শনিবার, ২২ আগস্ট, ২০২৬

বিপম চাকমা: চাঙমা কথাসাহিত্যের এক নির্মাণশিল্পী - ইনজেব চাঙমা

কিছু মানুষ পেশায় শিক্ষক, অথচ তাঁদের প্রকৃত পরিচয় ছড়িয়ে থাকে শ্রেণিকক্ষের সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে। কেউ কেউ আবার শব্দকে শুধু ভাষার বাহন হিসেবে ব্যবহার করেন না, শব্দের ভেতর দিয়ে তাঁরা একটি জনপদের জীবন, মানুষের স্বপ্ন, বেদনা, প্রেম, প্রকৃতি ও অস্তিত্বকে ধরে রাখেন। বিপম চাকমা তেমনই একজন মানুষ। পেশাগত পরিচয়ে তিনি শিক্ষক; কিন্তু সৃষ্টিশীল পরিচয়ে একজন কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও সাহিত্যকর্মী। বিশেষত চাঙমা ভাষায় ছোটগল্প রচনার ক্ষেত্রে তিনি একজন পথিকৃৎ। তাঁর ‘আজবঅ সাপ’ চাঙমা ভাষার প্রথম গল্পগ্রন্থ হিসেবে চাঙমা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় মাইলফলক।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পে যেমন মানুষের অন্তর্জীবন, প্রকৃতি, সমাজ ও সম্পর্কের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো শিল্পের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, বিপম চাকমার গল্পেও তেমনি ধরা পড়ে তাঁর নিজস্ব জনপদের মানুষ ও জীবনের নানা রং। সেই কারণেই অনেকে তাঁকে ভালোবেসে ‘চাঙমা রবীন্দ্রনাথ’ বলে অভিহিত করেন। এটি নিছক একটি উপাধি নয়; বরং তাঁর সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য ও গল্প বলার ক্ষমতার প্রতি পাঠকের এক ধরনের শ্রদ্ধার প্রকাশ।

বিপম চাকমার জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার পোয়াপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতা আলোক বিকাশ চাকমা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মাতা সুনীতি সুধা চাকমা ছিলেন গৃহিণী। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ।

তাঁর শৈশবের আকাশ অবশ্য খুব বেশি নির্মল ছিল না। ১৯৮০ সালের কলমপতি গণহত্যার অভিঘাতে তাঁদের পরিবারকে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নিতে হয় নানার বাড়িতে, নানিয়ারচর উপজেলার দক্ষিণ এ্যাইত মারা বা হাতিমারা গ্রামে। শৈশবেই ঘর হারানোর সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে স্পর্শ করে যায় গভীরভাবে। পরে তাঁর সাহিত্যকর্মে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবন, বাস্তবতা ও বেদনার যে অনুরণন শোনা যায়, তার পেছনে এই জীবনের অভিজ্ঞতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

হাতিমারা গ্রামেই ধনপাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। ১৯৮৪ সালে নিজ গ্রামে ফিরে এসে পোয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু জীবন তাঁকে বারবার নতুন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

১৯৮৭ সালে বাবার কর্মস্থল বেতবুনিয়ায় চলে যান। সেখানেই আসে জীবনের আরেক গভীর আঘাত, মায়ের মৃত্যু। মাতৃহারা সেই সময়ের বেদনায় প্রায় এক বছর তাঁর বিদ্যালয়জীবন থমকে যায়। তবু জীবন থেমে থাকে না। আবারও তিনি ফিরে আসেন শিক্ষার পথে।

১৯৮৮ সালে বেতবুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। মেধা ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে ১৯৯৩ সালে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বিভাগে এসএসসি এবং ১৯৯৫ সালে রাউজান কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর তাঁর গন্তব্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে প্রবেশ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিজ্ঞানের ছাত্র থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষার্থী হয়ে ওঠা যেন তাঁর ভেতরে সুপ্ত থাকা সাহিত্যিক সত্তার দরজা খুলে দেয়।

১৯৯৮ সালের পরীক্ষার্থী হিসেবে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন; পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের পরীক্ষার্থী হিসেবে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন; সেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালে।

শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণার জগতেও তাঁর পদচারণা ঘটে। ‘রূপতত্ত্ব: চাকমা সর্বনামের রূপ বিশ্লেষণ’ শিরোনামের গবেষণাকর্মে তিনি চাঙমা ভাষার ব্যাকরণ ও ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান করেন। তাঁর গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ভাষা গবেষক ড. মনিরুজ্জামান। ভাষা যে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, একটি জাতির স্মৃতি ও অস্তিত্বেরও ধারক, তাঁর গবেষণা ও সাহিত্যচর্চায় সেই উপলব্ধির প্রতিফলন স্পষ্ট।

২০০৪ সালে তিনি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরের বছর ২৬তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু সরকারি চাকরির পথে তখনও ছিল অনিশ্চয়তা। ২০০৬ সালের মার্চে প্রকাশিত ২৬তম বিসিএসের নিয়োগ গেজেটের চূড়ান্ত তালিকা থেকে তিনি বাদ পড়েন।

অবশেষে ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৮ সালে ২৬তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে প্রভাষক পদে নিয়োগ লাভ করেন। শিক্ষকতা তাঁর কাছে কেবল একটি পেশা নয়; জ্ঞান ও প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির এক দায়িত্বও বটে। বর্তমানে তিনি বান্দরবান সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।

ব্যক্তিজীবনেও তিনি একটি শিক্ষিত ও সাহিত্যপ্রবণ পরিবারের অংশ। তাঁর সহধর্মিণী শার্লিন চাকমা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক। তাঁদের দুই সন্তান, তজিম চাকমা ও রিঝুম চাকমা।

ছাত্রজীবন থেকেই বিপম চাকমার লেখালেখির শুরু। সময়ের সঙ্গে সেই লেখালেখি পরিণত হয়েছে দীর্ঘ সাহিত্যসাধনায়। চাঙমা ও বাংলা দুই ভাষাতেই তিনি লিখেছেন। ছড়া, কবিতা, গান, গল্প, প্রবন্ধ ও সাহিত্য-সমালোচনা—সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ।

তবে তাঁর সাহিত্যের মূল সুরটি খুঁজে পাওয়া যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবন ও বাস্তবতার ভেতরে। পাহাড়ের মানুষ, তাদের স্বপ্ন ও দুঃখ, প্রকৃতি, সামাজিক টানাপোড়েন, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রশ্ন তাঁর লেখার উপাদান হয়ে ওঠে।

তিনি পাহাড়কে দূর থেকে দেখেননি। পাহাড় তাঁর কাছে কেবল ভূগোল নয়; পাহাড় তাঁর জীবনের অংশ, স্মৃতির অংশ, মানুষের অংশ। তাই তাঁর গল্পে পাহাড়ের প্রকৃতি যেমন কথা বলে, তেমনি কথা বলে পাহাড়ের মানুষও।

২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বাংলা গল্পগ্রন্থ ‘অজগর’। গ্রন্থটি পাঠকমহলে পরিচিতি লাভ করে এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার বাংলা বিভাগের পাঠ্যতালিকায় স্থান পায়। ২০২২ সাল থেকে গ্রন্থটি মূলপাঠ্য হিসেবে পড়ানো হচ্ছে, একজন লেখকের জন্য এটি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি।এর পরের বছর, ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস ‘গ্রহণ লাগা ভোর’। জীবনের অন্ধকার ও আলোর সন্ধিক্ষণ, মানুষের অস্তিত্ব এবং সমাজবাস্তবতার নানা অনুষঙ্গ তাঁর উপন্যাসে শিল্পিত রূপ পেয়েছে।

কিন্তু চাঙমা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ আসে ২০১৯ সালে। প্রকাশিত হয় ‘আজবঅ সাপ’—চাঙমা ভাষায় রচিত প্রথম গল্পগ্রন্থ। একটি ভাষার সাহিত্যভাণ্ডারে প্রথম গল্পগ্রন্থের আবির্ভাব কেবল একটি বই প্রকাশের ঘটনা নয়; এটি একটি নতুন সাহিত্যধারার জন্ম।

‘আজবঅ সাপ’-এর মধ্য দিয়ে চাঙমা ভাষার গল্প সাহিত্যিক পরিসরে নতুন পরিচয় পায়। বিপম চাকমা প্রমাণ করেন, মাতৃভাষাও মানুষের জটিল অনুভূতি, জীবনসংগ্রাম, হাসি-কান্না ও সমাজবাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যিক প্রকাশ ঘটাতে পারে।

বিপম চাকমার সাহিত্যিক ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড পাহাড়ের সীমানায় আবদ্ধ থাকেনি। ২০২২ সালের ১২–১৪ নভেম্বর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ‘Chakma Language, Scripts & Culture’ বিষয়ে তিনি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

একই বছরের ডিসেম্বরে রাঙ্গামাটি জেলা সাহিত্য সম্মেলনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে সেই প্রবন্ধ ২০২৩ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়।

২০২৩ সালের ৫–৮ জানুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন Dhaka Lit Fest-এ তিনি আলোচক হিসেবে অংশ নেন। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বান্দরবান জেলা সাহিত্য সম্মেলনেও তিনি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।

ছাত্রজীবন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি অসংখ্য সংকলন, লিটলম্যাগ ও সাহিত্যপত্রের সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয় দৈনিকগুলোতেও নিয়মিত তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়ে আসছে। তাঁর বহু গল্প ও প্রবন্ধ এখনও গ্রন্থের মলাটে বন্দি হওয়ার অপেক্ষায়।

বিপম চাকমার সাহিত্যজীবনকে কেবল একজন ব্যক্তির সৃষ্টিশীলতার ইতিহাস হিসেবে দেখলে তাঁর গুরুত্বকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা যাবে না। তাঁর লেখার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ভাষার ভবিষ্যৎ, একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি এবং একটি জনপদের জীবনকথা।

বাংলা ভাষায় তিনি যখন পাহাড়ের গল্প বলেন, তখন বৃহত্তর পাঠকসমাজ পাহাড়ের মানুষের জীবনকে নতুন চোখে দেখার সুযোগ পায়। আর যখন চাঙমা ভাষায় গল্প লেখেন, তখন তিনি তাঁর নিজের মানুষের কাছে তাঁদের ভাষাতেই তাঁদের জীবনকে ফিরিয়ে দেন। এই দ্বিমুখী সাহিত্যসেতুই তাঁর লেখকসত্তার সবচেয়ে বড় শক্তি।

একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক, অন্যদিকে মাতৃভাষার নিবেদিত কথাশিল্পী, এই দুই পরিচয় তাঁর মধ্যে এসে মিলেছে এক জায়গায়: মানুষ ও ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতায়।

জীবনের শুরুতে তিনি দেখেছেন ঘরহারা মানুষের মিছিল, দেখেছেন শৈশবের অনিশ্চয়তা, হারিয়েছেন মাকে; তারপর শিক্ষা তাঁকে দিয়েছে আলোর পথ, শিক্ষকতা দিয়েছে মানুষ গড়ার সুযোগ, আর সাহিত্য দিয়েছে নিজের দেখা পৃথিবীকে শব্দে ধরে রাখার শক্তি।

তাঁর কলম তাই শুধু গল্প লেখে না, সময়কে সংরক্ষণ করে। তাঁর চরিত্রগুলো শুধু কাগজের মানুষ নয়; তারা পাহাড়ের জনপদ থেকে উঠে আসা জীবন্ত মানুষ। তাঁদের হাসি আছে, কান্না আছে, স্বপ্ন আছে, পরাজয় আছে, আবার উঠে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষাও আছে।

চাঙমা ভাষায় প্রথম গল্পগ্রন্থ রচনা করে বিপম চাকমা যে দরজা খুলেছেন, সেই দরজা দিয়ে একদিন আরও অনেক নতুন কথাশিল্পী প্রবেশ করবেন, এটাই তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।

তাঁর পরিচয় তাই কেবল ‘শিক্ষক’ নয়, কেবল ‘লেখক’ও নয়। তিনি একাধারে শিক্ষক, গবেষক, কথাশিল্পী এবং চাঙমা ভাষার সাহিত্যভুবনের এক নির্মাণশিল্পী। তাঁর কলমে পাহাড় কথা বলে, মানুষের জীবন কথা বলে, আর একটি ভাষা তার নিজের সাহিত্যিক অস্তিত্বের সন্ধান পায়।

 

শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু পাহাড়, অরণ্য আর নদীর ভূগোল নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, আত্মপরিচয় এবং অধিকার-চেতনার এক দীর্ঘ অভিযাত্রার নাম। এই ভূখণ্ডের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে আছে প্রকৃতি, জুমচাষ, নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা, গান, নৃত্য, সাহিত্য ঐতিহ্য। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই আত্মপরিচয় বহন করে চলেছে জুম্ম জনগোষ্ঠী। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন প্রজন্মের যে কজন তরুণ-তরুণী শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিকতা সামাজিক দায়বদ্ধতাকে জীবনের অনুষঙ্গ করে সামনে এগিয়ে চলেছেন, হেমা চাকমা তাঁদের অন্যতম।

পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদ পানছড়ির ২ নম্বর চেঙ্গী ইউনিয়নের নম্বর ওয়ার্ডের তারাবন জগৎ মোহন পাড়ার মাটিতে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০২ সালে হেমা চাকমার জন্ম। তাঁর শৈশবের প্রথম পাঠশালা বনশ্রী শিশু নিকেতন। তাঁর পিতা অনিল চন্দ্র চাকমা (সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান)। মা, মিনতি চাকমা। বড় ভাই অমর প্রিয় চাকমা।

হেমার শৈশব কেটেছে পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের জীবন এবং সমাজের বাস্তবতার খুব কাছাকাছি। যে ভূখণ্ডে শিশুর চোখ প্রথম আকাশ দেখে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে, যে জনপদে নদী শুধু জলধারা নয়, জীবনের অংশ, যে সমাজে ভাষা সংস্কৃতি মানুষের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, সেই পরিবেশ তাঁর মনোজগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই পরবর্তী জীবনে মানবাধিকার, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ভাষা মানুষের জীবন নিয়ে তাঁর যে আগ্রহ দেখা যায়, তার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় এই শৈশবেই।

শিক্ষাজীবনের শুরু পুজগাংমুখ বনশ্রী শিশু নিকেতনে। এরপর পুজগাংমুখ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ২০১৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ২০২০ সালে চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

পাহাড়ের নিভৃত পল্লি থেকে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পৌঁছানোর এই যাত্রা নিছক শিক্ষাগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বহুমাত্রিক পরিবেশে এসে তাঁর চিন্তার পরিধিও আরও বিস্তৃত হয়েছে। স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, বৈষম্য, অধিকার, শিক্ষা, সংস্কৃতি সামাজিক ন্যায়বিচার, বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ক্রমে সক্রিয় সামাজিক চেতনায় রূপ নেয়।

হেমা চাকমার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি হলো তাঁর মানবিক দায়বদ্ধতা। মানুষের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য এবং অবহেলার বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ সোচ্চার। তিনি মনে করেন, সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষকে কেবল সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন সম্মান, সুযোগ ন্যায্য অধিকার। অনাথ, অসহায় দরিদ্র মানুষের জীবন তাঁকে নাড়া দেয়। তাঁদের জীবনসংগ্রামকে গল্প, সাহিত্য সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা তাঁর মানবিক সত্তার পরিচয় বহন করে।

শুধু মানবাধিকারের প্রশ্নেই নয়, শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রহ গভীর। পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ, সচেতনতা জ্ঞানচর্চার প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলব্ধি করেন। স্বাস্থ্য অর্থনীতি সম্পর্কেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির বিষয়টি তাঁর কর্মকাণ্ডের অন্যতম ক্ষেত্র। ফলে তাঁর সামাজিক চিন্তা কোনো একটি বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ নয়; বরং মানুষের সামগ্রিক জীবনমান মর্যাদাকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত।

হেমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় একজন সংস্কৃতিমনস্ক তরুণী হিসেবে। চাকমা ভাষা বর্ণমালা তাঁর কাছে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এগুলো তাঁর জাতিসত্তার স্মৃতি আত্মপরিচয়ের বাহক। চাকমা হরফ বা বর্ণমালা নিয়ে গবেষণা চর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ নিজের সাংস্কৃতিক শিকড়কে জানার এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।

সংগীত, নৃত্য, কবিতা লেখা আবৃত্তি তাঁর সৃজনশীলতার নানা দিক। প্রকৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসাও এই সৃজনশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পাহাড়ের বাতাস, বৃষ্টি, নদী, অরণ্য মানুষের জীবন, এসব তাঁর অনুভূতির জগতে নানা রঙে প্রতিফলিত হয়। কখনো তিনি কবিতায়, কখনো গানে, কখনো বক্তব্যে, আবার কখনো সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ করেন।

সাহিত্যের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ক্রমশ দৃঢ় হয়েছে। Kok Creativities-এর উদ্যোগে প্রকাশিত আবেদি নামে যৌথ কাব্যগ্রন্থে তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে। বিশেষ তাৎপর্যের বিষয়, সংকলনটি সম্পূর্ণ চাকমা বর্ণমালায় প্রকাশিত হয়েছে। এই অংশগ্রহণ তাঁর কাছে শুধু কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ নয়; বরং নিজস্ব লিপি ভাষার প্রতি ভালোবাসাকে সৃজনশীলতার মাধ্যমে প্রকাশ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

হেমার রাজনৈতিক সামাজিক চেতনার ক্ষেত্রেও রয়েছে দৃঢ়তা। জুম্ম জাতীয়তাবাদ, আত্মপরিচয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বিষয়ে তাঁর অবস্থান আপসহীন বলে তাঁর পরিচিতজনদের বর্ণনায় উঠে আসে। বৈষম্যবিরোধী মনোভাব এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থান তাঁর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে তিনি কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত ফলাফলে হেমা চাকমার প্রাপ্ত ভোট ,৯০৮ এবং তাঁকে নির্বাচিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডাকসুর নির্বাচনী যাত্রা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামের একজন তরুণী দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোর একটির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ অর্জন করেছেন, এটি নিঃসন্দেহে তাঁর শিক্ষাজীবন সামাজিক সম্পৃক্ততার একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। তাঁর এই সাফল্য পাহাড়ের অনেক তরুণ-তরুণীর কাছেও উচ্চশিক্ষা নেতৃত্বের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে পানছড়ি পাহাড়ের মানুষের জন্য গৌরবের ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে হেমা চাকমাকে শুধু একটি নির্বাচনী পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাঁর জীবনযাত্রার বিস্তৃত পরিসরে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক চর্চা, কবিতা, সংগীত, নৃত্য, ভাষা বর্ণমালা নিয়ে আগ্রহ, প্রকৃতিপ্রেম এবং মানুষের জীবন নিয়ে ভাবনা। তিনি বিজ্ঞানমনস্ক; যুক্তি অনুসন্ধিৎসাকে গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে তাঁর মধ্যে রয়েছে প্রবল কৌতূহল, হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনের সন্ধান থেকে শুরু করে ধাঁধা সমাধান, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা মাছ ধরার মতো স্বাভাবিক আনন্দের মধ্যেও তাঁর জীবনের প্রাণবন্ত সত্তাটি প্রকাশ পায়।

ব্যক্তিত্বের দিক থেকে হেমা আবেগী, জেদী কখনো কখনো রাগী। কিন্তু তাঁর এই আবেগের মধ্যেই রয়েছে গভীর মমতা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোরতা এবং মানুষের কষ্টের প্রতি তাঁর কোমলতা, এই দুই বিপরীত বৈশিষ্ট্য মিলেই তাঁর ব্যক্তিত্বকে স্বতন্ত্র করেছে। বিতর্কে তিনি নির্ভীক, বক্তব্যে অকপট এবং নিজের বিশ্বাসের জায়গায় দৃঢ়। তাঁর কাছে নীরব থাকা অনেক সময় অন্যায়ের প্রতি সম্মতির মতো; তাই প্রয়োজন হলে তিনি প্রশ্ন করেন, কথা বলেন এবং নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।

হেমা চাকমার জীবনকে যদি একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে তার উৎস পাহাড়ের একটি ছোট্ট জনপদ, আর তার স্রোত আজ বিস্তৃত হয়েছে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, মানবাধিকার সামাজিক নেতৃত্বের নানা ভূখণ্ডে। তাঁর জীবনের পথ এখনও দীর্ঘ। সামনে আরও শিক্ষা, আরও অভিজ্ঞতা, আরও সংগ্রাম এবং আরও সৃজনশীলতার সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে।

পাহাড়ের মাটি থেকে উঠে এসে জাতীয় পরিসরে নিজের পরিচয় তৈরি করা কোনো সহজ যাত্রা নয়। এই পথের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন সাহস, অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। হেমা চাকমার মধ্যে সেই সম্ভাবনার অনেকগুলো উপাদান ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান।

তাঁর হাতে যেমন কবিতার কলম, তেমনি কণ্ঠে প্রতিবাদের ভাষা; তাঁর চোখে যেমন পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, তেমনি ভবিষ্যৎ সমাজের স্বপ্ন। নিজের ভাষা বর্ণমালার প্রতি ভালোবাসা তাঁকে শেকড়ের কাছে রাখে, আর শিক্ষা যুক্তিবোধ তাঁকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেয়। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একজন পূর্ণাঙ্গ মানবিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

হেমা চাকমার গল্প তাই কেবল একজন তরুণীর জীবনী নয়; এটি পাহাড়ের এক প্রজন্মের স্বপ্ন, সংগ্রাম সম্ভাবনারও প্রতিচ্ছবি। যে প্রজন্ম নিজের পরিচয় ভুলে যেতে চায় না, অথচ বিশ্বজ্ঞান থেকেও বিচ্ছিন্ন থাকতে চায় না; যে প্রজন্ম সংস্কৃতিকে ভালোবাসে, কিন্তু কুসংস্কারকে নয়; যে প্রজন্ম অধিকার চায়, কিন্তু তার সঙ্গে শিক্ষা, যুক্তি মানবিকতাকেও সামনে রাখতে চায়, হেমা চাকমা সেই প্রজন্মেরই এক সাহসী প্রতিনিধি।

পাহাড়ের পথ কখনোই সরল নয়। তবু পথ যত দুর্গমই হোক, স্বপ্ন যদি অটুট থাকে, তবে ছোট্ট একটি পাড়ার মেয়ে একদিন দেশের বৃহত্তর পরিসরে নিজের কণ্ঠ পৌঁছে দিতে পারে। হেমা চাকমার জীবন সেই সম্ভাবনারই এক চলমান অধ্যায়, যার পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলো কি করবে-হবে এখনও লেখা বাকি …………….। 

তথ্য: ইন্দ্রলাল চাঙমা, প্রধান শিক্ষক পুজগাঙমুখ উচ্চ বিদ্যালয়, পানছড়ি।  

 

বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

সিন্ধু কুমার চাকমা: সংগ্রামের আগুন থেকে কলমের আলো - ইনজেব চাঙমা

পাহাড়ের ইতিহাস কেবল পাহাড়, নদী, অরণ্য আর মেঘের গল্প নয়। এই ইতিহাসের পাতায় মিশে আছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস, রক্তের দাগ, হারানোর বেদনা, অধিকার আদায়ের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক অদম্য সংগ্রামের স্মৃতি। সেই ইতিহাসেরই এক নীরব অথচ প্রত্যয়ী সাক্ষী সিন্ধু কুমার চাকমা, যাঁর জীবনের এক অধ্যায় লেখা হয়েছে সংগ্রামের উত্তাপে, আর পরবর্তী অধ্যায় লেখা হচ্ছে কলমের কালিতে।

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গী ইউনিয়নের তারাবন জীতেন্দ্র লাল কার্বারী পাড়ায় তাঁর জন্ম। পিতা দিন রঞ্জন চাকমা, মাতা বিরোজা চাকমা। শৈশব থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির ও সংঘাতময় বাস্তবতার মধ্যে। ১৯৭১-এর পরবর্তী সময়ের মুক্তিবাহিনী দ্বারা পানছিড়তে হত্যা, সহিংসতা, গ্রাম পোড়ানো, মানুষের ওপর নেমে আসা নিপীড়ন এবং পরবর্তী সামরিক অভিযানের অভিঘাত তাঁর কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করে। চারপাশের সেই বাস্তবতা ধীরে ধীরে তাঁর ভেতরে জন্ম দেয় প্রতিবাদী মনন, সংগ্রামী চেতনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস।

সময়ের স্রোতে সেই চেতনা তাঁকে নিয়ে যায় আরও কঠিন এক পথে। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ছাত্রজীবনেই তিনি তৎকালীন পার্বত্য পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে শান্তিবাহিনীতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। পরবর্তী দীর্ঘ প্রায় এক যুগ তাঁর জীবন কেটেছে সশস্ত্র সংগ্রামের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। পাহাড়ের দুর্গম পথ, অনিশ্চিত দিন, ভয় ও প্রত্যাশার দ্বন্দ্ব, সবকিছুই তাঁর জীবনকে অন্য এক অভিধানে লিখে দেয়। সে অভিধানে ছিল সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, স্বপ্ন এবং একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও অধিকারের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু ইতিহাস কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না।

১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তাঁর জীবনে আসে এক নতুন বাঁক। দীর্ঘ সংঘাতের পথ পেরিয়ে তিনি ফিরে আসেন স্বাভাবিক জীবনে। তবে সংগ্রাম থেকে তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল না আত্মসমর্পণ; বরং সংগ্রামের ভাষা বদলে যাওয়ার এক নতুন অধ্যায়। হাতে অস্ত্রের পরিবর্তে উঠে আসে কলম। পাহাড়ের পথের বদলে তিনি প্রবেশ করেন শব্দের পথে। সেই পথেই তিনি খুঁজে নেন নিজের দ্বিতীয় জীবন।

গণতান্ত্রিক আন্দোলন, পাহাড়ের মানুষের অধিকার, ইতিহাস, পরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন তাঁর লেখার কেন্দ্রে স্থান পায়। একই সঙ্গে কবিতার কোমল জগৎও তাঁকে আকর্ষণ করে। চাকমা ও বাংলা, দুই ভাষায় তিনি লিখেছেন। তাঁর কাছে ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জাতির স্মৃতি, আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের ধারক। তাই মাতৃভাষায় লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি যেন নিজের শেকড়কেও আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।

বিভিন্ন ম্যাগাজিন, স্মরণিকা এবং যৌথ কাব্যগ্রন্থে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। প্রবাহণ, পহর ফুদোক, কাচালং, উন্মেষ, কাব্যের বেলাভূমি, ৩৩০ কবির কবিতা, বসন্তের বাঁশী, শ্রাবণের মেঘ, বর্ণালী, লেখনী, ৫০০ কবির কবিতা, চব্বিশের আন্দোলন, হৃদয়ের দহণ, হেমন্তের সন্ধ্যা, ফাগুনের কাব্য মেলা, মনের অজান্তে, শিকল ভাঙার গান, রক্তাক্ত মানচিত্রের স্বাধীনতা, অগ্নির প্রহর, জ্বলন্ত অগ্নিশিখা, কবিতার কলি, কবির মননে কবিতা, কাব্যের পঙ্‌ক্তিমালা, শ্রাবণের সন্ধ্যা, বাত্তোপেকসহ বহু সংকলনে তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিচয় পাওয়া যায়।

তবে সিন্ধু কুমার চাকমার লেখকসত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় তাঁর একক গ্রন্থসমূহে। তাঁর বইয়ের নামগুলোর মধ্যেই যেন তাঁর জীবনদর্শনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়, পাহাড়ের আন্দোলন এবং অধিকারের বাস্তবতা, পাহাড়ের রক্তাক্ত গেরিলা যুদ্ধের ইতিহাস, আদিবাসী স্বীকৃতির যৌক্তিকতা ও প্রতিবন্ধকতা, মুক্তি বাহিনী থেকে শান্তি বাহিনী ও পাহাড়ে সশস্ত্র সংগ্রাম এবং মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বিপ্লবী জীবন ও দর্শন (প্রকাশের পথে)

২০২৪ সালে প্রকাশিত পাহাড়ের আন্দোলন এবং অধিকারের বাস্তবতা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতার এক গুরুত্বপূর্ণ লিখিত দলিল। এর পর ২০২৫ সালে প্রকাশিত পাহাড়ের রক্তাক্ত গেরিলা যুদ্ধের ইতিহাস তাঁর জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায়কে শব্দের মধ্যে সংরক্ষণের প্রয়াস। আদিবাসী স্বীকৃতির যৌক্তিকতা ও প্রতিবন্ধকতা গ্রন্থে তিনি পরিচয় ও স্বীকৃতির প্রশ্নকে যুক্তির আলোকে দেখতে চেয়েছেন। আর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বিপ্লবী জীবন ও দর্শন নিয়ে তাঁর কাজ যেন তাঁর নিজের জীবন ও চিন্তার সঙ্গেও এক গভীর আত্মিক সংলাপ।

কারণ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা কেবল একটি নাম নন; পাহাড়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি একটি চিন্তার প্রতীক। তাঁর জীবন ও দর্শনকে ধারণ করে লিখতে গিয়ে সিন্ধু কুমার চাকমা যেন নিজের সময়কেও নতুন করে পাঠ করেন।

তাঁর লেখায় ইতিহাস শুধু অতীতের গল্প হয়ে থাকে না। ইতিহাস হয়ে ওঠে প্রশ্ন। সেই প্রশ্ন, কেন একটি জনগোষ্ঠীকে নিজের পরিচয়ের জন্য সংগ্রাম করতে হয়? কেন মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করতে হয়? কেন পাহাড়ের মানুষের অধিকার বারবার রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, একটি প্রজন্মের অভিজ্ঞতা যদি লিখে না রাখা হয়, তবে পরবর্তী প্রজন্ম কীভাবে জানবে তাদের পথের ইতিহাস? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই হয়তো তিনি লিখে চলেছেন।

তাঁর জীবনসঙ্গী সম্পর্কিত অধ্যায়ও তাঁর জীবনের ব্যক্তিগত পরিসরের অংশ। ১৯৯২ সালে তিনি ছন্দা চাঙমাকে বিবাহ করেন। পরবর্তীতে ২০০০ সালে গেভলিন চাঙমার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। গেভলিন চাঙমার গর্ভে তাঁদের একমাত্র সন্তান কাবিলের জন্ম হয়। ছন্দা চাঙমা নিঃসন্তান।

জীবনের এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। নানা অসুস্থতা, আর্থিক অনটন এবং জীবনের প্রতিকূলতা তাঁকে ঘিরে থাকলেও তাঁর কলম থেমে নেই। চাঙমা কবিতার পাণ্ডুলিপি এখনও যেন তাঁর টেবিলের ওপর অপেক্ষমাণ- প্রকাশের আলো দেখার আশায়।

এই দৃশ্যটি নিছক একজন লেখকের আর্থিক সংকটের ছবি নয়; এটি আমাদের সাহিত্য-সমাজের প্রতিও একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। যে মানুষটি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, সময়ের ইতিহাস এবং একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতিকে শব্দে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, তাঁর সৃষ্টির মূল্যায়ন ও সংরক্ষণের দায়িত্ব কার?

