পাহাড়ের জীবন কখনোই সরলরেখায় এগোয় না। সেখানে পথের সঙ্গে মিশে থাকে উত্থান-পতন, নদীর সঙ্গে মিশে থাকে অপেক্ষা, আর মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাস। রাঙামাটির পাহাড় ও নদীবেষ্টিত চোংড়াছড়ি গ্রামের প্রকৃতির কোলে জন্ম নেওয়া ডাক্তার নিপুণ চাকমা, ডাকনাম ‘মণি’, যেন সেই পাহাড়ি জীবনেরই এক সরল অথচ বহুমাত্রিক প্রতিচ্ছবি। জন্ম জুলাই ১৯, ১৯৮০ খ্রি.। চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা, আর কবি হিসেবে প্রকৃতি ও জীবনের কাছে ফিরে যাওয়া—এই দুই স্রোত তাঁর জীবনকে সমান্তরালভাবে বয়ে নিয়ে চলেছে।
তাঁর পিতা হরিশ্চ চন্দ্র চাকমা এবং মাতা মহারাণী চাকমা। পাঁচ ভাইবোনের পরিবারে একমাত্র বোনটি শৈশবেই অকালে না-ফেরার দেশে চলে যায়। সেই অকালশূন্যতার পর নিপুণ চাকমাই হয়ে ওঠেন পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান। স্বাভাবিকভাবেই সবার আদর-স্নেহ তাঁর ওপর একটু বেশি ছিল। কিন্তু সেই আদরের আবরণ তাঁর মনকে কঠিন করেনি; বরং সহজ-সরল জুমিয়া পরিবারের মাটির গন্ধ, মানুষের প্রতি মমতা এবং প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা তাঁর চরিত্রে স্থায়ী ছাপ রেখে গেছে।
তাঁর পিতা ছিলেন ধর্মপ্রাণ ও শ্রদ্ধাশীল মানুষ। শ্রদ্ধেয় বনভান্তে জীবিত থাকাকালে চারিখ্যং বা চোংড়াছড়ি কিয়াংয়ে ফাঙে গেলে তাঁদের বাড়িতে কয়েকবার পদার্পণ করেছিলেন, এই স্মৃতি আজও তাঁদের পারিবারিক ইতিহাসের একটি পবিত্র অধ্যায় হয়ে আছে। ২০০৬ সালের ২৪ এপ্রিল পিতার মৃত্যু পরিবারে যে শূন্যতা তৈরি করেছিল, তা কোনোদিন পূর্ণ হওয়ার নয়। অন্যদিকে তাঁর মা মহারাণী চাকমা আজও জীবিত ও সুস্থ আছেন। মায়ের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুর জন্য সন্তানের মতোই তাঁর অন্তরে রয়েছে গভীর প্রার্থনা।
নিপুণ চাকমার শিক্ষাজীবন কোনো মসৃণ পথের গল্প নয়। পাহাড়ি জীবনের চড়াই-উতরাইয়ের মতোই তাঁর পড়াশোনার পথেও এসেছে নানা বাধা। শৈশব থেকেই অনেক কষ্ট করে তাঁকে শিক্ষার পথে এগোতে হয়েছে।
১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড় যেন তাঁর জীবনের আকাশেও এক অদৃশ্য ঝড় ডেকে এনেছিল। তখন তিনি তবলছড়ির শাহ হাই স্কুলের ছাত্র। পারিবারিক বাস্তবতা ও নানা প্রতিকূলতায় সে বছর তাঁর শিক্ষাজীবন প্রায় থমকে যায়। পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। অনেকের জীবনে যে মুহূর্তটি শেষের সূচনা হয়ে দাঁড়ায়, নিপুণের জীবনে সেটিই পরবর্তীতে হয়ে ওঠে নতুন শুরুর অপেক্ষা।
পরের বছর তাঁর ভাইয়ের এক বন্ধুর সহযোগিতায় বড় ভাইকে রাজি করিয়ে তিনি আবারও শিক্ষার জগতে ফিরে আসেন। রানী দয়াময়ী হাই স্কুলে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে নতুন করে শুরু করেন পথচলা। সেই পথও সহজ ছিল না। কিন্তু তাঁর মধ্যে ছিল এগিয়ে যাওয়ার এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা। প্রতিকূলতা তাঁকে থামাতে পারেনি।
অবশেষে ২০০৯ সালে ডাক্তার জাকির হোসেন সিটি কর্পোরেশন হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ থেকে তিনি ডি.এইচ.এম.এস. ডিগ্রি অর্জন করেন। একটি দীর্ঘ সংগ্রামের পর অর্জিত এই সাফল্য শুধু একটি শিক্ষাগত সনদ নয়; এটি তাঁর অধ্যবসায়, ধৈর্য ও আত্মপ্রত্যয়েরও স্বীকৃতি।
