পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্য-ইতিহাসে কিছু নাম কেবল ব্যক্তি-পরিচয়ে সীমাবদ্ধ থাকে না; তারা একটি যুগের প্রতিনিধি হয়ে ওঠেন। তাঁদের জীবন, সাহিত্য এবং সংগ্রাম মিলেমিশে জাতিসত্তার ইতিহাসের অংশে পরিণত হয়। কবি মুকুন্দ চাকমা তেমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু একজন কবি নন; তিনি চাকমা ভাষার আধুনিক কাব্যধারার অন্যতম প্রধান নির্মাতা, মাতৃভাষার নিবেদিতপ্রাণ সাধক এবং পাহাড়ের মানুষের জীবনসংগ্রামের এক বিশ্বস্ত কথক।
চাকমা আধুনিক সাহিত্যের সূচনায় যে নামটি শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, তিনি স্বর্গীয় চুণীলাল দেওয়ান। তাঁর হাতে রোপিত আধুনিক সাহিত্যচর্চার চারাগাছকে দীর্ঘ সাধনা, সৃজনশীলতা এবং গভীর জীবনবোধ দিয়ে মহীরুহে রূপ দিয়েছেন কবি মুকুন্দ চাকমা। তাই তাঁকে যথার্থই চাকমা আধুনিক কবিতার দ্বিতীয় প্রধান পুরুষ বলা হয়।
১৯৩১ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি বগা গোজার অন্তর্গত ধজ্যা গোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা অর্জুন চন্দ্র তালুকদার এবং মাতা শুভদ্রা চাঙমা। সহধর্মিণী নীলিমা চাঙমা। তাঁদের ছয় সন্তান—দেব জ্যোতি চাঙমা, পরিতোষ চাঙমা, জ্ঞানর আলো চাঙমা, অপরাজিতা চাঙমা, আলপনা চাঙমা এবং শতরূপা চাঙমা। পারিবারিক জীবন ও সাহিত্যসাধনার সমন্বয়ে তিনি এক আদর্শ মানবিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত।
ছাত্রজীবনেই তিনি মাতৃভাষার প্রতি গভীর অনুরাগ অনুভব করেন। চুণীলাল দেওয়ানের সাহিত্যচেতনা তাঁকে উদ্বুদ্ধ করে। কিন্তু দেশভাগ-পরবর্তী অস্থিরতা তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পথ রুদ্ধ করে দেয়। জীবিকার প্রয়োজনে কিছুদিন শিক্ষকতা করলেও শেষ পর্যন্ত তিনি কৃষিজীবনকেই আপন করে নেন। কিন্তু কৃষিকাজ কখনো তাঁর সাহিত্যচর্চার অন্তরায় হয়নি; বরং সেই জীবনই তাঁর কবিতার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।
কবি মুকুন্দ চাকমার সাহিত্য পড়লে বোঝা যায়, তিনি পাহাড়কে দূর থেকে দেখেননি; পাহাড়ের মাটি ছুঁয়ে, মানুষের সঙ্গে হেঁটে, প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস করেই লিখেছেন। তাঁর কবিতায় ঝরনার সুর যেমন আছে, তেমনি আছে জুমচাষির ঘামের গন্ধ; আছে বনভূমির সবুজ, আবার আছে বঞ্চনার দীর্ঘশ্বাস।
কৃষক ও কবি—এই দুই পরিচয় তাঁর জীবনে পরস্পরের পরিপূরক। উন্নত কৃষি, বিশেষ করে ইরি ধানের চাষাবাদ নিয়ে তিনি গান, কবিতা ও নাটক রচনা করেন। এসব রচনা গ্রামীণ সমাজে কৃষি-সচেতনতা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাঁর এই অসাধারণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৮ সালে দিঘীনালা থানা সার্কেল (উন্নয়ন) অফিস তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত করে।
সাহিত্য তাঁর কাছে কখনো নিছক নান্দনিকতার অনুশীলন ছিল না; বরং মানুষের অধিকারের ভাষা। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জুম্ম জনগণের অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার নির্বাচনী প্রচারণায় তাঁর কবিতা সংগ্রামী মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়েছিল। তাঁর দ্রোহমুখর কবিতা পাহাড়ি জনপদের মানুষের আত্মমর্যাদা ও অধিকারচেতনার শক্তিশালী ভাষ্যে পরিণত হয়েছিল।
জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায় আসে ১৯৮৬ সালে। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে তাঁকে নিজভূমি ছেড়ে শরণার্থীজীবন গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু নির্বাসন তাঁর কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি। কাঁটাতারের ওপারেও তাঁর কলম থেমে থাকেনি। মাতৃভূমির স্মৃতি, বিচ্ছেদের বেদনা এবং প্রত্যাবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তাঁর কবিতায় নতুন গভীরতা এনে দেয়। পরবর্তীকালে আগরতলায় তাঁর নির্বাসনপর্বের কবিতাগুলো গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।
ধর্মীয় সাহিত্যেও তাঁর অবদান পথিকৃৎসুলভ। দিঘীনালা বন বিহার থেকে চাকমা ভাষায় রচিত ‘ধর্মছদক’ গ্রন্থটি প্রথম ধর্মীয় সাহিত্যগ্রন্থ হিসেবে বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। এছাড়া ‘পরিত্রাণ সূত্র’, ‘বুদ্ধের জীবন ও কাহিনী’, ‘নন্দপাল মহাথেরোর জীবনকথা’ এবং ‘প্রাণের মায়া’ গ্রন্থসমূহ চাকমা ভাষায় বৌদ্ধধর্মীয় সাহিত্যের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
তবে তাঁর সাহিত্যজীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি নিঃসন্দেহে মহাকাব্য ‘হিলট্রেক্সর দুক সুক’। পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের সুখ-দুঃখ, ইতিহাস, প্রকৃতি, সংস্কৃতি, সংগ্রাম ও আত্মপরিচয়ের এক বিশাল কাব্যিক দলিল এই মহাকাব্য। চাকমা সাহিত্যে এর গুরুত্ব কেবল একটি সাহিত্যকর্মের নয়; এটি এক জাতির স্মৃতি, ইতিহাস ও আত্মার ভাষ্য।
মুকুন্দ চাকমার সাহিত্য পাঠ করলে উপলব্ধি করা যায়, তিনি শব্দের অলংকার নির্মাণে যতটা আগ্রহী, তার চেয়ে অনেক বেশি দায়বদ্ধ ছিলেন মানুষের প্রতি। তাঁর রচনায় প্রকৃতির সৌন্দর্য যেমন আছে, তেমনি আছে সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ; আছে ধর্মীয় চেতনা, আবার আছে মানবিকতার গভীর আহ্বান। এই বহুমাত্রিকতাই তাঁকে সমকাল অতিক্রম করে কালজয়ী করে তুলেছে।
তাঁর অসামান্য সাহিত্যসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ (বর্তমান চাঙমা সাহিত্য একাডেমি) তাঁকে ‘নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য পদক–২০২৩’ প্রদান করে। এছাড়া চাঙমা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীও তাঁকে সম্মাননা জানায়। এই সম্মান কেবল একজন কবিকে নয়, চাকমা ভাষা ও সাহিত্যকে আজীবন সমৃদ্ধ করে তোলা এক মহৎ সাধককে নিবেদিত শ্রদ্ধাঞ্জলি।
আজ জীবনের অপরাহ্নে তিনি খাগড়াছড়ি জেলার দিঘীনালা উপজেলার অঝাপাত স্কোয়ার সংলগ্ন মিলনপুর গ্রামের শান্ত পরিবেশে নিভৃতচারী জীবন কাটাচ্ছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকলেও তাঁর সৃষ্টি আজও নতুন প্রজন্মকে পথ দেখায়। কারণ সত্যিকারের কবির মৃত্যু হয় না; তিনি বেঁচে থাকেন তাঁর শব্দে, তাঁর চিন্তায়, তাঁর জাতির স্মৃতিতে।
চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস যখনই লেখা হবে, মুকুন্দ চাকমার নাম সেখানে শ্রদ্ধা ও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হবে। তিনি প্রমাণ করেছেন—একজন কৃষকের হাতেও যেমন লাঙল মানায়, তেমনি সেই হাতেই জন্ম নিতে পারে একটি জাতির আধুনিক সাহিত্যধারার শ্রেষ্ঠ কাব্য। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষই সবচেয়ে গভীর ভাষায় মানুষের কথা বলতে পারেন।
কবি মুকুন্দ চাকমা তাই কেবল একজন সাহিত্যিক নন; তিনি চাকমা জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক স্মৃতি, ভাষার অভিভাবক এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক সাহিত্য-জাগরণের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন