বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬

কবি আশীষ খীসা : পাহাড়ের নৈঃশব্দ্যে যে কবি শব্দের প্রদীপ জ্বালান - Injeb Changma

পাহাড়ের জীবন কখনো কেবল পাহাড়ের মতো স্থির নয়। তার বুকের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে অজস্র গল্পবৃষ্টিভেজা শৈশব, সবুজের মায়া, মানুষের হাসি-কান্না, বিচ্ছেদের দীর্ঘশ্বাস, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা আর আবারও উঠে দাঁড়ানোর দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা। সেই জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন, অনুভব করেছেন এবং শব্দের শরীরে ধারণ করেছেন কবি আশীষ খীসা। তাঁর জীবন যেন এক দীর্ঘ পথের কাব্য- যেখানে শিক্ষকতার শৃঙ্খলা, সাহিত্যের আবেগ, সংগীতের মাধুর্য এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের অবিনাশী লড়াই একাকার হয়ে গেছে।

১৯৭০ সালের ৩১ আগস্ট রাঙামাটি জেলা সদরের দীঘলী বাঁক গ্রামে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন কবি আশীষ খীসা। পিতা বিনয় কান্তি খীসা, মাতা গোপাদেবী খীসা। পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, মাটির গন্ধ, মানুষের সহজ জীবন আর প্রকৃতির অন্তরঙ্গ সান্নিধ্যেই তাঁর শৈশবের দিনগুলো ধীরে ধীরে বেড়ে উঠেছিল। হয়তো সেই শৈশবেরই কোনো এক অদৃশ্য মুহূর্তে তাঁর অন্তরে জন্ম নিয়েছিল শব্দের প্রতি ভালোবাসা- যে ভালোবাসা পরবর্তীকালে তাঁকে কবিতার কাছে, গানের কাছে, সাহিত্যের কাছে নিয়ে যায়।

তাঁর পৈতৃক নিবাস রাঙামাটি পার্বত্য জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার মারিশ্যা তুলাবান গ্রামে। বর্তমানে বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলীকদম উপজেলার ভারত মোহন পাড়ায় তিনি স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। জীবনের ভৌগোলিক ঠিকানা বদলালেও পাহাড় তাঁর অন্তরের ঠিকানা থেকে কখনো মুছে যায়নি।

কবি আশীষ খীসা বান্দরবানের আলীকদমের শুভদিনী চাকমা সাথে  ৯ ফেব্রুয়ারি ২০০১ সালে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। শুভদিনী চাকমা বর্তমানে আলীকদম উপজেলা সমাজসেবা অফিসে কর্মরত। তাঁদের দাম্পত্যজীবন ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পারিবারিক বন্ধনে সমৃদ্ধ।

এই দম্পতির দুই কন্যা। বড় মেয়ে পিউলি খীসা ইষ্টি। তিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। ছোট মেয়ে প্রিম খীসা নিঝুম। তিনিও উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে চলেছেন এবং বর্তমানে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পড়াশোনা করছেন

আশীষ খীসার শিক্ষাজীবন ছিল না কোনো মসৃণ নদীর মতো- বরং পাথুরে পাহাড়ি পথের মতো, যেখানে প্রতিটি বাঁকে ছিল অনিশ্চয়তা, বাধা নতুন করে পথ খুঁজে নেওয়ার প্রয়োজন। নানিয়ারচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে চতুর্থ শ্রেণি এবং তুলাবান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ থেকে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ শেষ করে তিনি কাচালং সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, মারিশ্যা থেকে এসএসসি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। পরে রাঙ্গুনীয়া কলেজ থেকে এইচএসসি এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এড. এম.এড. ডিগ্রিও লাভ করেন; এম.এড.- অর্জন করেন প্রথম বিভাগ।

তবে তাঁর শিক্ষাজীবনের গল্প শুধু অর্জনের নয়, এর ভেতরে রয়েছে হার না মানা এক মানুষের দীর্ঘশ্বাসও।

১৯৯০-৯১ শিক্ষাবর্ষে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অনার্সে ভর্তি হয়েছিলেন তিনি। প্রথম সেমিস্টার শেষ হওয়ার আগেই নব্বইয়ের গণআন্দোলনের উত্তাল সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ অশান্ত হয়ে ওঠে। দীর্ঘ প্রায় এগারো মাস বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকায় অপেক্ষার প্রহর ক্রমশ তাঁর ধৈর্যের সীমা অতিক্রম করে। শেষ পর্যন্ত ১৯৯২ সালে রাউজান কলেজ থেকে ডাইরেক্ট রেজিস্ট্রেশন করে বি.. (পাস) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন এবং রাউজান কেন্দ্রে সেন্টার ফার্স্ট হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

কিন্তু তাঁর জ্ঞানপিপাসা তখনো থামেনি। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে লোক প্রশাসনে এম.. এবং চট্টগ্রাম আইন কলেজের নৈশ শাখায় এলএলবিতে ভর্তি হন। দুটো ক্ষেত্রেই প্রথম পর্ব বা প্রিলিমিনারি পরীক্ষার বাধা অতিক্রম করেছিলেন; কিন্তু পরিস্থিতির নির্মম বাস্তবতা তাঁকে চূড়ান্ত পরীক্ষার দরজায় পৌঁছেও থামিয়ে দেয়।

এরপর চট্টগ্রাম কলেজে ইসলামের ইতিহাস সংস্কৃতি বিষয়ে এম..-তে ভর্তি হন। সেখানেও হরতালের কারণে পরীক্ষার তারিখ পরিবর্তিত হয়। যোগাযোগের অভাবে পরিবর্তিত তারিখ জানতে না পারায় ফাইনাল মৌখিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সুযোগ হারান।

জীবনের এই ঘটনাগুলোকে নিছক ব্যর্থতা বলে দেখলে ভুল হবে। বরং এগুলো তাঁর চরিত্রের দৃঢ়তার দলিল। যে মানুষ বারবার দরজা বন্ধ হতে দেখেও নতুন দরজার সন্ধান করেন, তাঁর জীবন আসলে পরাজয়ের নয়অদম্য প্রত্যয়ের জীবন।

১৯৯৫ সালে ফটিকছড়ির নাজিরহাট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে তাঁর শিক্ষকতা জীবনের সূচনা। ইংরেজি বিষয়ের শিক্ষক হিসেবে ২০০৬ সালের প্রায় শেষ পর্যন্ত তিনি সেখানে দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর ২৩ ডিসেম্বর ২০০৬ সালে বান্দরবানের থানচি উপজেলার ক্যাচুপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। পরে বদলি হয়ে ২০১২ সালের মার্চ আলীকদমের ভরিরমুখ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। আজও তিনি সেই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

একজন প্রকৃত শিক্ষক কেবল বইয়ের অক্ষর পড়ান না; তিনি মানুষের ভেতরে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে দেন। আশীষ খীসার শিক্ষকতা তাই তাঁর কাছে চাকরির পরিচয় নয় এক নীরব সামাজিক সাধনা। তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের স্বীকৃতি এসেছে ২০২৩ সালের জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদকে উপজেলা জেলা পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে।

ক্লাসরুমের দায়িত্ব শেষ হলে আশীষ খীসার আরেকটি পৃথিবীর দরজা খুলে যায়। সেই পৃথিবীর নাম সাহিত্য।

সাহিত্য তাঁর কাছে অবসরের বিনোদন নয়; বরং আত্মার বিশ্রাম। শব্দের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। তিনি কবিতা লেখেন, ছড়া লেখেন, গল্প লেখেন, গান লেখেন; আবার সেই গান কণ্ঠেও ধারণ করেন। একাধারে তিনি কবি, ছড়াকার, লেখক, সাহিত্যিক, গীতিকার, গায়ক ডিজিটাল ক্রিয়েটর।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সাহিত্য সংগঠন, অনলাইন ম্যাগাজিন, পত্রিকা বিভিন্ন ওয়েবপেজে নিয়মিত প্রকাশিত হয় তাঁর কবিতা, ছড়া, গল্প গান। তাঁর সাহিত্যচর্চা তাই কেবল মুদ্রিত বইয়ের পাতায় আবদ্ধ নয়; প্রযুক্তির নতুন পরিসরেও তাঁর সৃষ্টিশীলতার বিচরণ অব্যাহত।

