মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কুমার সমিত রায়: পাহাড়ের সুর, মাটির মানুষ - ইনজেব চাঙমা

  

    

    পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ক্রীড়াঙ্গনের বিস্তৃত পরিসরে কিছু মানুষ তাঁদের কর্মের মধ্য দিয়ে সময়কে অতিক্রম করে স্মরণীয় হয়ে থাকেন। কুমার সমিত রায় ছিলেন তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গীতিকার, সুরকার, সাহিত্যপ্রেমী, শিক্ষক, ক্রীড়াবিদ ও সংগঠক। জন্মসূত্রে চাকমা রাজপরিবারের সন্তান হয়েও তাঁর জীবন ছিল রাজকীয় আড়ম্বর থেকে অনেক দূরে, ছিল সাধারণ মানুষের প্রতি গভীর মমতা, পাহাড়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা এবং সৃষ্টিশীলতার এক নিরন্তর সাধনা।
চাকমা সঙ্গীতজগতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তাঁর রচিত ও সুরারোপিত-

 “আজার বজর ধরি”, “কোচপানা কারে কয়”, “গাজ ফাগন্দি জুনান যেক্কে উদে”, “ও বার্গী তুই যা উরি” 

সহ অসংখ্য গান আজও চাকমা তরুণদের কণ্ঠে বেঁচে আছে। তাঁর গান কেবল বিনোদনের জন্য রচিত হয়নি; সেখানে ধরা পড়েছে পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের প্রেম-বিরহ, লোকজ ঐতিহ্য, রাধামন-ধনপুদি ও শিবচরণ-চান্দবীর মতো লোককাহিনি এবং হারিয়ে যেতে বসা এক রাঙামাটির স্মৃতি।

    ১৯৪৩ সালের ২২ আগস্ট চাকমা রাজপরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কুমার সমিত রায়। তিনি ছিলেন ৪৯তম চাকমা রাজা নলিনাক্ষ রায় ও রানী বিনীতা রায়ের দ্বিতীয় সন্তান। তাঁর ডাকনাম ছিল জনি। দুই ভাই ও তিন বোনের স্নেহে, রাজপরিবারের সাংস্কৃতিক আবহে এবং রাঙামাটির প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে তাঁর শৈশব কেটেছিল।
    তাঁর সহোদরদের মধ্যে ছিলেন কুমারী অমিতি রায়, রাজা ত্রিদিব রায়, কুমারী মৈত্রী রায়, কুমারী রাজশ্রী রায় এবং কুমার নন্দিত রায়। ছোটবেলা থেকেই সমিত রায় ছিলেন অত্যন্ত মিশুক, প্রাণবন্ত ও প্রকৃতিপ্রেমী।
তবে শৈশবেই তাঁকে পিতৃবিয়োগের বেদনা বহন করতে হয়। ১৯৫১ সালের ৭ অক্টোবর মাত্র ৪৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন রাজা নলিনাক্ষ রায়। পিতার এই অকালপ্রয়াণ তাঁর জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

    কুমার সমিত রায়ের শিক্ষাজীবনের সূচনা কলকাতায়। পরবর্তীতে দার্জিলিংয়ের ভিক্টোরিয়া স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং ১৯৬২ সালে সেখান থেকে সিনিয়র ক্যামব্রিজ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৬৩-৬৪ শিক্ষাবর্ষে ঢাকার নটরডেম কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। এরপর চট্টগ্রাম কলেজ থেকে বিএ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। চট্টগ্রাম কলেজে অধ্যয়নকালে এক বছর আইন বিষয়েও পড়াশোনা করেছিলেন। কিন্তু আইনশাস্ত্রের প্রতি আগ্রহ অনুভব না করায় পরে সেই পড়াশোনা ছেড়ে দেন। শিক্ষাজীবনের বিস্তৃত অভিজ্ঞতা তাঁকে শুধু একজন জ্ঞানী মানুষই করেনি, বরং তাঁর চিন্তা, সাহিত্যবোধ, ইতিহাসচেতনা ও সাংস্কৃতিক মননকে আরও সমৃদ্ধ করেছিল।

মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জনের পর কুমার সমিত রায় দুবার সিএসপি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন বলে জানা যায়। তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের ফরেন অ্যাফেয়ার্স বিভাগে করাচিতে চাকরির সুযোগও তিনি লাভ করেছিলেন। কিন্তু সেই চাকরিতে যোগ দেননি। কারণ, তাঁর কাছে চাকরির মর্যাদার চেয়েও প্রিয় ছিল নিজের পাহাড়, নিজের রাঙামাটি এবং নিজের মানুষ। দূরদেশের আরাম-আয়েশের জীবন তাঁকে আকৃষ্ট করতে পারেনি। তাঁর মন পড়ে ছিল কর্ণফুলীর তীরে, পাহাড়ের সবুজ ঢালে, রাঙামাটির মানুষের কাছে। জীবনের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও প্রমাণ করেছে- নিজের মাটির প্রতি তাঁর এই টান ছিল গভীর ও আজীবন।

