সুপায়ন চাকমা অক্ষরের আলোয় এক স্বপ্নযাত্রী - ইনজেব চাঙমা
![]() |
| সুপায়ন চাঙমা |
তিনি বিশ্বাস করেন, একদিন চাঙমা সমাজের প্রতিটি ঘরে অঝাপাত বর্ণমালায় লেখা বই পড়বে নতুন প্রজন্ম। শিশুরা মাতৃভাষার অক্ষরে নিজেদের প্রথম শব্দ লিখবে, কবিতার পঙ্ক্তিতে খুঁজে পাবে পাহাড়ের সৌন্দর্য, আর ভাষার ভেতর আবিষ্কার করবে নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়। এই স্বপ্ন তাঁর কাছে কেবল কল্পনার রঙিন ছবি নয়; এটি তাঁর কর্মের প্রেরণা, পথচলার শক্তি এবং জীবনের এক গভীর সাধনা।
সুপায়ন চাকমার জন্ম ১০ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৮ সালে। তাঁর পিতা লাজুক্যা চাকমা ও মাতা সুমিতা চাকমা। রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার সাবেক্ষ্যং ইউনিয়নের লাম্বাছড়া গ্রামে তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। পাহাড়ের প্রকৃতি, সহজ-সরল জীবন ও পারিবারিক মূল্যবোধে তাঁর শৈশব গড়ে ওঠে।
শিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ ও অগ্রযাত্রা তাঁকে উচ্চশিক্ষার পথে নিয়ে এসেছে। বর্তমানে তিনি রাঙামাটি সরকারি কলেজে মাস্টার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নরত। তাঁর কাছে শিক্ষা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের সিঁড়ি নয়; শিক্ষা হলো সমাজকে জানার, মানুষকে বোঝার এবং নিজের জাতি ও সংস্কৃতির জন্য দায়িত্বশীল হয়ে ওঠার এক আলোকিত পথ।
ব্যক্তিজীবনে তিনি ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর খাগড়াছড়ির চিকিৎসক চিনুর বড় কন্যার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। সংসার জীবনের নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করেও তিনি ভাষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পথ থেকে সরে যাননি। বরং ব্যক্তিজীবন ও সামাজিক দায়িত্বের সমন্বয়ে তিনি তাঁর স্বপ্নকে আরও দৃঢ়ভাবে ধারণ করে চলেছেন।
চাঙমা সাহিত্য একাডেমির সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বর্তমানে তিনি একাডেমির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি মহালছড়ি কলেজ শাখার সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে তাঁর দায়িত্ব পালন কেবল পদধারণের ইতিহাস নয়; বরং ভাষা ও সাহিত্যকে এগিয়ে নেওয়ার পথে তাঁর শ্রম, নিষ্ঠা ও অঙ্গীকারের স্মারক।
চাঙমা ভাষা ও অঝাপাত বর্ণমালার প্রতি গভীর ভালোবাসা থেকেই তিনি দীর্ঘকাল ধরে স্বেচ্ছাশ্রমে ভাষা ও বর্ণমালা প্রশিক্ষণ কোর্স পরিচালনা করে আসছেন। একজন চাঙমা ভাষার স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষক হিসেবে তিনি শিশু-কিশোর ও আগ্রহী শিক্ষার্থীদের মাতৃভাষার অক্ষরের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। তাঁর হাতে অক্ষর শেখা মানে শুধু পড়তে বা লিখতে শেখা নয়; বরং নিজের শিকড়কে চিনে নেওয়া, জাতির ইতিহাসকে অনুভব করা এবং সাংস্কৃতিক পরিচয়কে হৃদয়ে ধারণ করা।
তিনি জানেন, একটি ভাষা হারিয়ে গেলে কেবল কিছু শব্দ হারায় না, হারিয়ে যায় বহু প্রজন্মের স্মৃতি, লোককথা, গান, ইতিহাস ও জীবনবোধ। তাই তিনি নীরবে অক্ষরের প্রদীপ জ্বালিয়ে চলেছেন। তাঁর এই স্বেচ্ছাশ্রম যেন পাহাড়ের ভোরের প্রথম আলো, ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মনে, জাগিয়ে তোলে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা।
