শুক্রবার, ১৩ মার্চ, ২০২৬

খাগড়াছড়িতে সিএইচটি নারী হেডম্যান–কার্বারী নেটওয়ার্কের ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন


খাগড়াছড়িতে সিএইচটি নারী হেডম্যান–কার্বারী নেটওয়ার্ক, খাগড়াছড়ি জেলা শাখার প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে। কেক কাটা, আলোচনা সভা ও মধ্যাহ্নভোজ আয়োজনের মাধ্যমে দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়।

স্থানীয় উন্নয়ন সংস্থা আলো-এর হলরুমে আয়োজিত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংগঠনটির সভাপতি ও খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ-এর সম্মানিত সদস্য মিজ জয়া ত্রিপুরা।

অনুষ্ঠানে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক হেডম্যান একহিন চৌধুরী পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে গত এক বছরে সংগঠনটির পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরেন। তিনি নারী হেডম্যান ও কার্বারীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্থানীয় নেতৃত্ব বিকাশ, সামাজিক সচেতনতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় গৃহীত উদ্যোগগুলোর সারসংক্ষেপ উপস্থাপন করেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা সংগঠনটির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ধারাবাহিক ও কার্যকর কর্মকাণ্ডের জন্য গভীর সন্তোষ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি আগামী দিনগুলোতে নারী নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করতে এবং সংগঠনটির কার্যক্রমকে বেগবান করতে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেন বক্তারা।

অনুষ্ঠান শেষে কেক কাটা ও মধ্যাহ্নভোজের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।

পাভিসবা’র কেন্দ্রীয় বার্ষিক সম্মেলন ও মহামান্য সংঘরাজ–উপসংঘরাজ অভিষেক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত


পাভিসবা’র কেন্দ্রীয় বার্ষিক সম্মেলন এবং মহামান্য সংঘরাজ ও উপসংঘরাজ অভিষেক অনুষ্ঠান–২০২৬ খ্রি. আজ দ্বিতীয় দিনে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও যথাযোগ্য মর্যাদায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। দিনের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয় ৫ম মহামান্য সংঘরাজ ও উপসংঘরাজ ভান্তেদের সারিবদ্ধভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে সাধু ও জয়ধ্বনির মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানমঞ্চে আগমনের মাধ্যমে।

অনুষ্ঠানে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলা থেকে আগত বহু জ্যেষ্ঠ জ্ঞানী–গুণী ও প্রাজ্ঞ ভিক্ষুসংঘ উপস্থিত ছিলেন। সাবেক কেন্দ্রীয় সম্পাদক ভদন্ত শীলপাল মহাথেরো এবং বর্তমান কেন্দ্রীয় সম্পাদক ভদন্ত লোকমিত্র থের–এর সঞ্চালনায় এবং কেন্দ্রীয় সভাপতি ভদন্ত প্রজ্ঞাজ্যোতি মহাথেরো–এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।

সভা শুরুর পর সর্বস্তরের জনগণ নব অধিষ্ঠিত মহামান্য সংঘরাজ ও মাননীয় উপসংঘরাজ ভান্তেদের পুষ্পপূজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর উপস্থিত ভিক্ষুসংঘ ও দায়ক–দায়িকাবৃন্দ পাভিসবা–এর প্রয়াত চারজন মহামান্য সংঘরাজের উদ্দেশ্যে বন্দনা নিবেদন করে মঞ্চে আসন গ্রহণ করলে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।

অনুষ্ঠানে দায়ক–দায়িকাদের পঞ্চশীল প্রদান করেন সংঘরাজ ভদন্ত প্রজ্ঞানন্দ মহাথেরো এবং দানোৎসর্গ সম্পাদন করেন ভদন্ত তি রত্তন জ্যোতি থেরো। পরবর্তীতে বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও মহানগর শাখা, ব্যক্তিবিশেষ, উপজেলা প্রশাসন, কার্বারী–হেডম্যান অ্যাসোসিয়েশন, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানবৃন্দ এবং বিভিন্ন বিহার সংস্থার পক্ষ থেকে শ্রদ্ধেয় নব অধিষ্ঠিত মহামান্য সংঘরাজ ও মাননীয় উপসংঘরাজ ভান্তেদের পুষ্পস্তবক, ক্রেস্ট ও নানান শ্রদ্ধার্ঘ্য প্রদান করা হয়।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও মুরুব্বিদের বক্তব্য শেষে মাননীয় উপসংঘরাজ ভান্তে এবং মহামান্য সংঘরাজ ভান্তে উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে আশীর্বাদমূলক ও দিকনির্দেশনামূলক মূল্যবান বক্তব্য প্রদান করেন। সর্বশেষে সভাপতি ভদন্ত প্রজ্ঞাজ্যোতি মহাথেরো সংক্ষিপ্ত সমাপনী বক্তব্যের মাধ্যমে দিনের আনুষ্ঠানিকতা সমাপ্ত ঘোষণা করেন।

সার্বিকভাবে, ধর্মীয় শৃঙ্খলা, ঐক্য ও ভক্তিভাবের আবহে পাভিসবা’র কেন্দ্রীয় বার্ষিক সম্মেলন ও অভিষেক অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় দিনের কার্যক্রম সফলভাবে সম্পন্ন হয়।



ফাওনর ইমে- ইনজেব চাঙমা

লেঘিয়্যাবো সুবি
এচ্যে ফাওনর ২৪ তারিখ। চেরোকিথ্যা ইন্দে কালর রঙ ছিদি আঘে। গাঝে গাঝে নুঅ দিক কোর উদি এ্যাইলে সাজি যার। রিপ রিপ গরি শুন যার কোকিল মিধে র। তুরিং ফুল, ভেইক ফুল আ নাকশা ফুলর তুম্বাঝে চেরোকিথ্যা ভরি উত্তে। ফুলর তুম্বাঝে মাত্তোল অই ফাওনর বোইয়েরান বেক্কুনরে উচ দের, বিঝু এযের।
এ অক্তত আগাঝর মন গম নেই। মানেইয়র দুক দেঘি তারার সুঘত্যাই চিগোন চিগোন ঝর ফুদ ফেলার। সে ঝর ফুদত ভিঝি যার উদোন। ঘর ছাল টোনানিত ফুদুক ফাদক র’ শুন যার। আ ২০০৪ সাল কিনে টোন। এ ভিদিরে বেক্কানি জাঙারে ধরি কন কন জাগাত কানা অই ঘর ভিদিরে পানি পরের।
মাত্তর, সিয়েনর অন আহ্’ভিল্যাচ নেই তজিমর। তে চেই আঘে আগাঝর কিথ্যা এক নিমোন গরি। আগাচ্ছান গম নেই, উরঘুম্যা, চেরো কিথ্যা কালা মেঘে ধাগি যিয়ে। অক্তে অক্তে রিপ রিপ গরি গুজুরি উদে। তারও বুক ভাঙ্যা।
এক অক্তত তার সংসার এল তজিমপুর। তা মোক্কো নাগরো কায় এল। চিগোন অহ্’লেয়্য তারার এক্কান সংসার এল। অভাব ন এল সিধক্যেন। বেন্যা-বেল্যা কনবাবদে ইধে পাদা ফেলে পারন। এক্কো ঝি আ এক্কো পুঅ। কবার কধা তারা দ্বি ভেই-বোনে এক্কো তারিগত জনম। বানা বঝরবো জুদ। সাচ লামি এত্তে তারা লেঘা পড়াত বঝন। ঘুমত পত্তে তা মামা পচ্জন শোনায়। রোইমানিক-চোইসোনা, কুচ্চো বেং, ক’বি আ ধ’বি পজ্জন। ভাত ছারা অহ্’লে পিজোরত্তুন দাগিদ’-
: ”ওই, ভাত খেবং। ভাত্তুন জুর অই যদান।”
সে র’ এয’ তজিম কানত ভাজি এযে।
অলর গরি দাবা তানদে তানদে আদিক্যা গরি পুরনি দিনর নিঝেনি তারে মুচ্চো নেযায়। মনে অহ্’য় তারে কন্না তানিন নেযার সে পাচ বঝর আগ দিনত।
সক্যে তজিমে গোদা অক্ত আ বেক বলনি নিঝি দিয়্যা তা মা ভাঝরলায়- চাঙমা ভাচ রখ্যে কামত। আদামে আদামে ঘুরি মানুচ্ছোনরে সচেদন গরানা, নুঅ পিড়িবোরে চাঙমা লেঘা শেঘানা, ভাঝর মান রখ্যে গরানাত্যাই খলা গরানা- এ কামানিলোই দিন কাদি যেদ। অনেগে তারে পাগল কধাক।
অনেগে কধাক-
: ভাচ্ছোই কি পেত ভরে?”
আর’ কন’ জনে হাঝি হাঝি কধাক-
: এ কামানি গরি কি লাভ?
মাত্তর, তজিমে মহ্ ন’ অয়। মহ্’ অবার বাবরপুত নয়। কিত্তে তে খবর পায়- ভাচ বানা কধা কবার আহ্’ত্যার নয়, ইয়ান এক্কো জাদর হৃৎপিন্ড।
এ লাড়েয়র দাঙর এজাল এল তা মোক্কো নাগরো। ঘর-সংসার বেক দায়িত্ব তা নিজ কানাত তুলি নেযেল। ভূইয়ত, কি ঘর কামত, পর কামত, পুঅ-ঝি লেঘা পড়া খরচ বেক সামেলেদ ধয্য আ কোচপানালোই।
একদিন পূন্নিমা রেত। কাদি মাচ। পোতপোত্যা জুন পহ্’র। চেরো কিথ্যা জুরো। আগাচ ভত্তি তারা, দ্বিবে এক্কো গুমরো দগরানা আ জনি জ্বলানা বাদে কন কিচ্ছু জাক্কে নেই। দ্বিজনে আদক্কন নাগর মাদানা পর তারা ঘুমত পরিলাক। সে রেদোত নাগরো কল-
: “তুই ত কামান গর। ভাঝত্যাই কাম গরানা দোল। সংসারানা মুই চেইম।”
তজিমে সক্কে অলর গরি তা চোঘ কিথ্যা চেই আঘে। সে চোক ন’ পেরার, খুজিয়ে জুনি উরদন।
মাত্তর, সময় অনসুর মানুঝর আওচ পুরন গরি ন’ দে। আদিক্যা গরি এক্কান কু সবন দেঘি নাগরো দরেল। সে দরত্তুন দাঙর এক্কান অসুক অহ্’ল। ৫/৬ মাচ সং চিকিৎস্যা গরানিয়্য পাদলন ন’ অল। তে গেল তা পধে। ফেলে গেল নেক, ঝি, পুঅ আ স-সাগর ইত্তো কুদুম কানেনেই। তা এধক্যে গরি যানায়ান কন’ জনে মানি ন’ পরন। তজিমে বিচ্যেচ ন’ যায়। তার বিচ্যেচ, কন’ এক্কান রাক আ বিগিদি গরি পল্লে আঘে। তে ফিরি এব।

সে দিনত্তুন ধরি তজিম জিংকানিত এ ন’ দেখ্যে লাঙলাঙ্যে জাগা জুরি আঘে বুগ ভিদিরে। ঘর গিরিত্তি ভর ইক্যে তা কানাত।
ইক্যে তা ঝি তরি অনার্স পড়ে। পুঅ পহ্’র কেলাচ নাইন। তারার লেঘা পড়া খরচ বারি যেল। তজিম নেই কন ইনকাম।
থিক সে অক্ত আদিক্যা গরি ফোনর র’।
স্ত্রিনত ভাজি উদিল তা ঝি তরি নাঙান।
তজিমে ফোন ধরদে নোনেই গরি তা ঝিবো কল-
”বাবা, কেঝান আঘচ? মরে ৫০০ তেঙা লাগদন।
কধা শুনি তজিম বুক গির গিরেই উদিল। এ অক্তত তার এক তেঙাও নেই। ত্যুঅ জেবত তেঙা বেক্কো চেল। আই কার্ডত্তান বাদে আর কিচ্ছু নেই। মনে অল তারে বেক্খানি বেরে ধচ্ছে। মাত্তর ঝিবোরে কি কব-
মা, মর ইক্যে তেঙা নেই?
আক্খন অলর গরি থেই তে বানা কল-
আচ্ছা মা, পাদে দিম।
সে পরে ফোনান তল। এক্কো ব’ নিঝেচ ইরি দিল।
বারেদি এয ঝর পরের। ঘরর টোনানিত ফুদুক ফাদাক র’ শুনা যার। মনে অয় পত্তিক র’ তা বুগর ভিদিরে বাজের।
এ অক্তত তা মা কধানি আর ইধোত উদিল-
”তজিম, তুই আর ক’ দিন এধক্যেন গরি থেবে? তর জাগা-জমি আঘে, বাগান আঘে। সমাঝর কাম এক্কা কম গরিনেই নিজ কামত মন দিলে এধক্যেন অভাবত ন’ থেবে।”
তা বাবা তিগুচ্যা কয়-
”মানুঝত্যাই কাম গরানা গম, মাত্তর বেগ আঘে নিজর ঘর সংসার কধা ভাবা পরে।”
ভেই-বোনুনেয়্য এ কধা কন।
তজিমে এ কধানি শুনি মু চেমে চেমে হাঝে। কন’ খেনত চুয়োল ন’ গরে, কাররে বোঝেবার চেরেচতায়্য ন গরে।
কিত্তে তে খবর পায়- তার এ পত্থান উজু নয়।
তার চিদর গঙেত এক্কান ইমে জ্বলের।
তে মনে মনে বারবাঙানে কর-
”যেদক দিন না চাঙমা ভাচ্ছান তা মান ন’ পেব, যেদক দিন মা ভাচ্ছান সরান ন পেব সেদক দিন সং মুই এ পত্থান ন’ ছারিম।
অভাব তারে দুক দেয় মাত্তর লেদা গরি ন’ পারে।
হাজার হাজার বাধামায় তজিমে নিজর লাড়েইয়ান কন’ ব্যর্থ মনে ন গরে। কিত্তে তে জানে- তার এ লাড়েই বানা তাত্যাই নয়।
ইয়ান তার মা ভাঝত্যাই।
তার রিদিসুধোমত্যাই।
তার জাদর মা ভাঝত্যাই।
বারেদি সক্যে ইন্দে বোইয়ের জুরো জুরো আভা বার। দুরত কন এক্কো গাঝত বোই ককিল র রিপ রিপ গরি শুন যার। তুরিং ফুল, ভেইক ফুল আ নাকশা ফুলর তুম্বাজে ভরি যিয়ে চেরো পালা।
তজিমে বোইদ্যাত্তুন উদিল। দাবাবো বেরচাগাত আহ্’বুজে তল। ভিজে উদোন কিথ্যা চেল। তা জেরে আগঝ কিথ্যা এক রিনি গরি চেই রল।
মনে অল তা নাগরো কত্তুন যেন তারে চেই আঘে।
আদিক্যা গরি আর তা বুগত এক্কান তনক সবন জনম নিল।
ফাওনর এ দিনত তে আর ইমে গরিল-
মুই মহ্ ন’ ওম।
যেদক দুক এযোক, মুই মহ্ ন’ ওম।
প্রকৃতির আনন্দর সেরেয়্য মানেইয়র লাড়েই চলি যায়- অলর গরি, তনক গরি, বুগত দাঙর বিচ্যেচ্ছোই।
ফাওনর ফুল একদিন ঝুরি যেবাক।
ইন্দে সময় আহ্’জি যেব।
মাত্তর,
তজিম ইমে ন’ ঝুরিব, ন’ অভ মহ্।
কিত্তে তে খবর পায়-
এক্কান ভাচ বাজিলে তে বাজিব এক্কো জাদর হৃৎপিন্ড।

থুম

ইন্দে কাল - বসন্ত কাল।  ইমে - প্রতিজ্ঞা।

ফাগুনের প্রতিজ্ঞা- ইনজেব চাঙমা

আজ ফাগুনের ২২ তারিখ।  চারদিকে বসন্তের রঙ ছড়িয়ে আছে। গাছের ডালে ডালে নতুন পাতার মেলা, দূর থেকে ভেসে আসছে কোকিলের কুহু কুহু ডাক। তুরিং ফুল, ভেইক ফুল আর নকশা ফুলের সুগন্ধে চারদিক ভরে উঠেছে। পাগলা বসন্তের বাতাস যেন পুরো প্রকৃতিকে মাতিয়ে তুলেছে

কখনো গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। সে বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছে বাড়ির উঠান। ঘরের পুরোনো টিনের ছাউনিতে টুপটাপ শব্দ করে পানি পড়ছে। টিনগুলো কেনা হয়েছিল ২০০৪ সালে। এতদিনে জং ধরে অনেক জায়গায় ফুটো হয়ে গেছে

কিন্তু এই আনন্দময় পরিবেশের মাঝেও তজিমের মন ভারী হয়ে আছে। আকাশের মেঘলা চেহারার মতোই তার মনটাও যেন বিষণ্ণ

একসময় তার সংসার ছিল ভরপুর। তখন তার স্ত্রী নাগরো ছিল পাশে। ছোট্ট হলেও ছিল তাদের একটি সুখী সংসার। অভাব ছিল না তেমন। ছেলে-মেয়েরা নিশ্চিন্তে পড়াশোনা করত। সন্ধ্যায় সবাই একসাথে বসে গল্প করত। নাগরো রান্নাঘর থেকে ডাক দিত—

ওই, হাত-মুখ ধুয়ে এসো। ভাত ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।”

সেই ডাক এখনো যেন তার কানে ভেসে আসে

নীরবে বসে  দাবা থানতে থানতে হঠাৎ পুরোনো দিনের স্মৃতি তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। মনে হলো সময় যেন তাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে পাঁচ বছর আগের সেই দিনগুলোতে

তখন তজিম নিজের সমস্ত সময় শক্তি উৎসর্গ করেছিল তার মাতৃভাষা—চাঙমা ভাষা রক্ষার কাজে

গ্রামে গ্রামে ঘুরে মানুষকে সচেতন করা, নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষা শেখানো, ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য সভা করা—এসব কাজেই তার দিন কেটে যেত। অনেকেই তাকে পাগল বলত

কেউ বলত,
ভাষা দিয়ে কি পেট ভরবে?”

কেউ আবার হাসতে হাসতে বলত,
এইসব করে লাভ কী?”

কিন্তু তজিম থামেনি। কারণ সে জানত—ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মা

এই সংগ্রামের পেছনে নীরব শক্তি হয়ে ছিল তার স্ত্রী নাগরো। সংসারের সব দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিল সে। মাঠের কাজ, ঘরের কাজ, ছেলে-মেয়ের পড়াশোনা—সবই সামলাত ধৈর্য আর ভালোবাসা দিয়ে

একদিন রাতে নাগরো তাকে বলেছিল—

তুমি তোমার কাজ করো। ভাষার জন্য কাজ করা খারাপ কিছু না। সংসারটা আমি দেখছি।”

তজিম তখন চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে ছিল। সেই চোখে ছিল কৃতজ্ঞতা

কিন্তু সময় সবসময় মানুষের ইচ্ছার মতো থাকে না

হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছিল নাগরো। প্রথমে সবাই ভেবেছিল সাধারণ কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই অবস্থা খারাপ হয়ে গেল। হাসপাতালে নেওয়ার পরে
সে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেল

সেই দিন থেকেই যেন তজিমের জীবনে এক অদৃশ্য শূন্যতা নেমে আসে

সংসারের ভার এখন তার একার কাঁধে

এখন তার মেয়ে অনার্সে পড়ে। ছেলে নবম শ্রেণিতে। তাদের পড়াশোনার খরচ দিন দিন বাড়ছে। অথচ তার নিজের আয় খুবই কম

ঠিক তখনই হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল

স্ক্রিনে ভেসে উঠল মেয়ের নাম

তজিম ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে মৃদু কণ্ঠে মেয়েটি বলল—

বাবা, ৫০০ টাকা পাঠাবে? জরুরি লাগবে।”

কথাটা শুনে তজিমের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল

এই মুহূর্তে তার কাছে একটাও টাকা নেই

সে পকেট হাতড়ে দেখল। পুরোনো একটি কাগজ ছাড়া আর কিছুই নেই। মনে হলো যেন শূন্যতা তাকে ঘিরে ধরেছে

কিন্তু মেয়েকে কি করে বলবে—

মা, আমার কাছে টাকা নেই”?

কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে শুধু বলল—

আচ্ছা মা, পাঠিয়ে দেব।”

তারপর ধীরে ধীরে কলটা কেটে দিল

ফোনটা নামিয়ে রেখে তজিম দীর্ঘশ্বাস ফেলল

বাইরে তখনও গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি পড়ছে। ঘরের টিনের ছাউনিতে টুপটাপ শব্দ হচ্ছে। মনে হলো প্রতিটি শব্দ যেন তার বুকের ভেতরে গিয়ে বাজছে

এমন সময় তার মায়ের কথাগুলো আবার কানে ভেসে উঠল—

তজিম, তুমি আর কতদিন এভাবে অভাবে থাকবে? তোমার তো জমি-জমা আছে, বাগান-বাগিচা আছে। সমাজের কাজ একটু কমিয়ে নিজের কাজ করলে তো অভাব থাকবে না।”

বাবাও প্রায়ই বলেন—

মানুষের জন্য কাজ করা ভালো, কিন্তু নিজের সংসারের কথাও ভাবতে হয়।”

ভাই-বোনেরাও একই কথা বলে

তজিম এসব কথা শুনে শুধু মৃদু হাসে। কখনো তর্ক করে না, কাউকে বোঝানোরও চেষ্টা করে না

কারণ সে জানে—তার পথটা সহজ নয়

তার হৃদয়ের গভীরে একটি প্রতিজ্ঞা জ্বলছে

সে মনে মনে বারবার বলে—

যতদিন না চাঙমা ভাষা তার প্রাপ্য সম্মান পায়, যতদিন না আমাদের ভাষা মুক্তভাবে বেঁচে থাকে, ততদিন আমি এই পথ ছেড়ে যাব না।”

অভাব তাকে কষ্ট দেয়, কিন্তু দুর্বল করে না

হাজারো সংকটের মাঝেও তজিম নিজের সংগ্রামকে কখনো ব্যর্থ মনে করে না। কারণ সে জানে—তার এই লড়াই শুধু নিজের জন্য নয়

এটি তার মাতৃভাষার জন্য

তার সংস্কৃতির জন্য

তার জাতির ভবিষ্যতের জন্য

বাইরে তখনও বসন্তের বাতাস বইছে। দূরে কোথাও কোকিল ডাকছে। ফুলের সুগন্ধে ভরে আছে চারপাশ

তজিম ধীরে ধীরে উঠল। ভেজা উঠানের দিকে তাকাল। তারপর আকাশের দিকে চোখ তুলে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল

মনে হলো নাগরো যেন কোথাও থেকে তাকে দেখছে

হঠাৎ তার বুকের ভেতর নতুন এক দৃঢ়তা জন্ম নিল

ফাগুনের এই দিনে সে আবার মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল—

আমি থামব না।”

যত কষ্টই আসুক, আমি থামব না।”

প্রকৃতির আনন্দের মাঝেও এক মানুষের সংগ্রাম চলতেই থাকে—নিঃশব্দে, দৃঢ়ভাবে, অটুট বিশ্বাস নিয়ে

ফাগুনের ফুল একদিন ঝরে যাবে

বসন্ত চলে যাবে

কিন্তু তজিমের প্রতিজ্ঞা ঝরবে না

কারণ সে জানে—

একটি ভাষা বাঁচলে তবেই বাঁচবে একটি জাতির আত্মা

 

খাগড়াছড়িতে সিএইচটি নারী হেডম্যান–কার্বারী নেটওয়ার্কের ১ম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

খাগড়াছড়িতে সিএইচটি নারী হেডম্যান–কার্বারী নেটওয়ার্ক, খাগড়াছড়ি জেলা শাখা র প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে।...