পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেও তাঁদের নিরলস কর্মে নির্মাণ করেছেন এক অনন্য অধ্যায়। তাঁরা বিশ্বাস করেন, সংস্কৃতি কেবল বিনোদনের বিষয় নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, আত্মমর্যাদা, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী ভিত্তি। চাঙমা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার এই দীর্ঘ সংগ্রামে যাঁরা নীরবে আজীবন কাজ করে চলেছেন, তাঁদের অন্যতম জ্ঞান কীর্তি চাকমা। তিনি একাধারে কবি, নাট্যকার, চিত্রনাট্যকার, অভিনেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক—সব পরিচয়ের সমন্বয়ে এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক।
জ্ঞান কীর্তি চাকমার জন্ম (সার্টিফিকেট অনুসারে) ২০ জানুয়ারি ১৯৮৪ সালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালা উপজেলার উদাল বাগান গ্রামে। তাঁর পিতা সুপেন্দ্র চাকমা এবং মাতা তৃপ্তি বালা চাকমা। তাঁর সহধর্মিণী মধুমিতা মারমা। তাঁদের দুই কন্যা—রাশিয়া চাকমা (দীঘিনালা সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী) এবং এশিয়া চাকমা (উদাল বাগান উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী)।
পাহাড়, বনাঞ্চল, প্রকৃতি এবং নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিবেশে তাঁর শৈশব অতিবাহিত হয়। এই পরিবেশই পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পীসত্তা, সাহিত্যচেতনা এবং চলচ্চিত্র নির্মাণে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।
প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় উদাল বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালে তিনি রাঙামাটির মোনঘর শিশু সদনে ভর্তি হন। মোনঘরেই তাঁর সাহিত্য, নাটক ও শিল্পচর্চার প্রকৃত ভিত্তি নির্মিত হয়।
২২ জানুয়ারি ১৯৮৯ সালে ভারতে শরণার্থী অবস্থায় তিনি তাঁর পিতার মৃত্যুসংবাদ পান। শৈশবের এই নির্মম ট্র্যাজেডি তাঁর জীবনে গভীর বেদনার ছাপ ফেললেও তিনি সেই বেদনাকেই সৃষ্টিশীল শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি কবিতা, গল্প ও নাটক রচনা শুরু করেন এবং সহপাঠীদের নিয়ে নিজেই নাটক মঞ্চস্থ করতেন।
তাঁর সৃজনশীল প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে শিক্ষক মৃত্তিকা, ঝিমিত ঝিমিত, শান্তি ও দীপ্তাসহ অনেকে তাঁকে নাট্যচর্চায় উৎসাহিত করেন। তাঁদের প্রেরণায় তিনি অভিনয় ও নাট্যরচনায় আরও মনোনিবেশ করেন।
এই সময়ে তিনি রচনা করেন—
- কবানত বাজ পজ্জে
- দজ বারা এগার
- চোগে পহর
- ভাঙি ন পারে বুবর স্ববণ
এসব নাটকে সমাজবাস্তবতা, মানবিক সংকট, আত্মমর্যাদা, বৈষম্য এবং মানুষের সংগ্রামের চিত্র শক্তিশালীভাবে ফুটে ওঠে।
এসএসসি পাসের পর তিনি রাঙামাটি সরকারি কলেজে ভর্তি হন। ১৯৯৮ সালে নিজ গ্রামে প্রতিষ্ঠা করেন জুম্ম সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংসদ। একই সময়ে তিনি সম্পাদনা করেন ‘রা-খা-বা বুক জ্বলি যার’ নামে একটি লিটল ম্যাগাজিন।
সংগঠনটির মূল উদ্দেশ্য ছিল সাহিত্যচর্চা, নাট্যচর্চা, সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি। দীর্ঘ আট বছর সংগঠনটি সক্রিয় থাকলেও বিভিন্ন রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে এর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু সংগঠন বিলুপ্ত হলেও তাঁর সাংস্কৃতিক সংগ্রাম থেমে থাকেনি। তিনি কলম, মঞ্চ এবং ক্যামেরাকে হাতিয়ার করে ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য কাজ করে যেতে থাকেন।
২০০২ সাল থেকে জ্ঞান কীর্তি চাকমা ধারাবাহিকভাবে টেলিফিল্ম নির্মাণ শুরু করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রাথমিক নির্মাণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- মানিক্যা বৈদ্যর দারু তালিক
- ভাঙি ন পারে বুবর স্ববন
- তুজিম পুরো কোচপানা
- আহভিলেজ
- তামাকবিরোধী চলচ্চিত্র সাত গাঙ সাজুরি বাক্কে এযের আহ্ গরি
- এ্যলা ফেলা
এসব চলচ্চিত্রে জুম্ম জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রাম, সামাজিক সংকট, জনসচেতনতা এবং মানবিক মূল্যবোধকে গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়েছে।
২৫ জানুয়ারি ২০১১ সালে উদাল বাগানে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জুম্ম ফিল্ম এসোসিয়েশন (জুফা)।
জুফা শুধু একটি চলচ্চিত্র সংগঠন নয়; এটি জুম্ম ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জাতিসত্তাকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সংরক্ষণ ও বিকাশের এক সাহসী সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।
সংগঠনটির প্রধান লক্ষ্য—
- চলচ্চিত্রের মাধ্যমে সমাজের নেতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরা;
- কুসংস্কার, মাদকাসক্তি, পারিবারিক সহিংসতা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা সৃষ্টি;
- শিক্ষা, মানবিকতা, সম্প্রীতি ও সামাজিক দায়িত্ববোধের প্রসার;
- জুম্ম ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিক সংরক্ষণ।
নিজেকে আরও সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে তিনি ২০১৩ সালে ঢাকার প্রাচ্যনাট স্কুল অব অ্যাক্টিং অ্যান্ড ডিজাইন-এ ছয় মাসব্যাপী অভিনয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন অভিনয় প্রশিক্ষণ কোর্স সফলভাবে সম্পন্ন করে সপ্তম স্থান অর্জন করেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁর অভিনয় ও চলচ্চিত্র নির্মাণে নতুন মাত্রা যোগ করে।
২০২০ সালে নির্মিত ‘আন্দারত ধান হুজানা’ তাঁর শর্টফিল্ম নির্মাণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
এরপর তিনি ধারাবাহিকভাবে নির্মাণ করেন—
রাধমন ধনপুদির ফুল পারা, নিজো টেঙত হুরোল মারানা, মরে ন তাগিজ, ডিএসএলআর ক্যামেরা, থার্টি ফাস্ট নাইট, বেজাদর হাজ্জেক, হেগা তাগলর কুপ, ছন্দবাজ, ভাইরাস, অধ গরাত, আহদ আগুন ন পেবে, ফাদা বাজত বিজে বাঝানা, গিরিত্তি ঘর বৌ, সজ্জানা, ঝড়া পাদার জিংকানি, বেলাব, দজা, ভাঙা গিরিত্তির যদন, ইলেকশন, ঝড় নেই দেবা কালা, চিগোন পিরে, পরা কবালর জিংকানি, হোদার আগুন লুরো, ঘর উন্দুরে বের কামারায়, কোচপানার চোগো পানি, লুরো শুগোর ছালত উদোনা, সত্য মিথ্যা চের আঙুল ফারক, টেঙা ফেরত চাং, ধুন্দুক, আদে ধন, ব্রেকআপ–১, ব্রেকআপ–২ এবং ফক্কর।
এসব চলচ্চিত্রে পারিবারিক সম্পর্ক, সামাজিক অবক্ষয়, প্রেম, প্রযুক্তির প্রভাব, নির্বাচন, নৈতিক মূল্যবোধ এবং জুম্ম সমাজের জীবনবাস্তবতা শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। তাঁর চলচ্চিত্রগুলো জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য-নথি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
জ্ঞান কীর্তি চাকমা বিশ্বাস করেন, মানুষকে সচেতন করার অন্যতম সহজ মাধ্যম হলো হাস্যরস।
এই বিশ্বাস থেকেই তিনি নির্মাণ করেছেন—
ওয়ান আনা টু ব্যানেনা, ভাইরাস, ব্যস্ত আগং, সরি, কগেয়্যা চুর, উত্তর সারাংশ দেখ, ভূত চালান, কুরো চুর, বৈদ্য, ইহি, উগুদো জিরেন, শালিজ, বিলেই, পাচ আহদ, চুর, শামুখ, কুন্দি যেম, তিবিরে, ইন্টারভিউ, ফুটবল, জোধা, দারু এবং সরি সাবজেক্ট—সহ অসংখ্য জনপ্রিয় ফানি ভিডিও।
এসব ভিডিও কেবল বিনোদনের জন্য নির্মিত নয়; বরং ব্যঙ্গ, রসিকতা ও বাস্তব জীবনের ঘটনাকে উপজীব্য করে সামাজিক অসংগতি তুলে ধরে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দেয়।
জ্ঞান কীর্তি চাকমার জীবন প্রমাণ করে—সীমিত সম্পদ কখনো মহান স্বপ্নের পথে অন্তরায় হতে পারে না। তিনি চলচ্চিত্রকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; বরং সামাজিক পরিবর্তন, ভাষা সংরক্ষণ, সাংস্কৃতিক জাগরণ এবং জাতিসত্তার ইতিহাস ধারণের এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন।
তাঁর প্রতিটি সৃষ্টি জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভাষা, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং সংগ্রামী ইতিহাসের এক মূল্যবান দলিল। আজ তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা নন; তিনি জুম্ম চলচ্চিত্র আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত। তাঁর হাতে গড়ে ওঠা জুম্ম ফিল্ম এসোসিয়েশন (জুফা) ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিল্পীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল প্রতিষ্ঠান হয়ে থাকবে।
জ্ঞান কীর্তি চাকমার সৃজনশীলতা, সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা এবং নিরলস সাধনা পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে দীর্ঘদিন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। ভাষা, সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি যে সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণ করে চলেছেন, তা শুধু জুম্ম সমাজের নয়; বাংলাদেশের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যেরও এক অমূল্য সম্পদ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন