শুক্রবার, ১০ জুলাই, ২০২৬

শান্তির এক চিলতে রোদ এবং কুয়াশার আগ্রাসন- ইনজেব চাঙমা


আজ ৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার। গত এক সপ্তাহ ধরে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই চারপাশ প্লাবিত হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে যখন দেখি গত রাতের বন্যার পানি কিছুটা কমেছে, তখন মনের ভেতর এক দীর্ঘশ্বাস আর প্রশ্ন জেগে ওঠে, এমন তো আগে ছিল না! অতীতে এর চেয়েও অনেক বেশি বৃষ্টি হতো, কিন্তু প্রকৃতি ছিল সুরক্ষিত। চারিদিকে গাছপালা ছিল, নদী-নালা, খাল-বিলে ছিল মাছ, কাঁকড়া, ইজে (চিংড়ি) ও শামুকের প্রাচুর্য। আজ নদী-নালা ভরাট হয়ে গেছে, সবুজ প্রকৃতি ধ্বংসপ্রাপ্ত। প্রকৃতির এই বিপর্যয়ের সমান্তরালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার এবং মর্যাদাও আজ বিপন্ন। আজ জুম্মদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্মানটুকু যেন হারিয়ে গেছে; তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর অপপ্রচার। এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি।

 
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের বারুদ আর বুলেটের গন্ধ মাখা অধ্যায়ের অবসান ঘটেছিল। অবরুদ্ধ উপত্যকায় উঁকি দিয়েছিল এক চিলতে শান্তির রোদ। কিন্তু সেই রোদ্দুর স্থায়ী হতে দেয়নি পাহাড়েরই কিছু বিভ্রান্ত সন্তান। প্রসিত বিকাশ খীসা, রবিশঙ্কর চাকমা ও সঞ্চয় চাকমাদের নেতৃত্বে পাহাড়ি গণপরিষদ, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশনের একটি অংশ এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে মেনে নিতে পারেনি। তারা জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ আর ‘আত্মসমর্পণের’ কাল্পনিক অভিযোগ তুলে পাহাড়ের বুকে আবার অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দিল।
 
পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের চটকদার স্লোগান তুলে তারা যে রাজনীতির সূচনা করল, তা জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পরিবর্তে রূপ নিল নিজেদের ঘরের ভেতরেই এক আত্মঘাতী, রক্তক্ষয়ী সংঘাতে।
সেই বিরোধের আগুন শুধু মৌখিক আস্ফালনে সীমাবদ্ধ রইল না। অল্প সময়ের মধ্যেই পাহাড়ি জনপদ কেঁপে উঠল চেনা মানুষের বুলেটের শব্দে। শুরু হলো জুম্ম ভাইদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, হত্যা, গুম আর মুক্তিপণের বাণিজ্য।
 
১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, খাগড়াছড়ির স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ। যেখানে বুক ভরা আশা নিয়ে জুম্ম দামাল ছেলেরা অস্ত্র জমা দিচ্ছিল, সেখানেই নিরাপত্তার কঠোর প্রাচীর ভেদ করে কালো পতাকা আর ঘৃণার ব্যানার নিয়ে ঢুকে পড়েছিল পার্বত্য চুক্তিবিরোধীরা। প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদদ ছাড়া সেই সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করা কি আদৌ সম্ভব ছিল? ১৯৯৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাঘাইছড়ি হাইস্কুল মাঠ , ৪ মে ধুধুকছড়া এবং ১৯৯৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দেখেছিলাম কীভাবে ইতিহাসের নির্মম সাক্ষী হয়ে আমি নিজে দাঁড়িয়েছিলাম দীঘিনালা বড়াদম হাইস্কুল মাঠে, অস্ত্র জমাদান অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে শান্তিবাহিনীদের জুতার মালা প্রদর্শন ও চুক্তির সমর্থকদের ওপর ইটপাটকেল আর হিংস্র আক্রমণ চালানো হয়েছিল।
 
পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর এই চুক্তিবিরোধী অংশটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (ইউপিডিএফ) নামে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধিকারের নামে জন্ম নেওয়া পর শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত আর ভ্রাতৃহত্যার করা শুরু হয়।
 
জাতিসংঘের হাত ধরে ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর এক আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে 'আদিবাসী দিবস' পালনের বিষয়টি স্বীকৃতি লাভ করে। সেই থেকে প্রতি বছর ৯ আগস্ট পৃথিবীর প্রায় ৯০টি দেশে ৩৭০ বিলিয়ন মানুষ বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করে আসছে। বাংলাদেশেও ২০০৪ সাল থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ আদিবাসী এই দিনটিতে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়।
 
অথচ চিন্তার এক চরম দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পেল ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর, যেদিন ইউপিডিএফ-এর অংগ্য মারমা দাবি করে বসলেন (যুমনা টিভি সাক্ষাৎকার), ‘আদিবাসী’ শব্দ নাকি কেবলই এনজিওদের দেওয়া একটি 'টার্ম'! এর ধারাবাহিকতায়, ২০২৬ সালের ১৪ জুন এক অনলাইন আলোচনায় ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা যেভাবে জুম্ম জাতীয়তাবাদের মহানায়ক, আদিবাসীদের অধিকারের ধ্রুবতারা এম এন লারমার তীব্র ও কুৎসিত সমালোচনা করলেন, তাতে তাদের ভেতরের অন্ধকার রূপটি আর ঢাকা রইল না।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৯৯ সাল থেকেই ইউপিডিএফ তাদের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিল ১০ নভেম্বর ‘এম এন লারমা শহীদ দিবস’ পালন না করার। অথচ তারা এতদিন মিথ্যা অজুহাত দিয়ে আসছিল যে, ১০ নভেম্বর পালন করলে জেএসএস তাদের ওপর হামলা করে। আজ তাদের নেতা-কর্মীদের মুখ থেকেই জলছাপের মতো স্পষ্ট যে, তারা আসলে এম এন লারমার সেই কালজয়ী সাম্যবাদী ও অধিকার আদায়ের দর্শনকেই ধারণ করতে মানসিকভাবে নারাজ।
 
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা কেবল পাহাড়ি জুম্মদের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এই ভূখণ্ডের প্রতিটি শোষিত, লাঞ্ছিত এবং মেহনতি মানুষের অবিনাশী কণ্ঠস্বর। ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবর, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের খসড়া সংবিধানের ওপর দাঁড়িয়ে গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি যে ঐতিহাসিক বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা আজো বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়:
"মাননীয় স্পীকার সাহেব, ১৯৪৭ সালে কেউ কি চিন্তা করেছিলেন যে, পাকিস্তান ধ্বংস হয়ে যাবে? জনাব মোঃ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, 'Pakistan has come to stay'। নিয়তি অদৃষ্ট থেকে সেদিন নিশ্চয় উপহাস ভরে হেসেছিলেন। সেই পাকিস্তান অধিকার হারা বঞ্চিত মানুষের বুকের জ্বালায়, উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। ...পাকিস্তানের সময় দীর্ঘ ২৪ বছর পর্যন্ত একটি কথাও বলতে পারিনি। আমাদের অধিকারকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই অধিকার আমরা পেতে চাই, এই চাওয়া অন্যায় নয়। সেই অধিকার এই সংবিধানের মাধ্যমে দেওয়া হয়নি।"
 
তিনি বুকভাঙা কান্না আর ক্ষোভ নিয়ে বলেছিলেন, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আলোয় আজ সারা দেশ ঝলমল করে, কলকারখানা চলে; অথচ সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে উদ্বাস্তু করে, হাজার মানুষের জীবন বলি দিয়েও তাদের মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার দেওয়া হয়নি।
 
সংবিধানে পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাস ও অস্তিত্বকে অস্বীকার করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন:
"পার্বত্য চট্টগ্রাম হল বিভিন্ন জাতিসত্তার ইতিহাস। কেমন করে সেই ইতিহাস আমাদের সংবিধানের পাতায় স্থান পেল না, তা আমি ভাবতে পারি না। সংবিধান হচ্ছে এমন একটা ব্যবস্থা, যা অনগ্রসর জাতিকে, পিছিয়ে পড়া নির্যাতিত জাতিকে, অগ্রসর জাতির সংগে সমান তালে এগিয়ে নিয়ে আসার পথ নির্দেশ করবে। কিন্তু বস্তুতঃ পক্ষে এই পেশকৃত সংবিধানে আমরা সেই রাস্তার সন্ধান পাচ্ছি না।"
তিনি শুধু নিজের জাতির জন্য কাঁদেননি, তিনি সেদিন সংবিধানে অধিকার চেয়েছিলেন বাংলার কৃষক, শ্রমিক, মেথর, কামার, কুমার আর মাঝি-মাল্লাদের জন্য।
 
যে মানুষটি বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব মানবতার মঞ্চে শোষিত মানুষের অধিকারের কথা বলে গেছেন, সেই মহামানব এম এন লারমাকে আজ ইউপিডিএফ বা মাইকেল চাকমারা যেভাবে খাটো করার অপচেষ্টা করছেন, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও আত্মঘাতী। তাদের এই আচরণ প্রমাণ করে, তারা জুম্ম জনগণের মুক্তি চায় না, তারা চায় চিরস্থায়ী বিভেদ। তারা অধিকারের আলো চায় না, চায় পাহাড়ে বন্দুকের নলের অন্ধকার রাজত্ব বজায় রাখতে।
 
প্রকৃতির ভারসাম্য হারিয়ে গেলে যেমন পাহাড়ের বুক ভাসিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত প্লাবন আসে, তেমনি রাজনীতির আদর্শিক ভারসাম্য হারালে সমাজ ভেসে যায় ভ্রাতৃঘাতী রক্তে। জুম্ম জনগণের যদি এই বাংলার বুকে মাথা উঁচু করে, আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে হয়, তবে এই কৃত্রিম বিভেদ আর অস্ত্রের রাজনীতি ভুলে এম এন লারমার সেই মহান আদর্শ আর অসাম্প্রদায়িক শোষিত মানুষের লড়াইয়ের পতাকাতলে একত্রিত হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
৯ জুলাই ২০২৬ 

লাঙলের হাত থেকে কলমে: চাকমা আধুনিক সাহিত্যের মহীরুহ কবি মুকুন্দ চাকমা লেখা: ইনজেব চাঙমা

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি-পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা একটি যুগের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। তাঁদের জীবন, সাহিত্য এবং সংগ্রাম মিলেমিশে জাতিসত্তার ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়। কবি মুকুন্দ চাকমা তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি চাকমা ভাষার আধুনিক কাব্যধারার অন্যতম প্রধান নির্মাতা, মাতৃভাষার নিবেদিতপ্রাণ সাধক এবং পাহাড়ের মানুষের জীবনসংগ্রামের এক বিশ্বস্ত কথক।

চাকমা আধুনিক সাহিত্যের সূচনায় যে নামটি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তিনি স্বর্গীয় চুণীলাল দেওয়ান। তাঁর হাতে রোপিত আধুনিক সাহিত্যচর্চার চারাগাছকে দীর্ঘ সাধনা, সৃজনশীলতা এবং গভীর জীবনবোধ দিয়ে মহীরুহে রূপ দিয়েছেন কবি মুকুন্দ চাকমা। তাই তাঁকে যথার্থই চাকমা আধুনিক কবিতার দ্বিতীয় প্রধান পুরুষ বলা হয়।

১৯৩১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি বগা গোজার অন্তর্গত ধজ্যা গোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা অর্জুন চন্দ্র তালুকদার এবং মাতা শুভদ্রা চাঙমা। সহধর্মিণী নীলিমা চাঙমা। তাঁদের ছয় সন্তান—দেব জ্যোতি চাঙমা, পরিতোষ চাঙমা, জ্ঞানর আলো চাঙমা, অপরাজিতা চাঙমা, আলপনা চাঙমা এবং শতরূপা চাঙমা। পারিবারিক জীবন ও সাহিত্যসাধনার সমন্বয়ে তিনি এক আদর্শ মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।

ছাত্রজীবনেই তিনি মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ অনুভব করেন। চুণীলাল দেওয়ানের সাহিত্যচেতনা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু দেশভাগ-পরবর্তী অস্থিরতা তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে দেয়। জীবিকার প্রয়োজনে কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি কৃষিজীবনকেই আপন করে নেন। কিন্তু কৃষিকাজ কখনো তাঁর সাহিত্যচর্চার অন্তরায় হয়নি; বরং সেই জীবনই তাঁর কবিতার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।

কবি মুকুন্দ চাকমার সাহিত্য পড়লে বোঝা যায়, তিনি পাহাড়কে দূর থেকে দেখেননি; পাহাড়ের মাটি ছুঁয়ে, মানুষের সঙ্গে হেঁটে, প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করেই লিখেছেন। তাঁর কবিতায় ঝরনার সুর যেমন আছে, তেমনি আছে জুমচাষির ঘামের গন্ধ; আছে বনভূমির সবুজ, আবার আছে বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস।

কৃষক ও কবি—এই দুই পরিচয় তাঁর জীবনে পরস্পরের পরিপূরক। উন্নত কৃষি, বিশেষ করে ইরি ধানের চাষাবাদ নিয়ে তিনি গান, কবিতা ও নাটক রচনা করেন। এসব রচনা গ্রামীণ সমাজে কৃষি-সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর এই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৮ সালে দিঘীনালা থানা সার্কেল (উন্নয়ন) অফিস তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করে।

সাহিত্য তাঁর কাছে কখনো নিছক নান্দনিকতার অনুশীলন ছিল না; বরং মানুষের অধিকারের ভাষা। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জুম্ম জনগণের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁর কবিতা সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছিল। তাঁর দ্রোহমুখর কবিতা পাহাড়ি জনপদের মানুষের আত্মমর্যাদা ও অধিকারচেতনার শক্তিশালী ভাষ্যে পরিণত হয়েছিল।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় আসে ১৯৮৬ সালে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাঁকে নিজভূমি ছেড়ে শরণার্থীজীবন গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু নির্বাসন তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি। কাঁটাতারের ওপারেও তাঁর কলম থেমে থাকেনি। মাতৃভূমির স্মৃতি, বিচ্ছেদের বেদনা এবং প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতায় নতুন গভীরতা এনে দেয়। পরবর্তীকালে আগরতলায় তাঁর নির্বাসনপর্বের কবিতাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

ধর্মীয় সাহিত্যেও তাঁর অবদান পথিকৃৎসুলভ। দিঘীনালা বন বিহার থেকে চাকমা ভাষায় রচিত ‘ধর্মছদক’ গ্রন্থটি প্রথম ধর্মীয় সাহিত্যগ্রন্থ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। এছাড়া ‘পরিত্রাণ সূত্র’, ‘বুদ্ধের জীবন ও কাহিনী’, ‘নন্দপাল মহাথেরোর জীবনকথা’ এবং ‘প্রাণের মায়া’ গ্রন্থসমূহ চাকমা ভাষায় বৌদ্ধধর্মীয় সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।

তবে তাঁর সাহিত্যজীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি নিঃসন্দেহে মহাকাব্য ‘হিলট্রেক্সর দুক সুক’। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, ইতিহাস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের এক বিশাল কাব্যিক দলিল এই মহাকাব্য। চাকমা সাহিত্যে এর গুরুত্ব কেবল একটি সাহিত্যকর্মের নয়; এটি এক জাতির স্মৃতি, ইতিহাস ও আত্মার ভাষ্য।

মুকুন্দ চাকমার সাহিত্য পাঠ করলে উপলব্ধি করা যায়, তিনি শব্দের অলংকার নির্মাণে যতটা আগ্রহী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়বদ্ধ ছিলেন মানুষের প্রতি। তাঁর রচনায় প্রকৃতির সৌন্দর্য যেমন আছে, তেমনি আছে সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; আছে ধর্মীয় চেতনা, আবার আছে মানবিকতার গভীর আহ্বান। এই বহুমাত্রিকতাই তাঁকে সমকাল অতিক্রম করে কালজয়ী করে তুলেছে।

তাঁর অসামান্য সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ (বর্তমান চাঙমা সাহিত্য একাডেমি) তাঁকে ‘নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য পদক–২০২৩’ প্রদান করে। এছাড়া চাঙমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীও তাঁকে সম্মাননা জানায়। এই সম্মান কেবল একজন কবিকে নয়, চাকমা ভাষা ও সাহিত্যকে আজীবন সমৃদ্ধ করে তোলা এক মহৎ সাধককে নিবেদিত শ্রদ্ধাঞ্জলি।

আজ জীবনের অপরাহ্নে তিনি খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলার অঝাপাত স্কোয়ার সংলগ্ন মিলনপুর গ্রামের শান্ত পরিবেশে নিভৃতচারী জীবন কাটাচ্ছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকলেও তাঁর সৃষ্টি আজও নতুন প্রজন্মকে পথ দেখায়। কারণ সত্যিকারের কবির মৃত্যু হয় না; তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর শব্দে, তাঁর চিন্তায়, তাঁর জাতির স্মৃতিতে।

চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস যখনই লেখা হবে, মুকুন্দ চাকমার নাম সেখানে শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তিনি প্রমাণ করেছেন—একজন কৃষকের হাতেও যেমন লাঙল মানায়, তেমনি সেই হাতেই জন্ম নিতে পারে একটি জাতির আধুনিক সাহিত্যধারার শ্রেষ্ঠ কাব্য। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষই সবচেয়ে গভীর ভাষায় মানুষের কথা বলতে পারেন।

কবি মুকুন্দ চাকমা তাই কেবল একজন সাহিত্যিক নন; তিনি চাকমা জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক স্মৃতি, ভাষার অভিভাবক এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক সাহিত্য-জাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

শান্তির এক চিলতে রোদ এবং কুয়াশার আগ্রাসন- ইনজেব চাঙমা

আজ ৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার। গত এক সপ্তাহ ধরে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই চারপাশ প্লাবিত হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে যখন দেখি গত র...