    ১৯৭২ সালে ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে রাঙামাটি সরকারি কলেজে যোগ দেন কুমার সমিত রায়। দীর্ঘ কর্মজীবন শেষে ২০০৪ সালে সেখান থেকেই অবসর গ্রহণ করেন। শ্রেণিকক্ষে তিনি শুধু ইতিহাস পড়াতেন না; শিক্ষার্থীদের জীবনের প্রতি দায়বদ্ধতা, মানবিকতা ও স্বপ্ন দেখার সাহস জোগাতেন। তাঁর অনেক ছাত্রের কাছে তিনি ছিলেন শুধু শিক্ষক নন, ছিলেন অভিভাবকের মতো একজন মানুষ।

    তাঁর মৃত্যুর পর এক ছাত্র এসে তাঁর স্ত্রী জয়তি রায়ের কাছে তাঁর স্মৃতিচারণ করেছিলেন। সেই ছাত্রকে কলেজজীবনে সমিত রায় নিয়মিত আর্থিক সহায়তা করতেন। পরবর্তীকালে সেই ছাত্র চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। এমন অসংখ্য মানুষের জীবনে তিনি নীরবে আলো জ্বেলেছেন- যার অনেক গল্প তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশই পায়নি।

    কুমার সমিত রায়ের ব্যক্তিজীবনেও ছিল এক মায়াময় প্রেমকাহিনি। রাঙামাটির পুরোনো দিনের কর্ণফুলীর তীর, হাজারীবাগের মাঠ, রাজবাড়ির আশপাশের সেই পরিচিত পরিবেশেই তাঁর সঙ্গে জয়তি রায়ের পরিচয় ও সখ্য গড়ে ওঠে। জয়তি রায় ছিলেন তখন অল্পবয়সী। বান্ধবীদের সঙ্গে তিনি মাঠে খেলতে যেতেন। সমিত রায় ছিলেন রসিক ও বন্ধুত্বপরায়ণ। একদিন মাঠে আসা মেয়েদের জন্য তিনি চুড়ি কিনে আনেন। অন্যরা চুড়ি নিলেও জয়তি প্রথমে নিতে অস্বীকার করেন। পরে বান্ধবীদের অনুরোধে চুড়ি গ্রহণ করলে সমিত রায় আনন্দিত হন। সেই ছোট্ট স্মৃতিই পরবর্তীতে তাঁর গানে রূপ পায়-

“ইধোত আগেনি নেই? পূণ্যামেলাত্তুন।
কিনি দিদুং বাঙুরী, পিনেই দিদুঙ মুই!!”

    পরিবারের সম্মতিতে ১৯৬৫ সালে তাঁদের প্রণয় পরিণয়ে রূপ নেয়। জয়তি রায় হয়ে ওঠেন তাঁর জীবনসঙ্গী।

    সমিত রায়ের শিল্পীসত্তার ভিত গড়ে উঠেছিল শৈশবেই। তাঁর মা বিনীতা রায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সান্নিধ্য লাভ করেছিলেন। তাঁর কাকা সলিল রায় ছিলেন চাকমা সমাজের প্রথমদিককার কবিদের একজন। রাজপরিবারে শিল্পী-সাহিত্যিকদের যাতায়াত ছিল। কলকাতায় পড়াশোনার সময়ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় তিনি অংশ নিতেন।এই পরিবেশ তাঁর ভেতরে যে সৃজনশীল বীজ বপন করেছিল, পরবর্তী জীবনে তা মহীরুহে পরিণত হয়।

    ১৯৭০-এর দশকে কুমার সমিত রায় তাঁর ছোট ভাই কুমার নন্দিত রায় (রেনি) এবং কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘উন্মাদ শিল্পীগোষ্ঠী’। শুরুতে তাঁরা অন্য শিল্পীদের গান পরিবেশন করতেন। পরে ১৯৮০-এর দশকে নিজেদের গান নিয়ে নতুন পথচলা শুরু হয়। এই সময় থেকেই সমিত রায়ের গীতিকার ও সুরকার হিসেবে পূর্ণ বিকাশ ঘটে।
    রাজবাড়ির ড্রয়িংরুমে বসে তিনি আপনমনে গানের কথা লিখতেন, তারপর নিজের গানের সুর নিজেই গুনগুন করে তৈরি করতেন। বন্ধুদের সঙ্গে চলত জ্যামিং। সেই সৃজনমগ্ন পরিবেশ থেকেই জন্ম নিয়েছে চাকমা সংগীতের বহু স্মরণীয় গান। সমিত রায়ের সৃষ্টিশীলতার একটি অনন্য ঘটনা জড়িয়ে আছে “হোজপানা হারে হই” গানটির সঙ্গে।

    ১৯৮০-এর দশকে ক্যাসেটে গান রেকর্ডের সময় গানটি গাওয়ার কথা ছিল উত্তম দেওয়ান মানি। কিন্তু কাজে ব্যস্ত থাকায় তিনি স্টুডিওতে পৌঁছাতে কিছুটা দেরি করেন। এর মধ্যে চিজিমনি বাবু গানটি নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর কণ্ঠেই গানটি রেকর্ড হয়। পরে মানি এসে গানটি অন্যের কণ্ঠে রেকর্ড হয়ে গেছে দেখে মন খারাপ করেন। সমিত রায় তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে সেখানেই নতুন একটি গান লিখে ফেলেন-

“মোনতোলা আদামর টান্নেবি,
কুধু আগচ কিঝানি।”

    পরবর্তীতে সেই গানটি মানি দেওয়ানের কণ্ঠে রেকর্ড হয়। একই দিনে জন্ম নেয় দুটি স্মরণীয় চাকমা গান,যার একটির জন্ম হয়েছিল নির্ধারিত পরিকল্পনায়, আর অন্যটির জন্ম হয়েছিল একজন শিল্পীর বন্ধুর মন ভালো করার আন্তরিক প্রয়াস থেকে। এ ঘটনা কুমার সমিত রায়ের শিল্পীসত্তার একটি বিশেষ দিক উন্মোচন করে, তিনি গানকে শুধু শিল্প হিসেবে দেখতেন না; গান ছিল তাঁর অনুভূতির স্বতঃস্ফূর্ত প্রকাশ।

    সমিত রায়ের গান শুনলে মনে হয়, রাঙামাটির পাহাড়, নদী, বন, ঝিরি, ফুল, মানুষের হাসি-কান্না, সবকিছু যেন সুর হয়ে কথা বলছে। কাপ্তাই বাঁধের আগে যে রাঙামাটি তিনি দেখেছিলেন, সেই হারিয়ে যাওয়া জনপদের স্মৃতি তাঁর মনে গভীরভাবে গেঁথে ছিল। তাই তিনি লিখেছিলেন-

“কিল্লে আদি্যিা স্ববনত দেক্কোং, পুরোন রাংগামাত্যা।” 

এই পঙ্ক্তির ভেতর শুধু স্মৃতিচারণ নেই; আছে একটি হারিয়ে যাওয়া ভূগোলের জন্য দীর্ঘশ্বাস। সুবলংয়ের গভীরে ‘আলাম্বা’ নামের এক গ্রামে গিয়ে সেখানকার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে ফিরে তিনি লিখেছিলেন-

“এঞ্জান দোল জাগা গান কুধু আঘে কিঝানি,
রং-বেরঙর তেংতেমুরি বংপাদারে যাদন উরি...”

তাঁর গানে প্রকৃতি কখনো শুধু দৃশ্য নয়; প্রকৃতি সেখানে প্রেম, স্মৃতি, পরিচয় এবং অস্তিত্বের অংশ। কুমার সমিত রায়ের গানের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল চাকমা লোকঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক সংগীতবোধের সমন্বয়। তিনি রাধামন-ধনপুদি, শিবচরণ-চান্দবীর মতো লোককথার চরিত্রকে নিজের গানে স্থান দিয়েছেন-

“আজার বজর ধরি, এলুং ইধু মুই,
রাধামন-ধনপুদি, শিবচরন-চান্দোবি,
বেগে মিলি আঘি ইধু, আজার বজর ধরি।”

ফলে তাঁর গান হয়ে উঠেছে একই সঙ্গে আধুনিক, লোকজ এবং মাটির গভীর শিকড়ে প্রোথিত।

    কুমার সমিত রায়ের প্রতিভা শুধু সাহিত্য ও সংগীতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি ছিলেন দুর্দান্ত ক্রীড়াবিদ এবং ক্রীড়া সংগঠক। ফুটবল ছিল তাঁর বিশেষ প্রিয়। তিনি বলতেন, একদিন ফুটবলে লাথি না মারলে তাঁর মনে হতো যেন একদিন ভাত খাননি। গ্রামে গ্রামে গিয়ে তিনি ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন করতেন, প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাছাই করে দল গড়তেন এবং অনেক সময় খেলোয়াড় ও দলের যাবতীয় খরচ নিজেই বহন করতেন। তিনি ক্রিকেট, হকি, ফুটবল, ব্যাডমিন্টন ও টেবিল টেনিসে পারদর্শী ছিলেন। চট্টগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে তিনি দীর্ঘদিন প্রেস্টিজিয়াস স্টার ক্লাবের ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন। রাঙামাটির শহীদ শুক্কুর ক্লাব ও রাজবাড়ী স্টার ক্রিকেট ক্লাব প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়ে আছে।তিনি শুধু নিজে খেলতেন না, অন্যের প্রতিভা বিকাশেও সহযোগিতা করতেন। কোনো মেধাবী খেলোয়াড়ের সন্ধান পেলে তাঁকে উৎসাহিত করতেন, প্রয়োজনীয় সহায়তা দিতেন এবং কোচ হিসেবে দীর্ঘদিন বিভিন্ন খেলাধুলা ও অ্যাথলেটিকসে কাজ করেছেন। ১৯৭৬ সালের মন্ট্রিয়াল অলিম্পিকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার গৌরবও তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।

    রাঙামাটির ক্রীড়াঙ্গনের উন্নয়নেও তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। তৎকালীন রাষ্ট্রপ্রধান জিয়াউর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তিনি রাঙামাটিতে একটি স্টেডিয়াম নির্মাণের দাবি ও প্রতিশ্রুতি আদায় করেছিলেন বলে জানা যায়। পরবর্তীকালে রাঙামাটিতে মারী স্টেডিয়াম প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি হয়। এ ঘটনাও প্রমাণ করে, নিজের জন্য নয়, নিজের এলাকার মানুষের জন্যই তিনি তাঁর পরিচিতি ও প্রভাবকে কাজে লাগাতে চাইতেন।

    জন্মসূত্রে তিনি ছিলেন রাজকুমার। কিন্তু তাঁর জীবনযাপন ছিল অত্যন্ত সাদাসিধে। রাজকীয় পরিচয় তাঁকে কখনো সাধারণ মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়নি। তিনি ছিলেন অমায়িক, দয়ালু ও প্রচারবিমুখ। মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো ছিল তাঁর স্বভাব। অনেককে তিনি নীরবে আর্থিক সহায়তা করতেন, এমনও ঘটেছে, তাঁর পরিবারের সদস্যরাও সেই সাহায্যের কথা জানতেন না। তাঁর কাছে মানুষের পরিচয় ছিল মানুষ হওয়া। রাজপরিবারের সদস্য হয়েও তিনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে অনায়াসে মিশে যেতে পারতেন। তাঁর মানবিকতার গল্প তাই আজও রাঙামাটির মানুষের স্মৃতিতে ছড়িয়ে আছে।

    স্বাধীনতার পর সমিত রায় স্বপরিবারে ভারতে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু বিদেশের মাটিতে তাঁর মন টেকেনি। কয়েক বছর পর পরিবার নিয়ে আবার ফিরে আসেন রাঙামাটিতে। দেশে ফিরে শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে একাধিকবার মন্ত্রিসভায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু মন্ত্রী হলে হয়তো রাঙামাটির বাইরে থাকতে হবে, এই আশঙ্কায় তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ক্ষমতার কেন্দ্রের চেয়ে তাঁর কাছে পাহাড়ের মানুষের ভালোবাসা ছিল বড়। এই সিদ্ধান্ত তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচয়গুলোর একটি।

১৯৮০ ও ৯০-এর দশক ছিল তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল সময়। পরবর্তী সময়ে তিনি খুব বেশি গান লেখেননি। ২০০২-০৪ সালের দিকে জীবনের শেষ পর্যায়ে এসে তিনি যে গানটি লিখেছিলেন, সেখানে যেন নিজের জীবনকে ফিরে দেখেছিলেন-

“মোন-মুরো, ছড়া-গাং ফেলেই যাংগোল্লোই,
চিগোন চিগোন কধানি ইদোত উদেল্লোই।
জিঙ্ঘানির ভালুদ্দুর পথ ফেলেই ইচ্চোং মুই,
কি চেয়োং কি পেয়োং, ইজেব রাক্কোনি হেউ?”

    এই গানের ভেতর যেন এক পথিকের দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি, অর্জন ও অনন্ত প্রশ্ন মিশে আছে। জীবনের এতটা পথ পেরিয়ে মানুষ শেষ পর্যন্ত কী খুঁজল, কী পেল- সেই হিসাব কি কেউ রাখে?
সমিত রায়ের শেষদিকের এই সৃষ্টিকে তাই শুধু একটি গান হিসেবে দেখলে তার গভীরতা ধরা পড়ে না; এটি যেন তাঁর নিজের জীবনদর্শনের এক অন্তর্মুখী স্বীকারোক্তি।

    কুমার সমিত রায় লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়ে ২০০৮ সালের ৪ এপ্রিল ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম হারায় এক অসাধারণ শিক্ষক, গীতিকার, সুরকার, ক্রীড়াবিদ ও মানবিক মানুষকে। মৃত্যুর পর চাকমা রাজবাড়িতে তাঁর মায়ের পাশে তাঁকে সমাধিস্থ করা হয়। তাঁর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে নির্মিত হয়েছে স্মৃতিসৌধ। সেই স্মৃতিফলকে স্থান পেয়েছে তাঁরই লেখা একটি গান-

“দগিনো বইয়ের বার,
বিজু ফুল উন ঝড়ি যার,
এঞ্জান ফাগুনো দিনোত,
গিত্তুন ইদোত গরিচ মর।”

    এই পঙ্ক্তিগুলো যেন তাঁর জীবনকেই ধারণ করে- বসন্ত আসে, বিঝুর ফুল ঝরে যায়, দিন ফুরিয়ে যায়; কিন্তু মানুষের সৃষ্টি, ভালোবাসা ও স্মৃতি থেকে যায়।

    কুমার সমিত রায় ছিলেন এমন এক মানুষ, যাঁর জীবনে রাজকীয় পরিচয় ও সাধারণ মানুষের জীবনবোধ একাকার হয়ে গিয়েছিল। তিনি ক্ষমতা চাননি, খ্যাতির পেছনে ছুটেননি; বরং নিজের জ্ঞান, প্রতিভা ও সামর্থ্যকে বিলিয়ে দিতে চেয়েছেন তাঁর প্রিয় রাঙামাটি এবং পাহাড়ের মানুষের জন্য।

    তাঁর গান তাই কেবল গান নয়, এগুলো এক হারিয়ে যাওয়া রাঙামাটির দলিল। তাঁর সুরে আছে কর্ণফুলীর কলতান, পাহাড়ি ঝিরির শব্দ, বিঝুর রঙ, প্রেমের কোমলতা, বিচ্ছেদের ব্যথা এবং মানুষের প্রতি গভীর মমতা। তাঁর লেখায় আছে চাকমা লোকঐতিহ্যের স্মৃতি; তাঁর কর্মে আছে ক্রীড়াঙ্গনের উন্মেষ; তাঁর শিক্ষকতায় আছে প্রজন্ম গড়ার স্বপ্ন; আর তাঁর জীবনযাপনে আছে নিঃস্বার্থ মানবতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

