২৩ মে, ২০২৬। বান্দরবানের থানচি উপজেলা সদরের বুক চিরে বেরিয়ে এলো আর্তনাদ—পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ। পরদিন ২৪ মে, পুলিশের জালে ধরা পড়ল ষোলো বছরের এক কিশোর। ঘটনা মর্মান্তিক, নিঃসন্দেহে। কিন্তু পাহাড়ের বাতাসে ভেসে বেড়ানো প্রশ্নটা আরও গভীর: এটি কি নিছকই একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা, নাকি সবুজ পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা রক্তের দাগের আরও একটি নতুন বিন্দু?
পুলিশের খাতাই সাক্ষী দিচ্ছে—২০২৫ সালেই শুধু বান্দরবানে ১১টি শিশু আর দুই গৃহবধূর সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়েছে। একই বছরের ৫ মে, জুমখেতে কাজ করতে গিয়ে চিংমা খিয়াং নামের এক নারী ফিরে আসেননি আর। তার নিথর দেহ পাওয়া গিয়েছিল ঝোপের আড়ালে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিনিয়া চাকমার কণ্ঠে তখনও শোনা গেছে সেই চিরচেনা বাক্য—“তদন্ত চলমান”। পাহাড় জানে, এই “চলমান” শব্দটির আড়ালে কত দীর্ঘশ্বাস, কত অন্ধকার রাত জমে থাকে। কত মামলার ফাইল ধুলোয় চাপা পড়ে, আর কত অপরাধী নতুন শিকারের খোঁজে বের হয়।
এই অন্ধকারের হিসেব রেখেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত তাদের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন বলছে—এক বছরে ২৬টি ঘটনায় ৩২ জন জুম্ম নারী ও শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানি আর শারীরিক নির্যাতনের শিকার। সংখ্যা নয়, এ যেন পাহাড়ের প্রতিটি ঝরনার জলে মিশে যাওয়া অশ্রুর হিসেব। এ হিসেব বলে দেয়, জুম্ম নারীর শরীর আজও নিরাপদ নয়—না জুমখেতে, না ঘরের আঙিনায়।
তাই ২৫ মে, ২০২৬। রাঙামাটির রাজপথে নেমে এলো পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ আর হিল উইমেন্স ফেডারেশন। বিলাইছড়িতে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, থানচিতে শিশুকে ধর্ষণ, আর রাজধানীতে শিশু রামিসার হত্যাকাণ্ড—সব ক্ষোভ একসাথে গর্জে উঠল শ্লোগানে। দাবি একটাই, স্পষ্ট আর তীক্ষ্ণ: দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার।
কিন্তু প্রশ্নটা রয়েই যায়—এই মিছিল, এই শ্লোগান, এই কান্না—রাষ্ট্র কি শুনতে পায়? চাকমা প্রবাদ আছে—“এ্যাদো কিয়েত কুগুরে বুগানা”। যার অর্থ, ডেকে কোনো লাভ নেই, সে শুনেও শুনবে না। পাহাড়ের মানুষের কাছে রাষ্ট্রের ভূমিকা আজ সেই কুকুরের মতোই—ডাক শুনেও নির্বিকার।
অপরাধ যখন শাস্তি পায় না, তখন তা আর অপরাধ থাকে না, হয়ে ওঠে সংস্কৃতি। পাহাড়ে ধর্ষণ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি বিচারহীনতার এক স্থায়ী ব্যাধি। প্রতিটি দেরি করা বিচার, প্রতিটি ধামাচাপা দেওয়া মামলা অপরাধীর হাতে তুলে দিচ্ছে নতুন করে অস্ত্র। আর ধর্ষণের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই এক পতাকা, এক মানচিত্রের কথা বলে, তবে তার প্রথম প্রমাণ দিতে হবে পাহাড়ের নারী ও শিশুর নিশ্বাসের নিরাপত্তা দিয়ে। কারণ পতাকা শুধু কাপড়ের টুকরো নয়, এটি ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে পাহাড়ের প্রতিটি ঝিরি অভিমানে শুকিয়ে যাবে, প্রতিটি জুমঘর থেকে উঠবে প্রতিবাদের আগুন।
আর তখন প্রশ্নটা আরও কঠিন হয়ে ফিরে আসবে—রাষ্ট্র কি শুনছে? নাকি পাহাড়ের কান্না শুধু পাহাড়েই প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে যাচ্ছে?
তথ্যসূত্র: হিল ভয়েচ ও দৈনিক প্রথম আলো (২৫ মে ২০২৬)
