পৃথিবীর
সমস্ত মহান সৃষ্টির পেছনে থাকে এক দীর্ঘ নীরব সাধনা। থাকে অভাব, প্রতিকূলতা, বঞ্চনা,
হারানোর বেদনা এবং বারবার ভেঙে পড়েও নতুন করে উঠে দাঁড়ানোর এক দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা।
শিল্পীর জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। বরং একজন প্রকৃত শিল্পীর জীবনকে বুঝতে হলে তাঁর সৃষ্টির
সৌন্দর্যের পাশাপাশি ফিরে তাকাতে হয় সেই পথের দিকে—যে পথে কাঁটা ছিল, ছিল অন্ধকার;
তবু তিনি আলো খুঁজেছেন, সুর খুঁজেছেন, মানুষের কাছে পৌঁছানোর ভাষা খুঁজেছেন।
অমর
শান্তি চাঙমার জীবন তেমনই এক দীর্ঘ সৃষ্টিযাত্রার নাম। তিনি কেবল একজন গীতিকার নন,
কেবল একজন সুরকার কিংবা কণ্ঠশিল্পী নন; তিনি একাধারে শিক্ষক, লেখক, কবি, সাংস্কৃতিক
সংগঠক ও মানবতাবাদী মননের অধিকারী। তাঁর সৃষ্টির ভেতর দিয়ে পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের
জীবন, সমাজের বাস্তবতা, ধর্মীয় অনুভব, দেশ ও জাতির প্রতি দায়বোধ এবং শান্তির আকাঙ্ক্ষা
একাকার হয়ে গেছে।
তাঁর
গানে প্রকৃতি কখনো নিছক দৃশ্য নয়—তা হয়ে ওঠে অনুভবের ভাষা। মেঘ, পাহাড়, ফুল, পাখি,
জুমের জীবন ও মানুষের চলমান অস্তিত্ব তাঁর সৃষ্টির ভেতরে এসে পায় এক আত্মিক ব্যঞ্জনা।
তাঁর কালজয়ী গানের পঙ্ক্তিতে যেন মুক্ত বিহঙ্গের ডানায় ভর করে দূর আকাশে উড়ে যাওয়ার
স্বপ্ন; যেন পৃথিবীর সৌন্দর্যকে বুকের ভেতর ধারণ করে মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর এক
নির্মল বাসনা।
তাঁর
শিল্পভাবনার কেন্দ্রে তাই আছে মানুষ। বিভেদের বিপরীতে ঐক্য, বিদ্বেষের বিপরীতে ভালোবাসা,
হিংসার বিপরীতে শান্তি এবং অন্ধকারের বিপরীতে সৃষ্টির আলো—এই মানবিক প্রত্যয় তাঁর দীর্ঘ
সৃষ্টিজীবনের অন্তঃসলিলা স্রোত।
অমর
শান্তি চাঙমার শৈশব কোনো বিলাসী জীবনের গল্প নয়। তা ছিল এক সাধারণ গ্রামীণ জীবনের সরল
অথচ কঠিন বাস্তবতা। পারিবারিক আর্থিক সচ্ছলতা ছিল সীমিত। তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে
তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। ছোট বয়সেই সংসারের বাস্তবতা তাঁকে বুঝতে হয়েছিল। অভাব তাঁর স্বপ্নকে
থামিয়ে দেয়নি; বরং সেই অভাবই সম্ভবত তাঁকে জীবনের প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তুলেছিল।
পিতার
সংসারের কাজে সহযোগিতা করে, দৈনন্দিন দায়িত্ব পালন করে তারপর তাঁকে বিদ্যালয়ে যেতে
হতো। বিদ্যালয় থেকে ফিরে আবার বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলায় মেতে উঠতেন। জীবনের এই সরল
ছন্দের মধ্যেই গড়ে উঠেছিল তাঁর শৈশব—একদিকে সংসারের দায়িত্ব, অন্যদিকে পড়াশোনার প্রতি
অদম্য আগ্রহ এবং তার পাশাপাশি কিশোর মনের স্বাভাবিক উচ্ছ্বাস।
শৈশবেই
তিনি শ্রদ্ধেয় শ্রীসৎ সুজাত প্রিয় মহাস্থবিরের সান্নিধ্যে এসে কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে
শিক্ষাজীবন চালিয়ে যান। রূপালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কাচালং উচ্চ বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের
অগ্রসরতা ঘটে। প্রথমবার এসএসসি পরীক্ষায় সফলতা না এলেও তিনি ভেঙে পড়েননি। ১৯৮১ সালে
পুনরায় পরীক্ষায় অংশ নিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে সম্পূর্ণ নকলমুক্তভাবে
তাঁর গ্রাম থেকে একমাত্র তিনিই উত্তীর্ণ হন—যা তাঁর অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস ও নৈতিক
দৃঢ়তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
পরবর্তীতে
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হলেও ভাগ্য তাঁর শিক্ষার পথে সহজ রাস্তা বিছিয়ে রাখেনি।
তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁর উচ্চশিক্ষার স্বপ্নে
ছেদ টানে। দূর শহরে গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া আর সম্ভব হয়নি। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের
আনুষ্ঠানিক পথ থেমে গেলেও তাঁর শিক্ষাযাত্রা থেমে যায়নি। পরবর্তী জীবনেই তিনি প্রমাণ
করেছেন—শিক্ষা কোনো সনদে সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষা মানুষের সারাজীবনের অন্বেষণ।
অমর
শান্তি চাঙমার সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক সত্তার উন্মেষ ঘটে তাঁর কৈশোরেই। বন্ধুদের মধ্যে
সাহিত্যচর্চা, গান নিয়ে ভাবনা, কবিতা ও সৃষ্টিশীলতার আলোচনা তাঁর কিশোর মনকে গভীরভাবে
আলোড়িত করেছিল। জ্ঞানপাল চাকমা, লক্ষ্মীধন চাকমা, নবেন্দু বিকাশ চাকমাসহ তাঁর বাল্যবন্ধুদের
সঙ্গে সাহিত্য ও সংগীত নিয়ে নানা আলোচনা তাঁর সৃষ্টির ভিত নির্মাণে সহায়ক হয়।
১৯৭২
সালের ১৫ মে তাঁর হাতে জন্ম নেয় “উত্তোন পেইগে সেজ্যে মেল্যে”—এবং সৃষ্টির সেই প্রথম
স্পন্দন ক্রমে পরিণত হয় দীর্ঘ এক সুরযাত্রায়। পরবর্তীতে তিনি একের পর এক গান রচনা করেন।
শুধু গান নয়—কবিতা, গল্প, নাটকও লিখেছেন। তাঁর কলমের স্রোত একসময় এতটাই প্রবল হয়ে ওঠে
যে ব্যক্তিগত সৃষ্টির সীমানা অতিক্রম করে তা ছড়িয়ে পড়ে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরে।
১৯৭৩
সালে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সূত্রে রূপায়ন দেওয়ান ও রঞ্জিত কুমার
দেওয়ানের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তাঁর সাংস্কৃতিক জীবনে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় সৃষ্টি
করে। তাঁর লেখা দুটি গান তিনি তাঁদের হাতে তুলে দেন। গানগুলোর সুরও তিনি নিজেই করেছিলেন।
পরবর্তীতে একটি গানের জন্য তাঁর দেওয়া সুর গ্রহণ করা হয়, অন্যটির সুর নতুনভাবে নির্মিত
হয়। এই স্বীকৃতি তাঁর ভেতরের স্রষ্টাকে আরও সাহসী করে তোলে।
এরপর
আর তাঁকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। একের পর এক গান তাঁর অন্তর থেকে উৎসারিত হতে থাকে।
তাঁর সৃষ্টির বিষয়ও হয়ে ওঠে বহুমাত্রিক—চাকমা ভাষা, দেশ, পাহাড়ের জীবন, জুম, নৃত্য,
ধর্মীয় অনুভব, মানুষের জীবন ও সমাজের নানা বাস্তবতা। তাঁর নিজের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত
তাঁর রচিত গানের সংখ্যা চার হাজারেরও অধিক।
চার
হাজারের অধিক গান—এই সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়। এর ভেতরে আছে কয়েক দশকের একাকী সাধনা,
ভাষার প্রতি ভালোবাসা, সংস্কৃতির প্রতি দায় এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে নিবিড় সংযোগ।
তাঁর গান তাই কেবল শ্রুতিমধুর সুরের সমষ্টি নয়; তা তাঁর জীবনদর্শনেরই একেকটি উচ্চারণ।
জীবন
কখনো শিল্পীর প্রতি সদয় থাকে না। অমর শান্তি চাঙমার ক্ষেত্রেও ছিল না। সময়ের প্রতিকূলতা,
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাতে তাঁর বহু লেখা হারিয়ে গেছে। কবিতা,
গান, গল্প ও নাটকের বহু পাণ্ডুলিপি আজ আর তাঁর হাতে নেই।
এর
সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ব্যক্তিগত বিপর্যয়ও। দুবার আগুনে তাঁর বাড়ি পুড়ে গিয়ে বিপুল ক্ষতির
সম্মুখীন হতে হয়েছে তাঁকে। একটি সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য নিজের সৃষ্টির হারিয়ে যাওয়া
কতটা গভীর বেদনার—তা সহজে ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। কিন্তু এখানেই অমর শান্তি চাঙমার
জীবনের অন্যতম বড় শক্তি। তিনি হারিয়েছেন, কিন্তু থামেননি। আগুন তাঁর ঘর পুড়িয়েছে, তাঁর
সৃষ্টির কাগজ পুড়িয়েছে; তাঁর ভেতরের সৃষ্টিশিখা নিভিয়ে দিতে পারেনি।
এই
কারণেই তাঁর জীবনকে কেবল সৃষ্টির ইতিহাস বলা যায় না; এটি পুনঃসৃষ্টিরও ইতিহাস।
কর্মজীবনের
পথও তাঁর জন্য সহজ ছিল না। জীবনে বিভিন্ন চাকরির সুযোগ পেয়েছেন, কিন্তু সব গ্রহণ করেননি।
দেশ ও জাতির স্বার্থে জীবনের দীর্ঘ দশ-বারোটি বছর তিনি নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে
অতিবাহিত করেছেন। সে সময়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কষ্ট, ত্যাগ, এমনকি জেলজীবনের অভিজ্ঞতাও।
সেই দীর্ঘ সময়ের বহু স্মৃতিই হারিয়ে গেছে, হারিয়ে গেছে তাঁর লেখা বহু সৃষ্টিও।
১৯৮৫
সালের প্রথমার্ধে তাঁর কর্মজীবনে নতুন এক অধ্যায় শুরু হয়। পরবর্তীতে ১৯৮৮ সালে তিনি
সেটেলমেন্টে চাকরি নেন। কয়েক বছর চাকরি করার পর তিনি উপলব্ধি করেন—জীবনকে শুধু অর্থের
হিসাব দিয়ে মাপা যায় না। চাকরির মাধ্যমে যে অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তার কিছু
অংশ তাঁর বিবেককে স্বস্তি দিতে পারেনি। অর্থের প্রাচুর্য তাঁকে আকৃষ্ট করেনি; বরং নৈতিক
অস্বস্তিই তাঁকে সেই চাকরি ত্যাগের সিদ্ধান্তে নিয়ে যায়।
তিনি
চলে গেলেন একটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে। তখন হয়তো অর্থনৈতিক দিক
থেকে সেটি ছিল সহজ সিদ্ধান্ত নয়। কিন্তু তাঁর কাছে জীবনের মূল্যবোধ ছিল অন্য জায়গায়।
পরবর্তীতে সেই বিদ্যালয় সরকারি হওয়ার সঙ্গে তাঁর কর্মজীবনও স্থিতিশীলতা লাভ করে। দীর্ঘ
২৯ বছর শিক্ষকতা শেষে তিনি অবসর নিয়েছেন।
এই
ঘটনাটি তাঁর ব্যক্তিত্বের গভীরে থাকা নৈতিক দৃঢ়তার পরিচয় বহন করে। অর্থ যেখানে বিবেককে
অস্বস্তিতে ফেলে, সেখানে অর্থকে প্রত্যাখ্যান করার সাহস খুব বেশি মানুষের থাকে না।
অমর শান্তি চাঙমা সেই বিরল সাহসের অধিকারী।
অমর
শান্তি চাঙমার জীবনের সঙ্গে শিক্ষকতা এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে একটিকে অন্যটির থেকে আলাদা
করা কঠিন। তাঁর কাছে শিক্ষকতা ছিল শুধু শ্রেণিকক্ষে পাঠদান নয়; বরং মানুষের ভেতরের
মানুষটিকে জাগিয়ে তোলার এক নীরব সাধনা।
তিনি
