সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা: মাতৃভাষার স্বপ্নে আলোকিত এক স্বল্পায়ু নক্ষত্র - ইনজেব চাঙমা

 

কিছু মানুষ দীর্ঘ জীবন বাঁচার জন্য পৃথিবীতে আসেন না; তাঁরা আসেন একটি সময়কে আলোকিত করে যেতে। তাঁদের জীবনকাল সীমিত হলেও স্বপ্ন ও সৃষ্টির আয়ু হয়ে ওঠে দীর্ঘতর। কবি দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। মাত্র ছেচল্লিশ বছরের জীবনে তিনি চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের যে স্বপ্ন দেখেছিলেন, তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পরও সেই স্বপ্নের আলো নিভে যায়নি।

১৯৪৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ির মহাজনপাড়া আদামে জন্মগ্রহণ করেন দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা। তাঁর পিতা সত্যব্রত চাঙমা এবং মাতা শশীবালা চাঙমা। সাত ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়।

তাঁদের মধ্যে ছিলেন, মালবিকা চাঙমা, দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, হিরোহিত চাঙমা, কনিষ্ক চাঙমা, শ্রীগীত চাঙমা, মিজিকো চাঙমা ও টলস্টয় চাঙমা। তাঁদের মধ্যে হিরোহিত চাঙমা অধ্যক্ষ, কনিষ্ক চাঙমা চক্ষু বিশেষজ্ঞ এবং টলস্টয় চাঙমা চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হন।

দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার সহধর্মিণী ................................ চাঙমা। তাঁদের একমাত্র পুত্র দিগন্ত চাঙমা

পাহাড়ের প্রকৃতি, জুমজীবন এবং পাহাড়ি মানুষের সহজ-সরল সম্পর্ক তাঁর শৈশবের চেতনায় গভীর ছাপ ফেলেছিল। নিজের সমাজ, সংস্কৃতি ও ভাষার যে আবহে তাঁর বেড়ে ওঠা, পরবর্তী জীবনে তাঁর সাহিত্যচিন্তার ভিত নির্মাণে সেই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শিক্ষার প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তাঁকে পাহাড়ের গণ্ডি পেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে তিনি ইংরেজি সাহিত্য অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৭৪ সালে বি.এ. (অনার্স) ও এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তীকালে তিনি রাঙামাটি সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা ছিল তাঁর পেশা, কিন্তু সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চা ছিল তাঁর জীবনভাবনার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।

কর্মজীবনের প্রয়োজনে তিনি দেশের বাইরেও ভ্রমণ ও অবস্থান করেন। লিবিয়া, ইতালি, গ্রিস ও ভারত তাঁর জীবন-অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে ওঠে। বহির্বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় তাঁর চিন্তার পরিসরকে প্রসারিত করলেও নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কখনো শিথিল হয়নি। বরং দূরের পৃথিবীকে দেখার অভিজ্ঞতা তাঁকে নিজের শিকড়কে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে সাহায্য করেছিল।

দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার সাহিত্যচিন্তার কেন্দ্রে ছিল মাতৃভাষা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, কোনো ভাষার অস্তিত্ব কেবল মুখের ব্যবহারে টিকে থাকে না; তাকে লিখিত রূপ দিতে হয়, সাহিত্য সৃষ্টি করতে হয়, শিক্ষা ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। এই উপলব্ধি থেকেই তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল-

“আমি শিক্ষিত মানুষ হয়ে যদি চাঙমা লেখা-মু ভেদেদেই কন্না চাঙমা লেখানি উন্নতি গরিব... চাঙমা লেঘা ইক্কুল, কলেজ, বিশ্ব ইক্কুল চালেবাত্যা আমাত্তুন চাঙমা লেঘা শিঘা পরিব... চাঙমা সাহিত্য সৃষ্টি গরি পারি...”

এই বক্তব্য কেবল একজন কবির ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা নয়; এর মধ্যে ছিল একটি জাতির ভাষা ও সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখার সাংস্কৃতিক দায়িত্ববোধ। তিনি চেয়েছিলেন, শিক্ষিত চাঙমা সমাজ নিজের ভাষায় লিখুক, সেই ভাষায় সাহিত্য সৃষ্টি করুক এবং ধীরে ধীরে বিদ্যালয়, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানচর্চাতেও চাঙমা ভাষার ব্যবহার প্রতিষ্ঠিত হোক।

তাঁর কাছে মাতৃভাষা ছিল আত্মপরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। তাই নিজের ভাষায় লেখা তাঁর কাছে নিছক সাহিত্যচর্চা ছিল না, এ ছিল সাংস্কৃতিক অস্তিত্ব রক্ষার এক ধরনের দায়িত্ব।

 দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার প্রধান পরিচয়তিনি কবি। তাঁর কবিতায় পাহাড়, মানুষ, প্রকৃতি, জীবন এবং অন্তর্জগত পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে। তাঁর কাব্যভাষায় ছিল সংক্ষিপ্ততা, শব্দের পুনরাবৃত্তি, নীরবতার ব্যবহার এবং আধুনিক অনুভূতির প্রকাশ।

১৯৭২ সালে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় ‘লুরা’‘ফুরামোন’। ‘লুরা’ প্রকাশিত হয় এপ্রিল মাসে, ১ বৈশাখ ১৩৭৯ বঙ্গাব্দে; পরে বৈশাখী পূর্ণিমায় প্রকাশিত হয় ‘ফুরামোন’। চাঙমা ভাষায় মুদ্রিত সাহিত্য তখনও ছিল সীমিত। সেই বাস্তবতায় এই দুটি প্রকাশনা ছিল গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঘটনা। এগুলো শুধু সাহিত্য প্রকাশের উদ্যোগ ছিল না; মাতৃভাষায় সৃজনশীল লেখার সম্ভাবনাকেও দৃশ্যমান করেছিল।

তাঁর কবিতার উল্লেখযোগ্য সংকলন ‘পাদারং কোচপানা’ ও অর্ন্তগত বৃষ্টিপাত । এই কাব্যগ্রন্থ তাঁর কবিসত্তার বিস্তৃত পরিচয় বহন করে। ‘লুরা’ ও ‘ফুরামোন’-এর সঙ্গে ‘পাদারং কোচপানা’ ও অর্ন্তগত বৃষ্টিপাত  মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যিক বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারার সন্ধান পাওয়া যায়।

নিজের ভাষায় কবিতা লিখে ও প্রকাশ করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন, চাঙমা ভাষা আধুনিক সাহিত্যচর্চার উপযুক্ত একটি সৃজনশীল মাধ্যম। তাঁর কবিতায় ব্যক্তিগত অনুভূতি, পাহাড়ি জীবন, প্রকৃতি, ভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনা একটি স্বতন্ত্র কাব্যিক রূপ পেয়েছে।

সাহিত্যকে তিনি কখনো ব্যক্তিগত সাধনার গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখেননি। ১৯৭২ সালে তিনি ‘জুভাপ্রদ’ নামে একটি সাহিত্য সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। এর মাধ্যমে চাঙমা সাহিত্যচর্চাকে সংগঠিত করার পাশাপাশি নবীন লেখকদের জন্য একটি সৃজনশীল পরিসর তৈরির চেষ্টা করেন।

সাময়িকী প্রকাশেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। সে সময়ের বিভিন্ন সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সাময়িকীর প্রকাশনা-উদ্যোগে তিনি অংশ নেন এবং নিজেও নিয়মিত লেখালেখি করেন। ফলে তাঁর ভূমিকা ছিল দ্বিমুখী—একদিকে তিনি ছিলেন স্রষ্টা, অন্যদিকে সাহিত্যিক পরিসর নির্মাণের একজন সক্রিয় সংগঠক। তাঁর সঙ্গে যুক্ত সাময়িকীগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—

  • গেংখুলি — ১৯৭৭
  • রঙধং — ১৯৭৮, বিঝু
  • রেঙ — সেপ্টেম্বর ১৯৮০
  • বিজু — এপ্রিল ১৯৮১
  • হুয়াঙ ছেরে চাঙমা গীত — ১৯৮১, বিঝু
  • Ray — এপ্রিল/বিঝু, ১৯৮৫
  • এক ঝাক বিজোল রোদ — ১৯৮৬, বিঝু

এসব সাময়িকীর পাতায় তাঁর লেখালেখি চাঙমা ভাষার সাহিত্যকে সমকালীন চিন্তা, অনুভূতি ও সৃজনশীলতার সঙ্গে যুক্ত করেছিল। একই সঙ্গে এগুলো নতুন লেখক ও পাঠকদের জন্য একটি সাহিত্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল।

তাই দীপঙ্করের সাহিত্যিক অবদান শুধু তাঁর প্রকাশিত কবিতা বা কাব্যগ্রন্থ দিয়ে বিচার করলে পূর্ণতা পাওয়া যায় না। কবিতা লেখা, কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ, সাহিত্য সংগঠন গড়ে তোলা, সাময়িকী প্রকাশে অংশ নেওয়া এবং সেখানে নিয়মিত লেখা, সব মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যসাধনা একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক উদ্যোগের রূপ লাভ করেছিল।

১৯৭৩ সালে তাঁর ‘অন্যমনে’ কবিতা প্রকাশিত হয়। পরবর্তীকালে কবিতাটি রুশ ভাষায় অনূদিত হয়ে একটি রুশ ভাষার সংকলনে স্থান পায়। একটি পাহাড়ি জাতিগোষ্ঠীর ভাষায় লেখা কবিতা যখন অনুবাদের মাধ্যমে ভিন্ন ভাষার পাঠকের কাছে পৌঁছে যায়, তখন তা নিঃসন্দেহে চাঙমা সাহিত্যের সম্ভাবনারও একটি পরিচায়ক হয়ে ওঠে।

নিজেও দীপঙ্কর অনুবাদে আগ্রহী ছিলেন। সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৫–৭৬ সালের দিকে সুগত চাঙমার ‘হিল্লো মিলেবো জুমত যায় দ্যা’ গানটি তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন। ‘রেত্তুয়া জনমবো ন’ থেব’ গানটিও তিনি অনুবাদ করেন।

এই অনুবাদকর্ম তাঁর সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। তিনি শুধু নিজের ভাষায় লেখার কথা ভাবেননি; নিজের ভাষার সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনাও অনুভব করেছিলেন।

দীপঙ্করের সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্যের আরেকটি দিক ছিল নতুন শব্দ ও প্রকাশভঙ্গি নির্মাণের চেষ্টা। তাঁর কাছে ভাষা কোনো স্থির কাঠামো ছিল না; সময়, সমাজ ও মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভাষাকেও সমৃদ্ধ হতে হয়, এমন একটি ধারণা তাঁর লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে।

আধুনিক জীবন ও নতুন অভিজ্ঞতা প্রকাশের উপযোগী করে চাঙমা ভাষাকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াস তাঁর সাহিত্যিক চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাঁর কিছু কবিতায় পরবর্তীকালে সুরারোপ হয়ে গানও তৈরি হয়। ফলে তাঁর সাহিত্য মুদ্রিত পাতার সীমা অতিক্রম করে শ্রুতিমাধ্যমেও প্রবেশ করে।

প্রকাশিত গ্রন্থের বাইরে তাঁর কিছু রচনা অপ্রকাশিত থেকে যায়। সংগৃহীত তথ্যের মধ্যে ‘অলর গাচ্ছুয়া পাদা লরে’, ‘জুঁদা পিত্তিমি’, ‘অদেঘা’ প্রভৃতি রচনার উল্লেখ রয়েছে। এসব রচনা তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের মূল্যবান অংশ। ভবিষ্যতে তাঁর পাণ্ডুলিপি ও অপ্রকাশিত রচনাগুলো অনুসন্ধান, সংরক্ষণ ও প্রকাশ করা চাঙমা সাহিত্য গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

চাঙমা আধুনিক সাহিত্য কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। ১৯৪০-এর দশক থেকে চুনীলাল দেওয়ানের হাত ধরে যে আধুনিক সাহিত্যচর্চার বিকাশ শুরু হয়, পরবর্তীকালে মুকুন্দ চাঙমা, ডা. ভগদত্ত খীসা, সলিল রায়, অরুণ রায় প্রমুখ সাহিত্যিক সেই ধারাকে সমৃদ্ধ করেন।

এই ধারাবাহিকতায় দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার বিশেষত্ব হলো—তিনি একই সঙ্গে কবি, সম্পাদক, সংগঠক, প্রকাশনা-উদ্যোক্তা ও অনুবাদক। তিনি কবিতা লিখেছেন, কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেছেন, সাহিত্য সংগঠন গড়ে তুলেছেন, সাময়িকী প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থেকেছেন, নিজে লিখেছেন এবং ভাষার প্রকাশক্ষমতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছেন।

অতএব, তাঁর অবদান কোনো একক গ্রন্থ বা কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়। চাঙমা আধুনিক সাহিত্যচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সঙ্গে তাঁর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।

১৯৯৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর মাত্র ৪৬ বছর বয়সে দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমার জীবনাবসান ঘটে। তাঁর জীবন থেমে যায় এমন এক সময়ে, যখন তাঁর সাহিত্যিক সম্ভাবনা আরও বিস্তৃত হওয়ার কথা ছিল। আরও কবিতা, আরও অনুবাদ, আরও নতুন শব্দ, আরও সাহিত্যিক উদ্যোগ হয়তো তাঁর কলম থেকে আসতে পারত। তাঁর এই অকালপ্রয়াণ চাঙমা সাহিত্যজগতের জন্য ছিল গভীর ক্ষতি। কিন্তু একজন কবির জীবনাবসান তাঁর সৃষ্টির সমাপ্তি নয়। দীপঙ্করের ক্ষেত্রেও তা ঘটেনি।

তাঁর সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হয়তো কোনো একক গ্রন্থে নয়; বরং একটি প্রশ্নেশিক্ষিত হয়ে আমরা কি নিজের ভাষার জন্য কিছু করব? এই প্রশ্ন তাঁর সময় অতিক্রম করে আজও প্রাসঙ্গিক। তাঁর জীবন দেখায়, বিশ্বকে জানার সঙ্গে নিজের শিকড়কে জানার কোনো বিরোধ নেই। বরং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত শক্ত করেই বৃহত্তর বিশ্বের সঙ্গে অর্থপূর্ণ সংযোগ তৈরি করা সম্ভব।

লিবিয়া, ইতালি, গ্রিস ও ভারত ঘুরে দেখা মানুষটি শেষ পর্যন্ত ফিরে এসেছিলেন নিজের ভাষার কাছে। তাঁর কবিতা, কাব্যগ্রন্থ, সাময়িকী, অনুবাদ, সাহিত্য সংগঠন এবং ভাষা নিয়ে তাঁর ভাবনা—সবকিছুতেই সেই প্রত্যাবর্তনের চিহ্ন রয়েছে।

১৯৯৬ সালের ১০ সেপ্টেম্বর তাঁর জীবন থেমে গেলেও তাঁর সাহিত্যিক পদচিহ্ন মুছে যায়নি। পুরোনো সাময়িকীর পাতায়, কবিতার পঙ্‌ক্তিতে, কাব্যগ্রন্থে, অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির সম্ভাবনায় এবং নতুন প্রজন্মের মাতৃভাষাচর্চায় তাঁর স্মৃতি এখনও বেঁচে আছে।

একটি স্বল্পায়ু জীবন কখনো কখনো একটি দীর্ঘ সাহিত্যিক উত্তরাধিকার রেখে যায়। দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা সেই বিরল উত্তরাধিকারেরই একজন নির্মাতা তিনি চলে গেছেন; কিন্তু তাঁর ভাষার প্রতি দায়বোধ, সাহিত্যিক স্বপ্ন এবং সৃষ্টির আলো এখনও পাহাড়ের সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে জ্বলছে।

তথ্যসূত্র

সবিতা চাঙমা; শুভ্র জ্যোতি চাঙমা; আর্য্যমিত্র চাঙমা (নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ এ পক্ষ থেকে কবির মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে ভার্চুয়াল আলোচনা সভা ১০ সেপ্টেম্বর২০২৩),  রান্যাফুল (কবিতাগ্রন্থ); জুমজার্নাল

ছবি সংগ্রহ: কবিতা চাঙমা (অস্ট্রেলিয়া)

রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কৃষ্ণকিশোর চাকমা: পাহাড়ে শিক্ষার প্রথম আলোকবর্তিকা - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস কেবল পাহাড়, নদী, বন আর জনপদের ইতিহাস নয়; এটি অন্ধকারের ভিতর থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া এক মানুষেরও ইতিহাস। যে সময়ে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা, শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত এবং যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল, সে সময় একজন মানুষ শিক্ষাকে করে তুলেছিলেন সামাজিক মুক্তির প্রধান হাতিয়ার। তাঁর নাম কৃষ্ণকিশোর চাকমা।

আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি আগে পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদে যে শিক্ষার প্রদীপ তিনি জ্বালিয়েছিলেন, তার আলো পরবর্তী প্রজন্মের হাতে ছড়িয়ে পড়ে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের নানা প্রান্তে। তাই কৃষ্ণকিশোর চাকমাকে কেবল একজন স্কুল পরিদর্শক হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানের প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাব্রতী, সমাজসংস্কারক এবং পাহাড়ে আধুনিক শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রেও তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারের অন্যতম প্রধান অগ্রদূত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কৃষ্ণকিশোর চাকমার জন্ম ১৮৯৫ সালের ১৪ জুলাই রাঙামাটি জেলার নান্যাচর উপজেলার কেরেতকাবা মোনতলা গ্রামে। তাঁর পিতা সুন্দরবি চাকমা এবং মাতা চানমুনি চাকমা। তিন ভাইয়ের মধ্যে কৃষ্ণকিশোর ছিলেন জ্যেষ্ঠ। তাঁর দুই ভাই ছিলেন হরকিশোর চাকমা ও চিত্তকিশোর চাকমা।

তাঁদের পরিবারের আদি বসতি ছিল পাহাড়ের পাদদেশে, মাওরুম ছড়ার উৎসস্থলের সত্তা-ধুরুং বা কেরেতকাবা অঞ্চলে। পরবর্তীকালে পরিবারটি মাওরুম এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করে। আজকের প্রজন্মের কাছে মাওরুম নামটি কেবল একটি জনপদের নাম নয়; পার্বত্য চট্টগ্রামে আধুনিক শিক্ষার প্রাথমিক বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গেও এ নামটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক স্মৃতিচারণেও কৃষ্ণকিশোর ও তাঁর ভাইদের মহাপ্রুমকেন্দ্রিক শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে।

দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশে বসবাস করেও কৃষ্ণকিশোরের পরিবার শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিল। সেই সময়ে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। তবু সুন্দরবি ও চানমুনি তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার পথে এগিয়ে দেন। তিন ভাইই পরবর্তীকালে শিক্ষিত হয়ে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

কৃষ্ণকিশোর ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। ১৯১৯ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। মাত্র এক বছর পর, ১৯২০ সালে, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা বিভাগে সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষা বিভাগের স্কুল পরিদর্শক হিসেবে তাঁর কাজ পাহাড়ের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।

সরকারি চাকরির প্রচলিত অর্থে তাঁর কাজ ছিল বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষাব্যবস্থার তদারকি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন। কিন্তু কৃষ্ণকিশোর সেই সীমারেখার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তিনি বুঝেছিলেন- শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না; মানুষের মনেও শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করতে হবে।
তাই তিনি বিদ্যালয়ের দরজার পাশাপাশি খুলতে চেয়েছিলেন মানুষের মনের দরজাও।

আজকের মতো সড়ক, যানবাহন ও যোগাযোগব্যবস্থা তখন ছিল না। এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে যেতে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হতো। কিন্তু এই প্রতিকূলতা কৃষ্ণকিশোরকে থামাতে পারেনি।
কখনও সাইকেলে, কখনও পায়ে হেঁটে তিনি পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকায় ছুটে যেতেন। গ্রামের মুরুব্বি, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁদের বোঝাতেন, সন্তানকে শুধু ক্ষেত-খামার বা পারিবারিক কাজে যুক্ত রাখলে চলবে না; তাকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে, বইয়ের জগতে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। এ ছিল নিছক সরকারি কর্তব্য নয়; ছিল এক ধরনের সামাজিক জাগরণ।

শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি করা, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, শিক্ষকদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা, সরকারি সাহায্য ও অনুদান সংগ্রহ করা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষায় ধরে রাখার মতো নানা কাজে তিনি যুক্ত ছিলেন।

কৃষ্ণকিশোর চাকমার শিক্ষা আন্দোলনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল ছিল একের পর এক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।
তাঁর উদ্যোগ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে ১৯২২ সালে মগবান ইউপি স্কুল ও সুবলং-খাগড়াছড়ি ইউপি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী ১৯২৩ সালে মহাপ্রুম এমই স্কুল, রামগড় এমই স্কুল, পানছড়ি এমই স্কুল, দীঘীনালা এমই স্কুল এবং তুলাবান এমই স্কুল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিদ্যালয়গুলো তাঁর কাছে কেবল শিক্ষাদানের প্রতিষ্ঠান ছিল না। এগুলো ছিল পাহাড়ি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের কর্মশালা। একটি বিদ্যালয় মানে ছিল একটি গ্রামের শিশুর সামনে নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে যাওয়া। একটি বই মানে ছিল অজানাকে জানার সুযোগ। একজন শিক্ষিত ছাত্র মানে ছিল একটি পরিবারের চিন্তার জগতে পরিবর্তনের সূচনা। এই উপলব্ধিই কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা আন্দোলনকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

কৃষ্ণকিশোর বুঝেছিলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যে একটি সমাজকে আটকে রাখলে চলবে না। উচ্চশিক্ষার পথও উন্মুক্ত করতে হবে। সে কারণেই তিনি উচ্চতর স্তরের বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেন। তৎকালীন বাস্তবতায় ইংরেজি শিক্ষা ছিল উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। ফলে পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের জন্য এই সুযোগ সৃষ্টি করা ছিল ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়ার মতো। তাঁর এই দূরদর্শিতা পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

কৃষ্ণকিশোরের ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক শিক্ষা-ঐতিহ্যও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর মেজ ভাই হরকিশোর চাকমা ছিলেন শিক্ষক। ছোট ভাই চিত্তকিশোর চাকমাও শিক্ষকতা ও সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চিত্তকিশোর মহাপ্রুম মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন বলে স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে। এই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও পাহাড়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চিত্তকিশোরের সন্তানদের মধ্যে ছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, জ্যোতিপ্রভা লারমা, শুভেন্দু প্রভাস লারমা ও জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা- যিনি ‘সন্তু লারমা’ নামে পরিচিত। কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা-চেতনার সঙ্গে এই বৃহত্তর পারিবারিক ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিক যোগসূত্র পরবর্তী ইতিহাসে লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ, যে পরিবারে এক প্রজন্ম বিদ্যালয়ের দরজা খুলেছিল, পরবর্তী প্রজন্ম সেই শিক্ষার আলোকে সমাজ ও অধিকারচেতনার বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে গিয়েছিল।

কৃষ্ণকিশোরের কাছে শিক্ষা ছিল কেবল পড়তে, লিখতে বা পরীক্ষায় পাস করার বিষয় নয়। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা অর্জনের পথ। পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন সমাজে শ্রেণিগত ও গোষ্ঠীগত বৈষম্য ছিল প্রবল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও ছিল সীমিত। ফলে সমাজের বৃহত্তর অংশকে শিক্ষার বাইরে রেখে একটি সুস্থ ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না। কৃষ্ণকিশোর নিজের জীবন দিয়েই দেখেছিলেন- শিক্ষার অভাব মানুষকে কীভাবে পিছিয়ে রাখে। তাই শিক্ষার বিস্তারের পাশাপাশি সামাজিক পশ্চাৎপদতা, শ্রেণীবৈষম্য ও সংকীর্ণ চিন্তার বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির কাজেও তিনি ভূমিকা রাখেন। ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁর শিক্ষা উদ্যোগকে পরবর্তী পাহাড়ি জাতীয় চেতনার বিকাশের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।

কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা আন্দোলনের আলোচনায় মাওরুমকে আলাদাভাবে স্মরণ করা প্রয়োজন।
কৃষ্ণকিশোর ও তাঁর ভাই চিত্তকিশোরের শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগের সঙ্গে মহাপ্রুমের নাম গভীরভাবে জড়িত। পরবর্তী স্মৃতিচারণে মাওরুমকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আধুনিক শিক্ষার বিকাশের অন্যতম প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

এই মাওরুম থেকেই পরবর্তী সময়ে বহু শিক্ষিত মানুষ বেরিয়ে আসেন। তাঁদের কেউ শিক্ষক, কেউ সমাজকর্মী, কেউ প্রশাসক, কেউবা পাহাড়ের অধিকার ও আত্মপরিচয়ের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।
অতএব, মাওরুমের ইতিহাসকে শুধু একটি গ্রামের ইতিহাস হিসেবে দেখলে তার গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি পাহাড়ের শিক্ষা ও সামাজিক জাগরণের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা আন্দোলনের প্রাথমিক বিস্তার রাঙামাটিকে কেন্দ্র করে হওয়ায় চাকমা সমাজ এর সুফল তুলনামূলকভাবে আগে পায়। সে সময় কর্ণফুলী নদীর উপত্যকা ও রাঙামাটি অঞ্চলে চাকমা জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে তাঁর শিক্ষা-চেতনা খাগড়াছড়িসহ অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে চাকমাদের পাশাপাশি মারমা ও ত্রিপুরারাও এই শিক্ষা বিস্তারের সুফল পেতে শুরু করে। অবশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খুমি, পাংখোয়া, খ্যাং, লুসাই, মুরং ও চাকসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর কাছে এই শিক্ষার ঢেউ পৌঁছাতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগে। ভৌগোলিক দুর্গমতা, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। তাই কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা আন্দোলনকে একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং ধীরে ধীরে বিস্তৃত হওয়া পাহাড়ের সামগ্রিক শিক্ষা-জাগরণের সূচনা হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত।

একটি সমাজে শিক্ষার বিস্তার ঘটলে শুধু বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ে না, বদলে যায় মানুষের চিন্তার জগৎও।
এই সত্যটি কৃষ্ণকিশোর খুব তাড়াতাড়িই উপলব্ধি করেছিলেন। শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম নিজেদের সমাজ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শেখে। সেই অর্থে তাঁর শিক্ষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ের সামাজিক ও জাতীয় চেতনার বিকাশের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল। ঐতিহাসিক সূত্রে কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা উদ্যোগকে পাহাড়ি জনগণের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও জাতীয় চেতনা বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

কৃষ্ণকিশোর চাকমার জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে ১৯৩৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর জীবনের দৈর্ঘ্য তাঁর কর্মের ব্যাপ্তিকে মাপতে পারেনি। মাত্র কয়েক দশকের জীবনে তিনি যে বীজ বপন করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মে অঙ্কুরিত হয়, শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে এবং পাহাড়ের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। একজন মানুষ চলে যেতে পারেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন যদি মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকে, তবে তাঁর মৃত্যু হয় না। কৃষ্ণকিশোরের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ২০০১ সালে তাঁকে মরণোত্তর বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে। এই সম্মাননা তাঁর কর্মের প্রতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধা। তবে তাঁর প্রকৃত সম্মাননা সম্ভবত আরও বড়- পাহাড়ের সেইসব শিক্ষিত মানুষ, যাঁরা তাঁর উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বিদ্যালয়ের দরজা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জগতে প্রবেশ করেছেন।

ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা নিজের জন্য পথ তৈরি করেন না- পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করেন। কৃষ্ণকিশোর চাঙমা ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি যখন পাহাড়ের দুর্গম পথে সাইকেল চালিয়ে কিংবা পায়ে হেঁটে বিদ্যালয় খুঁজতে বেরিয়েছিলেন, তখন হয়তো তিনি জানতেন না তাঁর সেই ছোট ছোট পদক্ষেপ একদিন একটি বৃহৎ শিক্ষা-আন্দোলনের ইতিহাস হয়ে উঠবে। তিনি হয়তো জানতেন না, তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের কোনো এক ছাত্র ভবিষ্যতে শিক্ষক হবে, কোনো এক শিক্ষার্থী সমাজের নেতৃত্ব দেবে, আর কোনো এক পরিবারে শিক্ষার আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু ইতিহাস জানে- সেই পদক্ষেপগুলো বৃথা যায়নি।

আজ পাহাড়ের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে যখন একটি শিশু বই হাতে বিদ্যালয়ের পথে হাঁটে, তখন তার পদধ্বনির মধ্যে যেন এক শতাব্দী আগের সেই শিক্ষাব্রতীর পদধ্বনিও শোনা যায়। কোনো পাহাড়ি তরুণ যখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখে, তখন সেই স্বপ্নের আকাশে কৃষ্ণকিশোরের জ্বালিয়ে যাওয়া প্রদীপের আলোও মিশে থাকে। তাই কৃষ্ণকিশোর চাকমা কেবল অতীতের একজন শিক্ষা কর্মকর্তা নন; তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা-জাগরণের এক অগ্রদূত, এক নিরলস শিক্ষাব্রতী এবং পাহাড়ের মানুষের স্মৃতিতে চিরপ্রজ্বলিত এক আলোকবর্তিকা।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি বিদ্যালয় নির্মাণ মানে শুধু একটি ভবন নির্মাণ নয়; একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্মাণ। আর সেই ভবিষ্যতের স্থপতিদের মধ্যে কৃষ্ণকিশোর চাকমার নাম তাই ইতিহাসের পাতায় শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হওয়ার যোগ্য।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, জুমজার্নাল

[এখানে মৃত্যু তারিখ জানাছিলনা। তাই কাহারো জানা থাকলে ও তথ্য অসংগতি থাকলে কমেন্ট বা injebchangmacharu@gmail.com (ই-মেইল) জানানো জন্য অনুরোধ রইল।] 

দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান চাঙমা: মাতৃভাষার স্বপ্নে আলোকিত এক স্বল্পায়ু নক্ষত্র - ইনজেব চাঙমা

  কিছু মানুষ দীর্ঘ জীবন বাঁচার জন্য পৃথিবীতে আসেন না; তাঁরা আসেন একটি সময়কে আলোকিত করে যেতে। তাঁদের জীবনকাল সীমিত হলেও স্বপ্ন ও সৃষ্টির আয়ু ...