১৯৩৮ সালের জ্যৈষ্ঠ মাসের এক শান্ত থমথমে বৃহস্পতিবার। রাঙামাটি জেলা সদরের অদূরে সবুজে ঘেরা ছোট্ট গ্রাম ‘মহাপুরম’ (স্থানীয়দের প্রিয় ‘মাওরুম’)। সেই রূপময় গ্রামে শিক্ষক চিত্তকিশোর চাঙমা ও ধার্মিক সমাজসেবিকা সুভাষিনী দেওয়ানের ঘর আলো করে ভূমিষ্ঠ হন জ্যোতিপ্রভা লারমা। চার ভাই-বোনের মধ্য তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। পিতৃগৃহের পরিমণ্ডলটি ছিল মুক্তচিন্তা ও বিদ্যানুরাগের এক অপূর্ব তীর্থভূমি। পিতা চিত্তকিশোর চাকমার শিক্ষার প্রতি অপরিসীম দরদ ও দূরদর্শিতা কেবল জ্যোতিপ্রভাকেই আলোর মুখ দেখায়নি, বরং তাঁর অনুজ ভাইদেরও প্রস্তুত করেছিল এক ঐতিহাসিক ভূমিকার জন্য। তাঁর তিন অনুজ- শুভেন্দু প্রভাষ লারমা (বুলু), পার্বত্য জনপদের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম এন লারমা) এবং জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)- প্রত্যেকেই পরবর্তীকালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতীয়তাবাদী ও বৈষম্যবিরোধী সংগ্রামে নেতৃত্বের শীর্ষ শিখরে আরোহণ করেন। জ্যোতিপ্রভা ছিলেন এই বিপ্লবী পরিবারের জ্যেষ্ঠ কাণ্ডারী ও চেতনার মূল অনুপ্রেরণাদাত্রী।
চল্লিশের দশকের পাহাড়ি সমাজে কন্যাসন্তানের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল সুদূরপরাহত এক স্বপ্ন। সামাজিক রক্ষণশীলতা ও ভৌগোলিক প্রতিকূলতাকে জয় করে জ্যোতিপ্রভা লারমা ভর্তি হন মহাপুরম প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি শুধু সেখানে বিদ্যা অর্জন করতে যাননি, বরং সেই বিদ্যালয়ের প্রথম নারী শিক্ষার্থী হিসেবে নাম লিখিয়ে ইতিহাসের সূচনা করেন।
বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠ শেষ করার পর জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত, সংসার ও কাজের ব্যস্ততার মাঝেও শিক্ষার প্রতি তাঁর অন্তহীন তৃষ্ণা ম্লান হয়নি। দীর্ঘ বিরতির পর, প্রতিকূল সময় ও বয়সের হিসাবকে তুচ্ছ জ্ঞান করে ১৯৮০ সালে তিনি কুমিল্লা বোর্ডের অধীনে সাফল্যসূচকভাবে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। প্রথাগত বয়সের সীমানা ডিঙিয়ে তাঁর এই শিক্ষাগত সাফল্য প্রমাণ করে- জ্ঞানের অনুসন্ধান কোনো নির্দিষ্ট বয়সের গণ্ডিতে বন্দি থাকে না।
১৯৫৪ সালে তিনি রাঙামাটিতে এসে জীবনসংগ্রামের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন। ক্যাথলিক মিশন স্কুলে শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর ব্রত। শিক্ষকতাকে তিনি কোনো সাধারণ অর্থ উপার্জনের জীবিকা হিসেবে নেননি, গ্রহণ করেছিলেন মানুষ গড়ার এক পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে। নিজেকে একজন নিপুণ শিক্ষিকা হিসেবে গড়ে তুলতে রাঙামাটি টিচার্স ট্রেনিং সেন্টার থেকে তিনি এক বছরের পেশাগত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
শিক্ষকতার গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর বিস্তৃত মন চাইল গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার শিকড়ে গিয়ে কাজ করতে। তিনি ঢাকায় ভিলেজ এইড (V.A.I.D.)-এর অধীনে এক বছর মেয়াদী নিবিড় প্রশিক্ষণ নেন এবং খাগড়াছড়িতে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ভিলেজ এইডের হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের দুর্গম পাহাড়ি গ্রামগুলোতে কাজ করার সময় তিনি পাহাড়ের অনগ্রসর নারীদের ক্ষুধা, অশিক্ষা, স্বাস্থ্যহীনতা ও বঞ্চনাকে প্রত্যক্ষভাবে উপলব্ধি করেন। নারীর স্বাস্থ্য সুরক্ষা, চিকিৎসা, খেলাধুলা ও সামাজিকভাবে স্বাবলম্বী করার কাজে তিনি নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন।
১৯৬০ সাল জ্যোতিপ্রভা লারমা তথা সমগ্র পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়ের সূচনা করে। কাপ্তাই বাঁধের জলে নিমজ্জিত হয় তাঁদের পৈতৃক ভিটেমাটি ‘মহাপুরম’ গ্রাম। শৈশবের স্মৃতি, স্মৃতির আঙিনা আর প্রিয় মাতৃভূমি জলের তলায় হারিয়ে গেলে পরিবারসহ তিনি উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নেন খাগড়াছড়ির পানছড়িতে। এই মর্মান্তিক বাস্তুচ্যুতি কেবল এক পরিবারের গৃহহীন হওয়া ছিল না, এটি ছিল হাজার হাজার জুম্ম জনগোষ্ঠীর মূল উপড়ে ফেলার যৌথ ট্র্যাজেডি।
পানছড়িতে এসে তিনি খাগড়াছড়ি এম.ই. স্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। তবে শিক্ষকতার ক্লাসরুম থেকে তাঁর সামাজিক চেতনা ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর রাজনৈতিক ক্যানভাসে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার ও স্বশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য যে ঐতিহাসিক আন্দোলন গড়ে ওঠে, জ্যোতিপ্রভা লারমা তাতে নিঃশব্দে কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
পারিবারিক জীবন ও সামাজিক দায়িত্বকে তিনি সুষম ভারসাম্যে বেঁধেছিলেন। স্বামী চিরঞ্জীব তালুকদারের সঙ্গে সাংসারিক জীবনে তিনি দুই কন্যা ও তিন পুত্রসন্তানের জননী। মাতৃত্বের দায়িত্ব, গৃহস্থালি সামলানো, শিক্ষকতা ও সমাজসেবা- সবকিছুর পাশাপাশি তিনি পাহাড়ের নারী আন্দোলনকে সুসংগঠিত করার চেষ্টা চালিয়ে যান।
তাঁর মতে, কেবল রাজনৈতিক স্বশাসন অর্জন করলেই মুক্তি আসে না; যতক্ষণ না পর্যন্ত প্রান্তিক মানুষ ও নারীরা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারছে, ততক্ষণ সমাজ অসম্পূর্ণ। ফলে তাঁর সংগ্রাম ছিল একাধারে বৈষম্যহীন সমাজ গঠন ও নারীর মানবিক মর্যাদা রক্ষার লড়াই।
জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে জ্যোতিপ্রভা লারমা তাঁর অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি ও সমাজচিন্তাকে সাহিত্যের ভাষায় প্রকাশ করতে শুরু করেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে স্বজাতির সমাজ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, নারীজীবন ও অধিকারচেতনার প্রতি গভীর অনুরাগ স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাঁর লেখার মূল উদ্দেশ্য নিছক সাহিত্যচর্চা নয়; বরং সমাজের বৈষম্য ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি, নারী-পুরুষের অসমতা দূরীকরণ, অধিকারহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নিপীড়ন-বঞ্চনামুক্ত একটি মানবিক সমাজ নির্মাণে ভূমিকা রাখা।
২০১৯ সালের অক্টোবরে তাঁর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ‘চাঙমা পজ্জন’র ফুলবারেং’ প্রকাশিত হয়। এর পর ২০২০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘রৌদ্রজ্জ্বল সূর্যের প্রতীক্ষায়’। জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের স্মৃতি ধারণ করে ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘একজন সংগ্রামী নারীর আত্মকথন’।
এই গ্রন্থগুলো তাঁর ব্যক্তিজীবনের স্মৃতিচারণের পাশাপাশি একটি সময়, একটি সমাজ এবং একটি জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রামেরও সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর লেখায় ব্যক্তির গল্প বৃহত্তর সমাজের গল্পে রূপ নেয়; ব্যক্তিগত বেদনা হয়ে ওঠে সামষ্টিক স্মৃতির অংশ।
পার্বত্য অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার, স্বশাসন প্রতিষ্ঠা ও নারী জাগরণে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি সম্মানিত হয়েছেন- চট্টগ্রামের প্রীতিলতা ট্রাস্ট সম্মাননা বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ সম্মাননা, বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম (পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল) সম্মাননা, তবে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সম্মাননা বা উপাধিতে জ্যোতিপ্রভা লারমার জীবনব্যাপ্তিকে আবদ্ধ করা সম্ভব নয়। তাঁর আসল পরিচয়- তিনি প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে হেঁটে যাওয়া এক অগ্রগামী নারী, যিনি পাহাড়ের নতুন প্রজন্মকে পথ দেখিয়েছেন।
জ্যোতিপ্রভা লারমা সময়কে কেবল অতিক্রম করেননি, তিনি সময়কে নিজের চেতনায় ধারণ করেছেন। জীবনের উত্থান-পতন, ভিটেমাটি হারানোর কষ্ট, আন্দোলন-সংগ্রামের অগ্নিপরীক্ষা পেরিয়ে সাহিত্যসাধনার শান্ত আশ্রয়ে পৌঁছানো- সব মিলিয়ে তাঁর জীবন পার্বত্য চট্টগ্রামের একেঁবেঁকে চলা পাহাড়ি নদীর মতোই বহমান। আজ বয়সের ভারে শরীর হয়তো কিছুটা শ্লথ, কিন্তু তাঁর চিন্তার জ্যোতি অমলিন। পার্বত্য জনপদের ইতিহাসে সংগ্রামী নারী জ্যোতিপ্রভা লারমা এক অবিনাশী প্রদীপ হয়ে জাগ্রত থাকবেন বহুকাল।
তথ্যসূত্র: তাঁর প্রকাশিত বই বিভিন্ন সময় প্রকাশিত খবর