সাহিত্যচর্চাও তাঁর জীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে নিয়মিত কবিতা লেখেন। তাঁর কবিতায় কখনো পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, কখনো মানুষের হাসি-কান্না, কখনো মাতৃভাষার প্রতি মমতা, আবার কখনো জাতিসত্তার স্বপ্ন ও আত্মপরিচয়ের আকাঙ্ক্ষা জীবন্ত হয়ে ওঠে।
তাঁর সাহিত্যযাত্রার উল্লেখযোগ্য সংযোজন যৌথ কাব্যগ্রন্থ “পুববেল”, যা নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এই কাব্যগ্রন্থগুলো সম্পূর্ণ চাঙমা ভাষা ও অঝাপাত বর্ণমালায় প্রকাশিত। নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালায় সাহিত্যচর্চার এই প্রয়াস কেবল সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেনি; বরং চাঙমা ভাষা ও অঝাপাত বর্ণমালার ব্যবহার, সংরক্ষণ এবং প্রসারের পথকেও সুদৃঢ় করেছে।
তিনি চাঙমা সাহিত্যপত্রিকা “চাদি”-তে কবিতা লেখেন। তাঁর কবিতার পঙ্ক্তিতে মাতৃভাষার সুর, পাহাড়ের জীবন এবং মানুষের অনুভূতি একাকার হয়ে ওঠে। তাঁর লেখালেখি যেন ভাষার প্রতি এক নীরব অঙ্গীকার, যতদিন শব্দ থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবে মানুষের স্মৃতি; যতদিন অক্ষর থাকবে, ততদিন জাগ্রত থাকবে জাতির আত্মপরিচয়।
সুপায়ন চাকমার পথচলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বড় পরিবর্তনের শুরু কখনো কখনো একটি ছোট শ্রেণিকক্ষ থেকে হয়; একটি শিশুর হাতে প্রথম অক্ষর তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়েই একদিন জেগে উঠতে পারে একটি জাতির নতুন ভবিষ্যৎ। তিনি হয়তো কোনো বড় মঞ্চের আলো খোঁজেন না; কিন্তু তাঁর স্বেচ্ছাশ্রমের প্রতিটি মুহূর্ত ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একেকটি আলোর প্রদীপ হয়ে জ্বলছে।
আজ তিনি শুধু একজন শিক্ষার্থী নন; তিনি একজন ভাষাসেবী, স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষক, কবি, সাহিত্যকর্মী এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক। চাঙমা সাহিত্য একাডেমির স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে তাঁর অভিজ্ঞতা ও কর্মপ্রেরণা আগামী দিনেও ভাষা, বর্ণমালা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে নতুন পথ দেখাবে, এমন প্রত্যাশা করা যায়।
পাহাড়ের মাটি, মাতৃভাষার মাধুর্য এবং জাতির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে হৃদয়ে ধারণ করে সুপায়ন চাকমা তাঁর স্বপ্নের পথে এগিয়ে চলেছেন। তাঁর স্বপ্ন একদিন সত্য হোক, চাঙমা সমাজের প্রতিটি ঘরে ঘরে অঝাপাত বর্ণমালায় লেখা বই পৌঁছে যাক; শিশুরা মাতৃভাষায় পড়ুক, লিখুক, কবিতা রচনা করুক; আর চাঙমা ভাষার অক্ষর হয়ে উঠুক আগামী প্রজন্মের গর্ব ও আত্মপরিচয়ের উজ্জ্বল আলো।
সুপায়ন
চাকমা, তিনি অক্ষরের আলোয় পথচলা এক স্বপ্নযাত্রী; চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালার স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষক, সাহিত্যপ্রেমী, কবি, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং মাতৃভাষার ভবিষ্যৎ নির্মাণে নিবেদিত এক তরুণ কর্মী।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন