রবিবার, ১৭ মে, ২০২৬

পাহাড়ের দীর্ঘশ্বাস - ইনজেব চাঙমা

 


পাহাড়ের অরণ্য যখন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে, তখন তার নিস্তব্ধতার গভীরে লুকিয়ে থাকে দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস। ১৯৭১ থেকে ১৯৯৭—এই দীর্ঘ ছাব্বিশটি বছর পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের জন্য কেবল একটি কালপঞ্জি ছিল না। তা ছিল এক অস্তিত্বহীনতার কালখণ্ড। যে মাটিতে জুম্ম জন্ম, সেই মাটিই তার জন্য হয়ে উঠেছিল এক নির্মম বধ্যভূমি আর সন্দেহের কণ্টকশয্যা।
সে সময় পাহাড়ের ঢালে কোনো জুম্ম যুবকের লম্বা চুল কিংবা অঙ্গে সবুজ শার্ট থাকাটাই ছিল অপরাধের পরোয়ানা। পোশাক আর অবয়ব দেখে মানুষকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দেওয়ার সেই একপাক্ষিক বিচার ব্যবস্থা মানবিকতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল।
সাধারণ জীবনযাপনের অতি সামান্য উপকরণও হয়ে উঠত রাষ্ট্রীয় সন্দেহের বীজ। দশ কেজি চাল কিংবা একটি লাক্স সাবান কিনলেই জুটত ‘সন্ত্রাসী বাজার’ অথবা ‘শান্তিবাহিনীর গোপন রসদ’ সরবরাহের অভিযোগ। হাটে গিয়ে সদাই করাও ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা। এই সন্দেহের আবর্তে পিষ্ট হয়ে কত প্রাণ অকালে জেলের অন্ধ প্রকোষ্ঠে হারিয়ে গেছে, তার হিসাব ইতিহাসের কোনো পাতায় লেখা নেই।
কোথাও গেলে কিংবা বাজারে গেলে ‘গোল ঘর’-এ নাম লেখাতে হতো। ‘গোল ঘর’ ছিল জুম্মদের জন্য এক বিভীষিকাময় তোরণ। সেখানে নাম এন্ট্রি করার অর্থ ছিল নিজের আত্মসম্মানকে বিসর্জন দেওয়া। প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হতে যখন মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসত, তখন সামান্যতম সন্দেহে মিলত অবর্ণনীয় সাজা।
চেকপোস্টের সেই তল্লাশি কেবল দেহের ছিল না, তা ছিল এক জনগোষ্ঠীর মর্যাদার ওপর পদাঘাত। পরিধেয় বস্ত্র খুলে যখন নিজেকে প্রমাণ করতে হতো, তখন পাহাড়ের আকাশ-বাতাসও যেন অপমানে কুঁকড়ে যেত। সন্ধ্যা নামলে নিরাপত্তার খোঁজে মানুষ গ্রাম ছেড়ে গহিন অরণ্যে আশ্রয় নিত, কিন্তু শান্তির ছায়া মেলেনি কোথাও।
পাহাড়ের এই যন্ত্রণার শেকড় আরও গভীরে। পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই বাঁধের মাধ্যমে যে উন্নয়নের জোয়ারের কথা বলা হয়েছিল, তা আসলে ছিল লক্ষাধিক চাকমার জন্য এক ‘মরণ-ফাঁদ’। নিজের বাস্তুভিটা জলমগ্ন হতে দেখে এক বিশাল জনগোষ্ঠী দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়েছিল।
সেই থেকে শুরু হওয়া ‘পরবাসী’ জীবনের অভিশাপ আজও এই জনপদের ললাট থেকে মুছে যায়নি। নিজের দেশে থেকেও পরবাসী হওয়ার এমন নজির ইতিহাসে বিরল।
১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মানুষের বুকে এক চিলতে আশার আলো জ্বালিয়েছিল। মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো বুটের শব্দ কোনো ভোরে তাদের ঘুম ভাঙবে না।
কিন্তু নিয়তির পরিহাস আর রাজনৈতিক জটিলতায় সেই আশা কেবল এক দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে। চাকমাদের প্রচলিত সেই প্রবাদটি আজও কত সত্য—“চিলে সো মারিলে খেরান অলে নেযায়”। অর্থাৎ, চিল ছোঁ মারলে শিকার ধরতে না পারলেও অন্তত ঘাস ছিঁড়ে নিয়ে যায়। চুক্তি হলো সত্য, কিন্তু নতুন সংগঠন ইউপিডিএফ উদ্ভব আর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত সেই ১৯৯৭-পূর্ববর্তী বিভীষিকাকেই যেন নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনল। এভাবে ২৮টি বসন্ত চলে গেল জুম্ম জাতির বুকে।
আজকের প্রজন্ম হয়তো জানে না সেই গোল ঘরের অপমান কিংবা ৫০০ গ্রাম সিদোল কেনার অপরাধে নির্যাতিত হওয়ার গল্প। কিন্তু পাহাড়ের ধুলিকণায় আজও সেই যন্ত্রণার ঘ্রাণ লেগে আছে।
চুক্তি পরবর্তী সময়েও মানুষ যখন নিজভূমে পরবাসীর মতো জীবন কাটায়, তখন প্রশ্ন জাগে—পাহাড়ের এই অন্তহীন রক্তক্ষরণ কি তবে কোনোদিন থামবে না? মলাটবদ্ধ ইতিহাসের বইয়ে নয়, বরং মানুষের যাপিত জীবনে যেদিন আত্মমর্যাদা আর প্রকৃত শান্তি ফিরে আসবে, সেদিনই হয়তো পাহাড়ের এই দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটবে।
আর সেই মুক্তির একমাত্র পথ হলো ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন। চুক্তির প্রতিটি ধারা—ভূমি কমিশন কার্যকর করা, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদকে ক্ষমতায়ন, অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার—বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের মানুষের বুকে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস শেষ হবে না। কাগজের চুক্তিকে মাঠের বাস্তবতায় রূপ দিতে পারলেই কেবল কুয়াশা সরে গিয়ে পাহাড়ে নতুন ভোরের আলো ফুটবে।

পাহাড়ের দীর্ঘশ্বাস - ইনজেব চাঙমা

  পাহাড়ের অরণ্য যখন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে, তখন তার নিস্তব্ধতার গভীরে লুকিয়ে থাকে দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস। ১৯৭১ থেকে ১৯৯৭—এই দীর্ঘ ছা...