগার দাও, ইন্টারনেট দাও। এই ত্রিশটি প্রদীপের জন্য বৃত্তি দাও, গবেষণার বৃত্ত দাও, ফিরে এসে যেন মাটির ঋণ শোধ করতে পারে তার কর্মসংস্থান দাও।
উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের সেতু নয়, উন্নয়ন মানে সম্ভাবনার সাঁকো বাঁধা।
আমাদের সাধ, এই তরুণেরা কেবল চাকরির বাজারে সনদ বেচবে না। তারা হবে জাতির কণ্ঠস্বর।
কেউ লিখবে নতুন ‘রাধামন ধনপুদি পালা ও বারমাস ’, কেউ সুর দেবে বিঝুর গানে বিশ্বমাতানোর মতো মূর্ছনা, কেউ আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড়িয়ে বলবে পাহাড়ের অধিকারের কথা, কেউ জুমের মাটিতে ফলাবে খরাসহিষ্ণু ধান।
তারা প্রমাণ করুক—শিক্ষা মানে শেকড় কাটা নয়, শেকড়কে আকাশে মেলে ধরা।
নলবনিয়ার ত্রিশটি দীপশিখা আজ ত্রিশটি ধ্রুবতারা। এই তারার আলোয় পথ দেখুক পার্বত্যের প্রতিটি শিশু। তাদের ছবি, নাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছড়িয়ে দাও পাহাড় থেকে সমতলে। কারণ একটি ছবি হাজারো ঘুমন্ত চোখে স্বপ্ন বুনে দিতে পারে।
জেগে ওঠো, পাহাড়। জেগে ওঠো, বাংলাদেশ।

শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬

প্রগতিশীল চিন্তক লালন কান্তি চাঙমা- ইনজেব চাঙমা

 

কবি লালন কান্তি চাঙমা
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য আর পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে যাওয়া ঝিরির কলতানে মুখরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম। তবে এই নয়নাভিরাম রূপের সমান্তরালে রয়েছে প্রান্তিক মানুষের জীবনসংগ্রাম, রাজনৈতিক অস্থিরতা আর সামাজিক বিবর্তনের এক জটিল ইতিহাস। এই পটভূমিতেই জন্ম নেন এমন কিছু মানুষ, যাঁরা কেবল নিজের আত্মউন্নয়নেই সীমাবদ্ধ থাকেন না, বরং নিজ সমাজ ও সংস্কৃতির আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠেন। সমকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক জাগরণের তেমনই এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব লালন কান্তি চাকমা। একাধারে শিক্ষক, কবি, প্রগতিশীল চিন্তক, সম্পাদক ও সমাজসংগঠক হিসেবে তিনি সমকালীন পাহাড়ি জনপদে এক স্বতন্ত্র ও গৌরবময় পরিচয়ে ভাস্বর।
কবি লালন কান্তি চাঙমা ১৯৬৯ সালের ১১ জুন খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার প্রত্যন্ত ও সবুজ-শ্যামল তারাবন্যা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রয়াত সুরেন্দ্রলাল চাকমা এবং মাতা প্রয়াত বিরাজ মুখী চাকমা। পাহাড়ের কোলেই তাঁর বেড়ে ওঠা। শৈশবে প্রকৃতির উদারতা যেমন তাঁর মনকে সমৃদ্ধ করেছে, তেমনই সেই সময়কার রাজনৈতিক অস্থিরতা, সাম্প্রদায়িক অসহিষ্ণুতা ও প্রান্তিক মানুষের নিত্যদিনের জীবনসংগ্রাম তাঁর অবোধ মননে গভীর রেখাপাত করে। এই শৈশবকালীন অভিজ্ঞতা ও পারিপার্শ্বিকতা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্য, সমাজভাবনা এবং সাংস্কৃতিক কর্মের মূল ভিত্তিভূমি তৈরি করেছিল।
দীঘিনালার বোয়ালখালী অনাথ আশ্রম ও ঐতিহ্যবাহী ‘মোনঘর’-এর স্নেহছায়ায় লালন কান্তি চাকমার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাজীবন সম্পন্ন হয়। পাহাড়ি জীবনের শেকড় থেকে উঠে এসে উচ্চশিক্ষার তীব্র আকাঙ্ক্ষায় তিনি তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাড়ি জমান। সেখান থেকে তিনি সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে বিএসএস (সম্মান) ও এমএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন। সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে রাষ্ট্র, সংস্কৃতি, জাতিগত পরিচয়, সামাজিক কাঠামো ও মানবিক মূল্যবোধের মৌলিক প্রশ্নগুলো তাঁর বৌদ্ধিক চর্চাকে শাণিত করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এই জীবনই তাঁকে একজন প্রগতিশীল ও যুক্তিবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে লালন কান্তি চাকমা প্রথমে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘আইডিএফ’-এ প্রায় দুই বছর উন্নয়নকর্মী হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু মাঠপর্যায়ের কাজের চেয়ে মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সমাজ গঠনের মূল ভিত্তি অর্থাৎ শিক্ষার আলো ছড়ানোর প্রতি তাঁর টান ছিল প্রবল। ফলে, তিনি শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। বর্তমানে তিনি কাচলং সরকারি কলেজে অধ্যাপনারত। তাঁর কাছে শিক্ষকতা কেবল নিয়মতান্ত্রিক পাঠদান বা জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম নয়, বরং এটি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিকতা, যুক্তিবাদ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সংস্কৃতিচর্চার বীজ বপনের এক পরম ব্রত।
কবি লালন কান্তি চাঙমা একজন খাঁটি মানবতাবাদী ও প্রগতিশীল ভাবুক। তিনি স্বপ্ন দেখেন এমন এক সমাজের, যা হবে শ্রেণিবৈষম্যহীন, বিজ্ঞানমনস্ক, প্রযুক্তিনির্ভর এবং মানবিক মূল্যবোধে সিক্ত। অসাম্প্রদায়িকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও যুক্তিনির্ভর জীবনদৃষ্টির প্রশ্নে তাঁর অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিল্পী ভূপেন হাজারিকার আত্মজীবনী 'আমি এক যাযাবর' তাঁর সার্বক্ষণিক সঙ্গী এবং জীবনের অন্যতম প্রধান প্রেরণার উৎস।
কেবল চিন্তার জগতেই নয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের মাঠেও তিনি সমান সক্রিয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘আরাঙ’-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়া, পাহাড়ি অঞ্চলের তরুণ ও প্রবীণ লেখকদের মিলনমেলা ‘চাকমা সাহিত্য বাহ্’ বর্তমানে চাঙমা সাহিত্য একাডেমি-এর উপদেষ্টা সদস্য হিসেবে তিনি নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।
কবি লালন কান্তি চাঙমার সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটেছিল ছাত্রজীবনের দেয়ালিকা, সাময়িকী ও দৈনিক পত্রিকার পাতা থেকে। কবিতা তাঁর আত্মপ্রকাশের প্রিয় মাধ্যম হলেও প্রবন্ধ, স্মৃতিকথা, শিক্ষাবিষয়ক রচনা ও সম্পাদনায় তিনি সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তাঁর মৌলিক লেখায় বারবার ঘুরেফিরে আসে শিক্ষা, মানবতা, নৈতিকতা, পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবনসংগ্রাম, কৃষ্টি ও ইতিহাস-সচেতনতা।
তাঁর সাহিত্য ও সম্পাদনার একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে বৌদ্ধধর্মীয় স্মারকগ্রন্থ ও সমাজসংস্কারকদের জীবন আখ্যান, যা ইতিহাসের অমূল্য দলিল। তাঁর প্রকাশিত ও সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ নিচে তুলে ধরা হলো:
প্রকাশিত মৌলিক গ্রন্থ
• মেয়্যে রেগা (কাব্যগ্রন্থ) – বিঝু, ২০১৯
• আমার প্রিয় শিক্ষকের একাল সেকাল – নভেম্বর, ২০২১
সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ
• কর্মবীর (ভদন্ত তিলোকানন্দ মহাথের-এর ৮১তম শুভ জন্মজয়ন্তী স্মারক) – ৫ অক্টোবর ২০১৮
• জন্মস্মারক (উপ-সংঘরাজ ভদন্ত তিলোকানন্দ মহাথের-এর ৮২তম শুভ জন্মজয়ন্তী) – ১১ অক্টোবর ২০১৯
• আত্মদীপ (তিলোকানন্দ ভান্তের স্মারক গ্রন্থ)
• প্রদীপ্ত মশাল (১ম খণ্ড) (তিলোকানন্দ ভান্তের স্মারক গ্রন্থ)
• প্রদীপ্ত মশাল (২য় খণ্ড) (৪র্থ সংঘরাজ ভদন্ত তিলোকানন্দ মহাথের-এর ৮৪তম জন্মস্মারক সংকলন) – ডিসেম্বর ২০২১
• শ্রদ্ধাস্মারক (প্রয়াত উপালি মহাস্থবির এর শেষকৃত্যানুষ্ঠান বাস্তবায়ন কমিটির বিশেষ প্রকাশনা) – ২০২২
• তরুছায়া (দিমোনঘরীয়ান্স এর ২৫ বছর পূর্তি বিশেষ প্রকাশনা) – ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৪
• তিলোকানন্দ (সাদা মনের মানুষ) – ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫
কবি লালন কান্তি চাঙমার সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম ও সম্পাদনা শিল্পের মূল সুর হলো—পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ঐতিহ্য, শিক্ষা, সমাজসংস্কার এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে মহাকালের বুকে ধরে রাখা। তিনি বর্তমান পার্বত্য অঞ্চলের জ্ঞানচর্চার এক অন্যতম বাতিঘর। শিক্ষা, প্রগতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের অপূর্ব সমন্বয়ে গড়ে ওঠা তাঁর কর্মময় জীবন আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় এক আদর্শ। পাহাড়ের বুক থেকে উঠে আসা এই মনীষা তাঁর সৃষ্টির মাধ্যমে দেশ ও জাতির মনন গঠনে আজীবন অবদান রেখে চলবেন, এটাই প্রত্যাশা।

শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

শান্তির এক চিলতে রোদ এবং কুয়াশার আগ্রাসন- ইনজেব চাঙমা


আজ ৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার। গত এক সপ্তাহ ধরে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই চারপাশ প্লাবিত হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে যখন দেখি গত রাতের বন্যার পানি কিছুটা কমেছে, তখন মনের ভেতর এক দীর্ঘশ্বাস আর প্রশ্ন জেগে ওঠে, এমন তো আগে ছিল না! অতীতে এর চেয়েও অনেক বেশি বৃষ্টি হতো, কিন্তু প্রকৃতি ছিল সুরক্ষিত। চারিদিকে গাছপালা ছিল, নদী-নালা, খাল-বিলে ছিল মাছ, কাঁকড়া, ইজে (চিংড়ি) ও শামুকের প্রাচুর্য। আজ নদী-নালা ভরাট হয়ে গেছে, সবুজ প্রকৃতি ধ্বংসপ্রাপ্ত। প্রকৃতির এই বিপর্যয়ের সমান্তরালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার এবং মর্যাদাও আজ বিপন্ন। আজ জুম্মদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্মানটুকু যেন হারিয়ে গেছে; তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর অপপ্রচার। এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি।

 
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের বারুদ আর বুলেটের গন্ধ মাখা অধ্যায়ের অবসান ঘটেছিল। অবরুদ্ধ উপত্যকায় উঁকি দিয়েছিল এক চিলতে শান্তির রোদ। কিন্তু সেই রোদ্দুর স্থায়ী হতে দেয়নি পাহাড়েরই কিছু বিভ্রান্ত সন্তান। প্রসিত বিকাশ খীসা, রবিশঙ্কর চাকমা ও সঞ্চয় চাকমাদের নেতৃত্বে পাহাড়ি গণপরিষদ, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশনের একটি অংশ এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে মেনে নিতে পারেনি। তারা জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ আর ‘আত্মসমর্পণের’ কাল্পনিক অভিযোগ তুলে পাহাড়ের বুকে আবার অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দিল।
 
পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের চটকদার স্লোগান তুলে তারা যে রাজনীতির সূচনা করল, তা জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পরিবর্তে রূপ নিল নিজেদের ঘরের ভেতরেই এক আত্মঘাতী, রক্তক্ষয়ী সংঘাতে।
সেই বিরোধের আগুন শুধু মৌখিক আস্ফালনে সীমাবদ্ধ রইল না। অল্প সময়ের মধ্যেই পাহাড়ি জনপদ কেঁপে উঠল চেনা মানুষের বুলেটের শব্দে। শুরু হলো জুম্ম ভাইদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, হত্যা, গুম আর মুক্তিপণের বাণিজ্য।
 
১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, খাগড়াছড়ির স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ। যেখানে বুক ভরা আশা নিয়ে জুম্ম দামাল ছেলেরা অস্ত্র জমা দিচ্ছিল, সেখানেই নিরাপত্তার কঠোর প্রাচীর ভেদ করে কালো পতাকা আর ঘৃণার ব্যানার নিয়ে ঢুকে পড়েছিল পার্বত্য চুক্তিবিরোধীরা। প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদদ ছাড়া সেই সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করা কি আদৌ সম্ভব ছিল? ১৯৯৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাঘাইছড়ি হাইস্কুল মাঠ , ৪ মে ধুধুকছড়া এবং ১৯৯৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দেখেছিলাম কীভাবে ইতিহাসের নির্মম সাক্ষী হয়ে আমি নিজে দাঁড়িয়েছিলাম দীঘিনালা বড়াদম হাইস্কুল মাঠে, অস্ত্র জমাদান অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে শান্তিবাহিনীদের জুতার মালা প্রদর্শন ও চুক্তির সমর্থকদের ওপর ইটপাটকেল আর হিংস্র আক্রমণ চালানো হয়েছিল।
 
পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর এই চুক্তিবিরোধী অংশটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (ইউপিডিএফ) নামে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধিকারের নামে জন্ম নেওয়া পর শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত আর ভ্রাতৃহত্যার করা শুরু হয়।
 
জাতিসংঘের হাত ধরে ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর এক আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে 'আদিবাসী দিবস' পালনের বিষয়টি স্বীকৃতি লাভ করে। সেই থেকে প্রতি বছর ৯ আগস্ট পৃথিবীর প্রায় ৯০টি দেশে ৩৭০ বিলিয়ন মানুষ বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করে আসছে। বাংলাদেশেও ২০০৪ সাল থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ আদিবাসী এই দিনটিতে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়।
 
অথচ চিন্তার এক চরম দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পেল ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর, যেদিন ইউপিডিএফ-এর অংগ্য মারমা দাবি করে বসলেন (যুমনা টিভি সাক্ষাৎকার), ‘আদিবাসী’ শব্দ নাকি কেবলই এনজিওদের দেওয়া একটি 'টার্ম'! এর ধারাবাহিকতায়, ২০২৬ সালের ১৪ জুন এক অনলাইন আলোচনায় ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা যেভাবে জুম্ম জাতীয়তাবাদের মহানায়ক, আদিবাসীদের অধিকারের ধ্রুবতারা এম এন লারমার তীব্র ও কুৎসিত সমালোচনা করলেন, তাতে তাদের ভেতরের অন্ধকার রূপটি আর ঢাকা রইল না।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৯৯ সাল থেকেই ইউপিডিএফ তাদের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিল ১০ নভেম্বর ‘এম এন লারমা শহীদ দিবস’ পালন না করার। অথচ তারা এতদিন মিথ্যা অজুহাত দিয়ে আসছিল যে, ১০ নভেম্বর পালন করলে জেএসএস তাদের ওপর হামলা করে। আজ তাদের নেতা-কর্মীদের মুখ থেকেই জলছাপের মতো স্পষ্ট যে, তারা আসলে এম এন লারমার সেই কালজয়ী সাম্যবাদী ও অধিকার আদায়ের দর্শনকেই ধারণ করতে মানসিকভাবে নারাজ।
 
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা কেবল পাহাড়ি জুম্মদের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এই ভূখণ্ডের প্রতিটি শোষিত, লাঞ্ছিত এবং মেহনতি মানুষের অবিনাশী কণ্ঠস্বর। ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবর, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের খসড়া সংবিধানের ওপর দাঁড়িয়ে গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি যে ঐতিহাসিক বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা আজো বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়:
"মাননীয় স্পীকার সাহেব, ১৯৪৭ সালে কেউ কি চিন্তা করেছিলেন যে, পাকিস্তান ধ্বংস হয়ে যাবে? জনাব মোঃ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, 'Pakistan has come to stay'। নিয়তি অদৃষ্ট থেকে সেদিন নিশ্চয় উপহাস ভরে হেসেছিলেন। সেই পাকিস্তান অধিকার হারা বঞ্চিত মানুষের বুকের জ্বালায়, উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। ...পাকিস্তানের সময় দীর্ঘ ২৪ বছর পর্যন্ত একটি কথাও বলতে পারিনি। আমাদের অধিকারকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই অধিকার আমরা পেতে চাই, এই চাওয়া অন্যায় নয়। সেই অধিকার এই সংবিধানের মাধ্যমে দেওয়া হয়নি।"
 
তিনি বুকভাঙা কান্না আর ক্ষোভ নিয়ে বলেছিলেন, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আলোয় আজ সারা দেশ ঝলমল করে, কলকারখানা চলে; অথচ সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে উদ্বাস্তু করে, হাজার মানুষের জীবন বলি দিয়েও তাদের মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার দেওয়া হয়নি।
 
সংবিধানে পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাস ও অস্তিত্বকে অস্বীকার করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন:
"পার্বত্য চট্টগ্রাম হল বিভিন্ন জাতিসত্তার ইতিহাস। কেমন করে সেই ইতিহাস আমাদের সংবিধানের পাতায় স্থান পেল না, তা আমি ভাবতে পারি না। সংবিধান হচ্ছে এমন একটা ব্যবস্থা, যা অনগ্রসর জাতিকে, পিছিয়ে পড়া নির্যাতিত জাতিকে, অগ্রসর জাতির সংগে সমান তালে এগিয়ে নিয়ে আসার পথ নির্দেশ করবে। কিন্তু বস্তুতঃ পক্ষে এই পেশকৃত সংবিধানে আমরা সেই রাস্তার সন্ধান পাচ্ছি না।"
তিনি শুধু নিজের জাতির জন্য কাঁদেননি, তিনি সেদিন সংবিধানে অধিকার চেয়েছিলেন বাংলার কৃষক, শ্রমিক, মেথর, কামার, কুমার আর মাঝি-মাল্লাদের জন্য।
 
যে মানুষটি বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব মানবতার মঞ্চে শোষিত মানুষের অধিকারের কথা বলে গেছেন, সেই মহামানব এম এন লারমাকে আজ ইউপিডিএফ বা মাইকেল চাকমারা যেভাবে খাটো করার অপচেষ্টা করছেন, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও আত্মঘাতী। তাদের এই আচরণ প্রমাণ করে, তারা জুম্ম জনগণের মুক্তি চায় না, তারা চায় চিরস্থায়ী বিভেদ। তারা অধিকারের আলো চায় না, চায় পাহাড়ে বন্দুকের নলের অন্ধকার রাজত্ব বজায় রাখতে।
 
প্রকৃতির ভারসাম্য হারিয়ে গেলে যেমন পাহাড়ের বুক ভাসিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত প্লাবন আসে, তেমনি রাজনীতির আদর্শিক ভারসাম্য হারালে সমাজ ভেসে যায় ভ্রাতৃঘাতী রক্তে। জুম্ম জনগণের যদি এই বাংলার বুকে মাথা উঁচু করে, আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে হয়, তবে এই কৃত্রিম বিভেদ আর অস্ত্রের রাজনীতি ভুলে এম এন লারমার সেই মহান আদর্শ আর অসাম্প্রদায়িক শোষিত মানুষের লড়াইয়ের পতাকাতলে একত্রিত হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
৯ জুলাই ২০২৬ 

লাঙলের হাত থেকে কলমে: চাকমা আধুনিক সাহিত্যের মহীরুহ কবি মুকুন্দ চাকমা লেখা: ইনজেব চাঙমা

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি-পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা একটি যুগের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। তাঁদের জীবন, সাহিত্য এবং সংগ্রাম মিলেমিশে জাতিসত্তার ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়। কবি মুকুন্দ চাকমা তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি চাকমা ভাষার আধুনিক কাব্যধারার অন্যতম প্রধান নির্মাতা, মাতৃভাষার নিবেদিতপ্রাণ সাধক এবং পাহাড়ের মানুষের জীবনসংগ্রামের এক বিশ্বস্ত কথক।

চাকমা আধুনিক সাহিত্যের সূচনায় যে নামটি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তিনি স্বর্গীয় চুণীলাল দেওয়ান। তাঁর হাতে রোপিত আধুনিক সাহিত্যচর্চার চারাগাছকে দীর্ঘ সাধনা, সৃজনশীলতা এবং গভীর জীবনবোধ দিয়ে মহীরুহে রূপ দিয়েছেন কবি মুকুন্দ চাকমা। তাই তাঁকে যথার্থই চাকমা আধুনিক কবিতার দ্বিতীয় প্রধান পুরুষ বলা হয়।

১৯৩১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি বগা গোজার অন্তর্গত ধজ্যা গোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা অর্জুন চন্দ্র তালুকদার এবং মাতা শুভদ্রা চাঙমা। সহধর্মিণী নীলিমা চাঙমা। তাঁদের ছয় সন্তান—দেব জ্যোতি চাঙমা, পরিতোষ চাঙমা, জ্ঞানর আলো চাঙমা, অপরাজিতা চাঙমা, আলপনা চাঙমা এবং শতরূপা চাঙমা। পারিবারিক জীবন ও সাহিত্যসাধনার সমন্বয়ে তিনি এক আদর্শ মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।

ছাত্রজীবনেই তিনি মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ অনুভব করেন। চুণীলাল দেওয়ানের সাহিত্যচেতনা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু দেশভাগ-পরবর্তী অস্থিরতা তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে দেয়। জীবিকার প্রয়োজনে কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি কৃষিজীবনকেই আপন করে নেন। কিন্তু কৃষিকাজ কখনো তাঁর সাহিত্যচর্চার অন্তরায় হয়নি; বরং সেই জীবনই তাঁর কবিতার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।

কবি মুকুন্দ চাকমার সাহিত্য পড়লে বোঝা যায়, তিনি পাহাড়কে দূর থেকে দেখেননি; পাহাড়ের মাটি ছুঁয়ে, মানুষের সঙ্গে হেঁটে, প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করেই লিখেছেন। তাঁর কবিতায় ঝরনার সুর যেমন আছে, তেমনি আছে জুমচাষির ঘামের গন্ধ; আছে বনভূমির সবুজ, আবার আছে বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস।

কৃষক ও কবি—এই দুই পরিচয় তাঁর জীবনে পরস্পরের পরিপূরক। উন্নত কৃষি, বিশেষ করে ইরি ধানের চাষাবাদ নিয়ে তিনি গান, কবিতা ও নাটক রচনা করেন। এসব রচনা গ্রামীণ সমাজে কৃষি-সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর এই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৮ সালে দিঘীনালা থানা সার্কেল (উন্নয়ন) অফিস তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করে।

সাহিত্য তাঁর কাছে কখনো নিছক নান্দনিকতার অনুশীলন ছিল না; বরং মানুষের অধিকারের ভাষা। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জুম্ম জনগণের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁর কবিতা সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছিল। তাঁর দ্রোহমুখর কবিতা পাহাড়ি জনপদের মানুষের আত্মমর্যাদা ও অধিকারচেতনার শক্তিশালী ভাষ্যে পরিণত হয়েছিল।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় আসে ১৯৮৬ সালে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাঁকে নিজভূমি ছেড়ে শরণার্থীজীবন গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু নির্বাসন তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি। কাঁটাতারের ওপারেও তাঁর কলম থেমে থাকেনি। মাতৃভূমির স্মৃতি, বিচ্ছেদের বেদনা এবং প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতায় নতুন গভীরতা এনে দেয়। পরবর্তীকালে আগরতলায় তাঁর নির্বাসনপর্বের কবিতাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

ধর্মীয় সাহিত্যেও তাঁর অবদান পথিকৃৎসুলভ। দিঘীনালা বন বিহার থেকে চাকমা ভাষায় রচিত ‘ধর্মছদক’ গ্রন্থটি প্রথম ধর্মীয় সাহিত্যগ্রন্থ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। এছাড়া ‘পরিত্রাণ সূত্র’, ‘বুদ্ধের জীবন ও কাহিনী’, ‘নন্দপাল মহাথেরোর জীবনকথা’ এবং ‘প্রাণের মায়া’ গ্রন্থসমূহ চাকমা ভাষায় বৌদ্ধধর্মীয় সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

তবে তাঁর সাহিত্যজীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি নিঃসন্দেহে মহাকাব্য ‘হিলট্রেক্সর দুক সুক’। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, ইতিহাস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের এক বিশাল কাব্যিক দলিল এই মহাকাব্য। চাকমা সাহিত্যে এর গুরুত্ব কেবল একটি সাহিত্যকর্মের নয়; এটি এক জাতির স্মৃতি, ইতিহাস ও আত্মার ভাষ্য।

মুকুন্দ চাকমার সাহিত্য পাঠ করলে উপলব্ধি করা যায়, তিনি শব্দের অলংকার নির্মাণে যতটা আগ্রহী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়বদ্ধ ছিলেন মানুষের প্রতি। তাঁর রচনায় প্রকৃতির সৌন্দর্য যেমন আছে, তেমনি আছে সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; আছে ধর্মীয় চেতনা, আবার আছে মানবিকতার গভীর আহ্বান। এই বহুমাত্রিকতাই তাঁকে সমকাল অতিক্রম করে কালজয়ী করে তুলেছে।

তাঁর অসামান্য সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ (বর্তমান চাঙমা সাহিত্য একাডেমি) তাঁকে ‘নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য পদক–২০২৩’ প্রদান করে। এছাড়া চাঙমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীও তাঁকে সম্মাননা জানায়। এই সম্মান কেবল একজন কবিকে নয়, চাকমা ভাষা ও সাহিত্যকে আজীবন সমৃদ্ধ করে তোলা এক মহৎ সাধককে নিবেদিত শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আজ জীবনের অপরাহ্নে তিনি খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলার অঝাপাত স্কোয়ার সংলগ্ন মিলনপুর গ্রামের শান্ত পরিবেশে নিভৃতচারী জীবন কাটাচ্ছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকলেও তাঁর সৃষ্টি আজও নতুন প্রজন্মকে পথ দেখায়। কারণ সত্যিকারের কবির মৃত্যু হয় না; তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর শব্দে, তাঁর চিন্তায়, তাঁর জাতির স্মৃতিতে।

চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস যখনই লেখা হবে, মুকুন্দ চাকমার নাম সেখানে শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তিনি প্রমাণ করেছেন—একজন কৃষকের হাতেও যেমন লাঙল মানায়, তেমনি সেই হাতেই জন্ম নিতে পারে একটি জাতির আধুনিক সাহিত্যধারার শ্রেষ্ঠ কাব্য। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষই সবচেয়ে গভীর ভাষায় মানুষের কথা বলতে পারেন।

কবি মুকুন্দ চাকমা তাই কেবল একজন সাহিত্যিক নন; তিনি চাকমা জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক স্মৃতি, ভাষার অভিভাবক এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক সাহিত্য-জাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

অবক্ষয়ের পুঁজিকাল ও বিপন্ন মাতৃভাষা: এক অন্তর্দহন- ইনজেব চাঙমা


হৃদয়ের গহীন থেকে আজ এক তীব্র আর্তি ক্রমাগত চাবুক মারছে আমায়—"আমি আমার মাতৃভাষাকে কতটুকু ভালোবাসি?" এই প্রশ্ন যেন কোনো শান্ত নদী নয়, বরং এক অশান্ত মেঘের গর্জন, যা আমার আত্মসত্তাকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। ভাষা তো কেবল শুষ্ক ঠোঁটের কোনো যান্ত্রিক কথন নয়, কিংবা নয় কেবল দুটি মানুষের মাঝে আলগা যোগাযোগের সেতু। ভাষা হলো একটি জাতির শতাব্দীর রক্ত দিয়ে চেনা রূপ, তার ললাটের তিলক এবং তার অস্তিত্বের পরম আশ্রয়। অথচ আজ এই ঘোর কলিকালে, এই সর্বগ্রাসী পুঁজিতান্ত্রিক বাস্তবতায় আমরা আমাদের সেই পরম আশ্রয়কেই হারিয়ে ফেলছি। চাকমা তথা জুম্ম জাতির অন্তহীন উদাসীনতা আজ আমাদের সেই গৌরবের ইতিহাসকে এক চরম অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।

আমাদের এই তথাকথিত মাতৃভাষা প্রীতির স্বরূপ যেন আমাদেরই এক চিরন্তন চাঙমা প্রবাদের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক নির্মম পরিহাস:

"কোচপাং কলে গালত পরে, কোচ ন পাং কলেও গালত পরে।" (ভালোবাসি বললেও চড় খেতে হয়, না বললেও চড় খেতে হয়।)

আমরা আজ এক অদ্ভুত দ্বিমুখী চেতনার দোলাচলে দুলছি। হৃদয়ে ভাষা-প্রেমের অভিনয় করছি ঠিকই, কিন্তু সত্যকে বরণ করার সাহস হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের এই মেকি ভালোবাসার রূপটি যেন আমাদেরই আরেক টুকরো লোকগাথার মতো—

"পধত পেলুং লাঙ, তাপ্পে-তুপ্পায় যাঙ।" (পথের মাঝে প্রেয়সীকে পেয়ে ক্ষণিক সোহাগ ছড়ানো, আর সে চোখের আড়াল হতেই তাকে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে দেওয়া।)

আমরাও ভাষার সাথে ঠিক এই ক্ষণিকের চপল প্রেমিকের মতোই আচরণ করছি। উৎসবের মঞ্চে বা সস্তা আবেগের মুহূর্তে আমরা ভাষার চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করি, কিন্তু দিনশেষে তাকে অবহেলা আর বিস্মৃতির ধূসর ধুলোয় ফেলে রেখে আপন সার্থান্বেষণে মগ্ন হই।

আজকের এই স্বর্ণ যুগে মানুষের বিবেক আর মূল্যবোধ যেন বাঁধা পড়েছে অর্থের নিগড়ে। যেখানে বস্তুগত লাভ নেই, সেখানে মানুষ আজ বড় বেশি নিঃস্পৃহ। আমাদের সমাজজীবনের এক নগ্ন সত্য আজ চোখের সামনে ভেসে ওঠে:

১।  কোনো এক এনজিও যখন সভা কিংবা সেমিনারের ডাক দেয়, তখন মানুষের ঢল নামে। যেন এক বসন্তের কোকিলের মেলা! কারণ সেখানে মিলবে যাতায়াত ভাতা আর উপাদেয় চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়।

২।  অথচ, যদি কোনো দরদী মানুষ নিঃস্বার্থভাবে সমাজের বা ভাষার সত্যিকার পুনর্জাগরণের জন্য একটি সভার আহ্বান করেন, তবে দেখা যায় সেই শূন্য প্রাঙ্গণে কেবল আহ্বানকারী একাকী দাঁড়িয়ে আছেন নিজের দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে। কারণ সেখানে কোনো নগদ প্রাপ্তি নেই।

হায়! আজ আমাদের প্রাণের ভাষার ভাগ্যাকাশও এই একই কুয়াশায় আচ্ছন্ন। যে ভাষা পরম মমতায় আমাদের শৈশবকে রাঙিয়েছিল, আজ পুঁজির বাজারে তার কোনো বিনিময় মূল্য নেই। যে ভাষা দিয়ে অর্থ বা প্রতিপত্তি অর্জন করা যায় না, এই বাণিজ্যিক দুনিয়ায় তা যেন এক অচল আধুলি। অর্থের অভাবে আজ আমাদের প্রাণের ভাষাও আমাদের কাছে মূল্যহীন, ব্রাত্য!

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—"অধিকার স্বত্বে যে জাতি উদাসীন, তার অস্তিত্ব মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে বাধ্য।" ভাষার অধিকার কখনো যাযাবরের মতো যাচ্ঞা করে পাওয়া যায় না, তা ছিনিয়ে নিতে হয়। ভাষার এই পরম মাধুর্য আর তার গুরুত্ব কেবল বাঙালি জাতি অনুধাবন করতে পেরেছিল। তাই ১৯৫২-র ফাল্গুনে তারা রাজপথ রাঙিয়েছিল বুকের তাজা রক্তে। রক্তের বিনিময়ে তারা কিনেছিল তাদের মায়ের মুখের বুলি।

আজ যদি আমরা, জুম্মরা, আমাদের ভাষার সেই মহিমান্বিত রূপ আর তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে বুঝতাম, তবে আমাদের এই দূরবস্থায় উপনীত হতে হতো না। আমাদের নিজস্ব সমৃদ্ধ বর্ণমালা থাকা সত্ত্বেও আজ আমাদের এই চরম মানসিক দৈন্যতা যে, নিজেদের ভাষার আঙিনায় আমরা আজ পরবাসী! আজ আমাদের লজ্জিত মস্তকে অন্যকে শুধাতে হয়—"অতিথি"-কে আমাদের ভাষায় কী বলে? কিংবা "অমুক" শব্দের প্রকৃত চাকমা প্রতিশব্দটি কী? এর চেয়ে বড় আত্মগ্লানি আর কী হতে পারে!

মহাকাল এখনো আমাদের সম্পূর্ণ গ্রাস করেনি, ছাইয়ের নিচে এখনো কিছু জ্বলন্ত অঙ্গার বাকি আছে। শুধু অন্তঃসারশূন্য আবেগ দিয়ে কিংবা চারু বাক্যের মায়াজাল বুনে একটি বিপন্ন ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন ত্যাগ, সাধনা আর শেকড়ের প্রতি অবিচল আনুগত্য।

তাই আসুন, এই মোহনিদ্রা আর আত্মকেন্দ্রিকতার দেয়াল ভেঙে ফেলি। "নিজর গারখ্যে দর গরি" আমরা বেরিয়ে পড়ি দিক-দিগন্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে। আমাদের নিজস্ব বর্ণমালার গৌরব, আমাদের সংস্কৃতির সুবাস ছড়িয়ে দিই প্রতিটি জুম্ম সন্তানের হৃদয়ে। মাতৃভাষাকে কেবল মুখের ভাষা নয়, তাকে করে তুলি আমাদের বেঁচে থাকার হাতিয়ার ও প্রতিবাদের ভাষা। তবেই রক্ষা পাবে আমাদের জাতিসত্তা, তবেই সার্থক হবে আমাদের এই পৃথিবীতে জুম্ম হিসেবে বেঁচে থাকা।

 

 

ক্ষতবিক্ষত পাহাড়ের আর্তনাদ ও মুক্তির অন্বেষণ- ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম, বহু যুগ ধরে এক অসুস্থ, ক্ষতবিক্ষত জনপদ। এই ভূখণ্ডের ক্ষত কেবল উপশম হয়নি, সময়ের নির্মম আবর্তে তা আরও গভীর, আরও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। স্মৃতির পাতা উল্টালে দেখি এক দুঃসহ কাল—যখন পাহাড়ের মানুষকে দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগেই রাতের আহার সেরে নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করতে হতো। নিস্তব্ধ রজনীতে কুকুরের করুণ আর্তনাদও বুকের রক্ত হিম করে দিত। ভয়ের সেই করাল গ্রাসে দিনকে মনে হতো দীর্ঘ এক যুগ, আর রাতকে মনে হতো অন্তহীন এক শতাব্দী। চারিদিকে কেবল থমথমে, নিস্পৃহ নীরবতা। তখন পাহাড়ের সরল প্রাণের কাছে চিরস্থায়ী আতঙ্কের প্রতিশব্দ ছিল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর সেটেলার বাঙালি।

ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সেই ভয়ের রাজত্বে কিছুটা হলেও স্বস্তির হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল। মানুষ আগের চেয়ে শিক্ষা-দীক্ষায় মন দিতে পেরেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে পা বাড়িয়েছে, যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। কেউ কেউ ইট-কাঠের সুন্দর ঘর তুলেছে, অথচ জনসংখ্যার বিশাল অংশ আজও মৌলিক অধিকারের ন্যূনতম স্পর্শ থেকে বঞ্চিত। তবু স্বাধীনতা-উত্তর রক্তাক্ত অধ্যায়ের তুলনায় চুক্তি-পরবর্তী সময় নগণ্য হলেও জুম্ম জনগণের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছিল।

কিন্তু ইতিহাসের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! পার্বত্য চুক্তিকে মনঃপূত না করে পাহাড়ের বুক চিরে জন্ম নিল ইউপিডিএফ। দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের পর শান্তি বাহিনীর জীর্ণ-ক্লান্ত যোদ্ধারা যখন বন্দুক রেখে সন্তান-পরিজন নিয়ে একটু শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাইলেন, ঠিক তখনই ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’-এর চটকদার স্লোগান তুলে রণক্লান্ত সেই মানুষগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল চুক্তি-বিরোধী এই সংগঠন। সূচনা হলো জুম্ম জাতীয় জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও করুণ অধ্যায়—ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়।
গত ২৮ বছরে এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে কত শত মেধাবী তরুণের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে, কতজনকে অন্ধকার কারাকক্ষে দিন গুনতে হয়েছে, তার নির্ভুল হিসাব মেলানো আজ দুষ্কর। কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, কত বাবার ভবিষ্যৎ অঙ্কুরেই ঝরে গেছে, কত সন্তান মাথার উপর থেকে শেষ ছায়াটুকুও হারিয়েছে। মুক্তির নামে বয়ে যাওয়া এই রক্তগঙ্গা ২৮টি বসন্ত পেরিয়েও থামেনি।

আজ আমার লেখার কারণে আমাকে বারবার অভিযুক্ত করা হয়, আমি নাকি কেবল ইউপিডিএফ-এর অন্ধ সমালোচক। শুধু অভিযোগ নয়, আমার প্রতিটি পোস্টে জমা হয় কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য আর নানাবিধ হুমকি, যা কোনো সভ্য সমাজে কাম্য নয়। আমাকে ‘জেএসএস’ তকমা দিয়ে খোঁজা হয় আমি কোন শাখার কর্মী। মূলত এই ভুল ধারণার অবসান ঘটাতেই আমার এই লেখা।

আমি কেন ইউপিডিএফ-এর সমালোচনা করি-
১। যে ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে সংগঠনটির জন্ম, ২৮টি বছর পেরিয়েও তারা সরকারের ওপর কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। ২০২২ সালের ৯ জুন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলামের হাতে একটি দাবিনামা তুলে দেওয়া ছাড়া দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক অর্জন নেই।
২। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে স্কুলপড়ুয়া কোমলমতি শিশুদের রাস্তায় নামিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করানো, অশালীন ভাষার প্ল্যাকার্ড-স্লোগান শেখানো—এটি কোনো রাজনৈতিক সচেতনতা নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে সহিংসতা ও ঘৃণার বীজ বপন করা। আমরা তো চিরকাল শিখে এসেছি, সন্তানের সামনে মা-বাবা ঝগড়া করে না। অথচ এখানে রাজনীতির নামে শিশুমনে হিংসা ও ধ্বংসের বিষ ঢালা হচ্ছে।

অন্যদিকে জেএসএস চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশ-বিদেশে একঝাঁক মুক্তিপাগল মানুষকে নিয়ে নিরলস কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর জাতিসংঘের অধিবেশনে পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়নসহ অধিকারহারা মানুষের পক্ষে তারা সোচ্চার হচ্ছে।

জেএসএস যে ভুলের ঊর্ধ্বে বা ধোয়া তুলসীপাতা, তা বলছি না। কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে বড় কাজ করতে গেলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা অপরাধ নয়—অনিবার্য মূল্য। একটি বিশাল বটবৃক্ষের নিচে অন্য চারাগাছ সহজে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। বটগাছটি হয়তো তা জানে। কিন্তু সে এও জানে, তার একটি মহাজাগতিক দায় আছে—তার ডালে হাজারো পাখি বাসা বাঁধবে, ফল খেয়ে জীবন বাঁচাবে, আর ক্লান্ত পথিক তার ছায়ায় এসে দেহ-মন জুড়াবে।

আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, পাহাড়ের প্রতিটি মানুষই ‘মুক্তিপাগল’। কিন্তু শুধু মুখে বড় বড় বুলি আর ফাঁকা স্লোগানে মুক্তি আসে না। বুদ্ধ বলে গেছেন—“দুঃখ যেমন আছে, দুঃখমুক্তির উপায়ও আছে।” বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় পার্বত্য চুক্তির কথা বলা এবং এর পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করা ছাড়া পাহাড়ের মানুষের অধিকার আদায়ের আর কোনো যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবসম্মত পথ নেই।

তাই ইউপিডিএফ-এর বন্ধুদের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, তুচ্ছ ও ভিত্তিহীন ইস্যু নিয়ে ব্যক্তি-বিদ্বেষ ছড়াবেন না, হুমকি-ধমকির সংস্কৃতি বন্ধ করুন। নিজেদের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এবং মিশন-ভিশন নিয়ে নির্মোহ আত্মসমালোচনা করুন। এতে দল, দেশ ও জাতি, সবারই মঙ্গল হবে। যারা সত্যিকার অর্থে সমাজের জন্য কাজ করেন, তারা জানেন পার্বত্য চুক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং এর বাস্তবায়ন কতটা জরুরি।

এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের। আমার এই সত্য উচ্চারণ ও লেখনীর পর আপনারা আমাকে কোন কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন? জাত-বিরোধী, নাকি দালালের তকমা দেবেন? আমি কেবল সত্য ও বাস্তবতার পক্ষে দাঁড়ানো এক নিঃসঙ্গ বন্দা।

চুক্তির পরবর্তী ২৮ বছরের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত আমাদের কী দিয়েছে? দিয়েছে শুধু লাশের মিছিল, মা-বোনের আহাজারি আর মেধার অপচয়। পূর্ণস্বায়ত্তশাসন হোক বা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, লক্ষ্য যাই হোক, যদি তার পথ রচিত হয় ভাইয়ের রক্তে, তবে সে মুক্তি কার জন্য?

পাহাড়কে আর রক্তাক্ত করবেন না। আত্মসমালোচনার আয়নায় নিজেদের দেখুন। কারণ পাহাড়ের প্রতিটি পাথর আজও ফিসফিস করে বলে, “চুক্তি বাস্তবায়নই শেষ কথা”।

শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬

𑄘𑄬𑄠𑄣𑄧𑄖𑄴 𑄛𑄨𑄖𑄴 𑄝𑄎𑄚 𑄃 𑄎𑄧𑄚𑄴 𑄖𑄳𑄢𑄨𑄛𑄪𑄢 𑄃𑄪𑄌𑄴𑄇𑄢𑄨: 𑄃𑄨𑄚𑄴𑄎𑄬𑄝𑄴 𑄌𑄋𑄴𑄟


"𑄡𑄬 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨𑄖𑄳𑄠𑄭 𑄣𑄮 𑄘𑄨𑄣𑄧𑄁, 𑄡𑄬 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨𑄖𑄳𑄠𑄭 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨 𑄝𑄦𑄨𑄚𑄩 𑄎𑄧𑄚𑄧𑄟𑄴 𑄦𑄧𑄠𑄬, 𑄡𑄬 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨𑄖𑄳𑄠𑄭 𑄦𑄖𑄳𑄠𑄢𑄴 𑄎𑄧𑄟 𑄘𑄨𑄠𑄳𑄠 𑄦𑄧𑄠𑄬 𑄥𑄬 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨 𑄃𑄢𑄴 𑄛𑄢𑄴𑄝𑄧𑄖𑄳𑄠𑄧 𑄌𑄧𑄑𑄴𑄧𑄉𑄳𑄢𑄟𑄴 𑄚𑄧 𑄗𑄬𑄝𑄧𑅁 𑄥𑄬𑄚𑄬 𑄇𑄧𑄋𑄧𑄢𑄴, 𑄃𑄃𑄮𑄏𑄮𑄢𑄴 𑄝𑄁𑄣𑄘𑄬𑄌𑄴, 𑄃𑄃𑄮𑄏𑄮𑄢𑄴, 𑄝𑄋𑄣𑄨 𑄃 𑄛𑄦𑄢𑄨 𑄥𑄧𑄟𑄧𑄎𑄳𑄠𑄃𑄪𑄚𑄴, 𑄌𑄮𑄇𑄴 𑄟𑄬𑄣𑄨 𑄢𑄨𑄚𑄨 𑄌𑄧𑅁 𑄌𑄮𑄇𑄴 𑄟𑄨𑄣𑄨 𑄢𑄨𑄚𑄨 𑄌𑄬𑄝𑄢𑄴 𑄃𑄧𑄇𑄴𑄖𑄧 𑄃𑄬𑄥𑄳𑄠𑄬𑅁”

𑄉𑄬𑄣𑄴𑄬 𑄸𑄹 𑄎𑄪𑄚𑄴 𑄸𑄶𑄸𑄼, 𑄝𑄚𑄴𑄘𑄧𑄢𑄴𑄝𑄚𑄴 𑄣𑄟 𑄃𑄪𑄛𑄧𑄎𑄬𑄣 𑄚𑄎𑄨𑄢𑄟𑄴 𑄖𑄳𑄢𑄨𑄛𑄪𑄢 𑄃𑄘𑄟𑄧𑄖𑄴 𑄎𑄪𑄟𑄴𑄧𑄃𑄪𑄚𑄧𑄢𑄴 𑄎𑄉 𑄝𑄬𑄘𑄧𑄋𑄧𑄣𑄴, 𑄦𑄟𑄴𑄣 𑄃 𑄃𑄉𑄪𑄚𑄴 𑄝𑄎𑄬 𑄘𑄬𑄚 𑄥𑄪𑄠𑄮𑄣𑄬 𑄎𑄪𑄉𑄧𑄣𑄨𑄠𑄬 𑄃𑄬𑄉𑄧𑄖𑄴𑄧𑄢𑄨 𑄈𑄧𑄣𑄝𑄮𑄖𑄴 𑄃𑄬 𑄇𑄧𑄙 𑄇𑄮𑄃𑄨𑄠𑄬 𑄉𑄝𑄧𑄎𑄳𑄠 𑄃𑄬𑄃𑄮𑄎𑄨 𑄎𑄧𑄚𑄴 𑄖𑄳𑄢𑄨𑄛𑄪𑄢𑄘𑄊𑄨𑅁 𑄖 𑄃𑄬 𑄇𑄧𑄙𑄖𑄴 𑄝𑄚 𑄥𑄪𑄘𑄪𑄢𑄪𑄋𑄮 𑄥𑄪𑄠𑄮𑄣𑄴 𑄚𑄧𑄠𑄴, 𑄣𑄟𑄴𑄝 𑄖𑄨𑄚𑄴 𑄘𑄧𑄥𑄧𑄇𑄧𑄢𑄴 𑄇𑄠𑄴 𑄇𑄪𑄠𑄴 𑄡𑄬 𑄛𑄢𑄴𑄝𑄧𑄖𑄳𑄠𑄧 𑄌𑄧𑄑𑄴𑄧𑄉𑄳𑄢𑄟𑄴 𑄌𑄪𑄇𑄴𑄖𑄨 𑄝𑄥𑄴𑄖𑄧𑄝𑄠𑄧𑄚𑄴 𑄚𑄧 𑄦𑄧𑄚𑄖𑄳𑄠𑄭 𑄃𑄬𑄌𑄳𑄠𑄬 𑄛𑄦𑄢𑄧𑄖𑄴 𑄎𑄪𑄟𑄴𑄧 𑄍𑄖𑄳𑄢𑄧-𑄉𑄝𑄪𑄎𑄳𑄠 𑄛𑄨𑄢𑄨𑄃𑄪𑄚𑄧𑄢𑄴 𑄎𑄧𑄟 𑄦𑄧𑄠𑄬 𑄢𑄇𑄴, 𑄝𑄧 𑄚𑄨𑄏𑄬𑄌𑄴 𑄃 𑄖𑄪𑄢𑄴 𑄖𑄇𑄴𑄖𑄇𑄳𑄠𑄬 𑄝𑄢𑄪𑄎𑄧𑄢𑄴 𑄝𑄮𑄟𑄴 𑄜𑄘𑄚𑅁 
 
𑄷𑄿𑄿𑄽 𑄥𑄣𑄧𑄖𑄴 𑄸 𑄓𑄨𑄥𑄬𑄟𑄴𑄝𑄧𑄢𑄴 𑄥𑄇𑄴𑄈𑄧𑄢𑄴 𑄦𑄧𑄠𑄬 𑄥𑄬 𑄝𑄨𑄎𑄧𑄇𑄴 𑄝𑄚𑄬𑄠𑄳𑄠 𑄌𑄪𑄇𑄴𑄖𑄨 𑄃𑄬𑄡𑄧 𑄖𑄧𑄎𑄨𑄟𑄧𑄛𑄪𑄢𑄴 𑄉𑄧𑄢𑄨 𑄛𑄳𑄦𑄧𑄢𑄧 𑄟𑄪 𑄚𑄧 𑄘𑄬𑄊𑄬𑅁 𑄞𑄫𑄟𑄨 𑄇𑄧𑄟𑄨𑄥𑄧𑄚𑄴 𑄇𑄟𑄴 𑄉𑄧𑄢𑄨 𑄚𑄧 𑄛𑄢𑄚 𑄃𑄧𑄚𑄴𑄥𑄪𑄢𑄴 𑄚𑄨𑄎𑄧 𑄊𑄧𑄢𑄴𑄛𑄘 𑄎𑄉𑄖𑄴𑄪𑄚𑄴 𑄣𑄪𑄢𑄨 𑄛𑄘𑄧𑄚𑄴 𑄎𑄪𑄟𑄴𑄧𑄃𑄪𑄚𑄬𑅁 𑄃𑄬𑄙𑄧𑄇𑄳𑄠𑄬 𑄎𑄨𑄠𑄮𑄖𑄨𑄠𑄮 𑄘𑄨𑄚𑄴 𑄟𑄙𑄚𑄧𑄖𑄴 𑄎𑄧𑄚𑄴 𑄖𑄳𑄢𑄨𑄛𑄪𑄢𑄘𑄊𑄨 𑄛𑄧𑄢𑄇𑄴 𑄛𑄧𑄢𑄇𑄴 𑄉𑄧𑄢𑄨 𑄞𑄋𑄨 𑄇𑄧𑄣𑄇𑄴- 

"𑄃𑄬 𑄣𑄬𑄊 𑄛𑄢 𑄃𑄟𑄢𑄬 𑄇𑄟𑄴 𑄚𑄧 𑄘𑄨𑄝𑄧, 𑄃𑄬 𑄖𑄬𑄋 𑄛𑄧𑄠𑄴𑄎𑄳𑄠 𑄇𑄟𑄴 𑄚𑄧 𑄘𑄨𑄝𑄧𑅁 𑄃𑄬 𑄝𑄨𑄣𑄴𑄓𑄨𑄋𑄧𑄖𑄴 𑄇𑄟𑄴 𑄚𑄧 𑄘𑄨𑄝𑄧 𑄃𑄬 𑄥𑄧𑄟𑄴𑄛𑄧𑄖𑄴𑄨 𑄇𑄟𑄴 𑄚𑄧 𑄘𑄨𑄝𑄧𑅁 𑄡𑄨𑄠𑄧𑄚𑄧𑄖𑄳𑄠 𑄃𑄟𑄨 𑄥𑄧𑄟𑄴𑄛𑄧𑄖𑄴𑄨 𑄖𑄧𑄉𑄬𑄢𑄴, 𑄥𑄬 𑄥𑄧𑄟𑄴𑄛𑄧𑄘𑄴 𑄡𑄪𑄚𑄨 𑄢𑄥𑄴𑄑𑄳𑄢𑄧, 𑄘𑄬𑄌𑄴, 𑄥𑄧𑄢𑄧𑄇𑄢𑄴 𑄢𑄧𑄈𑄳𑄠𑄬 𑄉𑄧𑄢𑄨 𑄚𑄧 𑄛𑄢𑄬, 𑄟 𑄝𑄮𑄚𑄪𑄚𑄧𑄢𑄬 𑄃𑄬 𑄃𑄭𑄚𑄴 𑄥𑄳𑄢𑄨𑄋𑄴𑄈𑄧𑄣 𑄝𑄦𑄨𑄚𑄨 𑄢𑄧𑄈𑄳𑄠𑄬 𑄉𑄧𑄢𑄨 𑄚𑄧 𑄛𑄢𑄬 𑄥𑄣𑄬𑄚𑄴 𑄥𑄬 𑄃𑄭𑄚𑄴 𑄥𑄳𑄢𑄨𑄋𑄴𑄈𑄧𑄣 𑄃𑄟𑄨 𑄚𑄧 𑄌𑄬𑄃𑄨𑅁 𑄃𑄟𑄨 𑄚𑄨𑄎𑄧𑄢𑄴 𑄚𑄨𑄢𑄛𑄧𑄖𑄴𑄖 𑄚𑄨𑄎𑄬 𑄘𑄨𑄝𑄧𑄁𑅁 𑄥𑄨𑄠𑄚𑄴 𑄡𑄪𑄚𑄨 𑄝𑄬𑄛𑄧𑄙𑄬 𑄦𑄧𑄠𑄴, 𑄥𑄨𑄠𑄚𑄴 𑄡𑄪𑄚𑄨 𑄃𑄧𑄉𑄧𑄚𑄧𑄖𑄳𑄢𑄚𑄴𑄖𑄳𑄢𑄨𑄇𑄴 𑄛𑄧𑄙𑄬 𑄦𑄧𑄠𑄴 𑄃𑄟𑄨 𑄥𑄨𑄠𑄚𑄴 𑄉𑄧𑄢𑄨𑄝𑄢𑄴 𑄎𑄪𑄉𑄧𑄣𑄴 𑄃𑄊𑄨𑅁” 

𑄎𑄧𑄚𑄴 𑄖𑄳𑄢𑄨𑄛𑄪𑄢𑄘𑄊𑄨𑄢𑄴 𑄃𑄬 𑄇𑄧𑄙 𑄃𑄟 𑄢𑄥𑄴𑄑𑄳𑄢𑄧 𑄃 𑄥𑄧𑄟𑄏𑄧𑄖𑄳𑄠𑄭 𑄘𑄋𑄧𑄢𑄴 𑄃𑄪𑄌𑄴𑄇𑄢𑄨 𑄇𑄧𑄙𑅁 𑄡𑄧𑄇𑄳𑄠𑄬 𑄃𑄬𑄇𑄴𑄮 𑄌𑄉𑄣 𑄟𑄚𑄬𑄃𑄨𑄃𑄪𑄚𑄬 𑄚𑄨𑄎𑄧𑄢𑄴 𑄟𑄯𑄣𑄨𑄇𑄴 𑄚𑄨𑄢𑄛𑄧𑄖𑄴𑄖 𑄃 𑄌𑄁𑄥𑄢 𑄢𑄧𑄈𑄳𑄠𑄬𑄢𑄴 𑄃𑄭𑄚𑄨 𑄃 𑄉𑄧𑄕𑄧𑄖𑄚𑄴𑄖𑄳𑄢𑄨𑄇𑄴 𑄙𑄧𑄉𑄧𑄢𑄴 𑄃𑄪𑄉𑄪𑄢𑄬 𑄝𑄨𑄌𑄳𑄠𑄬𑄌𑄴 𑄦𑄎𑄨 𑄜𑄬𑄣𑄚𑄴, 𑄥𑄧𑄇𑄴𑄬 𑄥𑄨𑄠𑄚𑄴 𑄉𑄮𑄘 𑄘𑄬𑄏𑄧𑄢𑄴 𑄃𑄧𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨 𑄟𑄪𑄠𑄮𑄖𑄴 𑄛𑄧𑄢𑄨 𑄡𑄠𑄴𑅁 
 
𑄝𑄬𑄉𑄧𑄖𑄴𑄪𑄚𑄴 𑄝𑄬𑄌𑄴 𑄘𑄧𑄢𑄴𑄉𑄧𑄢𑄬 𑄛𑄮𑄃𑄨𑄘𑄳𑄠𑄚𑄴 𑄦𑄧𑄣𑄧𑄘𑄬 𑄥𑄧𑄚𑄴𑄖𑄪 𑄣𑄢𑄴𑄟 𑄚𑄧 𑄗𑄬𑄣𑄬 𑄃𑄬 𑄟𑄪𑄢𑄪𑄣𑄳𑄠 𑄌𑄉𑄣 𑄚𑄨𑄚𑄬𑄃𑄨 𑄖𑄢𑄴 𑄃𑄉𑄗𑄳𑄠 𑄃𑄪𑄌𑄴𑄇𑄢𑄨𑅁 𑄎𑄧𑄚𑄴 𑄖𑄳𑄢𑄨𑄛𑄪𑄢 𑄃𑄢𑄧 𑄇𑄧𑄣𑄴-

"𑄖𑄮𑄟𑄢𑄬 𑄃𑄪𑄌𑄴 𑄘𑄪𑄋𑄮𑄢𑄴, 𑄥𑄧𑄚𑄴𑄖𑄪 𑄣𑄢𑄴𑄟 𑄡𑄪𑄚𑄨 𑄟𑄪𑄢𑄨 𑄡𑄠𑄴 𑄥𑄧𑄇𑄴𑄬 𑄛𑄢𑄴𑄝𑄧𑄖𑄳𑄠𑄧 𑄌𑄧𑄑𑄴𑄧𑄉𑄳𑄢𑄟𑄴 𑄇𑄨 𑄙𑄧𑄇𑄴 𑄃𑄧𑄞𑄧 𑄥𑄧𑄇𑄳𑄠𑄬 𑄖𑄬 𑄖𑄪𑄟𑄨 𑄝𑄪𑄏𑄨 𑄛𑄢𑄨𑄝𑅁 𑄃𑄬 𑄥𑄧𑄚𑄴𑄖𑄪 𑄣𑄢𑄴𑄟𑄖𑄳𑄠𑄭 𑄃𑄬𑄌𑄳𑄠𑄬 𑄛𑄢𑄴𑄝𑄧𑄖𑄳𑄠𑄧 𑄌𑄧𑄑𑄴𑄧𑄉𑄳𑄢𑄟𑄴 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨 𑄗𑄨𑄘𑄧 𑄃𑄊𑄬𑅁 𑄡𑄬𑄘𑄨𑄚𑄴 𑄥𑄧𑄚𑄴𑄖𑄪 𑄣𑄢𑄴𑄟 𑄟𑄪𑄢𑄨 𑄡𑄬𑄝𑄧 𑄥𑄬𑄘𑄨𑄚𑄴 𑄘𑄨𑄊𑄨𑄝 𑄃𑄬 𑄛𑄢𑄴𑄝𑄧𑄖𑄳𑄠𑄧 𑄌𑄧𑄑𑄴𑄧𑄉𑄳𑄢𑄟𑄴 𑄃𑄢𑄴 𑄇𑄢𑄧𑄢𑄴 𑄦𑄚𑄴𑄎𑄟𑄬 𑄚𑄧 𑄗𑄬𑄝𑄧𑅁 𑄥𑄧𑄇𑄴𑄬 𑄝𑄪𑄏𑄨𑄝 𑄃𑄬 𑄝𑄁𑄣𑄟𑄬𑄌𑄴 𑄇𑄨 𑄝𑄧𑄎𑄧𑄁 𑄉𑄧𑄌𑄴𑄍𑄬𑅁 ….. 𑄝𑄎𑄳𑄠𑄬 𑄚𑄧 𑄗𑄇𑄴𑄮 𑄥𑄧𑄚𑄴𑄖𑄪 𑄣𑄢𑄴𑄟 𑄟𑄢𑄚𑄢𑄴𑅁 𑄃𑄨𑄠𑄚𑄴 𑄝𑄧𑄎𑄧𑄁 𑄇𑄟𑄴𑅁 𑄖𑄬 𑄝𑄎𑄨 𑄗𑄇𑄴𑄬 𑄃𑄟𑄢𑄴 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨 𑄗𑄨𑄘𑄧 𑄉𑄧𑄢 𑄛𑄧𑄢𑄨𑄝𑄧𑅁 𑄡𑄪𑄚𑄨 𑄖𑄬 𑄟𑄪𑄢𑄨 𑄡𑄠𑄴 𑄛𑄢𑄴𑄝𑄧𑄖𑄳𑄠𑄧 𑄌𑄧𑄑𑄴𑄧𑄉𑄳𑄢𑄟𑄴 𑄃𑄢𑄴 𑄇𑄧𑄚𑄧 𑄘𑄨𑄚𑄴 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨 𑄚𑄧 𑄃𑄧𑄞𑄧𑅁”

𑄃𑄬 𑄉𑄝𑄪𑄎𑄳𑄠 𑄌𑄬𑄣𑄝𑄮 𑄇𑄧𑄙𑄚𑄴 𑄛𑄮𑄖𑄴𑄛𑄮𑄖𑄳𑄠 𑄉𑄧𑄢𑄨 𑄜𑄪𑄘𑄨 𑄃𑄪𑄘𑄬, 𑄟𑄪𑄢𑄪𑄣𑄳𑄠 𑄌𑄉𑄣𑄖𑄴 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨 𑄃𑄬𑄡𑄧 𑄟𑄮𑄢𑄴𑄟𑄮𑄎𑄳𑄠 𑄥𑄪𑄘𑄧𑄣𑄮𑄃𑄨 𑄖𑄋𑄬𑄠𑄳𑄠 𑄃𑄊𑄬𑅁 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨𑄝𑄦𑄨𑄚𑄩𑄃𑄪𑄚𑄬 𑄦𑄖𑄳𑄠𑄢𑄴 𑄎𑄧𑄟 𑄘𑄬𑄚 𑄛𑄧𑄢𑄴 𑄃𑄬𑄌𑄳𑄠𑄬 𑄥𑄧𑄁 𑄸𑄿 𑄝𑄧𑄏𑄧𑄢𑄴 𑄞𑄨𑄘𑄨 𑄉𑄬𑄣𑄬𑄠𑄳𑄠𑄧 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨 𑄦𑄞 𑄚𑄧 𑄜𑄨𑄢𑄚𑄠𑄴 𑄉𑄝𑄪𑄎𑄳𑄠𑄃𑄪𑄚𑄴 𑄛𑄨𑄖𑄴 𑄘𑄬𑄠𑄣𑄧𑄖𑄴 𑄦𑄞𑄪𑄎𑄳𑄠𑅁 𑄎𑄧𑄚𑄴 𑄖𑄳𑄢𑄨𑄛𑄪𑄢 𑄥𑄧𑄢𑄴𑄇𑄢𑄧𑄢𑄬 𑄃𑄪𑄌𑄴 𑄘𑄨𑄚𑄬𑄃𑄨 𑄇𑄧𑄣𑄧, 𑄃𑄬 𑄃𑄧𑄇𑄴𑄖𑄧𑄖𑄴 𑄛𑄢𑄴𑄝𑄧𑄖𑄳𑄠𑄧 𑄌𑄧𑄑𑄴𑄧𑄉𑄳𑄢𑄟𑄧𑄢𑄴 𑄃𑄬 𑄘𑄪𑄇𑄴 𑄃 𑄢𑄇𑄴 𑄚𑄧 𑄝𑄪𑄏𑄨 𑄡𑄪𑄚𑄨 𑄞𑄝𑄧 𑄦𑄖𑄳𑄠𑄢𑄴𑄣𑄮𑄃𑄨 𑄢𑄧𑄞 𑄉𑄧𑄢 𑄡𑄬𑄝𑄧, 𑄥𑄣𑄬𑄚𑄴 𑄥𑄨𑄠𑄚𑄴 𑄃𑄧𑄞𑄧 “𑄘𑄋𑄧𑄢𑄴 𑄃𑄬𑄇𑄴𑄇𑄚𑄴 𑄝𑄧𑄎𑄧𑄁 𑄇𑄟𑄴𑅁"

𑄃𑄧𑄇𑄴𑄖𑄧 𑄦𑄮𑄢𑄬 𑄡𑄬𑄝𑄢𑄴 𑄃𑄉𑄬 𑄥𑄧𑄢𑄴𑄇𑄢𑄧𑄢𑄴 𑄃𑄪𑄌𑄴𑄖𑄴 𑄟𑄪𑄢𑄪𑄣𑄳𑄠 𑄃𑄬 𑄇𑄨𑄏𑄬𑄇𑄴 𑄃 𑄢𑄇𑄴 𑄇𑄧𑄖𑄴𑄖𑄟𑄚𑄴 𑄉𑄧𑄢𑄬𑄁 𑄦𑄣𑄬𑄭 𑄉𑄧𑄢𑄚𑅁 𑄘𑄧𑄋𑄚-𑄇𑄧𑄎𑄧𑄣 𑄝 𑄝𑄧𑄣𑄧𑄢𑄴 𑄞𑄏𑄬 𑄚𑄧𑄠𑄴, 𑄥𑄧𑄚𑄴𑄖𑄪 𑄣𑄢𑄴𑄟 𑄝𑄎𑄨 𑄗𑄇𑄴𑄬 𑄛𑄢𑄴𑄝𑄧𑄖𑄳𑄠𑄧 𑄌𑄪𑄖𑄴𑄨 𑄖𑄧𑄎𑄨𑄟𑄧𑄛𑄪𑄢𑄧 𑄉𑄧𑄢𑄨 𑄝𑄥𑄴𑄖𑄧𑄝𑄠𑄧𑄚𑄴 𑄃 𑄞𑄫𑄟𑄨 𑄇𑄧𑄟𑄨𑄥𑄧𑄚𑄧𑄢𑄴 𑄇𑄟𑄚 𑄦𑄖𑄴 𑄘𑄨𑄚𑄬𑄭 𑄝𑄚 𑄃𑄬 𑄟𑄪𑄢𑄪𑄣𑄳𑄠 𑄌𑄉𑄣 𑄇𑄪𑄘𑄨𑄚𑄴 𑄟𑄙𑄚𑄴 𑄝 𑄘𑄋𑄧𑄢𑄴 𑄘𑄧𑄏𑄖𑄴𑄪𑄚𑄴 𑄝𑄎𑄨 𑄛𑄢𑄬𑅁 𑄃 𑄇𑄧𑄘𑄧𑄇𑄣𑄴 𑄟𑄪𑄢𑄪𑄣𑄳𑄠 𑄌𑄉𑄣 𑄇𑄪 𑄃𑄉𑄪𑄚𑄴 𑄎𑄧𑄣𑄨𑄝𑄧? 𑄢𑄥𑄴𑄑𑄳𑄢𑄧𑄖𑄴𑄪𑄚𑄴 𑄃𑄨𑄠𑄚𑄧𑄢𑄴 𑄃𑄨𑄢𑄪𑄇𑄴 𑄢𑄧𑄞 𑄚𑄨𑄠 𑄛𑄧𑄢𑄨𑄝𑄧𑅁

মাচাং মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা: গিরি-কন্যা খাগড়াছড়ির এক আলোকবর্তিকা - ইনজেব চাঙমা

সবুজ অরণ্যে ঘেরা, মেঘের চাদরে মোড়া খাগড়াছড়ি। যেখানে পাহাড়েরা ফিসফিসিয়ে গল্প বলে, ঝর্ণার জল সুর তোলে। সেই মায়াবী ভূমির কোলে, ১৯৭৪ সালের ২৬শ...