বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

বর্ণের আলোয় স্বাধিকার: এক ভাষার সংগ্রাম থেকে অন্য ভাষার বঞ্চনা- ইনজেব চাঙমা

Injeb Changma
ইতিহাসের পাতায় কোনো জাতির আত্মপরিচয়ের প্রথম ও প্রধান দলিল তার ভাষা। ১৯৫২ সালের এক রক্তঝরা ফাল্গুনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৫৬ ভাগ মানুষের বুকের ভাষা বাংলা, ৩৭ ভাগ মানুষ কথা বলে অন্যান্য ভাষায়, আর মাত্র ৭ ভাগ মানুষের মুখের ভাষা উর্দু, সেই উর্দুকেই তারা করতে চেয়েছিল রাষ্ট্রের একমাত্র লাঠি। সেখানে অন্যায্যভাবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদেই অঙ্কুরিত হয়েছিল আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন। সেই ভাষার লড়াই, ত্যাগের বহ্নিশিখা এবং দীর্ঘ পথচলার পরিণতিতেই আজকের এই লাল-সবুজের মানচিত্র, সার্বভৌম এক রাষ্ট্র, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। যে ত্যাগের মহিমাকে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। কিন্তু যে দেশের জন্মই হয়েছিল ভাষার অধিকারকে কেন্দ্র করে, সেই দেশেই কি সব ভাষার বর্ণমালা তাদের নিজস্ব নীড় খুঁজে পেয়েছে?

রাষ্ট্র গঠনের প্রারম্ভেই স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের অবিসংবাদিত নেতা, জুম্ম জাতির পিতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এক ঐতিহাসিক সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি দৃপ্তকণ্ঠ অথচ গভীর বেদনায় বলেছিলেন—
“বাংলা আমার রাষ্ট্রভাষা, কিন্তু আমার মাতৃভাষা চাঙমা। আমি চাঙমা ভাষায় পড়াশোনা করতে চাই।”

এই বাক্যটি কেবল একজন ব্যক্তির দাবি ছিল না; এটি ছিল কোনো এক ভূখণ্ডের বহুভাষিক আত্মপরিচয়ের আকুল আবেদন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, যে রাষ্ট্র নিজেই ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিল, সেই রাষ্ট্র সেইদিন এই অমোঘ সত্যকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। পাহাড়ের শিশুদের মনের ভেতরের এই দাবি বহু বছর ধরে কেবল প্রতিধ্বনি হয়েই ফিরে এসেছে, মূল স্রোতে মেশেনি।

কালক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হলো, প্রতিশ্রুতি এল। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে আদিবাসী শিশুদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার কথা অন্তর্ভুক্ত করা হলো। কিন্তু নীতির কাগজ থেকে শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে সেই অধিকার পৌঁছাতে লেগে গেল আরও দীর্ঘ সময়।

২০১৭ সালে এসে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হলেও, অবকাঠামো, শিক্ষক ও সদিচ্ছার অভাবে সেই বইগুলো আজও সঠিক অর্থে শিশুদের হাত ধরে শ্রেণিকক্ষে প্রাণবন্ত হতে পারেনি। অন্যদিকে, ২০১৪ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সর্বস্তরে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ও নামফলকে অন্যান্য ভাষার অযাচিত মিশ্রণ বন্ধের রায় দেন। একটি ভাষাকে স্বকীয়তায় বাঁচিয়ে রাখার এই তাড়না প্রশংসনীয়, তবে সেই একই সংবেদনশীলতা কি দেশের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক ও আদিবাসীদের ভাষার ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা ছিল না?

ভাষায় শুধু কথা বলা যায় না, ভাষাতে স্বপ্ন দেখা যায়, আত্মাকে স্পর্শ করা যায়। যখন একজন চাঙমা শিশু তার নিজের বর্ণমালায় প্রথম ”চুচ্যাঙ্যা- কা, গুজঙ্যা- খা, চান্দ্যা- গা” লিখতে শেখে না, তখন কেবল একটি বর্ণমালা হারিয়ে যায় না, বরং একটি ইতিহাস ও সংস্কৃতির শিকড় আলগা হয়ে যায়।

আজ তাই আবার মনে পড়ে যায় সেই ঐতিহাসিক দাবি, যা আজও ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে জবাব খোঁজে:
“আমি আমার চাঙমা ভাষায় পড়াশোনা করতে চাই!”
হে রাষ্ট্র, হে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন এই মাটির তলের সুর?

যে মাটি রক্তের বিনিময়ে ভাষার অধিকার অর্জন করেছে, সেই মাটি কি আরেকটি ভাষার স্বাভাবিক বিকাশকে বুকে জড়িয়ে নেবে না? শাসনের কঠোরতা নয়, মাতৃভাষার অধিকার হোক প্রতিটি শিশুর জন্মগত প্রাপ্তি। যেন দেশের প্রতিটি সন্তান নিজ নিজ মায়ের ভাষায় চোখ মেলে স্বপ্ন দেখতে পারে, অনুভবে ছড়িয়ে দিতে পারে তার সাহিত্যের আলো।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

বর্ণের আলোয় স্বাধিকার: এক ভাষার সংগ্রাম থেকে অন্য ভাষার বঞ্চনা- ইনজেব চাঙমা

Injeb Changma ইতিহাসের পাতায় কোনো জাতির আত্মপরিচয়ের প্রথম ও প্রধান দলিল তার ভাষা। ১৯৫২ সালের এক রক্তঝরা ফাল্গুনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৫...