![]() |
পৃথিবীর নানা প্রান্তে আজ আদিবাসী মানুষ তাদের অস্তিত্ব, অধিকার, ভাষা, সংস্কৃতি ও ভূমির দাবিকে আবারো উচ্চারণ করছে। কোথাও বিক্ষোভ, কোথাও আলোচনা, কোথাও মিছিল—আবার কোথাও নীরব স্মরণ। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের কাছে ৯ আগস্ট কেবল একটি দিবস নয়; এটি যেন বুকের ভেতর বহুদিন ধরে জমে থাকা প্রশ্নগুলোর দরজা খুলে দেওয়ার দিন।
প্রশ্ন-১: আমরা কি সত্যিই স্বাধীন? প্রশ্ন- ২: স্বাধীনতার যে স্বপ্ন নিয়ে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল, সেই স্বপ্নের আলো কি পাহাড়ের প্রতিটি ঘরে পৌঁছেছে? প্রশ্ন- ৩: রাষ্ট্রের চোখে পাহাড়ের মানুষ কি সমান মর্যাদার নাগরিক?
এই প্রশ্নগুলো নতুন নয়। এগুলো বহু বছরের। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহন করে চলা এক দীর্ঘ বেদনার নদীর মতো।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল শোষণ, বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থেকে। স্বাধীনতার স্বপ্ন ছিল, মানুষ তার নিজের পরিচয়ে বাঁচবে, নিজের ভাষায় কথা বলবে, নিজের ভূমিতে নিরাপদ থাকবে, রাষ্ট্র তাকে ভয় দেখাবে না; বরং রাষ্ট্র হবে তার অধিকার রক্ষার আশ্রয়। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের জীবনে সেই স্বপ্ন আজও কেন অসম্পূর্ণ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের ফিরে যেতে হয় ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের কাছে। দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম জনগণের পক্ষে জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি। পাহাড়ের মানুষের কাছে সেই দিনটি ছিল দীর্ঘ অন্ধকারের শেষে শান্তির একটি সম্ভাব্য ভোর। চুক্তির কাগজে শুধু কিছু ধারা লেখা ছিল না; সেখানে লেখা ছিল মানুষের ঘরে ফেরার স্বপ্ন, ভূমির নিরাপত্তা, রাজনৈতিক মর্যাদা এবং শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।
কিন্তু আজ ২০২৬। চুক্তির ২৯ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে। সময় নদীর মতো বয়ে গেছে। প্রজন্ম বদলেছে। পাহাড়ের অনেক তরুণ জন্মেছে, বেড়ে উঠেছে, আবার কেউ কেউ এই চুক্তির বাস্তবায়নের অপেক্ষা করতে করতেই পৃথিবী ছেড়ে গেছে। তবু প্রশ্নটি রয়ে গেছে।
চুক্তির কতটুকু মানুষের জীবনে পৌঁছেছে? সরকারের হিসাব একরকম। পাহাড়ের মানুষের অভিজ্ঞতা আরেক রকম। রাষ্ট্র বলে বাস্তবায়নের অনেক অগ্রগতি হয়েছে; পাহাড়ের মানুষ বলে, চুক্তির মৌলিক রাজনৈতিক ও ভূমি-সংক্রান্ত প্রশ্নগুলো এখনো অমীমাংসিত।
এই
দুই বক্তব্যের
মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের মানুষ.
তার ঘর, তার ভূমি,
তার জুম, তার স্মৃতি
এবং তার ভবিষ্যৎ। ভূমি
এখানে শুধু মাটি নয়।
এক টুকরো পাহাড় মানে একটি পরিবারের
ইতিহাস। একটি ঝিরি মানে
শৈশবের স্মৃতি। একটি জুমের ঢাল
মানে পূর্বপুরুষের ঘামের গন্ধ। একটি বন মানে
জীবনের আশ্রয়। একটি নদী মানে
প্রজন্মের গল্প।
তাই যখন ভূমির প্রশ্ন ওঠে, তখন সেটি কেবল জমির মালিকানার প্রশ্ন থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে অস্তিত্বের প্রশ্ন। একটি জাতির ভূমি যদি অনিরাপদ হয়, তার ভাষা কি নিরাপদ থাকে? ভাষা যদি হারিয়ে যায়, তার সংস্কৃতি কি টিকে থাকে? সংস্কৃতি যদি ক্ষয়ে যায়, তার জাতিসত্তা কি বেঁচে থাকে? আর জাতিসত্তা যদি ক্রমাগত সংকুচিত হতে থাকে, তবে স্বাধীনতার অর্থই বা কী?
এই
কারণেই ৯ আগস্ট পাহাড়ে
অন্যরকম অর্থ বহন করে।
আজ (৯ আগস্ট ২০২৬) রাঙামাটিতে উচ্চারিত হয়েছে একটি কঠিন, বিস্ফোরক
অথচ গভীর রাজনৈতিক বার্তা—
“পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাতিল করো, আমরাও প্রস্তুত।”
এই বাক্যকে শুধু একটি স্লোগান
হিসেবে দেখলে এর ভেতরের দীর্ঘ
ইতিহাসকে দেখা হবে না।
একটি জনগোষ্ঠী যখন এমন কথা
উচ্চারণ করে, তখন তার
পেছনে থাকে দীর্ঘদিনের জমে
থাকা অভিমান, অবিশ্বাস, ক্ষোভ এবং রাষ্ট্রের কাছে
বারবার প্রশ্ন রেখে উত্তর না
পাওয়ার যন্ত্রণা।
চুক্তি যদি রাষ্ট্রের কাছে মূল্যহীন হয়, তবে তা বাতিলের প্রশ্ন উঠতেই পারে। আর যদি চুক্তি রাষ্ট্রের কাছে শান্তির দলিল হয়, তবে তার পূর্ণ বাস্তবায়নে এত দীর্ঘসূত্রতা কেন? দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ চুক্তি শুধু কাগজে লেখা অক্ষর নয়। চুক্তি হলো বিশ্বাস। আর বিশ্বাস একবার ভেঙে গেলে শুধু নতুন একটি কাগজে স্বাক্ষর করলেই তা ফিরে আসে না। এই কারণেই ২০২৫ সালের ২ ডিসেম্বর খাগড়াছড়িতেও এমএন লারমা গ্রুপের কেন্দ্রীয় সভাপতি বিমল কান্তি চাঙমার কণ্ঠে শোনা গিয়েছিল কঠিন উচ্চারণ, “পার্বত্য চুক্তি বাতিল করে দেখো।” চুক্তি বাস্তবায়ন করতে হবে, এটাই শান্তির পথ। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি করতে হবে। আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদকে কার্যকর করতে হবে। পাহাড়ের মানুষের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের নিরাপত্তা দিতে হবে। সর্বোপরি, মানুষের মনে এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে হবে যে রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নয়, রাষ্ট্র তারও।
তাই
৯ আগস্টের এই দিনে আমাদের
আত্মজিজ্ঞাসা বেশি প্রয়োজন। আমরা
কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? স্বাধীনতার এত
বছর পরও কেন ৫০
টি জনগোষ্ঠীকে (সরকারের হিসাব) তার অস্তিত্বের নিরাপত্তার
প্রশ্ন তুলতে হয়? কেন চুক্তির
বাস্তবায়ন আজও রাজনৈতিক বিতর্কের
বিষয়? কেন ভূমির প্রশ্নে
পাহাড়ের মানুষের মনে এত অনিশ্চয়তা?
কেন তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি
রক্ষার জন্য তাদেরই বারবার
রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নাড়তে হয়?
এসব
প্রশ্নের উত্তর শুধু পাহাড়ের মানুষকে
নয়—রাষ্ট্রকেও দিতে হবে। কারণ
পাহাড় বাংলাদেশের বাইরে নয়। পাহাড়ের মানুষও
বাংলাদেশের বাইরে নয়। চামড়া, ভাষা, বর্ণমালা ও সংস্কৃতি
ঐতিহ্য আলাদা হতে পারে কিন্তু তাদের পতাকাও লাল সবুজ। এ লাল সবুজের জন্য তারাও রক্ত
দিলো, সম্ভ্রম হারিয়ে ছিল। তাই তাদের অধিকার রক্ষা করা কোনো বিশেষ
অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিক
মর্যাদার প্রশ্ন।
আজ ৯ আগস্ট তাই কেবল আদিবাসী দিবস নয়। এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রচরিত্রেরও এক আয়না। সেই আয়নায় আমরা কী দেখতে চাই? একটি উদার, গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী বাংলাদেশ, যেখানে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন জাতিসত্তা পাশাপাশি বেঁচে থাকবে? নাকি এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে সংখ্যার জোরে কোনো পরিচয়কে ধীরে ধীরে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হবে?
সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কারণ ইতিহাস কাউকে চিরকাল অপেক্ষা করায় না। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর যে চুক্তি পাহাড়ে শান্তির স্বপ্ন দেখিয়েছিল, আজ সেই চুক্তি রাষ্ট্রের সামনে আবারও একটি আয়না তুলে ধরেছে। চুক্তি বাস্তবায়ন করো অথবা ব্যাখ্যা দাও, কেন করছ না। আর যদি চুক্তি সত্যিই অকার্যকর মনে হয়, তবে সাহস করে জনগণের সামনে সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করো।
আজ পাহাড় তাই শুধু অধিকার চাইছে না; পাহাড় তার সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতির মর্যাদা চাইছে। আজ ৯ আগস্ট পাহাড়ের বাতাসে তাই একটিই প্রশ্ন ভাসছে, স্বাধীনতার যে স্বপ্নে বাংলাদেশ জন্মেছিল, সেই স্বাধীনতার আলো কি পাহাড়ের মানুষের ঘরেও সমানভাবে পৌঁছাবে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আজকের জন্য নয়। এই উত্তর নির্ধারণ করবে আগামী বাংলাদেশের ইতিহাস।




কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন