Hillor pojjan(হিলর্ পজ্জন)
হিলো বুগোর সুক্-দুগর কধা ফগদাঙ গর অয়।
সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬
পাহাড়ের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার আওতায় আসুক- ইনজেব চাঙমা
লেখক সি. আর. চাকমা: ভাষা, ইতিহাস ও সাহিত্যচর্চার আর এক নিবেদিত সাধক- Injeb Changma
চাকমা ভাষা, সাহিত্য ও জাতিসত্তার ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে লেখক সি. আর. চাকমা আরো এক নিবেদিতপ্রাণ গবেষক ও সাহিত্যসাধক। তিনি ১৯২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলার বড়াদম এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম নবচন্দ্র কার্বারি চাকমা। শৈশব থেকেই তিনি নিজ জাতির ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। তবে কর্মজীবনের শেষ পর্বে এসে তিনি উপলব্ধি করেন যে, একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান ভিত্তি তার মাতৃভাষা, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এই উপলব্ধিই তাঁকে গবেষণা, রচনা এবং ভাষা-সংরক্ষণের কাজে আত্মনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পূর্বেই তিনি চাকমা ভাষার অভিধান, ব্যাকরণ এবং জাতীয় ইতিহাস প্রণয়নের কাজে হাত দেন। অবসর-পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্য ও গবেষণাকর্ম আরও বিস্তৃত হয়। তাঁর রচনায় ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, ইতিহাসচর্চা এবং জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন সমান গুরুত্ব লাভ করেছে। বিশেষ করে চাকমা ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং জাতির অতীত ইতিহাসকে দলিলভিত্তিকভাবে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রকাশিত গ্রন্থ
সি. আর. চাকমার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
১. চাঙমা কধা
২. নবচন্দ্র পত্থম চাঙমা ব্যাকরণ
৩. যুগ বিবর্তনে চাকমা জাতি (প্রাচীন যুগ)
৪. যুগ বিবর্তনে চাকমা জাতি (মধ্যযুগ)
অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি
প্রকাশিত গ্রন্থের পাশাপাশি সি. আর. চাকমা বহু গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপিও রচনা করেন, যা তাঁর বহুমাত্রিক চিন্তা ও গবেষণার সাক্ষ্য বহন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
১. Learn Chakma Language in Bengali, Hindi and English
২. Progressive Development of Telecommunication System in Railways
৩. Kiss is the Key of Love and Love is the Lock of Life —
৪. জিঙ্গানী (জীবনসূত্র)
৫. চাকমা–অসমীয়া ভাষাতত্ত্ব ও ব্যাকরণ সমালোচনা
সি. আর. চাকমার সাহিত্যকর্ম কেবল গ্রন্থ রচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর সমগ্র সাধনার লক্ষ্য ছিল চাকমা ভাষা ও জাতিসত্তার সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা সুশৃঙ্খলভাবে তুলে ধরা। অভিধান, ব্যাকরণ, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব, আত্মজীবনী এবং উপন্যাস—বিভিন্ন ধারায় তাঁর বিচরণ তাঁকে একজন বহুমাত্রিক সাহিত্যিক ও গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষত চাকমা ভাষার প্রমিত রূপ নির্ধারণ, ভাষার শব্দভাণ্ডার সংরক্ষণ এবং জাতীয় ইতিহাস প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।
বি.দ্র.: সি. আর চাঙমার মৃত্যু তারিখ ও তার সর্ম্পকে কাহারোর ধারনা থাকলে শেয়ার করা জন্য অনুরোধ থাকলো। হোয়াটঅ্যাপ: 01516195366
শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬
মাচাং মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা: গিরি-কন্যা খাগড়াছড়ির এক আলোকবর্তিকা - ইনজেব চাঙমা
সবুজ অরণ্যে ঘেরা, মেঘের চাদরে মোড়া খাগড়াছড়ি। যেখানে পাহাড়েরা ফিসফিসিয়ে গল্প বলে, ঝর্ণার জল সুর তোলে। সেই মায়াবী ভূমির কোলে, ১৯৭৪ সালের ২৬শে মে, এক নবজাতকের কান্না পাহাড়ি বাতাসে মিশে গিয়েছিল। কে জানত, সেই কান্নাই একদিন পাহাড়ের ভাষার কান্না হয়ে বাজবে, আবার সেই কণ্ঠই হবে পাহাড়ের জয়গান?
পিতা মাচাং বরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার সুবোধ আর মাতা সবিতা রাণী ত্রিপুরার কোমল স্নেহের ছায় তাঁর শৈশব। চেঙের ধুলো-মাটি গায়ে মেখে, খাগড়াছড়ির পাঠশালার চৌকাঠে তাঁর প্রথম বর্ণপরিচয়। কিন্তু এই বর্ণমালা তাঁর তৃষ্ণা মেটাতে পারেনি। বিদ্যার অদম্য পিপাসা তাঁকে টেনে নিয়ে গেল চট্টগ্রামের সবুজ চত্বরে, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে তিনি এক গভীর সত্য আবিষ্কার করলেন, যে জাতি তার শিকড়কে ভোলে, তার কোনো ভবিষ্যৎ নেই। ২০০০ সালে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করে তিনি ফিরে এলেন। তবে চাকরির মোহে নয়, ফিরে এলেন ঋণ শোধ করতে, মাটির ঋণ, মায়ের ভাষার ঋণ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের চকচকে স্বপ্নকে পেছনে ফেলে তিনি জড়িয়ে পরেন, ‘জাবারাং কল্যাণ সমিতি’। জাবারাং মানে কি কেবল একটি এনজিও? না। জাবারাং হলো পাহাড়ি শিশুর মুখে তার মায়ের ভাষায় প্রথম বুলি ফোটানোর এক নীরব বিদ্রোহ। ২০০২ সাল থেকে যখন চারপাশে উন্নয়নের কোলাহলে মাতৃভাষা হারিয়ে যেতে বসেছিল, তখন তিনি বিশেষ করে চাঙমা, মারমা, ককবরক শিশুদের হাতে তুলে দিলেন তাদের মাতৃভাষার বই। তিনি প্রমাণ করলেন, শিক্ষা মানে পরের ভাষায় মুখস্থ করা নয়, শিক্ষা মানে নিজের ভাষায় জগৎকে চেনা। আজ তিনি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডে ককবরক ভাষার একজন অতন্দ্র প্রহরী।
মাচাং মথুরা বিকাশ কেবল সংগঠক নন, তিনি শব্দের কারিগর। তিনি একাধারে কবি, গল্পকার, গবেষক ও অনুবাদক। ককবরক, বাংলা ও ইংরেজি - এই তিন ভাষার মোহনায় তিনি নির্মাণ করেছেন এক বিশাল সাহিত্য-সাম্রাজ্য। তাঁর কলম থেকে জন্ম নিয়েছে চল্লিশের অধিক গ্রন্থ। কখনো তিনি ‘ককবরক ককলব খল’ -এ কবিতার সুর বুনেছেন, কখনো ‘অরণ্যকথা’য় পাহাড়ের দীর্ঘশ্বাসকে গল্প করেছেন, কখনো ‘ককবরক শব্দ ভান্ডার’ রচনা করে হারিয়ে যাওয়া শব্দদের জন্য একটি ঘর বানিয়েছেন।
তিনি বঙ্গবন্ধুর অগ্নিঝরা ৭ই মার্চের ভাষণকে, অসমাপ্ত আত্মজীবনীকে ককবরক ভাষায় অনুবাদ করে পাহাড় আর সমতলকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। তাঁর ‘আমানি কক’ সিরিজের বইগুলো আজ পাহাড়ের শিশুদের কাছে কেবল পাঠ্যবই নয়, মায়ের কোলে শোনা রূপকথা।
এই নিরলস সাধনা একদিন রাষ্ট্রের হৃদয় ছুঁয়েছিল। ২০২১ সালে, যখন প্রথমবারের মতো ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদক’ প্রদান করা হলো, তখন জাতীয় অধ্যাপক মুহাম্মদ রফিকুল ইসলামের পাশে উচ্চারিত হলো এই পাহাড়ি সন্তানের নাম। স্থানীয় সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থেকে কুড়িয়েচিল সম্মাননা। এ পুরস্কার কেবল একজন মথুরা বিকাশ ত্রিপুরার নয়, এ পুরস্কার পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি পাহাড়ের, প্রতিটি ঝর্ণার, প্রতিটি মাতৃভাষার জয়ধ্বনি।
আজ মাচাং মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা কোনো একক নাম নয়। তিনি পাহাড়ের ইতিহাস, পাহাড়ের বর্তমান এবং পাহাড়ের ভবিষ্যৎ। যতদিন পাহাড়ে মেঘ জমবে, যতদিন ককবরক ভাষায় একটি শিশু ’মা’ বলে মাকে ডাকবে, ততদিন এই নামটি ধ্রুবতারার মতো জ্বলজ্বল করবে।
১. এককভাবে রচিত গ্রন্থ (১৯টি)
ক. কাব্যগ্রন্থ
১. ককবরক ককলব খল (ককবরক কবিতা সংকলন), ১৯৯৪
২. Jorani Khorang (ককবরক কবিতা সংকলন), ২০১৪
৩. Ungbale E Hu Hu Hu (ককবরক কাব্যগ্রন্থ), ২০১৮
৪. Tete Tuai (তেতে তুয়াই), ২০২২
৫. ককবরক কাব্যসাহিত্য, ২০২৩
৬. রাইবতি, ২০২৬
খ. গল্পগ্রন্থ
৭. অরণ্যকথা, ২০২৬
গ. শিশু সাহিত্য
৮. Chini Emangni Ha (শিশুতোষ ছড়া সংকলন), ২০১৫
ঘ. অভিধান ও ভাষাবিজ্ঞান
৯. Kokborokni Kokthaih Khutruk (Kokborok-English-Bangla Word Book), ২০০২
১০. ককবরক শব্দভান্ডার (ককবরক-ইংরেজি-বাংলা), ২০১১
১১. Roman Suithaihbai Kokborok Sunai Raida (রোমান হরফে ককবরক লেখার কৌশল), ২০০৭
ঙ. জীবনী ও গবেষণা
১২. গুরুনি য়াপ্রি (বলংরাই সন্ন্যাসির জীবন ও কর্ম), ২০১৫
১৩. ত্রিপুরা : সমাজ, সংস্কৃতি ও জীবিকা, ২০১৯
চ. প্রবন্ধ
১৪. এ কথা সে কথা – পাহাড়ের কথা, ২০১৬
ছ. মাতৃভাষার শিশু শিক্ষা
১৫. AMANI KOK (প্রথম শ্রেণি), ২০০৭
১৬. AMANI KOK (দ্বিতীয় শ্রেণি), ২০০৭
১৭. AMANI KOK (তৃতীয় শ্রেণি), ২০০৭
জ. অনুবাদ
১৮. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ (ককবরক অনুবাদ), ২০২০
১৯. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী (ককবরক অনুবাদ), ২০২৩
২. যৌথভাবে রচিত গ্রন্থ (১৫টি)
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)
- ANI BIJAP Swrwng Sakang (প্রাক-প্রাথমিক মাতৃভাষার বই)
- PHAIDI SUINI SWRWNGNO Swrwng Sakang
- MWSA BAI KERANG
- SWICHA BAI TOKLA
- BUJU GANANG SIAL
- MASANDWI BAI MAYUNG
- GONG BAI POYABOTHOP
- RISA HACHUK KAMIO THANGMANI
- MAMU HATIO THANGO
- ANI KOKBOROK BIJAP Rwngrem Sa
- THIKIMUNG BIJAP Rwngrem Sa
- ANI KOKBOROK BIJAP Rwngrem Nwi
- THIKIMUNG BIJAP Rwngrem Nwi
- ANI KOKBOROK BIJAP Rwngrem Tham
অন্যান্য
- Ani Gam Nangjakmani (শিশুতোষ গল্প), ২০১২
৩. একক সম্পাদিত গ্রন্থ ও সাময়িকী (২৭টি)
গবেষণা ও প্রবন্ধ
- Society and Culture: The Indigenous Peoples in Bangladesh
- Land, Culture and Indigenous Peoples
- Indigenous Peoples: Life and Livelihood
- Indigenous Peoples of the World: Culture and Rights
- Mother Tongue and Culture: Indigenous Peoples of Bangladesh
- ভাষা, শিক্ষা ও সাহিত্য : বাংলাদেশের আদিবাসী
- আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার অধিকার : মাতৃভাষার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে
- Indigenous Children's Rights to Education: Mother Tongue Matters
- সমাজ পরিবর্তনের জন্য যুব নেতৃত্ব
- বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা আদিবাসী জীবন সংস্কৃতি
সাময়িকী ও জার্নাল
- Santua Journal
- পাহাড়কথা (সংখ্যা ১, ৩, ৫, ৬, ৭, ৮, ৯ ও বিশেষ সংখ্যা)
- গিরিপাঠ
- গিরিজা
- RUANG (প্রতিধ্বনি)
- উন্নয়ন বুলেটিন
- Jora (সময়)
পরিবেশ ও উন্নয়ন
- পরিবেশের অ আ ক খ
কোভিড-১৯ তথ্যপত্র
- জরুরি বার্তা (সংখ্যা ১–৫), ২০২০
৪. যৌথ সম্পাদিত গ্রন্থ (৫৯টি)
ক. শিক্ষা ও মাতৃভাষা
- প্রাথমিক শব্দভান্ডার
- শিক্ষা আইন ২০১৩ (খসড়া)
- প্রাথমিক শিক্ষা চিত্র : বাংলাদেশের আদিবাসী
- Grassroots Voice
- Thikimwng Swrwngmwng
- ANI LEKHAMUNG BIJAP
- AMANI KOK Rwngrem Tham
খ. সাহিত্য সংকলন
- হিরন্ময়
- প্রকৃতি
- পাহাড়িয়া কাব্য
- BOROK HODANI KOK
- পঞ্চাশের হাওয়ায় আজাদ বুলবুল
- Nonaya Khorang
গ. শিশু সাহিত্য
- মনিমালানি কক
- Nokha Kusum Chakha
- Amani Kokkotor
- NOKHAI RAJA
- Kiching Kaithamni Kok
- Ang Malmatakhor Naimani
- Yak Baksa Samung Tangno
- Wak Bok Sajakmani Kok
- Twi Gam Nungdi
- Thaipung Chanai
- TOKBAK ROKNI KOK
- TAKHUK BUKHUK
- SIALSA SUMUR SUBO
- SAMUNG NI KOK
- RINA BAI RIPO ISKULO THANGDOK
- RINAI RISA
- RI CHUM
- PUTHI AA
- NOK HUG
- Kiching Kamarni Kok
- Lairang Twi Balmani
- Lechu Kumun
- Lopha Tormani Gamya
- Makhara Dormai Khogo
- Mokol Phungwi Thwngmani
- Khumni Bagan
- Khorgoni Bari
- Kaisani Bipodu Tamunwidi
- Jirok Toksa
- Hor Bai Thungmani Gamya
- HANYA CHAYA
- Gobing Bai Puthi Aa
- DUDU KARABO
- CHINI NOK HUG
- Chini Nok
- Chini Aphak
- Bwisu
- Atoini Nuk
- Anaji Thalwi
- Bolongni Atoi
সাহিত্যকর্মের পরিসংখ্যান
| বিভাগ | সংখ্যা |
|---|---|
| এককভাবে রচিত গ্রন্থ | ১৯টি |
| যৌথভাবে রচিত গ্রন্থ | ১৫টি |
| একক সম্পাদনা | ২৭টি |
| যৌথ সম্পাদনা | ৫৯টি |
| মোট প্রকাশনা | ১২০টি |
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই, ২০২৬
চাঙমা উপন্যাস সাহিত্যের অগ্রদূত ও ভাষা-নবজাগরণের নির্মাতা: আর্য্যমিত্র চাঙমা - ইনজেব চাঙমা
চাকমা নাট্যসাহিত্যের অন্যতম প্রধান রূপকার: সুনানু মৃত্তিকা চাঙমা - ইনজেব চাঙমা
জুমপাহাড়ের শব্দসারথি- কেভি দেবাশীষ চাঙমা : ইনজেব চাঙমা
রবিবার, ১২ জুলাই, ২০২৬
পাহাড়ের বুক চিরে জেগে ওঠা ত্রিশটি দীপশিখা (নলবনিয়ার চাকমা তরুণদের উচ্চশিক্ষা জয়ের মহাকাব্য) - ইনজেব চাঙমা
শনিবার, ১১ জুলাই, ২০২৬
প্রগতিশীল চিন্তক লালন কান্তি চাঙমা- ইনজেব চাঙমা
![]() |
| কবি লালন কান্তি চাঙমা |
শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬
শান্তির এক চিলতে রোদ এবং কুয়াশার আগ্রাসন- ইনজেব চাঙমা
আজ ৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার। গত এক সপ্তাহ ধরে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই চারপাশ প্লাবিত হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে যখন দেখি গত রাতের বন্যার পানি কিছুটা কমেছে, তখন মনের ভেতর এক দীর্ঘশ্বাস আর প্রশ্ন জেগে ওঠে, এমন তো আগে ছিল না! অতীতে এর চেয়েও অনেক বেশি বৃষ্টি হতো, কিন্তু প্রকৃতি ছিল সুরক্ষিত। চারিদিকে গাছপালা ছিল, নদী-নালা, খাল-বিলে ছিল মাছ, কাঁকড়া, ইজে (চিংড়ি) ও শামুকের প্রাচুর্য। আজ নদী-নালা ভরাট হয়ে গেছে, সবুজ প্রকৃতি ধ্বংসপ্রাপ্ত। প্রকৃতির এই বিপর্যয়ের সমান্তরালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার এবং মর্যাদাও আজ বিপন্ন। আজ জুম্মদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্মানটুকু যেন হারিয়ে গেছে; তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর অপপ্রচার। এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি।
লাঙলের হাত থেকে কলমে: চাকমা আধুনিক সাহিত্যের মহীরুহ কবি মুকুন্দ চাকমা লেখা: ইনজেব চাঙমা
পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি-পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা একটি যুগের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। তাঁদের জীবন, সাহিত্য এবং সংগ্রাম মিলেমিশে জাতিসত্তার ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়। কবি মুকুন্দ চাকমা তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি চাকমা ভাষার আধুনিক কাব্যধারার অন্যতম প্রধান নির্মাতা, মাতৃভাষার নিবেদিতপ্রাণ সাধক এবং পাহাড়ের মানুষের জীবনসংগ্রামের এক বিশ্বস্ত কথক।
চাকমা আধুনিক সাহিত্যের সূচনায় যে নামটি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তিনি স্বর্গীয় চুণীলাল দেওয়ান। তাঁর হাতে রোপিত আধুনিক সাহিত্যচর্চার চারাগাছকে দীর্ঘ সাধনা, সৃজনশীলতা এবং গভীর জীবনবোধ দিয়ে মহীরুহে রূপ দিয়েছেন কবি মুকুন্দ চাকমা। তাই তাঁকে যথার্থই চাকমা আধুনিক কবিতার দ্বিতীয় প্রধান পুরুষ বলা হয়।
১৯৩১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি বগা গোজার অন্তর্গত ধজ্যা গোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা অর্জুন চন্দ্র তালুকদার এবং মাতা শুভদ্রা চাঙমা। সহধর্মিণী নীলিমা চাঙমা। তাঁদের ছয় সন্তান—দেব জ্যোতি চাঙমা, পরিতোষ চাঙমা, জ্ঞানর আলো চাঙমা, অপরাজিতা চাঙমা, আলপনা চাঙমা এবং শতরূপা চাঙমা। পারিবারিক জীবন ও সাহিত্যসাধনার সমন্বয়ে তিনি এক আদর্শ মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
ছাত্রজীবনেই তিনি মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ অনুভব করেন। চুণীলাল দেওয়ানের সাহিত্যচেতনা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু দেশভাগ-পরবর্তী অস্থিরতা তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে দেয়। জীবিকার প্রয়োজনে কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি কৃষিজীবনকেই আপন করে নেন। কিন্তু কৃষিকাজ কখনো তাঁর সাহিত্যচর্চার অন্তরায় হয়নি; বরং সেই জীবনই তাঁর কবিতার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।
কবি মুকুন্দ চাকমার সাহিত্য পড়লে বোঝা যায়, তিনি পাহাড়কে দূর থেকে দেখেননি; পাহাড়ের মাটি ছুঁয়ে, মানুষের সঙ্গে হেঁটে, প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করেই লিখেছেন। তাঁর কবিতায় ঝরনার সুর যেমন আছে, তেমনি আছে জুমচাষির ঘামের গন্ধ; আছে বনভূমির সবুজ, আবার আছে বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস।
কৃষক ও কবি—এই দুই পরিচয় তাঁর জীবনে পরস্পরের পরিপূরক। উন্নত কৃষি, বিশেষ করে ইরি ধানের চাষাবাদ নিয়ে তিনি গান, কবিতা ও নাটক রচনা করেন। এসব রচনা গ্রামীণ সমাজে কৃষি-সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর এই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৮ সালে দিঘীনালা থানা সার্কেল (উন্নয়ন) অফিস তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করে।
সাহিত্য তাঁর কাছে কখনো নিছক নান্দনিকতার অনুশীলন ছিল না; বরং মানুষের অধিকারের ভাষা। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জুম্ম জনগণের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁর কবিতা সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছিল। তাঁর দ্রোহমুখর কবিতা পাহাড়ি জনপদের মানুষের আত্মমর্যাদা ও অধিকারচেতনার শক্তিশালী ভাষ্যে পরিণত হয়েছিল।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় আসে ১৯৮৬ সালে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাঁকে নিজভূমি ছেড়ে শরণার্থীজীবন গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু নির্বাসন তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি। কাঁটাতারের ওপারেও তাঁর কলম থেমে থাকেনি। মাতৃভূমির স্মৃতি, বিচ্ছেদের বেদনা এবং প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতায় নতুন গভীরতা এনে দেয়। পরবর্তীকালে আগরতলায় তাঁর নির্বাসনপর্বের কবিতাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
ধর্মীয় সাহিত্যেও তাঁর অবদান পথিকৃৎসুলভ। দিঘীনালা বন বিহার থেকে চাকমা ভাষায় রচিত ‘ধর্মছদক’ গ্রন্থটি প্রথম ধর্মীয় সাহিত্যগ্রন্থ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। এছাড়া ‘পরিত্রাণ সূত্র’, ‘বুদ্ধের জীবন ও কাহিনী’, ‘নন্দপাল মহাথেরোর জীবনকথা’ এবং ‘প্রাণের মায়া’ গ্রন্থসমূহ চাকমা ভাষায় বৌদ্ধধর্মীয় সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
তবে তাঁর সাহিত্যজীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি নিঃসন্দেহে মহাকাব্য ‘হিলট্রেক্সর দুক সুক’। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, ইতিহাস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের এক বিশাল কাব্যিক দলিল এই মহাকাব্য। চাকমা সাহিত্যে এর গুরুত্ব কেবল একটি সাহিত্যকর্মের নয়; এটি এক জাতির স্মৃতি, ইতিহাস ও আত্মার ভাষ্য।
মুকুন্দ চাকমার সাহিত্য পাঠ করলে উপলব্ধি করা যায়, তিনি শব্দের অলংকার নির্মাণে যতটা আগ্রহী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়বদ্ধ ছিলেন মানুষের প্রতি। তাঁর রচনায় প্রকৃতির সৌন্দর্য যেমন আছে, তেমনি আছে সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; আছে ধর্মীয় চেতনা, আবার আছে মানবিকতার গভীর আহ্বান। এই বহুমাত্রিকতাই তাঁকে সমকাল অতিক্রম করে কালজয়ী করে তুলেছে।
তাঁর অসামান্য সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ (বর্তমান চাঙমা সাহিত্য একাডেমি) তাঁকে ‘নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য পদক–২০২৩’ প্রদান করে। এছাড়া চাঙমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীও তাঁকে সম্মাননা জানায়। এই সম্মান কেবল একজন কবিকে নয়, চাকমা ভাষা ও সাহিত্যকে আজীবন সমৃদ্ধ করে তোলা এক মহৎ সাধককে নিবেদিত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আজ জীবনের অপরাহ্নে তিনি খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলার অঝাপাত স্কোয়ার সংলগ্ন মিলনপুর গ্রামের শান্ত পরিবেশে নিভৃতচারী জীবন কাটাচ্ছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকলেও তাঁর সৃষ্টি আজও নতুন প্রজন্মকে পথ দেখায়। কারণ সত্যিকারের কবির মৃত্যু হয় না; তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর শব্দে, তাঁর চিন্তায়, তাঁর জাতির স্মৃতিতে।
চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস যখনই লেখা হবে, মুকুন্দ চাকমার নাম সেখানে শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তিনি প্রমাণ করেছেন—একজন কৃষকের হাতেও যেমন লাঙল মানায়, তেমনি সেই হাতেই জন্ম নিতে পারে একটি জাতির আধুনিক সাহিত্যধারার শ্রেষ্ঠ কাব্য। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষই সবচেয়ে গভীর ভাষায় মানুষের কথা বলতে পারেন।
কবি মুকুন্দ চাকমা তাই কেবল একজন সাহিত্যিক নন; তিনি চাকমা জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক স্মৃতি, ভাষার অভিভাবক এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক সাহিত্য-জাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬
অবক্ষয়ের পুঁজিকাল ও বিপন্ন মাতৃভাষা: এক অন্তর্দহন- ইনজেব চাঙমা
হৃদয়ের গহীন থেকে আজ এক তীব্র আর্তি ক্রমাগত চাবুক মারছে আমায়—"আমি আমার মাতৃভাষাকে কতটুকু ভালোবাসি?" এই প্রশ্ন যেন কোনো শান্ত নদী নয়, বরং এক অশান্ত মেঘের গর্জন, যা আমার আত্মসত্তাকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। ভাষা তো কেবল শুষ্ক ঠোঁটের কোনো যান্ত্রিক কথন নয়, কিংবা নয় কেবল দুটি মানুষের মাঝে আলগা যোগাযোগের সেতু। ভাষা হলো একটি জাতির শতাব্দীর রক্ত দিয়ে চেনা রূপ, তার ললাটের তিলক এবং তার অস্তিত্বের পরম আশ্রয়। অথচ আজ এই ঘোর কলিকালে, এই সর্বগ্রাসী পুঁজিতান্ত্রিক বাস্তবতায় আমরা আমাদের সেই পরম আশ্রয়কেই হারিয়ে ফেলছি। চাকমা তথা জুম্ম জাতির অন্তহীন উদাসীনতা আজ আমাদের সেই গৌরবের ইতিহাসকে এক চরম অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
আমাদের এই তথাকথিত মাতৃভাষা প্রীতির স্বরূপ যেন আমাদেরই এক চিরন্তন চাঙমা প্রবাদের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক নির্মম পরিহাস:
"কোচপাং কলে গালত পরে, কোচ ন পাং কলেও গালত পরে।" (ভালোবাসি বললেও চড় খেতে হয়, না বললেও চড় খেতে হয়।)
আমরা আজ এক অদ্ভুত দ্বিমুখী চেতনার দোলাচলে দুলছি। হৃদয়ে ভাষা-প্রেমের অভিনয় করছি ঠিকই, কিন্তু সত্যকে বরণ করার সাহস হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের এই মেকি ভালোবাসার রূপটি যেন আমাদেরই আরেক টুকরো লোকগাথার মতো—
"পধত পেলুং লাঙ, তাপ্পে-তুপ্পায় যাঙ।" (পথের মাঝে প্রেয়সীকে পেয়ে ক্ষণিক সোহাগ ছড়ানো, আর সে চোখের আড়াল হতেই তাকে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে দেওয়া।)
আমরাও ভাষার সাথে ঠিক এই ক্ষণিকের চপল প্রেমিকের মতোই আচরণ করছি। উৎসবের মঞ্চে বা সস্তা আবেগের মুহূর্তে আমরা ভাষার চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করি, কিন্তু দিনশেষে তাকে অবহেলা আর বিস্মৃতির ধূসর ধুলোয় ফেলে রেখে আপন সার্থান্বেষণে মগ্ন হই।
আজকের এই স্বর্ণ যুগে মানুষের বিবেক আর মূল্যবোধ যেন বাঁধা পড়েছে অর্থের নিগড়ে। যেখানে বস্তুগত লাভ নেই, সেখানে মানুষ আজ বড় বেশি নিঃস্পৃহ। আমাদের সমাজজীবনের এক নগ্ন সত্য আজ চোখের সামনে ভেসে ওঠে:
১। কোনো এক এনজিও যখন সভা কিংবা সেমিনারের ডাক দেয়, তখন মানুষের ঢল নামে। যেন এক বসন্তের কোকিলের মেলা! কারণ সেখানে মিলবে যাতায়াত ভাতা আর উপাদেয় চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়।
২। অথচ, যদি কোনো দরদী মানুষ নিঃস্বার্থভাবে সমাজের বা ভাষার সত্যিকার পুনর্জাগরণের জন্য একটি সভার আহ্বান করেন, তবে দেখা যায় সেই শূন্য প্রাঙ্গণে কেবল আহ্বানকারী একাকী দাঁড়িয়ে আছেন নিজের দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে। কারণ সেখানে কোনো নগদ প্রাপ্তি নেই।
হায়! আজ আমাদের প্রাণের ভাষার ভাগ্যাকাশও এই একই কুয়াশায় আচ্ছন্ন। যে ভাষা পরম মমতায় আমাদের শৈশবকে রাঙিয়েছিল, আজ পুঁজির বাজারে তার কোনো বিনিময় মূল্য নেই। যে ভাষা দিয়ে অর্থ বা প্রতিপত্তি অর্জন করা যায় না, এই বাণিজ্যিক দুনিয়ায় তা যেন এক অচল আধুলি। অর্থের অভাবে আজ আমাদের প্রাণের ভাষাও আমাদের কাছে মূল্যহীন, ব্রাত্য!
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—"অধিকার স্বত্বে যে জাতি উদাসীন, তার অস্তিত্ব মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে বাধ্য।" ভাষার অধিকার কখনো যাযাবরের মতো যাচ্ঞা করে পাওয়া যায় না, তা ছিনিয়ে নিতে হয়। ভাষার এই পরম মাধুর্য আর তার গুরুত্ব কেবল বাঙালি জাতি অনুধাবন করতে পেরেছিল। তাই ১৯৫২-র ফাল্গুনে তারা রাজপথ রাঙিয়েছিল বুকের তাজা রক্তে। রক্তের বিনিময়ে তারা কিনেছিল তাদের মায়ের মুখের বুলি।
আজ যদি আমরা, জুম্মরা, আমাদের ভাষার সেই মহিমান্বিত রূপ আর তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে বুঝতাম, তবে আমাদের এই দূরবস্থায় উপনীত হতে হতো না। আমাদের নিজস্ব সমৃদ্ধ বর্ণমালা থাকা সত্ত্বেও আজ আমাদের এই চরম মানসিক দৈন্যতা যে, নিজেদের ভাষার আঙিনায় আমরা আজ পরবাসী! আজ আমাদের লজ্জিত মস্তকে অন্যকে শুধাতে হয়—"অতিথি"-কে আমাদের ভাষায় কী বলে? কিংবা "অমুক" শব্দের প্রকৃত চাকমা প্রতিশব্দটি কী? এর চেয়ে বড় আত্মগ্লানি আর কী হতে পারে!
মহাকাল এখনো আমাদের সম্পূর্ণ গ্রাস করেনি, ছাইয়ের নিচে এখনো কিছু জ্বলন্ত অঙ্গার বাকি আছে। শুধু অন্তঃসারশূন্য আবেগ দিয়ে কিংবা চারু বাক্যের মায়াজাল বুনে একটি বিপন্ন ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন ত্যাগ, সাধনা আর শেকড়ের প্রতি অবিচল আনুগত্য।
তাই আসুন, এই মোহনিদ্রা আর আত্মকেন্দ্রিকতার দেয়াল ভেঙে ফেলি। "নিজর গারখ্যে দর গরি" আমরা বেরিয়ে পড়ি দিক-দিগন্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে। আমাদের নিজস্ব বর্ণমালার গৌরব, আমাদের সংস্কৃতির সুবাস ছড়িয়ে দিই প্রতিটি জুম্ম সন্তানের হৃদয়ে। মাতৃভাষাকে কেবল মুখের ভাষা নয়, তাকে করে তুলি আমাদের বেঁচে থাকার হাতিয়ার ও প্রতিবাদের ভাষা। তবেই রক্ষা পাবে আমাদের জাতিসত্তা, তবেই সার্থক হবে আমাদের এই পৃথিবীতে জুম্ম হিসেবে বেঁচে থাকা।
ক্ষতবিক্ষত পাহাড়ের আর্তনাদ ও মুক্তির অন্বেষণ- ইনজেব চাঙমা
পার্বত্য চট্টগ্রাম, বহু যুগ ধরে এক অসুস্থ, ক্ষতবিক্ষত জনপদ। এই ভূখণ্ডের ক্ষত কেবল উপশম হয়নি, সময়ের নির্মম আবর্তে তা আরও গভীর, আরও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। স্মৃতির পাতা উল্টালে দেখি এক দুঃসহ কাল—যখন পাহাড়ের মানুষকে দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগেই রাতের আহার সেরে নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করতে হতো। নিস্তব্ধ রজনীতে কুকুরের করুণ আর্তনাদও বুকের রক্ত হিম করে দিত। ভয়ের সেই করাল গ্রাসে দিনকে মনে হতো দীর্ঘ এক যুগ, আর রাতকে মনে হতো অন্তহীন এক শতাব্দী। চারিদিকে কেবল থমথমে, নিস্পৃহ নীরবতা। তখন পাহাড়ের সরল প্রাণের কাছে চিরস্থায়ী আতঙ্কের প্রতিশব্দ ছিল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর সেটেলার বাঙালি।
ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সেই ভয়ের রাজত্বে কিছুটা হলেও স্বস্তির হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল। মানুষ আগের চেয়ে শিক্ষা-দীক্ষায় মন দিতে পেরেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে পা বাড়িয়েছে, যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। কেউ কেউ ইট-কাঠের সুন্দর ঘর তুলেছে, অথচ জনসংখ্যার বিশাল অংশ আজও মৌলিক অধিকারের ন্যূনতম স্পর্শ থেকে বঞ্চিত। তবু স্বাধীনতা-উত্তর রক্তাক্ত অধ্যায়ের তুলনায় চুক্তি-পরবর্তী সময় নগণ্য হলেও জুম্ম জনগণের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছিল।
কিন্তু ইতিহাসের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! পার্বত্য চুক্তিকে মনঃপূত না করে পাহাড়ের বুক চিরে জন্ম নিল ইউপিডিএফ। দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের পর শান্তি বাহিনীর জীর্ণ-ক্লান্ত যোদ্ধারা যখন বন্দুক রেখে সন্তান-পরিজন নিয়ে একটু শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাইলেন, ঠিক তখনই ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’-এর চটকদার স্লোগান তুলে রণক্লান্ত সেই মানুষগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল চুক্তি-বিরোধী এই সংগঠন। সূচনা হলো জুম্ম জাতীয় জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও করুণ অধ্যায়—ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়।
গত ২৮ বছরে এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে কত শত মেধাবী তরুণের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে, কতজনকে অন্ধকার কারাকক্ষে দিন গুনতে হয়েছে, তার নির্ভুল হিসাব মেলানো আজ দুষ্কর। কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, কত বাবার ভবিষ্যৎ অঙ্কুরেই ঝরে গেছে, কত সন্তান মাথার উপর থেকে শেষ ছায়াটুকুও হারিয়েছে। মুক্তির নামে বয়ে যাওয়া এই রক্তগঙ্গা ২৮টি বসন্ত পেরিয়েও থামেনি।
আজ আমার লেখার কারণে আমাকে বারবার অভিযুক্ত করা হয়, আমি নাকি কেবল ইউপিডিএফ-এর অন্ধ সমালোচক। শুধু অভিযোগ নয়, আমার প্রতিটি পোস্টে জমা হয় কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য আর নানাবিধ হুমকি, যা কোনো সভ্য সমাজে কাম্য নয়। আমাকে ‘জেএসএস’ তকমা দিয়ে খোঁজা হয় আমি কোন শাখার কর্মী। মূলত এই ভুল ধারণার অবসান ঘটাতেই আমার এই লেখা।
আমি কেন ইউপিডিএফ-এর সমালোচনা করি-
১। যে ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে সংগঠনটির জন্ম, ২৮টি বছর পেরিয়েও তারা সরকারের ওপর কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। ২০২২ সালের ৯ জুন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলামের হাতে একটি দাবিনামা তুলে দেওয়া ছাড়া দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক অর্জন নেই।
২। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে স্কুলপড়ুয়া কোমলমতি শিশুদের রাস্তায় নামিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করানো, অশালীন ভাষার প্ল্যাকার্ড-স্লোগান শেখানো—এটি কোনো রাজনৈতিক সচেতনতা নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে সহিংসতা ও ঘৃণার বীজ বপন করা। আমরা তো চিরকাল শিখে এসেছি, সন্তানের সামনে মা-বাবা ঝগড়া করে না। অথচ এখানে রাজনীতির নামে শিশুমনে হিংসা ও ধ্বংসের বিষ ঢালা হচ্ছে।
অন্যদিকে জেএসএস চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশ-বিদেশে একঝাঁক মুক্তিপাগল মানুষকে নিয়ে নিরলস কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর জাতিসংঘের অধিবেশনে পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়নসহ অধিকারহারা মানুষের পক্ষে তারা সোচ্চার হচ্ছে।
জেএসএস যে ভুলের ঊর্ধ্বে বা ধোয়া তুলসীপাতা, তা বলছি না। কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে বড় কাজ করতে গেলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা অপরাধ নয়—অনিবার্য মূল্য। একটি বিশাল বটবৃক্ষের নিচে অন্য চারাগাছ সহজে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। বটগাছটি হয়তো তা জানে। কিন্তু সে এও জানে, তার একটি মহাজাগতিক দায় আছে—তার ডালে হাজারো পাখি বাসা বাঁধবে, ফল খেয়ে জীবন বাঁচাবে, আর ক্লান্ত পথিক তার ছায়ায় এসে দেহ-মন জুড়াবে।
আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, পাহাড়ের প্রতিটি মানুষই ‘মুক্তিপাগল’। কিন্তু শুধু মুখে বড় বড় বুলি আর ফাঁকা স্লোগানে মুক্তি আসে না। বুদ্ধ বলে গেছেন—“দুঃখ যেমন আছে, দুঃখমুক্তির উপায়ও আছে।” বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় পার্বত্য চুক্তির কথা বলা এবং এর পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করা ছাড়া পাহাড়ের মানুষের অধিকার আদায়ের আর কোনো যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবসম্মত পথ নেই।
তাই ইউপিডিএফ-এর বন্ধুদের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, তুচ্ছ ও ভিত্তিহীন ইস্যু নিয়ে ব্যক্তি-বিদ্বেষ ছড়াবেন না, হুমকি-ধমকির সংস্কৃতি বন্ধ করুন। নিজেদের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এবং মিশন-ভিশন নিয়ে নির্মোহ আত্মসমালোচনা করুন। এতে দল, দেশ ও জাতি, সবারই মঙ্গল হবে। যারা সত্যিকার অর্থে সমাজের জন্য কাজ করেন, তারা জানেন পার্বত্য চুক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং এর বাস্তবায়ন কতটা জরুরি।
এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের। আমার এই সত্য উচ্চারণ ও লেখনীর পর আপনারা আমাকে কোন কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন? জাত-বিরোধী, নাকি দালালের তকমা দেবেন? আমি কেবল সত্য ও বাস্তবতার পক্ষে দাঁড়ানো এক নিঃসঙ্গ বন্দা।
চুক্তির পরবর্তী ২৮ বছরের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত আমাদের কী দিয়েছে? দিয়েছে শুধু লাশের মিছিল, মা-বোনের আহাজারি আর মেধার অপচয়। পূর্ণস্বায়ত্তশাসন হোক বা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, লক্ষ্য যাই হোক, যদি তার পথ রচিত হয় ভাইয়ের রক্তে, তবে সে মুক্তি কার জন্য?
পাহাড়কে আর রক্তাক্ত করবেন না। আত্মসমালোচনার আয়নায় নিজেদের দেখুন। কারণ পাহাড়ের প্রতিটি পাথর আজও ফিসফিস করে বলে, “চুক্তি বাস্তবায়নই শেষ কথা”।
পাহাড়ের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার আওতায় আসুক- ইনজেব চাঙমা
ইনজেব চাঙমা মানুষ জন্ম নেয় একটি ভূখণ্ডে, কিন্তু তার প্রকৃত জন্ম ঘটে একটি ভাষায়। মায়ের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রথম শব্দ, ঘুমপাড়ানি গানের সুর, শৈশব...
-
সেদিন ছিল ১৭ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, এক অলস বুধবার। চারদিকের আকাশ সকাল থেকেই মেঘের ঘন চাদরে ঢাকা। মাঝে মাঝে সেই মেঘের বুক চিরে সূর্য তার তেজস্...
-
পাহাড়ে আজ যে ‘মর্ডানিজম’ দেখা যাচ্ছে, তা আসলে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা নয়। এটি হলো সাজানো-গোছানো এক নতুন উপনিবেশ। বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর, ভেতর...
-
𑄃𑄨𑄢𑄪𑄇𑄴 𑄃𑄬𑄇𑄴𑄇𑄚𑄴 𑄃𑄪𑄌𑄴𑄮𑄟𑄨 𑄇𑄟𑄴 𑄃𑄟𑄢𑄬 𑄚𑄪𑄃𑄧 𑄉𑄧𑄢𑄨 𑄝𑄪𑄇𑄴 𑄝𑄚𑄨 𑄘𑄬𑄢𑄴, 𑄘𑄬𑄢𑄴 𑄞𑄧𑄢𑄬 𑄃 𑄥𑄧𑄝𑄧𑄚𑄴 𑄘...










