ভূমিকা
চাকমা জনগোষ্ঠীর ভাষা ও বর্ণমালা দক্ষিণ এশিয়ার আদিবাসী ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভাষার লিখিত রূপ কোনো জাতির সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, ধর্মীয় চর্চা ও জ্ঞানসংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। চাকমা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে—এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য হলেও, বর্ণসংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ বিদ্যমান। এই প্রবন্ধে চাকমা বর্ণমালার সংখ্যা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বিতর্ক, ধর্মীয় ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট এবং আধুনিক কালে এর মান্যতা ও প্রযুক্তিগত বিকাশ আলোচনা করা হয়েছে।
চাকমা বর্ণমালার সংখ্যা: গবেষণাগত মতভেদ
চাকমা
বর্ণমালার সংখ্যা নির্ধারণে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন
গবেষণা পাওয়া যায়। ভাষাবিদ George Abraham Grierson তার বহুল আলোচিত
গবেষণাগ্রন্থ Linguistic
Survey of India-এ চাকমা ভাষার ৩৩টি বর্ণমালার উল্লেখ করেন।¹
পরবর্তীকালে সতীশ চন্দ্র ঘোষ
চাকমা জাতি গ্রন্থে ৩৭টি বর্ণমালার কথা উল্লেখ
করেন।²
আবার নোয়ারাম চাকমা তার পাঠ্যবই চাকমার
বর্ণমালার পত্তম শিক্ষা-তে ৩৯টি বর্ণমালার উল্লেখ করেন।³
এই ভিন্নমতগুলো মূলত উচ্চারণভেদ, যুক্তধ্বনি
ও আঞ্চলিক ব্যবহারের পার্থক্য থেকে উদ্ভূত বলে
অনুমান করা যায়।
আধুনিক মান্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত
বর্ণসংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নিরসনের লক্ষ্যে ২০০৭ সালে আয়োজিত একটি কর্মশালায় ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ ও চাকমা সমাজের প্রতিনিধিদের আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, চাকমা ভাষার জন্য ৩৩টি বর্ণমালাই প্রমিত ও ব্যবহারযোগ্য।⁴ বর্তমানে শিক্ষা, সাহিত্য ও লিখিত যোগাযোগে এই বর্ণমালাই ব্যবহৃত হচ্ছে।
ধর্মীয় ঐতিহ্য ও প্রাচীন সাহিত্য
চাকমারা
একসময় তান্ত্রিক বৌদ্ধমতে বিশ্বাসী ছিলেন। এই ধর্মীয় ধারার
অনুসারী লুরি বা পুরোহিতরা
চাকমা বর্ণমালায় ধর্মগ্রন্থ “আঘরতারা” রচনা করেন, যা
চাকমা জনগোষ্ঠীর প্রাচীনতম পুঁথি হিসেবে বিবেচিত।⁵
আঠারো শতকে (প্রায় ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) চাকমা
সাধক কবি শিবচরণ চাকমা
বর্ণমালায় “গোজেনলামা” গীতি-কবিতা রচনা
করেন।⁶ এসব সাহিত্যকর্ম থেকে
প্রতীয়মান হয় যে চাকমা
বর্ণমালার ব্যবহার বহু শতাব্দী পূর্ব
থেকেই প্রচলিত।
প্রযুক্তিগত বিকাশ ও ডিজিটাল চর্চা
আধুনিক যুগে চাকমা বর্ণমালার প্রসারে প্রযুক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০০১ সালে মোস্তফা জব্বার চাকমা বর্ণমালার প্রথম সফটওয়্যার তৈরি করেন, যা চাকমা ভাষাকে ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে।⁷ এর ফলে ভাষাটি শিক্ষা ও প্রকাশনায় নতুন মাত্রা লাভ করে।
উপসংহার
চাকমা বর্ণমালা একটি প্রাচীন ও জীবন্ত ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহ্য। বর্ণসংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও ২০০৭ সালের প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বর্তমানে ৩৩টি বর্ণমালা মান্যতা পেয়েছে। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল চর্চা পর্যন্ত—চাকমা বর্ণমালার ধারাবাহিক ব্যবহার এর ঐতিহাসিক গভীরতা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করে।
রেফারেন্স / ফুটনোট তালিকা
- Grierson, G. A. (1903). Linguistic Survey of India. Calcutta: Government of India Press.
- ঘোষ, সতীশ চন্দ্র. (১৯০৯). চাকমা জাতি. কলকাতা।
- চাকমা, নোয়ারাম. (১৯৫৯). চাকমার বর্ণমালার পত্তম শিক্ষা. রাঙামাটি।
- চাকমা ভাষা বিষয়ক কর্মশালা প্রতিবেদন. (২০০৭). রাঙামাটি।
- চাকমা ধর্মীয় পুঁথি: আঘরতারা (প্রাচীন পাণ্ডুলিপি)।
- শিবচরণ চাকমা. (১৭৭৭ আনু.). গোজেনলামা (গীতি-কবিতা)।
- প্রথম আলো. (২৫ ডিসেম্বর ২০১৩). “চাকমা বর্ণমালার সফটওয়্যার ও ডিজিটাল উদ্যোগ”।













