একটি জাতির ইতিহাস শুধু রাজা-রাজড়ার ইতিহাস নয়। ইতিহাসের পাতা শুধু রাজদণ্ড হাতে থাকা মানুষদের নামেই পূর্ণ হয় না। ইতিহাসের গভীরতম জায়গাগুলোতে কখনো কখনো লেখা থাকে এমন কিছু মানুষের নাম, যাঁরা কোনো সিংহাসনে বসেননি, কোনো রাজমুকুট পরেননি, কোনো ক্ষমতার দম্ভ দেখাননি; তবু নিঃশব্দে নিজের জীবন পুড়িয়ে আলো জ্বালিয়েছেন জাতির পথের জন্য।
তাঁদের হাতে থাকে না রাজদণ্ড, থাকে কলম।তাঁদের মুখে থাকে না ক্ষমতার ভাষা- থাকে মাতৃভাষার উচ্চারণ। তাঁদের স্বপ্ন নিজের জন্য নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। চাঙমা ভাষা, সাহিত্য ও অঝাপাতের ইতিহাসের সেই নীরব আলোকবর্তিকাদের একজন নোয়ারাম চাঙমা।
তাঁর জীবনকে যতই কাছে থেকে দেখি, ততই মনে হয়, এটি শুধু একজন মানুষের জীবনী নয়; এটি একটি ভাষার জন্য লড়াই করা এক মানুষের কাহিনি। এটি একজন অনাথ শিশুর গল্প, যে জীবনের শুরুতেই হারিয়েছিল পিতা-মাতার ছায়া; একজন রাখালের গল্প, যে গরু চরাতেও শব্দের সঙ্গে বন্ধুত্ব করেছিল; একজন শিক্ষকের গল্প, যিনি নিজে শিখেছেন এবং অন্যকে শেখানোর ব্রত নিয়েছেন; একজন সাহিত্যিকের গল্প, যিনি নিজের জাতির হারিয়ে যেতে বসা কণ্ঠগুলোকে কাগজে ধরে রাখতে চেয়েছেন। আর সর্বোপরি, এটি একজন ভাষাসেবকের গল্প, যিনি অঝাপাতের অক্ষরগুলোকে মুদ্রিত কাগজে প্রাণ দিতে চেয়েছিলেন।
আমার সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, নোয়ারাম চাঙমা ১৯২২ সালের ২২ জানুয়ারি ভারতের ত্রিপুরার গোমেতকুলের তীর্থমোর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা শুক্রমণি চাঙমা এবং মাতা কালাবী চাঙমা। কিন্তু জন্মের আনন্দ তাঁর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। নাবালক বয়সেই তিনি হারিয়ে ফেলেন মা-বাবাকে।
একটি শিশুর পৃথিবী তখন কত ছোট থাকে! মায়ের আঁচল, বাবার কণ্ঠ, ঘরের উঠান, এই নিয়েই তার পৃথিবী। অথচ সেই পৃথিবীটুকুও নোয়ারামের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল অতি অল্প বয়সে। যে বয়সে অন্য শিশুরা বাবা-মায়ের হাত ধরে পৃথিবী চিনতে শেখে, সে বয়সেই নোয়ারামকে চিনতে হয়েছিল পৃথিবীর নির্মমতা। পরবর্তীতে তাঁর জেটু সাপ্যে চাঙমা ত্রিপুরার গোমেতকুলে গিয়ে মা-বাবাহীন অসহায় নোয়ারামকে সঙ্গে করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মিঙিনি এলাকার বাজেইছড়া গ্রামে নিয়ে আসেন।
সেদিন হয়তো কেউ জানত না, এই অনাথ শিশুটিই একদিন চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে নিজের নাম লিখে যাবে।
সে সময় পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদে শিক্ষার আলো ছিল খুবই ক্ষীণ। গ্রামে গ্রামে বিদ্যালয় ছিল না। বই ছিল দুর্লভ। নিয়মিত শিক্ষার সুযোগ ছিল আরও দুর্লভ। এমন সময় চিৎমরঙ থেকে চংড়াছড়ির ফুলচান কার্বারীপাড়া গ্রামে এক ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এক ভান্তের সঙ্গে সাপ্যে চাঙমার পরিচয় হয়। কথার একপর্যায়ে উঠে আসে মা-বাবাহীন নোয়ারামের কথা। একজন শিশুর অসহায়ত্বের কথা শুনে ভান্তের হৃদয় নরম হয়ে যায়। তিনি নোয়ারামকে চিৎমরঙে নিয়ে যান লেখাপড়া শেখানোর আশায়।
সেখানে তাঁর আরেক ছাত্র ছিলেন কালিকুমার চাঙমা। দুজনের একসঙ্গে থাকা, খাওয়া ও ছাত্রজীবন শুরু হয়। কিন্তু জীবন যেন নোয়ারামের পথকে বারবার কঠিন করে তুলতে চেয়েছিল। বয়সে ছোট নোয়ারামকে অনেকটা কালিকুমারের কথামতো চলতে হতো। একসময় তাঁদের দুষ্টুমি ভান্তের নজরে আসে। সিদ্ধান্ত হলো, নোয়ারামকে আবার তাঁর জেটুর কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। আবার পথ। আবার অনিশ্চয়তা। আবার আশ্রয়ের সন্ধান।
যাত্রামণি চাঙমা প্রতি বছর চিৎমরঙে মানস সরোবরের উদ্দেশ্যে যেতেন। ভান্তের আদেশে তিনি নোয়ারামকে সঙ্গে করে তাঁর জেটু সাপ্যের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য নিয়ে আসেন। পথে লংগদুর যাত্রামণি চাঙমার বাড়িতে রাতযাপন করেন। সেখানে নোয়ারামের মা-বাবা কেউ বেঁচে নেই, এই কথা জানতে পারেন তিনি।
নোয়ারামের আপন বলতে যেন দূর ভারতের সেই জন্মভূমি ছাড়া আর কিছুই ছিল না। যাত্রামণি চাঙমা তাঁকে নিজের বাড়িতে রাখাল হিসেবে থাকার প্রস্তাব দেন। নোয়ারাম রাজি হয়ে যান। কারণ জীবনের তখন আর কতটুকুই বা দাবি করার ছিল তাঁর?
নোয়ারাম গরু চরাতে শুরু করলেন। কিন্তু গরুর পাল চরাতে চরাতেও তাঁর মন যেন অন্য কোথাও ঘুরে বেড়াত। সুযোগ পেলেই তিনি লিখতেন। কবিতা লিখতেন, গল্প লিখতেন, কৌতুক লিখতেন, গান লিখতেন।
অভাব তাঁর হাত থেকে কলম কেড়ে নিতে পারেনি। জীবন তাঁকে বই দেয়নি; তিনি নিজের ভেতর থেকেই বইয়ের জগৎ তৈরি করতে শুরু করেছিলেন। এইভাবেই ধীরে ধীরে তাঁর প্রতিভার কথা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। যাত্রামুড়া গ্রামের এক শিক্ষক যখন পড়াতেন, নোয়ারাম দূর থেকে মনোযোগ দিয়ে তাঁর পাঠ শুনতেন। শুধু শুনতেন না, কখনো শিক্ষকের ভুলও ধরিয়ে দিতেন। বিষয়টি যাত্রামণি চাঙমার চোখ এড়াল না। একদিন তিনি নোয়ারামকে জিজ্ঞেস করলেন—
‘তুমি কি পড়াশোনা পারো?’ নোয়ারামের উত্তর ছিল, ‘হ্যাঁ।’ সেই একটি ‘হ্যাঁ’ যেন তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। যাত্রামণি বুঝলেন, এই ছেলেটির ভেতরে কিছু আছে। তিনি তাঁকে শিক্ষক হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত নিলেন। এরপর নোয়ারাম হয়ে উঠলেন ‘নোয়ারাম মাস্টার’। একদিন যে হাত গরুর দড়ি ধরেছিল, সেই হাতেই ধরা পড়ল শিক্ষার প্রদীপ।
যাত্রামণি চাঙমা নোয়ারামের মেধা ও গুণে মুগ্ধ হয়ে নিজের মেয়ে ফুলেশ্বরী চাঙমা-র সঙ্গে তাঁর বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রবীণদের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, ফুলেশ্বরী চাঙমা তখন কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত ছিলেন। তবু নোয়ারাম পিছিয়ে যাননি।
কেন?
সম্ভবত তাঁর মনে তখনও জ্বলছিল সেই পুরোনো দিনের কথা, একজন অসহায় অনাথ শিশুকে যিনি আশ্রয় দিয়েছিলেন, তাঁর কাছে নোয়ারামের ঋণ ছিল কৃতজ্ঞতার, মানবিকতার। তাই কোনো দ্বিধা ছাড়াই তিনি বিয়েতে সম্মতি দেন।
নোয়ারাম ও ফুলেশ্বরীর সংসারে একে একে জন্ম নেন- বাসন্তি, আরতি, বিরতি, মনদেবী, কল্যাণ সাধন, বিনা দেবী ও রিনা দেবী। সাত সন্তান নিয়ে তাঁদের সংসার পূর্ণ হয়।
কিন্তু ফুলেশ্বরীর রোগ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য নোয়ারাম চাঙমা ছুটে যান চন্দ্রঘোনায়। সেখানে তাঁর পরিচয় হয় ড. স্ক্রোব-এর সঙ্গে। পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, চিকিৎসার পাশাপাশি ড. স্ক্রোব তাঁকে খ্রিস্টান ধর্ম গ্রহণের শর্ত দেন। অসহায় পরিস্থিতিতে নোয়ারাম সেই শর্ত মেনে নেন। চিকিৎসার পর ফুলেশ্বরী সুস্থ হয়ে ওঠেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
এই সময় ড. স্ক্রোব নোয়ারামের মেধা ও দক্ষতায় মুগ্ধ হন। তাঁকে শিক্ষার প্রসারে কাজ করার পরামর্শ দেন। নোয়ারাম সেই পরামর্শকে জীবনের আরেকটি দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেন। ড. স্ক্রোবের উদ্যোগে নোয়ারাম চাঙমা ময়মনসিংহের বিরিশিরিতে যান। সেখানে প্রায় তিন বছর অবস্থান করেন। তিন বছর পর তিনি ফিরে আসেন আবার তাঁর পাহাড়ে, গ্রামে। কিন্তু এবার তিনি আর আগের সেই নোয়ারাম নন। জীবন তাঁকে অনেক কিছু শিখিয়েছে—অভাব শিখিয়েছে, সংগ্রাম শিখিয়েছে, শিক্ষা শিখিয়েছে, মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, নিজের জাতির ভাষাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে।
চাঙমা ভাষার ইতিহাসে ১৯৫৯ সাল একটি স্মরণীয় বছর। এই বছর চট্টগ্রামের ইসলামিয়া লিথো অ্যান্ড প্রিন্টিং প্রেস থেকে নোয়ারাম চাঙমা প্রকাশ করেন ‘চাঙমার পত্থম শিক্ষা’। ছাপাখানার অক্ষরে চাঙমা বর্ণমালায় একটি বই!
আজকের দিনে হয়তো এই ঘটনাকে সহজ মনে হতে পারে। কিন্তু সেই সময়ের বাস্তবতা বিবেচনা করলে বোঝা যায়, এটি কত বড় সাহসের কাজ ছিল। এটি শুধু একটি বই প্রকাশ নয়। এটি ছিল অক্ষরকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। এটি ছিল ভাষাকে কাগজে স্থায়ী করার চেষ্টা। এটি ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে নিজের ভাষার প্রথম পাঠ তুলে দেওয়ার চেষ্টা।
চাঙমা সমাজের সর্বস্তর থেকে বইটি স্বাগত জানানো হয়েছিল বলে তৎকালীন স্মরণলেখায় উল্লেখ পাওয়া যায়। আরও জানা যায়, তৎকালীন ইস্ট পাকিস্তান স্কুল টেক্সটবুক বোর্ড বইটিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছিল।
গ্রন্থটির দ্বিতীয় সংস্করণ ১৯৬১ সালে প্রকাশিত হয় বলে সংগৃহীত তথ্যে জানা যায়। পরবর্তীতে এর তৃতীয় সংস্করণের ২০১৭সাল তথ্য পাওয়া যায়।
এই একটি বইয়ের মধ্য দিয়েই নোয়ারাম চাঙমা যেন বলে গেলেন- ‘আমাদের ভাষাও বই হতে পারে। আমাদের অক্ষরও ছাপাখানায় বাঁচতে পারে। আমাদের শিশুরাও নিজের ভাষায় পড়তে পারে।’
‘চাঙমার পত্থম শিক্ষা’ শুধু সাধারণ মানুষের কাছেই সমাদৃত হয়নি; তৎকালীন চাঙমা রাজা ত্রিদিব রায়ও বইটির গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিলেন।
সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, তিনি নোয়ারাম চাঙমার এই উদ্যোগকে জাতির ঐতিহাসিক গৌরব ও ভাবপ্রকাশের নতুন দ্বার উন্মোচনকারী হিসেবে দেখেছিলেন এবং তাঁকে ‘জাতীয় সেবক’ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছিলেন।
রাজা ত্রিদিব রায়ের বক্তব্যের মর্মার্থ ছিল- চাঙমা জাতির প্রাচীন ঐতিহাসিক গৌরব, নানা কথা ও কাহিনী এতদিন জাতীয় লেখনীর মাধ্যমে যথাযথভাবে রূপ পায়নি। নোয়ারামের উদ্যোগের মধ্য দিয়ে চাঙমা জাতির উন্নতি ও ভাবপ্রকাশের একটি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।
এই স্বীকৃতি নোয়ারামের ব্যক্তিগত সম্মানই শুধু নয়; এটি ছিল চাঙমা ভাষা ও অঝাপাতের প্রতি একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি।
নোয়ারাম চাঙমা শুধু নতুন বই লেখেননি। তিনি ফিরে গিয়েছিলেন অতীতের কাছেও। চাঙমা সমাজের মুখে মুখে বেঁচে থাকা পুরোনো লোকগীতি ও পালাগান তিনি সংগ্রহ করেছিলেন। স্বর্গপালা, লক্ষীপালা, বুদ্ধলামা, এসব লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের পাশাপাশি চাঙমাদের প্রসিদ্ধ লোকগীতি রাধামন-ধনপুদি পালা নিয়েও তিনি পাণ্ডুলিপি রচনা করেছিলেন বলে সংগৃহীত তথ্যে জানা যায়।
তিনি যেন বুঝেছিলেন, একটি জাতির সাহিত্য শুধু নতুন করে লেখা বইয়ে থাকে না; তার আসল শিকড় লুকিয়ে থাকে মানুষের মুখে মুখে ফিরে বেড়ানো গান, পালা, কাহিনী আর স্মৃতির মধ্যে। সেই হারিয়ে যেতে বসা কণ্ঠগুলোকে তিনি কাগজে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর সামনে তখনও সেই পুরোনো বাধা, অর্থের অভাব।
অনেক পাণ্ডুলিপি ছিল। অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু ছাপাখানায় নেওয়ার মতো অর্থ ছিল না। ফলে তাঁর বহু মূল্যবান সংগ্রহ ও রচনা অপ্রকাশিত থেকে যায়। একজন লেখকের কাছে এর চেয়ে বড় বেদনা আর কী হতে পারে? কলম ছিল। কাগজ ছিল। সৃষ্টি ছিল। কিন্তু বই হয়ে ওঠার সামর্থ্য ছিল না। যতটুকু পেরেছেন, ততটুকুই রেখে গেছেন।
অর্থের সংকটের মধ্যেও তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ করতে সক্ষম হন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
- চাঙমার পত্থম শিক্ষা
- পরিবার পরিকল্পনা গান
তাঁর মৃত্যুর পর ‘পার্বত্য রাজ লহরি’ প্রকাশিত হয় বলে সংগৃহীত তথ্যে জানা যায়। তাঁর বিভিন্ন সাহিত্যকর্ম, লোকসাহিত্য সংগ্রহ ও পাণ্ডুলিপি চাঙমা সাহিত্য-ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নোয়ারাম চাঙমার ভাষাসেবার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল তাঁর অনুবাদকর্ম।
খ্রিস্টধর্মাবলম্বী চাঙমাদের জন্য তিনি বাইবেলের বিভিন্ন গল্প চাঙমা অক্ষর ও ভাষায় অনুবাদ ও প্রকাশ করেছিলেন বলে সংগৃহীত তথ্যে জানা যায়।
অন্য ভাষার ধর্মীয় ও নৈতিক কাহিনীকে নিজের মাতৃভাষায় রূপ দেওয়া ছিল শুধু অনুবাদের কাজ নয়; এটি ছিল ভাষাকে নতুন বিষয়বস্তু ধারণের উপযোগী করে তোলারও একটি প্রয়াস। অঝাপাতের অক্ষরে এসব লেখা ছিল তাঁর কাছে ভাষাকে জীবিত রাখার আরেকটি পথ।
নোয়ারাম চাঙমার কাছে অঝাপাত ছিল শুধু কয়েকটি অক্ষরের সমষ্টি নয়। অক্ষরের মধ্যে তিনি দেখতে পেয়েছিলেন জাতির স্মৃতি। একটি জাতি তার গল্প হারালে শুধু গল্প হারায় না, সে তার অতীতের একটি অংশ হারায়। একটি জাতি তার ভাষা হারালে শুধু কথা বলার মাধ্যম হারায় না, সে নিজের পরিচয়ের একটি দরজা হারায়।
নোয়ারাম তাই অক্ষরকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। তিনি চাঙমা বর্ণমালায় লিখেছেন। শিখিয়েছেন। বই প্রকাশ করেছেন। অনুবাদ করেছেন। লোকসাহিত্য সংগ্রহ করেছেন।
অর্থাৎ তিনি অঝাপাতকে শুধু ব্যবহার করেননি; অঝাপাতের জন্য একটি ব্যবহারিক জগৎ তৈরি করার চেষ্টা করেছিলেন।
নোয়ারাম চাঙমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটি হলো, তিনি তাঁর নিজের স্বপ্নের পূর্ণ বিকাশ দেখে যেতে পারেননি। রাঙামাটি প্রকাশনীর প্রচেষ্টায় ‘লক্ষীপালা’ প্রকাশের পথে ছিল। বর্ণমালা চার্টও প্রকাশের অপেক্ষায় ছিল। কিন্তু নোয়ারাম সেই বই কিংবা চার্ট দেখে যেতে পারেননি। আঞ্জিসহ বিভিন্ন লেখা ও পাণ্ডুলিপ।
আরও পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র সুহৃদ চাঙমা শাম, খামতি, অহোম, বার্মিজ, থাই প্রভৃতি বর্ণমালার সঙ্গে চাঙমা বর্ণমালার তুলনামূলক চার্ট তৈরি করেন। চাঙমা ভাষায় ‘ধ্বনিতত্ত্ব’-সহ বর্ণমালার বয়স ও সময়কাল নিয়ে গবেষণামূলক কাজও প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু এসব অগ্রগতির কোনোটি তাঁর চোখে পড়েনি। যে মানুষটি প্রথম ছাপার অক্ষরে চাঙমা বর্ণমালাকে বইয়ের পাতায় দেখতে চেয়েছিলেন, তিনি তাঁর পরবর্তী প্রজন্মের গবেষণার এই অগ্রগতি দেখে যেতে পারেননি। কী অদ্ভুত নিয়তি!
যে মানুষটি ভবিষ্যতের জন্য বীজ বুনেছিলেন, তিনি নিজে সেই বৃক্ষের ছায়ায় বসতে পারেননি।
১৯৭৮ সালের ৮ নভেম্বর নোয়ারাম চাঙমার জীবনাবসান ঘটে। তাঁর চলে যাওয়া ছিল শুধু একটি পরিবারের শোক নয়; এটি ছিল একটি ভাষাসেবকের বিদায়। একটি কলম থেমে গেল। একটি কণ্ঠ নীরব হলো। কিন্তু অঝাপাতের অক্ষরগুলো রয়ে গেল। তিনি যে বই রেখে গেলেন, যে পাণ্ডুলিপি রেখে গেলেন, যে লোকগান সংগ্রহ করে গেলেন, যে ভাষাপ্রেম রেখে গেলেন, সেগুলোই আজ তাঁর জীবনের সাক্ষ্য।
একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য অনেক সময় তাঁর মৃত্যুর পর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নোয়ারাম চাঙমার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি।
তাঁর স্মৃতি ও সাহিত্য-ভাষাসেবার অবদানকে ধারণ করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য পদক’। চাঙমা সাহিত্য, ভাষা ও বর্ণমালায় অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন, এমন ব্যক্তি বা সৃষ্টিশীল মানুষকে তাঁর স্মরণে এই পদক প্রদান করা হয়।
এ পর্যন্ত দুইজন বিশিষ্ট ব্যক্তিকে এই পদক প্রদান করা হয়েছে— ১. চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ান
২. কবি মুকুন্দ চাঙমা।
এই পদক কেবল একটি সম্মাননা নয়; এটি নোয়ারাম চাঙমার রেখে যাওয়া আদর্শের উত্তরাধিকার বহন করে। যে মানুষটি ভাষা, সাহিত্য ও অক্ষরের জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন, তাঁর নামে সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক অবদানের স্বীকৃতি প্রদান নিঃসন্দেহে তাঁর স্মৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে জীবন্ত রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
নোয়ারাম চাঙমার স্মৃতি আজও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ফিরে আসে। ২০২৪ সালে খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট (উপপরিচালক জিতেন চাঙমা) নোয়ারাম চাঙমার জন্মদিন উপলক্ষে জন্মদিন উদযাপন ও আলোচনা সভার আয়োজন করে। এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে তাঁর জীবন, সাহিত্যকর্ম, ভাষাসেবা এবং চাঙমা অক্ষর ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে তাঁর অবদান নতুন করে আলোচনায় আসে।
এ ধরনের আয়োজন শুধু একজন প্রয়াত সাহিত্যিককে স্মরণ করা নয়; বরং নতুন প্রজন্মকে নিজের ভাষা, বর্ণমালা ও সাহিত্য-ঐতিহ্যের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ারও একটি কার্যকর মাধ্যম।
নোয়ারাম চাঙমার জীবনকে যদি এক বাক্যে বলতে হয়, তবে আমি বলব—
তিনি নিজের জীবনের আলো দিয়ে একটি জাতির অক্ষরকে জ্বালিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন।
অনাথ শিশুটি হারিয়ে যায়নি। রাখাল ছেলেটি হারিয়ে যায়নি। ‘নোয়ারাম মাস্টার’ হারিয়ে যাননি। কবি হারিয়ে যাননি। লেখক হারিয়ে যাননি। লোকসাহিত্য সংগ্রাহক হারিয়ে যাননি। অনুবাদক হারিয়ে যাননি। ভাষাসেবকও হারিয়ে যাননি। তাঁরা সবাই মিলে আজও বেঁচে আছেন তাঁর কাজের ভেতর। আজ আমরা যখন চাঙমা ভাষা ও অঝাপাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে কথা বলি, তখন আমাদের মনে রাখা উচিত—এই পথ একদিনে তৈরি হয়নি।
