সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬

তুফান চাঙমা : তুলির ভেতর পাহাড়ের আত্মকথা - ইনজেক চাাঙমা

পাহাড়কে দূর থেকে দেখলে তার সৌন্দর্যই চোখে পড়ে, সবুজের স্তরে স্তরে নেমে আসা ঢেউ, মেঘের ছায়ায় আচ্ছন্ন উপত্যকা, ঝরনার স্বচ্ছ জলধ্বনি, জুমের ঢালে মানুষের নিত্যদিনের ব্যস্ততা। কিন্তু পাহাড়ের গভীরে যে জীবন, সে জীবন কেবল দৃশ্যের নয়; তার আছে দীর্ঘ ইতিহাস, আছে হারানোর বেদনা, আছে সংস্কৃতির উত্তরাধিকার, আছে শেকড় আঁকড়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। সেই জীবনকে কেবল চোখে দেখা যায় না, তাকে অনুভব করতে হয় হৃদয়ের অন্তর্গত কোনো গোপন প্রদেশে।

আর যখন কোনো শিল্পীর তুলিতে সেই অনুভব রঙ ও রেখার ভাষা পায়, তখন ক্যানভাস আর নিছক ক্যানভাস থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি জনপদের স্মৃতি, একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়, ইতিহাসের নীরব দলিল এবং অস্তিত্বের এক গভীর উচ্চারণ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জীবনগাথাকে শিল্পের ভাষায় দেশে-বিদেশে প্রথম সুদূর বিস্তারে তুলে ধরার পথিকৃৎ চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ান। তাঁর পরবর্তী প্রজন্মে সেই শিল্প-ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হয়ে, কিন্তু নিজের স্বতন্ত্র ভাষা ও সময়ের আধুনিক প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে, এগিয়ে চলেছেন তরুণ শিল্পী তুফান চাঙমা। তাঁর তুলিতে পাহাড় কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ নয়; পাহাড় সেখানে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, আনন্দ-বেদনা এবং না-বলা কথার এক দীর্ঘ কাব্য।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালার উদাল বাগান, পাহাড়ের বুকের সেই ছোট্ট জনপদেই তুফান চাঙমার শৈশবের প্রথম আলো ফুটেছিল। পিতা অশ্বথামা চাকমা, মাতা শোভারাণী চাকমা। জন্ম ১৭ জুলাই ১৯৯৬ খ্রি.। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছোট; বড় ভাই কনিস্ক চাকমা।

শৈশবের চারপাশে যে প্রকৃতি, যে মানুষ, যে জীবনযাপন, যে সংস্কৃতি তাঁকে ঘিরে ছিল, তা-ই অজান্তে তাঁর শিল্পীসত্তার ভিত নির্মাণ করেছিল। পাহাড়ের গ্রাম তাঁর কাছে কোনো দূরবর্তী দৃশ্য ছিল না; ছিল তাঁর নিজের জীবন। জুমের ঢাল, মজা ঘর, মানুষের মুখ, উৎসবের রঙ, পোশাকের বুনন, পাহাড়ি জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ, সবকিছুই ধীরে ধীরে তাঁর অন্তর্লোকে জমা হতে থাকে স্মৃতির অমোচনীয় রেখায়।

প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ তিনি নেন উদাল বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে উদাল বাগান উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ শেষ করেন। জীবনের পরবর্তী অধ্যায় তাঁকে নিয়ে যায় বৃহত্তর শিক্ষাজগতের দিকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক অধ্যয়ন তাঁর চিন্তার জগতকে আরও প্রসারিত করে।

তারপর যেন তাঁর যাত্রাপথের দিগন্ত আরও দূরে সরে যায়। ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপের অধীনে ২০২৪–২৬ সেশনে তিনি উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেন ইউরোপের তিনটি প্রতিষ্ঠানে, বেলজিয়ামের লুকা স্কুল অব আর্টস, ফিনল্যান্ডের আলটো ইউনিভার্সিটি এবং পর্তুগালের লুসোফোনা ইউনিভার্সিটিতে। উদাল বাগানের পাহাড়ি গ্রাম থেকে ইউরোপের শিল্পশিক্ষার আন্তর্জাতিক পরিসর, এই পথচলা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে, শেকড়ের গভীরে দাঁড়িয়েও দিগন্তের দিকে তাকানো যায়।

তুফানের শিল্পীজীবনের প্রথম প্রেরণা এসেছিল প্রকৃতি থেকে। ছোট্ট তুফানের তুলিতে বারবার ফিরে এসেছে পাহাড়ি গ্রামের পরিচিত রূপ, মানুষের জীবন, রীতি ও সংস্কৃতির সরল সৌন্দর্য। কিন্তু শিল্পী যত পরিণত হয়েছেন, তাঁর দৃষ্টিও তত গভীর হয়েছে।

প্রকৃতির বাহ্যিক সৌন্দর্য থেকে তাঁর শিল্প ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে মানুষের অন্তর্জীবনে। এখন তাঁর ছবিতে শুধু পাহাড়ের সবুজ নেই; আছে পাহাড়ের মানুষের ইতিহাস। শুধু ঝরনার জলধারা নেই; আছে অশ্রুর অদৃশ্য ধারা। শুধু উৎসবের রঙ নেই; আছে বঞ্চনার বিবর্ণতা। শুধু সংস্কৃতির নান্দনিক প্রকাশ নেই; আছে সেই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামও।

তাঁর ক্যানভাসে চাকমা সংস্কৃতি, ইতিহাস, সংগ্রাম ও ঐতিহ্য যেন নতুন করে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। মানুষের পোশাক, জীবনাচার, সামাজিক সম্পর্ক, উৎসব, শ্রম, বিশ্বাস ও দৈনন্দিনতার মধ্য দিয়ে তিনি নির্মাণ করেন পাহাড়ের এক বহুমাত্রিক জীবনচিত্র।

কিন্তু তাঁর শিল্পের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত সেখানে, যেখানে সৌন্দর্যের আড়াল ভেদ করে উঠে আসে অপ্রিয় বাস্তবতা। পাহাড়ি মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, বঞ্চনা, হতাশা ও না-বলা কষ্ট তাঁর ছবিতে কখনো সরাসরি, কখনো প্রতীকের আড়ালে কথা বলে। যে কথাগুলো উচ্চারণ করার মতো কণ্ঠ অনেক সময় পাওয়া যায় না, তাঁর তুলিই যেন সেসব কথার ভাষা হয়ে ওঠে। তাই তুফানের ছবি দেখা মানে কেবল ছবি দেখা নয়; কখনো কখনো তা একটি নীরব মানুষের মুখোমুখি দাঁড়ানো।

তুফান চাঙমার শিল্পদর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গভীর উপলব্ধি—“আমাদের নিয়ে কথা বলার মানুষ নেই।” এই উপলব্ধি নিছক আক্ষেপ নয়; বরং তাঁর শিল্পীজীবনের এক নৈতিক ভিত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার উদ্দেশ্যে যখন তিনি বৃহত্তর সমাজে প্রবেশ করলেন, ছবি আঁকার মাধ্যমে যখন তাঁর পরিচিতি বাড়তে লাগল, তখন তাঁর মনে জন্ম নিল এক নতুন দায়িত্ববোধ। তিনি উপলব্ধি করলেন, তাঁর হাতে এমন একটি ভাষা আছে যা শব্দের সীমা অতিক্রম করতে পারে। সেই ভাষা হলো ছবি।

তিনি ভাবলেন, যদি তাঁর কণ্ঠস্বর দিয়ে সব কথা বলা সম্ভব না হয়, তবে তাঁর তুলিই কথা বলুক। যদি তাঁর জনগোষ্ঠীর জীবনকে অনেকে দেখতে না চায়, তবে তিনি সেই জীবনকে ক্যানভাসে দৃশ্যমান করে তুলবেন। যদি ইতিহাসের কিছু অধ্যায় নীরবতার অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকে, তবে রঙ ও রেখার মধ্য দিয়ে তিনি সেই নীরবতার দরজা খুলবেন। এই জায়গাতেই তুফান একজন সাধারণ চিত্রকর থেকে শিল্পী হয়ে ওঠেন। কারণ শিল্পী শুধু সৌন্দর্য আঁকেন না; তিনি সময়কেও আঁকেন। তিনি মানুষের হাসির পাশাপাশি কান্নার রেখাও পড়েন। তিনি দৃশ্যমানের পাশাপাশি অদৃশ্যকেও দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেন।

