রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬

পাহাড়ের বুক থেকে ভাষার অক্ষরে: শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যযাত্রা - ইনজেব চাঙমা

পাহাড় কখনো শুধু পাহাড় নয়। তার গায়ে লেগে থাকে মেঘের ছায়া, বৃষ্টির গন্ধ, ঝরনার গান আর অরণ্যের নীরবতা। তার ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকে মানুষের হাসি-কান্না, প্রেম-বিরহ, বেঁচে থাকার সংগ্রাম, হারিয়ে যাওয়া দিনের স্মৃতি এবং ভবিষ্যৎকে নিয়ে একরাশ স্বপ্ন। পাহাড়ের মানুষ তাই প্রকৃতির সঙ্গে শুধু বসবাস করে না—প্রকৃতির সঙ্গে তার আত্মারও এক গভীর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

সেই পাহাড়ি জীবন, মানুষের অনুভব, মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের গল্পকে শব্দের শরীরে ধারণ করে চলেছেন শান্তি জীবন চাকমা। শিক্ষকতা তাঁর পেশা, কিন্তু সাহিত্য তাঁর অন্তর্গত জীবন। ভাষা ও বর্ণমালা তাঁর কাছে শুধু লেখার উপকরণ নয়; এগুলো তাঁর অস্তিত্বের শিকড়। আর সেই শিকড়কে আঁকড়ে ধরেই তিনি এগিয়ে চলেছেন একজন শিক্ষক, কবি, সাহিত্যকর্মী, সম্পাদক ও ভাষা-সংস্কৃতির নিবেদিত কর্মী হিসেবে।

তাঁর সাহিত্যযাত্রা তাই কেবল নিজের জন্য লেখার গল্প নয়; এটি একটি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার, একটি সংস্কৃতির স্মৃতি ধরে রাখার এবং আগামী প্রজন্মকে নিজের পরিচয়ের কাছে ফিরিয়ে আনার এক নীরব অথচ গভীর প্রয়াস।

শান্তি জীবন চাকমার ডাকনাম ধনহ/মরদ চ। ১৯৯২ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাঙামাটি জেলার সাজেকের তালছড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা যতিন বিকাশ চাকমা, মাতা স্নেহপদি চাকমা। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়; তাঁর বোন সাধনা চাকমা।

সাজেকের পাহাড়, অরণ্য, ঝরনা, মেঘ আর মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপন তাঁর শৈশবকে ঘিরে রেখেছিল। প্রকৃতির সেই নিবিড় সান্নিধ্য হয়তো তখন তাঁকে কোনো সাহিত্যিক স্বপ্ন দেখায়নি; কিন্তু অজান্তেই তা তাঁর ভেতরে বুনে দিয়েছিল অনুভবের এক গভীর বীজ।

পাহাড়ের পথ, মানুষের মুখ, লোকজ জীবন, উৎসব, বিশ্বাস, ভাষা, সবকিছুই ধীরে ধীরে তাঁর স্মৃতির ভাণ্ডারে জমা হতে থাকে। পরবর্তীকালে সেই স্মৃতি ও অনুভবই তাঁর সাহিত্যিক সত্তার নানা রূপে ফিরে এসেছে।

তাঁর কাছে পাহাড় কোনো পোস্টকার্ডের দৃশ্য নয়। পাহাড় মানে মানুষ। পাহাড় মানে স্মৃতি। পাহাড় মানে নিজের শিকড়। আর সেই শিকড় থেকেই তাঁর শব্দের জন্ম।

শান্তি জীবন চাকমার শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় কেটেছে দিঘীনালা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে ২০০৯ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। পরে দিঘীনালা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি ও বি.এস.এস. ডিগ্রি অর্জন করেন।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁকে দিয়েছে জ্ঞানের ভিত্তি; কিন্তু পাহাড়ি সমাজ ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক দিয়েছে জীবনকে অন্য চোখে দেখার ক্ষমতা। বইয়ের শিক্ষা আর জীবনের শিক্ষা—এই দুইয়ের মিলনেই ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে তাঁর সাহিত্যিক মনন।

