রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

মাতৃভাষার প্রদীপ ও বর্ণমালার রূপকার

ইনজেব চাঙমা 
“একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল কিছু শব্দের বিলুপ্তি নয়; হারিয়ে যায় একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ উত্তরাধিকার।”

ইতিহাসের প্রতিটি সময়ে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাঁরা ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা অতিক্রম করে নিজেদের জীবনকে একটি বৃহত্তর আদর্শের কাছে সমর্পণ করেন। তাঁদের হাতে কোনো রাষ্ট্রক্ষমতা থাকে না, থাকে না বিপুল অর্থসম্পদ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব; কিন্তু তাঁদের নীরব শ্রমই একদিন একটি ভাষাকে নতুন প্রাণ দেয়, একটি বিলীয়মান বর্ণমালাকে পুনর্জাগরিত করে এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
 
পার্বত্য চট্টগ্রামের চাঙমা ভাষা, অঝাপাত বর্ণমালা এবং সমকালীন চাঙমা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে এমনই এক নিবেদিতপ্রাণ সাধকের নাম ইনজেব চাঙমা। তিনি কেবল একজন লেখক নন; তিনি ভাষাসংগ্রামী, সংগঠক
, সম্পাদক, পাঠাভ্যাস আন্দোলনের উদ্যোক্তা এবং মাতৃভাষা পুনর্জাগরণের এক নিরলস কর্মযোদ্ধা।
১৯৮১ সালে ১৯ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের চাঙমা সার্কেলের ২৯ নম্বর ছোটমেরুং মৌজার বাজেইছড়া গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইনজেব চাঙমা। পিতা তরুণী কুমার চাঙমা ও মাতা বিজয়শোভা চাঙমার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ।
 
পাহাড়, জুমক্ষেত, বনভূমি, ঝিরিপথ এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির আবহে তাঁর শৈশব গড়ে ওঠে। প্রকৃতিই ছিল তাঁর প্রথম শিক্ষক; লোকগাথা ছিল তাঁর প্রথম সাহিত্য; আর মাতৃভাষার উচ্চারণ ছিল তাঁর প্রথম আত্মপরিচয়।
১৯৯২-৯৪ সালে গৃহশিক্ষক দীপায়ন চাঙমা (বীর)’র কাছে অঝাপাত বর্ণমালা শেখার পর তাঁর জীবনে এক গভীর উপলব্ধির জন্ম হয়। তিনি বুঝতে পারেন—একটি ভাষা যতদিন মুখে বেঁচে থাকে, ততদিন তার অস্তিত্ব টিকে থাকে; কিন্তু তার নিজস্ব বর্ণমালা হারিয়ে গেলে সেই ভাষার ইতিহাস, সাহিত্য ও সভ্যতাও ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। সেই দিন থেকেই মাতৃভাষা ও অঝাপাত সংরক্ষণ তাঁর জীবনের ব্রত হয়ে ওঠে।
ইনজেব চাঙমার ব্যক্তিজীবন সুখ ও বেদনার এক গভীর সংমিশ্রণ। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ২৯ নম্বর ছোটমেরুং মৌজার হেডম্যান সুশীল জীবন চাঙমার কন্যা। এই দাম্পত্যজীবনে জন্ম নেয় কন্যা কালজয়ী চাঙমা, যিনি বর্তমানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে অধ্যয়নরত, এবং পুত্র আর্যঋদ্ধি মানব জ্যোতি চাঙমা, ৯ম শ্রেণি।
 
কিন্তু জীবনের নির্মম বাস্তবতা তাঁকে অকালেই স্ত্রীর মৃত্যুশোকের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সেই ব্যক্তিগত বিপর্যয় তাঁকে ভেঙে দেয়নি; বরং আরও গভীরভাবে ভাষা ও সংস্কৃতির কাজে নিমগ্ন করেছে।
 
পরবর্তীকালে তিনি পানছড়ি উপজেলার ধুদুকছড়া গ্রামের প্রদ্যুত চাঙমা মেয়ে মাদ্রি দেবী চাঙমাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় কন্যা জধা চাঙমা। সংসারের দায়িত্ব, কৃষিকাজ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক সংগ্রামের মধ্য দিয়েও তিনি মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।
 
২০০৪ সালে ইনজেব চাঙমা উপলব্ধি করেন—ভাষাকে কেবল ভালোবাসা যথেষ্ট নয়; তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন শিক্ষা, পাঠক, লেখক, গ্রন্থ, পাঠাগার এবং সংগঠিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
 
এই উপলব্ধি থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ এবং সাঙু পাঠাগার। পরবর্তীকালে সংগঠনটি নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করে চাঙমা সাহিত্য একাডেমি নামে।
 
তাঁর উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং ভারতের ত্রিপুরা পর্যন্ত বিস্তৃত হয় অঝাপাত ও চাঙমা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে, এক ঝাঁক ভাষাপ্রেমিদের স্বেচ্ছাশ্রমে প্রায় ষোল হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী মাতৃভাষা ও অঝাপাত বর্ণমালার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছে—যা চাঙমা ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
 
ইনজেব চাঙমার সাহিত্যকর্ম বিস্তৃত হয়েছে ভাষা শিক্ষা, শিশুসাহিত্য, কবিতা, নাটক, অনুবাদ, গান এবং সম্পাদনার নানা ক্ষেত্রে।
 
ভাষা শিক্ষা: পত্থম আদিপুদি (২০১৫), ম বই (২০১৭), সাঙু (২০১৮) ও অঝাপাত (২০২১)।
শিশুসাহিত্য: কব্দ কোই, তারুম আ জানজুনি ও লোবিয়ত (সবগুলো ২০১৮)
কাব্যগ্রন্থ: উত্তিপুত্তি (২০২৩) ও ধনপুদি (২০২৩)। 
 
নাট্যরচনা: প্রকাশিত তাঁর নাটিকা “জুয়া মানে জিংকানি নাচ” এবং “মা ভাচ ” মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে নাট্যরূপে উপস্থাপনের উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা।
 
নিজস্ব সাহিত্য রচনার পাশাপাশি ইনজেব চাঙমা বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন শিশুতোষ গল্প চাঙমা ভাষায় অনুবাদ(যৌথ) করেছেন। রাজা আ কংজরি, বাক আ সিংহ, মেলাত হারা-হারি, শিয়াল্যা আ ত বোবুয়া, রাঙা বল, আহ্'ওচ, মাচ তোগেয়্যাসহ বহু অনুবাদগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি চাঙমা শিশুদের সামনে বিশ্বসাহিত্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
 
একজন লেখকের পাশাপাশি তিনি একজন সম্পাদকও। নবীন সাহিত্যিকদের জন্য তিনি সম্পাদনা করেছেন চাদি, হিলর পচ্জন (চাঙমা সাংবাদ পত্র), জুম, হিল চাদিগাঙ, মেদেনি এবং চাঙমা কবিতা সংকলন ‘পুগবেল’।
 
এই পত্রিকাগুলো কেবল সাহিত্য প্রকাশের মাধ্যম নয়; এগুলো চাঙমা ভাষার নতুন লেখক সৃষ্টির উর্বর ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
 
ইনজেব চাঙমার বিশ্বাস—একটি ভাষা বইয়ের মধ্য দিয়েই দীর্ঘজীবী হয়। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি খাগড়াছড়ি জেলায় ‘শিঙোর’ নামে বারোটি দেয়ালিকা প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি শুরু করেন বইপাঠ আন্দোলন, পাঠচক্র, গ্রামীণ পাঠাগার গঠন, সাহিত্যসভা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠাভ্যাস কর্মসূচি।
তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস—
“যে সমাজ বই পড়ে না, সে সমাজ কোনো ভাষাকেই দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারে না।”
এই দর্শনই তাঁর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কৃষিকাজ, সংসার এবং ভাষা আন্দোলনের ভার একসঙ্গে বহন করেছেন ইনজেব চাঙমা। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তাঁর সাহিত্যসাধনাকে থামাতে পারেনি, কিন্তু বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি এখনো প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
 
অপ্রকাশিত রচনার মধ্যে রয়েছে—
• একটি চাঙমা ছোটগল্পগ্রন্থ • একটি চাঙমা কাব্যগ্রন্থ • একটি চাঙমা প্রবন্ধগ্রন্থ • বাংলা ভাষায় তিনটি প্রবন্ধগ্রন্থ।
এই পাণ্ডুলিপিগুলোর প্রকাশ কেবল একজন লেখকের স্বপ্নপূরণ নয়; বরং চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যভাণ্ডারের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হবে।
 
ইনজেব চাঙমার জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—একজন মানুষের নিষ্ঠা কখনও কখনও একটি জাতির সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। সীমিত সম্পদ, ব্যক্তিগত শোক, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি যে দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন, তা নিছক ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি একটি ভাষার পুনর্জাগরণের ইতিহাস।
 
তিনি প্রমাণ করেছেন, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, চিন্তা, বিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের ধারক। তাই তাঁর কর্মজীবন মূলত এক অবিরাম সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ইতিহাস—বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির, নীরবতার বিরুদ্ধে উচ্চারণের, এবং বিলুপ্তির বিরুদ্ধে অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রাম।
সময়ের বিচারে ইনজেব চাঙমার কর্মের পূর্ণ মূল্যায়ন হয়তো এখনও সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় চাঙমা ভাষা ও অঝাপাত বর্ণমালার পুনর্জাগরণের যে অধ্যায় রচিত হবে, সেখানে তাঁর নাম একনিষ্ঠ ভাষাসাধক, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং মাতৃভাষার প্রদীপরক্ষক হিসেবে অনিবার্যভাবেই উচ্চারিত হবে।
 
তথ্য ও প্রচার বিভাগ
চাঙমা সাহিত্য একাডেমি
দিঘীনালা, চাঙমা সার্কেল।

শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

ম্যাকলিন চাকমা : পাহাড়ের ভাষা, মানুষের কবি -ইনজেব চাঙমা

কিছু কবি শব্দ লেখেন, কিছু কবি সময়কে লিপিবদ্ধ করেন; আর কিছু কবি আছেন, যাঁরা একটি ভূখণ্ডের আত্মাকে ভাষা দেন। তরুণ চাঙমা কবি ম্যাকলিন চাকমা সেই বিরল কণ্ঠগুলোর একজন। তাঁর কবিতায় পাহাড় কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; পাহাড় সেখানে কথা বলে, নদী স্মৃতি বহন করে, জুমের ধোঁয়া ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে আকাশে মিশে যায়। তাঁর কাব্যে ফুল ফোটে কেবল বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে নয়, বরং মানুষের স্বপ্ন, বেদনা ও অস্তিত্বের অনিবার্য প্রতীক হয়ে। তাই তাঁর কবিতা পড়া মানে শুধু সাহিত্য পাঠ নয়; যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির অন্তর্লোকের সঙ্গে এক নিবিড় আলাপ।

১৯৯৩ সালের ১০ অক্টোবর রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার সুভলং ইউনিয়নের হাজাছড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা অলঙ্গ কুমার চাকমা এবং মাতা অলকা দেবী চাকমার স্নেহধন্য সন্তান তিনি। ছোট বোন পপি চাকমাকে নিয়ে তাঁদের পরিবার। শৈশব কেটেছে পাহাড়ের বুক চিরে, জুমের পথ ধরে, বিরেচমরা পাহাড় থেকে ছোটহরিণার খুকিছড়া পর্যন্ত এক জুম থেকে আরেক জুমে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে। প্রকৃতির সেই অন্তরঙ্গ সংসর্গ তাঁর রক্তে মিশিয়ে দিয়েছে পাহাড়ের রং, ঝরনার সুর আর বনভূমির নৈঃশব্দ্য। পরবর্তীকালে সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর কবিতার প্রাণরস হয়ে উঠেছে।

তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা নিজ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে বরুনাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষে মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ২০১২ সালে এসএসসি সম্পন্ন করে ঢাকার মার্টিন লুথার কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বি.এড. অধ্যয়ন শুরু করলেও সাহিত্য ও জ্ঞানসাধনার গভীর আকর্ষণ তাঁকে নিয়ে যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে, যেখানে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

ম্যাকলিন চাকমা মূলত কবি; তবে তাঁর সাহিত্যসাধনা কেবল কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়। ছোটগল্প, নাটক, গান, প্রবন্ধ—প্রতিটি শাখায় তিনি সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করেন। তাঁর প্রকাশিত তিনটি চাকমা কাব্যগ্রন্থ—‘দেবংসি’ (২০১৮), ‘আচ্’ (২০১৯) এবং ‘নুও গরি ফাগুন এঝের’ (২০২০)—চাকমা ভাষার আধুনিক কাব্যধারায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। পাশাপাশি চাকমা, বাংলা ও ইংরেজি—তিন ভাষায় একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

তাঁর কবিতায় পাহাড়ের প্রকৃতি যেমন জীবন্ত হয়ে ওঠে, তেমনি উচ্চারিত হয় আদিবাসী মানুষের জীবনসংগ্রাম, মাতৃভাষার মমত্ব, ইতিহাসের ক্ষত, প্রেমের নির্মলতা এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। তাঁর শব্দচয়ন সংযত, অথচ গভীর; ভাষা সহজ, কিন্তু ভাবের বিস্তার সুদূরপ্রসারী। এই কারণেই তাঁর কবিতা শুধু চাঙমা পাঠকের নয়, বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যাঙ্গনেরও মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

দেশের বিভিন্ন সাহিত্যপত্র, লিটল ম্যাগাজিন এবং জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ-এ তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। দেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতের সাহিত্যপত্রেও তাঁর কবিতা ও ছোটগল্প স্থান পেয়েছে। সাহিত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সাহিত্যপত্র ‘রঁদেভু’-এর ১৭তম সংখ্যা এবং মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার স্মরণে প্রকাশিত ‘কেওক্রডং’-এর ২০২২ সংখ্যা তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘নুও গরি ফাগুন এঝের’ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার বাংলা বিভাগের একটি কোর্সে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া তাঁর সাহিত্যকীর্তির এক অনন্য স্বীকৃতি।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ইউনেস্কো ঢাকার একটি প্রকল্পে কাজ করেন। ইউনেস্কো প্রকাশিত Of Roots of Heritage: Tales from the Hills গ্রন্থে তাঁর একটি যৌথ গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একই গ্রন্থের পাঁচটি গল্প বাংলা থেকে চাকমা ভাষায় অনুবাদ এবং চাকমা ফন্টে লিপ্যন্তরের দায়িত্বও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেন। ২০২৩ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কবিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত আন্তর্জাতিক অনলাইন কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ লাভ করেন। কানাডা, চীন, গ্রিস, ইরান, ফিলিপাইন, সার্বিয়া ও বাংলাদেশের কবিদের সঙ্গে একই মঞ্চে কবিতা পাঠ তাঁর সাহিত্যযাত্রাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে দেয়।

চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৮ সালে বরুনাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, ২০২৫ সালে কাট্টলী বরুনাছড়ি ও ধামাইছড়া মৌজাস্থ চাকুরিজীবী কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেড এবং ২০২৬ সালে বাংলাদেশ আদিবাসী কবি, লেখক ও সাহিত্যিক ঐক্য পরিষদ আয়োজিত আদিবাসী সাহিত্য উৎসবে সম্মাননায় ভূষিত হন।

 
বর্তমানে তিনি মোনঘরে সহকারী প্রকাশনা ও যোগাযোগ কর্মকর্তা ও মোনঘর রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ (চাঙমা ভাষা) শিক্ষকতা করছেন। পাশাপাশি চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রাইটার্স ইউনিয়ন-এর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-গবেষণা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ম্যাকলিন চাকমার সাহিত্যজীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আশ্রয়। তাঁর কবিতা পাহাড়ের বাতাসে জন্ম নেয়, ঝরনার জলে ধুয়ে যায়, মানুষের হৃদয়ে আশ্রয় খুঁজে নেয়। তিনি এমন এক কবি, যিনি শব্দ দিয়ে কেবল কবিতা নির্মাণ করেন না; নির্মাণ করেন একটি জাতির স্মৃতি, একটি ভূখণ্ডের চেতনা এবং ভবিষ্যতের প্রতি অবিচল বিশ্বাস। সময়ের প্রবাহে তাঁর সাহিত্যকর্ম নিঃসন্দেহে চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে বেঁচে থাকবে।

শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তাঁদের নিরলস কর্মে নির্মাণ করেছেন এক অনন্য অধ্যায়। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা, ইতিহাস ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। চাঙমা ভাষা, সাহিত্য সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার এই দীর্ঘ সংগ্রামে যাঁরা নীরবে আজীবন কাজ করে চলেছেন, তাঁদের অন্যতম জ্ঞান কীর্তি চাকমা তিনি একাধারে কবি, নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠকসব পরিচয়ের সমন্বয়ে এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক।

জ্ঞান কীর্তি চাকমার জন্ম (সার্টিফিকেট অনুসারে) ২০ জানুয়ারি ১৯৮৪ সালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উপজেলার উদাল বাগান গ্রামে। তাঁর পিতা সুপেন্দ্র চাকমা এবং মাতা তৃপ্তি বালা চাকমা। তাঁর সহধর্মিণী মধুমিতা মারমা। তাঁদের দুই কন্যারাশিয়া চাকমা (দীঘিনালা সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী) এবং এশিয়া চাকমা (উদাল বাগান উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী)

পাহাড়, বনাঞ্চল, প্রকৃতি এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিবেশে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়। এই পরিবেশই পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পীসত্তা, সাহিত্যচেতনা এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় উদাল বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে তিনি রাঙামাটির মোনঘর শিশু সদনে ভর্তি হন। মোনঘরেই তাঁর সাহিত্য, নাটক শিল্পচর্চার প্রকৃত ভিত্তি নির্মিত হয়।

২২ জানুয়ারি ১৯৮৯ সালে ভারতে শরণার্থী অবস্থায় তিনি তাঁর পিতার মৃত্যুসংবাদ পান। শৈশবের এই নির্মম ট্র্যাজেডি তাঁর জীবনে গভীর বেদনার ছাপ ফেললেও তিনি সেই বেদনাকেই সৃষ্টিশীল শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা, গল্প নাটক রচনা শুরু করেন এবং সহপাঠীদের নিয়ে নিজেই নাটক মঞ্চস্থ করতেন।

তাঁর সৃজনশীল প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে শিক্ষক মৃত্তিকা, ঝিমিত ঝিমিত, শান্তি দীপ্তাসহ অনেকে তাঁকে নাট্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। তাঁদের প্রেরণায় তিনি অভিনয় নাট্যরচনায় আরও মনোনিবেশ করেন।

এই সময়ে তিনি রচনা করেন

  • কবানত বাজ পজ্জে
  • দজ বারা এগার
  • চোগে পহর
  • ভাঙি পারে বুবর স্ববণ

এসব নাটকে সমাজবাস্তবতা, মানবিক সংকট, আত্মমর্যাদা, বৈষম্য এবং মানুষের সংগ্রামের চিত্র শক্তিশালীভাবে ফুটে ওঠে।

এসএসসি পাসের পর তিনি রাঙামাটি সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৯৮ সালে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন জুম্ম সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ একই সময়ে তিনি সম্পাদনা করেন রা-খা-বা বুক জ্বলি যার নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন।

সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্যচর্চা, নাট্যচর্চা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি। দীর্ঘ আট বছর সংগঠনটি সক্রিয় থাকলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সংগঠন বিলুপ্ত হলেও তাঁর সাংস্কৃতিক সংগ্রাম থেমে থাকেনি। তিনি কলম, মঞ্চ এবং ক্যামেরাকে হাতিয়ার করে ভাষা সংস্কৃতির জন্য কাজ করে যেতে থাকেন।

২০০২ সাল থেকে জ্ঞান কীর্তি চাকমা ধারাবাহিকভাবে টেলিফিল্ম নির্মাণ শুরু করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক নির্মাণগুলোর মধ্যে রয়েছে

  • মানিক্যা বৈদ্যর দারু তালিক
  • ভাঙি পারে বুবর স্ববন
  • তুজিম পুরো কোচপানা
  • আহভিলেজ
  • তামাকবিরোধী চলচ্চিত্র সাত গাঙ সাজুরি বাক্কে এযের আহ্ গরি
  • এ্যলা ফেলা

এসব চলচ্চিত্রে জুম্ম জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম, সামাজিক সংকট, জনসচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে।

২৫ জানুয়ারি ২০১১ সালে উদাল বাগানে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জুম্ম ফিল্ম এসোসিয়েশন (জুফা)

জুফা শুধু একটি চলচ্চিত্র সংগঠন নয়; এটি জুম্ম ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জাতিসত্তাকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সংরক্ষণ বিকাশের এক সাহসী সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।

সংগঠনটির প্রধান লক্ষ্য

  • চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজের নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা;
  • কুসংস্কার, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি;
  • শিক্ষা, মানবিকতা, সম্প্রীতি সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রসার;
  • জুম্ম ভাষা, সংস্কৃতি ঐতিহ্যের ধারাবাহিক সংরক্ষণ।

নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি ২০১৩ সালে ঢাকার প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইন- ছয় মাসব্যাপী অভিনয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র টেলিভিশন অভিনয় প্রশিক্ষণ কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করে সপ্তম স্থান অর্জন করেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁর অভিনয় চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন মাত্রা যোগ করে।

২০২০ সালে নির্মিত আন্দারত ধান হুজানা তাঁর শর্টফিল্ম নির্মাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে নির্মাণ করেন

রাধমন ধনপুদির ফুল পারা, নিজো টেঙত হুরোল মারানা, মরে তাগিজ, ডিএসএলআর ক্যামেরা, থার্টি ফাস্ট নাইট, বেজাদর হাজ্জেক, হেগা তাগলর কুপ, ছন্দবাজ, ভাইরাস, অধ গরাত, আহদ আগুন পেবে, ফাদা বাজত বিজে বাঝানা, গিরিত্তি ঘর বৌ, সজ্জানা, ঝড়া পাদার জিংকানি, বেলাব, দজা, ভাঙা গিরিত্তির যদন, ইলেকশন, ঝড় নেই দেবা কালা, চিগোন পিরে, পরা কবালর জিংকানি, হোদার আগুন লুরো, ঘর উন্দুরে বের কামারায়, কোচপানার চোগো পানি, লুরো শুগোর ছালত উদোনা, সত্য মিথ্যা চের আঙুল ফারক, টেঙা ফেরত চাং, ধুন্দুক, আদে ধন, ব্রেকআপ, ব্রেকআপ এবং ফক্কর।

এসব চলচ্চিত্রে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক অবক্ষয়, প্রেম, প্রযুক্তির প্রভাব, নির্বাচন, নৈতিক মূল্যবোধ এবং জুম্ম সমাজের জীবনবাস্তবতা শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য-নথি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

জ্ঞান কীর্তি চাকমা বিশ্বাস করেন, মানুষকে সচেতন করার অন্যতম সহজ মাধ্যম হলো হাস্যরস।

এই বিশ্বাস থেকেই তিনি নির্মাণ করেছেন

ওয়ান আনা টু ব্যানেনা, ভাইরাস, ব্যস্ত আগং, সরি, কগেয়্যা চুর, উত্তর সারাংশ দেখ, ভূত চালান, কুরো চুর, বৈদ্য, ইহি, উগুদো জিরেন, শালিজ, বিলেই, পাচ আহদ, চুর, শামুখ, কুন্দি যেম, তিবিরে, ইন্টারভিউ, ফুটবল, জোধা, দারু এবং সরি সাবজেক্টসহ অসংখ্য জনপ্রিয় ফানি ভিডিও।

এসব ভিডিও কেবল বিনোদনের জন্য নির্মিত নয়; বরং ব্যঙ্গ, রসিকতা বাস্তব জীবনের ঘটনাকে উপজীব্য করে সামাজিক অসংগতি তুলে ধরে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেয়।

জ্ঞান কীর্তি চাকমার জীবন প্রমাণ করেসীমিত সম্পদ কখনো মহান স্বপ্নের পথে অন্তরায় হতে পারে না। তিনি চলচ্চিত্রকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং সামাজিক পরিবর্তন, ভাষা সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং জাতিসত্তার ইতিহাস ধারণের এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সংগ্রামী ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল। আজ তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নন; তিনি জুম্ম চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা জুম্ম ফিল্ম এসোসিয়েশন (জুফা) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে।

