মানুষের জীবনে কিছু গল্প থাকে, যা কেবল ব্যক্তিগত ইতিহাসের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না—তা এক বিস্তীর্ণ জনপদের স্মৃতি, একটি জাতিসত্তার সংগ্রাম এবং মাতৃভাষার দীর্ঘশ্বাসকে ধারণ করে। কবি ঊষাতন চাকমা তেমনই এক অনন্য জীবনগাথার নাম। তিনি এমন এক সাহিত্যিক, যার কলমে পার্বত্য চট্টগ্রামের নিসর্গ যেমন রঙিন হয়ে ওঠে, তেমনি বাস্তুচ্যুত জীবনের নির্মম বেদনা, মাতৃভাষার আকুলতা, মানুষের প্রতি গভীর মমত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি অটল দায়বদ্ধতা সমান শক্তিতে ধ্বনিত হয়। তাঁর কবিতা কেবল কাব্যিক সৌন্দর্যের অন্বেষণ নয়; বরং ইতিহাস, স্মৃতি, আত্মপরিচয় ও স্বপ্নের এক চিরন্তন অভিযাত্রা।
সার্টিফিকেট অনুযায়ী ১৯৮০ সালের ২ জুলাই খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার শান্তিপুর গ্রামের (চেঙে পার) সবুজ-শ্যামল প্রকৃতির বুকে কবি ঊষাতন চাকমা জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা বিনয় কৃষ্ণ চাকমা এবং মাতা সুমিতা চাকমা। চার সন্তানের স্নেহময় পরিবারে তিনি দ্বিতীয় সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠেন।
বর্তমানে তাঁর সহধর্মিণী তন্বী চাঙমা, যার পৈতৃক নিবাস রাঙামাটি জেলার তবলছড়ি এলাকার মাঝের বস্তি। তাঁদের দাম্পত্য জীবন দুই সন্তানের হাসি-আনন্দে পরিপূর্ণ, পুত্র উৎকর্ষ চাঙমা (তূর্ণ), ৯ম শ্রেণি এবং কন্যা রূধিরা চাঙমা (তমা) ৪ বছর। পাহাড়ের নির্মল বাতাস, ঝরনার সুর, জুমক্ষেতের রঙিন সৌন্দর্য এবং পাহাড়ি মানুষের সহজ-সরল জীবন ছিল তাঁর শৈশবের প্রথম পাঠশালা।
তবে এই শান্ত ও নির্মল শৈশব বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। ইতিহাসের অস্থির তরঙ্গ তাঁকে খুব অল্প বয়সেই উদ্বাস্তু জীবনের করুণ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করায়। ১৯৮৬ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত চারটি বছর তাঁর জীবনের সবচেয়ে গভীর ও বেদনাময় অধ্যায়। পরিবারের সঙ্গে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতের বাগানটিলা শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া, নিরাপত্তার অভাব, অনিশ্চিত দিন আর অন্ধকারের মধ্যে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা তাঁর শিশুমনে যে ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল, তা-ই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। এই সংকীর্ণ বাস্তবতার মাঝেও তিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন- একদিন স্বদেশে ফিরে নিজের ভাষায় লিখবেন, নিজের মানুষের কথা বলবেন। সেই স্বপ্নই পরবর্তীতে তাঁর সাহিত্যচর্চার শক্ত ভিত্তি রচনা করে।
শান্তিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা হলেও শরণার্থী শিবিরের অনিশ্চয়তার মধ্যে দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে হয়। দেশে ফেরার পর পানছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। এরপর পানছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় (বর্তমানে পানছড়ি সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়) থেকে ১৯৯৬ সালে এসএসসি এবং খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৯৮ সালে এইচএসসি সম্পন্ন করেন।
উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে সফলতার সঙ্গে স্নাতক (অনার্স) ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্ত ও বিস্তৃত সাহিত্যাঙ্গন তাঁর চিন্তার জগৎকে নতুন মাত্রা দেয়। বাংলা, ইংরেজি ও বিশ্বসাহিত্যের বিস্তৃত পাঠ তাঁর কাব্যভাষাকে পরিপক্ব ও সমৃদ্ধ করে তোলে।
শিক্ষকতা দিয়ে কবি ঊষাতন চাকমার কর্মজীবনের সূচনা ঘটে। ২০০৭ সালে চট্টগ্রামের মেরন সান স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন এবং পরবর্তীতে ঢাকার বনফুল আদিবাসী গ্রিন হার্ট কলেজে শিক্ষকতা করেন। তরুণদের মাঝে জ্ঞানের আলো ছড়ানোর এই সময়টি তাঁর জন্য অত্যন্ত প্রীতিময় ও তৃপ্তিদায়ক ছিল।
পরবর্তীতে ২০০৯ সালে তিনি জনতা ব্যাংক পিএলসি.-তে যোগদান করে পেশাগত জীবনে নতুন অধ্যায় সূচনা করেন। বর্তমানে তিনি মতিঝিলে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে প্রিন্সিপাল অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পেশাগত নানা ব্যস্ততা সত্ত্বেও সাহিত্য সৃষ্টি থেকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন হননি; দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন শেষে তিনি প্রতিনিয়ত ফিরে গিয়েছেন কবিতার নীরব ও সৃষ্টিশীল জগতে।
কলেজজীবনে সূচনা হলেও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তাঁর সাহিত্যচর্চা গতি পায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসভিত্তিক পত্রিকায় বাংলা কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর আত্মপ্রকাশ ঘটে। পরবর্তীতে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা, লিটল ম্যাগাজিন, অনলাইন সাহিত্যপত্র এবং শিশু-কিশোর সাময়িকীতে তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হতে থাকে।
তিনি ছড়া, কবিতা, ছোটগল্প এবং শিশুদের জন্য গান রচনায় সমান স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। তাঁর লেখার ভাষা সহজ-সরল, অথচ অনুভূতি অত্যন্ত গভীর। তাঁর কাব্যভাষায় পাহাড়ের মাটি, মানুষের জীবনসংগ্রাম, প্রেম, বেদনা ও আত্মপরিচয়ের সুর একাকার হয়ে ফুটে ওঠে।
প্রকাশিত ও উল্লেখযোগ্য কাজসমূহ:
রানজুনির রং (২০২২): চাকমা ভাষায় প্রকাশিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ, পাহাড়সম হৃদয় (২০২৩): বাংলা ভাষায় রচিত কাব্যগ্রন্থ, চাঙমা নিজেনী: যৌথভাবে সম্পাদিত চাকমা ভাষা শিক্ষার বই। সংজোআর: চাকমা সাহিত্য বা-এর রজতজয়ন্তী উপলক্ষে সম্পাদিত বিশেষ স্মারকগ্রন্থ। এবং শিশুদের মাতৃভাষা শিক্ষায় অবদান রাখার লক্ষ্যে চাকমা ভাষায় রচিত তাঁর একটি ছড়াগ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
শিশু-কিশোর সাহিত্যচর্চার প্রতি কবি ঊষাতন চাকমার গভীর অনুরাগ রয়েছে। ঢাকার শিশু-কিশোর পত্রিকা- কানামাছি এবং বগুড়ার কুঁড়ি পত্রিকায় তিনি নিয়মিত লেখেন। তিনি বিশ্বাস করেন, কচি-কাঁচাদের হাতে বই তুলে দিতে পারলে ভাষা ও সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত থাকবে।
এছাড়া ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলন, কবিতা উৎসব ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি করেন। তাঁর উচ্চারিত কবিতায় ব্যক্তিগত আবেগের পাশাপাশি পাহাড়ের সম্মিলিত কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনি লাভ করে।
ঊষাতন চাকমার সাহিত্যভাবনার মূল কেন্দ্রে রয়েছে মাতৃভাষা, সংস্কৃতি এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, একটি জাতির ভাষা হারিয়ে গেলে তার অস্তিত্ব ও ইতিহাসও ধীরে ধীরে মুছে যায়। তাই তাঁর কাছে সাহিত্যচর্চা কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়, এটি জাতিসত্তা ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক নিরন্তর সংগ্রাম।
ব্যক্তিজীবনে তিনি একজন দায়িত্বশীল ও পরিবারপ্রেমী মানুষ। তাঁর সহধর্মিণী তন্বী চাকমা ঢাকার সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার্স গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ-এর একজন সিনিয়র শিক্ষক। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে তাঁদের পরিবার পারস্পরিক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও শিক্ষণীয় মূল্যবোধে সমৃদ্ধ।
কবি ঊষাতন চাকমার জীবনপ্রবাহ প্রমাণ করে যে সংগ্রাম মানুষকে ভেঙে ফেলে না, বরং তাকে আরও মানবিক, সংবেদনশীল ও সৃজনশীল করে তোলে। শরণার্থী শিবিরের নির্মম কষ্ট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চা, শিক্ষকতার অনুভূতি, ব্যাংকিং জীবনের ব্যস্ততা এবং সাহিত্যসাধনার নিরলস পথচলা- সব মিলিয়ে তিনি আজ পাহাড়ি জনপদের এক অনন্য ও স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। যতদিন পাহাড়ের প্রকৃতি রবে এবং মাতৃভাষার প্রতি মানুষের ভালোবাসা থাকবে, ততদিন কবি ঊষাতন চাকমার কবিতা পাঠকের হৃদয়ে চির অম্লান থাকবে।

