চাঙমা ভাষায় "খদা" শব্দের অর্থ অশুভ, অমঙ্গল। "খদা আগুন লুরো" বলতে বোঝায় অশুভ আগুন। গ্রামে কেউ অমঙ্গল কিছু দেখলে, বিপদের আভাস পেলে মুরুব্বিরা বলে ওঠেন "খদা আগুন"। এটি সতর্কবার্তা। একটি সাংস্কৃতিক সংকেত যে সমাজের ভিতরে কিছু পুড়ছে, কিছু ভুল হচ্ছে।
আমাদের চাঙমা সমাজটাও কি আজ সেই খদা আগুনে রূপ নিচ্ছে? আমরা ৮০% শিক্ষিত দাবি করি, অথচ সমাজজুড়ে বিভাজন, অবিশ্বাস, স্বার্থের আগুন। তাহলে এই শিক্ষা কি আসলেই জাতির মেরুদণ্ড হচ্ছে, নাকি আমরা শুধু সার্টিফিকেট কুড়াচ্ছি?
শিক্ষা বনাম সার্টিফিকেট
শিক্ষা মানে কেবল পড়তে পারা বা ডিগ্রি নেওয়া নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "শিক্ষা হলো সেই যা আমাদের কেবল তথ্য দেয় না, জীবনের সঙ্গে সঙ্গতি স্থাপন করায়"।
|
দিক |
সার্টিফিকেটধারী |
প্রকৃত শিক্ষিত |
|
দৃষ্টিভঙ্গি |
চাকরি ও পদ আমার অধিকার |
দায়িত্ব ও সেবা আমার কর্তব্য |
|
সমাজের প্রতি |
আমি আলাদা, আমি উঁচু |
আমি সমাজের অংশ, সমাধানের অংশ |
|
বিভেদ দেখলে |
পক্ষ নিয়ে আগুনে ঘি ঢালে |
যুক্তি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে |
|
সংস্কৃতি নিয়ে |
পুরনো সব বাতিল, নয়তো অন্ধ অনুকরণ |
শিকড় চেনে, সময়ের সাথে মেলায় |
|
ফলাফল |
ব্যক্তি উন্নতি, সমাজে ফাটল |
ব্যক্তি ও সমাজ একসাথে আগায় |
আজ চাঙমা সমাজে অনেক গ্র্যাজুয়েট, মাস্টার্স, পিএইচডি। কিন্তু গ্রামে দুই বাড়ির ঝগড়া মেটাতে শিক্ষিত ছেলেটা এগিয়ে আসে না। ভোট আসলে শিক্ষিত যুবকটাই দলীয় বিভাজনের পোস্টার লাগায়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষিত মানুষটাই অন্য গোত্রকে হেয় করে কথা বলে। তাহলে ডিগ্রি থাকলেই কি আমরা মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারছি?
খদা আগুনের লক্ষণ-
১. রাজনৈতিক বিভাজন: একসময় জুম্ম জাতীয়তাবাদ ছিল ঐক্যের মন্ত্র। এখন এক গ্রামে তিনটা দল, চারটা মত। নেতা হতে চায় সবাই, ত্যাগ করতে চায় না কেউ। ফলে বাইরের শক্তি সুযোগ নেয়। এটা খদা আগুন, কারণ ঘর পুড়লে সবাই পোড়ে।
২. অর্থনৈতিক বিভাজন: শিক্ষিত হয়ে চাকরি পেয়ে অনেকে গ্রাম ছাড়ে, শহরে সেটেল হয়। টাকা হলে আত্মীয় ভুলে যায়। আবার গ্রামে যারা থাকে, তাদের ছোট করে দেখে। ধনী-গরিবের দেয়াল উঠে, যা আগে চাঙমা সমাজে এত প্রকট ছিল না। সুন্দর, সুস্থ জুমচাষের সংস্কৃতি ভেঙে ব্যক্তিকেন্দ্রিক লোভ ঢুকছে।
৩. ধর্মীয় বিভাজন: বৌদ্ধ ধর্ম চাঙমার প্রাণ। কিন্তু এখন থেরবাদ, বনবিহার-বৌদ্ধ বিহার,বনভান্তে প্রধান শিষ্য কে , অন্যান্য গুরুবাদ নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি। ফেসবুকে শিক্ষিত ছেলেরাই একে অন্যকে "ভণ্ড" বলে গালি দেয়। ধর্ম শান্তির কথা বলে, আমরা ধর্ম দিয়ে অশান্তি ডেকে আনছি। এটাই খদা আগুন।
৪. সামাজিক বিভাজন: দল, উপদল,গোঝা বা গোষ্ঠী নিয়ে অহংকার, জাতি-বেজাতি দ্বন্দ্ব তালিকা লম্বা। বিজু, সাংগ্রাইয়ের মতো উৎসবেও এখন রাজনৈতিক ব্যানার টানাটানি হয়।
কেন এমন হলো? রোগের শিকড়-
- মূল্যবোধহীন শিক্ষা: আমাদের স্কুল-কলেজ নম্বর দেয়, মানুষ বানায় না। জুম্ম ইতিহাস, গর্জন তলার চেতনা, উবগীত — এগুলো পাঠ্যে নেই। ফলে শিকড় কাটা শিক্ষিত তৈরি হচ্ছে।
- ব্যক্তিস্বার্থের উত্থান: বিশ্বায়নের যুগে "আমি" বড় হয়ে গেছে, "আমরা" ছোট হয়ে গেছে। সার্টিফিকেট সেই "আমি"কে আরও ধারালো করেছে।
- নেতৃত্বের সংকট: প্রকৃত মুরুব্বি, কার্বারী, হেডম্যানের জায়গায় এখন ফেসবুক নেতা। যার গলা বড়, সেই নেতা। ত্যাগ ও প্রজ্ঞার দাম কমে গেছে।
- দায়মুক্তি: "সমাজ গোল্লায় যাক, আমি তো ভালো আছি" — এই মনোভাব। শিক্ষিত মানুষটাই সবচেয়ে বেশি নীরব থাকে অন্যায় দেখলে।
খদা আগুন লকলকিয়ে ওঠে তখনই, যখন জাতির মেরুদণ্ডে ঘুণ ধরে। সার্টিফিকেট তখন দেয়ালের শোভা মাত্র, অন্তরের আলো নয়। এই আগুন নেভাতে হলে শিক্ষাকে কেবল কালির অক্ষর থেকে মুক্তি দিয়ে রক্তের অঙ্গীকারে আনতে হবে। শপথ নিতে হবে, মাথা উঁচু রাখার, হাত প্রসারিত করার, আর শিকড় আঁকড়ে ধরার।
অরণ্যে দাবানল লাগলে সর্বাগ্রে নিজের কুটিরটুকু রক্ষা করতে হয়। তেমনি সমাজের খদা আগুন নেভাতে হলে প্রথমে নিজের অন্তরের আঁধার দূর করতে হয়।
জুমের মাটিতে যে শিশু জন্মায়, তার কণ্ঠে যেন প্রথম বুলি হয় মা ভাষার। তার কর্ণে যেন প্রথম মন্ত্র হয় রাধামন-ধনপুদির কাহিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে হাঁটলেও তার চরণ যেন ভুলে না যায় গর্জন তলার ধূলি। যে শিক্ষা তাকে শিকড় থেকে উপড়ে আনে, সে শিক্ষা মেরুদণ্ড নয়, সে তো পঙ্গুত্বের শিকল।
নিজেকে সুধাও, আমার বিদ্যা কি কেবল নিজের উদরপূর্তির জন্য, নাকি যে পাহাড় আমায় ধারণ করেছে, তার ঋণ শোধের জন্য? যে কলম আমি ধরেছি, সে কলম দিয়ে কি আমি শুধু দরখাস্ত লিখব, নাকি আমার জাতির ইতিহাসও লিপিবদ্ধ করব? প্রদীপ নিজে না জ্বললে সে কি পারে অন্যের পথ আলো করতে?
জাতির মহীরুহ জন্ম নেয় গৃহের উঠোনে। যে গৃহে সন্তানকে কেবল প্রথম হওয়ার দৌড় শেখানো হয়, সহমর্মিতার মন্ত্র শেখানো হয় না, সে গৃহেই খদা আগুনের প্রথম স্ফুলিঙ্গ জন্মে।
সন্ধ্যা নামলে জোনাকির আলোয় আজু - বেভে কোল ঘেঁষে বসুক শিশু। শুনুক, কেমন করে উব গীদ গেয়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা দুঃখ ভুলত। পচ্জন শুনিয়ে ঘুম পরাত। জানুক, বিঝু মানে শুধু নবস্ত্র নয়, ফুল নিবেদনে পুরাতন গ্লানি মুছে ফেলার ব্রত। বুঝুক, কিয়াংয়ে দান দিলেই পূণ্য হয় না, যদি পাশের বাড়ির অনাহারী শিশুটির ক্রন্দন কর্ণে না পৌঁছায়।
মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষা: এই চার ব্রহ্মবিহার যদি পারিবারিক শিক্ষার ভিত্তি না হয়, তবে ডিগ্রির পর্বত গড়েও আমরা নৈতিকতায় বামনই থেকে যাব।
চাঙমা সমাজ একদিন একতার বীণায় সুর তুলত। আজ সেই বীণার তার ছিঁড়ে গেছে। দল, উপদল, গোঝা, গুরুবাদ, বুদ্ধ-বন: বিভেদের শত খণ্ডে আমরা বিচ্ছিন্ন। খদা আগুন এই বিচ্ছিন্নতার শুষ্ক কাষ্ঠেই দাউদাউ করে জ্বলে।
হে শিক্ষিত যুবক, তোমার লেখনী থামাক এই বিষবাষ্প। ফেসবুকের প্রান্তরে যখন দেখো ভ্রাতা ভ্রাতাকে কটু কথা বলছে, তুমি সেখানে বিবেকের সেতু হও। উৎসবের আঙিনায় যখন দেখো রাজনীতির ধ্বজা উড়ছে, তুমি সেখানে সংস্কৃতির চন্দ্রাতপ টাঙিয়ে দাও। মনে রেখো, তর্জনীর আস্ফালনে আগুন বাড়ে, করপুটের মিনতিতে আগুন নেভে।
বিঝুর পাজন যেমন বহু শাক-সবজি মিশ্রণে অমৃত হয়, তেমনি বহু মতের মিলনেই জাতি মহৎ হয়। ভিন্নতা থাকুক, বিদ্বেষ নয়।
আমাদের পাঠশালা, মহাবিদ্যালয় যেন শুধু নম্বরের কারখানা না হয়। সেখানে সরস্বতীর সাথে যেন কল্পতরুরও আবাহন হয়।
পাঠ্যক্রমের পত্রে পত্রে থাকুক জুম্ম পাহাড়ের রক্তাক্ত ইতিহাস। থাকুক চাকমা রাজাদের গৌরবগাথা, থাকুক মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার স্বপ্নের কথা। ছাত্র যখন শেক্সপিয়র পড়বে, তখন যেন সে শিবচরণ চাঙমাকেও চেনে। যখন সে নিউটন আওড়াবে, তখন যেন সে নিজের জাতির নবজাগরণের সূত্রও খোঁজে।
কিয়াংয়ের চত্বর কেবল ধর্মীয় স্থান নয়, হোক জ্ঞানের মুক্তাঙ্গন। সপ্তাহান্তে সেখানে বসুক জ্ঞানচক্র। শিক্ষিত তরুণ শেখাক আধুনিক বিজ্ঞান, মুরুব্বি শেখাক জীবনের দর্শন। এই বিনিময়েই খদা আগুনের বিপরীতে প্রজ্ঞার হোমানল জ্বলবে।
শিক্ষা যদি ভীরুতার নামান্তর হয়, তবে সে শিক্ষা ক্লীবের ভূষণ। মেরুদণ্ডের অর্থই হলো মাথা নত না করা।
ভূমি আমার মা। সেই মায়ের অঙ্গচ্ছেদ হলে নীরব থাকা কিসের শিক্ষা? সংবিধানের পাতায় আমার অস্তিত্বের স্বীকৃতি না থাকলে কলমের কালি দিয়ে কী হবে? পার্বত্য চুক্তির প্রতিশ্রুতি ধুলায় লুটালে আমার ডিগ্রি কি আমায় মুক্তি দেবে?
হে শিক্ষিত, তুমি ব্যবসায়ী হও, বিজ্ঞানী হও, কিন্তু সবার আগে হও প্রহরী। তোমার পাহাড়ের, তোমার ভাষার, তোমার অস্তিত্বের। দশটি চাকরির পেছনে ছোটার চেয়ে একটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা শ্রেয়। কারণ স্বাবলম্বনই সর্বোত্তম প্রতিরোধ।
প্রাচীন প্রবচন বলে, "যে আগুন লাগায়, নেভানোর জল তার কলসিতেই থাকে"। চাঙমা সমাজের এই খদা আগুন আমরাই লাগিয়েছি, আমাদের লোভে, আমাদের অনৈক্যে, আমাদের আত্মবিস্মৃতিতে।
তাই নেভানোর দায়ও আমাদেরই। কলসি আমাদের শিক্ষা। কিন্তু কলসি যদি শূন্য হয়, কেবল বাইরে কারুকার্য থাকে, তবে আগুন নিভবে না। কলসি পূর্ণ করতে হবে ত্যাগের জলে, ঐক্যের জলে, আত্মপরিচয়ের সুপেয় স্রোতে।
শিক্ষা যেদিন মেরুদণ্ডের শপথ নেবে, সেদিন খদা আগুন রূপান্তরিত হবে ধুনির আগুনে। সে আগুনে ঘর পোড়ে না। সে আগুনে শীত কাটে, অন্ন ফোটে, আর অন্ধকারে পথ দেখায়।
এসো, সেই শুভ আগুনের প্রতীক্ষায় আমরা সবাই নিজ নিজ কলসি কাঁখে তুলি।