জ্ঞান কীর্তি চাকমার সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা এবং নিরলস সাধনা পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ভাষা, সাহিত্য, নাটক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণ করে চলেছেন, তা শুধু জুম্ম সমাজের নয়; বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও এক অমূল্য সম্পদ।

 

পদ নয়, ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এক মানুষ - ইনজেব চাঙমা

 

ইনজেব চাঙমা
ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে কিছু সিদ্ধান্ত কাগজের ফাইলে বন্দী থাকে না, ফাইলের হলুদ পাতায় শুকিয়ে যায় না। তারা রক্তে-অশ্রুতে, দীর্ঘশ্বাসে ও প্রতীক্ষায় এক একটি জাতির বিবেক হয়ে ওঠে।
 
কিছু মন্ত্রণালয় ইট-কাঠের দপ্তর নয়। কিছু চেয়ার কেবল ক্ষমতার আসবাব নয়। সে চেয়ার আসলে এক জনগোষ্ঠীর হৃদপিণ্ডের স্পন্দন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় তেমনই একটি নাম, যে নাম উচ্চারিত হলেই পাহাড়ের বুক চিরে বেরিয়ে আসে পোড়া গ্রামের কালো ধোঁয়া, জুমের ফসলের মতো ঝরে পড়া স্বপ্ন, আর মায়ের কোলে ফিরতে না পারা সন্তানের জন্য এক অন্তহীন অপেক্ষা।
 
এই মন্ত্রণালয় তাই কোনো প্রশাসনিক অলঙ্কার নয়, এটি একটি ক্ষত, একটি অঙ্গীকার, একটি দীর্ঘ, অনন্ত শান্তির প্রার্থনা।
ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, একাধারে বিদগ্ধ আইনজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক, নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাঁর কাঁধে আজ কেবল প্রতিমন্ত্রীর সিলমোহর নয়, জমে আছে পাহাড়ের শতাব্দী প্রাচীন দীর্ঘশ্বাসের ভার।
 
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, তাঁর লন্ডনের ব্যারিস্টারি তাঁকে শুধু আইনের ধারা শেখায়নি, শিখিয়েছে ন্যায়ের সামনে মাথা নত করতে। তাঁর রাজনীতি তাঁকে শুধু ক্ষমতার অঙ্ক শেখায়নি, শিখিয়েছে ইতিহাসের ডাক শুনতে।
 
কারণ, শিক্ষা কখনো দম্ভের স্তম্ভে দাঁড়ায় না, শিক্ষা দাঁড়ায় ন্যায়কে নির্ভয়ে আলিঙ্গন করার সাহসে। আর নেতৃত্ব কখনো চেয়ার আঁকড়ে থাকায় মহান হয় না, নেতৃত্ব মহান হয় চেয়ার ছেড়ে দিয়ে সত্যের পাশে এসে দাঁড়ানোর ঔদার্যে।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কোনো রাজদরবারের দয়া নয়, কোনো অনুকম্পার হাততালি নয়। এ এক রক্ত নদী পেরিয়ে আসা সনদ। এর প্রতিটি অক্ষর লেখা হয়েছে, পাহাড়ের ঢালে ঢালে জ্বলে ওঠা গ্রামের কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ায়, ভিটেহারা মানুষের শূন্য চৌকাঠে জমে থাকা নিঃশব্দ অশ্রুতে,
আর একটাই আকুতিতে, আমার সন্তান যেন আর বন্দুকের শব্দে ঘুম ভেঙে না জাগে।
 
তাই এই দপ্তরের মালিকানা বদলের প্রশ্নটি কোনো বদলির নোটিশ নয়। এটি আস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন। এটি একজন পাহাড়ি মায়ের কাছে রাষ্ট্রের ফিরে আসার গল্প। এটি মর্যাদার পুনরুদ্ধার।
এখানে বিদ্বেষের কোনো কালি নেই। ব্যক্তি হেলাল উদ্দিনের প্রতি আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই তো এই, ব্যক্তিকে সম্মান রেখেই নীতির প্রশ্নে আমরা আপসহীন হতে পারি।
আজ ঊনত্রিশটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। শান্তি চুক্তির পাতা উল্টালে এখনো ধুলো ওড়ে। পাহাড়ি মানুষ এখনো জানে না, তার পায়ের নিচের মাটিটা তারই কি না, ভূমির অধিকার আজও এক অনিশ্চিত প্রশ্ন।
সে এখনো জানে না, তার নিজের ভাষায়, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকারটুকু রাষ্ট্র দেবে কি না, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন আজও এক অসমাপ্ত কবিতা। পাহাড় আর সমতলের মাঝে যে অদৃশ্য দেয়াল, সেই দেয়ালে আজও আস্থার কোনো জানালা খোলেনি।
 
এই ক্ষণে প্রয়োজন একটি বজ্রকঠিন, অথচ মেঘের মতো কোমল সিদ্ধান্ত। এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা পাহাড়কে বলবে, রাষ্ট্র তোমাকে ভোলেনি। এবং সেই সিদ্ধান্তের মহানায়ক হতে পারেন ব্যারিস্টার হেলাল নিজেই।
 
তিনি যদি আজ ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আত্মার দিকে তাকিয়ে, হাসিমুখে বলেন, "এই আসনটি আমার নয়, এই আসনটি পাহাড়েরই কোনো সন্তানের প্রাপ্য" — তবে তিনি ছোট হবেন না।
বরং ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে অন্যভাবে। কালের মহাকাব্যে তাঁর নাম লেখা থাকবে সোনার হরফে। কারণ ইতিহাস মন্ত্রীর তালিকা মনে রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে সেই মানুষটিকে, যে ক্ষমতার মোহকে উপেক্ষা করে ন্যায়ের পক্ষে একা দাঁড়িয়েছিল।
 
ভূমি মন্ত্রণালয় তো তাঁর হাতেই। সেখানেও তিনি হতে পারেন পাহাড়ের ত্রাতা। বছরের পর বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে থাকা ভূমি কমিশনের চাকায় তিনি-ই তো তেল দিতে পারেন। যুগের পর যুগ ধরে জমে থাকা ভূমি বিরোধের জট তিনি-ই তো খুলতে পারেন ন্যায়ের আঙুলে।
 
তাই এই হস্তান্তর কোনো পদত্যাগ নয়, কোনো পলায়ন নয়। এ এক মহৎ আত্ম-বিসর্জন। ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে বৃহত্তর ক্ষমতাকে, মানুষের ভালোবাসাকে, বরণ করে নেওয়া।
মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র তখনই মহৎ হয়, যখন সে তার দেওয়া কথার মর্যাদা রাখে। ক্ষমতা তখনই সুন্দর হয়, যখন সে ন্যায়ের সামনে নতজানু হতে শেখে। আর একজন মানুষ তখনই কালজয়ী হন, যখন তিনি নিজের চেয়ারের চেয়ে মানুষের অধিকারকে বড় করে দেখেন।
 
তাই আজ আহ্বান, করজোড়ে নয়, হৃদয়ের গভীর থেকে আহ্বান। পদের মোহ কেটে যাক, জেগে উঠুক বিবেক। হিসাব-নিকাশের সংকীর্ণ রাজনীতি মুছে যাক, জন্ম নিক সম্প্রীতির এক নতুন পাহাড়। কারণ ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, চেয়ার ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু একটি সাহসী, ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত, সে অনন্তকাল ধরে পাহাড়ের প্রতিটি ঝর্ণার মতো বয়ে চলে, মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধার প্রদীপ হয়ে জ্বলে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

কবি সরোজ কান্তি চাঙমা: চাঙমা সাহিত্য ও সংগীতের এক নিবেদিত প্রাণ - ইনজেব চাঙম

 

চাঙমা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশে এমন কিছু নক্ষত্র আছেন, যাঁদের আলো কখনো কোলাহল সৃষ্টি করে না, অথচ নিভৃত দীপ্তিতে একটি জাতির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আলোকিত করে রাখে। কবি সরোজ কান্তি চাঙমা তেমনই এক নির্মোহ সাহিত্যসাধক। তিনি একই সঙ্গে গীতিকার, সুরকার, কবি, ঔপন্যাসিক ও লেখক—একজন বহুমাত্রিক স্রষ্টা, যাঁর সৃজনযাত্রা চাঙমা ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্বকে আরও দৃঢ় ও প্রাণময় করে তুলেছে।
 
তিনি বিশ্বাস করেন, মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস, অনুভূতি ও ভবিষ্যতের ভিত্তি। তাই সাহিত্যচর্চাকে তিনি ব্যক্তিগত খ্যাতির নয়, বরং জাতিসত্তার দায়বোধের জায়গা থেকে গ্রহণ করেছেন। নীরবে, নিরলসভাবে তিনি লিখে চলেছেন—কখনো কবিতায়, কখনো গানে, কখনো গল্পে, আবার কখনো উপন্যাসে।
চাঙমা সংগীতের ভুবনে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। তাঁর রচিত বহু গান আজও পাহাড়ের জনপদে মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হয়। বিশেষ করে—
“মোনো জুমো তুগুনোত উদিনেই,
চেরোপালা রিনি চাং...
দুরোর পানিয়ানে ডাগে মরে,
কালাবি ভারি গুরি মনত উদে তরে।”
এই গানটি কেবল একটি জনপ্রিয় সংগীত নয়; এটি চাঙমা জনজীবনের আবেগ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত অনুষঙ্গ। তাঁর সুর ও কথার মাধুর্য লোকজ অনুভূতিকে এমনভাবে ধারণ করেছে যে গানটি আজ মানুষের হৃদয়ের সম্পদে পরিণত হয়েছে।
 
