সোমবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৬

পাহাড়ে মর্ডানিজম: সংস্কৃতি যখন পণ্য হয়ে ওঠে - ইনজেব চাঙমা

 


পাহাড়ে আজ যে ‘মর্ডানিজম’ দেখা যাচ্ছে, তা আসলে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা নয়। এটি হলো সাজানো-গোছানো এক নতুন উপনিবেশ। বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর, ভেতরে ভেতরে শোষণের পুরোনো কাঠামোই কাজ করছে।
‘রুটস ফেস্টিভ্যাল’-এর মতো আয়োজনগুলোতে পাহাড়ি সংস্কৃতি জীবনের অংশ হিসেবে নয়, মঞ্চের সাজ হিসেবে হাজির হয়। সমতল থেকে আনা শিল্পীরা এসে পাহাড়িদেরই শেখান তাদের সংস্কৃতি কীভাবে দেখাতে হবে। এখানে সংস্কৃতি আর মানুষের দৈনন্দিন জীবন নয়—এটি আলো, ক্যামেরা আর দর্শকের জন্য বানানো পণ্য।
এই উৎসবগুলোতে আদিবাসী মানুষ আর মানুষ থাকে না। তাদের পোশাক, খাবার, নাচ, শরীর, হাসি—সবকিছু ‘এথনিক আকর্ষণ’ হিসেবে বিক্রি হয়। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, পাংখুয়া, ম্রো, খুমী, ........তারা যেন জীবন্ত মানুষ নয়, বরং প্রদর্শনীর সামগ্রী।
তাদের কথা বলার ভাষাও নিজের থাকে না। কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না—সব আগেই ঠিক করা। যাতে বাজারে সমস্যা না হয়, যাতে প্রশ্ন না ওঠে। প্রতিবাদের জায়গায় থাকে ‘নান্দনিকতা’, আর সেই নান্দনিকতায় আগুন নিভে যায়।
এই সাংস্কৃতিক আয়োজনের পেছনে থাকে এক শ্রেণির এলিট—যারা বিদেশে পড়াশোনা করে ‘মাল্টিকালচারালিজম’ শিখে আসে, এনজিওর প্রজেক্ট চালায়, ফান্ড আনে, উৎসব বানায়। পাহাড়ি মধ্যবিত্ত এই চকচকে সংস্কৃতিতে মুগ্ধ হয়। অনেক লেখক-শিল্পীও সেখানে যুক্ত হয়ে পড়েন।
এখানেই সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি। যারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে নারীর অধিকারের কথা বলেন, তারাই আবার এই সংস্কৃতির বাজারের অংশ। তারা নারীবাদের ভাষা নেয় পশ্চিম থেকে, ‘অথেনটিক’ পরিচয় নেয় পাহাড় থেকে, আর স্বাদ নেয় সমতলের সংস্কৃতি থেকে। এটা শুধু দ্বিচারিতা নয়—এটা রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা।
এই সংস্কৃতি পুঁজির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না, কারণ সে নিজেই পুঁজির ভাষায় কথা বলে। পাহাড়ে যেখানে মানুষ প্রতিদিন ভূমি, ভাষা, নিরাপত্তা আর অস্তিত্বের জন্য লড়ছে—সেখানে শিল্পীর কাজ কি শুধু উৎসব সাজানো?
রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে বসতি স্থাপন, সামরিকীকরণ আর উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ চালাচ্ছে। এই বাস্তবতার ভেতরে শিল্পের ভাষা আলাদা না হলে, তা সত্যিকার শিল্প হয় কীভাবে?
রাষ্ট্র যেমন পাহাড়িদের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বানিয়েছে, তেমনি এই সাংস্কৃতিক এলিট পাহাড়কে বানিয়েছে ‘থিম’। নিরাপদ, সুন্দর, বাজারে বিক্রির মতো। তাহলে শাসক আর এই শিল্পীর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
সংস্কৃতি যদি মুক্তির কথা না বলে, যদি প্রতিরোধের শক্তি না হয়—তবে তা কেবল সাজঘর। পাহাড় কোনো ফেস্টিভ্যালের বিষয় নয়। পাহাড় হলো এক রক্তাক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এই বাস্তবতার মুখোমুখি না দাঁড়ালে কোনো মর্ডানিজমই আধুনিক নয়।
তা শুধু উপনিবেশের নতুন পোশাক।

পাহাড়ে মর্ডানিজম: সংস্কৃতি যখন পণ্য হয়ে ওঠে - ইনজেব চাঙমা

  পাহাড়ে আজ যে ‘মর্ডানিজম’ দেখা যাচ্ছে, তা আসলে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা নয়। এটি হলো সাজানো-গোছানো এক নতুন উপনিবেশ। বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর, ভেতর...