শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬

বাকস্বাধীনতা ও অধিকারের লড়াই - ইনজেব চাঙমা

 


একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হলো তার স্বাধীন মতপ্রকাশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য যে, যখনই কেউ নিজের ন্যায্য অধিকার বা সিস্টেমের ত্রুটি নিয়ে কথা বলে, তখনই তাকে 'সতর্কবার্তা' বা 'রাষ্ট্রদ্রোহের' তকমা দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়। রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের সাম্প্রতিক চাঙমা রাণী ইয়েন ইয়েনকে সতর্কবার্তা বা এ জাতীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—আমরা কি সত্যিই একটি স্বাধীন দেশে বাস করছি, নাকি ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করার সেই পুরনো ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিতেই আটকে আছি?
 
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, শোষক গোষ্ঠী সবসময়ই সত্য উচ্চারণকারীকে 'সন্ত্রাসী' বা 'রাষ্ট্রদ্রোহী' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত—বাংলার দামাল ছেলেরা যখনই অধিকারের কথা বলেছে, তখনই তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী তাদের রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা, সবার বিরুদ্ধেই একসময় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ছিল। আজ বাংলাদেশ স্বাধীন। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, ৫৪ বছর পরেও স্বাধীন বাংলাদেশে নিজের অধিকারের কথা বললে সেই একই 'রাষ্ট্রদ্রোহ' বা 'সতর্কবার্তা'র মুখোমুখি হতে হয়। যে কালচার পাকিস্তানি শাসনামলে ছিল, তার প্রতিফলন স্বাধীন বাংলাদেশে কাম্য নয়।
 
জেলা প্রশাসন বা রাষ্ট্রের যেকোনো অঙ্গের দায়িত্ব হলো নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা, অধিকার হরণ করা নয়। একজন নাগরিক যখন তার জীবন, জীবিকা বা আঞ্চলিক সমস্যা নিয়ে কথা বলেন, তখন তাকে আইনি ভয় দেখানো বা সতর্কবার্তা দেওয়া স্পষ্টতই বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী। সংবিধানে স্বীকৃত 'বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা' কোনো দয়া নয়, বরং এটি নাগরিকের জন্মগত অধিকার। অধিকারের কথা বলা যদি রাষ্ট্রদ্রোহ হয়, তবে বুঝতে হবে গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটিই সেখানে সংকটাপন্ন।
 
বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তা পরিমাপ করা হয় সেই রাষ্ট্রের নাগরিকরা কতটা নির্ভয়ে কথা বলতে পারে তার ওপর ভিত্তি করে। ভয়ের সংস্কৃতি বা 'কালচার অফ ফিয়ার' তৈরি করে সাময়িকভাবে কাউকে চুপ করানো যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক নয়। সমালোচনাই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সমালোচনাকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে রাষ্ট্রের মৌলিক স্তম্ভগুলোই দুর্বল হয়ে পড়ে।
 
দেশ স্বাধীন হয়েছে শোষণের শৃঙ্খল ভাঙার জন্য, নতুন কোনো শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নয়। রাঙামাটি বা দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষ যখন তার অধিকারের কথা বলে, তখন তা রাষ্ট্রদ্রোহ নয় বরং দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মনে রাখা উচিত, তারা জনগণের সেবক, মালিক নন। বাকস্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে কোনো দেশ উন্নত হতে পারে না। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে অধিকারের কথা বললে হাতে 'সতর্কবার্তা' নয়, বরং 'সমাধান' এসে পৌঁছাবে।
 
২৫ এপ্রিল ২০২৬ লেখা 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

গোপনীয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম।

  গোপনীয় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম। স্মারক নং ১০২৫(৯)সি তারিখ রাঙ্গামাটি, ১৫ই সেপ্টেম্বর/...