শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

পাহাড়ের বেদনা, ভাষার প্রেম ও স্বপ্নবাহী এক কাব্যযাত্রা: কবি ঊষাতন চাকমা - ইনজেব চাঙমা

  

    মানুষের জীবনে কিছু গল্প থাকে, যা কেবল ব্যক্তিগত ইতিহাসের সীমানায় আবদ্ধ থাকে নাতা এক বিস্তীর্ণ জনপদের স্মৃতি, একটি জাতিসত্তার সংগ্রাম এবং মাতৃভাষার দীর্ঘশ্বাসকে ধারণ করে কবি ঊষাতন চাকমা তেমনই এক অনন্য জীবনগাথার নাম তিনি এমন এক সাহিত্যিক, যার কলমে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিসর্গ যেমন রঙিন হয়ে ওঠে, তেমনি বাস্তুচ্যুত জীবনের নির্মম বেদনা, মাতৃভাষার আকুলতা, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অটল দায়বদ্ধতা সমান শক্তিতে ধ্বনিত হয় তাঁর কবিতা কেবল কাব্যিক সৌন্দর্যের অন্বেষণ নয়; বরং ইতিহাস, স্মৃতি, আত্মপরিচয় স্বপ্নের এক চিরন্তন অভিযাত্রা

    সার্টিফিকেট অনুযায়ী ১৯৮০ সালের ২ জুলাই খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার শান্তিপুর গ্রামের (চেঙে পার) সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির বুকে কবি ঊষাতন চাকমা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বিনয় কৃষ্ণ চাকমা এবং মাতা সুমিতা চাকমা। চার সন্তানের স্নেহময় পরিবারে তিনি দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠেন।

    বর্তমানে তাঁর সহধর্মিণী তন্বী চাঙমা, যার পৈতৃক নিবাস রাঙামাটি জেলার তবলছড়ি এলাকার মাঝের বস্তি। তাঁদের দাম্পত্য জীবন দুই সন্তানের হাসি-আনন্দে পরিপূর্ণ, পুত্র উৎকর্ষ চাঙমা (তূর্ণ), ৯ম শ্রেণি এবং কন্যা রূধিরা চাঙমা (তমা) ৪ বছর। পাহাড়ের নির্মল বাতাস, ঝরনার সুর, জুমক্ষেতের রঙিন সৌন্দর্য এবং পাহাড়ি মানুষের সহজ-সরল জীবন ছিল তাঁর শৈশবের প্রথম পাঠশালা।

     তবে এই শান্ত নির্মল শৈশব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি ইতিহাসের অস্থির তরঙ্গ তাঁকে খুব অল্প বয়সেই উদ্বাস্তু জীবনের করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায় ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চারটি বছর তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর বেদনাময় অধ্যায় পরিবারের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বাগানটিলা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া, নিরাপত্তার অভাব, অনিশ্চিত দিন আর অন্ধকারের মধ্যে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর শিশুমনে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, তা- পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এই সংকীর্ণ বাস্তবতার মাঝেও তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন- একদিন স্বদেশে ফিরে নিজের ভাষায় লিখবেন, নিজের মানুষের কথা বলবেন সেই স্বপ্নই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যচর্চার শক্ত ভিত্তি রচনা করে

    শান্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হলেও শরণার্থী শিবিরের অনিশ্চয়তার মধ্যে দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে হয় দেশে ফেরার পর পানছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন এরপর পানছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে পানছড়ি সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে ১৯৯৬ সালে এসএসসি এবং খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৯৮ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন

    উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে সফলতার সঙ্গে স্নাতক (অনার্স) স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত বিস্তৃত সাহিত্যাঙ্গন তাঁর চিন্তার জগৎকে নতুন মাত্রা দেয় বাংলা, ইংরেজি বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃত পাঠ তাঁর কাব্যভাষাকে পরিপক্ব সমৃদ্ধ করে তোলে