সিন্ধু কুমার চাকমার জীবন তাই একই সঙ্গে সংগ্রাম ও সৃষ্টির জীবন। একসময় তিনি পাহাড়ের সংঘাতময় বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে হেঁটেছেন; আজ তিনি সেই বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে হাঁটছেন সাহিত্যের পথে। একসময় তাঁর হাতে ছিল সংগ্রামের অস্ত্র; আজ তাঁর হাতে কলম। কিন্তু লক্ষ্যটির ভেতরে একটি গভীর ধারাবাহিকতা রয়েছে, মানুষের কথা বলা, ইতিহাসকে ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নিজের সময়ের সত্যটুকু পৌঁছে দেওয়া।

জীবনের শেষ প্রান্তে নয়, বরং এক নতুন সৃজনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। শরীর ক্লান্ত হতে পারে, অর্থের অভাব হতে পারে, প্রকাশনার পথ দুর্গম হতে পারে, তবু একজন সত্যিকারের লেখকের ভেতরের শব্দের নদী সহজে শুকিয়ে যায় না। সিন্ধু কুমার চাকমা সেই নদীরই একজন যাত্রী।

তাঁর কলমে পাহাড় কখনো রক্তাক্ত, কখনো সবুজ; কখনো ক্ষতবিক্ষত ইতিহাস, কখনো স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ। তাঁর কবিতায় মানুষ কথা বলে, তাঁর প্রবন্ধে ইতিহাস প্রশ্ন তোলে, আর তাঁর গ্রন্থে একটি সময় নিজের মুখ দেখতে পায়।

অতএব, সিন্ধু কুমার চাকমাকে শুধু একজন কবি বা লেখক হিসেবে দেখলে তাঁর পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি এক সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বাহক, এক সংগ্রামী জীবনের সাক্ষী এবং কলমের মাধ্যমে ইতিহাস সংরক্ষণে নিবেদিত একজন লেখক। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো একটি বই নয়, বরং তাঁর দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতাকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার এই নিরন্তর প্রয়াস। আগুন থেকে যে মানুষটি বেরিয়ে এসেছেন, তিনি আজ আলো জ্বালাতে চান শব্দ দিয়ে। আর সেই আলোর নাম- ইতিহাস, সাহিত্য ও সংগ্রামের স্মৃতি।

 

বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

ছাপামণি চাকমা: রেখার ভাঁজে স্বপ্নের আলপনা - ইনজেব চাঙমা

পাহাড়ের নীলাভ সবুজে, প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী গ্রামে আগস্ট ২০০৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন ছাপামণি চাকমা, স্নেহের ডাকনাম ছাবাক্কো পিতা শ্যামল কান্তি চাকমা এবং মাতা ঊষারাণী চাকমা। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছোট। জীবনের প্রথম প্রহরেই তাঁকে মুখোমুখি হতে হয়েছিল এক গভীর শূন্যতারমাত্র চার বছর বয়সে, ২০০৭ সালে তিনি হারান তাঁর প্রিয় পিতাকে।

শৈশবের যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবী আবর্তিত হয় বাবা-মায়ের স্নেহ, নিরাপত্তা নির্ভরতার চারপাশে, সেই বয়সেই ছাপামণির জীবনে নেমে আসে পিতৃহারা হওয়ার বেদনা। বাবার স্নেহময় হাত মাথার ওপর থেকে সরে গেলেও মায়ের ভালোবাসা, সাহস নিরলস যত্ন তাঁকে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে। পিতৃহীনতার সেই বেদনাকে হৃদয়ে ধারণ করেই তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন নিজের স্বপ্নের পৃথিবী।

বর্তমানে ছাপামণি চাকমা খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ইতিহাস তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের বিষয় হলেও শিল্প যেন তাঁর অন্তরের নিজস্ব ভাষা। ছবি আঁকা তাঁর শখ, তাঁর আনন্দ এবং অনুভূতি প্রকাশের এক নীরব মাধ্যম। রঙ রেখার সমন্বয়ে মানুষের মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান এক অন্যরকম প্রশান্তি।

ছাপামণির ছবি আঁকার গল্পটি শুরু হয়েছিল শৈশবের এক ছোট্ট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা থেকে। শিশু শ্রেণিতে পড়ার সময় নতুন বই হাতে পেয়ে বইয়ের পাতায় ছাপা ছবিগুলোর প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়। ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর মনে জন্ম নেয় নিজে ছবি আঁকার আকাঙ্ক্ষা।

একদিন যোগ-বিয়োগ শেখা শেষ করে তিনি মায়ের কাছে আবদার করলেন, একটি মানুষের ছবি এঁকে দিতে। মা স্নেহভরে তাঁর জন্য একটি মানুষের ছবি এঁকে দিলেন। ছোট্ট ছাপামণি মায়ের আঁকা সেই ছবিটির দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে রইলেন। তারপর পেন্সিল হাতে নিয়ে মায়ের আঁকা রেখাগুলো অনুসরণ করে নিজেই আঁকার চেষ্টা শুরু করলেন।

সেদিনের সেই শিশুসুলভ অনুকরণই যে একদিন তাঁর শিল্পীসত্তার প্রথম পদচিহ্ন হয়ে উঠবে, তা হয়তো তখন কেউ ভাবেনি।

পিতাকে হারানোর পর মা ঊষারাণী চাকমাই হয়ে ওঠেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। মায়ের ভালোবাসার সঙ্গে ছিল স্নেহমিশ্রিত শাসন। মা বলতেন, বেল যখন রাঙা হয়ে ডুবে যাবে, তখন পড়তে বসো।

সন্ধ্যার আকাশে যখন সূর্যের শেষ আলো পাহাড়ের গায়ে লেগে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেত, তখন মায়ের কথা মনে করে ছাপামণি বই নিয়ে বসতেন। কিন্তু পড়াশোনার ফাঁকে, অবসরে কিংবা সুযোগ পেলেই তাঁর পেন্সিল ছুটে যেত কাগজের পাতায়। কোথাও মানুষের মুখ, কোথাও কোনো অবয়ব, কোথাও শুধুই রেখার খেলা, এভাবেই অজান্তে তিনি নিজের ভেতরের শিল্পীসত্তাকে লালন করতে থাকেন।

শৈশবের সেই আঁকিবুঁকি একসময় বন্ধুদেরও নজরে আসে। সহপাঠী সঙ্গীরা তাঁর আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে নিজেদের ছবিও আঁকিয়ে নিতে চাইত। বন্ধুরা আবদার করত, আর ছাপামণি হাসিমুখে তাদের আবদার পূরণ করতেন। কারও মুখের ছবি, কারও কল্পনার অবয়ব, ছোট ছোট অনুরোধই তাঁকে আরও বেশি আঁকতে উৎসাহিত করত।

এভাবেই অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তাঁর হাতের রেখা হয়ে ওঠে দৃঢ়, চোখ হয়ে ওঠে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে অভ্যস্ত এবং মন হয়ে ওঠে শিল্পের প্রতি আরও নিবেদিত।

আজ তাঁর শৈশবের সেই ইজিবিজি আর নিছক আঁকিবুঁকি নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রেখা পেয়েছে পরিমিতি, ছায়া পেয়েছে গভীরতা, আর প্রতিকৃতিগুলো পেয়েছে জীবন্ত অভিব্যক্তি। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মানুষ, গুণী, জ্ঞানী বিশিষ্ট মানুষের মুখাবয়ব আঁকেন। একটি মুখের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব অনুভূতিকে রেখা ছায়ার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টাই তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

ছাপামণির জীবন কেবল পড়াশোনা শিল্পচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের সাংস্কৃতিক শিকড় চাঙমা সমাজের ভাষা-সাহিত্যের প্রতিও তাঁর রয়েছে গভীর অনুরাগ। সেই দায়বোধ থেকেই তিনি যুক্ত হয়েছেন চাঙমা সাহিত্য একাডেমির কর্মকাণ্ডে।

বর্তমানে তিনি চাঙমা সাহিত্য একাডেমির কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষা, সংস্কৃতি সৃজনশীলতার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার কাজে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিসত্তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

ছাপামণি চাকমার জীবনকে যদি একটি ক্যানভাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে সেখানে যেমন রয়েছে শৈশবের পিতৃবিয়োগের গভীর ছায়া, তেমনি রয়েছে মায়ের ভালোবাসার উজ্জ্বল আলো। মাত্র চার বছর বয়সে বাবাকে হারানোর যে বেদনা তাঁর শৈশবকে স্পর্শ করেছিল, তা তাঁর পথচলার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং সেই বেদনার মধ্য দিয়েই তিনি শিখেছেন জীবনের প্রতি দৃঢ় থাকতে, নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরতে।

মায়ের হাতে প্রথম আঁকা একটি মানুষের ছবি দেখে যে ছোট্ট মেয়েটির মনে ছবি আঁকার স্বপ্ন জেগেছিল, আজ সেই হাতেই ফুটে ওঠে জ্ঞানী-গুণী মানুষের মুখ। শৈশবের সেই পেন্সিল আজ তাঁর আত্মপ্রকাশের ভাষা।

ছাপামণি চাকমা তাই শুধু একজন শিক্ষার্থী নন; তিনি একজন সম্ভাবনাময় তরুণ শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং স্বপ্নবান প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের ক্যানভাসে কখনো কখনো দুঃখের গাঢ় ছায়া নেমে আসে, কিন্তু মানুষের ইচ্ছাশক্তি, ভালোবাসা সৃজনশীলতা সেই ছায়ার মধ্যেও নতুন রঙের জন্ম দিতে পারে।

একদিন যে শিশুটি মায়ের আঁকা একটি মানুষের ছবি দেখে পেন্সিল হাতে নিয়েছিল, আজ সে নিজেই মানুষের মুখে গল্প আঁকে। তার প্রতিটি রেখায় যেন শৈশবের স্মৃতি, মায়ের স্নেহ, হারানোর বেদনা আর আগামী দিনের স্বপ্ন একসঙ্গে কথা বলে।

ছাপামণির হাতে তাই শুধু পেন্সিল নেই, আছে এক টুকরো স্বপ্নের ক্যানভাস; যেখানে প্রতিটি রেখা তাঁর জীবনকে নতুন করে আঁকে, আর প্রতিটি ছবি হয়ে ওঠে তাঁর নীরব আত্মকথন।

 

বিপম চাকমা: চাঙমা কথাসাহিত্যের এক নির্মাণশিল্পী - ইনজেব চাঙমা

কিছু মানুষ পেশায় শিক্ষক, অথচ তাঁদের প্রকৃত পরিচয় ছড়িয়ে থাকে শ্রেণিকক্ষের সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে। কেউ কেউ আবার শব্দকে শুধু ভাষার বাহন হি...