    কুমার সমিত রায়ের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহত্ত্ব জন্মপরিচয়ে নয়, কর্মে; রাজকীয় মর্যাদায় নয়, মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেওয়াতেই। তাই তিনি আজ শুধু চাকমা রাজপরিবারের এক রাজকুমার নন; তিনি পাহাড়ের মানুষের স্মৃতিতে এক সুরের মানুষ, মাটির মানুষ, ভালোবাসার মানুষ।

    সময় তাঁর শরীরকে নিয়ে গেছে, কিন্তু তাঁর গান নিয়ে যেতে পারেনি। কর্ণফুলীর ঢেউ থেমে যায়, পুরোনো রাঙামাটি জলের নিচে হারিয়ে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়, তবু কোনো এক তরুণের কণ্ঠে যখন ভেসে ওঠে তাঁর গান, তখন মনে হয় কুমার সমিত রায় এখনো আছেন। পাহাড়ের বাতাসে, পুরোনো রাজবাড়ির স্মৃতিতে, বিঝুর ফুলে, রাঙামাটির নদীতে, আর সবচেয়ে বেশি আছেন মানুষের হৃদয়ে। এই কারণেই কুমার সমিত রায় কেবল একজন গীতিকার নন; তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের এক বিস্মৃতপ্রায় সময়ের কণ্ঠস্বর।

তথ্যসূত্র: জুমজার্নাল ও বাবলি ফেসবুক পোস্ট

বি.দ্র.: লেখাটিতে তথ্যগত অসংগতি, অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। কোনো কোনো বক্তব্য আপনার জানা তথ্য বা মতের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তাই লেখাটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে, নিজস্ব জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের আলোকে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করার অনুরোধ রইল। 

 

১৫ সেপ্টেম্বর : তোমাকে স্মরণ করে - ইনজেব চাঙমা

১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৩৯-

এই দিনে
পাহাড়ের আকাশে উঠেছিল এক নতুন সূর্য,
তুমি এসেছিলে-
পৃথিবী হেসেছিল,
আর পাহাড়ের বহুদিনের কান্না
পেয়েছিল একটি কণ্ঠ।

তোমার জন্মদিনে
পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়
নেচেছিল জুমের সবুজে,
বাতাসে উঠেছিল রেং (বিজয়ের ধ্বনি);
নির্যাতিত, নিপীড়িত জুম্ম মানুষের চোখে
জ্বলে উঠেছিল
একটি নতুন ভোরের স্বপ্ন।

তুমি এসেছিলে
শুধু একটি জীবনের জন্য নয়-
এসেছিলে ইতিহাসের অন্ধকারে
একটি প্রদীপ হাতে।

নতুন বাংলাদেশের সংসদে
তুমি উচ্চারণ করেছিলে
বৈষম্যের বিরুদ্ধে পাহাড়ের ভাষা;
বলেছিলে—
এই লাল-সবুজের দেশ
শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠের নয়,
এ দেশ সকল মানুষের,
সকল জাতির,
সকল স্বপ্নের।

তুমি চেয়েছিলে
সংবিধানের পাতায়
জুম্ম মানুষের নামটিও
সমান মর্যাদায় লেখা থাকুক।

কিন্তু
ক্ষমতার কানে পৌঁছায়নি
পাহাড়ের সেই আর্তনাদ।

মাটি সরে গেল পায়ের নিচ থেকে,
জাগা-জমি হারালো আপন ঠিকানা,
পাহাড়ের বুকজুড়ে
নেমে এলো উচ্ছেদের দীর্ঘ ছায়া।

তখন তুমি
নীরব পাহাড়কে বলেছিলে-

বাঁচতে হলে জাগতে হবে,
জাগতে হলে সংগ্রাম করতে হবে।

তোমার হাতে উঠেছিল অস্ত্র,
কিন্তু তারও আগে
তুমি মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিলে
ভাষা ও কলম।

সেই কলম আজও থামেনি।

দূর বিদেশের মাটিতে
লাল-সবুজের পতাকা হাতে
ঋতুপূর্ণা, মনিকা, রূপনা সুরাকৃষ্ণরা
বয়ে নিয়ে যায় পাহাড়ের স্বপ্ন;

 তুফান, জয়তুরারা
রং ও রেখায় লিখে চলে
অধিকারের অমোচনীয় অক্ষর।

জাতিসংঘের প্রাঙ্গণে
আজ নতুন প্রজন্মের কণ্ঠে
তোমারই প্রতিধ্বনি—

শোনো পাহাড়ের কথা,
শোনো মানুষের কথা,
শোনো অধিকারহারা ইতিহাস।

আগস্টিনা চাঙমার কণ্ঠে
আজও জেগে ওঠে
পার্বত্য চট্টগ্রামের
নির্যাতন ও গণহত্যার স্মৃতি।

তবু
আমাদের স্বপ্ন প্রতিহিংসার নয়—
আমরা চাই শান্তির সকাল,
চাই ন্যায়ের আলো,
চাই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন।

মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা-
আজ তোমার জন্মদিন।

তুমি নেই,
তবু পাহাড়ের বাতাসে
তোমার কণ্ঠের প্রতিধ্বনি আছে;
জুমের মাটিতে
তোমার পদচিহ্ন আছে;
তরুণের চোখে
তোমার অসমাপ্ত স্বপ্ন আছে।

তাই আজ
ফুল দিয়ে শুধু তোমাকে স্মরণ নয়—
আমরা স্মরণ করি
তোমার স্বপ্নকে।

একটি বাংলাদেশ—
যেখানে কোনো জাতি পরবাসী নয়,
কোনো মানুষ অধিকারহীন নয়,
আর পাহাড়ের মানুষ
নিজের মাটিতে, নিজের ভাষায়,
নিজের পরিচয়ে
মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।

এই হোক
তোমার জন্মদিনে
আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।

 

সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা: মাতৃভাষার স্বপ্নে আলোকিত এক স্বল্পায়ু নক্ষত্র - ইনজেব চাঙমা

 

কিছু মানুষ দীর্ঘ জীবন বাঁচার জন্য পৃথিবীতে আসেন না; তাঁরা আসেন একটি সময়কে আলোকিত করে যেতে। তাঁদের জীবনকাল সীমিত হলেও স্বপ্ন ও সৃষ্টির আয়ু হয়ে ওঠে দীর্ঘতর। কবি দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। মাত্র ছেচল্লিশ বছরের জীবনে তিনি চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরও সেই স্বপ্নের আলো নিভে যায়নি।

১৯৪৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ির মহাজনপাড়া আদামে জন্মগ্রহণ করেন দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা। তাঁর পিতা সত্যব্রত চাঙমা এবং মাতা শশীবালা চাঙমা। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।

তাঁদের মধ্যে ছিলেন, মালবিকা চাঙমা, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, হিরোহিত চাঙমা, কনিষ্ক চাঙমা, শ্রীগীত চাঙমা, মিজিকো চাঙমা ও টলস্টয় চাঙমা। তাঁদের মধ্যে হিরোহিত চাঙমা অধ্যক্ষ, কনিষ্ক চাঙমা চক্ষু বিশেষজ্ঞ এবং টলস্টয় চাঙমা চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হন।

দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার সহধর্মিণী ................................ চাঙমা। তাঁদের একমাত্র পুত্র দিগন্ত চাঙমা

পাহাড়ের প্রকৃতি, জুমজীবন এবং পাহাড়ি মানুষের সহজ-সরল সম্পর্ক তাঁর শৈশবের চেতনায় গভীর ছাপ ফেলেছিল। নিজের সমাজ, সংস্কৃতি ও ভাষার যে আবহে তাঁর বেড়ে ওঠা, পরবর্তী জীবনে তাঁর সাহিত্যচিন্তার ভিত নির্মাণে সেই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তাঁকে পাহাড়ের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৭৪ সালে বি.এ. (অনার্স) ও এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে তিনি রাঙামাটি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা ছিল তাঁর পেশা, কিন্তু সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চা ছিল তাঁর জীবনভাবনার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।

কর্মজীবনের প্রয়োজনে তিনি দেশের বাইরেও ভ্রমণ ও অবস্থান করেন। লিবিয়া, ইতালি, গ্রিস ও ভারত তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় তাঁর চিন্তার পরিসরকে প্রসারিত করলেও নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো শিথিল হয়নি। বরং দূরের পৃথিবীকে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজের শিকড়কে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল।

দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার সাহিত্যচিন্তার কেন্দ্রে ছিল মাতৃভাষা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কোনো ভাষার অস্তিত্ব কেবল মুখের ব্যবহারে টিকে থাকে না; তাকে লিখিত রূপ দিতে হয়, সাহিত্য সৃষ্টি করতে হয়, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল-

“আমি শিক্ষিত মানুষ হয়ে যদি চাঙমা লেখা-মু ভেদেদেই কন্না চাঙমা লেখানি উন্নতি গরিব... চাঙমা লেঘা ইক্কুল, কলেজ, বিশ্ব ইক্কুল চালেবাত্যা আমাত্তুন চাঙমা লেঘা শিঘা পরিব... চাঙমা সাহিত্য সৃষ্টি গরি পারি...”

এই বক্তব্য কেবল একজন কবির ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নয়; এর মধ্যে ছিল একটি জাতির ভাষা ও সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখার সাংস্কৃতিক দায়িত্ববোধ। তিনি চেয়েছিলেন, শিক্ষিত চাঙমা সমাজ নিজের ভাষায় লিখুক, সেই ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি করুক এবং ধীরে ধীরে বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চাতেও চাঙমা ভাষার ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত হোক।

তাঁর কাছে মাতৃভাষা ছিল আত্মপরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। তাই নিজের ভাষায় লেখা তাঁর কাছে নিছক সাহিত্যচর্চা ছিল না, এ ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক ধরনের দায়িত্ব।

 দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার প্রধান পরিচয়তিনি কবি। তাঁর কবিতায় পাহাড়, মানুষ, প্রকৃতি, জীবন এবং অন্তর্জগত পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে। তাঁর কাব্যভাষায় ছিল সংক্ষিপ্ততা, শব্দের পুনরাবৃত্তি, নীরবতার ব্যবহার এবং আধুনিক অনুভূতির প্রকাশ।

১৯৭২ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘লুরা’‘ফুরামোন’। ‘লুরা’ প্রকাশিত হয় এপ্রিল মাসে, ১ বৈশাখ ১৩৭৯ বঙ্গাব্দে; পরে বৈশাখী পূর্ণিমায় প্রকাশিত হয় ‘ফুরামোন’। চাঙমা ভাষায় মুদ্রিত সাহিত্য তখনও ছিল সীমিত। সেই বাস্তবতায় এই দুটি প্রকাশনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা। এগুলো শুধু সাহিত্য প্রকাশের উদ্যোগ ছিল না; মাতৃভাষায় সৃজনশীল লেখার সম্ভাবনাকেও দৃশ্যমান করেছিল।

তাঁর কবিতার উল্লেখযোগ্য সংকলন ‘পাদারং কোচপানা’ ও অর্ন্তগত বৃষ্টিপাত । এই কাব্যগ্রন্থ তাঁর কবিসত্তার বিস্তৃত পরিচয় বহন করে। ‘লুরা’ ও ‘ফুরামোন’-এর সঙ্গে ‘পাদারং কোচপানা’ ও অর্ন্তগত বৃষ্টিপাত  মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার সন্ধান পাওয়া যায়।

নিজের ভাষায় কবিতা লিখে ও প্রকাশ করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, চাঙমা ভাষা আধুনিক সাহিত্যচর্চার উপযুক্ত একটি সৃজনশীল মাধ্যম। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি, পাহাড়ি জীবন, প্রকৃতি, ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনা একটি স্বতন্ত্র কাব্যিক রূপ পেয়েছে।

সাহিত্যকে তিনি কখনো ব্যক্তিগত সাধনার গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখেননি। ১৯৭২ সালে তিনি ‘জুভাপ্রদ’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে চাঙমা সাহিত্যচর্চাকে সংগঠিত করার পাশাপাশি নবীন লেখকদের জন্য একটি সৃজনশীল পরিসর তৈরির চেষ্টা করেন।

সাময়িকী প্রকাশেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। সে সময়ের বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সাময়িকীর প্রকাশনা-উদ্যোগে তিনি অংশ নেন এবং নিজেও নিয়মিত লেখালেখি করেন। ফলে তাঁর ভূমিকা ছিল দ্বিমুখী—একদিকে তিনি ছিলেন স্রষ্টা, অন্যদিকে সাহিত্যিক পরিসর নির্মাণের একজন সক্রিয় সংগঠক। তাঁর সঙ্গে যুক্ত সাময়িকীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • গেংখুলি — ১৯৭৭
  • রঙধং — ১৯৭৮, বিঝু
  • রেঙ — সেপ্টেম্বর ১৯৮০
  • বিজু — এপ্রিল ১৯৮১
  • হুয়াঙ ছেরে চাঙমা গীত — ১৯৮১, বিঝু
  • Ray — এপ্রিল/বিঝু, ১৯৮৫
  • এক ঝাক বিজোল রোদ — ১৯৮৬, বিঝু

এসব সাময়িকীর পাতায় তাঁর লেখালেখি চাঙমা ভাষার সাহিত্যকে সমকালীন চিন্তা, অনুভূতি ও সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করেছিল। একই সঙ্গে এগুলো নতুন লেখক ও পাঠকদের জন্য একটি সাহিত্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।

তাই দীপঙ্করের সাহিত্যিক অবদান শুধু তাঁর প্রকাশিত কবিতা বা কাব্যগ্রন্থ দিয়ে বিচার করলে পূর্ণতা পাওয়া যায় না। কবিতা লেখা, কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ, সাহিত্য সংগঠন গড়ে তোলা, সাময়িকী প্রকাশে অংশ নেওয়া এবং সেখানে নিয়মিত লেখা, সব মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যসাধনা একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক উদ্যোগের রূপ লাভ করেছিল।

১৯৭৩ সালে তাঁর ‘অন্যমনে’ কবিতা প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে কবিতাটি রুশ ভাষায় অনূদিত হয়ে একটি রুশ ভাষার সংকলনে স্থান পায়। একটি পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় লেখা কবিতা যখন অনুবাদের মাধ্যমে ভিন্ন ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তা নিঃসন্দেহে চাঙমা সাহিত্যের সম্ভাবনারও একটি পরিচায়ক হয়ে ওঠে।

নিজেও দীপঙ্কর অনুবাদে আগ্রহী ছিলেন। সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫–৭৬ সালের দিকে সুগত চাঙমার ‘হিল্লো মিলেবো জুমত যায় দ্যা’ গানটি তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ‘রেত্তুয়া জনমবো ন’ থেব’ গানটিও তিনি অনুবাদ করেন।

এই অনুবাদকর্ম তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তিনি শুধু নিজের ভাষায় লেখার কথা ভাবেননি; নিজের ভাষার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনাও অনুভব করেছিলেন।

দীপঙ্করের সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যের আরেকটি দিক ছিল নতুন শব্দ ও প্রকাশভঙ্গি নির্মাণের চেষ্টা। তাঁর কাছে ভাষা কোনো স্থির কাঠামো ছিল না; সময়, সমাজ ও মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভাষাকেও সমৃদ্ধ হতে হয়, এমন একটি ধারণা তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে।

আধুনিক জীবন ও নতুন অভিজ্ঞতা প্রকাশের উপযোগী করে চাঙমা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস তাঁর সাহিত্যিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর কিছু কবিতায় পরবর্তীকালে সুরারোপ হয়ে গানও তৈরি হয়। ফলে তাঁর সাহিত্য মুদ্রিত পাতার সীমা অতিক্রম করে শ্রুতিমাধ্যমেও প্রবেশ করে।

প্রকাশিত গ্রন্থের বাইরে তাঁর কিছু রচনা অপ্রকাশিত থেকে যায়। সংগৃহীত তথ্যের মধ্যে ‘অলর গাচ্ছুয়া পাদা লরে’, ‘জুঁদা পিত্তিমি’, ‘অদেঘা’ প্রভৃতি রচনার উল্লেখ রয়েছে। এসব রচনা তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের মূল্যবান অংশ। ভবিষ্যতে তাঁর পাণ্ডুলিপি ও অপ্রকাশিত রচনাগুলো অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা চাঙমা সাহিত্য গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চাঙমা আধুনিক সাহিত্য কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৪০-এর দশক থেকে চুনীলাল দেওয়ানের হাত ধরে যে আধুনিক সাহিত্যচর্চার বিকাশ শুরু হয়, পরবর্তীকালে মুকুন্দ চাঙমা, ডা. ভগদত্ত খীসা, সলিল রায়, অরুণ রায় প্রমুখ সাহিত্যিক সেই ধারাকে সমৃদ্ধ করেন।

এই ধারাবাহিকতায় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার বিশেষত্ব হলো—তিনি একই সঙ্গে কবি, সম্পাদক, সংগঠক, প্রকাশনা-উদ্যোক্তা ও অনুবাদক। তিনি কবিতা লিখেছেন, কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, সাহিত্য সংগঠন গড়ে তুলেছেন, সাময়িকী প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, নিজে লিখেছেন এবং ভাষার প্রকাশক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন।

অতএব, তাঁর অবদান কোনো একক গ্রন্থ বা কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়। চাঙমা আধুনিক সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সঙ্গে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

১৯৯৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৬ বছর বয়সে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার জীবনাবসান ঘটে। তাঁর জীবন থেমে যায় এমন এক সময়ে, যখন তাঁর সাহিত্যিক সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল। আরও কবিতা, আরও অনুবাদ, আরও নতুন শব্দ, আরও সাহিত্যিক উদ্যোগ হয়তো তাঁর কলম থেকে আসতে পারত। তাঁর এই অকালপ্রয়াণ চাঙমা সাহিত্যজগতের জন্য ছিল গভীর ক্ষতি। কিন্তু একজন কবির জীবনাবসান তাঁর সৃষ্টির সমাপ্তি নয়। দীপঙ্করের ক্ষেত্রেও তা ঘটেনি।

তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো কোনো একক গ্রন্থে নয়; বরং একটি প্রশ্নেশিক্ষিত হয়ে আমরা কি নিজের ভাষার জন্য কিছু করব? এই প্রশ্ন তাঁর সময় অতিক্রম করে আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন দেখায়, বিশ্বকে জানার সঙ্গে নিজের শিকড়কে জানার কোনো বিরোধ নেই। বরং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত শক্ত করেই বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সংযোগ তৈরি করা সম্ভব।

লিবিয়া, ইতালি, গ্রিস ও ভারত ঘুরে দেখা মানুষটি শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছিলেন নিজের ভাষার কাছে। তাঁর কবিতা, কাব্যগ্রন্থ, সাময়িকী, অনুবাদ, সাহিত্য সংগঠন এবং ভাষা নিয়ে তাঁর ভাবনা—সবকিছুতেই সেই প্রত্যাবর্তনের চিহ্ন রয়েছে।

১৯৯৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবন থেমে গেলেও তাঁর সাহিত্যিক পদচিহ্ন মুছে যায়নি। পুরোনো সাময়িকীর পাতায়, কবিতার পঙ্‌ক্তিতে, কাব্যগ্রন্থে, অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির সম্ভাবনায় এবং নতুন প্রজন্মের মাতৃভাষাচর্চায় তাঁর স্মৃতি এখনও বেঁচে আছে।

একটি স্বল্পায়ু জীবন কখনো কখনো একটি দীর্ঘ সাহিত্যিক উত্তরাধিকার রেখে যায়। দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা সেই বিরল উত্তরাধিকারেরই একজন নির্মাতা তিনি চলে গেছেন; কিন্তু তাঁর ভাষার প্রতি দায়বোধ, সাহিত্যিক স্বপ্ন এবং সৃষ্টির আলো এখনও পাহাড়ের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে জ্বলছে।

তথ্যসূত্র

সবিতা চাঙমা; শুভ্র জ্যোতি চাঙমা; আর্য্যমিত্র চাঙমা (নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ এ পক্ষ থেকে কবির মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে ভার্চুয়াল আলোচনা সভা ১০ সেপ্টেম্বর২০২৩),  রান্যাফুল (কবিতাগ্রন্থ); জুমজার্নাল

ছবি সংগ্রহ: কবিতা চাঙমা (অস্ট্রেলিয়া)

কুমার সমিত রায়: পাহাড়ের সুর, মাটির মানুষ - ইনজেব চাঙমা

              পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সাহিত্য ও ক্রীড়াঙ্গনের বিস্তৃত পরিসরে কিছু মানুষ তাঁদের কর্মের মধ্য দিয়ে সময়কে অতিক্রম ...