তাঁর কবিতায় কখনো প্রেমের নরম আলো, কখনো জীবনের বিষণ্নতা, কখনো মানুষের স্বপ্ন, আবার কখনো পাহাড়ের নীরব প্রকৃতি এসে মিশে যায়। শব্দকে তিনি কেবল সাজান নাশব্দের মধ্যে অনুভূতির প্রাণ সঞ্চার করতে চান।

আশীষ খীসার একক যৌথ প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩৬টি। তাঁর একক কাব্যগ্রন্থ কবিতায় কবির দর্শন এবং কাব্য দর্পণ তাঁর নিজস্ব কাব্যভুবনের পরিচায়ক।

যৌথ কাব্যগ্রন্থের দীর্ঘ তালিকায় রয়েছে- বাংলাদেশের ২৩০ কবি, কাব্যময় কথা, গল্পটা কবিতা কাব্যের, নিঝুম রাতের কাব্য, মানিক রতন, সূর্যকিরণ, কাব্য প্রেরণা, শিল্পাঙ্গন সংকলন (), ৬৪ জেলার নির্বাচিত কবি, শতবর্ষী মুজিব, সাতরঙ, কবিতা মনের কথা বলে, যদি তুমি জানতে, বায়ান্ন থেকে একাত্তর, মায়াবতীর নীল কাব্য, শত স্মৃতির কাব্যমালা, পার্বত্য কাব্যের নির্ঝরিণী ধারা, স্বপ্নের ডাক বাংলা, ডাক বাংলা কাব্যকুঞ্জ, জয়ন্তী কামালা, The Burn of Love/ভালোবাসার আগুন এবং পহর ফুদোক

ছড়ার জগতে তাঁর যৌথ গ্রন্থ স্বপ্নপুরীর ছড়া শিশুতোষ ছড়ার মেলা গল্পগ্রন্থ গল্প কথা ()-তেও রয়েছে তাঁর সৃষ্টির স্বাক্ষর।

ছাড়া সূর্যকিরণ, তন্দ্রাহারা পাহাড়ি ভূমি, বন্ধুর বন্ধনে প্রয়াস, অরণ্য ক্যানভাস, সংজোয়ার, আমার ভাষায় আমার সাহিত্য, সরস্বতী সাহিত্য ধারা, চিন পর্য্যা- এবং কালের বাংলাদেশ ঈদ সংখ্যাসহ বিভিন্ন যৌথ ম্যাগাজিন সংকলনে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে।

একজন কবির প্রকৃত পরিচয় তাঁর বইয়ের সংখ্যায় নয়; তাঁর পরিচয় তাঁর রেখে যাওয়া অনুভূতির পদচিহ্নে। আশীষ খীসার প্রকাশনা-যাত্রা সেই পদচিহ্নকে ক্রমেই দীর্ঘতর করেছে।

আশীষ খীসার সৃষ্টিশীলতার আরেকটি উজ্জ্বল দিক সংগীত। কবিতার সঙ্গে সুরের যে গভীর আত্মীয়তা, তিনি সেই সম্পর্ককে নিজের সৃষ্টিতে রূপ দিয়েছেন।

সোনার চেয়ে দামি মৌলিক গানটির মধ্য দিয়ে বাংলা গানের জগতে গীতিকার হিসেবে তাঁর আত্মপ্রকাশ। গানটির সুর করেছেন বিশিষ্ট কবি, সুরকার বিটিভির সংগীতশিল্পী মো. রেজাউল করিম। সংগীতায়োজনে ছিলেন বিশিষ্ট সুরকার, গীতিকার এবং বেতার বিটিভির তালিকাভুক্ত শিল্পী মিনহাজ উদ্দিন।

পরবর্তীতে তাঁর লেখা চোখের জলে ভাসি এবং পথ পানে চেয়ে থাকবো গানও প্রকাশিত হয়। আরও কয়েকটি মৌলিক গান প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। তাঁর লেখা ছয়টি গান রোবটিক কণ্ঠে ইউটিউবের Music Vibes BD-তে প্রকাশিত হয়েছে।

বাংলার পাশাপাশি চাকমা ভাষার গানেও তাঁর সৃজনশীল উপস্থিতি লক্ষণীয়। স্থানীয় শিল্পীরা তাঁর লেখা চাকমা গান পরিবেশন করেন। ২০২৬ সালে ভারতের ত্রিপুরা থেকে Jhummo Ghoror ব্যানারে ইউটিউবে প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা চাকমা গান Fibir Fibir/পিবির পিবির গানটির সুর করেছেন ত্রিপুরার সংগীতশিল্পী তাপসী চাকমা এবং কণ্ঠ দিয়েছেন তাপসী চাকমা রাজীব টমাস।

যেন তাঁর সৃষ্টির আরেকটি সীমানাবাংলা চাকমা দুই ভাষার সেতুবন্ধনে সাহিত্য সংগীতকে নতুনভাবে স্পর্শ করা।

সাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে অবদানের জন্য কবি আশীষ খীসা জাতীয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিভিন্ন সংগঠন থেকে বহু সম্মাননা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ২০২১ থেকে ২০২৬এই সময়পর্বে তাঁর অর্জিত সম্মাননার তালিকা দীর্ঘ বৈচিত্র্যময়।

এর মধ্যে রয়েছে সূর্যসেনা সাহিত্য পরিষদ সম্মাননা স্মারক, ডাক বাংলা সাহিত্য একাডেমি সেরা কবি সেরা কাব্য সম্মাননা, মুনীর চৌধুরী সাহিত্য পুরস্কার, গীরি সম্প্রীতি সাহিত্য পদক, মাসিক নেত্রজল সাহিত্য ম্যাগাজিন বর্ষসেরা কবি সম্মাননা, অগ্নিবীণা সাহিত্য পুরস্কার, ইউএস বাংলা সাহিত্য সম্মেলন মিশিগান সম্মাননা, ডাক বাংলা সাহিত্য একাডেমি সাহিত্য রত্ন সম্মাননা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় সাহিত্য পুরস্কার, রাজর্ষি সাহিত্য পত্রিকা সাহিত্য জ্যোতি সম্মাননা, স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ সম্মাননা, পার্বত্য কাব্য সম্মাননা, ফুলের মালা সাহিত্য পরিষদ সেরা কবি/লেখক সম্মাননা, তরঙ্গ বার্তা সাহিত্য পরিষদ গ্রন্থ সম্মাননা, বীর চট্টলা কাব্য পরিষদ সম্মাননা, শিল্পাঙ্গন সম্মাননা, আন্তর্জাতিক কৃপা সাহিত্য পরিষদের কাব্য ভারতী উপাধি, আন্তর্জাতিক চাকমা ফাউন্ডেশনের কাব্য জ্যোতি সম্মাননা, মহাত্মা গান্ধী ইন্টারন্যাশনাল পীচ অ্যাওয়ার্ড, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু ইন্টারন্যাশনাল পীচ অ্যাওয়ার্ড, আন্তর্জাতিক অভিরূপ সাহিত্য পরিবার অ্যাওয়ার্ড, ডাক বাংলা লেখক পুরস্কার, বাংলা কবিতাঙ্গন সম্মাননা, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক কবিতা উৎসব স্মারক, ডাক বাংলা সাহিত্য একাডেমি ছড়াকার সম্মাননা, সরস্বতী সাহিত্য ধারা মেমেন্টো, World Wide Writers Association Best Award Certificate, মাসিক কালের বাংলাদেশ ম্যাগাজিন লেখক সম্মাননা, আন্তর্জাতিক সাহিত্য বার্তা সম্মাননা স্মারক এবং World Wide Writers Association International Publishing House-এর খাগড়াছড়ি ভ্রমণ সাহিত্য আড্ডা সম্মাননা স্মারকসহ আরও নানা স্বীকৃতি।

তাঁর এই সম্মাননার মালা নিঃসন্দেহে দীর্ঘ। কিন্তু কবির জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার কোনো পদক নয়পাঠকের হৃদয়ে একটি পঙ্ক্তির স্থায়ী হয়ে থাকা। একটি গান মানুষের একাকী সময়ে সঙ্গী হয়ে ওঠা। একটি কবিতা কোনো অচেনা মানুষের চোখে জল এনে দেওয়া। সৃষ্টির প্রকৃত সার্থকতা সেখানেই।