     শিক্ষকতা দিয়ে কবি ঊষাতন চাকমার কর্মজীবনের সূচনা ঘটে ২০০৭ সালে চট্টগ্রামের মেরন সান স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে ঢাকার বনফুল আদিবাসী গ্রিন হার্ট কলেজে শিক্ষকতা করেন তরুণদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর এই সময়টি তাঁর জন্য অত্যন্ত প্রীতিময় তৃপ্তিদায়ক ছিল

    পরবর্তীতে ২০০৯ সালে তিনি জনতা ব্যাংক পিএলসি.-তে যোগদান করে পেশাগত জীবনে নতুন অধ্যায় সূচনা করেন বর্তমানে তিনি মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন পেশাগত নানা ব্যস্ততা সত্ত্বেও সাহিত্য সৃষ্টি থেকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন হননি; দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন শেষে তিনি প্রতিনিয়ত ফিরে গিয়েছেন কবিতার নীরব সৃষ্টিশীল জগতে

     কলেজজীবনে সূচনা হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তাঁর সাহিত্যচর্চা গতি পায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসভিত্তিক পত্রিকায় বাংলা কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে পরবর্তীতে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন, অনলাইন সাহিত্যপত্র এবং শিশু-কিশোর সাময়িকীতে তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে

    তিনি ছড়া, কবিতা, ছোটগল্প এবং শিশুদের জন্য গান রচনায় সমান স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তাঁর লেখার ভাষা সহজ-সরল, অথচ অনুভূতি অত্যন্ত গভীর তাঁর কাব্যভাষায় পাহাড়ের মাটি, মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রেম, বেদনা আত্মপরিচয়ের সুর একাকার হয়ে ফুটে ওঠে

প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য কাজসমূহ:

 রানজুনির রং (২০২২): চাকমা ভাষায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ, পাহাড়সম হৃদয় (২০২৩): বাংলা ভাষায় রচিত কাব্যগ্রন্থ, চাঙমা নিজেনী: যৌথভাবে সম্পাদিত চাকমা ভাষা শিক্ষার বই সংজোআর: চাকমা সাহিত্য বা-এর রজতজয়ন্তী উপলক্ষে সম্পাদিত বিশেষ স্মারকগ্রন্থ   এবং শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষায় অবদান রাখার লক্ষ্যে চাকমা ভাষায় রচিত তাঁর একটি ছড়াগ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে

     শিশু-কিশোর সাহিত্যচর্চার প্রতি কবি ঊষাতন চাকমার গভীর অনুরাগ রয়েছে ঢাকার শিশু-কিশোর পত্রিকা- কানামাছি এবং বগুড়ার কুঁড়ি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখেন তিনি বিশ্বাস করেন, কচি-কাঁচাদের হাতে বই তুলে দিতে পারলে ভাষা সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকবে

    এছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলন, কবিতা উৎসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত কবিতা পাঠ আবৃত্তি করেন তাঁর উচ্চারিত কবিতায় ব্যক্তিগত আবেগের পাশাপাশি পাহাড়ের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনি লাভ করে

 ঊষাতন চাকমার সাহিত্যভাবনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে মাতৃভাষা, সংস্কৃতি এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, একটি জাতির ভাষা হারিয়ে গেলে তার অস্তিত্ব ইতিহাসও ধীরে ধীরে মুছে যায় তাই তাঁর কাছে সাহিত্যচর্চা কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়, এটি জাতিসত্তা সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক নিরন্তর সংগ্রাম

    ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন দায়িত্বশীল পরিবারপ্রেমী মানুষ তাঁর সহধর্মিণী তন্বী চাকমা ঢাকার সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর একজন সিনিয়র শিক্ষক এক ছেলে এক মেয়েকে নিয়ে তাঁদের পরিবার পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা শিক্ষণীয় মূল্যবোধে সমৃদ্ধ

