শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল, ২০২৬

পাহাড়ের ভোর, তবুও আঁধার- ইনজেব চাঙমা



পার্বত্য চট্টগ্রামের সুউচ্চ পাহাড়গুলোতে যখন ভোরের প্রথম আলো এসে পড়ে,তখন প্রকৃতির সেই স্নিগ্ধতা জুম্ম নারী ও শিশুদের মনে প্রশান্তিআনেনা; বরং নিয়ে আসে এক অজানা শঙ্কা জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনে পিসিজেএসএস- এর প্রতিনিধি অগাস্টিনা চাকমা যখন বলেন- ”তারা জানে না পরবর্তী হামলা থেকে বেঁচে থাকতে পারবে কিনা"—তখন সভ্যতার সব আস্ফালন থমকে দাঁড়ায়।পাহাড়ের বুক চিরে প্রবহমান ঝর্ণার শব্দের চেয়েও সেখানে এখন ভারী হয়ে উঠেছে মানুষের হাহাকার।

১৯৯৭ সালের সেই ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ছিল এক দীর্ঘ যুদ্ধের অবসানে শান্তির নীল নকশা। সেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের, স্বপ্ন ছিল নিজের ভূমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার আর সংকল্প ছিল নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষা। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টেছে, সময় গড়িয়েছে, অথচ সেই প্রতিশ্রুতির শিকলগুলো আজ জীর্ণ। অগাস্টিনা চাকমার বক্তব্যে উঠে এসেছে এক রূঢ় সত্যচুক্তির সেই প্রতিশ্রুতিগুলো আজ ভাঙা কাঁচের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পাহাড়ি পথে, যা প্রতিনিয়ত জুম্ম প্রান্তিক মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে।

আমরা সমতলে বসে যে সূর্যোদয়কে নতুনের আবাহন মনে করি, পাহাড়ে সেই সূর্যোদয় বয়ে আনে অনিশ্চয়তা। সেখানে প্রতিদিন ভোর হয় ঠিকই, কিন্তু জুম্ম জীবনের আকাশে অন্ধকারের ঘনঘটা কাটে না। সহিংসতা আর বঞ্চনা সেখানে নিত্যসঙ্গী। যে ভূমিতে তাদের পূর্বপুরুষের হাড় মিশে আছে, সেই ভূমি আজ তাদের কাছে পরবাসী। এই অস্তিত্বের সংকট কেবল লাঞ্ছনা নয়, বরং একটি জাতির শিকড় উপড়ে ফেলার নামান্তর।

অগাস্টিনা চাকমার এই সাহসী উচ্চারণ আমাদের স্তব্ধ করে দেয়, কিন্তু একইসাথে আমাদের ভেতরের ঘুমন্ত বিবেককে নাড়া দেয়। এই প্রগাঢ় অন্ধকার দূর করার দায়ভার আজ বর্তমান প্রজন্মের। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, শোষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা এবং ঐক্য। "পাহাড়ের এই দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার দূর করতে হলে সেই প্রজন্মকে জেগে উঠতে হবে, যাদের হৃদয়ে নিজের শিকড়ের প্রতি টান আছে।"

শেকড়হীন মানুষ যেমন ঝড়ে টিকে থাকতে পারে না, তেমনি নিজের অধিকার সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীন জাতি কখনো মুক্তি পায় না। পাহাড়ের প্রতিটি জুম্ম নারী শিশুর চোখে যে অনিশ্চয়তার ছায়া, তা মোছার জন্য প্রয়োজন এক নতুন জাগরণযে জাগরণ কেবল চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নয়, বরং মানুষের মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্ব নিশ্চিত করবে।

অগাস্টিনা চাকমা কেবল এক প্রতিনিধি নন, তিনি পাহাড়ের কণ্ঠস্বর। তাঁর সেই "সুন্দর অথচ বেদনাবিধুর" কথাগুলো আজ ধূলিকণায় মিশে যেতে দেওয়া চলে না। পাহাড়ের চূড়ায় ভোরের সত্যিকারের আলো তখনই পৌঁছাবে, যখন প্রতিটি শিশু নির্ভয়ে ঘুম থেকে উঠবে এবং প্রতিটি নারী ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা পাবে। শিকড়ের টানে, অস্তিত্বের লড়াইয়ে নতুন প্রজন্মকে সেই মশাল হাতে নিতে হবে যা এই দীর্ঘ অন্ধকারকে চিরতরে নির্বাসিত করবে।

অন্ধকার যতই গভীর হোক, পাহাড়ের বুক চিরে সত্যের সূর্য একদিন উদিত হবেইএই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পাহাড়ের ভোর, তবুও আঁধার- ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য  চট্টগ্রামের  সুউচ্চ  পাহাড়গুলোতে  যখন  ভোরের  প্রথম  আলো  এসে  পড়ে , তখন  প্রকৃতির  সেই  স্নিগ্ধতা  জুম্ম  নারী  ও  শিশুদের  মনে...