“মানুষেরআয়ুফুরিয়েযায়, কিন্তুমানুষেরমহৎকর্মসময়েরবুকথেকেকখনোমুছেযায়না।”
 |
| আনন্দ মোহন চাঙমা |
পৃথিবীতে
মানুষ আসে ক্ষণিকের জন্য;
কিন্তু সবাই সময়ের স্মৃতিতে
জায়গা করে নিতে পারে
না। কেউ নিজের জীবনকে
ব্যক্তিগত সুখ-
দুঃখের গণ্ডিতে
সীমাবদ্ধ রাখে,
আবার কেউ নিজের
স্বপ্ন,
শ্রম ও সাধনাকে
সমাজের কল্যাণে বিলিয়ে দিয়ে হয়ে ওঠে
একটি জাতির আলোকবর্তিকা। মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার নাম কিংবা
পদবিতে নয়—
তার পরিচয়
লুকিয়ে থাকে তার কর্মে,
ত্যাগে এবং মানুষের জন্য
রেখে যাওয়া ভালোবাসার চিহ্নে।
চাঙমা
জাতির অঝাপাত লিপি, মাতৃভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের আকাশে
যাঁরা নীরবে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়ে
চলেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম এক উজ্জ্বল নাম
সুনানু আনন্দ মোহন চাঙমা, যিনি
সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে
“আনন্দ ময়” নামে পরিচিত।
তিনি কেবল একজন শিক্ষক
নন; তিনি একজন লেখক,
কবি, গবেষক, সংগঠক, সংস্কৃতিসেবক এবং জাতিগত আত্মপরিচয়ের
এক নিবেদিতপ্রাণ কর্মী।
তাঁর
জীবন যেন একটি দীর্ঘ
যাত্রাপথ, যে পথে আছে
শিক্ষা, সমাজসেবা, সাহিত্যচর্চা, সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা এবং নিজ জাতির
ভাষা ও ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে
রাখার এক নিরলস অঙ্গীকার।
১৯৫৪
সালের ৮ জুলাই, পার্বত্য
প্রকৃতির সবুজ ছায়াঘেরা মায়নী
নদীর উপত্যকায় বাঘাইছড়িদুঅর নামক জনপদে জন্মগ্রহণ
করেন সুনানু আনন্দ মোহন চাঙমা। তাঁর
পিতা ছিলেন চিত্রজিৎ চাঙমা এবং মাতা রঞ্জিতা
চাঙমা।
পাহাড়ের
নিসর্গ, ঝিরির কলকল ধ্বনি, বনভূমির
নীরবতা এবং চাঙমা সমাজের
লোকজ ঐতিহ্যের ভেতর দিয়ে তাঁর
শৈশব বেড়ে ওঠে। সেই
শৈশবের মাটি থেকেই তিনি
শিখেছিলেন—মানুষ একা বাঁচে না;
মানুষ বেঁচে থাকে তার সমাজ,
ভাষা, সংস্কৃতি ও পূর্বপুরুষের স্মৃতিকে
ধারণ করে।
তাঁর
শিক্ষাজীবনের শুরু হয় জ্ঞানাঙ্কুর
বৌদ্ধ বিহারপালি টোলে। পরে তিনি উদলবাগান
প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং বাবুছড়া উচ্চ
বিদ্যালয়ে শিক্ষা লাভ করেন। শিক্ষা
তাঁর কাছে কেবল চাকরির
পথ ছিল না; শিক্ষা
ছিল মানুষকে আলোকিত করার এক মহৎ
শক্তি।
১৯৭৩
সালের ২৮ মে তিনি
ধনপাতা চন্দ্রমনি কার্বারীপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সেই
দিন থেকে তাঁর হাতে
ধরা পড়ে শুধু পাঠ্যবই
নয়—ধরা পড়ে ভবিষ্যৎ
প্রজন্মের স্বপ্ন।
পরবর্তীতে
তিনি উদলবাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২ নং বাঘাইছড়ি
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিষ্ঠা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে
শিক্ষকতা করেন। এর ফাঁকে ১৯৭৭
সালে স্বীয় পিতা ও মাতার
নামে নিজ গ্রামেই প্রতিষ্ঠা
করেন চিত্রজিৎ রঞ্জিতা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকে নিরলসভাবে
সরকারের সাথে দেনদরবার করার
ফলশ্রুতিতে ১৯৮৪
ইং হতে সরকারি কার্যাক্রম
শুরু হয়। জীবনের দীর্ঘ
পথ পেরিয়ে ২০১২ সালে তিনি
নিজেরই প্রতিষ্ঠিত চিত্রজিৎ-রঞ্জিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শিক্ষকতা জীবন
সমাপ্ত করেন।
কিন্তু
তাঁর শিক্ষকতা কখনো বিদ্যালয়ের চার
দেয়ালে সীমাবদ্ধ ছিল না। তিনি
বিশ্বাস করতেন—একজন শিক্ষক কেবল
অক্ষর শেখান না; তিনি মানুষের
ভেতরে স্বপ্ন জাগান, বিবেক জাগান এবং নিজের সমাজ
ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করেন।
শিক্ষকতার
পাশাপাশি তিনি নিজেকে নিবেদন
করেন সমাজ ও সংস্কৃতির
কাজে। ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসাবকে
পেছনে রেখে তিনি চাঙমা
জাতির ভাষা, সাহিত্য, অঝাপাত লিপি ও সাংস্কৃতিক
ঐতিহ্য সংরক্ষণের কাজে যুক্ত হন।
নব্বই
দশকের বিরাজিত পার্বত্য পরিস্থিতির শিকার হয়ে তিনি পঙ্গুত্ব
বরণ করেন এবং জীবনের
নিরাপত্তার তাগিদে ১৯৮৯ হতে ১৯৯৪
ইং পর্যন্ত প্রায় ৬ বছরের কাছাকাছি
ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে শরনার্থী হিসেবে আশ্রয় নেওয়ার পরে তৎকালীন বিএনপি
সরকার ও জুম্ম শরনার্থী
কল্যাণ সমিতির সাথে সমঝোতা চুক্তির
মাধ্যমে ১৯৯৪ সালে ২৪
শে আগষ্ট তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
করেন। প্রত্যাবর্তনের পরপরেই তিনি নিজ এলাকায়
প্রতিষ্ঠা করেন “চাঙমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী”নামে একটি সংস্কৃতি
সংগঠন। এটি শুধু একটি
সংগঠন ছিল না; ছিল
চাঙমা সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে
পৌঁছে দেওয়ার এক স্বপ্নের ঠিকানা।
সংগঠনটির গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনাগত দায়িত্ব পালন করে তিনি
সাহিত্য, নাটক, গান ও সাংস্কৃতিক
কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জাতিগত চেতনা জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেন।
সুনানু
আনন্দ মোহন চাঙমার কর্মজীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে
জনমানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁর সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি
জাতির আত্মপরিচয় টিকে থাকে তার মাতৃভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতির চর্চার মধ্য
দিয়ে। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি একের পর এক ব্যতিক্রমধর্মী উদ্যোগ গ্রহণ করেন, যা আজও
চাঙমা সমাজে স্মরণীয় হয়ে আছে।
দীঘিনালায়
পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা এবং সাহিত্যচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের লক্ষ্যে ১৯৯৫ সালের
১২ এপ্রিল তাঁর প্রত্যক্ষ উদ্যোগে আয়োজন করা হয় দীঘিনালার প্রথম বইমেলা।
পার্বত্য অঞ্চলে বইকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াস ছিল সময়ের তুলনায় অত্যন্ত
সাহসী ও দূরদর্শী পদক্ষেপ। বইমেলাটি শুধু বই কেনাবেচার আয়োজন ছিল না; এটি ছিল জ্ঞান,
সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মুক্তচিন্তার এক মিলনমেলা।
মাতৃভাষা
শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা গভীরভাবে উপলব্ধি করে তিনি ২০০৭ সালের ২৬ মার্চ চাঙমা
বর্ণমালা কোর্স চালু করেন। এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিশু-কিশোরসহ নতুন প্রজন্মের মধ্যে
অঝাপাত লিপি ও চাঙমা ভাষা শেখার আগ্রহ সৃষ্টি হয় এবং মাতৃভাষা শিক্ষার একটি সুসংগঠিত
ভিত্তি নির্মাণের পথ উন্মুক্ত হয়।
ভাষা,
সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চায় অসামান্য অবদান রাখা গুণীজনদের যথাযোগ্য সম্মান প্রদর্শনের
ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন অগ্রণী। ২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস
উপলক্ষে তাঁর উদ্যোগে বিশিষ্ট সাহিত্যিক, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিসেবী ও সমাজকর্মীদের
সম্মাননা প্রদান করা হয়। সেদিন সম্মাননায় ভূষিত হন মুকুন্দ চাঙমা, আর্য্যমিত্র চাঙমা,
লালন কান্তি চাঙমা, কেভি দেবাশীষ চাঙমা, জ্ঞানকীর্তি চাঙমা, কৃতি চাঙমা, ইনজেব চাঙমা, , পলাশ বড়ুয়া এবং জাহাঙ্গীর আলম রাজু।
একই অনুষ্ঠানে মরণোত্তর সম্মাননা প্রদান করা হয় নোয়ারাম চাঙমা, সুধীরঞ্জন বড়ুয়া,
সুহৃদ চাঙমা এবং গোরিকা বালা ত্রিপুরাকে।
এই
সম্মাননা অনুষ্ঠান ছিল কেবল পুরস্কার প্রদানের আনুষ্ঠানিকতা নয়; বরং চাঙমা ভাষা, সাহিত্য
ও সংস্কৃতির বিকাশে যাঁরা আজীবন অবদান রেখে গেছেন, তাঁদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা
প্রকাশের এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ। এর মধ্য দিয়ে তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে একটি সুস্পষ্ট
বার্তা পৌঁছে দেন, যে জাতি তার গুণীজনকে সম্মান করতে জানে, সেই জাতির ইতিহাস ও সংস্কৃতি
কখনো বিলীন হয় না।
শিক্ষকতা
পেশার সার্থক আলো ছড়াতে ১৯৯৫
সালের প্রারম্ভে তিনি বাবূছড়া ইউনিয়নের
ধনপাতা এলাকার ও দীঘি নালা
ইউনিয়নের কেশব চন্দ্র পাড়ার
গন্যমান্য ব্যক্তিদেরকে নিজ বাড়িতে দেখে
এনে ও সর্বসম্মত মতামত
গ্রহণ করে "ধনপাতা বাঙাল্যা করুনা পাড়া রেজিঃ বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়"ও "কেশব চন্দ্র পাড়া
রেজিঃ বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়" নামে দুটি বেসরকারী
প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কাজে হাত দেন
ও বাবুছড়া কলেজের জন্যও ১০ শতক (ক্রয়মূল্য) জমি দান করেছেন। যা বর্তমানে সরকারি
প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে দুটি ও কলেজ প্রতিষ্ঠানই স্বগৌরবে অবস্থান
করতেছে। একই সময়ে
তিনি জুম্ম ফুল অনাথ আশ্রমের
কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত হয়ে অসহায় শিশুদের
পাশে দাঁড়ান। প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে গেলেও
মানুষের প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতার এই
অধ্যায় আজও তাঁর জীবনের
মানবিক পরিচয় বহন করে। এতদভিন্ন
তিনি ক্রসুত্রে প্রাপ্ত জমি দান করে
তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান বাবু
শাক্য মুনি চাকমার সহযোগিতায়
"বাঘাইছড়ি মুখ কমিউনিটি ক্লিনিক"
প্রতিষ্ঠা করে বিনামূল্যে শত
শত মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার পর সুগম করে
দিয়েছেন।
ভাষা
কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি
জাতির আত্মা, ইতিহাস ও অস্তিত্বের স্মারক।
এই উপলব্ধি থেকেই ২০০৮ সালের ২৬
জুলাই জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি—ইউএনডিপির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় তিনি বাংলাদেশ চাঙমা
ভাষা পরিষদে গবেষক সহকারী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
চাঙমা
ভাষার গবেষণা, সংরক্ষণ ও বিকাশে তাঁর
এই ভূমিকা ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
ভাষার ভেতর যে জাতির
স্মৃতি লুকিয়ে থাকে, সেই স্মৃতিকে ভবিষ্যৎ
প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার
কাজে তিনি নিজের শ্রম
ও মেধা নিবেদন করেন। শিক্ষা
ও সংস্কৃতির পাশাপাশি তিনি স্থানীয় উন্নয়ন
ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন।
২০০৫
সালে তিনি প্রায় একটানা
১৮ বছর উদলবাগান উচ্চ
বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২
সালের ৮ই জুলাই শিক্ষকতা
থেকে অবসর গ্রহণের পর-পরেই তিনি বাংলাদেশ
পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের আওতাধীন দীঘিনালা উপজেলা কেন্দ্রীয় সমবায় সমিতির চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে একটানা ৯বছর
অর্থাৎ তিন পিরিয়ড মেয়াদ
সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন
করে গেছেন। অবশ্য একই সময়ে
তিনি চিত্রজিৎ-রঞ্জিতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও বাবুছড়া কলেজ প্রতিষ্ঠাতা সদস্য
হিসেবেও দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
এই
একই বছরের ৪ জানুয়ারি তিনি
নিজ এলাকায় “আনন্দ বাজার” নামে একটি বাজার
প্রতিষ্ঠা করেন। স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে
সহজতর করার লক্ষ্যে গড়ে
ওঠা এই বাজারের পরিচালনা
কমিটির সভাপতির দায়িত্বও তিনি পালন করেন।
তিনি সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সরকারি প্রশাসনেরও একজন প্রিয়
ব্যক্তি হিসেবে দীঘিনালা উপজেলার ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ কমিটি ও ত্রাণ ও
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির অনারারি সদস্য হিসেবে কাজ করে গেছেন
এবং বর্তমানেও উপজেলা ধান চাউল ক্রয়
কমিটি, উপজেলা আইন শৃঙ্খলা কমিটির
অনারারি সদস্য এবং দুর্নীতি দমন
কমিশন, চট্টগ্রাম ব্যুরো কর্তৃক অনুমোদিত উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে
দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
২০১৩
সালে তিনি দীঘিনালা নাট্যদলের
সার্বিক তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নাটক তাঁর কাছে
ছিল মানুষের জীবন, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজের কথা
বলার এক জীবন্ত শিল্পমাধ্যম।
২০১৫
সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের
উদ্যোগে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের
বহুভাষিক মাতৃভাষা বিষয়ক লেখক সহকারী হিসেবে
কাজ করেন তিনি। মাতৃভাষায়
শিক্ষার প্রসার এবং চাঙমা ভাষার
পাঠ্যসামগ্রী তৈরিতে তাঁর এই ভূমিকা
ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ
অবদান।
২০১৭
সালে বাংলাদেশের নিবন্ধিত সংগঠন “চাঙমা সাহিত্য পরিষদ”-এর তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে
দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তাঁর
সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক পথচলা
আরও বিস্তৃত হয়।
সুনানু
আনন্দ মোহন চাঙমা কেবল
সংগঠক বা শিক্ষক নন;
তিনি একজন সৃজনশীল লেখক
ও সাহিত্যসাধক। তাঁর রচনায় চাঙমা
জাতির ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা এবং আত্মপরিচয়ের
নানা রূপ উঠে এসেছে।
তাঁর
উল্লেখযোগ্য সাহিত্য ও সৃজনকর্মের মধ্যে
রয়েছে- ১। “কার্পাচ্চোই সেপ
খেলং- ১৭৮৫” আগরতলা, ১২ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪;
২। “চাঙমা জাদর বিজক” বুদ্ধপূর্ণিমা,
২০ মে ১৯৯৬; ৩। চাঙমা ভাষা
শিক্ষার গ্রন্থ “পগোনপাদা” ১৩ এপ্রিল ২০০৬।
এই
রচনাগুলো কেবল সাহিত্যকর্ম নয়;
এগুলো চাঙমা জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ভাষাগত অস্তিত্ব
রক্ষার একেকটি সৃজনশীল দলিল।
নিজের
জন্য নয়, সমাজের জন্য
তাঁর জীবন যেন নীরবে
একটি কথাই বলে—
“নিজের
জন্য বাঁচা সহজ; কিন্তু সমাজ
ও জাতির জন্য কিছু করতে
হলে ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের অনেক
কিছু ত্যাগ করতে হয়।”
জীবনের
লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি বিশ্বাস করেছেন—মানুষের প্রকৃত অর্জন তার ব্যক্তিগত সম্পদে
নয়; বরং সমাজের জন্য
রেখে যাওয়া কর্মে। তাঁর পথচলা তাই
কেবল একজন মানুষের ব্যক্তিগত
জীবনের ইতিহাস নয়; এটি চাঙমা
সমাজের শিক্ষা, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি
এক মানুষের দীর্ঘ ভালোবাসার ইতিহাস। একটি জাতির ভাষা
ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা কোনো সহজ
দায়িত্ব নয়। সীমিত সুযোগ,
নানা প্রতিবন্ধকতা এবং দীর্ঘ সংগ্রামের
মধ্যেও যাঁরা নিজেদের শ্রম, সময় ও মেধা
জাতির জন্য উৎসর্গ করেন,
তাঁরা ইতিহাসের নীরব নির্মাতা।
সুনানু
আনন্দ মোহন চাঙমা তেমনই
একজন কর্মসাধক। তিনি আলোচনার কেন্দ্র
হওয়ার জন্য কাজ করেননি;
তিনি কাজ করেছেন চাঙমা
ভাষা ও সংস্কৃতির আলোকে
আরও উজ্জ্বল করার জন্য। তাঁর
জীবন আমাদের শেখায়, একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের
বাইরে এসে একজন গবেষক
হতে পারেন, একজন সংগঠক হতে
পারেন, একজন সংস্কৃতির রক্ষক
হতে পারেন এবং একটি জাতির
স্মৃতি সংরক্ষণের দায়িত্বও নিতে পারেন।
মানুষের
জীবন ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু মহৎ কর্মের আয়ু
দীর্ঘ। সময় একদিন মানুষের
নামকে স্মৃতির আড়ালে নিয়ে যায়; কিন্তু
সমাজের জন্য করা সৎ
ও সৃজনশীল কাজ প্রজন্মের পর
প্রজন্ম আলো ছড়ায়। সুনানু
আনন্দ মোহন চাঙমা (আনন্দ
ময়) চাঙমা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে
এমনই এক আলোকিত পথিক।
তাঁর শিক্ষা, সাহিত্য, গবেষণা, সংগঠন ও সমাজসেবার কর্মধারা
আগামী প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে।
চাঙমা
ভাষা, অঝাপাত লিপি, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অগ্রযাত্রায়
তাঁর কর্মের আলো যুগ থেকে
যুগান্তরে ছড়িয়ে পড়ুক।