চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালার প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং নিজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ২০০৪ সাল থেকে আমার এক দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং পথচলা শুরু হয়। চংড়াছড়ি হাই স্কুলে (যা তখন জুনিয়র হাই স্কুল ছিল) প্রথম চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা কোর্স চালু করি, বিদ্যালয়টি ২০০০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই উদ্যোগের ফলস্বরূপ, ২০০৪-২০০৫ সালে বাজেই ছড়া বেসরকারি প্রাইমারি বিদ্যালয়ে আরও দুটি ব্যাচ শুরু হয়। তবে, আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ওয়ান ইলেভেনের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আমার এই কাজ সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
২০০৭ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে জীবন বাঁচাতে আমি আমার বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হই। সে সময়ে দিঘীনালার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ছিল এবং জনমনে ছিল চরম আতঙ্ক। কুদুকছড়ি গ্রামে আত্মগোপন অবস্থায় আমি প্রাইভেট টিউশনির পাশাপাশি চাঙমা ভাষা কোর্স চালু রাখি। জান্দিমুড়ো নামক এক গ্রামে টিউশনির সাথে চাঙমা লেখা শেখানোর কাজও চালিয়ে যাই। সে সময় আমি এক বছরে মাত্র ৭ হাজার টাকা ভাতা পেতাম। দুই বছর সেখানে কাজ করার পর, ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে পাশের গ্রাম শিবঙ্গ পাড়ায় টিউশনির উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাই। ২০১০ সালে আমার শ্বশুর হেডম্যান সুশীল জীবন চাকমার সহযোগিতায় আমি গ্রামে ফিরে আসার সুযোগ পাই।
গ্রামে ফিরে আমার মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় টিউশনি ও বাগান করা এবং তার সাথে চাঙমা লেখা শেখানো। কিন্তু মেরুং ইউনিয়নের পরিস্থিতি তখনো ভালো ছিল না। দিনের পর দিন উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তায় কেটে যেতে থাকে। এমনই এক কঠিন সময়ে আমার চাচা সরল কুমার চাঙমা, চাচাতো ভাই মন্তু চাঙমা এবং মন্তু চাঙমা ছেলে রিপন চাঙমাকে অপহরণ করা হয়। অপহরণ করেন রাজিব বাবু। প্রীতি দা তখন আমাকে দিঘীনালায় চলে আসার পরামর্শ দেন, কারণ গ্রামে থাকাটা অনিরাপদ ছিল। তাঁর কথা ভেবে ২০১৪ সালের দিকে আমি দিঘীনালায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করি।
এরই মধ্যে ২০০৯ সালের দিকে আমার স্ত্রী পাঁচ শতক জায়গা কিনে একটি বাড়ি তৈরি করেছিল। দিঘীনালায় আসার পর এক নতুন সমস্যার মুখোমুখি হই। একটি আনলকড নাম্বার থেকে বারবার কল আসছিল। অবশেষে একবার কল রিসিভ করলে অপর প্রান্ত থেকে আমাকে আমার শ্বশুরবাড়িতে (চংড়াছড়ি সুশীল হেডম্যান পাড়া) গিয়ে দেখা করতে বলা হয়। বিষয়টি প্রথমে সাধারণ মনে হলেও, সেখানে গিয়ে জানতে পারি আমাকে আরও একটি গ্রামে, বড়াদমে যেতে হবে। মনে উদ্বেগ নিয়ে বাবা, চাচাতো ভাই এবং স্ত্রীর বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বড়াদমের দিকে রওনা দিই। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই আবার জানানো হয় যে, চামিনি ছড়াতে যেতে হবে। ভরা দুপুরে এই বারবার দিক পরিবর্তনের কারণে আমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে ফিরে যেতে চাইলেও, দাদা আমাকে বুঝিয়ে রাজি করান। অবশেষে একটি পাহাড় পার হতে না হতেই আরও একটি ফোন আসে – এবার খামার পাড়ার অমুক বাড়িতে যেতে হবে। সেদিনের সেই মানসিক কষ্টের ঢেউ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যখন পৌঁছালাম, তখন দেখতে পেলাম রাজিব বাবুকে, যাকে আমি 'বনোই' বলে ডাকি। আমার শ্বশুর বাবা জানান যে, তিনি রাজিব বাবুকে আশ্রয় দিয়েছেন, কারণ তাঁর বাবার বিরুদ্ধে মানুষ মেরে ফেলার অভিযোগ ছিল এবং দুজন নিরপরাধ মানুষ মারা গিয়েছিল। এই ঘটনা 'উন্দ্রিক বাব আ ফাগারা' নামে কিংবদন্তি হয়ে আছে। সেখানে আমাকে প্রথম প্রশ্ন করা হয়, কেন আমি রাঙামাটিতে যোগাযোগ করেছি। এর আগে আমার ও বাবার ফোন কেড়ে নিয়ে চেক করা হয়। এরপর ৪০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ছয় মাসের জন্য আমার শ্বশুরবাড়িতে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
২০১৫ সালে গৃহবন্দী জীবন শেষ হওয়ার পর গ্রামের খারাপ পরিস্থিতির কারণে আমি গ্রামে না গিয়ে সরাসরি দিঘীনালায় চলে আসি। যদিও গ্রামে বাগান-বাগিচা ছিল, আমি সেখানে ফিরিনি। আমার উদ্দেশ্য ছিল ২০২০ সালের দিকে মাতৃভাষা নিয়ে কাজ শুরু করা এবং বাগান-বাগিচার কাজ শেষ করে দিঘীনালায় এসে সমাজের ও মাতৃভাষার জন্য আরও ভালোভাবে কাজ করা। কিন্তু ভাগ্য হয়তো অন্য কিছু চেয়েছিল; আমার ইচ্ছামতো কিছুই ঘটেনি।
দিঘীনালায় এসে আমি পূর্ণোদ্যমে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা শিক্ষা কোর্স শুরু করি ২০১৫ সালে। ২০১৯ সালের দিকে আমার মনে হয় দিঘীনালায় একটি 'অঝাপাত স্কোয়ার' প্রতিষ্ঠা করা যায় কিনা। একদিন কেভি দা, এলিন্সে এবং শতরুপাদির বাড়িতে গিয়ে প্রস্তাব দিলে তিনি আঞ্চলিক দলের সহযোগিতা নিতে বলেন। কিন্তু তাদের প্রতি আমার ভুল ধারণার কারণে আমি তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতে পারিনি, কারণ আমার মনে হতো তারা আমাকে সন্দেহের চোখে দেখে।
পরে ২০১৯ সালের দিকে পেলে বাবু সুভাষ বাবু হাতে এক লাখ টাকা নিঃশর্ত সহযোগিতা করেন, যা আমাকে সাহস যোগায়। এই সাহসে ভর করে একদিন আমি সভাপতি রোমান দা, জ্ঞান চাঙমা (চেয়ারম্যান) সহ আরও কয়েকজনের কাছে অঝাপাত স্কোয়ারের প্রস্তাব দিই। ত্রিদিব দা সবসময় ছায়ার মতো আমার পাশে ছিলেন। সকলের পরামর্শক্রমে ২০২২ সালের ১৭ই এপ্রিল সাইনবোর্ড লাগানো হয় – "অঝাপাত স্কোয়ার"। তবে কয়েক দিন যেতে না যেতেই জ্ঞান চাঙমা আমাকে ফোন করে সাইনবোর্ডটি দ্রুত খুলে ফেলার নির্দেশ দেন। আমি তখন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদে ছিলাম; বিকেলে ফিরে ত্রিদিব দাকে সঙ্গে নিয়ে সাইনবোর্ডটি খুলি।
এভাবে দিন কাটতে থাকে, কিন্তু অঝাপাত স্কোয়ার নামটি আমার মন থেকে মুছে যায়নি। সবসময় এটি মনে পড়ত। অবশেষে ২০২৬ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি এলাকার মায়মুরুব্বিদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয় যে, দিঘীনালার বাবুছড়া ও বাঘাইছড়ি সড়কের সংযোগ মোড়টির নাম 'অঝাপাত স্কোয়ার' হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে, ২০২৬ সালের ২৩শে মার্চ আবার সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়।
কিন্তু বেশি স্থায়ী হলো না। সে রাত ৯:৪৪ মিনিটে ত্রিদিব দা ফোন করে জানান যে কবাখালী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আমার সাথে কথা বলতে চান। আমি জ্ঞানকে ফোন করলেও সে রিসিভ করেনি। ৯:৫৯ মিনিটে একটি অচেনা নাম্বার থেকে কল আসে, সমীর দাদার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। তিনি জানতে চাইলেন আমি সাইনবোর্ড লাগিয়েছি কিনা। আমি বিনীতভাবে জানালাম যে, ২০১৭ সাল থেকে এটি আমার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, ২০২২ সালে একবার চেষ্টা করেও খুলতে হয়েছিল, আর এবার সকলের সম্মতিতে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই এটি করেছি।
২৪শে মার্চ ২০২৬, সকাল ১১:০২ মিনিটে সুবরণ চাঙমা ফোন করে জেএসএস অফিসে আসতে বলেন। অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম তারা মিন্টু দোগানে আছেন। সেখানে গিয়ে আমাকে অকথ্য ভাষায় অপমান করা হয়। চেয়ারম্যান বলেন, "আমি যতদিন চেয়ারম্যান থাকব, ততদিন আমার ইউনিয়নে কাজ করতে পারবে না। অন্য ইউনিয়নে কাজ না করে শুধু আমার ইউনিয়নে কেন কাজ করো। ইউপিডিএফ করো, জেএসএস করো। বেয়াদব। মানুষ চোখে দেখ না।" শামীল চাকমা ব্যঙ্গ করে "অঝাপাত, এ পাত..." বলতে থাকেন। আমার মনে হয় প্রীতি দা এই অপমান সহ্য করতে পারেননি। তিনি বলেন, "ইনজেব চাঙমা তো কারো ক্ষতি করার জন্য কাজ করছে না। যে জায়গা জিয়া স্কোয়ার, হাদি স্কোয়ার হতে পারে, তার দায় কে নেবে?" সেদিন বিকেলে বাড়ি ফিরে জানতে পারলাম, রাতের বেলা সাইনবোর্ডটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এরপর বিকেলে দুজন লোক নোটিশ নিয়ে আসে – জ্ঞান চাঙমার পাঠানো নোটিশ।
এই ঘটনাপ্রবাহ আমার ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং মাতৃভাষার প্রতি আমার অঙ্গীকারের এক জীবন্ত দলিল। শত বাধা, অপমান ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েও অঝাপাত স্কোয়ারের স্বপ্ন আমার মনে অমলিন। এই স্কোয়ারটি শুধুমাত্র একটি নাম নয়, এটি চাঙমা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য আমার নিবেদন এবং প্রতিরোধের প্রতীক।
২৬ মার্চ ২০২৬। জেএসএস অফিসে ত্রিদিব দা সহ গেলাম। নোটিশ বিষয়ে কথা বলার জন্য। অফিসে যাবার আগে জ্ঞান চাঙমাকে দেখে তার কাছে গেলাম। বলল, দা, যাবে কিনা অফিসে। তিনি তারাতারি বললেন, তুমি যাকে দেখেছো তার কাছে যাও। তোমাকে দেখলে রাগ হয় আমার। তোমাকে আমি মারবো। ইত্যাদি ইত্যাদি।
এরপর অফিসে গেলাম। সেখানে নিশিত বাবু আ সমির বাবু ছিল। কিছুক্ষণ পরে বাবুছড়া, দিঘীনালা, মেরুং ইউনিয়নে চেয়ারম্যান উপস্থিত হয়। সবকথা বলার শেজে বুঝা গেল, যে অঝাপাত সাইনবোর্ড দিয়েছি সে সাইনবোর্ড জ্ঞান চাঙমা ভেঙ্গে দিয়েছে। তারাদের অভিযোগ,
১। সেটির নাম মাইন রিসোর্ট আর কোন নাম হতে পারেনা।
২। সাইনবোর্ড দেওয়ার আগে তাদেরকে জানানো হয়নি।
এতে আমাদের যুক্তি মাইনি রির্সোট একটি প্রতিষ্ঠান। ঐটাই থাকবে। সবাই যখন সম্মিতি দিয়েছিল আর কাহারো কাছ থেকে অনুমতি প্রয়োজনবোধ করছিনা। কেনান, এতে ব্যক্তি কাহারো স্বার্থকতা নেই। এটি সার্বজননি।
আমার আর বুঝতে বাকি ছিল না যে তারা সেনাবাহিনী এজেন্ট হয়ে কাজ করছে। যদিও আগে ধারণা ছিল তা স্পষ্ট নয়। এখন আয়না মতো পরিষ্কার হলো। তার সাথে তাল মেলিয়ে বাবুছড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান গগনবিকাশ চাঙমা। জানিনা জাতি কি এ সমস্ত দালালিদের নিয়ে কি অস্ত্বিত্ব রক্ষা করতে পারবে?

