![]() |
| ইনজেব চাঙমা |
Hillor pojjan(হিলর্ পজ্জন)
হিলো বুগোর সুক্-দুগর কধা ফগদাঙ গর অয়।
রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬
মাতৃভাষার প্রদীপ ও বর্ণমালার রূপকার
শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬
ম্যাকলিন চাকমা : পাহাড়ের ভাষা, মানুষের কবি -ইনজেব চাঙমা
কিছু কবি শব্দ লেখেন, কিছু কবি সময়কে লিপিবদ্ধ করেন; আর কিছু কবি আছেন, যাঁরা একটি ভূখণ্ডের আত্মাকে ভাষা দেন। তরুণ চাঙমা কবি ম্যাকলিন চাকমা সেই বিরল কণ্ঠগুলোর একজন। তাঁর কবিতায় পাহাড় কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; পাহাড় সেখানে কথা বলে, নদী স্মৃতি বহন করে, জুমের ধোঁয়া ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে আকাশে মিশে যায়। তাঁর কাব্যে ফুল ফোটে কেবল বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে নয়, বরং মানুষের স্বপ্ন, বেদনা ও অস্তিত্বের অনিবার্য প্রতীক হয়ে। তাই তাঁর কবিতা পড়া মানে শুধু সাহিত্য পাঠ নয়; যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির অন্তর্লোকের সঙ্গে এক নিবিড় আলাপ।
১৯৯৩ সালের ১০ অক্টোবর রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার সুভলং ইউনিয়নের হাজাছড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা অলঙ্গ কুমার চাকমা এবং মাতা অলকা দেবী চাকমার স্নেহধন্য সন্তান তিনি। ছোট বোন পপি চাকমাকে নিয়ে তাঁদের পরিবার। শৈশব কেটেছে পাহাড়ের বুক চিরে, জুমের পথ ধরে, বিরেচমরা পাহাড় থেকে ছোটহরিণার খুকিছড়া পর্যন্ত এক জুম থেকে আরেক জুমে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে। প্রকৃতির সেই অন্তরঙ্গ সংসর্গ তাঁর রক্তে মিশিয়ে দিয়েছে পাহাড়ের রং, ঝরনার সুর আর বনভূমির নৈঃশব্দ্য। পরবর্তীকালে সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর কবিতার প্রাণরস হয়ে উঠেছে।
তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা নিজ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে বরুনাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষে মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ২০১২ সালে এসএসসি সম্পন্ন করে ঢাকার মার্টিন লুথার কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বি.এড. অধ্যয়ন শুরু করলেও সাহিত্য ও জ্ঞানসাধনার গভীর আকর্ষণ তাঁকে নিয়ে যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে, যেখানে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।
ম্যাকলিন চাকমা মূলত কবি; তবে তাঁর সাহিত্যসাধনা কেবল কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়। ছোটগল্প, নাটক, গান, প্রবন্ধ—প্রতিটি শাখায় তিনি সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করেন। তাঁর প্রকাশিত তিনটি চাকমা কাব্যগ্রন্থ—‘দেবংসি’ (২০১৮), ‘আচ্’ (২০১৯) এবং ‘নুও গরি ফাগুন এঝের’ (২০২০)—চাকমা ভাষার আধুনিক কাব্যধারায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। পাশাপাশি চাকমা, বাংলা ও ইংরেজি—তিন ভাষায় একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
তাঁর কবিতায় পাহাড়ের প্রকৃতি যেমন জীবন্ত হয়ে ওঠে, তেমনি উচ্চারিত হয় আদিবাসী মানুষের জীবনসংগ্রাম, মাতৃভাষার মমত্ব, ইতিহাসের ক্ষত, প্রেমের নির্মলতা এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। তাঁর শব্দচয়ন সংযত, অথচ গভীর; ভাষা সহজ, কিন্তু ভাবের বিস্তার সুদূরপ্রসারী। এই কারণেই তাঁর কবিতা শুধু চাঙমা পাঠকের নয়, বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যাঙ্গনেরও মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