আশীষ খীসাকে একক কোনো পরিচয়ের ফ্রেমে বাঁধা কঠিন। তিনি শিক্ষক, কিন্তু শুধু শিক্ষক নন। তিনি কবি, কিন্তু শুধু কবিও নন। তিনি গীতিকার, গায়ক, লেখক, ছড়াকার ডিজিটাল ক্রিয়েটরপ্রতিটি পরিচয়ের মধ্যে তিনি নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেছেন।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এখানেই- পেশা সৃষ্টিকে তিনি পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী করেননি। বরং শিক্ষকতার ব্যস্ততার মধ্যেও সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রেখেছেন; সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সংগীতকে আপন করে নিয়েছেন। জীবনের নানা বাধা তাঁর সৃজনশীলতার পথ রুদ্ধ করতে পারেনি।

পাহাড়ের মানুষ হিসেবে তাঁর জীবন সৃষ্টিতে পাহাড়ের একটি অন্তর্লীন সুরও অনিবার্যভাবে ধ্বনিত হয়। সেই সুর কখনো প্রকৃতির, কখনো মানুষের, কখনো স্মৃতির, কখনো হারানোর; আবার কখনো নতুন করে বেঁচে ওঠার।

জীবন কখনো আমাদের পছন্দমতো গল্প লিখে দেয় না। কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, কখনো পরীক্ষার সুযোগ হারিয়ে যায়, কখনো সময় পরিস্থিতি স্বপ্নের পথে দেয়াল তুলে দাঁড়ায়। কিন্তু মানুষ যদি তার ভেতরের আলোটুকু জ্বালিয়ে রাখতে পারে, তবে কোনো অন্ধকারই তাকে শেষ পর্যন্ত পরাজিত করতে পারে না। কবি আশীষ খীসার জীবন সেই অন্তর্গত আলোরই গল্প।

শিক্ষাজীবনের প্রতিকূলতা তাঁকে থামাতে পারেনি। শিক্ষকতার দীর্ঘ দায়িত্ব তাঁর কবিসত্তাকে নিঃশেষ করেনি। বরং জীবনের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি অভিজ্ঞতা, প্রতিটি হারানো সুযোগ এবং প্রতিটি অর্জন তাঁর সৃষ্টির ভেতর নতুন কোনো শব্দের জন্ম দিয়েছে।

তিনি আজও শ্রেণিকক্ষে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে জ্ঞানের প্রদীপ তুলে দেন; অবসরে কলম হাতে বসেন; কখনো কবিতার শরীরে হৃদয়ের কথা লেখেন, কখনো গানের সুরে অনুভূতিকে ভাসিয়ে দেন। তাঁর কলমে বাংলা চাকমা ভাষা পাশাপাশি হাঁটে; তাঁর সৃষ্টিতে পাহাড় মানুষের জীবন পরস্পরের মুখোমুখি দাঁড়ায়।

তাই কবি আশীষ খীসার জীবনকে কেবল একজন শিক্ষকের জীবন বলা যায় না, কেবল একজন কবির জীবনও বলা যায় না। তিনি মূলত একজন নিরন্তর পথিক- জ্ঞান থেকে সৃষ্টিতে, সৃষ্টি থেকে সুরে, সুর থেকে মানুষের হৃদয়ে যাঁর অবিরাম যাত্রা।

পাহাড়ের নীরবতারও যে নিজস্ব ভাষা আছে, তা যারা শুনতে পান, তারাই কবি হয়ে ওঠেন। আশীষ খীসা সেই নীরবতার ভাষা শুনেছেন। আর তাই তাঁর হাতে শব্দ কেবল শব্দ থাকে না- কখনো তা হয়ে ওঠে কবিতা, কখনো গান, কখনো স্মৃতি, কখনো ভালোবাসা, কখনো বা মানুষের জীবনেরই এক টুকরো প্রতিচ্ছবি।

 

কবি আশীষ খীসা : পাহাড়ের নৈঃশব্দ্যে যে কবি শব্দের প্রদীপ জ্বালান - Injeb Changma

পাহাড়ের জীবন কখনো কেবল পাহাড়ের মতো স্থির নয়। তার বুকের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে অজস্র গল্প — বৃষ্টিভেজা শৈশব , সবুজের মায়া , ...