বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬

ইতিহাসকে কি রাজনৈতিক সুবিধার জন্য অস্বীকার করা যায়? -ইনজেব চাঙমা

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সাম্প্রতিক বক্তব্য- বাংলাদেশে কোনো ‘আদিবাসী’ গোষ্ঠী নেই, সবাই বাংলাদেশের অধিবাসী- নতুন করে একটি পুরোনো প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।

প্রশ্নটি হলো- একটি শব্দের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা পরিবর্তন করলেই কি সেই শব্দের সঙ্গে যুক্ত মানুষের ইতিহাস, আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বও মুছে ফেলা যায়?
আরও বড় প্রশ্ন- একই রাজনৈতিক ধারার নেতৃত্বের অতীত বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান বক্তব্যের এই পার্থক্য আমরা কীভাবে ব্যাখ্যা করব?
 
২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠীর একটি অংশকে ‘আদিবাসী’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধ ও দেশগঠনে তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্বীকার করেছিলেন—এমন নথির উল্লেখ বিভিন্ন প্রকাশিত সূত্রেও পাওয়া যায়।
অর্থাৎ, আজকের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পাশে যদি ২০০৩ সালের সেই দলিলটি রাখা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—তখন কি তাঁরা আদিবাসী ছিলেন, আর আজ হঠাৎ করে তাঁরা ‘অধিবাসী’ হয়ে গেলেন?
 
রাজনীতি পরিবর্তিত হতে পারে। সরকার পরিবর্তিত হতে পারে। রাষ্ট্রীয় নীতির ভাষাও সময়ের সঙ্গে বদলাতে পারে। কিন্তু ইতিহাসকে সুবিধামতো পুনর্লিখন করা যায় না। একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় কোনো সরকারি বিবৃতির ওপর নির্ভর করে জন্ম নেয় না; তার পেছনে থাকে দীর্ঘ ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি, সামাজিক কাঠামো, ভূমির সঙ্গে সম্পর্ক এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা নিজস্ব পরিচয়।
বাংলাদেশের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রো, গারো, সাঁওতালসহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক পরিচয় রয়েছে। তাঁরা বাংলাদেশের নাগরিক—এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু নাগরিকত্ব এবং জাতিসত্তার পরিচয় এক জিনিস নয়। একজন মানুষ একই সঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিক এবং নিজের জাতিসত্তার পরিচয়ে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা কিংবা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর সদস্য হতে পারেন।
তাই ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়কে সামনে এনে অন্য পরিচয়গুলোকে অস্বীকার করার প্রয়োজন কোথায়?
বরং একটি পরিণত রাষ্ট্রের শক্তি হলো—সে তার নাগরিকদের বহুমাত্রিক পরিচয়কে সম্মান করতে পারে। জাতীয় পরিচয় কাউকে তার মাতৃভাষা, সংস্কৃতি কিংবা জাতিসত্তা ভুলে যেতে বাধ্য করে না।
 
এখানেই ২০০৩ সালের বক্তব্যটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ এটি কোনো সাধারণ ব্যক্তির মন্তব্য নয়; এটি ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর আনুষ্ঠানিক বাণী হিসেবে প্রচারিত বক্তব্য। অতএব আজ যদি রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে কোনো আদিবাসী নেই, তাহলে নাগরিক হিসেবে আমরা বিনয়ের সঙ্গে জানতে চাইতেই পারি—রাষ্ট্রের আগের অবস্থান কি ভুল ছিল? যদি ভুল হয়ে থাকে, তবে কেন ভুল ছিল—তার ব্যাখ্যা কোথায়? আর যদি তখনকার স্বীকৃতি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে থাকে, তবে আজকের অস্বীকৃতির ভিত্তি কী?
 
কোনো জনগোষ্ঠীকে স্বীকৃতি দেওয়া মানেই রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়। বরং নিজের দেশের মানুষের ইতিহাস ও বৈচিত্র্যকে স্বীকার করাই রাষ্ট্রের আত্মবিশ্বাসের পরিচয়।
আমরা চাই না ‘আদিবাসী’ শব্দটি কোনো দলীয় রাজনৈতিক বিতর্কের অস্ত্র হয়ে উঠুক। এই শব্দকে নিয়ে মতপার্থক্য থাকতে পারে, সাংবিধানিক ও আইনগত ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনা হওয়া উচিত ইতিহাস, নথি, গবেষণা, সংবিধান এবং মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে—রাজনৈতিক সুবিধার জন্য নয়।
 
আজকের বক্তব্য যদি গতকালের দলিলকে অস্বীকার করে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই। কারণ ইতিহাসের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক থাকতে পারে, কিন্তু ইতিহাসকে রাজনীতির প্রয়োজনে মিথ্যা বানিয়ে দেওয়া যায় না।
কিছু সত্য শুধু রাজনীতির জন্য রাজনীতি করে মিথ্যা বানিয়ে দেওয়া যায় না।
রাষ্ট্রের কাছে আমাদের দাবি খুব সাধারণ—আমাদের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না, আমাদের দেশপ্রেম নিয়ে প্রশ্ন তুলবেন না; কিন্তু একই সঙ্গে আমাদের জাতিসত্তা, ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকেও অস্বীকার করবেন না।
 
বাংলাদেশ সবার। এই ‘সবার’ মধ্যেই রয়েছে বহুজাতিক, বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক মানুষের বাংলাদেশ।
তাই আজকের প্রশ্নটি কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রের নীতির ধারাবাহিকতা নিয়ে—
২০০৩ সালের দলিল যদি সত্য হয়, তাহলে ২০২৬ সালের অস্বীকৃতির ভিত্তি কী?
রাষ্ট্রের কাছ থেকে এই প্রশ্নের উত্তর আমরা চাই। কারণ ইতিহাস কোনো দলীয় ইশতেহার নয়—যে সরকার বদলালে তার সত্যও বদলে যাবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবি আশীষ খীসা : পাহাড়ের নৈঃশব্দ্যে যে কবি শব্দের প্রদীপ জ্বালান - Injeb Changma

পাহাড়ের জীবন কখনো কেবল পাহাড়ের মতো স্থির নয়। তার বুকের ভাঁজে ভাঁজে লুকিয়ে থাকে অজস্র গল্প — বৃষ্টিভেজা শৈশব , সবুজের মায়া , ...