২০১৪ সালে পরিকল্পিতভাবে ফেসবুকে যুক্ত হন তুফান। প্রথম দিকে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকেই নিজের আঁকা ছবি প্রকাশ করতেন। কিন্তু শিল্পকে আরও বিস্তৃত পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে নতুন পথে নিয়ে যায়। বন্ধুদের পরামর্শে ২০২০ সালে তিনি তৈরি করেন ‘Tufan’s Artbin’ নামের একটি পেইজ। সেখান থেকেই তাঁর শিল্পযাত্রা যেন পেল নতুন এক জানালা। পাহাড়ের একটি ছোট্ট গ্রামে বসে আঁকা ছবি মুহূর্তেই পৌঁছে যেতে লাগল বহুদূরের মানুষের কাছে। এ যেন প্রযুক্তির সঙ্গে শেকড়ের এক অভিনব সংলাপ।

যে পাহাড় বহুদিন ধরে মূলধারার চোখে কখনো রহস্য, কখনো পর্যটনের দৃশ্য, কখনো রাজনৈতিক বিতর্কের ভূগোল হিসেবে উপস্থিত হয়েছে, তুফান সেই পাহাড়কে মানুষের জীবন দিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতে চান। তিনি চান, পাহাড়কে শুধু দেখা নয়—বোঝা হোক।

সময়ের সঙ্গে শিল্পের মাধ্যমও বদলায়। তুফান সেই পরিবর্তনকে ভয় পাননি। বরং প্রযুক্তিকে তিনি নিজের সংস্কৃতির নতুন বাহন করে নিয়েছেন। টিউশনির অর্থ সঞ্চয় করে কেনা আইপ্যাড তাঁর কাছে নিছক একটি প্রযুক্তি-যন্ত্র নয়। এটি যেন তাঁর হাতে উঠে আসা নতুন এক ক্যানভাস, যার সীমানা কাগজের চার প্রান্তে আবদ্ধ নয়। ডিজিটাল শিল্পের মাধ্যমে তিনি পাহাড়ের জীবনকে নতুন নান্দনিকতায় তুলে ধরছেন। আধুনিক প্রযুক্তির ভাষায় তিনি কথা বলছেন প্রাচীন সংস্কৃতির। বিশ্বায়নের যুগে দাঁড়িয়ে নিজের শেকড়ের গল্প বলছেন পৃথিবীর মানুষের কাছে।

এখানে তাঁর শিল্পের একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে, তিনি আধুনিকতাকে গ্রহণ করেছেন, কিন্তু নিজের পরিচয়কে বিসর্জন দিয়ে নয়। বরং আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছেন নিজের পরিচয়কে আরও সুদূরে পৌঁছে দিতে।

তুফানের ছবি কখনো কখনো পাহাড়ের এক ধরনের বিকল্প ইতিহাস হয়ে ওঠে। যে ইতিহাস বইয়ের পাতায় সম্পূর্ণ লেখা নেই, যে মানুষের জীবন সংবাদপত্রের শিরোনামে খুব কম আসে, যে বেদনার গল্প অনেক সময় জনপরিসরের আলোচনায় স্থান পায় না, তাঁর শিল্প সেখানে সাক্ষ্য দেয়।

তিনি পাহাড়ের মানুষকে কেবল ‘প্রকৃতির সন্তান’ হিসেবে দেখান না; তিনি তাঁদের ইতিহাসের মানুষ হিসেবে দেখেন। তাঁদের আছে স্মৃতি, স্বপ্ন, হারানোর বেদনা, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা। এই কারণে তাঁর শিল্পে পাহাড় কখনো নিস্তব্ধ নয়। তার সবুজের ভেতরে কথা আছে, নদীর স্রোতে কথা আছে, মানুষের চোখে কথা আছে, পোশাকের বুননে কথা আছে, উৎসবের রঙে কথা আছে, আছে সুদীর্ঘ পাহাড়ের সংগ্রামে কথা এমনকি নীরবতার মধ্যেও আছে দীর্ঘ এক আর্তনাদ। তুফান সেই আর্তনাদ শুনতে পান। তারপর তা রঙে অনুবাদ করেন।

তুফান চাঙমার শিল্পীসত্তার স্বীকৃতি এসেছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পরিসর থেকে। ২০২৩ সালে তিনি অর্জন করেন Minority Artist Award। ২০২৪ সালে লাভ করেন OHCHR Prince Claus Seed Award। পুরস্কার শিল্পীর পথচলার শেষ কথা নয়। কিন্তু কখনো কখনো পুরস্কার হয়ে ওঠে সেই কণ্ঠস্বরের স্বীকৃতি, যা দীর্ঘদিন বৃহত্তর সমাজের কানে পৌঁছায়নি। তুফানের ক্ষেত্রে এসব স্বীকৃতি তাই ব্যক্তিগত অর্জনের সীমানা অতিক্রম করে পাহাড়ের সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে বৃহত্তর পরিসরে দৃশ্যমান করার প্রয়াসেরও স্বীকৃতি হয়ে ওঠে।

তুফান চাঙমার স্বপ্ন কেবল নিজের শিল্পীজীবনের সাফল্যে থেমে নেই। তাঁর আকাঙ্ক্ষা আরও বৃহৎ দেশের সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে পাহাড়ের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনকে পরিচিত করে তোলা। তিনি চান না তাঁর সংস্কৃতি কারও কাছে অজানা থেকে যাক। চান না পাহাড়ের মানুষ বিশ্বের কাছে অদেখা, অনুচ্চারিত কিংবা উপেক্ষিত হয়ে থাকুক। তাঁর এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নতুন প্রজন্মের প্রতি এক গভীর দায়বোধ। তিনি তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিতে চান- আধুনিক হও, কিন্তু শেকড়হীন হয়ো না; পৃথিবীকে জানো, কিন্তু নিজেকে ভুলে নয়; সংকীর্ণতার দেয়াল ভাঙো, কিন্তু নিজের ইতিহাসকে মুছে দিয়ে নয়। কারণ শেকড় শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; শেকড়ই ভবিষ্যতের শক্তি।

চুণীলাল দেওয়ানের তুলিতে যে জুম্ম জীবনগাথা শিল্পের ভাষায় দেশে-বিদেশে পরিচিতির পথ পেয়েছিল, তুফান চাঙমার শিল্পে তারই এক নতুন উত্তরযাত্রা লক্ষ করা যায়। তবে এই উত্তরাধিকার অনুকরণের নয়। বরং সময়ের সঙ্গে ভাষা বদলে যাওয়ার উত্তরাধিকার। চুণীলালের ক্যানভাসের পর যে পৃথিবী বদলেছে, সেই পরিবর্তিত পৃথিবীতে তুফান ডিজিটাল প্রযুক্তি, সমকালীন শিল্পচিন্তা ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ের গল্প বলছেন নতুন ভাষায়।

একসময় পাহাড়ের কথা পৌঁছাতে সময় লাগত; এখন একটি ডিজিটাল ছবির মাধ্যমে তা মুহূর্তে পৌঁছে যেতে পারে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তুফান সেই সম্ভাবনাকে নিজের সংস্কৃতির জন্য কাজে লাগাচ্ছেন। তাই তাঁর শিল্পে আমরা একই সঙ্গে দেখি অতীতের শেকড় এবং ভবিষ্যতের দিগন্ত।

একজন সত্যিকারের শিল্পী কখনো একা ছবি আঁকেন না। তাঁর সঙ্গে আঁকে তাঁর সময়, তাঁর সমাজ, তাঁর স্মৃতি এবং তাঁর মানুষের জীবন। তুফান চাঙমার ক্ষেত্রেও তাই। উদাল বাগানের মাটি থেকে উঠে আসা এই তরুণ শিল্পী আজ তাঁর ক্যানভাসে ধারণ করছেন পাহাড়ের এক বিস্তৃত জীবনভুবন। তাঁর ছবিতে যেমন আছে পাহাড়ের সৌন্দর্য, তেমনি আছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস; যেমন আছে সংস্কৃতির রঙ, তেমনি আছে ইতিহাসের ক্ষত; যেমন আছে উৎসবের উচ্ছ্বাস, তেমনি আছে বঞ্চনার বিষণ্ন ছায়া। তাঁর তুলির রেখা তাই কেবল রেখা নয়, এ যেন স্মৃতির অক্ষর। তাঁর রঙ কেবল রঙ নয়, এ যেন একটি জনগোষ্ঠীর অনুভূতির রক্তমাংস। তাঁর ক্যানভাস কেবল ক্যানভাস নয়, এ যেন পাহাড়ের মানুষের এক নীরব আত্মজীবনী।

তুফান জানেন, সব কথা মুখে বলা যায় না। কিছু কথা রঙে বলতে হয়, কিছু কথা রেখায়, কিছু কথা নীরবতায়। তাই তিনি নিজের শিল্পকে করেছেন তাঁর মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর স্বপ্ন, পাহাড়ের গল্প পাহাড়ের গণ্ডি পেরিয়ে পৃথিবীর কাছে পৌঁছাক; তাঁর সংস্কৃতি অদেখা না থাকুক; তাঁর ইতিহাস বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে না যাক। আর নতুন প্রজন্মের প্রতি তাঁর যে আহ্বান, নিজের শেকড়কে ভুলে যেও না; তা কেবল একটি প্রজন্মের জন্য নয়, প্রতিটি সংস্কৃতির জন্যই এক চিরন্তন সত্য।

মানুষ যত দূরেই যাক, যত বড় পৃথিবীই জয় করুক, শেষ পর্যন্ত তার পরিচয়ের প্রথম আলো জ্বলে থাকে সেই মাটিতেই, যেখানে তার শৈশবের প্রথম পদচিহ্ন পড়েছিল। তুফান চাঙমা সেই মাটিকে সঙ্গে নিয়েই বিশ্বপথে হাঁটছেন। তাঁর হাতে তুলি, আর সেই তুলির ডগায় যেন ধীরে ধীরে লেখা হয়ে চলেছে পাহাড়ের আত্মকথা।

 

এসএসসি ফলাফল পাহাড়ের দীর্ঘশ্বাস - ইনজেব চাঙমা

 

আজ ১০ আগস্ট ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি হয়তো আর দশটি দিনের মতোই। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের কাছে আজকের দিনটি যেন দুটি ভিন্ন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমাদের, একটিতে দেখা যাচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল, অন্যটিতে সাজেক কলেজ প্রতিষ্ঠার অনিশ্চয়তা। একটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষত দেখাচ্ছে, অন্যটি সেই ক্ষতের গভীরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাস।
 
দুটি ঘটনা আলাদা নয়। একই সুতোয় বাঁধা। একটির নাম শিক্ষাবঞ্চনা, অন্যটির নাম অধিকারবঞ্চনা। এসএসসি-২০২৬-এর ফলাফল যেন পাহাড়ের আকাশে হঠাৎ নেমে আসা এক বিষণ্ন মেঘ।
খাগড়াছড়িতে পাসের হার মাত্র ৩৪.৯৯ শতাংশ; গত বছর ছিল ৬০.৭৭ শতাংশ। রাঙামাটিতে ৪১.১৭ শতাংশ, গত বছর ৫৬.৫৫ শতাংশ। বান্দরবানে ৪৭.৮৮ শতাংশ, গত বছর ছিল ৬৩.১২ শতাংশ। খাগড়াছড়ির তিনটি বিদ্যালয়ে পাসের হার শূন্য।
 
এই শূন্যের দিকে তাকালে কেবল পরীক্ষার খাতা দেখা যায় না; দেখা যায় কতগুলো শিশুর থমকে যাওয়া স্বপ্ন, কত মায়ের নীরব দীর্ঘশ্বাস, কত বাবার অসহায় মুখ, কত দূর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীর ক্লান্ত পা। একটি ফলাফল কখনো কেবল একটি সংখ্যা নয়। সংখ্যার পেছনে থাকে মানুষের জীবন।
 
গত ২৫ আগস্ট ২০২৩ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছিল—“খাগড়াছড়িতে শিক্ষক সংকটে মাধ্যমিকের পাঠদান ব্যাহত”। তিন বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু পাহাড়ের বিদ্যালয়ের সেই দীর্ঘশ্বাস কি থেমেছে? সম্প্রতি রিঝেংচির ফেসবুক লাইভে সাজেকের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে চিত্র উঠে এসেছে, সেটিও যেন সেই পুরোনো প্রশ্নেরই নতুন প্রতিধ্বনি। বিদ্যালয় আছে, শিশুরা আছে, বই আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। বর্গা শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান। কী অদ্ভুত আমাদের রাষ্ট্রচিত্র!
 
যে শিশুটিকে আমরা ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বলি, তার বিদ্যালয়েই যদি ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর না থাকে, তবে সেই ভবিষ্যৎ আমরা কোথায় তৈরি করছি? পাহাড়ের শিশুটি জন্মের পর প্রথম যে শব্দটি শোনে, তা বাংলা নয়। তার মায়ের মুখে যে ভাষা, তার দাদির গল্পে যে ভাষা, তার পাহাড়-জঙ্গল-নদীর সঙ্গে যে ভাষার সম্পর্ক—বিদ্যালয়ের দরজায় পা রাখার পর সেই ভাষা অনেক সময় হঠাৎ অচেনা হয়ে যায়।
 
পাহাড়ে বহু ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। জুম্ম জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা নয়। অথচ শিশুটিকে শিক্ষার প্রথম সিঁড়িতেই এমন একটি ভাষার মুখোমুখি হতে হয়, যা তার ঘরের ভাষা নয়। শিশুর কাছে বিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল তার পৃথিবীকে বড় করে দেখার জানালা। অথচ ভাষার অমিল কখনো কখনো সেই জানালার কাচেই কুয়াশা জমিয়ে দেয়।
 
মাতৃভাষা কেবল কথার বাহন নয়; মাতৃভাষা মানুষের প্রথম চিন্তা, প্রথম স্বপ্ন, প্রথম কান্না, প্রথম আনন্দ। একটি শিশুর চিন্তার ভাষাকে পাশ কাটিয়ে তার মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো কি সম্ভব? তাই পাহাড়ের শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের কথা বলতে গেলে মাতৃভাষার প্রশ্নকে পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই।
শিক্ষক কেবল একটি চাকরির পদ নয়। একজন শিক্ষক একটি প্রজন্মের নির্মাতা। কিন্তু সেই শিক্ষক নিয়োগের পথ যদি অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা অর্থের কাছে বন্দী হয়ে যায়, তবে তার অভিঘাত শুধু একটি নিয়োগে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়ে একটি শিশুর ভবিষ্যতের ওপর, বাংলাদেশের ওপর।
 
পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ ও প্রশ্ন রয়েছে। লাখ লাখ টাকার ঘুষের অভিযোগ যদি সমাজে কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে পড়ে, তবে সেটি শুধু দুর্নীতির গল্প নয়, এটি একটি সমাজের নৈতিক বিপর্যয়ের গল্প। যে অর্থ দিয়ে একজন শিক্ষক কেনা হয়, তার মূল্য পরিশোধ করে একটি প্রজন্ম। আর যে শিক্ষক যোগ্যতার বদলে অর্থের বিনিময়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তার হাতে বই থাকলেও শিক্ষার আলো কতটা থাকে, সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কার্যকারিতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধান, শ্রদ্ধেয় জ্যোতিরেন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) আঞ্চলিক পরিষদকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অথর্ব ও অকার্যকর করে রাখার অভিযোগ করেছেন।
 
রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে কেউ এটিকে গ্রহণ করতে পারেন, কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, যে প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য তৈরি, সেগুলো যদি মানুষের কাছে অর্থবহ না হয়, তবে মানুষ যাবে কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় সাজেকে। সাজেক—পাহাড়ের বুকের ওপর বিস্তৃত এক জনপদ। সেখানে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের বসবাস। অথচ সেই জনপদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নই আজ বিরোধ, মামলা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে।
 
কলেজের জায়গা নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে। আইনি প্রশ্ন থাকতে পারে। বন বিভাগের দায়িত্ব ও আইনও আছে। এসব প্রশ্নের সমাধান আইন ও আলোচনার পথেই হওয়া উচিত। কিন্তু সেই সব প্রশ্নের মাঝখানে যে প্রশ্নটি কি আমরা শুনছি?
 
আজ সকালে স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা সেখানে গেলে বাবু চাকমা যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, সেগুলো শুধু তাঁর একার প্রশ্ন নয়। এগুলো সাজেকের বহু মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা প্রশ্ন। সাজেকের মানুষ কলেজ চাইলে তাদের অপরাধ কোথায়? তাদের সন্তানও তো এই দেশের সন্তান। তাদেরও তো স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে। ঘরের ভাত খেইয়ে তাদেরও তো একজন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন থাকতে পারে, একজন শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন থাকতে পারে, একজন প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন থাকতে পারে, কিংবা বই হাতে নিয়ে নিজের সমাজের গল্প পৃথিবীকে বলার স্বপ্ন থাকতে পারে।
 
তবে কলেজের দরজা যদি তাদের নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে স্বপ্নের দরজাও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
সাজেকের বর্তমানকে বুঝতে হলে অতীতের দিকে তাকাতেই হবে। কাপ্তাই বাঁধের জল যখন মানুষের ঘর, জমি ও স্মৃতির ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল, তখন বহু জুম্ম পরিবার তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ভূমি হারানো ও বসতি সংকটের এবং পার্বত্য চট্টগ্রামর বাঙ্গালিদের পাহাড়ী বা জুম্মদের জায়গায় পূর্ণবাসন করার বাস্তবতায় বহু মানুষ পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেে সাজেকে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে।
 
তাই বাবু ধন চাকমার প্রশ্নটি নিছক আবেগের প্রশ্ন নয়, “আমরা যদি আমাদের পূর্বপুরুষের জায়গা ফিরে পায় বা কাপ্তায় বাঁধ খুলে দাও আমি আমার জায়গাতে চলে যাব।"
 
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল প্রশাসনিক ফাইলে লেখা যাবে না। এর উত্তর খুঁজতে হবে ইতিহাসের পাতায়, মানুষের স্মৃতিতে এবং রাষ্ট্রের নীতিতে। মানুষ তার হারানো ভূমির কথা ভুলে যায় না। নদী যেমন তার পুরোনো পথ মনে রাখে, মানুষও তেমনি মনে রাখে তার পূর্বপুরুষের ভিটা।
 
শিক্ষা দয়া নয়। শিক্ষা অনুগ্রহ নয়। শিক্ষা কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রের উপহারও নয়। শিক্ষা হলো মানুষের অধিকার। সাজেকের শিশুর অধিকার যেমন, ঢাকার শিশুর অধিকারও তেমন। সমতলের শিশুর হাতে বই থাকলে পাহাড়ের শিশুর হাতেও বই থাকার কথা, মাতৃভাষায় বই। শহরের সন্তান কলেজে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারলে পাহাড়ের সন্তানও সেই স্বপ্ন দেখবে—এটাই স্বাভাবিক।
 
অস্বাভাবিক হলো, একটি শিশুকে তার ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে রাখা। এই জায়গাতেই এসে প্রশ্নটি আবার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দিকে ফিরে যায়। পাহাড়ের সংকট কেবল বিদ্যালয় বানিয়ে সমাধান হবে না। কেবল শিক্ষক নিয়োগ করেও হবে না। কেবল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেও হবে না। ভূমি, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, নিরাপত্তা, উন্নয়ন—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
যে সমাজে ভূমির প্রশ্ন অমীমাংসিত, সেখানে মানুষের মনে স্থিরতা আসে না। যে সমাজে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কার্যকর নয়, সেখানে মানুষের আস্থা জন্মায় না। যে সমাজে মাতৃভাষা শিক্ষার যথাযথ মর্যাদা পায় না, সেখানে শিক্ষার আলোও সম্পূর্ণভাবে পৌঁছায় না।
 
তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ ও কার্যকর বাস্তবায়ন শুধু রাজনৈতিক দাবি নয়; এটি পাহাড়ে একটি স্থিতিশীল, আস্থাপূর্ণ ও মানবিক পরিবেশ নির্মাণের অন্যতম পূর্বশর্ত।
 
আজকের এসএসসি ফলাফল আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় আমরা দেখেছি পাহাড়ের শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর মুখ। সাজেক কলেজের অনিশ্চয়তা আমাদের সামনে আরেকটি আয়না ধরেছে। সেখানে আমরা দেখেছি মানুষের অধিকার কত সহজে প্রশাসনিক জটিলতা, বিরোধ ও অনিশ্চয়তার ভেতর হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু পাহাড়ের শিশুরা তো কোনো সংখ্যা নয়। ৩৪.৯৯ শতাংশ, ৪১.১৭ শতাংশ, ৪৭.৮৮ শতাংশ—এই সংখ্যাগুলোর পেছনে আছে হাজারো মুখ। আছে তাদের স্বপ্ন। আছে মায়ের আশা। আছে বাবার কষ্ট। আছে একটি পাহাড়ের ভবিষ্যৎ। তাই আজ আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন তারা ফেল করল—শুধু এই প্রশ্ন নয়; কেন তাদের এত কম সুযোগ দেওয়া হলো, সেই প্রশ্নও করতে হবে।
 
কেন সাজেকে কলেজ নেই—শুধু সেই প্রশ্ন নয়; কেন একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্যও পাহাড়ের মানুষকে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, সেই প্রশ্নও করতে হবে।
 
পাহাড়ের শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া কোনো দয়া নয়। সাজেকের সন্তানকে কলেজে পড়ার সুযোগ দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়। মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এসবই মানুষের অধিকার। আর যে রাষ্ট্র তার প্রত্যন্ততম শিশুটির চোখের স্বপ্নটুকুও রক্ষা করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই সত্যিকার অর্থে সভ্য।
 
আজ পাহাড় আমাদের কাছে সেই সভ্যতারই পরীক্ষা নিচ্ছে। এসএসসির ফলাফল সেই পরীক্ষার খাতা খুলে দিয়েছে। তাই আজ আর একটি প্রশ্ন—
আমরা কি পাহাড়ের সন্তানদের জন্য সমান ভবিষ্যৎ লিখতে প্রস্তুত?

রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬

পাহাড়ের বুক থেকে ভাষার অক্ষরে: শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যযাত্রা - ইনজেব চাঙমা

পাহাড় কখনো শুধু পাহাড় নয়। তার গায়ে লেগে থাকে মেঘের ছায়া, বৃষ্টির গন্ধ, ঝরনার গান আর অরণ্যের নীরবতা। তার ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকে মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎকে নিয়ে একরাশ স্বপ্ন। পাহাড়ের মানুষ তাই প্রকৃতির সঙ্গে শুধু বসবাস করে না—প্রকৃতির সঙ্গে তার আত্মারও এক গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

সেই পাহাড়ি জীবন, মানুষের অনুভব, মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের গল্পকে শব্দের শরীরে ধারণ করে চলেছেন শান্তি জীবন চাকমা। শিক্ষকতা তাঁর পেশা, কিন্তু সাহিত্য তাঁর অন্তর্গত জীবন। ভাষা ও বর্ণমালা তাঁর কাছে শুধু লেখার উপকরণ নয়; এগুলো তাঁর অস্তিত্বের শিকড়। আর সেই শিকড়কে আঁকড়ে ধরেই তিনি এগিয়ে চলেছেন একজন শিক্ষক, কবি, সাহিত্যকর্মী, সম্পাদক ও ভাষা-সংস্কৃতির নিবেদিত কর্মী হিসেবে।

তাঁর সাহিত্যযাত্রা তাই কেবল নিজের জন্য লেখার গল্প নয়; এটি একটি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার, একটি সংস্কৃতির স্মৃতি ধরে রাখার এবং আগামী প্রজন্মকে নিজের পরিচয়ের কাছে ফিরিয়ে আনার এক নীরব অথচ গভীর প্রয়াস।

শান্তি জীবন চাকমার ডাকনাম ধনহ/মরদ চ। ১৯৯২ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাঙামাটি জেলার সাজেকের তালছড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা যতিন বিকাশ চাকমা, মাতা স্নেহপদি চাকমা। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়; তাঁর বোন সাধনা চাকমা।

সাজেকের পাহাড়, অরণ্য, ঝরনা, মেঘ আর মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন তাঁর শৈশবকে ঘিরে রেখেছিল। প্রকৃতির সেই নিবিড় সান্নিধ্য হয়তো তখন তাঁকে কোনো সাহিত্যিক স্বপ্ন দেখায়নি; কিন্তু অজান্তেই তা তাঁর ভেতরে বুনে দিয়েছিল অনুভবের এক গভীর বীজ।

পাহাড়ের পথ, মানুষের মুখ, লোকজ জীবন, উৎসব, বিশ্বাস, ভাষা, সবকিছুই ধীরে ধীরে তাঁর স্মৃতির ভাণ্ডারে জমা হতে থাকে। পরবর্তীকালে সেই স্মৃতি ও অনুভবই তাঁর সাহিত্যিক সত্তার নানা রূপে ফিরে এসেছে।

তাঁর কাছে পাহাড় কোনো পোস্টকার্ডের দৃশ্য নয়। পাহাড় মানে মানুষ। পাহাড় মানে স্মৃতি। পাহাড় মানে নিজের শিকড়। আর সেই শিকড় থেকেই তাঁর শব্দের জন্ম।

শান্তি জীবন চাকমার শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে দিঘীনালা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ২০০৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। পরে দিঘীনালা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি ও বি.এস.এস. ডিগ্রি অর্জন করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁকে দিয়েছে জ্ঞানের ভিত্তি; কিন্তু পাহাড়ি সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক দিয়েছে জীবনকে অন্য চোখে দেখার ক্ষমতা। বইয়ের শিক্ষা আর জীবনের শিক্ষা—এই দুইয়ের মিলনেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে তাঁর সাহিত্যিক মনন।

তাই তাঁর লেখায় কেবল কল্পনা নেই; আছে বাস্তব জীবনের স্পর্শ। আছে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিজের ভাষার প্রতি মমতা এবং নিজের সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ।

বর্তমানে শান্তি জীবন চাকমা তারাবনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তাঁর কাছে শিক্ষকতা নিছক জীবিকা নয়; এটি মানুষ গড়ার এক দায়িত্ব। শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান পৌঁছে দিতে চান না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস, সৃজনশীল চিন্তা এবং নিজের ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি করাও তাঁর শিক্ষাদর্শনের অংশ।

তিনি বিশ্বাস করেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু পরীক্ষার ফলাফলে নির্ধারিত হয় না। ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় নতুন প্রজন্ম নিজের ভাষাকে কতটা ভালোবাসে, নিজের ইতিহাসকে কতটা জানে এবং নিজের সংস্কৃতিকে কতটা ধারণ করে, তার ওপরও। এই বিশ্বাসই তাঁকে শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্য ও ভাষা-সংস্কৃতির কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রেখেছে।

শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যচর্চা বহুমাত্রিক। কবিতা তাঁর অন্যতম প্রধান আশ্রয়। কখনো প্রেম, কখনো প্রকৃতি, কখনো মানুষের অনুভূতি, কখনো সমাজ ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন, বিভিন্ন অনুভব তাঁর সৃষ্টির ভেতর জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর সাহিত্যিক সৃষ্টির পরিমাণও বিস্ময়কর। বর্তমানে তাঁর অপ্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪৫ টি। কবিতা, ছড়া, কাব্য, ছোটগল্প, রূপকথা, নাটক, নাটিকা, প্রবন্ধ, অণুকাব্য, শিশুতোষ সাহিত্য, বাগধারা, লোকগান, ধর্মীয় গাথা—সাহিত্যের নানা শাখায় ছড়িয়ে আছে তাঁর সৃষ্টির পরিসর।

একজন লেখকের জন্য এত বিপুল সংখ্যক পাণ্ডুলিপি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়। এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর লেখার অভ্যাস, ভাবনার সঙ্গে লড়াই, শব্দ খোঁজা এবং নিজের ভেতরের কথাকে কাগজে ধরে রাখার নিরন্তর সাধনা। এইসব লেখা এখনো পাঠকের হাতে পৌঁছায়নি। তবু তারা তাঁর সাহিত্যিক জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।

শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যিক পরিচয়ে ‘পুগবেল’ ও ‘আবেদি’ দুটি যৌথ কাব্যগ্রন্থ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য কখনো একাকী পথচলা হলেও তার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি হলো সম্মিলিত সৃজন। একাধিক কবির অনুভূতি, জীবনবোধ ও কল্পনা যখন একই মলাটের নিচে এসে মিলিত হয়, তখন তৈরি হয় এক ভিন্নতর সাহিত্যিক পরিসর। ‘পুগবেল’ ও ‘আবেদি’ সেই সম্মিলিত সৃজনেরই পরিচায়ক। এই দুটি কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে শান্তি জীবন চাকমার কবিসত্তা বৃহত্তর সাহিত্যিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এখানে কবিতা শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির ভাষা নয়; হয়ে উঠেছে সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধেরও প্রকাশ।

একজন লেখকের কাছে ভাষা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন জাতিসত্তার মানুষের কাছে মাতৃভাষা তার চেয়েও বেশি কিছু, এটি অস্তিত্বের অংশ। শান্তি জীবন চাকমা চাকমা ভাষা ও বর্ণমালাকে সেই গভীর অনুভবের জায়গা থেকেই দেখেন। তাঁর কাছে ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়; এতে জমা থাকে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, লোকজ জ্ঞান, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়।

এই দায়বোধ থেকেই তিনি চাকমা বর্ণমালা ও ভাষা শিক্ষা কোর্স পরিচালনা করছেন। পাঠচক্র পরিচালনার মাধ্যমেও শিশু-কিশোর ও তরুণদের বই পড়া, সাহিত্যচর্চা এবং মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করছেন। কারণ তিনি জানেন, একটি ভাষা শুধু অভিধানে বেঁচে থাকে না। ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের মুখে, শিশুর খাতায়, কবিতার পঙ্‌ক্তিতে, গল্পের চরিত্রে, গান ও নাটকে। ভাষা বেঁচে থাকে যখন একটি প্রজন্ম তা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়।

নিজে লেখার পাশাপাশি অন্যদের লেখার জন্যও জায়গা তৈরি করছেন শান্তি জীবন চাকমা। বর্তমানে তিনি চাঙমা সাহিত্য একাডেমির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি চাঙমা সাহিত্য পত্রিকা ‘চাদি’ এবং চাঙমা সংবাদপত্র ‘হিলর পচ্জন’-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন।

সম্পাদনার কাজ নিঃশব্দ। একজন সম্পাদক অনেক সময় নিজের নামের চেয়ে অন্যের নামকে সামনে নিয়ে আসেন। নতুন লেখকের লেখা পড়েন, সংশোধন করেন, প্রকাশের সুযোগ করে দেন এবং একটি সাহিত্যিক পরিবেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন।

শান্তি জীবন চাকমার এই ভূমিকা তাঁর সাহিত্যিক দায়িত্ববোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি শুধু নিজের জন্য সাহিত্য করতে চান না; তিনি একটি সাহিত্যিক পরিসর তৈরি করতে চান।

শান্তি জীবন চাকমার সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক তাঁর বিপুল অপ্রকাশিত সাহিত্যসম্ভার। তাঁর মোট ৪৫টি অপ্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে।

এই তালিকায় যেমন আছে ‘মনর গভীন ছাবা’, ‘মৌন মুরৌর কুদুম’, ‘পাউজ্য শিঙোর’-এর মতো কাব্যগ্রন্থ, তেমনি আছে ‘চিদহ দজ্যার তুবোল ১ ও ২’ এবং ‘রিদয় সমুদ্রের ঢেউ ১ ও ২’-এর মতো রোমান্টিক কাব্যগ্রন্থ।

