বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রগতি খীসা: প্রতিকূলতার পথ পেরিয়ে সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে এক অভিযাত্রা - ইনজেব চাঙমা

জীবন কখনো সরলরেখায় এগিয়ে চলে না কখনো তা কণ্টকাকীর্ণ পথ, কখনো অন্ধকার গিরিপথ, আবার কখনো প্রতিকূলতার বুক চিরে উঠে আসা আলোর রেখা মানুষের জীবনকে বুঝতে হলে শুধু তার সাফল্যের দিকে তাকালে চলে না; জানতে হয় সেই সাফল্যের পেছনে থাকা দীর্ঘ সংগ্রাম, বঞ্চনা, স্বপ্ন অদম্য পথচলার ইতিহাস প্রগতি খীসার জীবনও তেমনই এক পাঠক্রমযেখানে পারিবারিক ঐতিহ্য, শিক্ষার সাধনা, সাহিত্যচর্চা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে নিরন্তর লড়াই পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে

প্রগতি খীসা জন্মগ্রহণ করেন মার্চ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার ৫৯ নম্বর বন্দুকভাঙ্গা মৌজার দুরখেয়া গ্রামে পিতা কংশসুর খীসা এবং মাতা তনুপতি খীসা পাহাড়, নদী, ঝরনা প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে তাঁর শৈশবের শিকড় বিস্তৃত তাঁর মাতৃপরিবারের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে চাকমা সমাজের একটি ঐতিহ্যবাহী বংশপরম্পরা তাঁর মা তনুপতি খীসার জন্ম বেড়ে ওঠা চেঙীনদীর তীরে, বুড়িঘাটের অনতিদূরের ছোট মহাপ্রুম গ্রামে চাকমা গোজাগোষ্ঠীর বিবেচনায় তিনি ওয়াংজাগোজা কালাহাঙারা গোষ্ঠীর রনুখাঁ দেওয়ানের রক্তসম্পর্কীয় সদস্য ছিলেন ফলে প্রগতির পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে পাহাড়ের সামাজিক-ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের একটি গভীর যোগসূত্রও বিদ্যমান

তাঁদের পরিবার ছিল বড় পরিবার ভাই-বোনের মধ্যে ছিলেনচন্দ্র হংস খীসা, সুনীতি বিকাশ খীসা, সুমিত্রা খীসা, পদ্মশোভা খীসা, জ্ঞান বিকাশ খীসা, প্রগতি খীসা, জ্যোৎস্না দেবী খীসা এবং বিজয় খীসা তাঁদের বোন সুমিত্রা খীসা অকালেই, ১৯৮১ সালে, যৌবন বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই অকালবিয়োগও পারিবারিক জীবনে রেখে যায় গভীর শূন্যতার স্মৃতি

প্রগতি খীসার পারিবারিক ইতিহাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় তাঁর পিতামহ স্বর্গীয় নবীনা খীসাকে ঘিরে তিনি ছিলেন গ্রামের কার্বারী বা গ্রামপ্রধান কার্বারী হিসেবে স্থানীয় সমাজে তাঁর ছিল বিশেষ মর্যাদা এবং দায়িত্ব সেই সূত্রে চাকমা রাজপরিবারের সঙ্গেও তাঁদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল

পারিবারিক স্মৃতিতে সংরক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো১৯৫৮ সালে নবীনা খীসার সাদর আমন্ত্রণে তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় তাঁদের আতিথ্য গ্রহণ করেন সে সময় তিনি বন্দুকভাঙ্গার বিরেজমরা তানজাং জলপ্রপাত বন্দুককানা মোন (যমচুগ) দর্শন করেন বহু বছর পর ২০২১ সালে চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ও বিরেজমরা তানজাং দর্শন করেন এবং তাঁদের বাড়িতে রাত্রিযাপন করেন এই ঘটনাগুলো শুধু একটি পরিবারের স্মৃতি নয়; এর মধ্যে পাহাড়ের সামাজিক সম্পর্ক, আতিথেয়তা এবং ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিকতাও প্রতিফলিত হয় এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বুকে নিয়েই প্রগতি খীসার বেড়ে ওঠা কিন্তু ঐতিহ্যের মর্যাদা থাকলেও তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল সহজ মসৃণ নয়

জীবনের প্রথম পাঠ শুরু হয় করল্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এরপর তিনি মাচ্ছ্যা পাড়া (চারিখ্যং) নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, বন্দুকভাঙ্গা থেকে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন

পরবর্তী সময়ে রাঙ্গামাটির শাহ (বহুমুখী) উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে ১৯৯০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এরপর রাজানগর রাণীরহাট কলেজ থেকে ১৯৯২ সালে এইচএসসি পাস করেন উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চট্টগ্রামের নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৯৫ সালে দ্বিতীয় বিভাগে বি.. ডিগ্রি অর্জন করেন

তাঁর শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা এখানেই থেমে থাকেনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এম.. অধ্যয়নরত অবস্থায় ভদন্ত সুমনালঙ্কার মহাথেরের আহ্বানে তিনি খাগড়াছড়ির পিবিএম আবাসিক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হয়ে ওঠার এই পরিবর্তন তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক এর পাশাপাশি ধর্মীয় পালি শিক্ষার প্রতিও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ পালি সংস্কৃত শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা থেকে বিনয় উপাধি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন

তবে তাঁর নিজের ভাষায়, কার্বারী পরিবারের সন্তান হয়েও তাঁর পড়াশোনার সময়টি সঙ্গত কারণে সুখকর ছিল না নানা প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে তাঁকে শিক্ষার পথ এগিয়ে নিতে হয়েছে তাই তাঁর শিক্ষাজীবনের সাফল্য কেবল কয়েকটি সনদ অর্জনের ইতিহাস নয়; এটি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার এক নীরব কাহিনি

প্রগতি খীসার সাহিত্যচর্চার শুরু স্কুলজীবন থেকেই শৈশব-কৈশোরে যে অনুভব, প্রকৃতি জীবনবোধ তাঁর মনে সঞ্চিত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোই কবিতার ভাষা পেয়েছে পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের জীবন, ভালোবাসা, বেদনা, স্বপ্ন সামাজিক বাস্তবতা তাঁর সাহিত্যচিন্তার পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে তাঁর প্রকাশিত একক কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে. মনচিদ আহ্ঙী যায় . জুম পাহাড়ের সংলাপ . বেদনার পদাবলি

তাঁর কবিতা বিভিন্ন সংকলন সাহিত্যপত্রে স্থান পেয়েছে রান্ন্যাফুল কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত চাকমা শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলন, উপজাতীয় কালচারাল ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিংশ শতাব্দীর কবিতা গ্রন্থ এবং ত্রিপুরা রাজ্য থেকে প্রকাশিত চাকমা সাহিত্যপত্র মাদি-তে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে কলকাতার বোধিভারতী বৌদ্ধ সাহিত্যপত্রেও তাঁর সাহিত্যকর্ম প্রকাশের উল্লেখ পাওয়া যায় এছাড়া বাংলা একাডেমি কর্তৃক ২০২৬ সালে প্রকাশিত চাকমা সাহিত্যবিষয়ক গ্রন্থেও তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে

কবিতার পাশাপাশি বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকীতে তাঁর বহু মননশীল কবিতা, প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ফলে তিনি শুধু কবি নন; সাহিত্যচর্চার বিস্তৃত পরিসরেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে

সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীতের প্রতিও প্রগতি খীসার রয়েছে গভীর অনুরাগ ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বেতার, রাঙ্গামাটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে আধুনিক গানের তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্তি তাঁর সৃজনশীল জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন শব্দ সুরের জগতে তাঁর এই সম্পৃক্ততা তাঁর বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে আরও সমৃদ্ধ করেছে

১৯৯৮ সালে বনিতা চাকমার সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক জীবন শুরু হয় দাম্পত্য জীবনে তাঁদের তিন পুত্রসন্তানপ্রমী খীসা, অতীন্দ্রিয় খীসা কৌশিক এবং পত্থম খীসা সাহিত্য, শিক্ষা সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবারও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন ব্যক্তিজীবনের দায়িত্ব এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে সমান্তরালে এগিয়ে নেওয়া তাঁর জীবনযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য দিক

প্রগতি খীসার কর্মপরিসর কেবল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয় বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি চাকমা রাজবিহার, রাঙ্গামাটির কার্যনির্বাহী পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এরপর ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত রাজবন বিহারের উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন

তিনি তাঞ্জাং শিল্পীগোষ্ঠী, রাঙ্গামাটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একইভাবে পার্বত্য শিক্ষা সহায়ক ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট, রাঙ্গামাটির সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ এসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন বর্তমানে তিনি CHT Writers Union-এর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন এসব দায়িত্বের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠেসাহিত্য তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত সৃষ্টির ক্ষেত্র নয়, বরং সমাজ সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতারও একটি মাধ্যম

সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা লাভ করেছেন তাঁর এই স্বীকৃতিগুলো ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি পাহাড়ের সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অবদানেরও স্বীকৃতি বহন করে

প্রগতি খীসার জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ কবিতা বলা হয়, তবে তার প্রতিটি স্তবকে রয়েছে সংগ্রামের ছাপ, শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার এবং সৃষ্টিশীলতার আলো কার্বারী পরিবারের ঐতিহ্য তাঁকে দিয়েছে শিকড়ের পরিচয়; প্রতিকূল শিক্ষাজীবন তাঁকে দিয়েছে দৃঢ়তা; সাহিত্য তাঁকে দিয়েছে আত্মপ্রকাশের ভাষা; আর সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তাঁকে দিয়েছে মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ

তাঁর জীবন তাই কেবল একজন কবি বা শিক্ষিত মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকথা নয় এটি পাহাড়ের এক প্রজন্মের সংগ্রাম, স্বপ্ন সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়েরও একটি প্রতিচ্ছবি জীবনের শুরুতে যে পথ ছিল বন্ধুর, সেই পথেই তিনি ধীরে ধীরে নিজের জন্য নির্মাণ করেছেন আলোর সিঁড়ি প্রতিকূলতা তাঁকে থামাতে পারেনি; বরং প্রতিটি বাধা তাঁর পথচলাকে আরও দৃঢ় করেছে তাই প্রগতি খীসার জীবন-পাঠক্রম শেষ হয়ে যায় কোনো একটি ডিগ্রি, পদ বা পুরস্কারে নয়এটি চলমান, যেমন পাহাড়ের ঝরনা চলতে থাকে আপন গতিতে

শিকড় থেকে উঠে এসে শব্দের ভুবনে নিজের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রেখে যাওয়াএই হলো প্রগতি খীসার জীবনযাত্রার মূল সুর

 

সার্টিফিকেটের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষিত মানুষ - ইনজেব চাঙমা

শিক্ষিত মানুষ কি সত্যিই শিক্ষিত? প্রশ্নটি খুব সাধারণ। অথচ এর উত্তর খুঁজতে গেলেই আমরা যেন এক গভীর অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়ে যাই। ঘরে ঘরে আজ শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই। দেওয়ালে ঝুলছে একের পর এক সার্টিফিকেট, নামের পাশে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন ডিগ্রি, পরিচয়ের সঙ্গে বাড়ছে শিক্ষাগত যোগ্যতার তালিকা। কিন্তু সেই শিক্ষার কতটুকু মানুষের আচরণে, কথায়, বিবেকে কিংবা মানবিকতায় ফুটে উঠছে—সেই হিসাবটি যেন কেউ রাখে না।

আমরা কাগজে শিক্ষিত হচ্ছি, কিন্তু হৃদয়ে কতটা? আমরা অক্ষর চিনতে শিখছি, কিন্তু মানুষ চিনতে শিখছি তো? আমরা বইয়ের পাতা মুখস্থ করছি, কিন্তু জীবনের পাতাগুলো পড়তে পারছি তো?

আজকাল কখনো কখনো মনে হয়, সার্টিফিকেট যেন শিক্ষার পরিচয়পত্র নয়—অহংকারের অলংকার হয়ে উঠেছে। যার নামের পাশে যত বেশি ডিগ্রি, তার কণ্ঠে কখনো কখনো তত বেশি আত্মম্ভরিতা। অথচ সত্যিকারের জ্ঞান তো মাথা উঁচু করার আগে মাথা নত করতে শেখায়। জ্ঞান যার গভীর, তার বিনয়ও তত গভীর।

সমুদ্র কখনো তার গভীরতার শব্দ করে না। বিশাল বৃক্ষ কখনো নিজের ছায়ার বিজ্ঞাপন দেয় না। আকাশ কখনো তার বিশালত্ব নিয়ে গর্ব করে না। প্রকৃত বড়ত্বের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়, নীরবতা। মানুষের ছায়া যখন অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ হয়ে যায়, তখন বুঝতে হয়, সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। জীবনের অহংকারও অনেকটা তেমন। অহংকারের ছায়া যত দীর্ঘ হয়, পতনের সূর্য ততই অস্তমুখী হয়।

তবু মানুষ অহংকার করে- তার অর্থ নিয়ে, তার ক্ষমতা নিয়ে, তার পদ নিয়ে, তার সৌন্দর্য নিয়ে, তার জ্ঞান নিয়ে, এমনকি তার সার্টিফিকেট নিয়েও। কিন্তু মানুষ কি কখনো ভেবে দেখে—
যে জ্ঞান আমাকে অন্যকে ছোট করতে শেখায়, সে জ্ঞান কি সত্যিই জ্ঞান? যে শিক্ষা আমাকে বিনয়ী করতে পারে না, সে শিক্ষা কি সত্যিই শিক্ষা?

সিদ্ধার্থের কথা মনে পড়ে। যে মানুষটির সামনে ছিল রাজপ্রাসাদের সমস্ত সুখ, মাথার ওপর ছিল রাজমুকুটের সম্ভাবনা, চারপাশে ছিল ঐশ্বর্যের অঢেল আয়োজন—তিনি একদিন সেই সবকিছুর মায়া পেছনে ফেলে বেরিয়ে গেলেন। রাজ্য ছেড়েছিলেন, প্রাসাদ ছেড়েছিলেন, পরিচিত পৃথিবী ছেড়েছিলেন- খুঁজেছিলেন এমন এক সত্য, যা মানুষের অন্তরকে মুক্ত করতে পারে।

তিনি বুঝেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাসাদও মানুষের অস্থির মনকে শান্ত করতে পারে না, যদি সেখানে সত্যের আলো না থাকে। ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা একই শিক্ষা পাই।

রামায়ণ থেকে মহাভারত- কত রাজ্য ধ্বংস হয়েছে, কত পরিবার ভেঙে গেছে, কত স্বপ্ন মাটিতে মিশে গেছে! অথচ সব ধ্বংসের শুরু তলোয়ারের ঝলকে হয়নি। অনেক ধ্বংসের শুরু হয়েছিল একটি কথা থেকে। একটি কুমন্ত্রণা থেকে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত থেকে।

কৈকেয়ীর কানে মন্ত্রার কথাগুলো পৌঁছেছিল- আর তার পরিণতিতে রামের বনবাস। রাবণের কাছে পৌঁছেছিল ভুল পরামর্শ, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অন্ধ অহংকার—শেষ পর্যন্ত সোনার লঙ্কাও রক্ষা পেল না। দুর্যোধন শুনেছিল শকুনির কূটবুদ্ধির কথা। বিবেকের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলাফল- কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে রক্তাক্ত হয়ে পড়েছিল এক বিশাল বংশের অহংকার। ইতিহাস তাই শুধু অতীতের গল্প নয়। ইতিহাস হলো সময়ের রেখে যাওয়া আয়না। সে আয়নায় আমরা চাইলে অন্যের মুখ দেখতে পারি, আবার চাইলে নিজের মুখটিও দেখতে পারি। দুঃখ শুধু একটাই- আমরা ইতিহাস পড়ি, কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করি না।

আমরা রাবণের পতনের গল্প বলি, কিন্তু নিজের অহংকারের দিকে তাকাই না। আমরা দুর্যোধনের ভুল নিয়ে কথা বলি, কিন্তু নিজের চারপাশের কুমন্ত্রণাকে প্রশ্ন করি না। আমরা রামের বনবাসের কথা জানি, কিন্তু ভুল কথা শুনে নিজের জীবনে কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি- সেই প্রশ্নটি করি না। তাহলে আমাদের শিক্ষার আলো কোথায়?

শিক্ষা তো শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার নাম নয়। শিক্ষা হলো, কথা বলার আগে ভাবতে শেখা অন্যের কথা শোনার পর সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে শেখা। ভুল করলে মাথা নত করে বলতে শেখা—“আমি ভুল করেছি।” শিক্ষা হলো এমন এক আলো, যে আলো প্রথমে অন্যের পথ নয়—নিজের ভেতরের অন্ধকারকে আলোকিত করে। আমাদের ঘরে সার্টিফিকেট থাকুক, ডিগ্রি থাকুক, জ্ঞানের ভাণ্ডার থাকুক—কিন্তু তার সঙ্গে যদি একটু বিনয় থাকে, একটু মায়া থাকে, একটু বিবেক থাকে, একটু মানবিকতা থাকে, তাহলেই সেই শিক্ষা পূর্ণতা পায়। কারণ জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কেউ জিজ্ঞেস করবে না—তোমার কতগুলো সার্টিফিকেট ছিল?

মানুষ মনে রাখবে- তুমি কেমন মানুষ ছিলে। তোমার কথায় কেউ ভেঙে পড়েছিল, নাকি সাহস পেয়েছিল। তোমার জ্ঞানে কেউ অপমানিত হয়েছিল, নাকি আলোকিত হয়েছিল। তোমার উপস্থিতিতে কেউ ছোট হয়ে গিয়েছিল, নাকি নিজেকে মূল্যবান মনে করেছিল। সার্টিফিকেট দেয় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শিক্ষিত হওয়ার স্বীকৃতি দেয় মানুষের হৃদয়।

তাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি সার্টিফিকেট নয়, একটু আত্মজিজ্ঞাসা। নিজেকে একবার নিঃশব্দে প্রশ্ন করা,  “আমি কতটা শিক্ষিত?” নয়, “আমার শিক্ষা আমাকে কতটা মানুষ করেছে?” হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমরা একদিন বুঝতে পারব, ডিগ্রির চেয়ে বড় জ্ঞান আছে, জ্ঞানের চেয়ে বড় বিনয় আছে, আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে আছেমানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা। সেই শিক্ষাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। সেই সার্টিফিকেটই সবচেয়ে মূল্যবান, যার কোনো কাগজ লাগে না।

মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সুলোক শশী চাকমা : জীবনের পথে ধর্ম, মানুষ ও মাটির টানে - ইনজেব চাঙমা

কিছু মানুষের জীবন কেবল নিজের জন্য বয়ে চলে না। তাঁদের জীবন যেন একটি নদী, নিজের পথ অতিক্রম করতে করতে যার জল ছুঁয়ে যায় বহু মানুষের জীবন, বহু ঘরের উঠোন, বহু প্রার্থনার প্রদীপ। তাঁদের অস্তিত্বের অর্থ খুঁজে পাওয়া যায় অন্যের মুখের হাসিতে, সমাজের কল্যাণে এবং মানুষের জন্য রেখে যাওয়া কিছু নির্মল স্মৃতিতে।

সুলোক শশী চাকমা তেমনই একজন মানুষ। তাঁর জীবনকে যদি একটি বাক্যে প্রকাশ করতে হয়, তবে বলা যায়- কর্মের মধ্য দিয়ে মানুষকে ভালোবাসা এবং ধর্মের মধ্য দিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে নেওয়া এক সাধারণ মানুষের অসাধারণ পথচলা।

সার্টিফিকেট অনুযায়ী সুলোক শশী চাকমার জন্ম ২৯ জুন ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে, উদাল বাগানে। পিতা কিনাচান চাকমা এবং মাতা রসিক মালা চাকমা। এক ভাই তিন বোনের সংসারে তিনি জ্যেষ্ঠ সন্তান। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে শৈশব থেকেই জীবনের অভাব-অনটন, সংগ্রাম বাস্তবতার সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে।

জীবনের সেই শুরুর দিনগুলো হয়তো তাঁকে খুব বেশি কিছু দিতে পারেনি, কিন্তু দিয়েছিল একটি অমূল্য শিক্ষা- মানুষের পাশে দাঁড়াতে হলে হৃদয় বড় হতে হয়, সম্পদ বড় হওয়া জরুরি নয়।

আজ তাঁর স্থায়ী ঠিকানা স্মৃতি ভাবনা পাড়া (থানা পাড়া), দীঘিনালা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা। কর্মজীবনের পথ তাঁকে জন্মভূমি থেকে দূরে নিয়ে গেলেও শেকড়ের প্রতি তাঁর টান কখনো আলগা হয়নি।

১৯৮২ সালের জুলাই, ২২ আষাঢ় ১৩৮৯ বাংলা, বুধবার মিজ চম্পা দেবী চাকমার সঙ্গে তাঁর বিবাহবন্ধন সম্পন্ন হয়। জীবনের দীর্ঘ পথচলায় সহধর্মিণী হয়ে তিনি পাশে থেকেছেন।

তাঁদের সংসারে দুই কন্যা- মণিষী চাকমা শ্যামলী চাকমা এবং এক পুত্র- সুমন প্রিয় চাকমা। সন্তানরা নিজ নিজ কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত। তাঁদের ঘরেও এসেছে নতুন প্রজন্ম, নাতি-নাতনিরা।

সন্তানদের সাফল্য তাঁর কাছে কেবল পারিবারিক আনন্দ নয়; এটি জীবনের দীর্ঘ পরিশ্রমের এক নীরব পুরস্কার। তাঁদের জন্য তাঁর প্রার্থনা খুব সরল- সবাই যেন নীরোগ থাকে, নিরাপদে থাকে, জীবনে উন্নতি লাভ করে এবং মানুষের মতো মানুষ হয়ে বেড়ে ওঠে।

শিক্ষাজীবনে তিনি এইচএসসি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। চাকরিতে প্রবেশের সময় তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল এসএসসি; পরবর্তীতে এইচএসসি সম্পন্ন করে তা চাকরির নথিতে সংযুক্ত করেন।

স্বাস্থ্য বিভাগে স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা। পরে পদোন্নতি পেয়ে সহস্বাস্থ্য পরিদর্শক হন। এভাবেই মানুষের সেবার সঙ্গে তাঁর জীবনের দীর্ঘ অধ্যায় যুক্ত হয়ে যায়।

সময়কে সংখ্যায় প্রকাশ করা যায়, কিন্তু দায়িত্বের ভার, মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা আর কর্মজীবনের স্মৃতিকে সংখ্যায় মাপা যায় না। দীর্ঘ এই কর্মজীবনের শেষে ৩০ জুন ২০২৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি সসম্মানে অবসর গ্রহণ করেন।

চাকরি তাঁর কাছে শুধু জীবিকা ছিল না; মানুষের কাছে পৌঁছানোর একটি সুযোগও ছিল। কর্মস্থল বদলেছে, ঠিকানা বদলেছে, কিন্তু মানুষের জন্য কিছু করার তাগিদ বদলায়নি।

মানুষের জীবনে কিছু অভাব থাকে, যার নাম দেওয়া যায় না। সুলোক শশী চাকমার জীবনে তেমনই একটি অভাব ছিলবিহারের অভাব।

স্মৃতি ভাবনা পাড়ায় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস। চাকমা, হিন্দু, বড়ুয়া, মুসলমান, ত্রিপুরাবৈচিত্র্যের এই বসতিতে মানুষের মধ্যে সহাবস্থান থাকলেও ছিল না একটি বৌদ্ধবিহার। বিহারহীন সেই পরিবেশ তাঁকে যেন ভেতর থেকে অস্থির করে তুলত।

তাঁর মনে হতো, মানুষের বসতির মধ্যে একটি ধর্মীয় আশ্রয় থাকা দরকারযেখানে সন্ধ্যার বাতাসে ভেসে আসবে ধর্মদেশনার শব্দ, যেখানে মানুষ কিছু সময়ের জন্য জীবনের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে নিজের অন্তরের সঙ্গে কথা বলতে পারবে। এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় তাঁর এক দীর্ঘ স্বপ্নের যাত্রা।

এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠ সর্বজনশ্রদ্ধেয় স্মৃতিমোহন (ঠাগুজ্যে) চাকমার কাছে একদিন বিহার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা তিনি উত্থাপন করেন। স্মৃতিমোহন চাকমা বিষয়টি হৃদয়ে ধারণ করলেন। পরদিন নিজের সন্তান, কন্যা উপযুক্ত নাতিদের নিয়ে ঘরোয়া পরামর্শ সভা ডাকলেন। সেখানে তিনি নিজের কষ্টার্জিত জায়গার একটি অংশ ধর্মীয় কাজে দান করার মহৎ সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন।

একজন মানুষের জীবনে জমি হয়তো সম্পদ; কিন্তু কোনো কোনো মানুষের কাছে সেই সম্পদ হয়ে ওঠে পরমার্থের সেতু। স্মৃতিমোহন চাকমার সেই দান ছিল তেমনই এক সেতু- এই পৃথিবীর মাটির সঙ্গে মানুষের পরপারের পুণ্যকামনার এক অদৃশ্য যোগসূত্র। পরিবারের সদস্যরাও তাঁর মহৎ সিদ্ধান্তে সম্মতি দেন। সুলোক শশী চাকমার দীর্ঘদিনের আকাঙ্ক্ষা যেন সেদিন বাস্তবের প্রথম আলো দেখতে পেল।

আলোচনা থেকে সিদ্ধান্ত, আর সিদ্ধান্ত থেকে বাস্তবায়ন- সবকিছু যেন দ্রুত এগিয়ে চলল। ১৯৯০ সালের ১৪ মার্চ, বুধবার স্মৃতি ভাবনা বৌদ্ধবিহারের শুভ আত্মপ্রতিষ্ঠা লাভ করে। বিহারের নামকরণ করেন পূজনীয় সাধন মিত্র ভিক্ষু- যিনি সবার কাছেগোপাল ভান্তেনামে পরিচিত ছিলেন। প্রথম পরিচালনা কাঠামোয় সভাপতি নির্বাচিত হন রুচা সেন কার্বারী, সাধারণ সম্পাদক সুলোক শশী চাকমা এবং কোষাধ্যক্ষ অশ্বিনী কুমার দেওয়ান।

বিহার প্রতিষ্ঠার সেই দিনগুলো ছিল শ্রম, ভালোবাসা বিশ্বাসের দিন। অর্থের চেয়ে মানুষের ইচ্ছাই ছিল বড়। একজন দিলেন বাঁশ, কেউ দিলেন কাঠ, কেউ শ্রম, কেউ সময়; আর কেউ দিলেন নিজের হৃদয়ের বিশ্বাস। এইভাবেই একটি বিহার শুধু ইট-কাঠ-বাঁশের স্থাপনা হয়ে ওঠেনিএটি হয়ে উঠেছিল বহু মানুষের সম্মিলিত পুণ্যকর্মের প্রতীক।

সেই সময় এক প্রবীণ ভিক্ষুর আগমন যেন এই গল্পে এক অলৌকিক অধ্যায় যোগ করে। কোনো আনুষ্ঠানিক আহ্বান ছাড়াই পূজনীয় সাধন মিত্র ভিক্ষু সেখানে এসে অবস্থান নেন। পরে তিনি নিজেই জানান, বিনা আহ্বানে কোনো ভিক্ষুর কোনো স্থানে অবস্থান করা ভিক্ষুসংঘের বিনয়ের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কিন্তু তাঁদের ক্ষেত্রে ঘটনাটি যেন অন্য কোনো অদৃশ্য নিয়তির ইশারা হয়ে এসেছিল।

সুলোক শশী চাকমার ভাষায়, সেই ভান্তের আগমন ছিল তাঁদের জন্যমণিকাঞ্চন যোগ গোপাল ভান্তে ছিলেন শীলচর্চায় কঠোর ধর্মীয় অনুশাসনে যত্নশীল। এলাকার দায়ক-দায়িকাদের শীল পালনে উৎসাহিত করতেন। বিহারের প্রতি তাঁর ছিল গভীর মমতা। আজ তিনি নেই। সময়ের স্রোত তাঁকে দূরে নিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর স্মৃতি রয়ে গেছে বিহারের প্রার্থনায়, মানুষের শ্রদ্ধায় এবং সুলোক শশী চাকমার হৃদয়ের গভীরে।

১৯৯১ সালের ২৬ জুলাই, শুক্রবার। এক সভায় বিহার অধ্যক্ষ সাধন মিত্র ভিক্ষু, মহাদাতা স্মৃতিমোহন চাকমা, পরিচালনা কমিটির সভাপতি রুচা সেন কার্বারী এবং উপস্থিত দায়ক-দায়িকাদের সর্বসম্মতিক্রমে সুলোক শশী চাকমাকে বিহার প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। সেদিনের সেই স্বীকৃতি তাঁর কাছে কোনো পদমর্যাদা নয়; বরং একটি দায়িত্ব।

সময়ের সঙ্গে পদবীটি তাঁর নামের পাশে থেকে গেছে। কিন্তু তিনি আজও মনে করেন, এই সম্মান তাঁর একার নয়। এর পেছনে রয়েছে মহাদাতার দান, ভিক্ষুসংঘের আশীর্বাদ, স্থানীয় মানুষের শ্রম এবং অসংখ্য দায়ক-দায়িকার ভালোবাসা।

জীবনের গল্প এখানেই শেষ হয়নি। চাকরির প্রয়োজনে সহস্বাস্থ্য পরিদর্শক হিসেবে লক্ষ্মীছড়িতে পোস্টিং হলে তাঁর চোখে আবার ধরা পড়ল সেই পুরোনো শূন্যতা, বৌদ্ধবিহারের অভাব। স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার, হেডম্যান, কার্বারী, শিক্ষিত গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে দেখা হলেই তিনি বিহার প্রতিষ্ঠার কথা বলতেন। একসময় সংসদ সদস্য কল্প রঞ্জন চাকমার কাছে আবেদন করা হলো। আবেদনের বিষয় ছিল, এলাকায় একটি কেন্দ্রীয় বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠা। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হলো। পাওয়া গেল ২০ হাজার টাকা।

টাকা হয়তো একটি বড় স্থাপনা নির্মাণের জন্য যথেষ্ট ছিল না। কিন্তু মানুষের ইচ্ছাশক্তির মূল্য কি টাকায় মাপা যায়?

তারপর শুরু হলো স্বেচ্ছাশ্রম। কে বাঁশ দেবেন? কে কাঠ দেবেন? কে ডগা দেবেন? কে মাটি কাটবেন? কে প্রতিদিন শ্রম দেবেন? প্রশ্নগুলো উঠল, আর একে একে তার উত্তরও পাওয়া গেল। মানুষ এগিয়ে এল। শ্রম দিল। সময় দিল। ভালোবাসা দিল। এভাবেই গড়ে উঠল বিহার।

সন্ধ্যা নামলে সেখানে ধর্মদেশনা হতো। কর্মচারীরা কাজ শেষে ধর্মীয় আলোচনা শুনতে সমবেত হতেন। অল্প আলোয়, দিনের ক্লান্তি পেরিয়ে, ধর্মের কথাগুলো যেন মানুষের মনে অন্য এক শান্তির দরজা খুলে দিত।

আজও সেই বিহার কেন্দ্রীয় বিহার হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। পাশেই কুশীনগর বনবিহার- যেখানে ভিক্ষুসংঘের ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে মানুষ পুণ্যসঞ্চয়ের সুযোগ পাচ্ছেন।

ধর্মীয় আয়োজন ছিল তাঁর জীবনের আরেকটি বড় অধ্যায়। স্থানীয় মুরুব্বিদের সম্মতি নিয়ে সিদ্ধার্থের গৃহত্যাগ উপলক্ষে সারারাতব্যাপী বুদ্ধকীর্তনের আয়োজন করেছেন। বিভিন্ন সময়ে বহু ভান্তের সান্নিধ্য পেয়েছেন। তাঁদের ধর্মদেশনা উপদেশ থেকে অর্জন করেছেন ধর্মজ্ঞান। ১৯৯৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততার সময়টি আজ তাঁর স্মৃতির পাতায় এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

সেই সময়ের মানুষের ভালোবাসা তাঁর কাছে আজও অমূল্য। তিনি মনে করেন, তিনি তাঁদের জন্য যতটুকু করেছেন, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি পেয়েছেন তাঁদের কাছ থেকে- স্নেহ, বিশ্বাস, ভালোবাসা আপন করে নেওয়ার উষ্ণতা।

মানুষ যখন জীবনের এক অধ্যায় শেষ করতে যায়, তখন বাইরের মানুষের চেয়ে নিজের ভেতরের মানুষের সঙ্গে তার কথোপকথনই বেশি জরুরি হয়ে ওঠে। অবসরের আগে সুলোক শশী চাকমাও বহুবার নিজেকে প্রশ্ন করেছেন- সুলোক শশী, এরপর কী করবে?”

নিজের কাছে তিনি প্রার্থনা করেছেনএমন একটি পথ যেন বেছে নিতে পারেন, যে পথে তাঁর নিজের দুঃখ না আসে, অন্যেরও দুঃখ না হয়; মানুষের কল্যাণ হয় এবং নিজেরও কল্যাণ সাধিত হয়।

এই আত্মজিজ্ঞাসা তাঁকে ধর্ম সমাজসেবার আরও কাছে নিয়ে আসে। তিনি অস্থায়ী শ্রমণ হওয়ার কথা ভাবেন, সুযোগ পেলে অষ্টশীল গ্রহণের ইচ্ছা পোষণ করেন। তাঁর ভাবনার কেন্দ্রে ছিল একটি নির্মল আকাঙ্ক্ষানিরাপদ জীবন, সুস্বাস্থ্য, সম্মানজনক জীবনযাপন এবং কারও ক্ষতির কারণ না হওয়া।

চাকমা সমাজের সামাজিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততার আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো চাকমা সম্প্রদায়ের বিবাহ অনুষ্ঠান- চুঙলং/জধন পরিচালনা করা। এপর্যন্ত তাঁর হাতে ১৪২ জোড়া বিবাহ সম্পন্ন হয়। এই ব্যতিক্রমী সামাজিক উদ্যোগ বিভিন্ন পত্রিকা টেলিভিশন চ্যানেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

গণমাধ্যমে প্রচারের ফলে তাঁর কাজ আরও বিস্তৃত মানুষের কাছে পৌঁছায়। কিন্তু তিনি এই পরিচিতিকেও নিজের কৃতিত্ব হিসেবে দেখেন না। বরং দর্শক, শুভাকাঙ্ক্ষী, সাংবাদিক সহযোগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। কারণ তিনি জানেন- একজন মানুষের কাজ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজ তাকে গ্রহণ করে।

জীবনের নানা কর্মব্যস্ততার মাঝেও তাঁর অন্তরে সাহিত্যবোধের একটি নীরব প্রদীপ জ্বলেছে। নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ থেকে প্রকাশিত যৌথ কাব্যগ্রন্থ পুগবেল- তাঁর ১০টি কবিতা স্থান পেয়েছে। এছাড়া তট্টে মুই নামে তাঁর একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে। তিনি চাঙমা সাহিত্য একাডেমির একজন সক্রিয় সদস্য। সাহিত্য তাঁর কাছে শুধু শব্দের বিন্যাস নয়; বরং নিজের সমাজ, সংস্কৃতি, অনুভূতি জীবনকে ধরে রাখার একটি মাধ্যম।

একদিকে ধর্মের প্রতি তাঁর অনুরাগ, অন্যদিকে সমাজ সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতাএই দুইয়ের মাঝখানে সাহিত্য যেন তাঁর মনের আরেকটি জানালা।

সুলোক শশী চাকমার জীবনের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়- এখানে বড় হওয়ার কোনো অহংকার নেই; আছে মানুষের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠার চেষ্টা।

একজন স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে দীর্ঘ ৩৭ বছর মাস ১৩ দিনের কর্মজীবন। একজন পরিবারের মানুষ হিসেবে দীর্ঘ সংসারজীবন। একজন ধর্মানুরাগী হিসেবে বিহার প্রতিষ্ঠার সাধনা। একজন সমাজকর্মী হিসেবে মানুষের পাশে থাকার প্রয়াস। একজন সংস্কৃতিপ্রেমী হিসেবে চাকমা সমাজের ঐতিহ্য রক্ষার আকাঙ্ক্ষা। আর একজন সাহিত্যপ্রেমী হিসেবে শব্দের ভেতর নিজের সময়কে ধরে রাখার চেষ্টা। এই সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবন যেন পাহাড়ি ঝরনার মতো- ছোট ছোট স্রোত মিলিয়ে যার জল একসময় নদী হয়ে ওঠে।

তিনি হয়তো ইতিহাসের বিশাল মঞ্চের কোনো আলোচিত চরিত্র নন। কিন্তু একটি পাড়ার মানুষের স্মৃতিতে, একটি বিহারের প্রার্থনায়, একটি পরিবারের ভালোবাসায়, একটি সমাজের সাংস্কৃতিক চর্চায় এবং কয়েকটি কবিতার পাতায় তিনি নিজের জন্য যে জায়গাটি নির্মাণ করেছেন- সেটিই তাঁর জীবনের প্রকৃত অর্জন। তাঁর প্রার্থনা তাই খুব বড় কিছু নয়

আমি যতদিন বেঁচে থাকি, ততদিন যেন নিষ্পাপ মনে মানুষের উপকার করতে পারি। আমার পরিবার, স্বজন সমাজের সকল মানুষ যেন নীরোগ, নিরাপদ সুখে থাকে। ধর্ম, সত্য কল্যাণের পথে যেন জীবন কাটাতে পারি।

একজন মানুষের জীবনের শেষ প্রার্থনা যদি মানুষের মঙ্গল হয়ে থাকে, তবে তার জীবনকে নিছক ব্যক্তিজীবন বলা যায় না।

সুলোক শশী চাকমার জীবন তাই এক মানুষের গল্প হয়েও বহু মানুষের গল্প- মাটি, মানুষ, ধর্ম ভালোবাসায় নির্মিত এক নীরব অথচ দীপ্ত জীবনকথা।

 

প্রগতি খীসা: প্রতিকূলতার পথ পেরিয়ে সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে এক অভিযাত্রা - ইনজেব চাঙমা

জীবন কখনো সরলরেখায় এগিয়ে চলে না । কখনো তা কণ্টকাকীর্ণ পথ , কখনো অন্ধকার গিরিপথ , আবার কখনো প্রতিকূলতার বুক চিরে উঠে আসা আল...