রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

কৃষ্ণকিশোর চাকমা: পাহাড়ে শিক্ষার প্রথম আলোকবর্তিকা - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস কেবল পাহাড়, নদী, বন আর জনপদের ইতিহাস নয়; এটি অন্ধকারের ভিতর থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া এক মানুষেরও ইতিহাস। যে সময়ে দুর্গম পাহাড়ি জনপদে বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল হাতে গোনা, শিক্ষার সুযোগ ছিল সীমিত এবং যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত প্রতিকূল, সে সময় একজন মানুষ শিক্ষাকে করে তুলেছিলেন সামাজিক মুক্তির প্রধান হাতিয়ার। তাঁর নাম কৃষ্ণকিশোর চাকমা।

আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি আগে পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদে যে শিক্ষার প্রদীপ তিনি জ্বালিয়েছিলেন, তার আলো পরবর্তী প্রজন্মের হাতে ছড়িয়ে পড়ে রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও পার্বত্য চট্টগ্রামের নানা প্রান্তে। তাই কৃষ্ণকিশোর চাকমাকে কেবল একজন স্কুল পরিদর্শক হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানের প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝা যাবে না। তিনি ছিলেন একজন শিক্ষাব্রতী, সমাজসংস্কারক এবং পাহাড়ে আধুনিক শিক্ষার অন্যতম পথিকৃৎ। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রেও তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারের অন্যতম প্রধান অগ্রদূত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কৃষ্ণকিশোর চাকমার জন্ম ১৮৯৫ সালের ১৪ জুলাই রাঙামাটি জেলার নান্যাচর উপজেলার কেরেতকাবা মোনতলা গ্রামে। তাঁর পিতা সুন্দরবি চাকমা এবং মাতা চানমুনি চাকমা। তিন ভাইয়ের মধ্যে কৃষ্ণকিশোর ছিলেন জ্যেষ্ঠ। তাঁর দুই ভাই ছিলেন হরকিশোর চাকমা ও চিত্তকিশোর চাকমা।

তাঁদের পরিবারের আদি বসতি ছিল পাহাড়ের পাদদেশে, মাওরুম ছড়ার উৎসস্থলের সত্তা-ধুরুং বা কেরেতকাবা অঞ্চলে। পরবর্তীকালে পরিবারটি মাওরুম এলাকায় এসে বসতি স্থাপন করে। আজকের প্রজন্মের কাছে মাওরুম নামটি কেবল একটি জনপদের নাম নয়; পার্বত্য চট্টগ্রামে আধুনিক শিক্ষার প্রাথমিক বিকাশের ইতিহাসের সঙ্গেও এ নামটি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। সাম্প্রতিক স্মৃতিচারণেও কৃষ্ণকিশোর ও তাঁর ভাইদের মহাপ্রুমকেন্দ্রিক শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগের কথা উঠে এসেছে।

দুর্গম পাহাড়ি পরিবেশে বসবাস করেও কৃষ্ণকিশোরের পরিবার শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করেছিল। সেই সময়ে পাহাড়ের সাধারণ মানুষের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। তবু সুন্দরবি ও চানমুনি তাঁদের সন্তানদের শিক্ষার পথে এগিয়ে দেন। তিন ভাইই পরবর্তীকালে শিক্ষিত হয়ে সমাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

কৃষ্ণকিশোর ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। ১৯১৯ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। মাত্র এক বছর পর, ১৯২০ সালে, তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা বিভাগে সাব-ইন্সপেক্টর হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ ভারতের শিক্ষা বিভাগের স্কুল পরিদর্শক হিসেবে তাঁর কাজ পাহাড়ের শিক্ষা বিস্তারের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্ব লাভ করে।

সরকারি চাকরির প্রচলিত অর্থে তাঁর কাজ ছিল বিদ্যালয় পরিদর্শন, শিক্ষাব্যবস্থার তদারকি ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন। কিন্তু কৃষ্ণকিশোর সেই সীমারেখার মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখেননি। তিনি বুঝেছিলেন- শুধু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করলেই হবে না; মানুষের মনেও শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি করতে হবে।
তাই তিনি বিদ্যালয়ের দরজার পাশাপাশি খুলতে চেয়েছিলেন মানুষের মনের দরজাও।

আজকের মতো সড়ক, যানবাহন ও যোগাযোগব্যবস্থা তখন ছিল না। এক জনপদ থেকে অন্য জনপদে যেতে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ অতিক্রম করতে হতো। কিন্তু এই প্রতিকূলতা কৃষ্ণকিশোরকে থামাতে পারেনি।
কখনও সাইকেলে, কখনও পায়ে হেঁটে তিনি পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকায় ছুটে যেতেন। গ্রামের মুরুব্বি, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁদের বোঝাতেন, সন্তানকে শুধু ক্ষেত-খামার বা পারিবারিক কাজে যুক্ত রাখলে চলবে না; তাকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে, বইয়ের জগতে প্রবেশের সুযোগ দিতে হবে। এ ছিল নিছক সরকারি কর্তব্য নয়; ছিল এক ধরনের সামাজিক জাগরণ।

শিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ তৈরি করা, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, শিক্ষকদের নিয়োগের ব্যবস্থা করা, সরকারি সাহায্য ও অনুদান সংগ্রহ করা এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তির মাধ্যমে শিক্ষায় ধরে রাখার মতো নানা কাজে তিনি যুক্ত ছিলেন।

কৃষ্ণকিশোর চাকমার শিক্ষা আন্দোলনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল ছিল একের পর এক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা।
তাঁর উদ্যোগ ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টার ফলে ১৯২২ সালে মগবান ইউপি স্কুল ও সুবলং-খাগড়াছড়ি ইউপি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তী ১৯২৩ সালে মহাপ্রুম এমই স্কুল, রামগড় এমই স্কুল, পানছড়ি এমই স্কুল, দীঘীনালা এমই স্কুল এবং তুলাবান এমই স্কুল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
বিদ্যালয়গুলো তাঁর কাছে কেবল শিক্ষাদানের প্রতিষ্ঠান ছিল না। এগুলো ছিল পাহাড়ি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণের কর্মশালা। একটি বিদ্যালয় মানে ছিল একটি গ্রামের শিশুর সামনে নতুন পৃথিবীর দরজা খুলে যাওয়া। একটি বই মানে ছিল অজানাকে জানার সুযোগ। একজন শিক্ষিত ছাত্র মানে ছিল একটি পরিবারের চিন্তার জগতে পরিবর্তনের সূচনা। এই উপলব্ধিই কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা আন্দোলনকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।

কৃষ্ণকিশোর বুঝেছিলেন, প্রাথমিক শিক্ষার মধ্যে একটি সমাজকে আটকে রাখলে চলবে না। উচ্চশিক্ষার পথও উন্মুক্ত করতে হবে। সে কারণেই তিনি উচ্চতর স্তরের বিদ্যালয়গুলোতে ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা সম্প্রসারণে গুরুত্ব দেন। তৎকালীন বাস্তবতায় ইংরেজি শিক্ষা ছিল উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরির অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। ফলে পাহাড়ি শিক্ষার্থীদের জন্য এই সুযোগ সৃষ্টি করা ছিল ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেওয়ার মতো। তাঁর এই দূরদর্শিতা পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষায় এগিয়ে যেতে সহায়তা করে।

কৃষ্ণকিশোরের ব্যক্তিজীবনের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক শিক্ষা-ঐতিহ্যও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাঁর মেজ ভাই হরকিশোর চাকমা ছিলেন শিক্ষক। ছোট ভাই চিত্তকিশোর চাকমাও শিক্ষকতা ও সমাজসেবার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। চিত্তকিশোর মহাপ্রুম মধ্য ইংরেজি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন বলে স্মৃতিচারণে উল্লেখ রয়েছে। এই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মও পাহাড়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চিত্তকিশোরের সন্তানদের মধ্যে ছিলেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা, জ্যোতিপ্রভা লারমা, শুভেন্দু প্রভাস লারমা ও জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা- যিনি ‘সন্তু লারমা’ নামে পরিচিত। কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা-চেতনার সঙ্গে এই বৃহত্তর পারিবারিক ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিক যোগসূত্র পরবর্তী ইতিহাসে লক্ষ করা যায়। অর্থাৎ, যে পরিবারে এক প্রজন্ম বিদ্যালয়ের দরজা খুলেছিল, পরবর্তী প্রজন্ম সেই শিক্ষার আলোকে সমাজ ও অধিকারচেতনার বৃহত্তর পরিসরে নিয়ে গিয়েছিল।

কৃষ্ণকিশোরের কাছে শিক্ষা ছিল কেবল পড়তে, লিখতে বা পরীক্ষায় পাস করার বিষয় নয়। তাঁর কাছে শিক্ষা ছিল মানুষের আত্মমর্যাদা অর্জনের পথ। পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন সমাজে শ্রেণিগত ও গোষ্ঠীগত বৈষম্য ছিল প্রবল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও ছিল সীমিত। ফলে সমাজের বৃহত্তর অংশকে শিক্ষার বাইরে রেখে একটি সুস্থ ও সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব ছিল না। কৃষ্ণকিশোর নিজের জীবন দিয়েই দেখেছিলেন- শিক্ষার অভাব মানুষকে কীভাবে পিছিয়ে রাখে। তাই শিক্ষার বিস্তারের পাশাপাশি সামাজিক পশ্চাৎপদতা, শ্রেণীবৈষম্য ও সংকীর্ণ চিন্তার বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির কাজেও তিনি ভূমিকা রাখেন। ঐতিহাসিক বিবরণে তাঁর শিক্ষা উদ্যোগকে পরবর্তী পাহাড়ি জাতীয় চেতনার বিকাশের সঙ্গেও যুক্ত করা হয়েছে।

কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা আন্দোলনের আলোচনায় মাওরুমকে আলাদাভাবে স্মরণ করা প্রয়োজন।
কৃষ্ণকিশোর ও তাঁর ভাই চিত্তকিশোরের শিক্ষা বিস্তারের উদ্যোগের সঙ্গে মহাপ্রুমের নাম গভীরভাবে জড়িত। পরবর্তী স্মৃতিচারণে মাওরুমকে পার্বত্য চট্টগ্রামে আধুনিক শিক্ষার বিকাশের অন্যতম প্রাথমিক কেন্দ্র হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

এই মাওরুম থেকেই পরবর্তী সময়ে বহু শিক্ষিত মানুষ বেরিয়ে আসেন। তাঁদের কেউ শিক্ষক, কেউ সমাজকর্মী, কেউ প্রশাসক, কেউবা পাহাড়ের অধিকার ও আত্মপরিচয়ের আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন।
অতএব, মাওরুমের ইতিহাসকে শুধু একটি গ্রামের ইতিহাস হিসেবে দেখলে তার গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি পাহাড়ের শিক্ষা ও সামাজিক জাগরণের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা আন্দোলনের প্রাথমিক বিস্তার রাঙামাটিকে কেন্দ্র করে হওয়ায় চাকমা সমাজ এর সুফল তুলনামূলকভাবে আগে পায়। সে সময় কর্ণফুলী নদীর উপত্যকা ও রাঙামাটি অঞ্চলে চাকমা জনগোষ্ঠীর বসতি ছিল উল্লেখযোগ্য। পরবর্তীকালে তাঁর শিক্ষা-চেতনা খাগড়াছড়িসহ অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ফলে চাকমাদের পাশাপাশি মারমা ও ত্রিপুরারাও এই শিক্ষা বিস্তারের সুফল পেতে শুরু করে। অবশ্য পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও দুর্গম অঞ্চলে বসবাসকারী তঞ্চঙ্গ্যা, বম, খুমি, পাংখোয়া, খ্যাং, লুসাই, মুরং ও চাকসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর কাছে এই শিক্ষার ঢেউ পৌঁছাতে তুলনামূলকভাবে বেশি সময় লাগে। ভৌগোলিক দুর্গমতা, ভাষাগত বৈচিত্র্য এবং সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতা এর পেছনে গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। তাই কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা আন্দোলনকে একটি জনগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো উদ্যোগ হিসেবে নয়, বরং ধীরে ধীরে বিস্তৃত হওয়া পাহাড়ের সামগ্রিক শিক্ষা-জাগরণের সূচনা হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিযুক্ত।

একটি সমাজে শিক্ষার বিস্তার ঘটলে শুধু বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ে না, বদলে যায় মানুষের চিন্তার জগৎও।
এই সত্যটি কৃষ্ণকিশোর খুব তাড়াতাড়িই উপলব্ধি করেছিলেন। শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম নিজেদের সমাজ, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অধিকার সম্পর্কে প্রশ্ন করতে শেখে। সেই অর্থে তাঁর শিক্ষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ের সামাজিক ও জাতীয় চেতনার বিকাশের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল। ঐতিহাসিক সূত্রে কৃষ্ণকিশোরের শিক্ষা উদ্যোগকে পাহাড়ি জনগণের দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও জাতীয় চেতনা বিকাশের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

কৃষ্ণকিশোর চাকমার জীবন ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে ১৯৩৫ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর জীবনের দৈর্ঘ্য তাঁর কর্মের ব্যাপ্তিকে মাপতে পারেনি। মাত্র কয়েক দশকের জীবনে তিনি যে বীজ বপন করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মে অঙ্কুরিত হয়, শাখা-প্রশাখা বিস্তার করে এবং পাহাড়ের শিক্ষাজীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে। একজন মানুষ চলে যেতে পারেন, কিন্তু তাঁর স্বপ্ন যদি মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকে, তবে তাঁর মৃত্যু হয় না। কৃষ্ণকিশোরের ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামে শিক্ষা বিস্তারে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ ২০০১ সালে তাঁকে মরণোত্তর বিশেষ সম্মাননা প্রদান করে। এই সম্মাননা তাঁর কর্মের প্রতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক শ্রদ্ধা। তবে তাঁর প্রকৃত সম্মাননা সম্ভবত আরও বড়- পাহাড়ের সেইসব শিক্ষিত মানুষ, যাঁরা তাঁর উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বিদ্যালয়ের দরজা পেরিয়ে উচ্চশিক্ষার জগতে প্রবেশ করেছেন।

ইতিহাসে কিছু মানুষ থাকেন, যাঁরা নিজের জন্য পথ তৈরি করেন না- পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পথ তৈরি করেন। কৃষ্ণকিশোর চাঙমা ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তিনি যখন পাহাড়ের দুর্গম পথে সাইকেল চালিয়ে কিংবা পায়ে হেঁটে বিদ্যালয় খুঁজতে বেরিয়েছিলেন, তখন হয়তো তিনি জানতেন না তাঁর সেই ছোট ছোট পদক্ষেপ একদিন একটি বৃহৎ শিক্ষা-আন্দোলনের ইতিহাস হয়ে উঠবে। তিনি হয়তো জানতেন না, তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়ের কোনো এক ছাত্র ভবিষ্যতে শিক্ষক হবে, কোনো এক শিক্ষার্থী সমাজের নেতৃত্ব দেবে, আর কোনো এক পরিবারে শিক্ষার আলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়বে। কিন্তু ইতিহাস জানে- সেই পদক্ষেপগুলো বৃথা যায়নি।

আজ পাহাড়ের কোনো প্রত্যন্ত গ্রামে যখন একটি শিশু বই হাতে বিদ্যালয়ের পথে হাঁটে, তখন তার পদধ্বনির মধ্যে যেন এক শতাব্দী আগের সেই শিক্ষাব্রতীর পদধ্বনিও শোনা যায়। কোনো পাহাড়ি তরুণ যখন উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখে, তখন সেই স্বপ্নের আকাশে কৃষ্ণকিশোরের জ্বালিয়ে যাওয়া প্রদীপের আলোও মিশে থাকে। তাই কৃষ্ণকিশোর চাকমা কেবল অতীতের একজন শিক্ষা কর্মকর্তা নন; তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষা-জাগরণের এক অগ্রদূত, এক নিরলস শিক্ষাব্রতী এবং পাহাড়ের মানুষের স্মৃতিতে চিরপ্রজ্বলিত এক আলোকবর্তিকা।

তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি বিদ্যালয় নির্মাণ মানে শুধু একটি ভবন নির্মাণ নয়; একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ নির্মাণ। আর সেই ভবিষ্যতের স্থপতিদের মধ্যে কৃষ্ণকিশোর চাকমার নাম তাই ইতিহাসের পাতায় শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হওয়ার যোগ্য।

তথ্যসূত্র: উইকিপিডিয়া, জুমজার্নাল

[এখানে মৃত্যু তারিখ জানাছিলনা। তাই কাহারো জানা থাকলে ও তথ্য অসংগতি থাকলে কমেন্ট বা injebchangmacharu@gmail.com (ই-মেইল) জানানো জন্য অনুরোধ রইল।] 

শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চাঙমা বর্ণমালা: সুযোগের দ্বারে দাঁড়িয়েও কেন এত দূরে? - ইনজেব চাঙমা

চাকমাদের নিজস্ব ভাষা সাহিত্য আছে। দু বছর আগেও চাঙমা লিপিতে চাঙমা ভাষায় সাহিত্য রচনা হতো বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাংলা এবং ইংরেজিতে লেখাপড়া করেন বলে চাকমা ভাষা সাহিত্য তাদের জীবনে অপরিহার্য নয়। আর জন্যই এর প্রতি একশ্রেণির শিক্ষিত লোকদের রয়েছে অনীহা।

চাঙমা সাহিত্য ভাষা নিয়ে নন্দলাল শর্মার এই কথাগুলো আজও আমাদের সামনে এক গভীর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর বক্তব্যের সময় থেকে বর্তমান সময়ের মধ্যে প্রযুক্তির পৃথিবী আমূল বদলে গেছে। বদলেছে লেখার মাধ্যম, প্রকাশনার ধরন, যোগাযোগের পথ। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, সুযোগ যত বেড়েছে, আমাদের অনেক কবি-সাহিত্যিকের চাঙমা বর্ণমালার সঙ্গে পরিচয় যেন ততটা বাড়েনি।

একসময় চাঙমা বর্ণমালায় লেখা ছিল কঠিন। হাতে লিখতে হতো, ছাপার অক্ষর সহজলভ্য ছিল না, বই প্রকাশের সুযোগ ছিল সীমিত। ফলে একজন লেখক চাঙমা ভাষায় লিখতে চাইলেও নানা বাস্তব প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতেন। কিন্তু আজ সেই বাস্তবতা অনেকটাই বদলে গেছে।

আজ চাঙমা বর্ণমালা কম্পিউটার অনলাইন মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়েছে। কীবোর্ডে লেখা যায়, এক লিপি থেকে অন্য লিপিতে রূপান্তরের জন্য কনভার্টার ব্যবহার করা যায়, ডিজিটাল মাধ্যমে লেখা সংরক্ষণ করা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা যায়। অর্থাৎ প্রযুক্তি আজ আমাদের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। যে অজুহাতগুলো একসময় বাস্তব ছিল, তার অনেকগুলোই এখন আর আগের মতো কার্যকর নয়।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়, আমরা কি সেই সুযোগটি গ্রহণ করছি?

আজকের একজন চাঙমা কবি বাংলা ভাষায় কবিতা লিখছেন, একজন সাহিত্যিক বাংলায় গল্প-প্রবন্ধ লিখছেন, গবেষক বাংলায় নিজের ভাবনা প্রকাশ করছেন। বাংলা ভাষায় লেখার প্রয়োজনীয়তা অবশ্যই আছে। বৃহত্তর পাঠকের কাছে পৌঁছানোর জন্য বাংলা একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কিন্তু নিজের ভাষা নিজের বর্ণমালার জায়গাটি কি তার ফলে হারিয়ে যাবে?

একজন লেখক যদি নিজের মাতৃভাষার সাহিত্য নিয়ে কথা বলেন, অথচ সেই ভাষার নিজস্ব বর্ণমালার সঙ্গে তাঁর পরিচয় না থাকে, তাহলে সেখানে এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। ভাষাকে ভালোবাসা শুধু ভাষায় কথা বলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভাষার লিখিত রূপকেও নিজের করে নেওয়া তারই অংশ।

চাঙমা বর্ণমালা কেবল কিছু অক্ষরের সমষ্টি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের ইতিহাস, স্মৃতি, সাহিত্য, আত্মপরিচয় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। পূর্বপুরুষেরা যে অক্ষরে নিজেদের কথা লিখে গেছেন, সেই অক্ষর যদি পরবর্তী প্রজন্মের শিক্ষিত সমাজের কাছেই অপরিচিত হয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু একটি লিপির সংকট নয়এটি উত্তরাধিকার হারানোরও সংকেত।

সবচেয়ে বেশি ভাবায় আমাদের কবি-সাহিত্যিকদের অবস্থান। যাঁরা ভাষা সংস্কৃতির কথা লেখেন, যাঁরা চাঙমা জাতিসত্তা ঐতিহ্য নিয়ে সাহিত্য রচনা করেন, তাঁদের কাছেই যদি চাঙমা বর্ণমালা অপরিচিত থাকে, তবে সাধারণ মানুষের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা কীভাবে তৈরি হবে?

অবশ্যই কাউকে বাংলা বা ইংরেজিতে লেখার জন্য দোষারোপ করার প্রশ্ন নেই। বহু ভাষায় লেখালেখি করা বরং একজন লেখকের শক্তি। কিন্তু নিজের ভাষার সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি নিজের লিপির প্রতিও ন্যূনতম দায়িত্ববোধ থাকা প্রয়োজন। কারণ অন্যের ভাষা শেখা আমাদের জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে, আর নিজের ভাষা লিপিকে ধারণ করা আমাদের শিকড়কে শক্ত করে।

আজ প্রয়োজন চাঙমা বর্ণমালাকে কেবল অতীতের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে না দেখে ভবিষ্যতের লেখার মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করা। কবিতা লেখা হোক চাঙমা বর্ণমালায়, গল্প লেখা হোক, শিশুদের বই প্রকাশিত হোক, অনলাইন পত্রিকা ওয়েবসাইটে লেখা প্রকাশিত হোক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও নিয়মিত চাঙমা বর্ণমালার ব্যবহার বাড়ানো হোক। তরুণ প্রজন্মের হাতে মোবাইল ফোন আছে, কম্পিউটার আছে, ইন্টারনেট আছেএখন প্রয়োজন শুধু আগ্রহ উদ্যোগ।

নন্দলাল শর্মা যখন লিখেছিলেন, তখন চাঙমা ভাষা সাহিত্যের সামনে প্রধান বাধাগুলোর একটি ছিল সুযোগের সীমাবদ্ধতা। আজ সেই সীমাবদ্ধতার অনেকটাই প্রযুক্তি দূর করে দিয়েছে। তাই এখন আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নসুযোগ আছে কি নানয়; বরংআমরা সুযোগটি ব্যবহার করছি কি না।

চাঙমা বর্ণমালার ভবিষ্যৎ কেবল প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে তার ব্যবহারকারীর ওপর। একজন কবি যখন নিজের কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি চাঙমা বর্ণমালায় লেখেন, একজন লেখক যখন নিজের গল্প নিজের লিপিতে প্রকাশ করেন, একজন শিক্ষক যখন নতুন প্রজন্মকে সেই অক্ষর শেখান, তখনই একটি লিপি বেঁচে থাকার নতুন শক্তি পায়।

আমাদের সামনে আজ এক বিরল সুযোগ এসেছে। অতীতের উত্তরাধিকার এবং বর্তমানের প্রযুক্তি, দুটিকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর সুযোগ। এই সুযোগ হারানো মানে শুধু কয়েকটি অক্ষর হারানো নয়; হারানো মানে নিজের সাহিত্যিক স্মৃতির একটি দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ করে দেওয়া।

তাই এখন সময় এসেছে নিজেদের দিকে ফিরে তাকানোর। চাঙমা বর্ণমালাকে শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, কবিতার খাতায়, বইয়ের পাতায়, মোবাইলের পর্দায় এবং অনলাইনের প্রতিটি সম্ভাব্য জায়গায় ফিরিয়ে আনতে হবে।

কারণ একটি ভাষা তখনই সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকে, যখন তার মানুষ সেই ভাষায় কথা বলে, লেখে, পড়ে এবং পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়।

সুযোগ আজ আমাদের সামনে। এখন সিদ্ধান্ত আমাদের, আমরা কি সেই সুযোগকে ইতিহাসে পরিণত করব, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জীবন্ত উত্তরাধিকার হিসেবে রেখে যাব?

শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সুহৃদ চাকমা : স্বল্পায়ু জীবনের দীপ্তিমান সাহিত্যপ্রতিভা - ইনজেব চাঙমা

কিছু মানুষ চলে যান, অথচ তাঁদের চলে যাওয়া শেষ হয়ে যায় না। তাঁরা থেকে যান শব্দে, স্মৃতিতে, অসমাপ্ত স্বপ্নে; থেকে যান একটি জাতির সাংস্কৃতিক চেতনার গভীরে। তাঁদের জীবন যত সংক্ষিপ্তই হোক, তাঁদের রেখে যাওয়া আলো দীর্ঘকাল পথ দেখায়। সুহৃদ চাকমা তেমনই এক নামচাকমা সাহিত্যের আকাশে স্বল্পকাল জ্বলে ওঠা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলো নিভে গেলেও তার দীপ্তি আজও অনুভব করা যায়।

সুহৃদ চাঙমা ডাকনামলক্ক খুব সাধারণ, সাদাসিধে, সহজ-সরল এক মানুষ। কিন্তু সেই সাধারণ মুখের আড়ালে বাস করত এক অসাধারণ মেধা, এক অনুসন্ধিৎসু মন এবং নিজের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি গভীর দায়বোধ। কবিতা ছিল তাঁর ভালোবাসা, সাহিত্য ছিল তাঁর সাধনা; আর চাকমা ভাষা সংস্কৃতির অনুসন্ধান ছিল তাঁর অন্তর্গত এক তাগিদ।

১৯৫৮ সালের ২০ জুন বর্তমান খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দিঘীনালা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তরেবাঘেইছড়ি দুঅরনামের এক স্থানে তাঁর জন্ম। পিতা প্রফুল্ল কুমার চাঙমা, মাতা দেনি চাঙমা। সাত সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। পাহাড়ের মাটি, অরণ্য, নদী আর লোকজ জীবনের আবহে বেড়ে ওঠা সেই শিশুটিই পরবর্তীকালে চাকমা সাহিত্যজগতে নিজের জন্য নির্মাণ করেছিলেন একটি স্বতন্ত্র আসন।

তাঁকে দেখলে হয়তো প্রথম দর্শনে কেউ অনুমান করতে পারত না, এই শান্ত, সরল মানুষটির ভেতরে কতটা আলো জমে আছে। হ্যাংলা-লম্বা, ফর্সা, ছিপছিপে শরীর; মুখে আত্মপ্রত্যয়ের মৃদু হাসি। কিন্তু তাঁর কথায়, লেখায় চিন্তায় প্রকাশ পেত গভীরতা। তিনি ছিলেন নীরব অথচ নিবিড় এক সাধক।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা সাহিত্যে অনার্স এম.. সম্পন্ন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন তাঁর চিন্তার জগৎকে আরও প্রসারিত করে। বাংলা সাহিত্য আধুনিক সাহিত্যতত্ত্বের সঙ্গে পরিচয়ের পাশাপাশি নিজের মাতৃভাষা জাতির সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে নতুন চোখে দেখার সুযোগ পান।

শিক্ষাজীবন শেষ করে বোয়ালখালী অনাথ আশ্রম বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে রাঙামাটির মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন কয়েক বছর। শিক্ষকতা ছেড়ে একটি প্রতিষ্ঠানে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবেও কাজ করেন। কিন্তু জীবিকার পরিচয় কখনো তাঁর আসল পরিচয়কে ঢেকে রাখতে পারেনি। তাঁর প্রকৃত পরিচয় ছিল, তিনি একজন সাহিত্যসাধক।

১৯৮২ সালের ৩১ জানুয়ারি তাঁর জীবনে আসে আরেক অধ্যায়। বনরূপা নিবাসী ব্রজেন্দ্র তালুকদার ঝর্ণা তালুকদারের কন্যা অর্চনা তালুকদার (স্বপ্না)-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের সংসারে আসে দুই সন্তান- পুত্র সুভদ্র কন্যা সূচনা। সংসার, কর্মজীবন সাহিত্য, সবকিছুর মধ্যেই তিনি নিজের সৃষ্টিশীলতার পথ তৈরি করে নিয়েছিলেন।

সুহৃদ চাকমার কবিসত্তার সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ বার্গী একটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ, অথচ তার মধ্যেই যেন একটি কবির দীর্ঘ সম্ভাবনার আভাস।

তিনি শুধু কবিতার অনুরাগী ছিলেন না; ছিলেন সচেতন আধুনিক কবি। তাঁর কবিতায় সমকাল প্রবেশ করেছে নানা অনুষঙ্গে। জীবনের পরিচিত দৃশ্য, মানুষের অনুভূতি, সময়ের অভিঘাত, সবকিছুকে তিনি কবিতার নিজস্ব ভাষায় রূপ দিতে চেয়েছেন।

চিত্রকল্প নির্মাণে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। শব্দ তাঁর কাছে শুধু বাক্য গঠনের উপকরণ ছিল না; শব্দ ছিল অনুভূতির শরীর। একটি দৃশ্যকে কীভাবে কয়েকটি শব্দের মধ্যে জীবন্ত করে তোলা যায়, একটি অনুভূতিকে কীভাবে চিত্রের মতো পাঠকের সামনে দাঁড় করানো যায়- সে বিষয়ে তাঁর ছিল গভীর উপলব্ধি।

তিনি কবিতাকে সহজ কাজ মনে করতেন না। কবিতা তাঁর কাছে ছিল শ্রম, সাধনা নির্মাণের বিষয়। তাই তাঁর কবিতায় শব্দের ব্যবহার, চিত্রকল্পের নির্মাণ এবং ভাবের বিন্যাসে পাওয়া যায় সচেতন শিল্পবোধ।

আজবার্গী দিকে ফিরে তাকালে সবচেয়ে বেশি যে বেদনা জাগে, তা হলো- এই কবির হাতে যদি আরও সময় থাকত! আরও দশটি বছর, আরও বিশটি বছর যদি তিনি পেতেন! হয়তো চাকমা আধুনিক কবিতার ইতিহাসে আরও অনেক নতুন দরজা খুলে যেত।

সুহৃদ চাকমার সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে মূল্যবান দিকগুলোর একটি ছিল চাকমা ভাষা নিয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ। তিনি বুঝেছিলেনএকটি জাতির ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষার ভেতরেই বাস করে তার ইতিহাস, স্মৃতি, সংস্কৃতি আত্মপরিচয়।

চাকমা ভাষা’, ‘দি চাকমা ক্রিপ্ট’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা’, ‘চাকমা সাহিত্যের উদ্ভব ক্রমবিকাশ’, ‘রাধামন-ধনপুদি গীতিকার ঐতিহাসিকতা’, ‘দীপংকর শ্রীজ্ঞান চাকমার কবিতা : ভাব আঙ্গিক বিশ্লেষণ’, ‘চাকমা জাতির ইতিহাসে মোগল প্রভাবসহ তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে সেই অনুসন্ধিৎসু মননের পরিচয় পাওয়া যায়।

তিনি কঠিন বিষয়কে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারতেন। তাঁর লেখার ভাষা ছিল ঋজু, সাবলীল এবং নিজস্ব। পাণ্ডিত্যকে কখনো দুর্বোধ্যতার আড়ালে লুকিয়ে রাখেননি। বরং জটিল বিষয়কে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজ করে তোলাই ছিল তাঁর লেখার অন্যতম শক্তি।

চাকমা ভাষা, সাহিত্য ইতিহাস নিয়ে তাঁর যে অনুসন্ধান, তা ছিল শুধু একজন লেখকের কৌতূহল নয়; ছিল নিজের জাতির সাংস্কৃতিক শিকড়ের সন্ধান।

গল্প লিখেছেন সংখ্যায় কম, কিন্তু তাঁর গল্পের বিষয়, প্লট উপস্থাপনার স্বাতন্ত্র্য তাঁকে একজন সম্ভাবনাময় গল্পকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।জিংকানি’, ‘কোচপানার নাং পত্তাপত্তি’, ‘অ্যান্ট্রপলজিসহ তাঁর গল্পগুলো তাঁর গদ্যশক্তির পরিচয় বহন করে।

তিনি বিশ্বাস করতেন, গদ্য ছাড়া একটি ভাষার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব নয়। উপন্যাস লেখার ইচ্ছাও তাঁর ছিল। সামর্থ্যও ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূর্ণতা পায়নি।

সমালোচক হিসেবেও তাঁর ছিল নিজস্ব অবস্থান। সত্য বলার সাহস ছিল তাঁর অন্যতম বড় গুণ। কারও মন রক্ষা করার জন্য তিনি নিজের বিচারবোধকে বিসর্জন দেননি। তাঁর ক্ষুরধার সমালোচনা অনেককে অস্বস্তিতে ফেলেছিল, অনেকের বিরাগও ডেকে এনেছিল। কিন্তু সাহিত্যিকের কাছে জনপ্রিয়তার চেয়ে সত্যনিষ্ঠা যে বড়. সুহৃদ তাঁর আচরণ লেখায় সেই বিশ্বাসেরই পরিচয় দিয়েছেন।

রাঙামাটি এস্থেটিক্স কাউন্সিলের অন্যতম রূপকার, নামকরণকারী প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবেও সুহৃদ চাকমার নাম স্মরণীয়। সাহিত্যকে তিনি নিছক ব্যক্তিগত আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি। তিনি চেয়েছিলেন সাহিত্য সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক, সাংস্কৃতিক চর্চা সংগঠিত হোক, নতুন প্রজন্মের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার পথ তৈরি হোক।

এই জায়গাতেই সুহৃদ চাকমার জীবনকে কেবল একজন কবির জীবন বলে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মী, চিন্তক এবং একজন স্বপ্নবান মানুষ।

তারপর এলো সেই দিন। আগস্ট ১৯৮৮। সুহৃদ চাঙমাকে তাঁর বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো।বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন-  একটু পরে আসছি। কী অদ্ভুত একটি বাক্য! প্রতিদিনের জীবনে উচ্চারিত একেবারে সাধারণ কথা। অথচ কখনো কখনো একটি সাধারণ বাক্যই হয়ে ওঠে সারাজীবনের সবচেয়ে গভীর স্মৃতি।

তিনি আর ফিরে এলেন না। সেদিন যে মানুষটি দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর প্রিয়জনেরা হয়তো অপেক্ষা করেছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, এই তো, একটু পরেই ফিরবেন। সন্ধ্যা নামল, রাত হলো; কিন্তু সেইএকটু পরেআর কোনোদিন এল না। একটি পরিবার অপেক্ষা করতে করতে হারাল তার প্রিয় মানুষকে। আর চাঙমা সাহিত্য হারাল তার এক উজ্জ্বল, সম্ভাবনাময় কণ্ঠকে।

১৯৫৮ থেকে ১৯৮৮- মাত্র ত্রিশ বছর। একজন মানুষের জীবনে ত্রিশ বছর হয়তো একটি পূর্ণ জীবন নয়; বরং জীবনের প্রস্তুতির সময়। এই বয়সেই মানুষ তার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, চিন্তাকে পরিণত করে, নিজের সৃষ্টির সবচেয়ে শক্তিশালী সময়ের দিকে এগিয়ে যায়।

সুহৃদ তখনও সেই পথের শুরুতেই ছিলেন। তাঁর সামনে ছিল আরও কবিতা লেখার সময়, আরও প্রবন্ধের বিষয়, আরও গবেষণার ক্ষেত্র, আরও গল্প, হয়তো একটি উপন্যাস। চাকমা ভাষা সাহিত্য নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান আরও বিস্তৃত হতে পারত। তাঁর চিন্তা আরও পরিণত হতে পারত। নতুন প্রজন্মের লেখকদের জন্য তিনি হয়ে উঠতে পারতেন একজন পথপ্রদর্শক।

কিন্তু নিয়তি তাঁকে সে সময়টুকু দেয়নি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যায়নি, হারিয়ে গেছে একটি সম্ভাব্য দীর্ঘ সাহিত্যজীবন।

আজ এত বছর পরও সুহৃদ চাকমার কথা মনে পড়লে প্রথমেই হয়তো তাঁর লেখা মনে পড়ে না। মনে পড়ে সেই মানুষটির কথা, যিনি হয়তো খুব সহজভাবে কথা বলতেন, মুখে থাকত মৃদু হাসি, আর নিজের ভেতরে বহন করতেন এক বিশাল সাহিত্যিক স্বপ্ন।

মনে পড়ে তাঁর সেই শেষ বাক্য-  একটু পরে আসছি।কত বছর পেরিয়ে গেছে সেইএকটু পরে অপেক্ষায়! কিন্তু সাহিত্য কখনো কখনো মৃত্যুকেও অতিক্রম করে। মানুষ চলে যায়, বই থেকে যায়। কণ্ঠ থেমে যায়, শব্দ বেঁচে থাকে। জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু চিন্তার উত্তরাধিকার শেষ হয় না। সুহৃদ চাকমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।

তাঁরবার্গীআজও তাঁর কবিসত্তার সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর প্রবন্ধগুলো আজও চাকমা ভাষা, সাহিত্য ইতিহাস নিয়ে ভাবার উপকরণ। তাঁর গল্পগুলো তাঁর গদ্যপ্রতিভার পরিচয় দেয়। তাঁর সমালোচনা তাঁর নির্ভীক মননের সাক্ষ্য দেয়। আর তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন আমাদের মনে করিয়ে দেয়- একজন প্রতিভাবান মানুষকে হারানো মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়; কখনো কখনো একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকেও হারানো।

সুহৃদ চাকমা বেঁচে থাকলে চাকমা সাহিত্য হয়তো আরও অনেক কিছু পেত। কিন্তু তিনি যতটুকু সময় পেয়েছেন, সেই অল্প সময়েই যে আলো জ্বেলে গেছেন, তা তাঁর জীবনকালের চেয়ে দীর্ঘ। আজ তাঁর স্মৃতির সামনে দাঁড়ালে তাই শোকের পাশাপাশি এক ধরনের কৃতজ্ঞতাও জন্ম নেয়।

তিনি এসেছিলেন বলে। তিনি লিখেছিলেন বলে। তিনি নিজের ভাষা সাহিত্যের জন্য স্বপ্ন দেখেছিলেন বলে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কৃতজ্ঞতা- মাত্র ত্রিশ বছরের জীবনে তিনি আমাদের হাতে দিয়ে গেছেন এমন কিছু শব্দ, যা তাঁর অনুপস্থিতির মধ্যেও তাঁর উপস্থিতির কথা বলে যায়। সুহৃদ চাকমা চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর সেইএকটু পরেযেন আজও শেষ হয়নি।

তিনি ফিরে আসেননি মানুষ হয়ে- ফিরে এসেছেন তাঁর কবিতায়, তাঁর প্রবন্ধে, তাঁর গবেষণায়, তাঁর গল্পে,তাঁর স্বপ্নে। চাকমা সাহিত্যের পাঠক যখন তাঁর লেখা খুলে বসেন, তখন হয়তো মনে হয়- দরজার ওপাশে এখনও সেই সহজ-সরল মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে সেই মৃদু আত্মপ্রত্যয়ের হাসি। শুধু তিনি বলছেন না- “একটু পরে আসছি। কারণ আমরা জানি, সেইএকটু পরেআর কোনোদিন শেষ হবে না। সুহৃদ চাকমা তাই শুধু অতীতের একজন সাহিত্যিক নন- তিনি চাকমা সাহিত্যের এক অসমাপ্ত স্বপ্ন, এক অমোচনীয় শূন্যতা এবং এক চিরভাস্বর স্মৃতি।

তথ্যসূত্র:
সুহৃদ চাকমা স্মারক গ্রন্থ - সম্পাদক: মৃত্তিকা চাকমা।

আলোর পথ দেখালো যারা -  সম্পাদক: বিনোদ বিকাশ কার্বারি।

 

কৃষ্ণকিশোর চাকমা: পাহাড়ে শিক্ষার প্রথম আলোকবর্তিকা - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস কেবল পাহাড়, নদী, বন আর জনপদের ইতিহাস নয়; এটি অন্ধকারের ভিতর থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়া এক মানুষেরও ইতিহাস। যে সম...