সেদিন ছিল ১৭
জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, এক অলস বুধবার। চারদিকের আকাশ সকাল থেকেই মেঘের ঘন চাদরে ঢাকা।
মাঝে মাঝে সেই মেঘের বুক চিরে সূর্য তার তেজস্বী উপস্থিতি জানান দিতে চাইছে বটে, কিন্তু
তাতে আলো ছড়ানোর চেয়ে গুমোট ভ্যাপসা গরমই বাড়ছিল কেবল। প্রকৃতির এই অস্বস্তিকর আবহাওয়ার
মাঝেই আমি ডুবে ছিলাম প্রিয় কাজে—চাকমা সাহিত্য পত্রিকা ‘চাদি’ ও চাঙমা সংবাদ পত্র
“হিলর পচ্জন”র প্রকাশনা নিয়ে টেবিলজুড়ে আমার ব্যস্ততা।
বেলা ঠিক ১১:৫৬
মিনিটে হাতের মুঠোফোনটি তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল দীঘিনালা উপজেলার
কবাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জ্ঞান চাকমা (নলেজ)-এর নাম। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে
গম্ভীর ও কিছুটা তাড়া মেশানো কণ্ঠ ভেসে এল, "জেএসএস অফিসে আসো।"
সকালে স্রেফ
নুন দিয়ে ভাত খাইয়ে আমার ছোট্ট মেয়ে জধা চাকমাকে সবেমাত্র ঘুম পাড়িয়েছিলাম। একটু ইতস্তত
করে বললাম, "মেয়েটা ঘুমাচ্ছে তো, একটু পরে আসলে হয় না?" উত্তর এল সংক্ষিপ্ত
ও অনমনীয়, "তাড়াতাড়ি আসলে ভালো হয়।"
মনটা কু ডাকল।
একটা সংশয় মনের
কোণে উঁকি দিল—কী এমন জরুরি দরকার, যা আমার জন্য অপেক্ষা করছে? আবার ভাবলাম, কদিন আগেই
তো জেএসএস সাধারণ সম্পাদক সমীর দাকে আমাদের চাকমা লেখা (লেঘা) কোর্সটি চালু করার অনুরোধ
করেছিলাম; হয়তো সেই বিষয়েই কোনো ইতিবাচক আলোচনা হবে।
সংশয় ঝেড়ে ফেলে
মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে কোলে নিলাম। সোজা রওনা হলাম অফিসের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে দেখি
জ্ঞান চাকমা নলেজ (সাংগঠনিক সম্পাদক, জেএসএস, দিঘীনালা থানা শাখা) এবং প্রদীপ চাকমা
(দপ্তর সম্পাদক, জেএসএস, দিঘীনালা থানা শাখা) বসে আছেন, পাশে এক বয়োবৃদ্ধ মানুষ। উনার
সাথে কি কথা যেন বলছেন। আমাদের দেখেই জ্ঞান চাকমা রূঢ় স্বরে বললেন, "মেয়েকে তার
মায়ের কাছে দিয়ে এসো।" জধার মা দীঘিনালার লারমা স্কয়ারে বসে শাকসবজি বিক্রি করে।
নিরুপায় হয়ে মেয়েকে তার মায়ের জিম্মায় রেখে দ্রুত আবার অফিসে ফিরে এলাম।
কিন্তু চেয়ারে
বসতে না বসতেই ঘরের বাতাস যেন বিষিয়ে উঠল। কোনো ভূমিকা ছাড়াই জ্ঞান চাকমা আচমকা তর্জন-গর্জন
শুরু করলেন, "তুমি একটা বেকুব, বেআক্কল! তোমার মতো মানুষকে মেরে ফেললে কী বা ক্ষতি
হবে? বড়জোর জেএসএস থেকে বহিষ্কার হতে হবে, এই তো!" একের পর এক অপমানজনক গালিগালাজ
ধেয়ে আসতে লাগল আমার দিকে।
আমি স্তম্ভিত
হয়ে গেলাম। আমতা আমতা করে বললাম, "আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কী হয়েছে?"
তিনি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, "তোমাকে সাইনবোর্ড দিতে কে বলেছে?"
"কীসের সাইনবোর্ড? আমি তো কোথাও কোনো সাইনবোর্ড দিইনি!" আকাশ থেকে পড়লাম
আমি। আমার বিস্ময়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি আরও জ্বলে উঠলেন, "তুমি না দিলে কে
দেবে? তোমার সব কাজ আজ থেকে বন্ধ। তুমি আর কোনো কাজ করতে পারবে না এখানে। তুমি কি ত্রিদীপকে
চেয়ারম্যান করতে চাও? মনে রেখো, এখানে আমি ছাড়া কেউ চেয়ারম্যান হতে পারবে না!"
তাঁর কথার রেশ
কাটতে না কাটতেই প্রদীপ চাকমা রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। আমাকে লক্ষ্য করে বললেন,
"তুমি কোন ইউনিয়নের লোক? কেন সেখানে কাজ করো?" এরপর জ্ঞানের দিকে তাকিয়ে
বললেন, "তুমি কেন বহিষ্কার হবে হে? এই ইনজেবকে হাত-পা ভেঙে রেখে দিলে কী এমন হবে?
কিচ্ছু হবে না!"
পরিস্থিতি কিছুটা
শান্ত করার চেষ্টা করে শামীল দা বললেন, "আমি তোমাকে বহুকাল ধরে চিনি। আচ্ছা, তুমি
যদি সাইনবোর্ডটা দিয়েও থাকো, সেটা সরিয়ে নিলেই তো ঝামেলা চুকে যায়।"
আমি জোড়হাতে
বিনীতভাবে বললাম, "দা, আমি তো কোনো পর মানুষ নই। সবার সহযোগিতা নিয়েই তো কাজ করছি।
এটি শুধু আমার ব্যক্তির কাজ নয়। এই সাইনবোর্ড আমি দিইনি। আমি নিশ্চয়ই কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের
শিকার হচ্ছি, এটা খতিয়ে দেখা দরকার। গত ২৩ মার্চ আমি যে তিনটি সাইনবোর্ড দিয়েছিলাম,
তা তো জ্ঞান চাকমা নিজেই ভেঙে দিয়েছেন। তারপর থেকে তো আমি ওমুখো হইনি। তাছাড়া, তখন
তো প্রয়োজন মনে করে এলাকার গণ্যমান্য সকলের সাথে পরামর্শ করে, অধিবেশনের সিদ্ধান্ত
মোতাবেকই ‘অঝাপাত স্কয়ার’-এর সাইনবোর্ড দিয়েছিলাম। সেটা নিয়ে যখন জ্ঞান চাকমার এত আপত্তি,
তখন আমি কেন আবার নতুন করে দিতে যাব?"
আমার যুক্তিপূর্ণ
আত্মপক্ষ সমর্থন শেষ হতে পারল না। প্রদীপ চাকমা হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, "কোনো কথা
নয়! এখান থেকে উঠে যাও। আর যেন তোমাকে চোখের সামনে না দেখি। অন্যথায় লাঠি পেটা করে
বের করে দেব!"
আর কোনো কথা
না বাড়িয়ে, এক বুক অপমান আর লাঞ্ছনা নিয়ে আমি সেই তপ্ত ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। সুব্রত
দার দোকানে বসে এক কাপ চা খেলাম, কিন্তু ভেতরের অস্বস্তিটা কমছিল না। সত্যটা যাচাই
করতে নিজেই গেলাম সেই মোড়ে। গিয়ে দেখি, সত্যিই কোনো নতুন সাইনবোর্ড নেই।
জ্ঞান চাকমাকে
ফোন করে জানালাম, "আমি তো কোনো সাইনবোর্ড দেখছি না।" তিনি ওপাশ থেকে নির্দেশ
দিলেন, "পূর্ব কোণায়, মানে কবাখালী রোডের দিকে গিয়ে দেখো।"
সেখানে গিয়ে
দেখলাম, একটি সাইনবোর্ড দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেটি তো নতুন নয়! সেটি তো সেই ২৩ মার্চে
দেওয়া পুরোনো সাইনবোর্ডটিই, যা পূর্বেই স্থাপন করা হয়েছিল। আমি পুনরায় জ্ঞান চাকমাকে
ফোন করে বললাম, "এটি তো ২৩ মার্চের দেওয়া পুরোনো সাইনবোর্ড, কোনো নতুন বোর্ড নয়।"
উত্তরে জ্ঞান চাকমা তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, "আমার চোখে কি লের পড়েছে? এতদিন তো
দেখিনি!" আমি দৃঢ়কণ্ঠে বললাম, "আমার কাছে প্রমাণ আছে, ছবি তোলা আছে। আপনি
চাইলে দেখতে পারেন। আর যারা সাইনবোর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে তাদের থেকে জিজ্ঞেস করে দেখেন
তারা কয়টি ভেঙ্গে দিয়েছে আর আমি কয়টি সাইনবোর্ড দিয়েছি"
স্মৃতির পাতা
হাতড়ালে মনে পড়ে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দীঘিনালার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে
আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল—দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা-বাবুছড়া
সংযোগ সড়ক মোড়টির নাম দেওয়া হবে “অঝাপাত স্কয়ার”। সেই সামাজিক সিদ্ধান্তের ওপর
ভিত্তি করেই গত ২৩ মার্চ আমি জয় চাকমাকে সাথে নিয়ে সেখানে সাইনবোর্ডটি স্থাপন করেছিলাম।
অথচ, সেই মহৎ
উদ্যোগের পর থেকেই জ্ঞান চাকমা (নলেজ) বারবার আমাকে কটূক্তি করেছেন, হুমকি দিয়েছেন।
এমনকি আমাকে জেএসএম বা ইউপিডিএফ করার ‘পরামর্শ’ দিয়ে নিজের ইউনিয়নে কাজ না করার জন্য
লিখিত নোটিশ পর্যন্ত পাঠিয়েছেন।
আজকের পৃথিবী
বিজ্ঞানের ডানায় ভর করে বহুদূরে এগিয়ে গেছে। ঘরে বসেই আমরা লহমায় হাতের মুঠোয় পেয়ে
যাচ্ছি পুরো দুনিয়ার খবরাখবর। মানুষ মহাকাশ জয় করছে, সীমানা পেরিয়ে অজানাকে চিনছে।
অথচ, আমরা? নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য আর সংস্কৃতির সুতোয় যারা সমাজকে বাঁধতে চাই, তারা
আজও কোন আদিম হিংসা আর সংকীর্ণতার বৃত্তে বন্দী হয়ে আছি? প্রগতির আলো কি তবে আমাদের
এই বৃত্তের অন্ধকারকে কখনো স্পর্শ করতে পারবে না?