শিশুদের জন্য রয়েছে ‘কচি মনের দেশে’, ‘কজি চিদর চিদে’, ‘কজি চিদর দেঝত’ এবং ‘পাহাড় পরবতের হাসিখুশি’। রূপকথার জগতে রয়েছে ‘মা লক্ষী মার এযানা আর ধে যানা’, ‘সিংহলোই এতমামু’, ‘দিবুরি বনভিলেচ’, ‘আহরি উহরি চর বুদ্ধি’, ‘মূলসী কন্যে’ ও ‘পাঁচফুলী কন্যে’।

ছোটগল্পের ভাণ্ডারেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য বৈচিত্র্য, ‘সোনা রঙর সে দিনুন’, ‘পাজারাত’, ‘ভাঙা আঝা’, ‘নাদান’, ‘ফাগুন্যু বুয়ের’, ‘আনধার’, ‘হারানো ফাগুন’, ‘অচিন দেঝর অচিন পরী’**সহ আরও বেশ কিছু রচনা।

নাটক ও নাটিকার ক্ষেত্রেও তাঁর সৃষ্টিশীলতা বিস্তৃত। ‘দিন জুরো’, ‘অত চিনিই’, ‘লাজাং দোরাং’, ‘যা ফালত তে পড়ে’, ‘এক ন জিনে নুদি লগে, এক ন জিনে ঊদি লগে’-এর পাশাপাশি রয়েছে একাধিক নাটিকা।

আরও আছে প্রবন্ধ, ভাষা ও বানানবিষয়ক লেখা, বাগধারা, ধাঁধা, ঘুমপাড়ানি গান এবং চাকমা ভাষায় পূজার গাথা। ‘চাঙমা বানান সুধোম’, ‘বানা আর ওলি গীত’, ‘আজু-নানু দাঘির গুণোর কধানি’ ও ‘বৌদ্ধ আরাধনা’ তাঁর ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের আকাঙ্ক্ষাকে বিশেষভাবে তুলে ধরে।

এই ৪৫ টি গ্রন্থ যেন একটি মানুষের একার হাতে গড়ে ওঠা ছোট্ট সাহিত্য-জাদুঘর, যেখানে পাশাপাশি বাস করছে প্রেম, শৈশব, লোককথা, সমাজ, ধর্ম, ভাষা, নাটক, হাসি, বেদনা ও মানুষের গল্প।

শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যিক স্বপ্ন ব্যক্তিগত খ্যাতির সীমানায় আটকে নেই। তিনি প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক হতে চান, এটি তাঁর স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন আরও বড় একটি স্বপ্ন। তিনি চান, চাকমা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বর্ণমালা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও সহজলভ্য ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠুক।

তিনি চান শিশুরা নিজের ভাষায় গল্প পড়ুক। তরুণেরা নিজের বর্ণমালা শিখুক। নতুন লেখকেরা মাতৃভাষায় লিখতে সাহস পাক। নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে তারা যেন বোঝে এবং ভালোবাসে। এই স্বপ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। একজন মানুষ নিজের জন্য যতটা সৃষ্টি করেন, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠেন তখনই, যখন তাঁর সৃষ্টি অন্যদের পথ দেখায়।

খাগড়াছড়ির দিঘীনালা উপজেলার ৩নং কবাখালী ইউনিয়নের দুলুছড়ি গ্রামে বর্তমানে বসবাস করছেন শান্তি জীবন চাকমা। তাঁর পরিচয় একক কোনো শব্দে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি শিক্ষক, তিনি কবি, তিনি সাহিত্যকর্মী, তিনি সম্পাদক, তিনি ভাষাকর্মী আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি একজন স্বপ্নবান মানুষ, যিনি বিশ্বাস করেন, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালোবেসেও পৃথিবীর বৃহত্তর জগতের সঙ্গে পথ চলা যায়।

পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যে ঝরনা নেমে আসে, তার গন্তব্য হয়তো অনেক দূরে। পথে তাকে পাথর পেরোতে হয়, অরণ্য পেরোতে হয়, কখনো শুকিয়ে যাওয়ার ভয়ও থাকে। তবু সে বয়ে চলে। শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যযাত্রাও যেন তেমনই এক ঝরনার মতো। নীরবে, ধীরে, নিজের পথ তৈরি করে তিনি এগিয়ে চলেছেন। তাঁর হাতে জমেছে ৪৫টি অপ্রকাশিত গ্রন্থের বিপুল সম্ভার; তাঁর সাহিত্যিক যাত্রায় যুক্ত হয়েছে ‘পুগবেল’ ও ‘আবেদি’র মতো যৌথ কাব্যগ্রন্থ; আর তাঁর কর্মযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষকতা, সম্পাদনা, পাঠচক্র, ভাষা শিক্ষা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে।

হয়তো একদিন তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো বই হয়ে পাঠকের হাতে পৌঁছাবে। হয়তো কোনো পাহাড়ি গ্রামের শিশু সেই বই খুলে নিজের ভাষায় নিজের গল্প পড়বে। হয়তো কোনো তরুণ তাঁর লেখা পড়ে নিজের মাতৃভাষায় কবিতা লিখতে উৎসাহিত হবে।

সেদিন শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যসাধনা শুধু একজন লেখকের প্রকাশনা-সাফল্য হয়ে থাকবে না; তা হয়ে উঠবে একটি ভাষা, একটি সংস্কৃতি ও একটি প্রজন্মের আত্মপরিচয় রক্ষার ইতিহাসের অংশ।

কারণ শেষ পর্যন্ত সাহিত্য শুধু শব্দের সমষ্টি নয়। সাহিত্য হলো স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার উপায়, হারিয়ে যেতে বসা কণ্ঠকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, আর ভবিষ্যতের হাতে অতীতের একটি আলো তুলে দেওয়ার নাম।

শান্তি জীবন চাকমা সেই আলোই জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছেন, পাহাড়ের বুক থেকে, মাতৃভাষার অক্ষরে, মানুষের গল্পে।

 

৯ আগস্টের প্রশ্ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও একটি অসমাপ্ত স্বাধীনতা - ইনজেব চাঙমা


আজ আগস্ট। বিশ্ব আদিবাসী দিবস।

পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজ আদিবাসী মানুষ তাদের অস্তিত্ব, অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ভূমির দাবিকে আবারো উচ্চারণ করছে। কোথাও বিক্ষোভ, কোথাও আলোচনা, কোথাও মিছিলআবার কোথাও নীরব স্মরণ। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের কাছে আগস্ট কেবল একটি দিবস নয়; এটি যেন বুকের ভেতর বহুদিন ধরে জমে থাকা প্রশ্নগুলোর দরজা খুলে দেওয়ার দিন।

প্রশ্ন-১: আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? প্রশ্ন- ২: স্বাধীনতার যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল, সেই স্বপ্নের আলো কি পাহাড়ের প্রতিটি ঘরে পৌঁছেছে? প্রশ্ন- ৩: রাষ্ট্রের চোখে পাহাড়ের মানুষ কি সমান মর্যাদার নাগরিক?

এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়। এগুলো বহু বছরের। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে চলা এক দীর্ঘ বেদনার নদীর মতো।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল শোষণ, বৈষম্য নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে। স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল, মানুষ তার নিজের পরিচয়ে বাঁচবে, নিজের ভাষায় কথা বলবে, নিজের ভূমিতে নিরাপদ থাকবে, রাষ্ট্র তাকে ভয় দেখাবে না; বরং রাষ্ট্র হবে তার অধিকার রক্ষার আশ্রয়। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের জীবনে সেই স্বপ্ন আজও কেন অসম্পূর্ণ?


এই
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরের কাছে। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম জনগণের পক্ষে জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। পাহাড়ের মানুষের কাছে সেই দিনটি ছিল দীর্ঘ অন্ধকারের শেষে শান্তির একটি সম্ভাব্য ভোর। চুক্তির কাগজে শুধু কিছু ধারা লেখা ছিল না; সেখানে লেখা ছিল মানুষের ঘরে ফেরার স্বপ্ন, ভূমির নিরাপত্তা, রাজনৈতিক মর্যাদা এবং শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।

কিন্তু আজ ২০২৬। চুক্তির ২৯ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। সময় নদীর মতো বয়ে গেছে। প্রজন্ম বদলেছে। পাহাড়ের অনেক তরুণ জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে, আবার কেউ কেউ এই চুক্তির বাস্তবায়নের অপেক্ষা করতে করতেই পৃথিবী ছেড়ে গেছে। তবু প্রশ্নটি রয়ে গেছে।

চুক্তির কতটুকু মানুষের জীবনে পৌঁছেছে? সরকারের হিসাব একরকম। পাহাড়ের মানুষের অভিজ্ঞতা আরেক রকম। রাষ্ট্র বলে বাস্তবায়নের অনেক অগ্রগতি হয়েছে; পাহাড়ের মানুষ বলে, চুক্তির মৌলিক রাজনৈতিক ভূমি-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত।

এই দুই বক্তব্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের মানুষ. তার ঘর, তার ভূমি, তার জুম, তার স্মৃতি এবং তার ভবিষ্যৎ। ভূমি এখানে শুধু মাটি নয়। এক টুকরো পাহাড় মানে একটি পরিবারের ইতিহাস। একটি ঝিরি মানে শৈশবের স্মৃতি। একটি জুমের ঢাল মানে পূর্বপুরুষের ঘামের গন্ধ। একটি বন মানে জীবনের আশ্রয়। একটি নদী মানে প্রজন্মের গল্প।


তাই
যখন ভূমির প্রশ্ন ওঠে, তখন সেটি কেবল জমির মালিকানার প্রশ্ন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে অস্তিত্বের প্রশ্ন। একটি জাতির ভূমি যদি অনিরাপদ হয়, তার ভাষা কি নিরাপদ থাকে? ভাষা যদি হারিয়ে যায়, তার সংস্কৃতি কি টিকে থাকে? সংস্কৃতি যদি ক্ষয়ে যায়, তার জাতিসত্তা কি বেঁচে থাকে? আর জাতিসত্তা যদি ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে, তবে স্বাধীনতার অর্থই বা কী?

এই কারণেই আগস্ট পাহাড়ে অন্যরকম অর্থ বহন করে। আজ (৯ আগস্ট ২০২৬) রাঙামাটিতে উচ্চারিত হয়েছে একটি কঠিন, বিস্ফোরক অথচ গভীর রাজনৈতিক বার্তা— “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাতিল করো, আমরাও প্রস্তুত।এই বাক্যকে শুধু একটি স্লোগান হিসেবে দেখলে এর ভেতরের দীর্ঘ ইতিহাসকে দেখা হবে না। একটি জনগোষ্ঠী যখন এমন কথা উচ্চারণ করে, তখন তার পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান, অবিশ্বাস, ক্ষোভ এবং রাষ্ট্রের কাছে বারবার প্রশ্ন রেখে উত্তর না পাওয়ার যন্ত্রণা।


চুক্তি
যদি রাষ্ট্রের কাছে মূল্যহীন হয়, তবে তা বাতিলের প্রশ্ন উঠতেই পারে। আর যদি চুক্তি রাষ্ট্রের কাছে শান্তির দলিল হয়, তবে তার পূর্ণ বাস্তবায়নে এত দীর্ঘসূত্রতা কেন? দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ চুক্তি শুধু কাগজে লেখা অক্ষর নয়। চুক্তি হলো বিশ্বাস। আর বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে শুধু নতুন একটি কাগজে স্বাক্ষর করলেই তা ফিরে আসে না। এই কারণেই ২০২৫ সালের ডিসেম্বর খাগড়াছড়িতেও এমএন লারমা গ্রুপের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিমল কান্তি চাঙমার কণ্ঠে শোনা গিয়েছিল কঠিন উচ্চারণ, “পার্বত্য চুক্তি বাতিল করে দেখো।

চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে, এটাই শান্তির পথ। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে। আঞ্চলিক পরিষদ জেলা পরিষদকে কার্যকর করতে হবে। পাহাড়ের মানুষের রাজনৈতিক প্রশাসনিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি পরিচয়ের নিরাপত্তা দিতে হবে। সর্বোপরি, মানুষের মনে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে যে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নয়, রাষ্ট্র তারও।


তাই
আগস্টের এই দিনে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা বেশি প্রয়োজন। আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন ৫০ টি জনগোষ্ঠীকে (সরকারের হিসাব)  তার অস্তিত্বের নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলতে হয়? কেন চুক্তির বাস্তবায়ন আজও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়? কেন ভূমির প্রশ্নে পাহাড়ের মানুষের মনে এত অনিশ্চয়তা? কেন তাদের ভাষা সংস্কৃতি রক্ষার জন্য তাদেরই বারবার রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়তে হয়?


এসব
প্রশ্নের উত্তর শুধু পাহাড়ের মানুষকে নয়রাষ্ট্রকেও দিতে হবে। কারণ পাহাড় বাংলাদেশের বাইরে নয়। পাহাড়ের মানুষও বাংলাদেশের বাইরে নয়। চামড়া, ভাষা, বর্ণমালা ও সংস্কৃতি ঐতিহ্য আলাদা হতে পারে কিন্তু তাদের পতাকাও লাল সবুজ। এ লাল সবুজের জন্য তারাও রক্ত দিলো, সম্ভ্রম হারিয়ে ছিল।  তাই তাদের অধিকার রক্ষা করা কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন।

আজ আগস্ট তাই কেবল আদিবাসী দিবস নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্রেরও এক আয়না। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই? একটি উদার, গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী বাংলাদেশ, যেখানে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন জাতিসত্তা পাশাপাশি বেঁচে থাকবে? নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সংখ্যার জোরে কোনো পরিচয়কে ধীরে ধীরে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হবে?

সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কারণ ইতিহাস কাউকে চিরকাল অপেক্ষা করায় না। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর যে চুক্তি পাহাড়ে শান্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আজ সেই চুক্তি রাষ্ট্রের সামনে আবারও একটি আয়না তুলে ধরেছে। চুক্তি বাস্তবায়ন করো অথবা ব্যাখ্যা দাও, কেন করছ না। আর যদি চুক্তি সত্যিই অকার্যকর মনে হয়, তবে সাহস করে জনগণের সামনে সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করো।

আজ পাহাড় তাই শুধু অধিকার চাইছে না; পাহাড় তার সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতির মর্যাদা চাইছে। আজ আগস্ট পাহাড়ের বাতাসে তাই একটিই প্রশ্ন ভাসছে, স্বাধীনতার যে স্বপ্নে বাংলাদেশ জন্মেছিল, সেই স্বাধীনতার আলো কি পাহাড়ের মানুষের ঘরেও সমানভাবে পৌঁছাবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আজকের জন্য নয়। এই উত্তর নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশের ইতিহাস।

 

 

শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬

শিল্পী জয়তু চাকমা: পাহাড়ের বেদনা, মানুষের ইতিহাস ও রঙের ভাষায় এক বিশ্বজয়ী শিল্পী - INJEB CHANGMA

বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলায় যে কজন শিল্পী পাহাড়ি জনপদের ইতিহাস, প্রকৃতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং অস্তিত্বের সংকটকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য শিল্পভাষায় উপস্থাপন করেছেন, তাঁদের মধ্যে জয়তু চাকমা একটি উজ্জ্বল নাম। তাঁর শিল্পকর্মে যেমন ধরা পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়, জুমজীবনের ছন্দ, মাচাং ঘর, কাপ্তাই হ্রদের জলরাশি মানুষের স্বপ্ন, তেমনি ফুটে ওঠে বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, ইতিহাসের নীরব আর্তনাদ এবং একটি জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন; তিনি পাহাড়ের স্মৃতি, মানুষের বেদনা এবং ইতিহাসের এক শিল্পিত ভাষ্যকার।

জয়তু চাকমার জন্ম ১৭ জানুয়ারি ১৯৮৯ সালে রাঙামাটি জেলার দুর্গম মোবাছড়ি গ্রামে। যদিও শিক্ষাগত সনদপত্রে তাঁর জন্মতারিখ ১০ জানুয়ারি ১৯৯০ হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। বাবা প্রভাত কিশোর চাকমা এবং মা বুদ্ধমালা চাকমার দুই সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠ। বড় ভাই সুদীর্ঘ চাকমা ছিলেন পরিবারের অন্যতম আশার প্রদীপ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাঁর অকালমৃত্যু পুরো পরিবারকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করে। বড় ভাইয়ের সেই শূন্যতা জয়তু চাকমার মনোজগতে এক গভীর ক্ষতের জন্ম দেয়। জীবনের ক্ষতি, বিচ্ছেদ, অনিশ্চয়তা অস্তিত্বের যে অনুভূতি তাঁর ক্যানভাসে এত তীব্রভাবে প্রতিফলিত হয়, তার পেছনে এই ব্যক্তিগত বেদনারও এক নীরব প্রভাব কাজ করে।

কাপ্তাই হ্রদের বুক চিরে নৌকায় করে পৌঁছাতে হয় তাঁর জন্মভূমি মোবাছড়িতে। আজও যেখানে আধুনিক সভ্যতার অনেক সুবিধা পুরোপুরি পৌঁছায়নি, সেই প্রকৃতিনির্ভর পাহাড়ি পরিবেশই ছিল তাঁর প্রথম বিদ্যালয়। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অন্যরকম। বাংলা, ইংরেজি কিংবা অঙ্কের খাতা ভরে উঠত না শুধু লেখায়; বরং প্রতিটি পাতা ভরে যেত পাহাড়, নদী, নৌকা, জুমখেত, জুমিয়া, মাচাং ঘর আর কাপ্তাই হ্রদের অসংখ্য রেখাচিত্রে। শুধু খাতা নয়, হাতে যে কাগজই পেতেন, সেখানেই ফুটিয়ে তুলতেন নিজের কল্পনার জগৎ। শিল্পের প্রতি এই সহজাত আকর্ষণের জন্য কখনো বাবা-মায়ের বকুনি শুনতে হয়নি; বরং তাঁদের অকুণ্ঠ উৎসাহ ভালোবাসাই তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার পথকে দৃঢ় করেছে।

প্রতি শুক্রবার তাঁর বাবা নিজ হাতে নৌকা চালিয়ে তাঁকে নিয়ে যেতেন রাঙামাটি চারুকলা একাডেমিতে। সেখানেই বিশিষ্ট শিল্পী রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যার সান্নিধ্যে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার সূচনা হয়। সেই ছোট্ট শিল্পযাত্রাই একদিন তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দেবেতখন হয়তো কেউ তা কল্পনাও করেননি।

তিনি নোয়াদম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে বন্দুকভাঙা উচ্চ বিদ্যালয় এবং রানী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর রাঙামাটি সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে। সেখানে পেইন্টিং বিভাগে স্নাতক স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষক ঢালী আল মামুন অলোক রায়ের শিল্পদর্শন তাঁর চিন্তা সৃষ্টিশীলতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তীতে ভারত সরকারের আইসিসিআর (ICCR) বৃত্তি লাভ করে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ বহুমাত্রিক করে তোলে।

দেশে ফিরে তিনি ঢাকাকে কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিলেও তাঁর হৃদয়ের ঠিকানা আজও পাহাড়। তাঁর ক্যানভাসে বারবার ফিরে আসে জন্মভূমির প্রকৃতি, মানুষের জীবন, ইতিহাস এবং হারিয়ে যাওয়া জনপদের স্মৃতি।

জয়তু চাকমার শিল্পের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ কাপ্তাই হ্রদ। তাঁর কাছে এই হ্রদ কেবল প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি উন্নয়নের নামে বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষের হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটি, ডুবে যাওয়া স্মৃতি এবং অব্যক্ত কান্নার প্রতীক। ষাটের দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের ফলে অসংখ্য গ্রাম, কৃষিজমি বসতি পানির নিচে তলিয়ে যায়। তাঁর পূর্বপুরুষদের বাড়িও সেই প্লাবনের শিকার হয়েছিল। যদিও তিনি সেই ভয়াবহ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেননি, পরিবারের প্রবীণদের মুখে শোনা সেই ইতিহাস তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।

তাঁর এক আলোচিত শিল্পকর্মে ত্রিভুজাকৃতির একটি ফ্রেমের মধ্যে গোলাকার জলরাশির নিচে ডুবে থাকা মানুষের শুধু একটি হাত দৃশ্যমান। সেই হাত যেন পানির নিচ থেকে ইতিহাসকে সাক্ষ্য দিতে চায়। যেন বলতে চায় হারিয়ে যাওয়া গ্রামগুলোর গল্প, বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস এবং অধিকারহারা একটি জনগোষ্ঠীর অব্যক্ত বেদনার ইতিহাস। এই প্রতীকী শিল্পভাষাই তাঁকে সমকালীন বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।

তাঁর শিল্পে পাহাড়ের প্রকৃতি যেমন স্থান পায়, তেমনি স্থান পায় আদিবাসী মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, পরিচয়ের সংকট, পরিবেশ ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি, সামাজিক বৈষম্য এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন। তিনি বিশ্বাস করেন, শিল্প কেবল রঙ রেখার সমাবেশ নয়; শিল্প হলো মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণের এক নীরব দলিল, ইতিহাসের বিকল্প ভাষা এবং প্রতিবাদের এক নান্দনিক মাধ্যম।

এই শিল্পভাবনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিস্বরূপ জয়তু চাকমা জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) আয়োজিত আন্তর্জাতিক শিল্প প্রতিযোগিতায় বিশ্বের নির্বাচিত আটজন সংখ্যালঘু শিল্পীর একজন হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি সেই সম্মান গ্রহণ করেন। এই অর্জন কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রামেরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।

তবে জয়তু চাকমার স্বপ্ন শুধু একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী হয়ে ওঠা নয়। তাঁর হৃদয়ের গভীরে লালিত সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষাএকদিন রাঙামাটিতে স্থায়ীভাবে ফিরে এসে একটি আধুনিক, আন্তর্জাতিক মানের শিল্প স্টুডিও সৃজনশীল শিল্পকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বিশ্বাস করেন, পাহাড়ে প্রতিভার কোনো অভাব নেই; অভাব শুধু সুযোগের। তাই তিনি চান, তাঁর স্টুডিও হবে নবীন শিল্পীদের জন্য শিক্ষা, গবেষণা, প্রদর্শনী সৃজনশীল চর্চার এক মুক্তাঙ্গন। সেখানে পাহাড়ের তরুণ-তরুণীরা শিল্পচর্চার সুযোগ পাবে, নিজেদের প্রতিভা বিকাশের পথ খুঁজে পাবে এবং দেশ-বিদেশে শিল্পের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি জীবনকে তুলে ধরতে সক্ষম হবে। তিনি মনে করেন, শিল্প কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়; এটি একটি সমাজকে জাগিয়ে তোলার শক্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণের অন্যতম মাধ্যম।

আজ জয়তু চাকমা বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁর প্রতিটি চিত্রকর্ম পাহাড়ের নীরব ভাষা, কাপ্তাইয়ের জলরাশি, হারিয়ে যাওয়া বসতির স্মৃতি এবং মানুষের অমলিন সংগ্রামের দলিল হয়ে উঠেছে। তিনি প্রমাণ করেছেনএকজন শিল্পী শুধু ছবি আঁকেন না; তিনি সময়কে ধারণ করেন, ইতিহাসকে সংরক্ষণ করেন এবং মানুষের না-বলা কথাগুলোকে রঙের ভাষায় বিশ্বমানবতার সামনে তুলে ধরেন।

জয়তু চাকমার শিল্পযাত্রা তাই কেবল একজন সফল চিত্রশিল্পীর জীবনী নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ, প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের এক অনবদ্য শিল্পগাথা। তাঁর তুলির প্রতিটি আঁচড়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে পাহাড়ের আত্মা, মানুষের বেদনা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্নযে স্বপ্নে শিল্প হয়ে ওঠে ইতিহাসের সাক্ষী, মানবতার ভাষা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য উত্তরাধিকার।

 

তুফান চাঙমা : তুলির ভেতর পাহাড়ের আত্মকথা - ইনজেক চাাঙমা

পাহাড়কে দূর থেকে দেখলে তার সৌন্দর্যই চোখে পড়ে, সবুজের স্তরে স্তরে নেমে আসা ঢেউ, মেঘের ছায়ায় আচ্ছন্ন উপত্যকা, ঝরনার স্বচ্ছ জলধ্বনি, জুমের ঢাল...