দেশের বিভিন্ন সাহিত্যপত্র, লিটল ম্যাগাজিন এবং জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ-এ তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। দেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতের সাহিত্যপত্রেও তাঁর কবিতা ও ছোটগল্প স্থান পেয়েছে। সাহিত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সাহিত্যপত্র ‘রঁদেভু’-এর ১৭তম সংখ্যা এবং মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার স্মরণে প্রকাশিত ‘কেওক্রডং’-এর ২০২২ সংখ্যা তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘নুও গরি ফাগুন এঝের’ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার বাংলা বিভাগের একটি কোর্সে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া তাঁর সাহিত্যকীর্তির এক অনন্য স্বীকৃতি।
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ইউনেস্কো ঢাকার একটি প্রকল্পে কাজ করেন। ইউনেস্কো প্রকাশিত Of Roots of Heritage: Tales from the Hills গ্রন্থে তাঁর একটি যৌথ গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একই গ্রন্থের পাঁচটি গল্প বাংলা থেকে চাকমা ভাষায় অনুবাদ এবং চাকমা ফন্টে লিপ্যন্তরের দায়িত্বও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেন। ২০২৩ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কবিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত আন্তর্জাতিক অনলাইন কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ লাভ করেন। কানাডা, চীন, গ্রিস, ইরান, ফিলিপাইন, সার্বিয়া ও বাংলাদেশের কবিদের সঙ্গে একই মঞ্চে কবিতা পাঠ তাঁর সাহিত্যযাত্রাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে দেয়।
চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৮ সালে বরুনাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, ২০২৫ সালে কাট্টলী বরুনাছড়ি ও ধামাইছড়া মৌজাস্থ চাকুরিজীবী কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেড এবং ২০২৬ সালে বাংলাদেশ আদিবাসী কবি, লেখক ও সাহিত্যিক ঐক্য পরিষদ আয়োজিত আদিবাসী সাহিত্য উৎসবে সম্মাননায় ভূষিত হন।
বর্তমানে তিনি মোনঘরে সহকারী প্রকাশনা ও যোগাযোগ কর্মকর্তা ও মোনঘর রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ (চাঙমা ভাষা) শিক্ষকতা করছেন। পাশাপাশি চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রাইটার্স ইউনিয়ন-এর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-গবেষণা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ম্যাকলিন চাকমার সাহিত্যজীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আশ্রয়। তাঁর কবিতা পাহাড়ের বাতাসে জন্ম নেয়, ঝরনার জলে ধুয়ে যায়, মানুষের হৃদয়ে আশ্রয় খুঁজে নেয়। তিনি এমন এক কবি, যিনি শব্দ দিয়ে কেবল কবিতা নির্মাণ করেন না; নির্মাণ করেন একটি জাতির স্মৃতি, একটি ভূখণ্ডের চেতনা এবং ভবিষ্যতের প্রতি অবিচল বিশ্বাস। সময়ের প্রবাহে তাঁর সাহিত্যকর্ম নিঃসন্দেহে চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে বেঁচে থাকবে।
শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬
জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তাঁদের নিরলস কর্মে নির্মাণ করেছেন এক অনন্য অধ্যায়। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। চাঙমা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার এই দীর্ঘ সংগ্রামে যাঁরা নীরবে আজীবন কাজ করে চলেছেন, তাঁদের অন্যতম জ্ঞান কীর্তি চাকমা। তিনি একাধারে কবি, নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক—সব পরিচয়ের সমন্বয়ে এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক।
জ্ঞান কীর্তি চাকমার জন্ম (সার্টিফিকেট অনুসারে) ২০ জানুয়ারি ১৯৮৪ সালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উপজেলার উদাল বাগান গ্রামে। তাঁর পিতা সুপেন্দ্র চাকমা এবং মাতা তৃপ্তি বালা চাকমা। তাঁর সহধর্মিণী মধুমিতা মারমা। তাঁদের দুই কন্যা—রাশিয়া চাকমা (দীঘিনালা সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী) এবং এশিয়া চাকমা (উদাল বাগান উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী)।
পাহাড়, বনাঞ্চল, প্রকৃতি এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিবেশে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়। এই পরিবেশই পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পীসত্তা, সাহিত্যচেতনা এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় উদাল বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে তিনি রাঙামাটির মোনঘর শিশু সদনে ভর্তি হন। মোনঘরেই তাঁর সাহিত্য, নাটক ও শিল্পচর্চার প্রকৃত ভিত্তি নির্মিত হয়।
২২ জানুয়ারি ১৯৮৯ সালে ভারতে শরণার্থী অবস্থায় তিনি তাঁর পিতার মৃত্যুসংবাদ পান। শৈশবের এই নির্মম ট্র্যাজেডি তাঁর জীবনে গভীর বেদনার ছাপ ফেললেও তিনি সেই বেদনাকেই সৃষ্টিশীল শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা, গল্প ও নাটক রচনা শুরু করেন এবং সহপাঠীদের নিয়ে নিজেই নাটক মঞ্চস্থ করতেন।
তাঁর সৃজনশীল প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে শিক্ষক মৃত্তিকা, ঝিমিত ঝিমিত, শান্তি ও দীপ্তাসহ অনেকে তাঁকে নাট্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। তাঁদের প্রেরণায় তিনি অভিনয় ও নাট্যরচনায় আরও মনোনিবেশ করেন।
এই সময়ে তিনি রচনা করেন—
- কবানত বাজ পজ্জে
- দজ বারা এগার
- চোগে পহর
- ভাঙি ন পারে বুবর স্ববণ
এসব নাটকে সমাজবাস্তবতা, মানবিক সংকট, আত্মমর্যাদা, বৈষম্য এবং মানুষের সংগ্রামের চিত্র শক্তিশালীভাবে ফুটে ওঠে।
এসএসসি পাসের পর তিনি রাঙামাটি সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৯৮ সালে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন জুম্ম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ। একই সময়ে তিনি সম্পাদনা করেন ‘রা-খা-বা বুক জ্বলি যার’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন।
সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্যচর্চা, নাট্যচর্চা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি। দীর্ঘ আট বছর সংগঠনটি সক্রিয় থাকলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সংগঠন বিলুপ্ত হলেও তাঁর সাংস্কৃতিক সংগ্রাম থেমে থাকেনি। তিনি কলম, মঞ্চ এবং ক্যামেরাকে হাতিয়ার করে ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য কাজ করে যেতে থাকেন।
২০০২ সাল থেকে জ্ঞান কীর্তি চাকমা ধারাবাহিকভাবে টেলিফিল্ম নির্মাণ শুরু করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক নির্মাণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- মানিক্যা বৈদ্যর দারু তালিক
- ভাঙি ন পারে বুবর স্ববন
- তুজিম পুরো কোচপানা
- আহভিলেজ
- তামাকবিরোধী চলচ্চিত্র সাত গাঙ সাজুরি বাক্কে এযের আহ্ গরি
- এ্যলা ফেলা
এসব চলচ্চিত্রে জুম্ম জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম, সামাজিক সংকট, জনসচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে।
২৫ জানুয়ারি ২০১১ সালে উদাল বাগানে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জুম্ম ফিল্ম এসোসিয়েশন (জুফা)।
জুফা শুধু একটি চলচ্চিত্র সংগঠন নয়; এটি জুম্ম ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জাতিসত্তাকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও বিকাশের এক সাহসী সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।
সংগঠনটির প্রধান লক্ষ্য—
- চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজের নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা;
- কুসংস্কার, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি;
- শিক্ষা, মানবিকতা, সম্প্রীতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রসার;
- জুম্ম ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিক সংরক্ষণ।
নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি ২০১৩ সালে ঢাকার প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইন-এ ছয় মাসব্যাপী অভিনয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনয় প্রশিক্ষণ কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করে সপ্তম স্থান অর্জন করেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁর অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন মাত্রা যোগ করে।