কোনো এক কঠিন সময়ে একজন মানুষ নিজের সামর্থ্যের সীমা অতিক্রম করে এই পথের ওপর প্রথম দিকের কিছু পাথর বসিয়েছিলেন।
তিনি হলেন নোয়ারাম চাঙমা। তাঁর হাতে ছিল না বিপুল অর্থ। ছিল না বড় কোনো প্রতিষ্ঠান। ছিল না ক্ষমতার আসন। ছিল শুধু একটি স্বপ্ন—
নিজের জাতির ভাষা যেন হারিয়ে না যায়। নিজের জাতির অক্ষর যেন মুছে না যায়।
নিজের জাতির গল্প যেন বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে না যায়।
সেই স্বপ্ন নিয়েই তিনি লিখেছেন, সংগ্রহ করেছেন, অনুবাদ করেছেন, বই প্রকাশ করেছেন, শিক্ষা দিয়েছেন।
আজ তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরও তাঁর নাম উচ্চারিত হয় অঝাপাতের প্রসঙ্গে, চাঙমা ভাষার মুদ্রিত শিক্ষার প্রসঙ্গে, লোকসাহিত্য সংরক্ষণের প্রসঙ্গে এবং ভাষা-সাহিত্যের উত্তরাধিকার রক্ষার প্রসঙ্গে।
এই তো একজন মানুষের সত্যিকারের অমরত্ব। মানুষ চলে যায়। সময় চলে যায়। শরীর একদিন আগুণে ছাই হয়ে যায়। কিন্তু যে মানুষ একটি জাতির ভাষায় নিজের জীবন লিখে যান, তাঁর মৃত্যু হয় না। নোয়ারাম চাঙমাও তাই মৃত্যুকে অতিক্রম করে আছেন তাঁর অক্ষরের মধ্যে।
তিনি ছিলেন অঝাপাতের প্রাণপুরুষ।
তিনি ছিলেন চাঙমা ভাষার নিবেদিত সেবক।
তিনি ছিলেন লোকসাহিত্যের নীরব সংগ্রাহক।
তিনি ছিলেন একজন শিক্ষক, কবি, লেখক ও অনুবাদক।
আর সর্বোপরি, তিনি ছিলেন তাঁর জাতির জন্য নিজেকে নিঃশেষ করে দেওয়া এক সত্যিকারের সেবক।
তাঁর হাতে যে প্রদীপ জ্বলেছিল, সেটি আজ আর তাঁর হাতে নেই। কিন্তু সেই প্রদীপের আলো এখনও অঝাপাতের অক্ষরে, চাঙমা ভাষার বইয়ে, লোকসাহিত্যের পাণ্ডুলিপিতে এবং নতুন প্রজন্মের ভাষাপ্রেমে জ্বলছে।
নোয়ারাম চাঙমা তাই শুধু অতীতের একজন মানুষ নন, তিনি আমাদের ভাষার বর্তমানের একটি ভিত্তি এবং ভবিষ্যতের প্রতি একটি দায়বদ্ধতার নাম। তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র প্রণাম।
তথ্যসূত্র
১. কল্যাণ সাধন চাঙমা — নোয়ারাম চাঙমার পারিবারিক ও জীবনসংক্রান্ত তথ্য।
২. অপনিকা চাঙমা — পারিবারিক স্মৃতি ও জীবনকথা।
৩. সাংবাদিক মোকছেদ, সাপ্তাহিক বনভূমি, রাঙামাটি — নোয়ারাম চাঙমার জীবন ও প্রয়াণসংক্রান্ত স্মরণলেখা।
৪. আর্য্যমিত্র চাঙমা, খাগড়াছড়ি।
৫. ননাধন চাঙমা, রাঙামাটি।
৬. সাপ্তাহিক বনভূমি, ২০ নভেম্বর ১৯৭৮ — নোয়ারাম চাঙমার প্রয়াণ ও কর্মের স্মরণলেখা।
৭. ‘চাঙমার পত্থম শিক্ষা’ — নোয়ারাম চাঙমা; ৩য়সংস্করণ সংগৃহীত তথ্য।
৮. নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য পদক - নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ, পদকপ্রাপ্তদের সংক্রান্ত সংগৃহীত তথ্য।
৯. খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, ২০২৪ — নোয়ারাম চাঙমার জন্মদিন উদযাপন ও আলোচনা সভা সংক্রান্ত তথ্য।




