সোমবার, ২০ জুলাই, ২০২৬

পাহাড়ের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার আওতায় আসুক- ইনজেব চাঙমা

 

ইনজেব চাঙমা
মানুষ জন্ম নেয় একটি ভূখণ্ডে, কিন্তু তার প্রকৃত জন্ম ঘটে একটি ভাষায়। মায়ের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রথম শব্দ, ঘুমপাড়ানি গানের সুর, শৈশবের বিস্ময় আর প্রথম স্বপ্ন—সবকিছুরই নিবাস মাতৃভাষা। তাই ভাষা কেবল যোগাযোগের বাহন নয়; ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের আয়না, ইতিহাসের উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যতের অঙ্গীকার।
পাহাড়ের সকাল যেমন কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের আলোয় উন্মোচিত হয়, তেমনি একটি শিশুর মনও জ্ঞানের আলোয় বিকশিত হয় তার নিজের ভাষার স্পর্শে। যে ভাষায় সে মায়ের মমতা অনুভব করে, প্রকৃতির রূপ চিনে, জীবনের প্রথম বিস্ময়কে নাম দেয়—সেই ভাষাই তার শিক্ষার সবচেয়ে স্বাভাবিক সোপান। অথচ কত নির্মম এই বাস্তবতা! পার্বত্য চট্টগ্রামের অসংখ্য শিশু বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়েই যেন নিজের ভাষাকে দরজার বাইরে রেখে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। সেখানে শিক্ষা আছে, কিন্তু নিজের ভাষার উষ্ণতা নেই; বই আছে, কিন্তু আত্মপরিচয়ের প্রতিধ্বনি নেই।
একটি ভাষা হারিয়ে যায় না একদিনে। নদী যেমন হঠাৎ শুকিয়ে যায় না, তেমনি ভাষাও একদিনে বিলীন হয় না। অবহেলার দীর্ঘ ঋতু, নীরবতার অনন্ত অপেক্ষা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যবহারহীনতার অন্ধকারে ভাষা ধীরে ধীরে তার দীপ্তি হারায়। ভাষার সঙ্গে হারিয়ে যায় লোককথা, প্রবাদ, গান, বিশ্বাস, ইতিহাস, স্মৃতি এবং একটি জনগোষ্ঠীর পৃথিবীকে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টি।
পাহাড়ের প্রতিটি ভাষা একটি জীবন্ত অরণ্যের মতো। তার প্রতিটি শব্দ একটি বৃক্ষ, প্রতিটি বর্ণ একটি পাতা, প্রতিটি লোকগাথা একটি ঝরনার কলধ্বনি। সেই অরণ্যকে রক্ষা করা মানে কেবল কয়েকটি ভাষাকে সংরক্ষণ করা নয়; রক্ষা করা মানে বাংলাদেশের বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক আত্মাকে রক্ষা করা।
শিক্ষা যদি মানুষের মুক্তির পথ হয়, তবে সেই পথের প্রথম ইটটি অবশ্যই মাতৃভাষার হওয়া উচিত। কারণ শিশুর চিন্তার প্রথম জানালা খুলে যায় তার নিজের ভাষায়। যে শিশুকে তার মাতৃভাষায় শেখার অধিকার দেওয়া হয়, সে কেবল ভালো শিক্ষার্থীই হয় না; সে নিজের শিকড়কে ধারণ করে বিশ্বকে আলিঙ্গন করতে শেখে। শিকড় যত গভীর হয়, বৃক্ষ ততই আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।
আজ প্রয়োজন আর কোনো প্রতিশ্রুতির নয়; প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগের। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি বিহার, মন্দির, ক্লাব, সরকারি, বেসরকারি, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কিন্ডারগার্টেন, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, গবেষণা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হবে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে কোনো শিশুকে নিজের ভাষা বিসর্জন দিয়ে জ্ঞানের পথে হাঁটতে না হয়।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের মহত্ত্ব তার অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, তার ভাষাগত বৈচিত্র্যকে কতটা সম্মান দিতে পারে—সেই সক্ষমতায়। পাহাড়ের শিশুরা যেন তাদের প্রথম অক্ষর লেখে নিজের ভাষায়, প্রথম কবিতা আবৃত্তি করে নিজের ভাষায়, প্রথম স্বপ্ন দেখে নিজের ভাষায়—এই আকাঙ্ক্ষা কোনো আবেগ নয়; এটি ন্যায়, এটি অধিকার, এটি একটি মানবিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।
আসুন, আমরা এমন এক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করি, যেখানে পাহাড়ের প্রতিটি বিদ্যালয়ে মাতৃভাষা হবে জ্ঞানের প্রথম প্রদীপ। কারণ ভাষার আলো নিভে গেলে অন্ধকার নামে শুধু একটি জনগোষ্ঠীর জীবনে নয়; অন্ধকার নেমে আসে সমগ্র জাতির সাংস্কৃতিক আকাশে। আর যে জাতি তার প্রতিটি ভাষাকে সযত্নে লালন করে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তার কণ্ঠস্বরকেই দীর্ঘজীবী করে রাখে।।

লেখক সি. আর. চাকমা: ভাষা, ইতিহাস ও সাহিত্যচর্চার আর এক নিবেদিত সাধক- Injeb Changma

চাকমা ভাষা, সাহিত্য ও জাতিসত্তার ইতিহাস সংরক্ষণের ক্ষেত্রে লেখক সি. আর. চাকমা আরো এক নিবেদিতপ্রাণ গবেষক ও সাহিত্যসাধক। তিনি ১৯২৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলার বড়াদম এলাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম নবচন্দ্র কার্বারি চাকমা। শৈশব থেকেই তিনি নিজ জাতির ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতি গভীর অনুরাগী ছিলেন। তবে কর্মজীবনের শেষ পর্বে এসে তিনি উপলব্ধি করেন যে, একটি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার প্রধান ভিত্তি তার মাতৃভাষা, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। এই উপলব্ধিই তাঁকে গবেষণা, রচনা এবং ভাষা-সংরক্ষণের কাজে আত্মনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করে।
সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পূর্বেই তিনি চাকমা ভাষার অভিধান, ব্যাকরণ এবং জাতীয় ইতিহাস প্রণয়নের কাজে হাত দেন। অবসর-পরবর্তী সময়ে তাঁর সাহিত্য ও গবেষণাকর্ম আরও বিস্তৃত হয়। তাঁর রচনায় ভাষাতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, ইতিহাসচর্চা এবং জাতীয় আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন সমান গুরুত্ব লাভ করেছে। বিশেষ করে চাকমা ভাষাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং জাতির অতীত ইতিহাসকে দলিলভিত্তিকভাবে সংরক্ষণের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
প্রকাশিত গ্রন্থ
সি. আর. চাকমার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
১. চাঙমা কধা
২. নবচন্দ্র পত্থম চাঙমা ব্যাকরণ
৩. যুগ বিবর্তনে চাকমা জাতি (প্রাচীন যুগ)
৪. যুগ বিবর্তনে চাকমা জাতি (মধ্যযুগ)
অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি
প্রকাশিত গ্রন্থের পাশাপাশি সি. আর. চাকমা বহু গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপিও রচনা করেন, যা তাঁর বহুমাত্রিক চিন্তা ও গবেষণার সাক্ষ্য বহন করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
১. Learn Chakma Language in Bengali, Hindi and English
২. Progressive Development of Telecommunication System in Railways
৩. Kiss is the Key of Love and Love is the Lock of Life —
৪. জিঙ্গানী (জীবনসূত্র)
৫. চাকমা–অসমীয়া ভাষাতত্ত্ব ও ব্যাকরণ সমালোচনা

সি. আর. চাকমার সাহিত্যকর্ম কেবল গ্রন্থ রচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; তাঁর সমগ্র সাধনার লক্ষ্য ছিল চাকমা ভাষা ও জাতিসত্তার সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তা সুশৃঙ্খলভাবে তুলে ধরা। অভিধান, ব্যাকরণ, ইতিহাস, ভাষাতত্ত্ব, আত্মজীবনী এবং উপন্যাস—বিভিন্ন ধারায় তাঁর বিচরণ তাঁকে একজন বহুমাত্রিক সাহিত্যিক ও গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষত চাকমা ভাষার প্রমিত রূপ নির্ধারণ, ভাষার শব্দভাণ্ডার সংরক্ষণ এবং জাতীয় ইতিহাস প্রণয়নের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান ভবিষ্যৎ গবেষণার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হবে।

বি.দ্র.: সি. আর চাঙমার মৃত্যু তারিখ ও তার সর্ম্পকে কাহারোর ধারনা থাকলে শেয়ার করা জন্য অনুরোধ থাকলো। হোয়াটঅ্যাপ: 01516195366

পাহাড়ের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার আওতায় আসুক- ইনজেব চাঙমা

  ইনজেব চাঙমা মানুষ জন্ম নেয় একটি ভূখণ্ডে, কিন্তু তার প্রকৃত জন্ম ঘটে একটি ভাষায়। মায়ের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রথম শব্দ, ঘুমপাড়ানি গানের সুর, শৈশব...