তাই তাঁর লেখায় কেবল কল্পনা নেই; আছে বাস্তব জীবনের স্পর্শ। আছে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, নিজের ভাষার প্রতি মমতা এবং নিজের সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ।

বর্তমানে শান্তি জীবন চাকমা তারাবনিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। তাঁর কাছে শিক্ষকতা নিছক জীবিকা নয়; এটি মানুষ গড়ার এক দায়িত্ব। শ্রেণিকক্ষের চার দেয়ালের মধ্যে তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান পৌঁছে দিতে চান না। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার অভ্যাস, সৃজনশীল চিন্তা এবং নিজের ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা তৈরি করাও তাঁর শিক্ষাদর্শনের অংশ।

তিনি বিশ্বাস করেন, একটি জাতির ভবিষ্যৎ শুধু পরীক্ষার ফলাফলে নির্ধারিত হয় না। ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় নতুন প্রজন্ম নিজের ভাষাকে কতটা ভালোবাসে, নিজের ইতিহাসকে কতটা জানে এবং নিজের সংস্কৃতিকে কতটা ধারণ করে, তার ওপরও। এই বিশ্বাসই তাঁকে শিক্ষকতার পাশাপাশি সাহিত্য ও ভাষা-সংস্কৃতির কর্মকাণ্ডে সক্রিয় রেখেছে।

শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যচর্চা বহুমাত্রিক। কবিতা তাঁর অন্যতম প্রধান আশ্রয়। কখনো প্রেম, কখনো প্রকৃতি, কখনো মানুষের অনুভূতি, কখনো সমাজ ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন, বিভিন্ন অনুভব তাঁর সৃষ্টির ভেতর জায়গা করে নিয়েছে। তাঁর সাহিত্যিক সৃষ্টির পরিমাণও বিস্ময়কর। বর্তমানে তাঁর অপ্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৪৫ টি। কবিতা, ছড়া, কাব্য, ছোটগল্প, রূপকথা, নাটক, নাটিকা, প্রবন্ধ, অণুকাব্য, শিশুতোষ সাহিত্য, বাগধারা, লোকগান, ধর্মীয় গাথা—সাহিত্যের নানা শাখায় ছড়িয়ে আছে তাঁর সৃষ্টির পরিসর।

একজন লেখকের জন্য এত বিপুল সংখ্যক পাণ্ডুলিপি শুধু সংখ্যার হিসাব নয়। এর পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর লেখার অভ্যাস, ভাবনার সঙ্গে লড়াই, শব্দ খোঁজা এবং নিজের ভেতরের কথাকে কাগজে ধরে রাখার নিরন্তর সাধনা। এইসব লেখা এখনো পাঠকের হাতে পৌঁছায়নি। তবু তারা তাঁর সাহিত্যিক জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে আছে।

শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যিক পরিচয়ে ‘পুগবেল’ ও ‘আবেদি’ দুটি যৌথ কাব্যগ্রন্থ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য কখনো একাকী পথচলা হলেও তার সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলোর একটি হলো সম্মিলিত সৃজন। একাধিক কবির অনুভূতি, জীবনবোধ ও কল্পনা যখন একই মলাটের নিচে এসে মিলিত হয়, তখন তৈরি হয় এক ভিন্নতর সাহিত্যিক পরিসর। ‘পুগবেল’ ও ‘আবেদি’ সেই সম্মিলিত সৃজনেরই পরিচায়ক। এই দুটি কাব্যগ্রন্থের মধ্য দিয়ে শান্তি জীবন চাকমার কবিসত্তা বৃহত্তর সাহিত্যিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। এখানে কবিতা শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতির ভাষা নয়; হয়ে উঠেছে সমষ্টিগত অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধেরও প্রকাশ।

একজন লেখকের কাছে ভাষা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন জাতিসত্তার মানুষের কাছে মাতৃভাষা তার চেয়েও বেশি কিছু, এটি অস্তিত্বের অংশ। শান্তি জীবন চাকমা চাকমা ভাষা ও বর্ণমালাকে সেই গভীর অনুভবের জায়গা থেকেই দেখেন। তাঁর কাছে ভাষা শুধু কথা বলার মাধ্যম নয়; এতে জমা থাকে পূর্বপুরুষের স্মৃতি, লোকজ জ্ঞান, সংস্কৃতি, বিশ্বাস, ইতিহাস ও আত্মপরিচয়।

এই দায়বোধ থেকেই তিনি চাকমা বর্ণমালা ও ভাষা শিক্ষা কোর্স পরিচালনা করছেন। পাঠচক্র পরিচালনার মাধ্যমেও শিশু-কিশোর ও তরুণদের বই পড়া, সাহিত্যচর্চা এবং মাতৃভাষার প্রতি আগ্রহী করে তোলার চেষ্টা করছেন। কারণ তিনি জানেন, একটি ভাষা শুধু অভিধানে বেঁচে থাকে না। ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের মুখে, শিশুর খাতায়, কবিতার পঙ্‌ক্তিতে, গল্পের চরিত্রে, গান ও নাটকে। ভাষা বেঁচে থাকে যখন একটি প্রজন্ম তা পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়।

নিজে লেখার পাশাপাশি অন্যদের লেখার জন্যও জায়গা তৈরি করছেন শান্তি জীবন চাকমা। বর্তমানে তিনি চাঙমা সাহিত্য একাডেমির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে তিনি চাঙমা সাহিত্য পত্রিকা ‘চাদি’ এবং চাঙমা সংবাদপত্র ‘হিলর পচ্জন’-এর সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করছেন।

সম্পাদনার কাজ নিঃশব্দ। একজন সম্পাদক অনেক সময় নিজের নামের চেয়ে অন্যের নামকে সামনে নিয়ে আসেন। নতুন লেখকের লেখা পড়েন, সংশোধন করেন, প্রকাশের সুযোগ করে দেন এবং একটি সাহিত্যিক পরিবেশ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন।

শান্তি জীবন চাকমার এই ভূমিকা তাঁর সাহিত্যিক দায়িত্ববোধের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। তিনি শুধু নিজের জন্য সাহিত্য করতে চান না; তিনি একটি সাহিত্যিক পরিসর তৈরি করতে চান।

শান্তি জীবন চাকমার সৃষ্টিশীলতার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক তাঁর বিপুল অপ্রকাশিত সাহিত্যসম্ভার। তাঁর মোট ৪৫টি অপ্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে।

এই তালিকায় যেমন আছে ‘মনর গভীন ছাবা’, ‘মৌন মুরৌর কুদুম’, ‘পাউজ্য শিঙোর’-এর মতো কাব্যগ্রন্থ, তেমনি আছে ‘চিদহ দজ্যার তুবোল ১ ও ২’ এবং ‘রিদয় সমুদ্রের ঢেউ ১ ও ২’-এর মতো রোমান্টিক কাব্যগ্রন্থ।

শিশুদের জন্য রয়েছে ‘কচি মনের দেশে’, ‘কজি চিদর চিদে’, ‘কজি চিদর দেঝত’ এবং ‘পাহাড় পরবতের হাসিখুশি’। রূপকথার জগতে রয়েছে ‘মা লক্ষী মার এযানা আর ধে যানা’, ‘সিংহলোই এতমামু’, ‘দিবুরি বনভিলেচ’, ‘আহরি উহরি চর বুদ্ধি’, ‘মূলসী কন্যে’ ও ‘পাঁচফুলী কন্যে’।

ছোটগল্পের ভাণ্ডারেও রয়েছে উল্লেখযোগ্য বৈচিত্র্য, ‘সোনা রঙর সে দিনুন’, ‘পাজারাত’, ‘ভাঙা আঝা’, ‘নাদান’, ‘ফাগুন্যু বুয়ের’, ‘আনধার’, ‘হারানো ফাগুন’, ‘অচিন দেঝর অচিন পরী’**সহ আরও বেশ কিছু রচনা।

নাটক ও নাটিকার ক্ষেত্রেও তাঁর সৃষ্টিশীলতা বিস্তৃত। ‘দিন জুরো’, ‘অত চিনিই’, ‘লাজাং দোরাং’, ‘যা ফালত তে পড়ে’, ‘এক ন জিনে নুদি লগে, এক ন জিনে ঊদি লগে’-এর পাশাপাশি রয়েছে একাধিক নাটিকা।

আরও আছে প্রবন্ধ, ভাষা ও বানানবিষয়ক লেখা, বাগধারা, ধাঁধা, ঘুমপাড়ানি গান এবং চাকমা ভাষায় পূজার গাথা। ‘চাঙমা বানান সুধোম’, ‘বানা আর ওলি গীত’, ‘আজু-নানু দাঘির গুণোর কধানি’ ও ‘বৌদ্ধ আরাধনা’ তাঁর ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণের আকাঙ্ক্ষাকে বিশেষভাবে তুলে ধরে।

এই ৪৫ টি গ্রন্থ যেন একটি মানুষের একার হাতে গড়ে ওঠা ছোট্ট সাহিত্য-জাদুঘর, যেখানে পাশাপাশি বাস করছে প্রেম, শৈশব, লোককথা, সমাজ, ধর্ম, ভাষা, নাটক, হাসি, বেদনা ও মানুষের গল্প।

শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যিক স্বপ্ন ব্যক্তিগত খ্যাতির সীমানায় আটকে নেই। তিনি প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক হতে চান, এটি তাঁর স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি যুক্ত করেছেন আরও বড় একটি স্বপ্ন। তিনি চান, চাকমা ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বর্ণমালা নতুন প্রজন্মের কাছে আরও সহজলভ্য ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠুক।

তিনি চান শিশুরা নিজের ভাষায় গল্প পড়ুক। তরুণেরা নিজের বর্ণমালা শিখুক। নতুন লেখকেরা মাতৃভাষায় লিখতে সাহস পাক। নিজেদের ইতিহাস ও সংস্কৃতিকে তারা যেন বোঝে এবং ভালোবাসে। এই স্বপ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে তাঁর সাহিত্যিক জীবনের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য। একজন মানুষ নিজের জন্য যতটা সৃষ্টি করেন, তার চেয়ে বড় হয়ে ওঠেন তখনই, যখন তাঁর সৃষ্টি অন্যদের পথ দেখায়।

খাগড়াছড়ির দিঘীনালা উপজেলার ৩নং কবাখালী ইউনিয়নের দুলুছড়ি গ্রামে বর্তমানে বসবাস করছেন শান্তি জীবন চাকমা। তাঁর পরিচয় একক কোনো শব্দে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তিনি শিক্ষক, তিনি কবি, তিনি সাহিত্যকর্মী, তিনি সম্পাদক, তিনি ভাষাকর্মী আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে তিনি একজন স্বপ্নবান মানুষ, যিনি বিশ্বাস করেন, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালোবেসেও পৃথিবীর বৃহত্তর জগতের সঙ্গে পথ চলা যায়।

পাহাড়ের ভেতর দিয়ে যে ঝরনা নেমে আসে, তার গন্তব্য হয়তো অনেক দূরে। পথে তাকে পাথর পেরোতে হয়, অরণ্য পেরোতে হয়, কখনো শুকিয়ে যাওয়ার ভয়ও থাকে। তবু সে বয়ে চলে। শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যযাত্রাও যেন তেমনই এক ঝরনার মতো। নীরবে, ধীরে, নিজের পথ তৈরি করে তিনি এগিয়ে চলেছেন। তাঁর হাতে জমেছে ৪৫টি অপ্রকাশিত গ্রন্থের বিপুল সম্ভার; তাঁর সাহিত্যিক যাত্রায় যুক্ত হয়েছে ‘পুগবেল’ ও ‘আবেদি’র মতো যৌথ কাব্যগ্রন্থ; আর তাঁর কর্মযজ্ঞ ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষকতা, সম্পাদনা, পাঠচক্র, ভাষা শিক্ষা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে।

হয়তো একদিন তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো বই হয়ে পাঠকের হাতে পৌঁছাবে। হয়তো কোনো পাহাড়ি গ্রামের শিশু সেই বই খুলে নিজের ভাষায় নিজের গল্প পড়বে। হয়তো কোনো তরুণ তাঁর লেখা পড়ে নিজের মাতৃভাষায় কবিতা লিখতে উৎসাহিত হবে।

সেদিন শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যসাধনা শুধু একজন লেখকের প্রকাশনা-সাফল্য হয়ে থাকবে না; তা হয়ে উঠবে একটি ভাষা, একটি সংস্কৃতি ও একটি প্রজন্মের আত্মপরিচয় রক্ষার ইতিহাসের অংশ।

কারণ শেষ পর্যন্ত সাহিত্য শুধু শব্দের সমষ্টি নয়। সাহিত্য হলো স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখার উপায়, হারিয়ে যেতে বসা কণ্ঠকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা, আর ভবিষ্যতের হাতে অতীতের একটি আলো তুলে দেওয়ার নাম।

শান্তি জীবন চাকমা সেই আলোই জ্বালিয়ে রাখার চেষ্টা করে চলেছেন, পাহাড়ের বুক থেকে, মাতৃভাষার অক্ষরে, মানুষের গল্পে।

 

৯ আগস্টের প্রশ্ন: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ও একটি অসমাপ্ত স্বাধীনতা - ইনজেব চাঙমা


আজ আগস্ট। বিশ্ব আদিবাসী দিবস।

পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজ আদিবাসী মানুষ তাদের অস্তিত্ব, অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ভূমির দাবিকে আবারো উচ্চারণ করছে। কোথাও বিক্ষোভ, কোথাও আলোচনা, কোথাও মিছিলআবার কোথাও নীরব স্মরণ। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের কাছে আগস্ট কেবল একটি দিবস নয়; এটি যেন বুকের ভেতর বহুদিন ধরে জমে থাকা প্রশ্নগুলোর দরজা খুলে দেওয়ার দিন।

প্রশ্ন-১: আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? প্রশ্ন- ২: স্বাধীনতার যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল, সেই স্বপ্নের আলো কি পাহাড়ের প্রতিটি ঘরে পৌঁছেছে? প্রশ্ন- ৩: রাষ্ট্রের চোখে পাহাড়ের মানুষ কি সমান মর্যাদার নাগরিক?

এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়। এগুলো বহু বছরের। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে চলা এক দীর্ঘ বেদনার নদীর মতো।

বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল শোষণ, বৈষম্য নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে। স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল, মানুষ তার নিজের পরিচয়ে বাঁচবে, নিজের ভাষায় কথা বলবে, নিজের ভূমিতে নিরাপদ থাকবে, রাষ্ট্র তাকে ভয় দেখাবে না; বরং রাষ্ট্র হবে তার অধিকার রক্ষার আশ্রয়। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের জীবনে সেই স্বপ্ন আজও কেন অসম্পূর্ণ?