     কবি ঊষাতন চাকমার জীবনপ্রবাহ প্রমাণ করে যে সংগ্রাম মানুষকে ভেঙে ফেলে না, বরং তাকে আরও মানবিক, সংবেদনশীল সৃজনশীল করে তোলে শরণার্থী শিবিরের নির্মম কষ্ট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা, শিক্ষকতার অনুভূতি, ব্যাংকিং জীবনের ব্যস্ততা এবং সাহিত্যসাধনার নিরলস পথচলা- সব মিলিয়ে তিনি আজ পাহাড়ি জনপদের এক অনন্য স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর যতদিন পাহাড়ের প্রকৃতি রবে এবং মাতৃভাষার প্রতি মানুষের ভালোবাসা থাকবে, ততদিন কবি ঊষাতন চাকমার কবিতা পাঠকের হৃদয়ে চির অম্লান থাকবে

 

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

কবি নূতন ধন চাঙমা: শিক্ষা, সাহিত্য ও সমাজচেতনার অন্যতম এক আলোকবর্তিকা - ইনজেব চাঙমা

"যে মানুষ এক হাতে শিক্ষার প্রদীপ জ্বালান, অন্য হাতে কবিতার অক্ষরে একটি জাতির আত্মপরিচয় রচনা করেন, তাঁর জীবন কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; তা হয়ে ওঠে একটি জনপদের সাংস্কৃতিক জাগরণের দলিল।"


পার্বত্য চট্টগ্রামের নৈসর্গিক সৌন্দর্যের মাঝে জন্ম নেওয়া কবি নুতন ধন চাঙমা সেইসব আলোকিত মানুষের অন্যতম, যাঁরা শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংবাদিকতার ত্রিমাত্রিক সাধনায় নিজেকে নিবেদিত করেছেন। তিনি শুধু একজন শিক্ষক নন, একজন সৃজনশীল কবি, দায়িত্বশীল সংবাদকর্মী এবং সমাজমনস্ক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর কলমে যেমন পাহাড়ের প্রকৃতি প্রাণ পায়, তেমনি উচ্চারিত হয় মানুষের জীবনসংগ্রাম, ভাষার অস্তিত্ব এবং জাতিসত্তার অম্লান চেতনা।

১৯৭৮ সালের ৩০ এপ্রিল খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার মধুমঙ্গল পাড়ায় তাঁর জন্ম। পিতা আনন্দ রাখাল চাঙমা এবং মাতা চন্দ্র বালা চাঙমা। পারিবারিক স্নেহ, নৈতিক মূল্যবোধ এবং নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁর ব্যক্তিত্ব গঠনের ভিত নির্মাণ করে। পরবর্তীকালে জীবনের সহযাত্রী হন সুপিলা চাঙমা, যিনি তাঁর সাহিত্য ও কর্মজীবনের নীরব প্রেরণার উৎস।

নুতন ধন চাঙমার শিক্ষাজীবন ছিল অধ্যবসায় ও আত্মনির্মাণের এক ধারাবাহিক যাত্রা। ১৯৯৪ সালে পুজগাংমুখ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক, ১৯৯৬ সালে পানছড়ি ডিগ্রি কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং ১৯৯৮ সালে রাঙামাটি সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

শিক্ষকতা পেশাকে কেবল জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং জাতি গঠনের ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে তিনি ২০০৫ সালে ফেনী সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিএড সম্পন্ন করেন। পরবর্তীকালে এমএড ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে শিক্ষাবিদ হিসেবে নিজের দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও সমৃদ্ধ করেন।

২০০০ সালে লোগাং বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করার মধ্য দিয়ে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। শ্রেণিকক্ষ তাঁর কাছে ছিল কেবল পাঠদানের স্থান নয়; বরং একটি স্বপ্ন নির্মাণের কর্মশালা। তিনি শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের পাশাপাশি মানবিকতা, নৈতিকতা, সংস্কৃতিবোধ এবং সাহিত্যপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার প্রয়াস চালিয়ে গেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল—একজন প্রকৃত শিক্ষক কেবল পাঠ্যবই শেখান না, মানুষ গড়েন।

শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকতায়ও রেখে গেছেন উল্লেখযোগ্য পদচিহ্ন। দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক প্রথম আলো-এর প্রতিনিধি হিসেবে প্রায় পাঁচ বছর নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া দৈনিক সমকাল এবং দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ-এর প্রতিনিধির দায়িত্বও পালন করেছেন।

সংবাদ সংগ্রহ তাঁর কাছে ছিল কেবল পেশাগত দায়িত্ব নয়; বরং প্রান্তিক মানুষের কথা, পাহাড়ের বাস্তবতা এবং সমাজের নীরব সত্যকে বৃহত্তর জাতীয় পরিসরে তুলে ধরার এক সামাজিক অঙ্গীকার। তাঁর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে পাহাড়ের জীবন, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং সময়ের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা।

কবি নুতন ধন চাঙমার সাহিত্যচর্চার মূল ভিত্তি তাঁর মাতৃভাষা, সংস্কৃতি এবং মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ। তিনি চাঙমা ভাষায় ‘ঘিলেফুল’ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের মাধ্যমে মাতৃভাষার সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন।

‘ঘিলেফুল’ কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়; এটি পাহাড়ি মানুষের অনুভূতি, প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্য, প্রেম, স্মৃতি, জীবনসংগ্রাম এবং জাতিগত আত্মপরিচয়ের কাব্যিক দলিল। তাঁর কবিতায় পাহাড়ের সবুজ, ঝরনার কলতান, মানুষের হাসি-কান্না এবং ভাষার প্রতি অগাধ ভালোবাসা একাকার হয়ে যায়। সহজ অথচ হৃদয়স্পর্শী ভাষা তাঁর কাব্যকে সাধারণ পাঠকের কাছেও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

নুতন ধন চাঙমা সেই বিরল মানুষদের একজন, যাঁরা শিক্ষা, সাংবাদিকতা ও সাহিত্য—এই তিনটি ক্ষেত্রকে একই সূত্রে বেঁধেছেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি আলোকিত মানুষ গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করেছেন; সাংবাদিক হিসেবে সমাজের বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন; আর কবি হিসেবে মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির সৌন্দর্যকে শব্দের অলংকারে অমর করে রেখেছেন।

তাঁর সাহিত্যকর্মে ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে বৃহত্তর সমাজ, ভাষা, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনবোধ অধিক গুরুত্ব পেয়েছে। ফলে তাঁর রচনা কেবল নান্দনিকতার জন্য নয়, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের দলিল হিসেবেও মূল্যবান।

কবি নুতন ধন চাঙমার জীবন আমাদের শেখায়—কলম যখন শিক্ষার আলো, সাহিত্যের সৌন্দর্য এবং সমাজের দায়বদ্ধতাকে একসূত্রে গাঁথে, তখন একজন মানুষ নিজের সীমানা অতিক্রম করে সময়ের সম্পদে পরিণত হন। তাঁর কর্ম, সাহিত্য এবং আদর্শ ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাতৃভাষা, শিক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধের পথে অনুপ্রাণিত করবে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-ইতিহাসে তাঁর নাম তাই এক নিবেদিত শিক্ষক, এক সংবেদনশীল কবি এবং এক দায়িত্বশীল সমাজসচেতন মানুষের পরিচয়ে দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

 

পাহাড়ের বেদনা, ভাষার প্রেম ও স্বপ্নবাহী এক কাব্যযাত্রা: কবি ঊষাতন চাকমা - ইনজেব চাঙমা

        মানুষের জীবনে কিছু গল্প থাকে , যা কেবল ব্যক্তিগত ইতিহাসের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না — তা এক বিস্তীর্ণ জনপদের স্মৃতি , এক...