কিছু মন্ত্রণালয় ইট-কাঠের দপ্তর নয়। কিছু চেয়ার কেবল ক্ষমতার আসবাব নয়। সে চেয়ার আসলে এক জনগোষ্ঠীর হৃদপিণ্ডের স্পন্দন। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয় তেমনই একটি নাম, যে নাম উচ্চারিত হলেই পাহাড়ের বুক চিরে বেরিয়ে আসে পোড়া গ্রামের কালো ধোঁয়া, জুমের ফসলের মতো ঝরে পড়া স্বপ্ন, আর মায়ের কোলে ফিরতে না পারা সন্তানের জন্য এক অন্তহীন অপেক্ষা।
এই মন্ত্রণালয় তাই কোনো প্রশাসনিক অলঙ্কার নয়, এটি একটি ক্ষত, একটি অঙ্গীকার, একটি দীর্ঘ, অনন্ত শান্তির প্রার্থনা।
ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন, একাধারে বিদগ্ধ আইনজ্ঞ, প্রজ্ঞাবান রাজনীতিক, নির্বাচিত প্রতিনিধি। তাঁর কাঁধে আজ কেবল প্রতিমন্ত্রীর সিলমোহর নয়, জমে আছে পাহাড়ের শতাব্দী প্রাচীন দীর্ঘশ্বাসের ভার।
আমরা বিশ্বাস করতে চাই, তাঁর লন্ডনের ব্যারিস্টারি তাঁকে শুধু আইনের ধারা শেখায়নি, শিখিয়েছে ন্যায়ের সামনে মাথা নত করতে। তাঁর রাজনীতি তাঁকে শুধু ক্ষমতার অঙ্ক শেখায়নি, শিখিয়েছে ইতিহাসের ডাক শুনতে।
কারণ, শিক্ষা কখনো দম্ভের স্তম্ভে দাঁড়ায় না, শিক্ষা দাঁড়ায় ন্যায়কে নির্ভয়ে আলিঙ্গন করার সাহসে। আর নেতৃত্ব কখনো চেয়ার আঁকড়ে থাকায় মহান হয় না, নেতৃত্ব মহান হয় চেয়ার ছেড়ে দিয়ে সত্যের পাশে এসে দাঁড়ানোর ঔদার্যে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কোনো রাজদরবারের দয়া নয়, কোনো অনুকম্পার হাততালি নয়। এ এক রক্ত নদী পেরিয়ে আসা সনদ। এর প্রতিটি অক্ষর লেখা হয়েছে, পাহাড়ের ঢালে ঢালে জ্বলে ওঠা গ্রামের কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ায়, ভিটেহারা মানুষের শূন্য চৌকাঠে জমে থাকা নিঃশব্দ অশ্রুতে,
আর একটাই আকুতিতে, আমার সন্তান যেন আর বন্দুকের শব্দে ঘুম ভেঙে না জাগে।
তাই এই দপ্তরের মালিকানা বদলের প্রশ্নটি কোনো বদলির নোটিশ নয়। এটি আস্থা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রশ্ন। এটি একজন পাহাড়ি মায়ের কাছে রাষ্ট্রের ফিরে আসার গল্প। এটি মর্যাদার পুনরুদ্ধার।
এখানে বিদ্বেষের কোনো কালি নেই। ব্যক্তি হেলাল উদ্দিনের প্রতি আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা আছে। কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই তো এই, ব্যক্তিকে সম্মান রেখেই নীতির প্রশ্নে আমরা আপসহীন হতে পারি।
আজ ঊনত্রিশটি বসন্ত পেরিয়ে গেছে। শান্তি চুক্তির পাতা উল্টালে এখনো ধুলো ওড়ে। পাহাড়ি মানুষ এখনো জানে না, তার পায়ের নিচের মাটিটা তারই কি না, ভূমির অধিকার আজও এক অনিশ্চিত প্রশ্ন।
সে এখনো জানে না, তার নিজের ভাষায়, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকারটুকু রাষ্ট্র দেবে কি না, রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন আজও এক অসমাপ্ত কবিতা। পাহাড় আর সমতলের মাঝে যে অদৃশ্য দেয়াল, সেই দেয়ালে আজও আস্থার কোনো জানালা খোলেনি।
এই ক্ষণে প্রয়োজন একটি বজ্রকঠিন, অথচ মেঘের মতো কোমল সিদ্ধান্ত। এমন একটি সিদ্ধান্ত, যা পাহাড়কে বলবে, রাষ্ট্র তোমাকে ভোলেনি। এবং সেই সিদ্ধান্তের মহানায়ক হতে পারেন ব্যারিস্টার হেলাল নিজেই।
তিনি যদি আজ ইতিহাসের দিকে তাকিয়ে, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির আত্মার দিকে তাকিয়ে, হাসিমুখে বলেন, "এই আসনটি আমার নয়, এই আসনটি পাহাড়েরই কোনো সন্তানের প্রাপ্য" — তবে তিনি ছোট হবেন না।
বরং ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে অন্যভাবে। কালের মহাকাব্যে তাঁর নাম লেখা থাকবে সোনার হরফে। কারণ ইতিহাস মন্ত্রীর তালিকা মনে রাখে না, ইতিহাস মনে রাখে সেই মানুষটিকে, যে ক্ষমতার মোহকে উপেক্ষা করে ন্যায়ের পক্ষে একা দাঁড়িয়েছিল।
ভূমি মন্ত্রণালয় তো তাঁর হাতেই। সেখানেও তিনি হতে পারেন পাহাড়ের ত্রাতা। বছরের পর বছর ধরে অচল হয়ে পড়ে থাকা ভূমি কমিশনের চাকায় তিনি-ই তো তেল দিতে পারেন। যুগের পর যুগ ধরে জমে থাকা ভূমি বিরোধের জট তিনি-ই তো খুলতে পারেন ন্যায়ের আঙুলে।
তাই এই হস্তান্তর কোনো পদত্যাগ নয়, কোনো পলায়ন নয়। এ এক মহৎ আত্ম-বিসর্জন। ক্ষমতা ছেড়ে দিয়ে বৃহত্তর ক্ষমতাকে, মানুষের ভালোবাসাকে, বরণ করে নেওয়া।
মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র তখনই মহৎ হয়, যখন সে তার দেওয়া কথার মর্যাদা রাখে। ক্ষমতা তখনই সুন্দর হয়, যখন সে ন্যায়ের সামনে নতজানু হতে শেখে। আর একজন মানুষ তখনই কালজয়ী হন, যখন তিনি নিজের চেয়ারের চেয়ে মানুষের অধিকারকে বড় করে দেখেন।
তাই আজ আহ্বান, করজোড়ে নয়, হৃদয়ের গভীর থেকে আহ্বান। পদের মোহ কেটে যাক, জেগে উঠুক বিবেক। হিসাব-নিকাশের সংকীর্ণ রাজনীতি মুছে যাক, জন্ম নিক সম্প্রীতির এক নতুন পাহাড়। কারণ ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, চেয়ার ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু একটি সাহসী, ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত, সে অনন্তকাল ধরে পাহাড়ের প্রতিটি ঝর্ণার মতো বয়ে চলে, মানুষের হৃদয়ে শ্রদ্ধার প্রদীপ হয়ে জ্বলে।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন