রবিবার, ১৬ আগস্ট, ২০২৬

মাদ্রী দেবী চাঙমা: নির্বাসন থেকে সংসার, সংগ্রাম থেকে কবিতার পথে - ইনজেব চাঙমা

মাদ্রী দেবী চাঙমা, পাহাড়ের মাটি, মানুষের জীবন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শরণার্থী জীবনের স্মৃতি এবং সংসারের নানামুখী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এক নারী। তাঁর জীবন যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসেরই একটি ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি; যেখানে ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে মিশে আছে স্বদেশ হারানোর বেদনা, ফিরে আসার আনন্দ, মানুষের জন্য কাজ করার আকাঙ্ক্ষা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও নিজের স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখার নিরন্তর চেষ্টা।

মাদ্রী দেবী চাঙমা ১৬ জুলাই ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে পানছড়ির ধুদুকছড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা প্রতিপদ চাঙমা এবং মাতা মিনতি বালা চাঙমা। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ। তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির সময়ের ভেতর দিয়ে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বিরাজমান রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতির অভিঘাত তাঁদের পরিবারকেও বহন করতে হয়েছে। অন্য অনেক পাহাড়ি পরিবারের মতো তাঁদের পরিবারও একসময় নিজভূমি ছেড়ে ভারতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। শরণার্থী জীবনের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, স্বদেশ থেকে বিচ্ছিন্নতার বেদনা এবং ফিরে আসার আকাঙ্ক্ষা তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতার সঙ্গে গভীরভাবে মিশে আছে।

পরবর্তীতে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর তাঁরা আবার স্বদেশে ফিরে আসেন। কিন্তু স্বদেশে প্রত্যাবর্তন মানেই সব সংকটের অবসান নয়। ফিরে এসে নতুন করে জীবন গড়ে তোলার সংগ্রামও কম কঠিন ছিল না। সেই বাস্তবতার মধ্যেই মাদ্রী দেবী বড় হয়ে ওঠেন এবং শিক্ষাজীবন শেষে নিজের জীবনের জন্য বেছে নেন একটি ভিন্ন পথ।

এসএসসি পাস করার পর তিনি সক্রিয়ভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। মাতৃভূমি ও মানুষের প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা তাঁকে রাজনীতির পথে নিয়ে যায়। তিনি হিল উইমেন্স ফেডারেশনে যোগ দিয়ে জীবনের মূল্যবান সময়ের একটি বড় অংশ মানুষের অধিকার ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে উৎসর্গ করেন। তাঁর কাছে রাজনীতি ছিল শুধু একটি সংগঠনের পরিচয় নয়; ছিল মানুষের মুক্তির জন্য কাজ করার এবং নিজের সমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার একটি পথ।

তখন তাঁর মনে ছিল দৃঢ় এক প্রত্যয়, জীবনে হয়তো সংসার করবেন না; রাজনীতির সঙ্গেই সারাজীবন যুক্ত থাকবেন। ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে বৃহত্তর সামাজিক স্বপ্নই ছিল তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু জীবন কখনো মানুষের পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোয় না। সময়ের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক বাস্তবতা তাঁর মনে অনাগ্রহ ও হতাশা তৈরি করে। ধীরে ধীরে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। রাজনৈতিক জীবন থেকে সরে এলেও মানুষের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষা তাঁর ভেতর থেকে হারিয়ে যায়নি; শুধু তার প্রকাশের পথ বদলে যায়।

২০২০ সালে তাঁর জীবনে আসে নতুন অধ্যায়। তিনি ইনজেব চাঙমাকে বিয়ে করেন।  যে নারী একসময় ভেবেছিলেন, তাঁর জীবনে সংসারের কোনো অধ্যায় থাকবে না, তিনিই শেষ পর্যন্ত সংসার জীবনের বাস্তবতায় প্রবেশ করেন। জীবনের এই পরিবর্তন তাঁকে নতুন দায়িত্ব, নতুন সম্পর্ক এবং নতুন স্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

সংসারের পাশাপাশি মাদ্রী দেবী চাঙমা চাঙমা ভাষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত হন। প্রায় দুই বছর তিনি চাঙমা ভাষার কাজে সময় দেন। মুকুন্দ নীলিমা ভোকেশনাল ইনস্টিটিউটে প্রায় ছয় মাস স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেন। মাতৃভাষার জন্য তাঁর এই শ্রম ছিল নিজের শেকড়ের সঙ্গে নতুন করে যুক্ত হওয়ার এক আন্তরিক প্রয়াস।

পরে জধা চাঙমা জন্ম নেওয়ার পর তাঁর জীবনের অগ্রাধিকার আরও বদলে যায়। মাতৃত্বের দায়িত্ব, সংসারের প্রয়োজন এবং জীবিকার বাস্তবতা তাঁকে আগের মতো সময় দেওয়ার সুযোগ দেয়নি। তাঁদের সংসার খুব একটা স্বচ্ছল নয়। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে তিনি টুকটাক সবজি ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন। প্রতিদিনের এই শ্রম তাঁর জীবনের আরেকটি নীরব সংগ্রামের নাম। তবু জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাঁর ভেতরের কবিকে থামাতে পারেনি।

সংসারের ব্যস্ততা, অভাব, সন্তানদের দায়িত্ব এবং জীবিকার সংগ্রামের মধ্যেও তিনি কবিতা ও গল্প লিখে চলেছেন। তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে ‘চাদি’ ম্যাগাজিনে। একই সঙ্গে তাঁর লেখা স্থান পেয়েছে যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘আবেদি’-তে, যা Kok Creativities থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

তাঁর সাহিত্যচর্চা যেন জীবনের অন্য এক জানালা। দিনের আলোয় তিনি সংসারের হিসাব মেলান, জীবিকার জন্য ছুটে চলেন, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেন; আর শব্দের কাছে ফিরে গিয়ে নিজের অন্তর্লোককে প্রকাশ করেন। যে বেদনা মুখে বলা যায় না, যে স্মৃতি বুকের গভীরে থেকে যায়, যে স্বপ্ন বাস্তবতার চাপে বারবার থমকে যায়, সেগুলোই হয়তো তাঁর কবিতার ভাষা হয়ে ওঠে।

তাঁর সংসারে রয়েছে সন্তানদের ভবিষ্যৎ ঘিরে নানা স্বপ্ন। কালজয়ী চাঙমা তাঁদের ঘরের এক প্রজন্মের প্রতিনিধি। তিনি কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।  আর আর্য্য ঋদ্ধি মানব জ্যোতি চাঙমা বর্তমানে নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। সন্তানদের ঘিরে তাঁর স্বপ্নই আজ জীবনের অন্যতম বড় আশ্রয়।

মাদ্রী দেবী চাঙমার জীবন তাই এক সরল জীবনী নয়; এটি বহু বাঁক পেরিয়ে চলা এক নারীর জীবনকথা। শরণার্থী জীবনের স্মৃতি থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন, শিক্ষাজীবন শেষে রাজনীতিতে প্রবেশ, হিল উইমেন্স ফেডারেশনের সঙ্গে পথচলা, রাজনীতি থেকে সরে আসা, সংসার গড়া, মাতৃভাষার কাজে স্বেচ্ছাশ্রম, জীবিকার জন্য সবজি ব্যবসা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও কবিতা ও গল্প লেখা, সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবন এক বহুমাত্রিক সংগ্রামের কাহিনি।

তাঁর জীবনের সৌন্দর্য হয়তো এখানেই, সময় তাঁকে বারবার পথ বদলাতে বাধ্য করেছে, কিন্তু থামিয়ে দিতে পারেনি। রাজনৈতিক স্বপ্ন একসময় স্তিমিত হয়েছে, সংসারের দায়িত্ব বেড়েছে, জীবিকার সংগ্রাম কঠিন হয়েছে; তবু তাঁর ভেতরের সৃষ্টিশীল মানুষটি বেঁচে আছে।

পাহাড়ের নারীদের অনেক গল্প ইতিহাসের বড় বইয়ে লেখা হয় না। তাঁদের গল্প লেখা থাকে সংসারের অন্দরমহলে, বাজারের ঝুড়িতে, সন্তানের স্কুলব্যাগে, মাতৃভাষার অক্ষরে কিংবা একটি কবিতার পাতায়। মাদ্রী দেবী চাঙমার জীবনও তেমনই এক নীরব ইতিহাস।

তিনি হয়তো আজ আর রাজনীতির মঞ্চে দাঁড়ান না, কিন্তু তাঁর জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম তাঁকে দিয়েছে অন্য এক ভাষা, সাহিত্যের ভাষা। সেই ভাষায় তিনি নিজের দেখা পৃথিবী, নিজের বেদনা, স্বপ্ন, ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতাকে ধরে রাখছেন।

জীবন তাঁকে সহজ পথ দেয়নি। কিন্তু কঠিন পথের মধ্য দিয়েই কিছু মানুষ গভীর হয়ে ওঠেন। তাঁদের নীরবতার ভেতরে থাকে ইতিহাস, আর কয়েকটি কবিতার পঙ্‌ক্তির মধ্যে লুকিয়ে থাকে একটি সম্পূর্ণ জীবনের গল্প। মাদ্রী দেবী চাঙমা সেই জীবন্ত গল্পেরই একজন নীরব কথক।

মাদ্রী দেবী চাঙমা: নির্বাসন থেকে সংসার, সংগ্রাম থেকে কবিতার পথে - ইনজেব চাঙমা

মাদ্রী দেবী চাঙমা, পাহাড়ের মাটি, মানুষের জীবন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, শরণার্থী জীবনের স্মৃতি এবং সংসারের নানামুখী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা এ...