এই
প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরের কাছে। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর বাংলাদেশ সরকার পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম জনগণের পক্ষে জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। পাহাড়ের মানুষের কাছে সেই দিনটি ছিল দীর্ঘ অন্ধকারের শেষে শান্তির একটি সম্ভাব্য ভোর। চুক্তির কাগজে শুধু কিছু ধারা লেখা ছিল না; সেখানে লেখা ছিল মানুষের ঘরে ফেরার স্বপ্ন, ভূমির নিরাপত্তা, রাজনৈতিক মর্যাদা এবং শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।

কিন্তু আজ ২০২৬। চুক্তির ২৯ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। সময় নদীর মতো বয়ে গেছে। প্রজন্ম বদলেছে। পাহাড়ের অনেক তরুণ জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে, আবার কেউ কেউ এই চুক্তির বাস্তবায়নের অপেক্ষা করতে করতেই পৃথিবী ছেড়ে গেছে। তবু প্রশ্নটি রয়ে গেছে।

চুক্তির কতটুকু মানুষের জীবনে পৌঁছেছে? সরকারের হিসাব একরকম। পাহাড়ের মানুষের অভিজ্ঞতা আরেক রকম। রাষ্ট্র বলে বাস্তবায়নের অনেক অগ্রগতি হয়েছে; পাহাড়ের মানুষ বলে, চুক্তির মৌলিক রাজনৈতিক ভূমি-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত।

এই দুই বক্তব্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের মানুষ. তার ঘর, তার ভূমি, তার জুম, তার স্মৃতি এবং তার ভবিষ্যৎ। ভূমি এখানে শুধু মাটি নয়। এক টুকরো পাহাড় মানে একটি পরিবারের ইতিহাস। একটি ঝিরি মানে শৈশবের স্মৃতি। একটি জুমের ঢাল মানে পূর্বপুরুষের ঘামের গন্ধ। একটি বন মানে জীবনের আশ্রয়। একটি নদী মানে প্রজন্মের গল্প।


তাই
যখন ভূমির প্রশ্ন ওঠে, তখন সেটি কেবল জমির মালিকানার প্রশ্ন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে অস্তিত্বের প্রশ্ন। একটি জাতির ভূমি যদি অনিরাপদ হয়, তার ভাষা কি নিরাপদ থাকে? ভাষা যদি হারিয়ে যায়, তার সংস্কৃতি কি টিকে থাকে? সংস্কৃতি যদি ক্ষয়ে যায়, তার জাতিসত্তা কি বেঁচে থাকে? আর জাতিসত্তা যদি ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে, তবে স্বাধীনতার অর্থই বা কী?

এই কারণেই আগস্ট পাহাড়ে অন্যরকম অর্থ বহন করে। আজ (৯ আগস্ট ২০২৬) রাঙামাটিতে উচ্চারিত হয়েছে একটি কঠিন, বিস্ফোরক অথচ গভীর রাজনৈতিক বার্তা— “পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাতিল করো, আমরাও প্রস্তুত।এই বাক্যকে শুধু একটি স্লোগান হিসেবে দেখলে এর ভেতরের দীর্ঘ ইতিহাসকে দেখা হবে না। একটি জনগোষ্ঠী যখন এমন কথা উচ্চারণ করে, তখন তার পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমান, অবিশ্বাস, ক্ষোভ এবং রাষ্ট্রের কাছে বারবার প্রশ্ন রেখে উত্তর না পাওয়ার যন্ত্রণা।


চুক্তি
যদি রাষ্ট্রের কাছে মূল্যহীন হয়, তবে তা বাতিলের প্রশ্ন উঠতেই পারে। আর যদি চুক্তি রাষ্ট্রের কাছে শান্তির দলিল হয়, তবে তার পূর্ণ বাস্তবায়নে এত দীর্ঘসূত্রতা কেন? দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ চুক্তি শুধু কাগজে লেখা অক্ষর নয়। চুক্তি হলো বিশ্বাস। আর বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে শুধু নতুন একটি কাগজে স্বাক্ষর করলেই তা ফিরে আসে না। এই কারণেই ২০২৫ সালের ডিসেম্বর খাগড়াছড়িতেও এমএন লারমা গ্রুপের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিমল কান্তি চাঙমার কণ্ঠে শোনা গিয়েছিল কঠিন উচ্চারণ, “পার্বত্য চুক্তি বাতিল করে দেখো।

চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে, এটাই শান্তির পথ। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে। আঞ্চলিক পরিষদ জেলা পরিষদকে কার্যকর করতে হবে। পাহাড়ের মানুষের রাজনৈতিক প্রশাসনিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি পরিচয়ের নিরাপত্তা দিতে হবে। সর্বোপরি, মানুষের মনে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে যে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নয়, রাষ্ট্র তারও।


তাই
আগস্টের এই দিনে আমাদের আত্মজিজ্ঞাসা বেশি প্রয়োজন। আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? স্বাধীনতার এত বছর পরও কেন ৫০ টি জনগোষ্ঠীকে (সরকারের হিসাব)  তার অস্তিত্বের নিরাপত্তার প্রশ্ন তুলতে হয়? কেন চুক্তির বাস্তবায়ন আজও রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয়? কেন ভূমির প্রশ্নে পাহাড়ের মানুষের মনে এত অনিশ্চয়তা? কেন তাদের ভাষা সংস্কৃতি রক্ষার জন্য তাদেরই বারবার রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়তে হয়?


এসব
প্রশ্নের উত্তর শুধু পাহাড়ের মানুষকে নয়রাষ্ট্রকেও দিতে হবে। কারণ পাহাড় বাংলাদেশের বাইরে নয়। পাহাড়ের মানুষও বাংলাদেশের বাইরে নয়। চামড়া, ভাষা, বর্ণমালা ও সংস্কৃতি ঐতিহ্য আলাদা হতে পারে কিন্তু তাদের পতাকাও লাল সবুজ। এ লাল সবুজের জন্য তারাও রক্ত দিলো, সম্ভ্রম হারিয়ে ছিল।  তাই তাদের অধিকার রক্ষা করা কোনো বিশেষ অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন।

আজ আগস্ট তাই কেবল আদিবাসী দিবস নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্রেরও এক আয়না। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই? একটি উদার, গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী বাংলাদেশ, যেখানে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন জাতিসত্তা পাশাপাশি বেঁচে থাকবে? নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সংখ্যার জোরে কোনো পরিচয়কে ধীরে ধীরে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হবে?

সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কারণ ইতিহাস কাউকে চিরকাল অপেক্ষা করায় না। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বর যে চুক্তি পাহাড়ে শান্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আজ সেই চুক্তি রাষ্ট্রের সামনে আবারও একটি আয়না তুলে ধরেছে। চুক্তি বাস্তবায়ন করো অথবা ব্যাখ্যা দাও, কেন করছ না। আর যদি চুক্তি সত্যিই অকার্যকর মনে হয়, তবে সাহস করে জনগণের সামনে সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করো।

আজ পাহাড় তাই শুধু অধিকার চাইছে না; পাহাড় তার সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতির মর্যাদা চাইছে। আজ আগস্ট পাহাড়ের বাতাসে তাই একটিই প্রশ্ন ভাসছে, স্বাধীনতার যে স্বপ্নে বাংলাদেশ জন্মেছিল, সেই স্বাধীনতার আলো কি পাহাড়ের মানুষের ঘরেও সমানভাবে পৌঁছাবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আজকের জন্য নয়। এই উত্তর নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশের ইতিহাস।

 

 

পাহাড়ের বুক থেকে ভাষার অক্ষরে: শান্তি জীবন চাকমার সাহিত্যযাত্রা - ইনজেব চাঙমা

পাহাড় কখনো শুধু পাহাড় নয়। তার গায়ে লেগে থাকে মেঘের ছায়া, বৃষ্টির গন্ধ, ঝরনার গান আর অরণ্যের নীরবতা। তার ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকে মানুষের হাসি-কা...