অধিকার ছাড়া কোনো জাতির ভবিষ্যৎ স্থায়ী হয় না -ইনজেব চাঙমা

প্রতিটি বস্তুরই নিজস্ব ধর্ম আছে, আছে নিজস্ব সত্তা ও বৈশিষ্ট্য। একই রক্ত-মাংসের মানুষ হলেও প্রত্যেকের চিন্তা, চেতনা, উপলব্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গি এক নয়। একই গোত্র, একই জাতি কিংবা একই সমাজের অন্তর্ভুক্ত হয়েও মানুষের চিন্তাভাবনা ও অভিব্যক্তির মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য থাকে। কারণ প্রত্যেক মানুষ তার নিজস্ব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার আলোকে পৃথিবীকে দেখে এবং সেই উপলব্ধি থেকেই নিজের মত প্রকাশ করে।

তাই আমার লেখাকে কেউ সমালোচনা করলে আমি তা খুশি মনেই গ্রহণ করি। সমালোচনা চিন্তার বিকাশ ঘটায়, ভুল ধরিয়ে দেয় এবং নিজের অবস্থানকে নতুন করে যাচাই করার সুযোগ তৈরি করে। তবে আমি কাউকে পূজা করতে পারি না—তার মানে এই নয় যে আমি কাউকে অশ্রদ্ধা করি। বরং ব্যক্তি হিসেবে যাঁদের আমি শ্রদ্ধা করি, তাঁদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা অন্তরের গভীরতা থেকেই আসে। অন্ধ আনুগত্য আর শ্রদ্ধা এক বিষয় নয়; শ্রদ্ধার সঙ্গে প্রশ্ন থাকতে পারে, মতপার্থক্য থাকতে পারে, এমনকি সমালোচনাও থাকতে পারে।

গত মার্চ মাস থেকে আমি বাংলা ভাষায় কিছু লেখা শুরু করেছি। বিষয়টি অনেকের কাছে হয়তো বিস্ময়ের কারণ হতে পারে। কারণ আমি মূলত চাঙমা ভাষায় লেখালেখি করি এবং দীর্ঘদিন ধরে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে কাজ করে আসছি। তাহলে হঠাৎ বাংলা ভাষায় কেন লিখছি, এর পেছনে অবশ্যই একটি কারণ রয়েছে। সেই কারণ এখনই বিস্তারিত বলতে চাই না। সময় হলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। আপাতত মূল আলোচনায় আসি।

আমি জানি, আমার লেখা অনেকের কাছে বিরক্তিকর মনে হতে পারে। তাঁদের কাছে আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাইছি। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁদের কাছে আমার একটি প্রশ্নও আছে, কেন আমি লিখছি, সেটিও কি একবার ভেবে দেখা যায় না?

দীর্ঘ বছর চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে আমি একটি বিষয় গভীরভাবে উপলব্ধি করেছি, অধিকার ছাড়া কোনো কাজই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। একটি জাতির ভাষা, সংস্কৃতি, সাহিত্য কিংবা বর্ণমালা যতই সমৃদ্ধ হোক, সেই জাতির নিজের অধিকার ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা না থাকলে তার অস্তিত্ব ক্রমশ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। অধিকারহীন জাতি অনেকটা পরগাছার মতো বেঁচে থাকে, নিজের শিকড় থাকলেও নিজের মাটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

এই উপলব্ধিই আমাকে শুধু ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে কাজ করার পাশাপাশি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করেছে।

আমাদের সমাজের দিকে তাকালে এখনো কিছু পুরোনো মানসিকতার অস্তিত্ব চোখে পড়ে। ব্যক্তিবাদ, আত্মীয়বাদ, গোত্র-গোষ্ঠীবাদ, এলাকাবাদ, এসবের সঙ্গে সবচেয়ে শক্তিশালী হয়ে আছে দলবাদ। দলীয় পরিচয় অনেক সময় ব্যক্তির চিন্তা, যোগ্যতা ও কাজের মূল্যায়নের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে কেউ কোনো কথা বললে তার বক্তব্যের সত্যতা, যুক্তি কিংবা প্রয়োজনীয়তা যাচাই না করেই তাকে সমালোচনা কিংবা আক্রমণের মুখোমুখি হতে হয়।

