“যে মানুষ নিজের মাতৃভাষার আলো জ্বালিয়ে রাখেন, তিনি কেবল অক্ষর শেখান না—তিনি একটি জাতির ইতিহাস, স্মৃতি ও আত্মপরিচয়কে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেন।”
পার্বত্য
চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা পথ ও জনপদের মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে জড়িয়ে
আছে ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের এক দীর্ঘ ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে হৃদয়ে ধারণ করে চাঙমা
ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে যাঁরা নীরবে কাজ করে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে পাভেল
চাঙমা ভূবন একজন নিবেদিতপ্রাণ সমাজকর্মী, সাহিত্যসেবী ও সাংস্কৃতিক সংগঠক।
পাভেল চাঙমা
দীর্ঘদিন ধরে তিনি চাঙমা সাহিত্য একাডেমির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে চাঙমা ভাষা, অঝাপাত বর্ণমালা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং বিকাশে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি চাঙমা সাহিত্য একাডেমির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন। সংগঠনের কার্যক্রমকে এগিয়ে নেওয়া, ভাষা ও সাহিত্যচর্চায় নতুন প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করা এবং জাতির নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়কে সুদৃঢ় করার কাজে তিনি আন্তরিকভাবে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন।
পাভেল চাঙমা ভূবন ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে রাঙামাটি পার্বত্য জেলার নান্যাচর উপজেলার যাত্রামণি আদাম গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা আনন্দ বিকাশ চাঙমা ও মাতা কনিকা চাঙমা। তিন ভাই মধ্যে তিনি সবার বড়। পাহাড়ের এক সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠায় শৈশব থেকেই তিনি নানা অভাব-অনটন ও প্রতিকূলতার সঙ্গে পরিচিত হন। ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ খ্রিস্টাব্দে রুপিনা চাঙমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের দুই কন্যাসন্তান রয়েছে।
তিনি রাঙামাটি সাপছড়ি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পারিবারিক আর্থিক সংকট ও অভাবের কারণে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন খুব বেশি দূর এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ হয়নি। কিন্তু শিক্ষার পথ সীমিত হলেও তাঁর জ্ঞানপিপাসা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং মানুষের জন্য কাজ করার আগ্রহ কখনো থেমে থাকেনি। জীবনের বাস্তব অভিজ্ঞতাকে শক্তিতে পরিণত করে তিনি সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন।
পাভেল চাঙমা ভূবন শুধু একজন সংগঠক নন; তিনি একজন চাঙমা ভাষার স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষক। মাতৃভাষার প্রতি গভীর ভালোবাসা ও দায়বদ্ধতা থেকে তিনি স্বেচ্ছাশ্রমে চাঙমা ভাষা ও অঝাপাত বর্ণমালা শেখানোর কাজে অংশগ্রহণ করে আসছেন। তাঁর বিশ্বাস—মাতৃভাষা একটি জাতির আত্মার ভাষা; আর সেই ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা মানে জাতির ইতিহাস, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বকে রক্ষা করা।
শিশু-কিশোর ও নতুন প্রজন্মের মধ্যে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করাকে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন। ভাষাশিক্ষার মাধ্যমে তিনি কেবল অক্ষরজ্ঞান ছড়িয়ে দিতে চান না; বরং নতুন প্রজন্মের হৃদয়ে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং জাতিগত পরিচয়ের প্রতি দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলতে চান। তাঁর এই স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ চাঙমা ভাষা সংরক্ষণ ও প্রসারের আন্দোলনে একটি মূল্যবান অবদান।
ব্যক্তিজীবনে তিনি রুপিনা চাঙমার সঙ্গে সংসার জীবন গড়ে তুলেছেন। তাঁদের তিন কন্যাসন্তান রয়েছে। পারিবারিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সমাজ, ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য সময় দেওয়া তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সংসারের ব্যস্ততা তাঁকে তাঁর সাংস্কৃতিক দায়িত্ব থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারেনি।
চাঙমা জাতির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করা তাঁর শখের গণ্ডি পেরিয়ে এক ধরনের জীবনসাধনায় পরিণত হয়েছে। তিনি মনে করেন, একটি জাতির ভাষা হারিয়ে গেলে তার ইতিহাসের অনেক অমূল্য স্মৃতি হারিয়ে যায়; আর সাহিত্যচর্চা থেমে গেলে দুর্বল হয়ে পড়ে জাতির আত্মপ্রকাশের পথ। তাই তিনি নিজের সামর্থ্য ও সাধ্যের মধ্যে থেকে চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার কাজে অবিচল রয়েছেন।
আর্থিক অনতনে এখনো তাঁর কোনো একক গ্রন্থ প্রকাশিত না হলেও তিনি নিয়মিত লেখালেখি করে চলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এবং বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিনে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। তাঁর লেখায় কখনো উঠে আসে পাহাড়ের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন, কখনো ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা, আবার কখনো জাতিসত্তা ও আত্মপরিচয় রক্ষার প্রত্যয়।
তাঁর সাহিত্যযাত্রার উল্লেখযোগ্য সংযোজন যৌথ কাব্যগ্রন্থ “পুববেল”। গ্রন্থটি নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ থেকে প্রকাশিত হয়। পাশাপাশি “আবেদি” নামের আরেকটি যৌথ কাব্যগ্রন্থ জাবারাং কল্যাণ সমিতি থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এই গ্রন্থগুলো সম্পূর্ণ চাঙমা ভাষা ও চাঙমা বর্ণমালায় রচিত। মাতৃভাষা ও নিজস্ব বর্ণমালায় সাহিত্যসৃষ্টির এই প্রয়াস চাঙমা সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি অঝাপাত বর্ণমালার ব্যবহার ও প্রসারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
একটি ভাষা কেবল ভাব বিনিময়ের মাধ্যম নয়; ভাষার ভেতর বাস করে একটি জাতির ইতিহাস, লোকজ স্মৃতি, সংস্কৃতি, অনুভব ও স্বপ্ন। পাভেল চাঙমা ভূবন সেই সত্যকে উপলব্ধি করেই ভাষা ও সাহিত্যচর্চার পথে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর কর্মজীবন প্রমাণ করে—সুযোগের সীমাবদ্ধতা কিংবা জীবনের প্রতিকূলতা মানুষের স্বপ্নকে থামিয়ে দিতে পারে না, যদি তার হৃদয়ে সমাজ ও জাতির জন্য কাজ করার দৃঢ় অঙ্গীকার থাকে।
চাঙমা সাহিত্য একাডেমির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি এবং চাঙমা ভাষার স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষক হিসেবে তিনি আজ ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির দুই গুরুত্বপূর্ণ ধারাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন। একদিকে তিনি সংগঠনের মাধ্যমে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে শক্তিশালী করছেন, অন্যদিকে ভাষা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দিচ্ছেন মাতৃভাষার অমূল্য উত্তরাধিকার।
পাহাড়ের মাটি, মানুষের জীবন, মাতৃভাষার মাধুর্য এবং নিজস্ব সংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসাকে হৃদয়ে ধারণ করে পাভেল চাঙমা ভূবন তাঁর পথচলা অব্যাহত রেখেছেন। তাঁর শ্রম, নিষ্ঠা, সাহিত্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গীকার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
পাভেল চাঙমা ভূবন—তিনি একজন সমাজসেবী, সাহিত্যপ্রেমী, সাংস্কৃতিক সংগঠক, চাঙমা ভাষার স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষক এবং চাঙমা ভাষা, সাহিত্য ও জাতিসত্তার নিবেদিত কর্মী।