শিক্ষাজীবনের সমাপ্তির পর শুরু হয় কর্মজীবনের নতুন অধ্যায়। ২০০৯ সালেই তিনি এম.এক্স.এন. মডার্ন হারবাল গ্রুপে মেডিকেল অফিসার হিসেবে যোগ দেন। দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলার দায়িত্ব পালন করেন নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে।
৬ জুন ২০০৯ থেকে ১ মার্চ ২০২৩—এই দীর্ঘ সময় তাঁর কর্মজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। অসংখ্য মানুষের কাছে চিকিৎসক মানে কেবল রোগ নিরাময়ের মানুষ নন; অনেক সময় তিনি হয়ে ওঠেন আশ্বাসের মানুষ, ভরসার মানুষ। নিপুণ চাকমার চিকিৎসকসত্তাতেও সেই মানবিকতার ছাপ রয়েছে।
দীর্ঘ দায়িত্ব পালনের পর ২০২৩ সালের ১ মার্চ তিনি স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করেন। কিন্তু মানুষের সেবা থেকে অবসর নেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। নিজের চেম্বার ‘মেডো হোমিও হল’-এ তিনি নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিয়ে চলেছেন। পাশাপাশি এম. ইসলাম জসিম উদ্দিন হোমিওপ্যাথিক মেডিক্যাল কলেজ এন্ড হাসপাতাল (প্রস্তাবিত)-এ প্রভাষক হিসেবে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
মানুষের শরীরের অসুখ সারাতে সারাতে তিনি কখন যে মানুষের মনের ভাষা পড়তে শিখেছেন, তা হয়তো নিজেও জানেন না। তাঁর পেশার পরিচয় চিকিৎসক, কিন্তু অন্তর্গত পরিচয়ের আরেকটি নাম—কবি।
নিয়মিত সাহিত্যচর্চা তাঁর জীবনের প্রধান কাজ হয়ে ওঠেনি। তবুও সাহিত্যের প্রতি তাঁর টান বরাবরের। কালেভদ্রে কলম হাতে নিলে তাঁর ভেতরের নীরব কবি জেগে ওঠে। কখনো কবিতা, কখনো ছোটগল্প—বিক্ষিপ্ত অথচ আন্তরিক এই লেখালেখির মধ্যেই তাঁর সাহিত্যিক সত্তার প্রকাশ ঘটে।
তাঁর একক কোনো কাব্যগ্রন্থ এখনো প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু ‘নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ’-এর যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘পুগবেল’ (২০২৩)-এ তাঁর ১০টি কবিতা স্থান পেয়েছে। আরও দুই-তিনটি কাব্যগ্রন্থের পাণ্ডুলিপি তাঁর টেবিলে পড়ে আছে, যেন সময়ের অপেক্ষায় থাকা কিছু অপ্রকাশিত ঋতু।
তাঁর সাহিত্যিক আগ্রহের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো চাঙমা লোকজ প্রবাদ-প্রবচন, অর্থাৎ ‘দাগ কধা’ সংগ্রহ। ইতোমধ্যে তিনি হাজারেরও বেশি দাগ কধা সংগ্রহ করেছেন। এগুলো কেবল কিছু বাক্য নয়; এগুলোর মধ্যে একটি জাতির জীবনবোধ, অভিজ্ঞতা, হাসি-কান্না, প্রজ্ঞা ও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা স্মৃতি জমা থাকে। তাই তাঁর এই সংগ্রহ নিছক ব্যক্তিগত আগ্রহ নয়—এটি এক ধরনের সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতাও।
নিপুণ চাকমার কবিসত্তার সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক তাঁর প্রকৃতিপ্রেম। পাহাড়ে জন্ম নেওয়া মানুষ প্রকৃতিকে শুধু দেখে না; প্রকৃতিকে অনুভব করে। পাহাড়ের নীরবতা, নদীর ছুটে চলা, বৃষ্টির শব্দ, জুমের সবুজ, বনভূমির গন্ধ, এসব তাঁর চেতনার সঙ্গে মিশে আছে।
তাঁর কবিতায় তাই প্রকৃতি কেবল দৃশ্যপট নয়; কখনো তা হয়ে ওঠে জীবন, কখনো স্মৃতি, কখনো প্রতিবাদের ভাষা। তাঁর কবিসত্তায় যেমন কোমলতা আছে, তেমনি আছে দ্রোহের আগুন।
তিনি সরাসরি কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন বা বিপ্লবে অংশগ্রহণ করেননি। কিন্তু মানুষের জীবন, সমাজ ও চারপাশের বাস্তবতা তাঁকে ভাবিয়েছে। সেই ভাবনারই প্রতিধ্বনি কখনো তাঁর কবিতায় বিপ্লবী সুর হয়ে ফিরে আসে। তাঁর পঙ্ক্তিতে কখনো কখনো শোনা যায় প্রতিবাদের শব্দ, অনুভূত হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষা। ফলে তাঁর কবিতা একদিকে প্রকৃতির কোমল স্পর্শ বহন করে, অন্যদিকে অন্তর্গত দ্রোহের উত্তাপও ধারণ করে।
এই দ্বৈততাই হয়তো তাঁর কবিসত্তাকে আলাদা করে, তিনি একই সঙ্গে প্রকৃতির কবি এবং মানুষের কবি।
জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় তাঁর দাম্পত্য ও পারিবারিক জীবন। ১৭ এপ্রিল ২০০০ সালে তিনি বুড়িঘাট মৌজার হেডম্যান শ্রী স্মৃতিময় দেওয়ানের কনিষ্ঠ কন্যা শ্রীমতী শ্রীলা দেওয়ানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।
তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় এক কন্যা ও এক পুত্র। বড় মেয়ে ঋত্তি চাকমা বর্তমানে বি.ইউ.এম.এস. (Bachelor of Unani Medicine and Surgery) ফাইনাল বর্ষে অধ্যয়নরত। ছোট ছেলে এস.এস.সি. পরীক্ষার্থী।
একজন চিকিৎসকের জীবনে যেমন মানুষের প্রতি দায়িত্ব থাকে, তেমনি একজন পিতার জীবনে থাকে সন্তানের ভবিষ্যৎ নির্মাণের দায়িত্ব। নিপুণ চাকমার জীবনেও এই দুই দায়িত্ব পাশাপাশি এগিয়ে চলেছে।
কিছু মানুষের জীবনকে কেবল পেশার পরিচয়ে চেনা যায় না। তাঁদের ভেতরে একাধিক মানুষ বসবাস করে, কেউ চিকিৎসক, কেউ কবি, কেউ প্রকৃতিপ্রেমী, কেউ সংগ্রামী, কেউ আবার নীরব সাংস্কৃতিক কর্মী। ডাক্তার নিপুণ চাকমার জীবনও তেমনই বহুমাত্রিক।
চিকিৎসক হিসেবে তিনি মানুষের শরীরের ব্যথা বোঝার চেষ্টা করেছেন; কবি হিসেবে অনুভব করেছেন মানুষের মনের ব্যথা। প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবে পাহাড়-নদীর সৌন্দর্যে আশ্রয় খুঁজেছেন; আর একজন চাঙমা হিসেবে নিজের ভাষা, লোকজ স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রেখেছেন।
তাঁর একক কাব্যগ্রন্থ এখনো প্রকাশিত হয়নি, তাই তাঁর সাহিত্যিক যাত্রা যেন এখনো অসমাপ্ত। তাঁর টেবিলে পড়ে থাকা কাব্যপাণ্ডুলিপিগুলো হয়তো একদিন বইয়ের মলাটে বন্দি হবে। হাজারো দাগ কধার সংগ্রহ হয়তো একদিন চাঙমা লোকজ জ্ঞানের মূল্যবান গ্রন্থে রূপ নেবে। আর তখন তাঁর আজকের নীরব সাধনা হয়ে উঠবে আগামী দিনের সাংস্কৃতিক সম্পদ।
জীবন কখনো সম্পূর্ণ লেখা কোনো বই নয়। কিছু অধ্যায় প্রকাশিত হয়, কিছু অধ্যায় থেকে যায় অপ্রকাশিত; কিছু কবিতা ছাপা হয়, কিছু কবিতা কেবল কবির বুকেই থেকে যায়। ডাক্তার নিপুণ চাকমার জীবনও তেমনই, পাহাড়ের পথের মতো বাঁকানো, নদীর স্রোতের মতো চলমান এবং কবিতার মতো অসমাপ্ত।
তাঁর জীবনকে তাই শুধু একজন হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসকের জীবন বলে দেখলে ভুল হবে। তিনি পাহাড়ের সন্তান, মানুষের সেবক, প্রকৃতির অনুরাগী এবং অন্তরে লুকিয়ে থাকা এক নীরব কবি। তাঁর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয় হয়তো এখানেই, তিনি পেশায় চিকিৎসক, আর অনুভবে একজন কবি।