কখনো বক্তব্যে ত্রুটি না পেলে ব্যক্তির জন্মপরিচয়, পারিবারিক পরিচয়, সামাজিক অবস্থান কিংবা অতীত টেনে এনে আক্রমণ করা হয়। এটি কোনো সুস্থ সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। মতের বিরোধিতা যুক্তি দিয়ে হওয়া উচিত, ব্যক্তিকে আক্রমণ করে নয়।

আমি এই সংস্কৃতির বাইরে আসতে চাই। আমি চাই, আমাদের সমাজে মানুষকে তার দল, গোত্র, পরিবার কিংবা পরিচয় দিয়ে নয়, তার চিন্তা, কর্ম, যুক্তি ও অবদানের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হোক। মতের পার্থক্য থাকবে, সমালোচনা থাকবে, বিতর্ক থাকবে; কিন্তু সেই বিতর্ক যেন যুক্তিনির্ভর ও সভ্য হয়।

আমাদের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত এখানেই, আমরা এখনো অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি ও মতকে আলাদা করতে শিখিনি। একজন মানুষকে শ্রদ্ধা করা মানেই তার প্রতিটি বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। আবার কারও বক্তব্যের সমালোচনা করা মানেই তাকে অসম্মান করা নয়। এই সহজ সত্যটি আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া জরুরি।

এই জায়গা থেকেই আমি মনে করি, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুক্তির কোন বিষয় সঠিক, কোন বিষয় অসম্পূর্ণ, কোন বিষয় নিয়ে সংশোধন বা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন আছে, এসব নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু চুক্তির বাস্তবায়নের প্রশ্নকে পাশ কাটিয়ে গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অধিকারগত সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।

চুক্তির বাস্তবায়ন কেবল প্রশাসনিক কোনো বিষয় নয়; এটি আমাদের সমাজের চিন্তা ও চেতনার বিকাশের সঙ্গেও সম্পর্কিত। অধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও স্বাধীনভাবে ভাবতে পারে। তখন ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, সাহিত্য, অর্থনীতি, আত্মপরিচয় এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, সবকিছু নিয়েই আরও গভীরভাবে চিন্তা করার সুযোগ তৈরি হয়।

আমার কাছে তাই ভাষার অধিকার এবং বৃহত্তর রাজনৈতিক অধিকার পরস্পর বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা রক্ষার সংগ্রাম যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সেই ভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয় অধিকার ও পরিবেশ প্রতিষ্ঠাও গুরুত্বপূর্ণ।

আমি কারও পূজা করতে চাই না, কারও অন্ধ অনুসারীও হতে চাই না। আমি চাই প্রশ্ন করতে, জানতে, ভুল হলে ভুল স্বীকার করতে এবং যুক্তি দিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে। আমার বক্তব্য ভুল হলে সমালোচনা করুন; যুক্তি দিয়ে ভুল প্রমাণ করুন। কিন্তু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, চলুন আমরা চিন্তার সঙ্গে চিন্তার, যুক্তির সঙ্গে যুক্তির এবং ধারণার সঙ্গে ধারণার মোকাবিলা করি।

কারণ একটি জাতির ভবিষ্যৎ কেবল আবেগ দিয়ে নির্মিত হয় না; তা নির্মিত হয় জ্ঞান, অধিকার, আত্মসমালোচনা, যুক্তিবোধ ও দূরদর্শী চিন্তার ভিত্তির ওপর।

আজ আমি বাংলা ভাষায় লিখছি, এরও একটি উদ্দেশ্য আছে। সেই উদ্দেশ্য হয়তো আজ সবার কাছে স্পষ্ট নয়। সময়ই তার উত্তর দেবে।

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমি কারও বিরুদ্ধে লিখতে চাই না; আমি লিখতে চাই আমাদের নিজেদের নিয়ে। আমাদের সীমাবদ্ধতা নিয়ে, আমাদের সম্ভাবনা নিয়ে, আমাদের অধিকার নিয়ে এবং আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে।

কারণ অধিকারহীন অবস্থায় শুধু টিকে থাকা নয়, নিজের ভবিষ্যৎ নিজের মতো করে নির্মাণ করাই একটি জাতির প্রকৃত লক্ষ্য হওয়া উচিত।

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা