রবিবার, ১২ এপ্রিল, ২০২৬

খদা আগুন ও চাঙমা সমাজ - ইনজেব চাঙমা

চাঙমা ভাষায় "খদা" শব্দের অর্থ অশুভ, অমঙ্গল। "খদা আগুন লুরো" বলতে বোঝায় অশুভ আগুন। গ্রামে কেউ অমঙ্গল কিছু দেখলে, বিপদের আভাস পেলে মুরুব্বিরা বলে ওঠেন "খদা আগুন"। এটি সতর্কবার্তা। একটি সাংস্কৃতিক সংকেত যে সমাজের ভিতরে কিছু পুড়ছে, কিছু ভুল হচ্ছে।

আমাদের চাঙমা সমাজটাও কি আজ সেই খদা আগুনে রূপ নিচ্ছে? আমরা ৮০% শিক্ষিত দাবি করি, অথচ সমাজজুড়ে বিভাজন, অবিশ্বাস, স্বার্থের আগুন। তাহলে এই শিক্ষা কি আসলেই জাতির মেরুদণ্ড হচ্ছে, নাকি আমরা শুধু সার্টিফিকেট কুড়াচ্ছি?

শিক্ষা বনাম সার্টিফিকেট

শিক্ষা মানে কেবল পড়তে পারা বা ডিগ্রি নেওয়া নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "শিক্ষা হলো সেই যা আমাদের কেবল তথ্য দেয় না, জীবনের সঙ্গে সঙ্গতি স্থাপন করায়"।

দিক

সার্টিফিকেটধারী

প্রকৃত শিক্ষিত

দৃষ্টিভঙ্গি

চাকরি ও পদ আমার অধিকার

দায়িত্ব ও সেবা আমার কর্তব্য

সমাজের প্রতি

আমি আলাদা, আমি উঁচু

আমি সমাজের অংশ, সমাধানের অংশ

বিভেদ দেখলে

পক্ষ নিয়ে আগুনে ঘি ঢালে

যুক্তি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে

সংস্কৃতি নিয়ে

পুরনো সব বাতিল, নয়তো অন্ধ অনুকরণ

শিকড় চেনে, সময়ের সাথে মেলায়

ফলাফল

ব্যক্তি উন্নতি, সমাজে ফাটল

ব্যক্তি ও সমাজ একসাথে আগায়

আজ চাঙমা সমাজে অনেক গ্র্যাজুয়েট, মাস্টার্স, পিএইচডি। কিন্তু গ্রামে দুই বাড়ির ঝগড়া মেটাতে শিক্ষিত ছেলেটা এগিয়ে আসে না। ভোট আসলে শিক্ষিত যুবকটাই দলীয় বিভাজনের পোস্টার লাগায়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষিত মানুষটাই অন্য গোত্রকে হেয় করে কথা বলে। তাহলে ডিগ্রি থাকলেই কি আমরা মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারছি?

 খদা আগুনের লক্ষণ-

১. রাজনৈতিক বিভাজন: একসময় জুম্ম জাতীয়তাবাদ ছিল ঐক্যের মন্ত্র। এখন এক গ্রামে তিনটা দল, চারটা মত। নেতা হতে চায় সবাই, ত্যাগ করতে চায় না কেউ। ফলে বাইরের শক্তি সুযোগ নেয়। এটা খদা আগুন, কারণ ঘর পুড়লে সবাই পোড়ে।

২. অর্থনৈতিক বিভাজন: শিক্ষিত হয়ে চাকরি পেয়ে অনেকে গ্রাম ছাড়ে, শহরে সেটেল হয়। টাকা হলে আত্মীয় ভুলে যায়। আবার গ্রামে যারা থাকে, তাদের ছোট করে দেখে। ধনী-গরিবের দেয়াল উঠে, যা আগে চাঙমা সমাজে এত প্রকট ছিল না। সুন্দর, সুস্থ জুমচাষের সংস্কৃতি ভেঙে ব্যক্তিকেন্দ্রিক লোভ ঢুকছে।

৩. ধর্মীয় বিভাজন: বৌদ্ধ ধর্ম চাঙমার প্রাণ। কিন্তু এখন থেরবাদ, বনবিহার-বৌদ্ধ বিহার,বনভান্তে প্রধান শিষ্য কে , অন্যান্য গুরুবাদ নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি। ফেসবুকে শিক্ষিত ছেলেরাই একে অন্যকে "ভণ্ড" বলে গালি দেয়। ধর্ম শান্তির কথা বলে, আমরা ধর্ম দিয়ে অশান্তি ডেকে আনছি। এটাই খদা আগুন।

৪. সামাজিক বিভাজন: দল, উপদল,গোঝা বা গোষ্ঠী নিয়ে অহংকার, জাতি-বেজাতি দ্বন্দ্ব  তালিকা লম্বা। বিজু, সাংগ্রাইয়ের মতো উৎসবেও এখন রাজনৈতিক ব্যানার টানাটানি হয়।

কেন এমন হলো? রোগের শিকড়-

  • মূল্যবোধহীন শিক্ষা: আমাদের স্কুল-কলেজ নম্বর দেয়, মানুষ বানায় না। জুম্ম ইতিহাস, গর্জন তলার চেতনা, উবগীত — এগুলো পাঠ্যে নেই। ফলে শিকড় কাটা শিক্ষিত তৈরি হচ্ছে।
  • ব্যক্তিস্বার্থের উত্থান: বিশ্বায়নের যুগে "আমি" বড় হয়ে গেছে, "আমরা" ছোট হয়ে গেছে। সার্টিফিকেট সেই "আমি"কে আরও ধারালো করেছে।
  • নেতৃত্বের সংকট: প্রকৃত মুরুব্বি, কার্বারী, হেডম্যানের জায়গায় এখন ফেসবুক নেতা। যার গলা বড়, সেই নেতা। ত্যাগ ও প্রজ্ঞার দাম কমে গেছে।
  • দায়মুক্তি: "সমাজ গোল্লায় যাক, আমি তো ভালো আছি" — এই মনোভাব। শিক্ষিত মানুষটাই সবচেয়ে বেশি নীরব থাকে অন্যায় দেখলে।

খদা আগুন লকলকিয়ে ওঠে তখনই, যখন জাতির মেরুদণ্ডে ঘুণ ধরে। সার্টিফিকেট তখন দেয়ালের শোভা মাত্র, অন্তরের আলো নয়। এই আগুন নেভাতে হলে শিক্ষাকে কেবল কালির অক্ষর থেকে মুক্তি দিয়ে রক্তের অঙ্গীকারে আনতে হবে। শপথ নিতে হবে, মাথা উঁচু রাখার, হাত প্রসারিত করার, আর শিকড় আঁকড়ে ধরার।

অরণ্যে দাবানল লাগলে সর্বাগ্রে নিজের কুটিরটুকু রক্ষা করতে হয়। তেমনি সমাজের খদা আগুন নেভাতে হলে প্রথমে নিজের অন্তরের আঁধার দূর করতে হয়।

জুমের মাটিতে যে শিশু জন্মায়, তার কণ্ঠে যেন প্রথম বুলি হয় মা ভাষার। তার কর্ণে যেন প্রথম মন্ত্র হয় রাধামন-ধনপুদির কাহিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে হাঁটলেও তার চরণ যেন ভুলে না যায় গর্জন তলার ধূলি। যে শিক্ষা তাকে শিকড় থেকে উপড়ে আনে, সে শিক্ষা মেরুদণ্ড নয়, সে তো পঙ্গুত্বের শিকল।

নিজেকে সুধাও, আমার বিদ্যা কি কেবল নিজের উদরপূর্তির জন্য, নাকি যে পাহাড় আমায় ধারণ করেছে, তার ঋণ শোধের জন্য? যে কলম আমি ধরেছি, সে কলম দিয়ে কি আমি শুধু দরখাস্ত লিখব, নাকি আমার জাতির ইতিহাসও লিপিবদ্ধ করব? প্রদীপ নিজে না জ্বললে সে কি পারে অন্যের পথ আলো করতে?

জাতির মহীরুহ জন্ম নেয় গৃহের উঠোনে। যে গৃহে সন্তানকে কেবল প্রথম হওয়ার দৌড় শেখানো হয়, সহমর্মিতার মন্ত্র শেখানো হয় না, সে গৃহেই খদা আগুনের প্রথম স্ফুলিঙ্গ জন্মে।

সন্ধ্যা নামলে জোনাকির আলোয় আজু - বেভে কোল ঘেঁষে বসুক শিশু। শুনুক, কেমন করে উব গীদ গেয়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা দুঃখ ভুলত। পচ্জন শুনিয়ে ঘুম পরাত। জানুক, বিঝু  মানে শুধু নবস্ত্র নয়, ফুল নিবেদনে পুরাতন গ্লানি মুছে ফেলার ব্রত। বুঝুক, কিয়াংয়ে দান দিলেই পূণ্য হয় না, যদি পাশের বাড়ির অনাহারী শিশুটির ক্রন্দন কর্ণে না পৌঁছায়।

মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষা: এই চার ব্রহ্মবিহার যদি পারিবারিক শিক্ষার ভিত্তি না হয়, তবে ডিগ্রির পর্বত গড়েও আমরা নৈতিকতায় বামনই থেকে যাব।

চাঙমা সমাজ একদিন একতার বীণায় সুর তুলত। আজ সেই বীণার তার ছিঁড়ে গেছে। দল, উপদল, গোঝা, গুরুবাদ, বুদ্ধ-বন: বিভেদের শত খণ্ডে আমরা বিচ্ছিন্ন। খদা আগুন এই বিচ্ছিন্নতার শুষ্ক কাষ্ঠেই দাউদাউ করে জ্বলে।

হে শিক্ষিত যুবক, তোমার লেখনী থামাক এই বিষবাষ্প। ফেসবুকের প্রান্তরে যখন দেখো ভ্রাতা ভ্রাতাকে কটু কথা বলছে, তুমি সেখানে বিবেকের সেতু হও। উৎসবের আঙিনায় যখন দেখো রাজনীতির ধ্বজা উড়ছে, তুমি সেখানে সংস্কৃতির চন্দ্রাতপ টাঙিয়ে দাও। মনে রেখো, তর্জনীর আস্ফালনে আগুন বাড়ে, করপুটের মিনতিতে আগুন নেভে।

বিঝুর পাজন যেমন বহু শাক-সবজি মিশ্রণে অমৃত হয়, তেমনি বহু মতের মিলনেই জাতি মহৎ হয়। ভিন্নতা থাকুক, বিদ্বেষ নয়।

আমাদের পাঠশালা, মহাবিদ্যালয় যেন শুধু নম্বরের কারখানা না হয়। সেখানে সরস্বতীর সাথে যেন কল্পতরুরও আবাহন হয়।

পাঠ্যক্রমের পত্রে পত্রে থাকুক জুম্ম পাহাড়ের রক্তাক্ত ইতিহাস। থাকুক চাকমা রাজাদের গৌরবগাথা, থাকুক মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার স্বপ্নের কথা। ছাত্র যখন শেক্সপিয়র পড়বে, তখন যেন সে শিবচরণ চাঙমাকেও চেনে। যখন সে নিউটন আওড়াবে, তখন যেন সে নিজের জাতির নবজাগরণের সূত্রও খোঁজে।

কিয়াংয়ের চত্বর কেবল ধর্মীয় স্থান নয়, হোক জ্ঞানের মুক্তাঙ্গন। সপ্তাহান্তে সেখানে বসুক জ্ঞানচক্র। শিক্ষিত তরুণ শেখাক আধুনিক বিজ্ঞান, মুরুব্বি শেখাক জীবনের দর্শন। এই বিনিময়েই খদা আগুনের বিপরীতে প্রজ্ঞার হোমানল জ্বলবে।

শিক্ষা যদি ভীরুতার নামান্তর হয়, তবে সে শিক্ষা ক্লীবের ভূষণ। মেরুদণ্ডের অর্থই হলো মাথা নত না করা।

ভূমি আমার মা। সেই মায়ের অঙ্গচ্ছেদ হলে নীরব থাকা কিসের শিক্ষা? সংবিধানের পাতায় আমার অস্তিত্বের স্বীকৃতি না থাকলে কলমের কালি দিয়ে কী হবে? পার্বত্য চুক্তির প্রতিশ্রুতি ধুলায় লুটালে আমার ডিগ্রি কি আমায় মুক্তি দেবে?

হে শিক্ষিত, তুমি ব্যবসায়ী হও, বিজ্ঞানী হও, কিন্তু সবার আগে হও প্রহরী। তোমার পাহাড়ের, তোমার ভাষার, তোমার অস্তিত্বের। দশটি চাকরির পেছনে ছোটার চেয়ে একটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা শ্রেয়। কারণ স্বাবলম্বনই সর্বোত্তম প্রতিরোধ।

প্রাচীন প্রবচন বলে, "যে আগুন লাগায়, নেভানোর জল তার কলসিতেই থাকে" চাঙমা সমাজের এই খদা আগুন আমরাই লাগিয়েছি, আমাদের লোভে, আমাদের অনৈক্যে, আমাদের আত্মবিস্মৃতিতে।

তাই নেভানোর দায়ও আমাদেরই। কলসি আমাদের শিক্ষা। কিন্তু কলসি যদি শূন্য হয়, কেবল বাইরে কারুকার্য থাকে, তবে আগুন নিভবে না। কলসি পূর্ণ করতে হবে ত্যাগের জলে, ঐক্যের জলে, আত্মপরিচয়ের সুপেয় স্রোতে।

শিক্ষা যেদিন মেরুদণ্ডের শপথ নেবে, সেদিন খদা আগুন রূপান্তরিত হবে ধুনির আগুনে। সে আগুনে ঘর পোড়ে না। সে আগুনে শীত কাটে, অন্ন ফোটে, আর অন্ধকারে পথ দেখায়।

এসো, সেই শুভ আগুনের প্রতীক্ষায় আমরা সবাই নিজ নিজ কলসি কাঁখে তুলি।

 

শনিবার, ১১ এপ্রিল, ২০২৬

‘বৈসাবি’ নয়, নিজস্ব নামে উৎসব: পার্বত্য মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের ঘোষণায় নতুন মাত্রা পেল পাহাড়ের বিঝু - ইনজেব চাঙমা

 

চৈত্রসংক্রান্তির তপ্ত দ্বিপ্রহর যখন ঘুঘুর ডাকে উদাস হয়ে ওঠে, যখন পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে কোকিল, কাত্থোল পাবোক আর কুয়ে পাখির কলতান প্রতিধ্বনিত হয়—ঠিক তখনই নাকশা-রিবেক ফুলের মদির সুবাস আর তরিং ফুলের শ্বেতশুভ্র পাপড়ি জানান দেয়, পাহাড়ের দুয়ারে কড়া নাড়ছে ‘বিঝু’। অরণ্যঘেরা জনপদে এ এক অনন্য মাহেন্দ্রক্ষণ।
 
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই চিরায়ত উৎসবের ক্যানভাসে এবার লেগেছে নতুন রঙের ছোঁয়া। দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত দাবি আর আবেগকে সম্মান জানিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাডভোকেট দীপেন দেওয়ান এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছেন। 
 

৯ এপ্রিলের প্রেস ব্রিফিংয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান স্পষ্ট করে জানালেন—এখন থেকে আর ‘বৈসাবি’ নয়, প্রতিটি জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব নাম, রীতি ও বোধে উৎসব উদযাপন করবে। এই উচ্চারণে পাহাড়ের ইতিহাস যেন দীর্ঘশ্বাস ফেলে হালকা হলো। কারণ, ‘বৈসাবি’ নামটি কার্যত তিনটি জনগোষ্ঠীর প্রতীক হয়ে উঠেছিল; অথচ পার্বত্য চট্টগ্রামের সামাজিক বাস্তবতায় রয়েছে ১১টি জাতিগোষ্ঠীর ভিন্ন ভিন্ন উৎসব-ভাষা, ভিন্ন ভিন্ন আচার।
 

মন্ত্রীর ঘোষণায় তাই নতুন করে উচ্চারিত হলো—বিঝু, বৈসু, সাংগ্রাই, বিষু, বিহু, চাংক্রান, চাংলানসহ প্রত্যেকের নিজস্ব নাম। নামের এই প্রত্যাবর্তন কেবল শব্দের সংশোধন নয়; এটি স্মৃতি, ইতিহাস ও অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নাম হারালে উৎসবও ধীরে ধীরে অর্থ হারায়—এই উপলব্ধিই ঘোষণাটিকে তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে।
 
একই ব্রিফিংয়ে মন্ত্রী আরও ইঙ্গিত দেন যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান পাহাড়ের স্বকীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি রক্ষায় সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন ও শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি ‘খুব শিগগিরই ইতিবাচক খবর’-এর আশ্বাস দেন। এই ‘সুখবর’ আপাতত প্রতিশ্রুতি, তবে পাহাড়ের মানুষ জানে—প্রতিশ্রুতিও কখনো কখনো আশার বীজ হয়ে ওঠে।
 

মন্ত্রণালয় ঘোষিত তিন দিনের রাষ্ট্রীয় কর্মসূচি:
১২ এপ্রিল ফুল বিঝু প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা, নদীতে ফুল নিবেদন
১৩ এপ্রিল মূর বিঝু ঘরে ঘরে ‘পাজন’ রান্না, অতিথি আপ্যায়ন
১৪ এপ্রিল গোজ্যাপোজ্যা দিন বয়োজ্যেষ্ঠদের আশীর্বাদ গ্রহণ, নতুন বছর বরণ
 
পার্বত্য মন্ত্রী অ্যাড. দীপেন দেওয়ান তার বক্তব্যে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জন্য একটি “ইতিবাচক সুখবর” আসার ইঙ্গিত দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন এবং শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের এই তোড়জোড় পাহাড়বাসীর মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকারের এই নিশ্চয়তা পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম করতে পারে।
 

ঐতিহাসিকভাবে বিঝুর ছুটি নিয়ে পাহাড়বাসীর মনে এক ধরনের আক্ষেপ কাজ করত। ব্রিটিশ আমলে দীর্ঘ এক মাসের ছুটি ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে বর্তমানে ১-৩ দিনে ঠেকেছে। উৎসবকে ‘বৈসাবি’র বদলে নিজস্ব নামে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান করায় এখন উৎসবের ব্যাপ্তি ও ছুটি বৃদ্ধির একটি জোরালো নৈতিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এটি কেবল বিনোদনের অবকাশ নয়, বরং একটি জনগোষ্ঠীর আত্মমর্যাদার প্রশ্ন।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আকাশ-বাতাস এখন বিঝু, বৈসু কিংবা সাংগ্রাইয়ের সুরে মুখরিত। ‘বৈসাবি’র ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসা এই নবযাত্রা জুম্ম জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ প্রশমনে সহায়ক হবে।
 
পাহাড়ের ১১টি জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতিকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির এই পদক্ষেপ আমাদের জাতীয় ঐতিহ্যের ভাণ্ডারকে আরও সমৃদ্ধ করবে। এখন পাহাড়বাসীর দৃষ্টি সেই প্রতিশ্রুত ‘সুখবর’-এর দিকে, যা হয়তো শান্তি ও প্রগতির এক নতুন ভোরের বার্তা নিয়ে আসবে।

বিজু, সাংগ্রাহং, বেসুক, বিষু, বিহু, সাংক্রাহ, সাংক্রান এবং কিছু প্রাসঙ্গিক কথা- সজীব চাকমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মদের ঐতিহ্যবাহী সর্ববৃহৎ সামাজিক উৎসব বিজু, সাংগ্রাইং, বৈসুক, বিষু, বিহু, সাংক্রাই, সাংক্রান। মনে হতে পারে উৎসবটির এক দীর্ঘ নাম, নতুবা ভিন্ন ভিন্ন সব একেকটি উৎসব। প্রকৃতপক্ষে নামে পরিসরে পার্থক্য থাকলেও বিষয়বস্তুর আলোকে তথা অন্তর্নিহিত তাৎপর্যে এটি অভিন্ন এক উৎসব।

স্মরণাতীত কাল থেকে তারা এই উৎসব পালন করে আসছে। কালের পরিক্রমায়, আর্থ-সামাজিক বিকাশের গতিধারায় এটি বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্মদের জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। সার্বজনীন বৈশিষ্ট্যমন্ডিত, অথচ স্বতন্ত্র বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি ঐতিহ্যের ধারক-বাহক এই উৎসবটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। আদিবাসী জুম্মদের সংখ্যাগরিষ্ট অংশ অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠী এই উৎসবটি অত্যন্ত মর্যাদা মমতার সাথে লালন পালন করে থাকে। আর এই উৎসবে সামিল হয় উপভোগ করে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল স্তরের মানুষ।

বৈসুক, সাংগ্রাইং, বিজু বনাম বৈসাবি

একদা কয়েক দশক আগে সাধারণভাবে 'বিজু' নামটিই কেবল প্রকাশ পেয়েছিল। বিশেষ করে পাকিস্তান আমলে এবং তৎপরবর্তী বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কিছু সময় পর্যন্ত সরকারী বিভিন্ন আদেশেও এই 'বিজু' শব্দটি প্রচলিত ছিল বলে জানা যায়। তবে 'বিজু'র পাশাপাশি নব্বই দশকের শুরু থেকে 'সাংগ্রাইং বা সাংগ্রাই' ও 'বৈসুক বা বৈসু'ও প্রচার পেতে থাকে স্বনামে। বৈসুক, সাংগ্রাইং, বিজু এর আদ্যক্ষর নিয়ে সম্মিলিত প্রকাশ হিসেবে প্রচলন হতে থাকে 'বৈ-সা-বি বা বৈসাবি' শব্দটি। বের হতে থাকে বিভিন্ন লেখালেখি নিয়ে 'বৈসাবি সংকলন', গঠিত হতে থাকে 'বৈসাবি উদযাপন কমিটি'। এর একটা ব্যবহারিক সুবিধা আছে বৈকি। এভাবে একসময় পত্রপত্রিকায়, বিভিন্ন প্রকাশনায় 'বৈসাবি' নামটিই প্রচার পেতে থাকে। পরবর্তীতে এমনভাবে নির্বিচারে এই শব্দটি ব্যবহৃত হতে থাকে, কেউ কেউ 'বৈ-সা-বি'র আদ্যক্ষর এর ব্যাপারটিও গুলিয়ে ফেলে 'বৈসাবী' লিখতে শুরু করেন, তাতে ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবের প্রকৃত নামগুলোই যেন চাপা পড়তে বসেছিল। এখনও অনেকে তাই ব্যবহার করে চলেছেন।

না জানি কোন এক দিন কেউ দাবি করে বসবেন বৈসাবি বা বৈসাবীও নয় 'বৈশাখী'। ইতিহাস বিকৃতির এই দেশে এই আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। তবে একটু আশার দিক হল, অতিসম্প্রতি অনেক গণমাধ্যম বা ব্যক্তি 'বৈসাবি' শব্দটি পরিহার করার চেষ্টা করছেন। (আবার এই লেখাটি যখন শেষ পর্যায়ে ঠিক তখনি রাস্তায় দেখতে পেলাম পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পোস্টারে 'বৈসাবি'ই ব্যবহার করা হয়েছে।) প্রকৃতপক্ষে 'বৈসাবি বা বৈসাবী' বলে কোন উৎসবের অস্তিত্ব নেই। এখন বোধ হয় সময় এসেছে এব্যাপারে সচেতন হওয়ার। বস্তুত এই উৎসবটি চাকমাদের ভাষায় 'বিজু' (উচ্চারণ ভেদে 'বিঝু'), মারমা ও চাকদের ভাষায় 'সাংগ্রাইং', ত্রিপুরা ভাষায় 'বৈসুক' (অথবা 'বৈসু'), তঞ্চঙ্গ্যাদের ভাষায় 'বিষু', গুর্খা ও অহমিয়াদের ভাষায় 'বিহু', মোরোদের ভাষায় 'সাংক্রান (বা চাংক্রান)', খুমীদের ভাষায় 'সাংক্রাই' নামে অভিহিত করা হয়।

বিভিন্ন দেশে এই উৎসব

জানা যায়, এই একই প্রকৃতির উৎসব ভারতের আসামে 'বিহু', হিমাচল প্রদেশ ও হিমালয়ের প্রায় সবক'টি রাজ্যে 'বিষুব সংক্রান্তি', 'বিষু' বা 'বৃষু' এবং নেপালে 'বিষু উৎসব' নামে পরিচিত। অপরদিকে মায়ানমারে এটি 'ছিংগায়ান' (Thingyan), থাইল্যান্ডে 'সংক্রান' (Songran) নামে পরিচিত। জানা যায়, উল্লিখিত দেশ ও প্রদেশে এটি অন্যতম জাতীয় উৎসব হিসেবে পালিত হয়।

উৎপত্তি

চৈত্র সংক্রান্তির দিনকে পঞ্জিকার ভাষায় বলা হয় 'বিষুব সংক্রান্তি' বা 'মহাবিষুব সংক্রান্তি' কারও কারও মতে, সংস্কৃত শব্দ 'সংক্রান্ত' (যার অর্থ পরিবর্তন) থেকেই 'সংক্রান্তি' শব্দের উৎপত্তি। বাংলা একাডেমির অভিধানে 'বিষুব', 'সংক্রান্ত' বা 'সংক্রান্তি' শব্দসমূহের উৎপত্তি নির্দেশ করা হয়েছে 'সংস্কৃত' থেকে। এতে 'বিষুব' শব্দের অর্থ 'যে সময়ে দিন রাত্রি সমান হয়' ইত্যাদি উল্লেখ রয়েছে। আর 'সংক্রান্তি' শব্দের অর্থ উল্লেখ করা হয়েছে 'সূর্য গ্রহাদির এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন; সঞ্চার', 'মাসের শেষ দিন (চৈত্রসংক্রান্তি)' ইত্যাদি।

এও জানা যায়, সুপ্রাচীনকালে ভারতীয় উপমহাদেশে বর্ষবিদায় বর্ষবরণের উৎসবকে বলা হতো 'বিষুব সংক্রান্তি' তাই ধারণা করা যায়, উক্ত শব্দ দুটি থেকে ধীরে ধীরে সংক্ষেপিত পরিবর্তিত রূপে কোথাও 'বিষু', 'বিহু', 'বৈসুক' বা 'বৈসু' 'বিজু' হয়েছে; আবার কোথাও 'সংক্রান', 'সাংক্রান (চাংক্রান)', সাংক্রাই', 'সাংগ্রাইং', 'ছিংগায়ান' ইত্যাদি রূপ নিয়েছে। তবে কখন, কিভাবে এর উৎপত্তি তা সঠিকভাবে এখনও জানা যায় না।

ঐতিহ্যবাহী এই উৎসব

বাংলা বর্ষপঞ্জীর হিসেবে সাধারণত বছরের শেষ দুই দিন নববর্ষের প্রথম দিন এই তিন দিনে বা তিন পর্বে এই উৎসবটি সম্পন্ন হয়ে থাকে। উৎসবের প্রথম দিনকে চাকমারা বলে 'ফুল বিজু', মারমারা বলে 'পাইং ছোয়াই', ত্রিপুরারা বলে 'হারি বৈসুক', তঞ্চঙ্গ্যারা বলে 'ফুল বিষু', গুর্খা অহমিয়ারা বলে 'ফুল বিহু', ম্রোরা বলে 'সাংক্রানি ওয়ান', চাকরা বলে 'পাইংছোয়েত' উৎসবের দ্বিতীয় দিন অর্থাৎ বাংলা বর্ষপঞ্জীর বিদায়ী বর্ষের শেষ দিনকে চাকমারা বলে 'মূল বিজু', মারমারা বলে 'সাংগ্রাইং আক্যা', ত্রিপুরারা বলে 'বৈসুকমা', তঞ্চঙ্গ্যারা বলে 'মূল বিষু', গুর্খা অহমিয়ারা বলে 'মূল বিহু', ম্রোরা বলে 'সাংক্রানি পানী', চাকরা বলে 'আক্যাই' উৎসবের শেষ পর্ব অর্থাৎ বাংলা বর্ষপঞ্জীর নববর্ষের প্রথম দিনের উৎসবকে চাকমারা বলে 'গোজ্যায়পোষ্যা দিন', মারমারা বলে 'সাংগ্রাইং আপ্যাইং' (তাকখীং), ত্রিপুরারা বলে 'বিসিকাতাল', তঞ্চঙ্গ্যারা বলে 'গ্যাপর্য্যা বিষু', গুর্খা অহমিয়ারা 'নববর্ষ' পালন করে, ম্রোরা বলে 'সাংক্রানি চুর' আর চাকরা বলে 'আপ্যাইং'

আগেই বলা হয়েছে, ভিন্ন ভাষায় ভিন্ন নামে অভিহিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামে এই উৎসবসমূহের বৈশিষ্ট্য এবং অন্তর্গত ভাবধারা মূলত একই। যেমন উৎসবের প্রথম দিনে শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীরা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে বিভিন্ন বাগান বা বন থেকে নানা রকমের ফুল সংগ্রহ করে সেই ফুল দিয়ে তাদের ঘরবাড়ি সাজায়। সঙ্গী-সাথীরা মিলে নদী বা ছড়ায় গিয়ে স্নান করে। কেউ কেউ কেয়াঙে গিয়ে সকালে ফুল দিয়ে বুদ্ধকে পূজা করে, নানা ধর্মীয় কর্ম সম্পাদন করে এবং সন্ধ্যায় প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে। আগেকার দিনে গ্রাম জনপদে শিশু কিশোর-কিশোরীরা ঝাঁক বেঁধে সকাল বেলায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে গৃহপালিত পশু-পাখিদের খাবার দিত।

কেউ কেউ নিজেদের নানান রকম ঐতিহ্যবাহী পিঠা তৈরী করে। এই দিন থেকে শুরু হয় ত্রিপুরাদের জনপ্রিয় 'গরয়া নৃত্য' শুরুর দিন থেকে একটানা - দিন ধরে গ্রামে গ্রামে ঘুরে ঘুরে গরয়া শিল্পীরা ঢোল-বাঁশী বাজিয়ে 'গরয়া নৃত্য' পরিবেশন করে। উৎসবের দ্বিতীয় দিনই উৎসবের মূল পর্ব এবং কাক্সিক্ষত দিন। এদিন ঘরে ঘরে সকলের জন্য খানাপিনার আয়োজন করা হয়। হরেক রকম পিঠা, নানা জাতের সেদ্ধ করা আলু, ফলমূল, পায়েস, শরবত ইত্যাদি পরিবেশন করা হয়। তবে সমস্ত খানাপিনার মধ্যে মূল আকর্ষণ হল শুটকী কিংবা শুকনো বা সেঁকা মাছ মিশিয়ে নানা প্রকার পাঁচমিশালী শবজি দিয়ে রান্না করা ভেষজগুণ সমৃদ্ধ এক ধরনের সুস্বাদু তরকারি। এটিকে চাকমারা বলে 'পাজন' বা 'পাজোন', আর ত্রিপুরারা বলে 'পাচন'

মারমারা ধরনের তরকারিকে বলে 'হাঙ-', তবে এটি তাদের প্রধান উপাদান নয়। সবাইয়ের চেষ্টা থাকে বা প্রতিযোগী মনোভাব থাকে কার পাজন কত পদ দিয়ে তৈরী বা কত সুস্বাদু। আর প্রাপ্ত বয়স্কদের জন্য মদ চাকমা ভাষায় '-চোয়ানি', 'এক-চোয়ানি' 'জগরা' পরিবেশন করা হয়। এছাড়া আজকের দিনে সামর্থ্য অনুযায়ী মিষ্টি, জিলাপী, চটপটি, মাংস নানা স্বাদের কোমল পানীয়সহ আরও অনেক খাবারও পরিবেশন করা হয়। উৎসবের শেষ পর্বেও খানাপিনার আয়োজন থাকে। এদিনে ভোরে ঘুম থেকে উঠে শিশু, কিশোর, তরুণ-তরুণীরা নদী বা ছড়ায় গিয়ে ফুল ভাসিয়ে দেয়। তবে এদিনের অন্যতম অনুষঙ্গ হল ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সম্পন্ন করা। এদিন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে যাওয়া হয় অথবা বাড়িতে ধর্মীয় গুরু এনে ধর্মীয় সূত্রাদি শ্রবন করা হয়। আগেকার দিনে তরুণ-তরুণীরা নদী-কুয়ো থেকে কলসী কাঁকে করে জল তুলে এনে বয়স্কদের স্নান করাত। বুদ্ধমূর্তিকে স্নান করানো হয়।

এই স্নান করানোটা হল পুরানো বছরের ময়লা-আবর্জনা বা আপদবিপদ ধুয়ে পূতঃপবিত্র হওয়ার প্রতীক। সন্ধ্যায় বাসার কামরায় বা দরোজায় মোমবাতি প্রজ্জ্বলন করা হয় এই উদ্দেশ্যে যে, পুরানো বছরের যাবতীয় অজ্ঞানতা, আপদ-বিপদের অন্ধকার যেন দূরীভূত হয়ে যায়। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে মারমাদের অন্যতম আকর্ষণীয় উপাদান হল 'রিলংবোয়ে' (অর্থাৎ পানি খেলা) এই পানি উৎসবকে তারা বাংলায় 'মৈত্রী পানি বর্ষণ' বলে অভিহিত করেন। উল্লেখ্য, এই উৎসবকে কেন্দ্র করে নানা ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাসহ 'বলীখেলা' আয়োজন করা হয়।

পরিবর্তনশীল এই উৎসব

বলাবাহুল্য, জগতের সবকিছুই যেমনি পরিবর্তনশীল, তেমনি এই উৎসবও এক অবস্থায় বা একরূপে থাকতে পারেনি। নানা প্রতিকূলতায় এই উৎসবের অনেক কিছুই যেমনি ক্ষুন্ন হতে বা হারিয়ে যেতে বসেছে, তেমনি সময়ের প্রয়োজনে নতুন বাস্তবতার আলোকে অনেক নতুন উপাদানও সংযোজিত হচ্ছে। সাম্প্রতিককালে এই উৎসবকে কেন্দ্র করে বিশেষত শহর এলাকায়, তবে এখন গ্রাম এলাকায়ও, অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আয়োজন করা হয় বর্ণাঢ্য র‍্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, কবিতা পাঠের আসর, নাটক মঞ্চায়ন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আদিবাসী বিজু মেলা, ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ইত্যাদি নানা অনুষ্ঠান।

উপলক্ষে প্রকাশ করা হয় সাহিত্য, সংস্কৃতি গবেষণা বিষয়ক নানা প্রকাশনাও এবং বের করা হয় নতুন নতুন গানের এ্যালবাম, ভিডিও চিত্র বা ভিডিও ফিল্ম। অধুনা এই উৎসব বরণ বা পালনের অন্যতম অনুষঙ্গ র‍্যালিতে থাকে নির্মল আনন্দ উৎসবের আবহ। এদিন সকল জাতির নারী-পুরুষ স্ব স্ব পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করে, বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ঐতিহ্যবাহী গীত পরিবেশন করে, রেং বা আনন্দ ধ্বনি দিয়ে র‍্যালিতে অংশগ্রহণ করে। র‍্যালিতে ধারাবিবরণীর মধ্য দিয়ে উচ্চারণ করা হয় জাতীয় ঐক্যের কথা, স্বকীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণ বিকাশের কথা, প্রগতির কথা, অসাম্প্রদায়িকতা, বিশ্ব ভ্রাতৃত্ব মানবজাতির শান্তির কথা, সকলের মঙ্গলের কথা। তবে কখনও কখনও এই র‍্যালি আলোচনা সভা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কন্ঠ হয়ে দাঁড়ায়। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া উচ্চারণের এক মঞ্চ হয়ে দাঁড়ায়।

নিঃসন্দেহে নতুন নতুন এই সকল দিকগুলো বা আয়োজনসমূহ এই উৎসবের তাৎপর্যকে এবং দায়-দায়িত্ব বা ভূমিকাকে বাড়িয়ে দিয়েছে অনেক বেশী। কিন্তু পাশাপাশি কোন কোন ক্ষেত্রে উৎসবের নামে বা উৎসবের আতিশয্যে কেউ কেউ ঘটায় নানা বিপত্তি অপ্রীতিকর ঘটনা। ফুল তোলার নামে কারো ফুলের বাগান করা হয় তছনছ, ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় কারো বাড়ির আঙিনায় থাকা গাছের ফলমূল। অথবা অপরিমিত মদ্যপানে নেশাগ্রস্ত হয়ে বিনষ্ট করা হয় পারস্পরিক সম্প্রীতি। ফলে নির্মল উৎসব আনন্দের পরিবেশ নষ্ট হয়ে যায়। এই ধরনের পরিবেশ কোনভাবে কাম্য হতে পারে না।

এই উৎসবের তাৎপর্য

কোন জাতিই সংস্কৃতি ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। আদিবাসীদের সংস্কৃতিই আদিবাসীদের জীবন। বিজু, সাংগ্রাইং, বৈসুক, বিষু, বিহু, সাংক্রাই, সাংক্রান আদিবাসী জুম্ম সংস্কৃতির অন্যতম প্রাণপ্রবাহ, অনুপ্রেরণা অভিব্যক্তি। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও প্রধানত এই উৎসবকে কেন্দ্র করেই আদিবাসী সংস্কৃতি কর্মীরা উজ্জীবিত হয়। এই উৎসবকে সামনে রেখে অনেকে বিভিন্ন প্রকাশনা বই-পুস্তক প্রকাশ করেন। আর সচেতন, অনুসন্ধিৎসু বোদ্ধা পাঠক-ক্রেতারা সেই প্রকাশনা সাগ্রহে সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন। বই পড়া কেনার প্রতি অনাগ্রহী এই সমাজে এখনও এই দিকটি ক্ষীণ হলেও এটিও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। হয়তো একদিন এই উৎসবকে কেন্দ্র করে অনেক বই প্রকাশ হবে, সেই বইয়ের পাঠক হবে, বড় বড় বইমেলা হবে; অনেক গান, নাটক ছায়াছবির সৃষ্টি হবে; ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলাগুলো অনেক বিকশিত হবে।

তখন এই উৎসবটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এই উৎসবের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ চেতনা হল- এটি মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবতাবোধ, সম্প্রীতি, বৈষম্যহীন গণতান্ত্রিক চেতনা, অকৃপণতা, উদারতা, আন্তরিকতা, অকৃত্রিম সেবা, ভালোবাসা আর মমত্ববোধ জাগিয়ে দেয়, জোরদার করে। এই দিনগুলিতে এই উৎসব যেন নিরব ভাষায় জাতি-ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণি বিভেদের বিপক্ষেই কথা বলে যায়। এদিন প্রতিটি জুম্ম যেন প্রতিবেশী বা কাছে-দূরের, চেনা-অচেনা প্রত্যেক অতিথির জন্য ঘরের দুয়ার খুলে বসে থাকে উদার চিত্তে, পরম আন্তরিকতায় আপ্যায়নের জন্য। বস্তুত এই উৎসব আদিবাসী জুম্মদের বর্ণাঢ্য সংস্কৃতি জীবনের কথাই বলে। বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের কথা বলে।

উৎসব, রাষ্ট্র বিদ্যমান পরিস্থিতি

মানুষের জীবন সংগ্রামের সাথে উৎসবের রয়েছে নিবিড় ঐতিহাসিক সম্পর্ক। গোড়াতে মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যে উৎপাদন সংগ্রামে লিপ্ত হতে হয়েছে সেই উৎপাদন সংগ্রামেরই একটি ব্যাপার ছিল এই উৎসব। ফলে দেখা যায়, নির্দিষ্ট সমাজ, জীবন-জীবিকা, ভূপ্রকৃতি, উৎপাদন ব্যবস্থা ইত্যাদির প্রেক্ষাপটেই একটি নির্দিষ্ট উৎসবের উৎপত্তি হয় এবং তার বিকাশ হয় সেই নিয়মে। বস্তুত কোন সমাজ বা সামাজিক জীবনের সাথে সেই সমাজের মানুষের কোন উৎসবের থাকে একটা গভীর সম্পর্ক। বিজু, সাংগ্রাইং, বৈসুক, বিষু, বিহু, সাংক্রাই, সাংক্রান উৎসব আদিবাসী জুম্মদের জীবন সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি যদি যথাযথ অকৃত্রিমভাবে উদযাপন করা যায় তাতে জুম্মদের সমাজ জীবনে গভীর অনুপ্রেরণা সৃষ্টি প্রাণের সঞ্চার করতে পারে।

আবার এটি যদি বাধাপ্রাপ্ত হয় কিংবা বিপথে পরিচালিত হয় তাতে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বা সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকেই উৎসাহিত করবে। বলাবাহুল্য, জুম্মদের জীবন এই উৎসব বিদ্যমান রাষ্ট্রব্যবস্থা, রাষ্ট্রীয় নীতি এবং বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। ঐতিহাসিকভাবে এই দেশটি বহু ভাষা, বহু সংস্কৃতি বহু জাতির একটি দেশ হলেও সাংবিধানিকভাবে এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন নীতিমালার আলোকে এদেশের সংখ্যালঘু আদিবাসী জাতিসমূহ বৈষম্যের শিকার।

স্বাধীনতার প্রায় ৪৫ বছরে পনের-ষোলবার সংবিধান সংশোধন করা হলেও আদিবাসীদের দাবি অনুযায়ী সংবিধানে তাদের যথাযথ মর্যাদাপূর্ণ আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি প্রদান করা হয়নি। তাদের প্রাপ্য রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্তরে স্তরে তারা এখনও ব্যাপক শোষণ, বঞ্চনা বৈষম্যের শিকার হন।

আর পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের মানবাধিকার তথা আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষে দীর্ঘ দিনের আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে 'পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি' স্বাক্ষরিত হলেও দীর্ঘ ১৮ বছরেও চুক্তিটি যথাযথ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি। ফলে অনেক জুম্ম তাদের হারানো ভূমি ফিরে পায়নি, তাদের বসতবাটিতে ফিরতে পারেনি।

তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক অর্থনৈতিক অধিকারসমূহ এখনও চরমভাবে উপেক্ষিত অবহেলিত। পার্বত্য চুক্তির মধ্য দিয়ে যে অধিকারগুলোর স্বীকৃতি দিয়েছে রাষ্ট্র, চুক্তির মৌলিক ধারাগুলো বাস্তবায়ন না করার কারণে সেসব অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে জুম্মরা। উপরন্তু সরকার কর্তৃক উন্নয়নের নামে চুক্তির মূল চেতনার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ এবং জুম্ম স্বার্থ বিরোধী বিভিন্ন পদক্ষেপ তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ বাস্তবায়নের কারণে জুম্মদের জাতীয় অস্তিত্বই আজ চরম হুমকীর মধ্যে পড়েছে। ফলে জুম্মদের জাতীয় জীবন এখনও গভীর এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে।

তাই জুম্মদের জীবনে তাদের এই মহান ঐতিহ্যবাহী উৎসবটি যেভাবে, যেরূপে যে মহিমায় উদযাপিত হওয়ার কথা সেভাবে স্বতস্ফূর্তভাবে উদযাপিত হতে পারছে না তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। বস্তুত এর জন্য প্রয়োজন সুষ্ঠু, স্বাভাবিক পরিবেশ, নিঃশংক নিরুদ্বিগ্ন জীবন, সুষম উন্নয়ন এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্টপোষকতা। সর্বোপরি জরুরী দরকার হল রাষ্ট্র কর্তৃক ভিন্ন ভাষি আদিবাসী জাতির জীবন, সংস্কৃতি অধিকারের প্রতি যথাযথ সম্মান স্বীকৃতি প্রদান এবং তা বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ।

তথ্যসূত্রঃ

১। সজীব চাকমা, পাহাড়ের ঐতিহ্যবাহী সামাজিক উৎসব, সাপ্তাহিক 'রোববার', ১১ এপ্রিল ২০১০, পৃষ্টা ১৮-২০।

২। শ্রী সুপ্রিয় তালুকদার, লেখক প্রাক্তন পরিচালক, উসাই, রাঙ্গামাটি।

৩। বালাদেশের আদিবাসী, এথনোগ্রাফিয় গবেষণা, প্রথম খন্ড, ডিসেম্বর ২০১০, উৎস প্রকাশন, ঢাকা বালাদেশ আদিবাসী ফোরাম।

৯ এপ্রিল ২০১৬  

খদা আগুন ও চাঙমা সমাজ - ইনজেব চাঙমা

চাঙমা ভাষায় "খদা" শব্দের অর্থ অশুভ, অমঙ্গল। "খদা আগুন লুরো" বলতে বোঝায় অশুভ আগুন। গ্রামে কেউ অমঙ্গল কিছু দেখলে, বিপদের আ...