২০২০ সালে নির্মিত ‘আন্দারত ধান হুজানা’ তাঁর শর্টফিল্ম নির্মাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে নির্মাণ করেন—
রাধমন ধনপুদির ফুল পারা, নিজো টেঙত হুরোল মারানা, মরে ন তাগিজ, ডিএসএলআর ক্যামেরা, থার্টি ফাস্ট নাইট, বেজাদর হাজ্জেক, হেগা তাগলর কুপ, ছন্দবাজ, ভাইরাস, অধ গরাত, আহদ আগুন ন পেবে, ফাদা বাজত বিজে বাঝানা, গিরিত্তি ঘর বৌ, সজ্জানা, ঝড়া পাদার জিংকানি, বেলাব, দজা, ভাঙা গিরিত্তির যদন, ইলেকশন, ঝড় নেই দেবা কালা, চিগোন পিরে, পরা কবালর জিংকানি, হোদার আগুন লুরো, ঘর উন্দুরে বের কামারায়, কোচপানার চোগো পানি, লুরো শুগোর ছালত উদোনা, সত্য মিথ্যা চের আঙুল ফারক, টেঙা ফেরত চাং, ধুন্দুক, আদে ধন, ব্রেকআপ–১, ব্রেকআপ–২ এবং ফক্কর।
এসব চলচ্চিত্রে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক অবক্ষয়, প্রেম, প্রযুক্তির প্রভাব, নির্বাচন, নৈতিক মূল্যবোধ এবং জুম্ম সমাজের জীবনবাস্তবতা শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য-নথি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
জ্ঞান কীর্তি চাকমা বিশ্বাস করেন, মানুষকে সচেতন করার অন্যতম সহজ মাধ্যম হলো হাস্যরস।
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি নির্মাণ করেছেন—
ওয়ান আনা টু ব্যানেনা, ভাইরাস, ব্যস্ত আগং, সরি, কগেয়্যা চুর, উত্তর সারাংশ দেখ, ভূত চালান, কুরো চুর, বৈদ্য, ইহি, উগুদো জিরেন, শালিজ, বিলেই, পাচ আহদ, চুর, শামুখ, কুন্দি যেম, তিবিরে, ইন্টারভিউ, ফুটবল, জোধা, দারু এবং সরি সাবজেক্ট—সহ অসংখ্য জনপ্রিয় ফানি ভিডিও।
এসব ভিডিও কেবল বিনোদনের জন্য নির্মিত নয়; বরং ব্যঙ্গ, রসিকতা ও বাস্তব জীবনের ঘটনাকে উপজীব্য করে সামাজিক অসংগতি তুলে ধরে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেয়।
জ্ঞান কীর্তি চাকমার জীবন প্রমাণ করে—সীমিত সম্পদ কখনো মহান স্বপ্নের পথে অন্তরায় হতে পারে না। তিনি চলচ্চিত্রকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং সামাজিক পরিবর্তন, ভাষা সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং জাতিসত্তার ইতিহাস ধারণের এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সংগ্রামী ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল। আজ তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নন; তিনি জুম্ম চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা জুম্ম ফিল্ম এসোসিয়েশন (জুফা) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে।
জ্ঞান কীর্তি চাকমার সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা এবং নিরলস সাধনা পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ভাষা, সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণ করে চলেছেন, তা শুধু জুম্ম সমাজের নয়; বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও এক অমূল্য সম্পদ।
পদ নয়, ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এক মানুষ - ইনজেব চাঙমা
বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬
কবি সরোজ কান্তি চাঙমা: চাঙমা সাহিত্য ও সংগীতের এক নিবেদিত প্রাণ - ইনজেব চাঙম
মাতৃভাষার প্রদীপ ও বর্ণমালার রূপকার
ইনজেব চাঙমা “একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল কিছু শব্দের বিলুপ্তি নয়; হারিয়ে যায় একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের দ...
-
সেদিন ছিল ১৭ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, এক অলস বুধবার। চারদিকের আকাশ সকাল থেকেই মেঘের ঘন চাদরে ঢাকা। মাঝে মাঝে সেই মেঘের বুক চিরে সূর্য তার তেজস্...
-
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন , যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তাঁদের নিরলস কর্মে নির্মাণ ...
-
পাহাড়ে আজ যে ‘মর্ডানিজম’ দেখা যাচ্ছে, তা আসলে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা নয়। এটি হলো সাজানো-গোছানো এক নতুন উপনিবেশ। বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর, ভেতর...



