কিছু মানুষ চলে যান, অথচ তাঁদের চলে যাওয়া শেষ হয়ে যায় না। তাঁরা থেকে যান শব্দে, স্মৃতিতে, অসমাপ্ত স্বপ্নে; থেকে যান একটি জাতির সাংস্কৃতিক চেতনার গভীরে। তাঁদের জীবন যত সংক্ষিপ্তই হোক, তাঁদের রেখে যাওয়া আলো দীর্ঘকাল পথ দেখায়। সুহৃদ চাকমা তেমনই এক নাম—চাকমা সাহিত্যের আকাশে স্বল্পকাল জ্বলে ওঠা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার আলো নিভে গেলেও তার দীপ্তি আজও অনুভব করা যায়।
সুহৃদ চাঙমা ডাকনাম ‘লক্ক’। খুব সাধারণ, সাদাসিধে, সহজ-সরল এক মানুষ। কিন্তু সেই সাধারণ মুখের আড়ালে বাস করত এক অসাধারণ মেধা, এক অনুসন্ধিৎসু মন এবং নিজের ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রতি গভীর দায়বোধ। কবিতা ছিল তাঁর ভালোবাসা, সাহিত্য ছিল তাঁর সাধনা; আর চাকমা ভাষা ও সংস্কৃতির অনুসন্ধান ছিল তাঁর অন্তর্গত এক তাগিদ।
১৯৫৮ সালের ২০ জুন বর্তমান খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দিঘীনালা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার উত্তরে ‘বাঘেইছড়ি দুঅর’ নামের এক স্থানে তাঁর জন্ম। পিতা প্রফুল্ল কুমার চাঙমা, মাতা দেনি চাঙমা। সাত সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন দ্বিতীয়। পাহাড়ের মাটি, অরণ্য, নদী আর লোকজ জীবনের আবহে বেড়ে ওঠা সেই শিশুটিই পরবর্তীকালে চাকমা সাহিত্যজগতে নিজের জন্য নির্মাণ করেছিলেন একটি স্বতন্ত্র আসন।
তাঁকে দেখলে হয়তো প্রথম দর্শনে কেউ অনুমান করতে পারত না, এই শান্ত, সরল মানুষটির ভেতরে কতটা আলো জমে আছে। হ্যাংলা-লম্বা, ফর্সা, ছিপছিপে শরীর; মুখে আত্মপ্রত্যয়ের মৃদু হাসি। কিন্তু তাঁর কথায়, লেখায় ও চিন্তায় প্রকাশ পেত গভীরতা। তিনি ছিলেন নীরব অথচ নিবিড় এক সাধক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনার্স ও এম.এ. সম্পন্ন করেন তিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাজীবন তাঁর চিন্তার জগৎকে আরও প্রসারিত করে। বাংলা সাহিত্য ও আধুনিক সাহিত্যতত্ত্বের সঙ্গে পরিচয়ের পাশাপাশি নিজের মাতৃভাষা ও জাতির সাহিত্যিক উত্তরাধিকারকে নতুন চোখে দেখার সুযোগ পান।
শিক্ষাজীবন শেষ করে বোয়ালখালী অনাথ আশ্রম বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে রাঙামাটির মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন কয়েক বছর। শিক্ষকতা ছেড়ে একটি প্রতিষ্ঠানে জেনারেল ম্যানেজার হিসেবেও কাজ করেন। কিন্তু জীবিকার পরিচয় কখনো তাঁর আসল পরিচয়কে ঢেকে রাখতে পারেনি। তাঁর প্রকৃত পরিচয় ছিল, তিনি একজন সাহিত্যসাধক।
১৯৮২ সালের ৩১ জানুয়ারি তাঁর জীবনে আসে আরেক অধ্যায়। বনরূপা নিবাসী ব্রজেন্দ্র তালুকদার ও ঝর্ণা তালুকদারের কন্যা অর্চনা তালুকদার (স্বপ্না)-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের সংসারে আসে দুই সন্তান- পুত্র সুভদ্র ও কন্যা সূচনা। সংসার, কর্মজীবন ও সাহিত্য, সবকিছুর মধ্যেই তিনি নিজের সৃষ্টিশীলতার পথ তৈরি করে নিয়েছিলেন।
সুহৃদ চাকমার কবিসত্তার সবচেয়ে উজ্জ্বল পরিচয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘বার্গী’। একটি মাত্র কাব্যগ্রন্থ, অথচ তার মধ্যেই যেন একটি কবির দীর্ঘ সম্ভাবনার আভাস।
তিনি শুধু কবিতার অনুরাগী ছিলেন না; ছিলেন সচেতন আধুনিক কবি। তাঁর কবিতায় সমকাল প্রবেশ করেছে নানা অনুষঙ্গে। জীবনের পরিচিত দৃশ্য, মানুষের অনুভূতি, সময়ের অভিঘাত, সবকিছুকে তিনি কবিতার নিজস্ব ভাষায় রূপ দিতে চেয়েছেন।
চিত্রকল্প নির্মাণে তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। শব্দ তাঁর কাছে শুধু বাক্য গঠনের উপকরণ ছিল না; শব্দ ছিল অনুভূতির শরীর। একটি দৃশ্যকে কীভাবে কয়েকটি শব্দের মধ্যে জীবন্ত করে তোলা যায়, একটি অনুভূতিকে কীভাবে চিত্রের মতো পাঠকের সামনে দাঁড় করানো যায়- সে বিষয়ে তাঁর ছিল গভীর উপলব্ধি।
তিনি কবিতাকে সহজ কাজ মনে করতেন না। কবিতা তাঁর কাছে ছিল শ্রম, সাধনা ও নির্মাণের বিষয়। তাই তাঁর কবিতায় শব্দের ব্যবহার, চিত্রকল্পের নির্মাণ এবং ভাবের বিন্যাসে পাওয়া যায় সচেতন শিল্পবোধ।
আজ ‘বার্গী’র দিকে ফিরে তাকালে সবচেয়ে বেশি যে বেদনা জাগে, তা হলো- এই কবির হাতে যদি আরও সময় থাকত! আরও দশটি বছর, আরও বিশটি বছর যদি তিনি পেতেন! হয়তো চাকমা আধুনিক কবিতার ইতিহাসে আরও অনেক নতুন দরজা খুলে যেত।
সুহৃদ চাকমার সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে মূল্যবান দিকগুলোর একটি ছিল চাকমা ভাষা নিয়ে তাঁর গভীর আগ্রহ। তিনি বুঝেছিলেন—একটি জাতির ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষার ভেতরেই বাস করে তার ইতিহাস, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়।
‘চাকমা ভাষা’, ‘দি চাকমা ক্রিপ্ট’, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা’, ‘চাকমা সাহিত্যের উদ্ভব ও ক্রমবিকাশ’, ‘রাধামন-ধনপুদি গীতিকার ঐতিহাসিকতা’, ‘দীপংকর শ্রীজ্ঞান চাকমার কবিতা : ভাব ও আঙ্গিক বিশ্লেষণ’, ‘চাকমা জাতির ইতিহাসে মোগল প্রভাব’সহ তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে সেই অনুসন্ধিৎসু মননের পরিচয় পাওয়া যায়।
তিনি কঠিন বিষয়কে সহজ ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারতেন। তাঁর লেখার ভাষা ছিল ঋজু, সাবলীল এবং নিজস্ব। পাণ্ডিত্যকে কখনো দুর্বোধ্যতার আড়ালে লুকিয়ে রাখেননি। বরং জটিল বিষয়কে সাধারণ পাঠকের কাছে সহজ করে তোলাই ছিল তাঁর লেখার অন্যতম শক্তি।
চাকমা ভাষা, সাহিত্য ও ইতিহাস নিয়ে তাঁর যে অনুসন্ধান, তা ছিল শুধু একজন লেখকের কৌতূহল নয়; ছিল নিজের জাতির সাংস্কৃতিক শিকড়ের সন্ধান।
গল্প লিখেছেন সংখ্যায় কম, কিন্তু তাঁর গল্পের বিষয়, প্লট ও উপস্থাপনার স্বাতন্ত্র্য তাঁকে একজন সম্ভাবনাময় গল্পকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। ‘জিংকানি’, ‘কোচপানার নাং পত্তাপত্তি’, ‘অ্যান্ট্রপলজি’সহ তাঁর গল্পগুলো তাঁর গদ্যশক্তির পরিচয় বহন করে।
তিনি বিশ্বাস করতেন, গদ্য ছাড়া একটি ভাষার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ সম্ভব নয়। উপন্যাস লেখার ইচ্ছাও তাঁর ছিল। সামর্থ্যও ছিল। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূর্ণতা পায়নি।
সমালোচক হিসেবেও তাঁর ছিল নিজস্ব অবস্থান। সত্য বলার সাহস ছিল তাঁর অন্যতম বড় গুণ। কারও মন রক্ষা করার জন্য তিনি নিজের বিচারবোধকে বিসর্জন দেননি। তাঁর ক্ষুরধার সমালোচনা অনেককে অস্বস্তিতে ফেলেছিল, অনেকের বিরাগও ডেকে এনেছিল। কিন্তু সাহিত্যিকের কাছে জনপ্রিয়তার চেয়ে সত্যনিষ্ঠা যে বড়. সুহৃদ তাঁর আচরণ ও লেখায় সেই বিশ্বাসেরই পরিচয় দিয়েছেন।
রাঙামাটি এস্থেটিক্স কাউন্সিলের অন্যতম রূপকার, নামকরণকারী ও প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবেও সুহৃদ চাকমার নাম স্মরণীয়। সাহিত্যকে তিনি নিছক ব্যক্তিগত আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্র হিসেবে দেখেননি। তিনি চেয়েছিলেন সাহিত্য ও সংস্কৃতি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক, সাংস্কৃতিক চর্চা সংগঠিত হোক, নতুন প্রজন্মের মধ্যে সৃষ্টিশীলতার পথ তৈরি হোক।
এই জায়গাতেই সুহৃদ চাকমার জীবনকে কেবল একজন কবির জীবন বলে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি ছিলেন সাংস্কৃতিক কর্মী, চিন্তক এবং একজন স্বপ্নবান মানুষ।
তারপর এলো সেই দিন। ৮ আগস্ট ১৯৮৮। সুহৃদ চাঙমাকে তাঁর বাসা থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হলো।বেরিয়ে যাওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন- “একটু পরে আসছি।” কী অদ্ভুত একটি বাক্য! প্রতিদিনের জীবনে উচ্চারিত একেবারে সাধারণ কথা। অথচ কখনো কখনো একটি সাধারণ বাক্যই হয়ে ওঠে সারাজীবনের সবচেয়ে গভীর স্মৃতি।
তিনি আর ফিরে এলেন না। সেদিন যে মানুষটি দরজা দিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিলেন, তাঁর প্রিয়জনেরা হয়তো অপেক্ষা করেছিলেন। হয়তো ভেবেছিলেন, এই তো, একটু পরেই ফিরবেন। সন্ধ্যা নামল, রাত হলো; কিন্তু সেই ‘একটু পরে’ আর কোনোদিন এল না। একটি পরিবার অপেক্ষা করতে করতে হারাল তার প্রিয় মানুষকে। আর চাঙমা সাহিত্য হারাল তার এক উজ্জ্বল, সম্ভাবনাময় কণ্ঠকে।
১৯৫৮ থেকে ১৯৮৮- মাত্র ত্রিশ বছর। একজন মানুষের জীবনে ত্রিশ বছর হয়তো একটি পূর্ণ জীবন নয়; বরং জীবনের প্রস্তুতির সময়। এই বয়সেই মানুষ তার অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে, চিন্তাকে পরিণত করে, নিজের সৃষ্টির সবচেয়ে শক্তিশালী সময়ের দিকে এগিয়ে যায়।
সুহৃদ তখনও সেই পথের শুরুতেই ছিলেন। তাঁর সামনে ছিল আরও কবিতা লেখার সময়, আরও প্রবন্ধের বিষয়, আরও গবেষণার ক্ষেত্র, আরও গল্প, হয়তো একটি উপন্যাস। চাকমা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে তাঁর অনুসন্ধান আরও বিস্তৃত হতে পারত। তাঁর চিন্তা আরও পরিণত হতে পারত। নতুন প্রজন্মের লেখকদের জন্য তিনি হয়ে উঠতে পারতেন একজন পথপ্রদর্শক।
কিন্তু নিয়তি তাঁকে সে সময়টুকু দেয়নি। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে শুধু একজন মানুষ হারিয়ে যায়নি, হারিয়ে গেছে একটি সম্ভাব্য দীর্ঘ সাহিত্যজীবন।
আজ এত বছর পরও সুহৃদ চাকমার কথা মনে পড়লে প্রথমেই হয়তো তাঁর লেখা মনে পড়ে না। মনে পড়ে সেই মানুষটির কথা, যিনি হয়তো খুব সহজভাবে কথা বলতেন, মুখে থাকত মৃদু হাসি, আর নিজের ভেতরে বহন করতেন এক বিশাল সাহিত্যিক স্বপ্ন।
মনে পড়ে তাঁর সেই শেষ বাক্য- “একটু পরে আসছি।” কত বছর পেরিয়ে গেছে সেই ‘একটু পরে’র অপেক্ষায়! কিন্তু সাহিত্য কখনো কখনো মৃত্যুকেও অতিক্রম করে। মানুষ চলে যায়, বই থেকে যায়। কণ্ঠ থেমে যায়, শব্দ বেঁচে থাকে। জীবন শেষ হয়ে যায়, কিন্তু চিন্তার উত্তরাধিকার শেষ হয় না। সুহৃদ চাকমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।
তাঁর ‘বার্গী’ আজও তাঁর কবিসত্তার সাক্ষ্য বহন করে। তাঁর প্রবন্ধগুলো আজও চাকমা ভাষা, সাহিত্য ও ইতিহাস নিয়ে ভাবার উপকরণ। তাঁর গল্পগুলো তাঁর গদ্যপ্রতিভার পরিচয় দেয়। তাঁর সমালোচনা তাঁর নির্ভীক মননের সাক্ষ্য দেয়। আর তাঁর অসমাপ্ত স্বপ্ন আমাদের মনে করিয়ে দেয়- একজন প্রতিভাবান মানুষকে হারানো মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়; কখনো কখনো একটি সম্ভাব্য ভবিষ্যৎকেও হারানো।
সুহৃদ চাকমা বেঁচে থাকলে চাকমা সাহিত্য হয়তো আরও অনেক কিছু পেত। কিন্তু তিনি যতটুকু সময় পেয়েছেন, সেই অল্প সময়েই যে আলো জ্বেলে গেছেন, তা তাঁর জীবনকালের চেয়ে দীর্ঘ। আজ তাঁর স্মৃতির সামনে দাঁড়ালে তাই শোকের পাশাপাশি এক ধরনের কৃতজ্ঞতাও জন্ম নেয়।
তিনি এসেছিলেন বলে। তিনি লিখেছিলেন বলে। তিনি নিজের ভাষা ও সাহিত্যের জন্য স্বপ্ন দেখেছিলেন বলে। আর সবচেয়ে বড় কথা, কৃতজ্ঞতা- মাত্র ত্রিশ বছরের জীবনে তিনি আমাদের হাতে দিয়ে গেছেন এমন কিছু শব্দ, যা তাঁর অনুপস্থিতির মধ্যেও তাঁর উপস্থিতির কথা বলে যায়। সুহৃদ চাকমা চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর সেই ‘একটু পরে’ যেন আজও শেষ হয়নি।
তিনি ফিরে আসেননি মানুষ হয়ে- ফিরে এসেছেন তাঁর কবিতায়, তাঁর প্রবন্ধে, তাঁর গবেষণায়, তাঁর গল্পে,তাঁর স্বপ্নে। চাকমা সাহিত্যের পাঠক যখন তাঁর লেখা খুলে বসেন, তখন হয়তো মনে হয়- দরজার ওপাশে এখনও সেই সহজ-সরল মানুষটি দাঁড়িয়ে আছেন। মুখে সেই মৃদু আত্মপ্রত্যয়ের হাসি। শুধু তিনি বলছেন না- “একটু পরে আসছি।” কারণ আমরা জানি, সেই ‘একটু পরে’ আর কোনোদিন শেষ হবে না। সুহৃদ চাকমা তাই শুধু অতীতের একজন সাহিত্যিক নন- তিনি চাকমা সাহিত্যের এক অসমাপ্ত স্বপ্ন, এক অমোচনীয় শূন্যতা এবং এক চিরভাস্বর স্মৃতি।
তথ্যসূত্র:
সুহৃদ চাকমা স্মারক গ্রন্থ - সম্পাদক: মৃত্তিকা চাকমা।
আলোর পথ দেখালো যারা - সম্পাদক: বিনোদ বিকাশ কার্বারি।