সংগীতের পাশাপাশি সাহিত্যেও তাঁর অবদান গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। চাঙমা ভাষা ও চাঙমা বর্ণমালায় রচিত তাঁর উপন্যাস ‘মেঘুলো দেবার আহ্জি’ চাঙমা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। এমন এক সময়ে, যখন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষায় মৌলিক সাহিত্য রচনা নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি, তখন তিনি মাতৃভাষায় উপন্যাস লিখে প্রমাণ করেছেন—চাঙমা ভাষাও গভীর জীবনবোধ, শিল্পসৌন্দর্য ও সৃজনশীলতার শক্তিশালী বাহন হতে পারে। তাঁর এই প্রয়াস কেবল একটি গ্রন্থ প্রকাশের ঘটনা নয়; এটি একটি ভাষার সাহিত্যিক সম্ভাবনার সাহসী ঘোষণা।
 
১৯৭১ সালের ২০ জুলাই রাঙামাটি পার্বত্য জেলার নান্যাচর উপজেলার প্রত্যন্ত এগারাল্যা ছড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা বিরাজ মোহন চাঙমা এবং মাতা বিজয় বালা তালুকদার। শৈশব থেকেই প্রকৃতি, লোকজ সংস্কৃতি ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে। পাহাড়ের নিসর্গ, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং মাতৃভাষার মমত্ববোধ তাঁর সৃষ্টিশীল মননকে ক্রমে পরিণত করেছে।
 
তিনি সিঙ্গিনালা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং রাঙ্গুনিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক (বিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি নান্যাচর উপজেলার বাকছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। শিক্ষকতা তাঁর পেশা হলেও সাহিত্য তাঁর আজীবনের সাধনা। শ্রেণিকক্ষে তিনি যেমন শিশুদের হাতে জ্ঞানের আলো তুলে দেন, তেমনি লেখনির মাধ্যমে একটি ভাষা ও সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্নও লালন করেন।
 
ব্যক্তিজীবনে তিনি শর্মিতা চাঙমার জীবনসঙ্গী। তাঁদের এক পুত্র দীঘোল চাঙমা এবং এক কন্যা নিষ্ঠা বৃত্তি চাঙমা। পরিবার, শিক্ষকতা ও সাহিত্য—এই তিন ধারাকে সমান্তরালভাবে বহন করেই তিনি তাঁর সৃজনযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।
 
এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা একটি হলেও তার সাহিত্যিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ‘মেঘুলো দেবার আহ্জি’-এর পাশাপাশি চাঙমা ভাষায় রচিত তাঁর অসংখ্য কবিতা, ছোটগল্প ও গান বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে। তাঁর প্রায় বিশটি গান প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে দশটি ধর্মীয় সংগীত। কিন্তু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর বহু কবিতা, গান ও ছোটগল্প এখনো প্রকাশের আলোর মুখ দেখেনি। অপ্রকাশিত সেই পাণ্ডুলিপিগুলো যেন সময়ের কাছে নীরব অপেক্ষায় থাকা একেকটি অমূল্য সম্পদ।
বাংলাদেশে আদিবাসী লেখকদের জন্য প্রকাশনার পথ আজও সহজ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের নিজস্ব অর্থায়নে বই প্রকাশ করতে হয়। ফলে বহু প্রতিভাবান সাহিত্যিকের সৃষ্টিকর্ম পাণ্ডুলিপির ভাঁজেই বন্দি থেকে যায়। কবি সরোজ কান্তি চাঙমাও সেই কঠিন বাস্তবতার এক নীরব সাক্ষী। অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর সাহিত্যসাধনাকে থামিয়ে দিতে পারেনি; বরং প্রতিকূলতার মধ্যেই তিনি সৃষ্টি করে চলেছেন ভাষা ও সংস্কৃতির এক অমূল্য ভাণ্ডার। তাঁর অপ্রকাশিত রচনাগুলো শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, সমগ্র চাঙমা জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
 
একজন সাহিত্যিকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর খ্যাতিতে নয়, তাঁর সৃষ্টির স্থায়িত্বে। সরোজ কান্তি চাঙমার সাহিত্য ও সংগীত সেই স্থায়িত্বেরই প্রতিশ্রুতি বহন করে। তিনি প্রমাণ করেছেন, নিবেদিত সাধনা কখনো বৃথা যায় না; একটি ভাষার জন্য একজন মানুষের একাগ্র ভালোবাসাও ইতিহাস নির্মাণ করতে পারে।
চাঙমা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার যে নীরব অভিযাত্রায় তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, তা নিঃসন্দেহে গভীর শ্রদ্ধার দাবিদার। তাঁর মতো সাহিত্যসাধকদের যথাযথ মূল্যায়ন, প্রকাশনার সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে চাঙমা সাহিত্য আরও বিকশিত হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তখন শুধু একটি ভাষাই উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে না; পাবে তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় এবং সাহিত্যিক গৌরবের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। আর সেই ভাণ্ডারের নির্মাতাদের অন্যতম উজ্জ্বল নাম হয়ে থাকবে—কবি সরোজ কান্তি চাঙমা।

মাতৃভাষার প্রদীপ ও বর্ণমালার রূপকার

ইনজেব চাঙমা  “একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল কিছু শব্দের বিলুপ্তি নয়; হারিয়ে যায় একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের দ...