নিয়মিত পাঠাভ্যাস করতেন। সমাজের নানা বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করতেন এবং সেই অভিজ্ঞতা তাঁর
লেখায় লিপিবদ্ধ করতেন। মেধা, মনন ও চিন্তাশক্তিকে তিনি কেবল নিজের বিকাশে ব্যবহার করেননি;
বরং সমাজ ও দেশ গঠনের কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
১৯৮৯-৯০
শিক্ষাবর্ষে রাঙামাটি সি-ইন-এড কলেজে প্রশিক্ষণ গ্রহণের সময় তাঁর সঙ্গে ট্রাইবেল কালচারাল
ইনস্টিটিউটের পরিচালক সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরার যোগাযোগ ঘটে। তাঁদের কথোপকথন ও পরামর্শ
তাঁর সাহিত্যিক ও সাংস্কৃতিক আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে। একজন গুণী মানুষের একটি আন্তরিক
পরামর্শ কখনো কখনো একজন স্রষ্টার জীবনে নতুন দরজা খুলে দেয়—তাঁর জীবনেও যেন তেমনই ঘটেছিল।
শিক্ষক
হিসেবে তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো তাঁর শিষ্যরা। তাঁর হাত ধরে অসংখ্য তরুণ সংগীত ও
সাংস্কৃতিক জগতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁদের মধ্যে মোসাম্মৎ শেফালি আক্তার,
কয়েল চাকমা, ধর্মরত্না চাকমা এবং জাপানপ্রবাসী কণ্ঠশিল্পী পাপড়ী চাকমার নাম বিশেষভাবে
উল্লেখযোগ্য।
একজন
শিক্ষকের প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর লেখা বইয়ে নয়, তাঁর ছাত্রদের জীবনেও বেঁচে থাকে।
সেই অর্থে অমর শান্তি চাঙমার উত্তরাধিকার বহুদূর বিস্তৃত।
অমর
শান্তি চাঙমার শিল্পসত্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক তাঁর ধর্মীয় সংগীতচর্চা। কিন্তু তাঁর
ধর্মভাবনা কোনো সংকীর্ণতার মধ্যে আবদ্ধ নয়। তাঁর কাছে ধর্ম মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির
উপকরণ নয়; বরং মানুষকে সংযম, শান্তি, মমতা ও কল্যাণের দিকে আহ্বান করার এক নৈতিক শক্তি।
ধর্মের
নামে হানাহানি, পরস্পরের প্রতি বিষোদ্গার কিংবা পরশ্রীকাতরতাকে তিনি নির্মল সমাজের
অদৃশ্য শত্রু বলে মনে করেন। তাঁর এই অবস্থান তাঁর মানবতাবাদী মননেরই বহিঃপ্রকাশ।
তাই
তাঁর গান শুনলে কেবল সুরের সৌন্দর্য শোনা যায় না; শোনা যায় এক শান্তিপ্রিয় মানুষের
অন্তর্গত আহ্বান। তাঁর শিল্পের ভাষা যেন বলে—মানুষকে মানুষের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়
যে বিদ্বেষ, তাকে পরাজিত করতে হবে ভালোবাসা দিয়ে; যে অন্ধকার মানুষকে বিভক্ত করে, তাকে
অতিক্রম করতে হবে সৃষ্টির আলোয়।
অমর
শান্তি চাঙমা প্রচারবিমুখ। তিনি আলোচনার কেন্দ্রে থাকার চেয়ে সৃষ্টির ভেতরে থাকতে বেশি
স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেছেন। তাঁর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা “মুরোল্যা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী”
স্থানীয় সুধী সমাজে প্রশংসা অর্জন করেছে। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক পরিসরের
গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান জুম ঈসথেটিক কাউন্সিলের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
রাঙামাটির
বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ তাঁর সৃষ্টির পরিসরকে আরও বিস্তৃত
করেছে। কীর্তি চাকমা, মনোজ বাহাদুর গোর্খা, রঞ্জিত কুমার দেওয়ান, সূর্যজ্যোতি চাকমাসহ
বহু গুণী মানুষের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ, মতবিনিময় ও পারস্পরিক সহযোগিতার স্মৃতি তাঁর
সাংস্কৃতিক জীবনের মূল্যবান সম্পদ।
তাঁর
এই যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সংস্কৃতির ইতিহাস শুধু বড় বড় মঞ্চে আলো পাওয়া মানুষের
ইতিহাস নয়; এর বড় অংশ তৈরি হয় নীরবে, প্রত্যন্ত জনপদে, ছোট ছোট ঘরে, অনাড়ম্বর আয়োজনের
মধ্যে, মানুষের প্রতি ভালোবাসা থেকে।
দীর্ঘ
সাংস্কৃতিক ও শিক্ষকতা জীবনে অমর শান্তি চাঙমা আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান
থেকে সম্মাননা পেয়েছেন। বড়াদম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রূপালী উচ্চ বিদ্যালয়, কাচালং
ওয়েলফেয়ার সোসাইটি ঢাকা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ইনস্টিটিউট, রাঙামাটি জেলা শিল্পকলা একাডেমি,
জুম ঈসথেটিক কাউন্সিল এবং বিশ্ব বেতার দিবস উপলক্ষে রাঙামাটি বেতার তাঁকে সম্মানিত
করেছে।
তাঁর
নিজের স্মৃতিচারণে খাগড়াছড়ির সুধী সমাজ থেকে পাওয়া সম্মানকে তিনি তাঁর জীবনের অন্যতম
শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পাওয়া
এই স্বীকৃতিগুলো তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের সামাজিক স্বীকৃতির সাক্ষ্য।
তবে
প্রকৃত শিল্পীর জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার হয়তো কোনো পদক নয়—মানুষের হৃদয়ে তাঁর সৃষ্টির
বেঁচে থাকা। সেই বিচারে অমর শান্তি চাঙমার সবচেয়ে বড় সম্মান তাঁর গান, তাঁর শিষ্য এবং
তাঁর সৃষ্টিকে ঘিরে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী ভালোবাসা।
অমর
শান্তি চাঙমা চার সন্তানের পিতা। তাঁর একমাত্র কন্যা পাপড়ী চাকমা জাপানপ্রবাসী ও কণ্ঠশিল্পী।
তাঁর বড় ছেলে আমেরিকাপ্রবাসী এবং অন্য দুই ছেলে সরকারি চাকরিতে নিয়োজিত। তাঁর পরিবারও
যেন তাঁর জীবনসাধনারই একটি নীরব সম্প্রসারণ।
একজন
শিল্পীর জীবন কখনো একার জীবন নয়। তাঁর সৃষ্টির পেছনে থাকে পরিবার, সমাজ, সময় ও মানুষের
অসংখ্য সম্পর্ক। অমর শান্তি চাঙমার জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। তাঁর শিল্পীসত্তা যেমন
ব্যক্তিগত, তেমনি তার শিকড় প্রোথিত রয়েছে বৃহত্তর সমাজ ও সংস্কৃতির মাটিতে।
আজ
তিনি শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়েছেন। কিন্তু সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য অবসর বলে কিছু নেই।
বিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি মিলতে পারে, কিন্তু সৃষ্টির প্রতি দায়বদ্ধতা
থেকে অবসর নেওয়া যায় না।
যে
মানুষ জীবনের প্রতিকূলতার কাছে মাথা নত করেননি, যার বহু সৃষ্টি হারিয়ে গেছে তবু তিনি
আবার লিখেছেন, যার ঘর আগুনে পুড়েছে তবু তাঁর অন্তরের সুর নিভে যায়নি, যিনি অর্থনৈতিক
স্বাচ্ছন্দ্যের চেয়ে নৈতিকতাকে বেছে নিয়েছেন, যিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি শিল্পী ও সংস্কৃতিসেবী
হিসেবে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করেছেন—তাঁর অবসর আসলে জীবনের এক নতুন অধ্যায়
মাত্র।
অমর
শান্তি চাঙমার জীবনকে এক বাক্যে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন। কারণ তাঁর পরিচয় একক নয়। তিনি
শিক্ষক, কিন্তু শুধু শিক্ষক নন; তিনি গীতিকার, কিন্তু শুধু গীতিকার নন; তিনি সুরকার,
কণ্ঠশিল্পী, লেখক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক—কিন্তু এই সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে তিনি একজন মানুষ,
যিনি মানুষের জন্য সৃষ্টি করতে চেয়েছেন।
তাঁর
জীবনের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়—অভাব তাঁকে থামাতে পারেনি, শিক্ষার পথে বাধা তাঁকে
থামাতে পারেনি, রাজনৈতিক অস্থিরতা তাঁকে থামাতে পারেনি, কারাবাস তাঁকে থামাতে পারেনি,
আগুনে পুড়ে যাওয়া সৃষ্টিও তাঁকে থামাতে পারেনি, অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও তাঁকে তাঁর নৈতিক
অবস্থান থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।
এই
অদম্যতাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সাহিত্য।
তাঁর
চার হাজারের অধিক গান কেবল সৃষ্টির সংখ্যা নয়—তা কয়েক দশকের এক অনিঃশেষ আত্মসংলাপ।
তাঁর গানগুলোতে পাহাড়ের প্রকৃতি আছে, জুমজীবনের স্পন্দন আছে, ধর্মীয় অনুভব আছে, মানুষের
প্রতি মমতা আছে, সমাজের বাস্তবতা আছে এবং আছে শান্তির এক গভীর আকাঙ্ক্ষা। তাঁর কলম
ও কণ্ঠে পাহাড় যেন নিজেই কথা বলে—কখনো মেঘের ভাষায়, কখনো বৃষ্টির সুরে, কখনো মানুষের
দীর্ঘশ্বাসে, আবার কখনো আশার দীপ্ত উচ্চারণে।
অমর
শান্তি চাঙমা তাই শুধু একজন শিল্পীর নাম নয়; তিনি এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের নাম।
তিনি এমন এক প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা সীমিত সুযোগের মধ্যেও নিজেদের ভাষা, গান, সাহিত্য
ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিরলস শ্রম দিয়েছেন।
সময়ের
স্রোত অনেক কিছু মুছে দেয়। পাণ্ডুলিপি হারিয়ে যায়, পুরোনো কাগজ নষ্ট হয়, মানুষের স্মৃতি
ক্ষীণ হয়ে আসে। কিন্তু যে সৃষ্টি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নেয়, তা সহজে মুছে যায় না।
একটি সুর প্রজন্ম পেরিয়ে অন্য প্রজন্মে পৌঁছে যায়; একটি গান হয়ে ওঠে মানুষের স্মৃতির
অংশ; একজন শিক্ষকের শেখানো একটি মূল্যবোধ বহু মানুষের জীবনে আলো জ্বালায়।
সেই
অর্থে অমর শান্তি চাঙমার প্রকৃত উত্তরাধিকার তাঁর গানেই, তাঁর শিষ্যদের কণ্ঠে, তাঁর
শিক্ষার্থীদের স্মৃতিতে এবং পাহাড়ের সাংস্কৃতিক জীবনের অন্তঃসলিল স্রোতে।
পাহাড়ের
আকাশে যখন মেঘ জমবে, জুমের সবুজে যখন বাতাস দুলবে, কোনো এক নির্জন বিকেলে যখন দূর থেকে
ভেসে আসবে তাঁর কোনো পুরোনো গান—তখন হয়তো মনে হবে, একজন মানুষ অবসর নিয়েছেন, কিন্তু
তাঁর সুর অবসর নেয়নি।
কারণ
মানুষ চলে যায়, সময় চলে যায়, প্রজন্ম বদলে যায়—কিন্তু সত্যিকারের সৃষ্টির কোনো অবসর
নেই।
অমর
শান্তি চাঙমার জীবন তাই শেষ পর্যন্ত এক দীর্ঘ সুরের মতো—যার শুরু আছে, কিন্তু শেষ নেই;
যার শব্দ মুছে যেতে পারে, কিন্তু যার অনুরণন থেকে যায়।
মানুষের
হৃদয়ে।
পাহাড়ের
বাতাসে।
সময়ের
গভীরে।