মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই, ২০২৬

সবার আগে আমি একজন মানুষ - ইনজেব চাঙমা


মানুষের পরিচয় কি কেবল তার ধর্মে?
সে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ না খ্রিস্টান—এই প্রশ্নের উত্তরেই কি তার সমস্ত অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ? নাকি মানুষের পরিচয়েরও আগে আছে একটি হৃদয়, একটি মন, কিছু স্বপ্ন, কিছু আনন্দ এবং মুক্তভাবে বেঁচে থাকার অধিকার?

 সম্প্রতি ‘শ্রাবণে মেঘগুলো’ ভিডিওকে কেন্দ্র করে স্কুলশিক্ষিকা বিউটি রাণী পাল সমালোচনার মুখে পড়েছেন (২৩জুলাই ২০২৬ ফেঞ্চুগঞ্জ প্রতিদিন নামে একটি ফেসবুক পেজ থেকে সমালোচনা শুরু হয়)। তাঁকে ঘিরে যখন নানা প্রশ্ন, মন্তব্য ও বিতর্কের ঢেউ উঠেছে, তখন প্রতিবাদে সরব হয়েছেন শিক্ষক, সাংবাদিক, সাধারণ মানুষ, কবি সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিমনা মানুষেরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আমার মনে একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসে, আমরা কি একজন মানুষকে তাঁর কর্ম দিয়ে বিচার করছি, নাকি তাঁর পরিচয়ের দেয়াল দিয়ে মাপছি?

 একজন শিক্ষক কেবল পাঠ্যবইয়ের কয়েকটি পাতা নন। তিনি বিদ্যালয়ের ঘণ্টা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ থাকা বন্ধ করেন না। শ্রেণিকক্ষের বাইরে তাঁরও একটি পৃথিবী আছে, সেখানে আছে হাসি, গান, অনুভূতি, সংস্কৃতি, আনন্দ আর নিজের মতো করে বেঁচে থাকার ছোট ছোট ইচ্ছা। দিনের পর দিন অন্যের সন্তানকে মানুষ করার দায়িত্ব যিনি বহন করেন, তাঁর নিজের মনের জন্য কি সামান্য আকাশ থাকবে না?


মানুষের জীবন শুধু দায়িত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা নয়। দায়িত্বের পাশাপাশি আনন্দও আছে, কর্মের পাশাপাশি বিশ্রামও আছে, আর কঠোর বাস্তবতার পাশে আছে শিল্প ও বিনোদনের কোমল আশ্রয়। বিনোদন কোনো অপরাধ নয়; এটি মানুষের স্বাভাবিক সাংস্কৃতিক অধিকার। গান মানুষের ক্লান্তি দূর করে, কবিতা মানুষের মনকে আলোড়িত করে, শিল্প মানুষকে জীবনের সৌন্দর্য চিনতে শেখায়।

 তবু কখনো কখনো আমরা ভুলে যাই, একজন মানুষের পেশাগত পরিচয়ের বাইরেও তাঁর একটি ব্যক্তিসত্তা আছে। আমরা শিক্ষককে শুধু শিক্ষক হিসেবে দেখতে চাই, শিল্পীকে শুধু শিল্পী হিসেবে, শ্রমিককে শুধু শ্রমিক হিসেবে। কিন্তু পরিচয়ের এই কঠিন খাঁচার ভেতরে যে একটি হৃদয় নিঃশব্দে স্পন্দিত হয়, তার কথা আমরা কতবার ভাবি?

 এই ঘটনাকে ঘিরে আমার মনে আরও একটি প্রশ্ন জাগে, তিনি যদি অন্য কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মানুষ হতেন, তবে কি একইভাবে তাঁকে এত প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হতো? প্রশ্নটি কোনো ধর্মকে ছোট করার জন্য নয়; বরং সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা বৈষম্য ও দ্বিমুখী মানদণ্ডকে খুঁজে দেখার জন্য। মানুষের প্রতি আমাদের বিচার যদি ধর্মভেদে বদলে যায়, তবে সেখানে মানবতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ে।

 ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলাম, যেখানে মানুষের কণ্ঠ স্বাধীন হবে, মর্যাদা নিরাপদ থাকবে এবং পরিচয়ের কারণে কেউ অবহেলিত বা বৈষম্যের শিকার হবেন না। আমরা ভেবেছিলাম, নতুন দিনের আলো পুরোনো সংকীর্ণতার অন্ধকার ভেদ করবে। কিন্তু আজও যদি ধর্ম, পরিচয় কিংবা সামাজিক অবস্থান মানুষের স্বাধীনতা নির্ধারণ করে, তবে আমাদের সেই স্বপ্নের পথ এখনো অনেক দূর।

 ধর্ম মানুষের বিশ্বাস—এটি হৃদয়ের আলো। কিন্তু ধর্ম কখনো মানুষের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়াক, তা কাম্য নয়। কেউ হিন্দু, কেউ মুসলিম, কেউ বৌদ্ধ, কেউ খ্রিস্টান, বিশ্বাসের পথ আলাদা হতে পারে, প্রার্থনার ভাষা ভিন্ন হতে পারে; কিন্তু মানুষের কান্নার ভাষা এক, হাসির রং এক, ভালোবাসার আকাঙ্ক্ষা এক।

 আমরা যখন কাউকে দেখি, তখন আগে তাঁর ধর্ম নয়, তাঁর মানুষটিকে দেখি। আগে তাঁর পরিচয় নয়, তাঁর হৃদয়কে বুঝি। কারণ ধর্ম মানুষকে বিশ্বাসের পথ দেখায়, কিন্তু মানবতা মানুষকে মানুষের কাছে নিয়ে যায়।
আজ তাই আমাদের প্রত্যেকের হৃদয়ে একটি বাক্য জেগে উঠুক—
“আমি হিন্দু নই, মুসলিম নই, বৌদ্ধ নই, খ্রিস্টান নই—এই পরিচয়গুলোরও আগে আমি একজন মানুষ।”
মানুষের পেশা তার দায়িত্ব, ধর্ম তার বিশ্বাস, সংস্কৃতি তার আত্মার ভাষা; কিন্তু মানবতা তার সবচেয়ে বড় পরিচয়।

 বিউটি রাণী পালকে ঘিরে এই আলোচনা তাই শুধু একজন শিক্ষিকাকে নিয়ে নয়। এটি আমাদের বিবেকের সামনে রাখা একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা কি একজন মানুষকে দেখতে পাচ্ছি, নাকি শুধু তাঁর ধর্মীয় পরিচয়?

 সময় এসেছে পরিচয়ের দেয়াল ভেঙে মানবতার পথে দাঁড়ানোর। সময় এসেছে অন্যের আনন্দকে সম্মান করার, ব্যক্তিস্বাধীনতাকে মর্যাদা দেওয়ার এবং মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার।
কারণ—
ধর্মের আগে মানবতা, পরিচয়ের আগে মর্যাদা, আর সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে—মানুষ।

 
#বি.দ্র.: “২০২৪ পর দেশে যে বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, আজ সেই প্রত্যাশা নানা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু মানুষের প্রতি হেনস্তা, ভয়ভীতি, সামাজিক অপমান কিংবা বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ উদ্বেগজনক।

সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

কবি বিনয় শংকর চাঙমার জীবন, সাহিত্য ও সংগ্রাম - ইনজেব চাঙমা

 
“যে কবি নিজের জনপদের কান্না শুনতে পান, তিনিই একদিন একটি জাতির স্মৃতির ভাষা হয়ে ওঠেন।”

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় কেবল সবুজ অরণ্যের বিস্তার নয়; তার প্রতিটি ঢালে জমে আছে ইতিহাসের স্তর, প্রতিটি ছড়ায় প্রবাহিত হয় মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, সংগ্রাম ও স্বপ্নের দীর্ঘ উপাখ্যান। সেই উপাখ্যানকে শব্দে, কবিতায় এবং গানে রূপ দিয়েছেন কবি বিনয় শংকর চাঙমা। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি পাহাড়ের স্মৃতিরক্ষক, স্বজাতির ভাষার প্রহরী এবং সংস্কৃতির অন্যতম নিবেদিতপ্রাণ সাধক।

প্রতিকূল রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক অনিশ্চয়তা এবং জীবনের নির্মম বিপর্যয় তাঁর সাহিত্যযাত্রাকে থামাতে পারেনি। বরং প্রতিটি ক্ষত তাঁর সৃষ্টিকে করেছে আরও গভীর, আরও মানবিক। তাই তাঁর কলমে যেমন ফুটে উঠেছে পাহাড়ের অপরূপ প্রকৃতি, তেমনি উচ্চারিত হয়েছে মানুষের বেদনা, ইতিহাসের দহন, জাতিসত্তার সংগ্রাম এবং অস্তিত্ব রক্ষার অদম্য প্রত্যয়। তাঁর অমর সৃষ্টি “লোগাং ছড়া কুলে কুলে” আজও পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের আবেগ, ভালোবাসা ও আত্মপরিচয়ের এক অনন্য প্রতীক।

১৯৪৯ সালের ১১ এপ্রিল খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার কিয়াংঘাট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন বিনয় শংকর চাঙমা। পিতা বিত্তলাল চাঙমা এবং মাতা বিজন মালা চাকমা এর স্নেহময় পরিবারেই তাঁর শৈশবের বীজ রোপিত হয়।

শৈশবের পাঠশালা ছিল পাহাড়, নদী, ছড়া, জুমক্ষেত, বনভূমি আর প্রকৃতির উন্মুক্ত অঙ্গন। পাহাড়ি মানুষের সরল জীবন, উৎসবের রঙ, প্রকৃতির নীরব সৌন্দর্য এবং লোকজ সংস্কৃতির স্পন্দন তাঁর কিশোর মনকে এমনভাবে আলোড়িত করেছিল যে পরবর্তী জীবনে সেগুলোই হয়ে ওঠে তাঁর সাহিত্যজগতের প্রধান অনুষঙ্গ। প্রকৃতি তাঁর কাছে কেবল দৃশ্য নয়, সে ছিল শিক্ষক, বন্ধু এবং অনুপ্রেরণার চিরন্তন উৎস।

ব্যক্তিজীবনে তিনি জীবনসঙ্গিনী বাসনা চাঙমাকে নিয়ে গড়ে তুলেছেন এক স্নেহময় পরিবার। তাঁদের দুই কন্যা বিজয়িনী (সোনা) ও বিদুসিনি (রূপা) এবং দুই পুত্র—বিমুক্তি দর্শন চাঙমা ও অলিয়ন চাঙমা।

রাঙামাটিতে শিক্ষাজীবন তাঁর চিন্তা ও ব্যক্তিত্ব গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ছাত্রাবস্থাতেই তিনি উপলব্ধি করেন, একটি জাতিকে টিকিয়ে রাখতে হলে তার ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
এই উপলব্ধিই তাঁকে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করে। তিনি পাহাড়ী ছাত্র সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি গিরিসুর শিল্পী গোষ্ঠীর সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তরুণ শিল্পীদের সংগঠিত করেন।
তাঁর লেখা প্রকাশিত ‘শিঙা’ গানের সংকলন পাহাড়ি সাংস্কৃতিক জাগরণের এক স্মরণীয় মাইলফলক। যেন দীর্ঘ নীরবতার পর আত্মপরিচয়ের ”শিঙা” প্রথমবারের মতো প্রতিধ্বনিত হয়েছিল পাহাড়ের উপত্যকায়।

শিক্ষাজীবন শেষে তিনি লেমুছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পাঁচ বছর শিক্ষকতা করার পর সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগে যোগ দেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের জেলা সুপারিনটেনডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

কিন্তু সরকারি চাকরির ব্যস্ততা কখনোই তাঁর সাহিত্যচর্চাকে স্তব্ধ করতে পারেনি। দিনের দাপ্তরিক কর্মব্যস্ততার পর রাতের নির্জনতাই হয়ে উঠত তাঁর সৃষ্টির সময়। পাহাড় যেন নীরবে তাঁর সঙ্গে কথা বলত, আর তিনি সেই কথোপকথনকে কবিতা, গান ও গদ্যের ভাষায় অমর করে রাখতেন।
বিনয় শংকর চাঙমার সাহিত্যজীবন যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি বেদনাবিধুর। বিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই তিনি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ ও গান লিখতে শুরু করেন। কিন্তু তাঁর সাহিত্যসাধনার পথ বারবার আগুনে দগ্ধ হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের অস্থির সময়ে মিজো ও পাঠানদের হামলায় তাঁর বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি আগুনে পুড়ে যায়। দীর্ঘ সাধনার ফসল মুহূর্তেই ছাই হয়ে যায়।
এরপর ২০০৩ সালের ২৯ আগস্ট মহালছড়িতে সেটেলার বাঙ্গালির সংঘটিত সহিংসতায় তাঁর বাড়িঘর অগ্নিসংযোগে ধ্বংস হয়ে যায়। সেই আগুনে তাঁর অবশিষ্ট সাহিত্যকর্মও ভস্মীভূত হয়।
চাকমা সমাজে একটি প্রবাদ আছে, “চুরে নিলে তিন কুন, আগুনে নিলে চের কুন।” অর্থাৎ, চোর কিছু নিয়ে গেলেও কিছু অবশিষ্ট থাকে; কিন্তু আগুন গ্রাস করলে আর কিছুই ফিরে পাওয়া যায় না।

এই প্রবাদ যেন তাঁর জীবনেরই নির্মম প্রতিচ্ছবি। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো, আগুন তাঁর কাগজ পুড়িয়েছে, তাঁর স্বপ্ন নয়। প্রতিবার ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকেই তিনি আবার নতুন করে কলম হাতে তুলে নিয়েছেন।
বিনয় শংকর চাঙমা একজন শক্তিমান গীতিকারও। তাঁর রচিত “লোগাং ছড়া কুলে কুলে” গানটি সাবেক প্রতিমন্ত্রী মণি স্বপন দেওয়ান-এর সুরে পরিবেশিত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা অতিক্রম করে দেশ-বিদেশের চাকমা সমাজে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এটি কেবল একটি গান নয়; এটি পাহাড়ের মানুষ, লোগাং, নদী, ভালোবাসা এবং স্বদেশচেতনার এক জীবন্ত দলিল। আজও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, বিঝু উৎসব কিংবা প্রবাসী চাকমা সমাজের মিলনমেলায় এই গান একই আবেগে উচ্চারিত হয়।
যে গান মানুষের স্মৃতিতে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বেঁচে থাকে, সেটিই প্রকৃত অর্থে লোকঐতিহ্যের অংশ হয়ে ওঠে। “লোগাং ছড়া কুলে কুলে” সেই মর্যাদাই অর্জন করেছে।

বিনয় শংকর চাঙমার সাহিত্যভুবন বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক। তিনি চাকমা ভাষা ও বাংলায় সমান দক্ষতায় কবিতা, গান, প্রবন্ধ, গল্প, ভ্রমণকাহিনি এবং আত্মজীবনী রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ, ১। রাঙাবেল (চাকমা কবিতা ও বাংলা অনুবাদসহ, ২০১৯), ২। চিত্তমণি ও ধিত্তমণি: সাত প্রজন্মের বংশতালিকা (২০২১), ৩। এযের ফাগুন মাচ (চাকমা কবিতা, ২০২৩), ৪। আমি আদিবাসী (চাকমা কবিতা, ২০২৩), ৫। সবুজ পাহাড়ের কান্না (বাংলা কবিতা, ২০২৩)
এছাড়াও তাঁর ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ রচনা এখনও অপ্রকাশিত। এর মধ্যে রয়েছে, ১। মার ভাচ, ২। ফাগুত্তুম, ৩। মিয়ানমার ভ্রমণ কাহিনী, ৪। ভারতের তীর্থ ও ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ কাহিনী, ৫। অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ কাহিনী, ৬। আমার অসমাপ্ত আত্মজীবনী, ৭। চিগোন ছড়া, ৮। আতঙ্কিত জনপদে বিঝু প্রভৃতি।

বিনয় শংকর চাঙমার কবিতায় পাহাড় কেবল ভৌগোলিক বাস্তবতা নয়; এটি মানুষের স্মৃতি, আত্মপরিচয় এবং অস্তিত্বের প্রতীক। তাঁর ভাষা সহজ, স্বচ্ছ ও হৃদয়স্পর্শী; কিন্তু তার অন্তর্গত অনুভব গভীর। লোকজ উপমা, চাকমা সংস্কৃতির চিত্রকল্প, প্রকৃতির প্রতীকী ব্যবহার এবং মানবিক সংবেদনশীলতা তাঁর কবিতাকে স্বতন্ত্র উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

তাঁর রচনায় প্রকৃতি কখনো মায়ের মতো আশ্রয়দাত্রী, কখনো প্রতিবাদের সহযাত্রী, আবার কখনো ইতিহাসের নির্বাক সাক্ষী। এই বৈশিষ্ট্যই তাঁকে সমসাময়িক পাহাড়ি সাহিত্যধারায় অনন্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিনয় শংকর চাঙমার জীবন ও সাহিত্য পরস্পরের অবিচ্ছেদ্য প্রতিফলন। ব্যক্তিগত ক্ষতি, রাজনৈতিক অস্থিরতা, অগ্নিকাণ্ডে বারবার পাণ্ডুলিপি হারানো, কোনো প্রতিকূলতাই তাঁর সাহিত্যসাধনাকে স্তব্ধ করতে পারেনি।
তিনি শুধু কবিতা রচনা করেননি; তিনি একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনবোধকে সাহিত্যের মাধ্যমে সংরক্ষণ করেছেন। তাঁর সৃষ্টি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিখিয়ে দেয়, একটি জাতির সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক স্মৃতি।

আজ তিনি খাগড়াছড়ির খবং পজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করলেও তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমানা অতিক্রম করে বাংলা সাহিত্যের বৃহত্তর পরিসরেও গভীর মূল্যায়নের দাবি রাখে।
সময় মানুষের দেহকে ক্ষয় করে, কিন্তু সত্যিকারের সাহিত্যিক সময়কে অতিক্রম করেন তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। বিনয় শংকর চাঙমার জীবন সেই সত্যেরই এক উজ্জ্বল প্রমাণ।

আগুন তাঁর পাণ্ডুলিপিকে ছাই করেছে, কিন্তু তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারেনি; ধ্বংস করেছে কাগজ, কিন্তু নিভিয়ে দিতে পারেনি তাঁর স্বপ্নের প্রদীপ। তাই তিনি কেবল একজন কবি নন, তিনি পাহাড়ের স্মৃতিবাহক, ভাষার প্রহরী এবং সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক অনমনীয় রক্ষক।
যতদিন পাহাড় থাকবে, ছড়ার জল বহমান থাকবে, মানুষের মুখে মুখে লোকগান ভেসে উঠবে, ততদিন বিনয় শংকর চাঙমার নামও উচ্চারিত হবে পাহাড়ি বাতাসের সঙ্গে। তাঁর সাহিত্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেবে—ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিই একটি জাতির সবচেয়ে স্থায়ী আশ্রয়, আর সেই আশ্রয় নির্মাণে কবির কলম কখনো পরাজিত হয় না।

তথ্যসূত্র
১. কবি বিনয় শংকর চাঙমার ব্যক্তিগত জীবনবৃত্তান্ত ও মৌখিক সাক্ষাৎকার।
২. কবির প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ।

পার্বত্য চট্টগ্রাম: শান্তির প্রতিশ্রুতি, রক্তের পুনরাবৃত্তি - ইনজেব চাঙমা

 

ইনজেব চাঙমা

রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

সুরের অমলিন প্রদীপ: শিল্পী তৃপ্তি তালুকদার - ইনজেব চাঙমা

শিল্পী তৃপ্তি তালুকদার

সুরের অমলিন প্রদীপ: শিল্পী তৃপ্তি তালুকদার

মানুষের জীবন কখনো কখনো একটি গানের মতো—কখনো উচ্ছ্বাসে ভরা, কখনো বেদনার সুরে বিষণ্ন। কিন্তু সত্যিকারের শিল্পীর জীবন কোনো একক জীবনের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না; তাঁর কণ্ঠ, তাঁর শিল্প আর তাঁর সৃষ্ট স্মৃতি সময়ের স্রোত পেরিয়ে প্রজন্মের পর প্রজন্মকে স্পর্শ করে। শরীর একদিন নিঃশেষ হয়, অথচ শিল্পের অনুরণন থেকে যায় মানুষের হৃদয়ে, ইতিহাসের পাতায়, একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগীত-ঐতিহ্যে তৃপ্তি তালুকদার ছিলেন তেমনই এক উজ্জ্বল নাম—যাঁর জীবন ছিল সংগীত, সংস্কৃতি, সৌন্দর্যবোধ ও মানবিকতার এক অনন্য সমন্বয়।

তৃপ্তি তালুকদার নামে তিনি সর্বাধিক পরিচিত হলেও জন্মসূত্রে ছিলেন এক সম্ভ্রান্ত দেওয়ান পরিবারের কন্যা। তাঁর পিতা তেজেন্দ্র লাল দেওয়ান এবং মাতা জ্যোতির্ময়ী দেওয়ান। ১৯৪০ সালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন লারমা গঝা পিড়াভাঙা গুত্তিভুক্ত এক ঐতিহ্যবাহী পরিবারে। এই পরিবারে শিক্ষা, শিল্পচর্চা, সংস্কৃতিপ্রীতি ও সামাজিক দায়বদ্ধতা ছিল উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জিত মূল্যবোধ। সেই পরিবেশেই শৈশবের তৃপ্তির হৃদয়ে প্রথম জেগে ওঠে সংগীতের প্রতি অনুরাগ, নৃত্যের প্রতি আকর্ষণ এবং অভিনয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

মাত্র সাত বছর বয়সেই তিনি মঞ্চে গান গাইতে শুরু করেন। যে বয়সে অধিকাংশ শিশু খেলায় মগ্ন থাকে, সে বয়সেই তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হতে থাকে শিল্পের প্রথম আহ্বান। সেই ক্ষুদ্র পদচারণাই পরবর্তীকালে তাঁকে পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যতম স্মরণীয় কণ্ঠশিল্পীতে পরিণত করে।

১৯৪৯ সালে তিনি রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। মেধা, শৃঙ্খলা এবং সাংস্কৃতিক প্রতিভার জন্য অল্প সময়েই তিনি শিক্ষকদের স্নেহ ও সহপাঠীদের শ্রদ্ধা অর্জন করেন। অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে বিদ্যালয়ের ‘বেস্ট গার্ল’ নির্বাচিত হয়ে তৎকালীন জার্মান রাষ্ট্রদূতের হাত থেকে একটি রূপার কাসকেট পুরস্কার হিসেবে গ্রহণ করেন। এটি ছিল কেবল একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর সম্মাননা নয়; ভবিষ্যতের এক উজ্জ্বল শিল্পীসত্তার প্রতি সময়ের নীরব স্বীকৃতি।

১৯৫৯ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরও এক বছর আগে, ১৯৫৮ সালে, তিনি অমিয় প্রকাশ তালুকদারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু সংসার তাঁর শিল্পসাধনার পথকে রুদ্ধ করতে পারেনি। বরং বিবাহোত্তর জীবনেই তিনি চট্টগ্রামের সঙ্গীত ভবন থেকে শাস্ত্রীয় সংগীত ও রবীন্দ্রসংগীতে তিন বছর মেয়াদি ডিপ্লোমা অর্জন করে নিজের শিল্পীজীবনকে আরও পরিপূর্ণ করে তোলেন।

সংসারও ছিল তাঁর আরেকটি সৃজনভূমি। তিনি ছিলেন তিন পুত্রের স্নেহময়ী জননী—তুষার শুভ্র তালুকদার (বাবলী), পার্থ প্রতিম তালুকদার (মিঠুল) এবং আশীষ তালুকদার (বিটু)। মাতৃত্ব, পারিবারিক দায়িত্ব এবং শিল্পসাধনা—এই তিন ধারাকে তিনি অসাধারণ দক্ষতায় একসূত্রে বেঁধেছিলেন।

তাঁর কণ্ঠ ছিল কোমল অথচ দৃঢ়, মধুর অথচ গভীর। রবীন্দ্রসংগীতের আবেগময় সৌন্দর্য যেমন তিনি নিখুঁত ব্যঞ্জনায় প্রকাশ করতে পারতেন, তেমনি চাকমা লোকগানের সহজ-সরল প্রাণস্পন্দনও তাঁর কণ্ঠে নতুন প্রাণ লাভ করত। তাঁর কাছে সংগীত ছিল না কেবল বিনোদনের অনুষঙ্গ; ছিল আত্মপরিচয়ের ভাষা, সংস্কৃতির ধারক এবং মানুষের হৃদয়ে পৌঁছে যাওয়ার সবচেয়ে নির্মল পথ।

গানের পাশাপাশি নৃত্য ও নাট্যকলাতেও তিনি ছিলেন সমান পারদর্শী। রাঙামাটির ঐতিহাসিক রাজবাড়ীতে রাজমাতা বিনীতা রায় ও সলিল রায়ের পরিচালনায় বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত ‘মৃণালিনী’ নাটকে তাঁর অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছিল। সেই নাট্যমঞ্চে তাঁর সহশিল্পী ছিলেন তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়, কুমার সৌমিত রায়, রাজকুমারী মৈত্রী রায়, রাজকুমারী রাজশ্রী রায়, কবি অরুণ রায়, অনিল রায়, জয়তী রায়, প্রণতি দেওয়ানসহ রাজপরিবার ও সমাজের বহু বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব। তাঁদের পাশে সমান দক্ষতায় অভিনয় করে তিনি প্রমাণ করেছিলেন—প্রকৃত শিল্পীর পরিচয় বংশে নয়, প্রতিভায়; পরিচিতিতে নয়, সাধনায়।

বাংলাদেশের বেতারজগতে তাঁর অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। তিনি ছিলেন চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের নিবন্ধিত রবীন্দ্রসংগীত ও চাকমা গানের শিল্পী। ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘পাহাড়িকা’ অনুষ্ঠানের সূচনালগ্ন থেকেই তিনি ছিলেন নিয়মিত কণ্ঠশিল্পী। ১৯৭৬ থেকে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তাঁর সুরেলা কণ্ঠ বেতারের তরঙ্গে ভেসে পৌঁছেছে পাহাড়ের জনপদ থেকে সমতলের অসংখ্য শ্রোতার হৃদয়ে।

বিশেষত চাকমা ভাষার গান পরিবেশন করে তিনি এক ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক দায়িত্ব পালন করেন। গীতিকার সুগত চাকমা ননাধন ও শিল্পী রঞ্জিত দেওয়ানের রচিত বহু গান তিনি কণ্ঠে ধারণ করেন। রঞ্জিত দেওয়ানের সঙ্গে তাঁর গাওয়া একাধিক দ্বৈত সংগীতও শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। তাঁর কণ্ঠে মাতৃভাষার গান যেন পাহাড়ি ঝরনার স্বচ্ছতা, অরণ্যের বাতাসের নির্মলতা এবং মানুষের মমত্বের উষ্ণতা একসঙ্গে ধারণ করত।

তৃপ্তি তালুকদার কেবল একজন শিল্পী ছিলেন না; ছিলেন একজন আদর্শ স্ত্রী, স্নেহময়ী মা এবং সংস্কৃতিমনা ব্যক্তিত্ব। সংসারের দায়িত্ব পালনের মধ্যেও তিনি কখনো শিল্পচর্চাকে বিসর্জন দেননি। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—যে মানুষ শিল্পকে ভালোবাসে, সে জীবনকেও ভালোবাসে।

২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর উত্তর কালিন্দীপুরের নিজ বাসভবনে বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি পরলোকগমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল পঁচাশি বছর। তিনি রেখে গেছেন তিন পুত্র, তিন পুত্রবধূ এবং চারজন নাতি-নাতনি। তবে তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবল তাঁর পরিবার নয়; তাঁর রেখে যাওয়া অসংখ্য গান, তাঁর শিল্পসাধনা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি তাঁর আজীবন নিবেদন।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তবু পাহাড়ি সন্ধ্যায় যখন কোনো পুরোনো চাকমা গান ভেসে আসে, কিংবা রবীন্দ্রসংগীতের কোনো সুর হৃদয়কে নীরব করে দেয়, তখন মনে হয়—তৃপ্তি তালুকদারের কণ্ঠ এখনও বাতাসে মিশে আছে। কারণ প্রকৃত শিল্পীর মৃত্যু হয় না; তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর শিল্পে, তাঁর উত্তরসূরিদের স্মৃতিতে এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক ইতিহাসের গভীরতম অনুচ্ছেদে।

তৃপ্তি তালুকদারের জীবন তাই কেবল একজন শিল্পীর জীবনী নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সংগীত-ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল অধ্যায়। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—শিল্পের সাধনা নিছক ব্যক্তিগত অর্জন নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয় রক্ষার নীরব সংগ্রাম। সেই সংগ্রামের এক নিবেদিত, বিনয়ী ও দীপ্তিমান যোদ্ধা ছিলেন শিল্পী তৃপ্তি তালুকদার।

তথ্য: তুষার শুভ্র তালুকদার 



মাতৃভাষার প্রদীপ ও বর্ণমালার রূপকার

ইনজেব চাঙমা 
“একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল কিছু শব্দের বিলুপ্তি নয়; হারিয়ে যায় একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ উত্তরাধিকার।”

ইতিহাসের প্রতিটি সময়ে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাঁরা ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা অতিক্রম করে নিজেদের জীবনকে একটি বৃহত্তর আদর্শের কাছে সমর্পণ করেন। তাঁদের হাতে কোনো রাষ্ট্রক্ষমতা থাকে না, থাকে না বিপুল অর্থসম্পদ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব; কিন্তু তাঁদের নীরব শ্রমই একদিন একটি ভাষাকে নতুন প্রাণ দেয়, একটি বিলীয়মান বর্ণমালাকে পুনর্জাগরিত করে এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
 
পার্বত্য চট্টগ্রামের চাঙমা ভাষা, অঝাপাত বর্ণমালা এবং সমকালীন চাঙমা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে এমনই এক নিবেদিতপ্রাণ সাধকের নাম ইনজেব চাঙমা। তিনি কেবল একজন লেখক নন; তিনি ভাষাসংগ্রামী, সংগঠক
, সম্পাদক, পাঠাভ্যাস আন্দোলনের উদ্যোক্তা এবং মাতৃভাষা পুনর্জাগরণের এক নিরলস কর্মযোদ্ধা।
১৯৮১ সালে ১৯ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের চাঙমা সার্কেলের ২৯ নম্বর ছোটমেরুং মৌজার বাজেইছড়া গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইনজেব চাঙমা। পিতা তরুণী কুমার চাঙমা ও মাতা বিজয়শোভা চাঙমার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ।
 
পাহাড়, জুমক্ষেত, বনভূমি, ঝিরিপথ এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির আবহে তাঁর শৈশব গড়ে ওঠে। প্রকৃতিই ছিল তাঁর প্রথম শিক্ষক; লোকগাথা ছিল তাঁর প্রথম সাহিত্য; আর মাতৃভাষার উচ্চারণ ছিল তাঁর প্রথম আত্মপরিচয়।
১৯৯২-৯৪ সালে গৃহশিক্ষক দীপায়ন চাঙমা (বীর)’র কাছে অঝাপাত বর্ণমালা শেখার পর তাঁর জীবনে এক গভীর উপলব্ধির জন্ম হয়। তিনি বুঝতে পারেন—একটি ভাষা যতদিন মুখে বেঁচে থাকে, ততদিন তার অস্তিত্ব টিকে থাকে; কিন্তু তার নিজস্ব বর্ণমালা হারিয়ে গেলে সেই ভাষার ইতিহাস, সাহিত্য ও সভ্যতাও ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। সেই দিন থেকেই মাতৃভাষা ও অঝাপাত সংরক্ষণ তাঁর জীবনের ব্রত হয়ে ওঠে।
ইনজেব চাঙমার ব্যক্তিজীবন সুখ ও বেদনার এক গভীর সংমিশ্রণ। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ২৯ নম্বর ছোটমেরুং মৌজার হেডম্যান সুশীল জীবন চাঙমার কন্যা। এই দাম্পত্যজীবনে জন্ম নেয় কন্যা কালজয়ী চাঙমা, যিনি বর্তমানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে অধ্যয়নরত, এবং পুত্র আর্যঋদ্ধি মানব জ্যোতি চাঙমা, ৯ম শ্রেণি।
 
কিন্তু জীবনের নির্মম বাস্তবতা তাঁকে অকালেই স্ত্রীর মৃত্যুশোকের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সেই ব্যক্তিগত বিপর্যয় তাঁকে ভেঙে দেয়নি; বরং আরও গভীরভাবে ভাষা ও সংস্কৃতির কাজে নিমগ্ন করেছে।
 
পরবর্তীকালে তিনি পানছড়ি উপজেলার ধুদুকছড়া গ্রামের প্রদ্যুত চাঙমা মেয়ে মাদ্রি দেবী চাঙমাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় কন্যা জধা চাঙমা। সংসারের দায়িত্ব, কৃষিকাজ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক সংগ্রামের মধ্য দিয়েও তিনি মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।
 
২০০৪ সালে ইনজেব চাঙমা উপলব্ধি করেন—ভাষাকে কেবল ভালোবাসা যথেষ্ট নয়; তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন শিক্ষা, পাঠক, লেখক, গ্রন্থ, পাঠাগার এবং সংগঠিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
 
এই উপলব্ধি থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ এবং সাঙু পাঠাগার। পরবর্তীকালে সংগঠনটি নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করে চাঙমা সাহিত্য একাডেমি নামে।
 
তাঁর উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং ভারতের ত্রিপুরা পর্যন্ত বিস্তৃত হয় অঝাপাত ও চাঙমা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে, এক ঝাঁক ভাষাপ্রেমিদের স্বেচ্ছাশ্রমে প্রায় ষোল হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী মাতৃভাষা ও অঝাপাত বর্ণমালার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছে—যা চাঙমা ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
 
ইনজেব চাঙমার সাহিত্যকর্ম বিস্তৃত হয়েছে ভাষা শিক্ষা, শিশুসাহিত্য, কবিতা, নাটক, অনুবাদ, গান এবং সম্পাদনার নানা ক্ষেত্রে।
 
ভাষা শিক্ষা: পত্থম আদিপুদি (২০১৫), ম বই (২০১৭), সাঙু (২০১৮) ও অঝাপাত (২০২১)।
শিশুসাহিত্য: কব্দ কোই, তারুম আ জানজুনি ও লোবিয়ত (সবগুলো ২০১৮)
কাব্যগ্রন্থ: উত্তিপুত্তি (২০২৩) ও ধনপুদি (২০২৩)। 
 
নাট্যরচনা: প্রকাশিত তাঁর নাটিকা “জুয়া মানে জিংকানি নাচ” এবং “মা ভাচ ” মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে নাট্যরূপে উপস্থাপনের উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা।
 
নিজস্ব সাহিত্য রচনার পাশাপাশি ইনজেব চাঙমা বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন শিশুতোষ গল্প চাঙমা ভাষায় অনুবাদ(যৌথ) করেছেন। রাজা আ কংজরি, বাক আ সিংহ, মেলাত হারা-হারি, শিয়াল্যা আ ত বোবুয়া, রাঙা বল, আহ্'ওচ, মাচ তোগেয়্যাসহ বহু অনুবাদগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি চাঙমা শিশুদের সামনে বিশ্বসাহিত্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
 
একজন লেখকের পাশাপাশি তিনি একজন সম্পাদকও। নবীন সাহিত্যিকদের জন্য তিনি সম্পাদনা করেছেন চাদি, হিলর পচ্জন (চাঙমা সাংবাদ পত্র), জুম, হিল চাদিগাঙ, মেদেনি এবং চাঙমা কবিতা সংকলন ‘পুগবেল’।
 
এই পত্রিকাগুলো কেবল সাহিত্য প্রকাশের মাধ্যম নয়; এগুলো চাঙমা ভাষার নতুন লেখক সৃষ্টির উর্বর ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
 
ইনজেব চাঙমার বিশ্বাস—একটি ভাষা বইয়ের মধ্য দিয়েই দীর্ঘজীবী হয়। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি খাগড়াছড়ি জেলায় ‘শিঙোর’ নামে বারোটি দেয়ালিকা প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি শুরু করেন বইপাঠ আন্দোলন, পাঠচক্র, গ্রামীণ পাঠাগার গঠন, সাহিত্যসভা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠাভ্যাস কর্মসূচি।
তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস—
“যে সমাজ বই পড়ে না, সে সমাজ কোনো ভাষাকেই দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারে না।”
এই দর্শনই তাঁর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কৃষিকাজ, সংসার এবং ভাষা আন্দোলনের ভার একসঙ্গে বহন করেছেন ইনজেব চাঙমা। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তাঁর সাহিত্যসাধনাকে থামাতে পারেনি, কিন্তু বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি এখনো প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
 
অপ্রকাশিত রচনার মধ্যে রয়েছে—
• একটি চাঙমা ছোটগল্পগ্রন্থ • একটি চাঙমা কাব্যগ্রন্থ • একটি চাঙমা প্রবন্ধগ্রন্থ • বাংলা ভাষায় তিনটি প্রবন্ধগ্রন্থ।
এই পাণ্ডুলিপিগুলোর প্রকাশ কেবল একজন লেখকের স্বপ্নপূরণ নয়; বরং চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যভাণ্ডারের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হবে।
 
ইনজেব চাঙমার জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—একজন মানুষের নিষ্ঠা কখনও কখনও একটি জাতির সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। সীমিত সম্পদ, ব্যক্তিগত শোক, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি যে দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন, তা নিছক ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি একটি ভাষার পুনর্জাগরণের ইতিহাস।
 
তিনি প্রমাণ করেছেন, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, চিন্তা, বিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের ধারক। তাই তাঁর কর্মজীবন মূলত এক অবিরাম সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ইতিহাস—বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির, নীরবতার বিরুদ্ধে উচ্চারণের, এবং বিলুপ্তির বিরুদ্ধে অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রাম।
সময়ের বিচারে ইনজেব চাঙমার কর্মের পূর্ণ মূল্যায়ন হয়তো এখনও সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় চাঙমা ভাষা ও অঝাপাত বর্ণমালার পুনর্জাগরণের যে অধ্যায় রচিত হবে, সেখানে তাঁর নাম একনিষ্ঠ ভাষাসাধক, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং মাতৃভাষার প্রদীপরক্ষক হিসেবে অনিবার্যভাবেই উচ্চারিত হবে।
 
তথ্য ও প্রচার বিভাগ
চাঙমা সাহিত্য একাডেমি
দিঘীনালা, চাঙমা সার্কেল।

শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

ম্যাকলিন চাকমা : পাহাড়ের ভাষা, মানুষের কবি -ইনজেব চাঙমা

কিছু কবি শব্দ লেখেন, কিছু কবি সময়কে লিপিবদ্ধ করেন; আর কিছু কবি আছেন, যাঁরা একটি ভূখণ্ডের আত্মাকে ভাষা দেন। তরুণ চাঙমা কবি ম্যাকলিন চাকমা সেই বিরল কণ্ঠগুলোর একজন। তাঁর কবিতায় পাহাড় কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; পাহাড় সেখানে কথা বলে, নদী স্মৃতি বহন করে, জুমের ধোঁয়া ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে আকাশে মিশে যায়। তাঁর কাব্যে ফুল ফোটে কেবল বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে নয়, বরং মানুষের স্বপ্ন, বেদনা ও অস্তিত্বের অনিবার্য প্রতীক হয়ে। তাই তাঁর কবিতা পড়া মানে শুধু সাহিত্য পাঠ নয়; যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির অন্তর্লোকের সঙ্গে এক নিবিড় আলাপ।

১৯৯৩ সালের ১০ অক্টোবর রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার সুভলং ইউনিয়নের হাজাছড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা অলঙ্গ কুমার চাকমা এবং মাতা অলকা দেবী চাকমার স্নেহধন্য সন্তান তিনি। ছোট বোন পপি চাকমাকে নিয়ে তাঁদের পরিবার। শৈশব কেটেছে পাহাড়ের বুক চিরে, জুমের পথ ধরে, বিরেচমরা পাহাড় থেকে ছোটহরিণার খুকিছড়া পর্যন্ত এক জুম থেকে আরেক জুমে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে। প্রকৃতির সেই অন্তরঙ্গ সংসর্গ তাঁর রক্তে মিশিয়ে দিয়েছে পাহাড়ের রং, ঝরনার সুর আর বনভূমির নৈঃশব্দ্য। পরবর্তীকালে সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর কবিতার প্রাণরস হয়ে উঠেছে।

তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা নিজ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে বরুনাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষে মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ২০১২ সালে এসএসসি সম্পন্ন করে ঢাকার মার্টিন লুথার কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বি.এড. অধ্যয়ন শুরু করলেও সাহিত্য ও জ্ঞানসাধনার গভীর আকর্ষণ তাঁকে নিয়ে যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে, যেখানে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

ম্যাকলিন চাকমা মূলত কবি; তবে তাঁর সাহিত্যসাধনা কেবল কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়। ছোটগল্প, নাটক, গান, প্রবন্ধ—প্রতিটি শাখায় তিনি সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করেন। তাঁর প্রকাশিত তিনটি চাকমা কাব্যগ্রন্থ—‘দেবংসি’ (২০১৮), ‘আচ্’ (২০১৯) এবং ‘নুও গরি ফাগুন এঝের’ (২০২০)—চাকমা ভাষার আধুনিক কাব্যধারায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। পাশাপাশি চাকমা, বাংলা ও ইংরেজি—তিন ভাষায় একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

তাঁর কবিতায় পাহাড়ের প্রকৃতি যেমন জীবন্ত হয়ে ওঠে, তেমনি উচ্চারিত হয় আদিবাসী মানুষের জীবনসংগ্রাম, মাতৃভাষার মমত্ব, ইতিহাসের ক্ষত, প্রেমের নির্মলতা এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। তাঁর শব্দচয়ন সংযত, অথচ গভীর; ভাষা সহজ, কিন্তু ভাবের বিস্তার সুদূরপ্রসারী। এই কারণেই তাঁর কবিতা শুধু চাঙমা পাঠকের নয়, বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যাঙ্গনেরও মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

দেশের বিভিন্ন সাহিত্যপত্র, লিটল ম্যাগাজিন এবং জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ-এ তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। দেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতের সাহিত্যপত্রেও তাঁর কবিতা ও ছোটগল্প স্থান পেয়েছে। সাহিত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সাহিত্যপত্র ‘রঁদেভু’-এর ১৭তম সংখ্যা এবং মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার স্মরণে প্রকাশিত ‘কেওক্রডং’-এর ২০২২ সংখ্যা তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘নুও গরি ফাগুন এঝের’ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার বাংলা বিভাগের একটি কোর্সে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া তাঁর সাহিত্যকীর্তির এক অনন্য স্বীকৃতি।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ইউনেস্কো ঢাকার একটি প্রকল্পে কাজ করেন। ইউনেস্কো প্রকাশিত Of Roots of Heritage: Tales from the Hills গ্রন্থে তাঁর একটি যৌথ গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একই গ্রন্থের পাঁচটি গল্প বাংলা থেকে চাকমা ভাষায় অনুবাদ এবং চাকমা ফন্টে লিপ্যন্তরের দায়িত্বও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেন। ২০২৩ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কবিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত আন্তর্জাতিক অনলাইন কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ লাভ করেন। কানাডা, চীন, গ্রিস, ইরান, ফিলিপাইন, সার্বিয়া ও বাংলাদেশের কবিদের সঙ্গে একই মঞ্চে কবিতা পাঠ তাঁর সাহিত্যযাত্রাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে দেয়।

চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৮ সালে বরুনাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, ২০২৫ সালে কাট্টলী বরুনাছড়ি ও ধামাইছড়া মৌজাস্থ চাকুরিজীবী কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেড এবং ২০২৬ সালে বাংলাদেশ আদিবাসী কবি, লেখক ও সাহিত্যিক ঐক্য পরিষদ আয়োজিত আদিবাসী সাহিত্য উৎসবে সম্মাননায় ভূষিত হন।

 
বর্তমানে তিনি মোনঘরে সহকারী প্রকাশনা ও যোগাযোগ কর্মকর্তা ও মোনঘর রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ (চাঙমা ভাষা) শিক্ষকতা করছেন। পাশাপাশি চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রাইটার্স ইউনিয়ন-এর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-গবেষণা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ম্যাকলিন চাকমার সাহিত্যজীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আশ্রয়। তাঁর কবিতা পাহাড়ের বাতাসে জন্ম নেয়, ঝরনার জলে ধুয়ে যায়, মানুষের হৃদয়ে আশ্রয় খুঁজে নেয়। তিনি এমন এক কবি, যিনি শব্দ দিয়ে কেবল কবিতা নির্মাণ করেন না; নির্মাণ করেন একটি জাতির স্মৃতি, একটি ভূখণ্ডের চেতনা এবং ভবিষ্যতের প্রতি অবিচল বিশ্বাস। সময়ের প্রবাহে তাঁর সাহিত্যকর্ম নিঃসন্দেহে চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে বেঁচে থাকবে।

শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তাঁদের নিরলস কর্মে নির্মাণ করেছেন এক অনন্য অধ্যায়। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা, ইতিহাস ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। চাঙমা ভাষা, সাহিত্য সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার এই দীর্ঘ সংগ্রামে যাঁরা নীরবে আজীবন কাজ করে চলেছেন, তাঁদের অন্যতম জ্ঞান কীর্তি চাকমা তিনি একাধারে কবি, নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠকসব পরিচয়ের সমন্বয়ে এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক।

জ্ঞান কীর্তি চাকমার জন্ম (সার্টিফিকেট অনুসারে) ২০ জানুয়ারি ১৯৮৪ সালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উপজেলার উদাল বাগান গ্রামে। তাঁর পিতা সুপেন্দ্র চাকমা এবং মাতা তৃপ্তি বালা চাকমা। তাঁর সহধর্মিণী মধুমিতা মারমা। তাঁদের দুই কন্যারাশিয়া চাকমা (দীঘিনালা সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী) এবং এশিয়া চাকমা (উদাল বাগান উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী)

পাহাড়, বনাঞ্চল, প্রকৃতি এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিবেশে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়। এই পরিবেশই পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পীসত্তা, সাহিত্যচেতনা এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।

প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় উদাল বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে তিনি রাঙামাটির মোনঘর শিশু সদনে ভর্তি হন। মোনঘরেই তাঁর সাহিত্য, নাটক শিল্পচর্চার প্রকৃত ভিত্তি নির্মিত হয়।

২২ জানুয়ারি ১৯৮৯ সালে ভারতে শরণার্থী অবস্থায় তিনি তাঁর পিতার মৃত্যুসংবাদ পান। শৈশবের এই নির্মম ট্র্যাজেডি তাঁর জীবনে গভীর বেদনার ছাপ ফেললেও তিনি সেই বেদনাকেই সৃষ্টিশীল শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা, গল্প নাটক রচনা শুরু করেন এবং সহপাঠীদের নিয়ে নিজেই নাটক মঞ্চস্থ করতেন।

তাঁর সৃজনশীল প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে শিক্ষক মৃত্তিকা, ঝিমিত ঝিমিত, শান্তি দীপ্তাসহ অনেকে তাঁকে নাট্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। তাঁদের প্রেরণায় তিনি অভিনয় নাট্যরচনায় আরও মনোনিবেশ করেন।

এই সময়ে তিনি রচনা করেন

  • কবানত বাজ পজ্জে
  • দজ বারা এগার
  • চোগে পহর
  • ভাঙি পারে বুবর স্ববণ

এসব নাটকে সমাজবাস্তবতা, মানবিক সংকট, আত্মমর্যাদা, বৈষম্য এবং মানুষের সংগ্রামের চিত্র শক্তিশালীভাবে ফুটে ওঠে।

এসএসসি পাসের পর তিনি রাঙামাটি সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৯৮ সালে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন জুম্ম সাহিত্য সাংস্কৃতিক সংসদ একই সময়ে তিনি সম্পাদনা করেন রা-খা-বা বুক জ্বলি যার নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন।

সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্যচর্চা, নাট্যচর্চা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি। দীর্ঘ আট বছর সংগঠনটি সক্রিয় থাকলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সংগঠন বিলুপ্ত হলেও তাঁর সাংস্কৃতিক সংগ্রাম থেমে থাকেনি। তিনি কলম, মঞ্চ এবং ক্যামেরাকে হাতিয়ার করে ভাষা সংস্কৃতির জন্য কাজ করে যেতে থাকেন।

২০০২ সাল থেকে জ্ঞান কীর্তি চাকমা ধারাবাহিকভাবে টেলিফিল্ম নির্মাণ শুরু করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক নির্মাণগুলোর মধ্যে রয়েছে

  • মানিক্যা বৈদ্যর দারু তালিক
  • ভাঙি পারে বুবর স্ববন
  • তুজিম পুরো কোচপানা
  • আহভিলেজ
  • তামাকবিরোধী চলচ্চিত্র সাত গাঙ সাজুরি বাক্কে এযের আহ্ গরি
  • এ্যলা ফেলা

এসব চলচ্চিত্রে জুম্ম জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম, সামাজিক সংকট, জনসচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে।

২৫ জানুয়ারি ২০১১ সালে উদাল বাগানে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জুম্ম ফিল্ম এসোসিয়েশন (জুফা)

জুফা শুধু একটি চলচ্চিত্র সংগঠন নয়; এটি জুম্ম ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জাতিসত্তাকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সংরক্ষণ বিকাশের এক সাহসী সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।

সংগঠনটির প্রধান লক্ষ্য

  • চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজের নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা;
  • কুসংস্কার, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি;
  • শিক্ষা, মানবিকতা, সম্প্রীতি সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রসার;
  • জুম্ম ভাষা, সংস্কৃতি ঐতিহ্যের ধারাবাহিক সংরক্ষণ।

নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি ২০১৩ সালে ঢাকার প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইন- ছয় মাসব্যাপী অভিনয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

পরবর্তীতে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র টেলিভিশন অভিনয় প্রশিক্ষণ কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করে সপ্তম স্থান অর্জন করেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁর অভিনয় চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন মাত্রা যোগ করে।

২০২০ সালে নির্মিত আন্দারত ধান হুজানা তাঁর শর্টফিল্ম নির্মাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে নির্মাণ করেন

রাধমন ধনপুদির ফুল পারা, নিজো টেঙত হুরোল মারানা, মরে তাগিজ, ডিএসএলআর ক্যামেরা, থার্টি ফাস্ট নাইট, বেজাদর হাজ্জেক, হেগা তাগলর কুপ, ছন্দবাজ, ভাইরাস, অধ গরাত, আহদ আগুন পেবে, ফাদা বাজত বিজে বাঝানা, গিরিত্তি ঘর বৌ, সজ্জানা, ঝড়া পাদার জিংকানি, বেলাব, দজা, ভাঙা গিরিত্তির যদন, ইলেকশন, ঝড় নেই দেবা কালা, চিগোন পিরে, পরা কবালর জিংকানি, হোদার আগুন লুরো, ঘর উন্দুরে বের কামারায়, কোচপানার চোগো পানি, লুরো শুগোর ছালত উদোনা, সত্য মিথ্যা চের আঙুল ফারক, টেঙা ফেরত চাং, ধুন্দুক, আদে ধন, ব্রেকআপ, ব্রেকআপ এবং ফক্কর।

এসব চলচ্চিত্রে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক অবক্ষয়, প্রেম, প্রযুক্তির প্রভাব, নির্বাচন, নৈতিক মূল্যবোধ এবং জুম্ম সমাজের জীবনবাস্তবতা শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য-নথি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

জ্ঞান কীর্তি চাকমা বিশ্বাস করেন, মানুষকে সচেতন করার অন্যতম সহজ মাধ্যম হলো হাস্যরস।

এই বিশ্বাস থেকেই তিনি নির্মাণ করেছেন

ওয়ান আনা টু ব্যানেনা, ভাইরাস, ব্যস্ত আগং, সরি, কগেয়্যা চুর, উত্তর সারাংশ দেখ, ভূত চালান, কুরো চুর, বৈদ্য, ইহি, উগুদো জিরেন, শালিজ, বিলেই, পাচ আহদ, চুর, শামুখ, কুন্দি যেম, তিবিরে, ইন্টারভিউ, ফুটবল, জোধা, দারু এবং সরি সাবজেক্টসহ অসংখ্য জনপ্রিয় ফানি ভিডিও।

এসব ভিডিও কেবল বিনোদনের জন্য নির্মিত নয়; বরং ব্যঙ্গ, রসিকতা বাস্তব জীবনের ঘটনাকে উপজীব্য করে সামাজিক অসংগতি তুলে ধরে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেয়।

জ্ঞান কীর্তি চাকমার জীবন প্রমাণ করেসীমিত সম্পদ কখনো মহান স্বপ্নের পথে অন্তরায় হতে পারে না। তিনি চলচ্চিত্রকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং সামাজিক পরিবর্তন, ভাষা সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং জাতিসত্তার ইতিহাস ধারণের এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন।

তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সংগ্রামী ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল। আজ তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নন; তিনি জুম্ম চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা জুম্ম ফিল্ম এসোসিয়েশন (জুফা) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে।

জ্ঞান কীর্তি চাকমার সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা এবং নিরলস সাধনা পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ভাষা, সাহিত্য, নাটক চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণ করে চলেছেন, তা শুধু জুম্ম সমাজের নয়; বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও এক অমূল্য সম্পদ।

 

সবার আগে আমি একজন মানুষ - ইনজেব চাঙমা

মানুষের পরিচয় কি কেবল তার ধর্মে? সে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ না খ্রিস্টান—এই প্রশ্নের উত্তরেই কি তার সমস্ত অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ? নাকি মানুষের পরিচ...