কিছু মানুষ পেশায় শিক্ষক, অথচ তাঁদের প্রকৃত পরিচয় ছড়িয়ে থাকে শ্রেণিকক্ষের সীমানা পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে। কেউ কেউ আবার শব্দকে শুধু ভাষার বাহন হিসেবে ব্যবহার করেন না, শব্দের ভেতর দিয়ে তাঁরা একটি জনপদের জীবন, মানুষের স্বপ্ন, বেদনা, প্রেম, প্রকৃতি ও অস্তিত্বকে ধরে রাখেন। বিপম চাকমা তেমনই একজন মানুষ। পেশাগত পরিচয়ে তিনি শিক্ষক; কিন্তু সৃষ্টিশীল পরিচয়ে একজন কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও সাহিত্যকর্মী। বিশেষত চাঙমা ভাষায় ছোটগল্প রচনার ক্ষেত্রে তিনি একজন পথিকৃৎ। তাঁর ‘আজবঅ সাপ’ চাঙমা ভাষার প্রথম গল্পগ্রন্থ হিসেবে চাঙমা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি স্মরণীয় মাইলফলক।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গল্পে যেমন মানুষের অন্তর্জীবন, প্রকৃতি, সমাজ ও সম্পর্কের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলো শিল্পের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে, বিপম চাকমার গল্পেও তেমনি ধরা পড়ে তাঁর নিজস্ব জনপদের মানুষ ও জীবনের নানা রং। সেই কারণেই অনেকে তাঁকে ভালোবেসে ‘চাঙমা রবীন্দ্রনাথ’ বলে অভিহিত করেন। এটি নিছক একটি উপাধি নয়; বরং তাঁর সাহিত্যিক স্বাতন্ত্র্য ও গল্প বলার ক্ষমতার প্রতি পাঠকের এক ধরনের শ্রদ্ধার প্রকাশ।
বিপম চাকমার জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৭৮ খ্রিষ্টাব্দে রাঙ্গামাটি জেলার কাউখালী উপজেলার পোয়াপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতা আলোক বিকাশ চাকমা ছিলেন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং মাতা সুনীতি সুধা চাকমা ছিলেন গৃহিণী। দুই ভাই ও তিন বোনের মধ্যে তিনি সর্বকনিষ্ঠ।
তাঁর শৈশবের আকাশ অবশ্য খুব বেশি নির্মল ছিল না। ১৯৮০ সালের কলমপতি গণহত্যার অভিঘাতে তাঁদের পরিবারকে উদ্বাস্তু হয়ে আশ্রয় নিতে হয় নানার বাড়িতে, নানিয়ারচর উপজেলার দক্ষিণ এ্যাইত মারা বা হাতিমারা গ্রামে। শৈশবেই ঘর হারানোর সেই অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনকে স্পর্শ করে যায় গভীরভাবে। পরে তাঁর সাহিত্যকর্মে পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের জীবন, বাস্তবতা ও বেদনার যে অনুরণন শোনা যায়, তার পেছনে এই জীবনের অভিজ্ঞতারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
হাতিমারা গ্রামেই ধনপাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা। ১৯৮৪ সালে নিজ গ্রামে ফিরে এসে পোয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু জীবন তাঁকে বারবার নতুন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।
১৯৮৭ সালে বাবার কর্মস্থল বেতবুনিয়ায় চলে যান। সেখানেই আসে জীবনের আরেক গভীর আঘাত, মায়ের মৃত্যু। মাতৃহারা সেই সময়ের বেদনায় প্রায় এক বছর তাঁর বিদ্যালয়জীবন থমকে যায়। তবু জীবন থেমে থাকে না। আবারও তিনি ফিরে আসেন শিক্ষার পথে।
১৯৮৮ সালে বেতবুনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। মেধা ও অধ্যবসায়ের সঙ্গে এগিয়ে গিয়ে ১৯৯৩ সালে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বিভাগে এসএসসি এবং ১৯৯৫ সালে রাউজান কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। এরপর তাঁর গন্তব্য চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে প্রবেশ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। বিজ্ঞানের ছাত্র থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শিক্ষার্থী হয়ে ওঠা যেন তাঁর ভেতরে সুপ্ত থাকা সাহিত্যিক সত্তার দরজা খুলে দেয়।
১৯৯৮ সালের পরীক্ষার্থী হিসেবে তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন; পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০০১ সালে। পরবর্তীতে ১৯৯৯ সালের পরীক্ষার্থী হিসেবে দ্বিতীয় শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন; সেই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় ২০০৩ সালে।
শিক্ষার পাশাপাশি গবেষণার জগতেও তাঁর পদচারণা ঘটে। ‘রূপতত্ত্ব: চাকমা সর্বনামের রূপ বিশ্লেষণ’ শিরোনামের গবেষণাকর্মে তিনি চাঙমা ভাষার ব্যাকরণ ও ভাষাতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য অনুসন্ধান করেন। তাঁর গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও ভাষা গবেষক ড. মনিরুজ্জামান। ভাষা যে শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, একটি জাতির স্মৃতি ও অস্তিত্বেরও ধারক, তাঁর গবেষণা ও সাহিত্যচর্চায় সেই উপলব্ধির প্রতিফলন স্পষ্ট।
২০০৪ সালে তিনি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে যোগ দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। পরের বছর ২৬তম বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। কিন্তু সরকারি চাকরির পথে তখনও ছিল অনিশ্চয়তা। ২০০৬ সালের মার্চে প্রকাশিত ২৬তম বিসিএসের নিয়োগ গেজেটের চূড়ান্ত তালিকা থেকে তিনি বাদ পড়েন।
অবশেষে ২০০৬ সালের ডিসেম্বরে সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। ২০০৮ সালে ২৬তম বিসিএসের শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা হিসেবে প্রভাষক পদে নিয়োগ লাভ করেন। শিক্ষকতা তাঁর কাছে কেবল একটি পেশা নয়; জ্ঞান ও প্রজন্মের মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরির এক দায়িত্বও বটে। বর্তমানে তিনি বান্দরবান সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন।
ব্যক্তিজীবনেও তিনি একটি শিক্ষিত ও সাহিত্যপ্রবণ পরিবারের অংশ। তাঁর সহধর্মিণী শার্লিন চাকমা সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক। তাঁদের দুই সন্তান, তজিম চাকমা ও রিঝুম চাকমা।
ছাত্রজীবন থেকেই বিপম চাকমার লেখালেখির শুরু। সময়ের সঙ্গে সেই লেখালেখি পরিণত হয়েছে দীর্ঘ সাহিত্যসাধনায়। চাঙমা ও বাংলা দুই ভাষাতেই তিনি লিখেছেন। ছড়া, কবিতা, গান, গল্প, প্রবন্ধ ও সাহিত্য-সমালোচনা—সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ।
তবে তাঁর সাহিত্যের মূল সুরটি খুঁজে পাওয়া যায় পার্বত্য চট্টগ্রামের জীবন ও বাস্তবতার ভেতরে। পাহাড়ের মানুষ, তাদের স্বপ্ন ও দুঃখ, প্রকৃতি, সামাজিক টানাপোড়েন, স্মৃতি, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের প্রশ্ন তাঁর লেখার উপাদান হয়ে ওঠে।
তিনি পাহাড়কে দূর থেকে দেখেননি। পাহাড় তাঁর কাছে কেবল ভূগোল নয়; পাহাড় তাঁর জীবনের অংশ, স্মৃতির অংশ, মানুষের অংশ। তাই তাঁর গল্পে পাহাড়ের প্রকৃতি যেমন কথা বলে, তেমনি কথা বলে পাহাড়ের মানুষও।
২০১৭ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর বাংলা গল্পগ্রন্থ ‘অজগর’। গ্রন্থটি পাঠকমহলে পরিচিতি লাভ করে এবং ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার বাংলা বিভাগের পাঠ্যতালিকায় স্থান পায়। ২০২২ সাল থেকে গ্রন্থটি মূলপাঠ্য হিসেবে পড়ানো হচ্ছে, একজন লেখকের জন্য এটি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য স্বীকৃতি।এর পরের বছর, ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর উপন্যাস ‘গ্রহণ লাগা ভোর’। জীবনের অন্ধকার ও আলোর সন্ধিক্ষণ, মানুষের অস্তিত্ব এবং সমাজবাস্তবতার নানা অনুষঙ্গ তাঁর উপন্যাসে শিল্পিত রূপ পেয়েছে।
কিন্তু চাঙমা সাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ আসে ২০১৯ সালে। প্রকাশিত হয় ‘আজবঅ সাপ’—চাঙমা ভাষায় রচিত প্রথম গল্পগ্রন্থ। একটি ভাষার সাহিত্যভাণ্ডারে প্রথম গল্পগ্রন্থের আবির্ভাব কেবল একটি বই প্রকাশের ঘটনা নয়; এটি একটি নতুন সাহিত্যধারার জন্ম।
‘আজবঅ সাপ’-এর মধ্য দিয়ে চাঙমা ভাষার গল্প সাহিত্যিক পরিসরে নতুন পরিচয় পায়। বিপম চাকমা প্রমাণ করেন, মাতৃভাষাও মানুষের জটিল অনুভূতি, জীবনসংগ্রাম, হাসি-কান্না ও সমাজবাস্তবতার পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যিক প্রকাশ ঘটাতে পারে।
বিপম চাকমার সাহিত্যিক ও গবেষণামূলক কর্মকাণ্ড পাহাড়ের সীমানায় আবদ্ধ থাকেনি। ২০২২ সালের ১২–১৪ নভেম্বর ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ‘Chakma Language, Scripts & Culture’ বিষয়ে তিনি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
একই বছরের ডিসেম্বরে রাঙ্গামাটি জেলা সাহিত্য সম্মেলনে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। পরবর্তীতে সেই প্রবন্ধ ২০২৩ সালে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত হয়।
২০২৩ সালের ৫–৮ জানুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন Dhaka Lit Fest-এ তিনি আলোচক হিসেবে অংশ নেন। একই বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত বান্দরবান জেলা সাহিত্য সম্মেলনেও তিনি প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন।
ছাত্রজীবন থেকে আজ পর্যন্ত তিনি অসংখ্য সংকলন, লিটলম্যাগ ও সাহিত্যপত্রের সম্পাদনার দায়িত্ব পালন করেছেন। জাতীয় দৈনিকগুলোতেও নিয়মিত তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়ে আসছে। তাঁর বহু গল্প ও প্রবন্ধ এখনও গ্রন্থের মলাটে বন্দি হওয়ার অপেক্ষায়।
বিপম চাকমার সাহিত্যজীবনকে কেবল একজন ব্যক্তির সৃষ্টিশীলতার ইতিহাস হিসেবে দেখলে তাঁর গুরুত্বকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা যাবে না। তাঁর লেখার সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ভাষার ভবিষ্যৎ, একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতি এবং একটি জনপদের জীবনকথা।
বাংলা ভাষায় তিনি যখন পাহাড়ের গল্প বলেন, তখন বৃহত্তর পাঠকসমাজ পাহাড়ের মানুষের জীবনকে নতুন চোখে দেখার সুযোগ পায়। আর যখন চাঙমা ভাষায় গল্প লেখেন, তখন তিনি তাঁর নিজের মানুষের কাছে তাঁদের ভাষাতেই তাঁদের জীবনকে ফিরিয়ে দেন। এই দ্বিমুখী সাহিত্যসেতুই তাঁর লেখকসত্তার সবচেয়ে বড় শক্তি।
একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষিত শিক্ষক, অন্যদিকে মাতৃভাষার নিবেদিত কথাশিল্পী, এই দুই পরিচয় তাঁর মধ্যে এসে মিলেছে এক জায়গায়: মানুষ ও ভাষার প্রতি দায়বদ্ধতায়।
জীবনের শুরুতে তিনি দেখেছেন ঘরহারা মানুষের মিছিল, দেখেছেন শৈশবের অনিশ্চয়তা, হারিয়েছেন মাকে; তারপর শিক্ষা তাঁকে দিয়েছে আলোর পথ, শিক্ষকতা দিয়েছে মানুষ গড়ার সুযোগ, আর সাহিত্য দিয়েছে নিজের দেখা পৃথিবীকে শব্দে ধরে রাখার শক্তি।
তাঁর কলম তাই শুধু গল্প লেখে না, সময়কে সংরক্ষণ করে। তাঁর চরিত্রগুলো শুধু কাগজের মানুষ নয়; তারা পাহাড়ের জনপদ থেকে উঠে আসা জীবন্ত মানুষ। তাঁদের হাসি আছে, কান্না আছে, স্বপ্ন আছে, পরাজয় আছে, আবার উঠে দাঁড়ানোর আকাঙ্ক্ষাও আছে।
চাঙমা ভাষায় প্রথম গল্পগ্রন্থ রচনা করে বিপম চাকমা যে দরজা খুলেছেন, সেই দরজা দিয়ে একদিন আরও অনেক নতুন কথাশিল্পী প্রবেশ করবেন, এটাই তাঁর সাহিত্যিক উত্তরাধিকারের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা।
তাঁর পরিচয় তাই কেবল ‘শিক্ষক’ নয়, কেবল ‘লেখক’ও নয়। তিনি একাধারে শিক্ষক, গবেষক, কথাশিল্পী এবং চাঙমা ভাষার সাহিত্যভুবনের এক নির্মাণশিল্পী। তাঁর কলমে পাহাড় কথা বলে, মানুষের জীবন কথা বলে, আর একটি ভাষা তার নিজের সাহিত্যিক অস্তিত্বের সন্ধান পায়।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন