শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু পাহাড়, অরণ্য আর নদীর ভূগোল নয়; এটি ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা, আত্মপরিচয় এবং অধিকার-চেতনার এক দীর্ঘ অভিযাত্রার নাম। এই ভূখণ্ডের মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে মিশে আছে প্রকৃতি, জুমচাষ, নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা, গান, নৃত্য, সাহিত্য ঐতিহ্য। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই আত্মপরিচয় বহন করে চলেছে জুম্ম জনগোষ্ঠী। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন প্রজন্মের যে কজন তরুণ-তরুণী শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিকতা সামাজিক দায়বদ্ধতাকে জীবনের অনুষঙ্গ করে সামনে এগিয়ে চলেছেন, হেমা চাকমা তাঁদের অন্যতম।

পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদ পানছড়ির ২ নম্বর চেঙ্গী ইউনিয়নের নম্বর ওয়ার্ডের তারাবন জগৎ মোহন পাড়ার মাটিতে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০০২ সালে হেমা চাকমার জন্ম। তাঁর শৈশবের প্রথম পাঠশালা বনশ্রী শিশু নিকেতন। তাঁর পিতা অনিল চন্দ্র চাকমা (সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান)। মা, মিনতি চাকমা। বড় ভাই অমর প্রিয় চাকমা।

হেমার শৈশব কেটেছে পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের জীবন এবং সমাজের বাস্তবতার খুব কাছাকাছি। যে ভূখণ্ডে শিশুর চোখ প্রথম আকাশ দেখে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে, যে জনপদে নদী শুধু জলধারা নয়, জীবনের অংশ, যে সমাজে ভাষা সংস্কৃতি মানুষের পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ, সেই পরিবেশ তাঁর মনোজগৎকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। তাই পরবর্তী জীবনে মানবাধিকার, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ভাষা মানুষের জীবন নিয়ে তাঁর যে আগ্রহ দেখা যায়, তার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় এই শৈশবেই।

শিক্ষাজীবনের শুরু পুজগাংমুখ বনশ্রী শিশু নিকেতনে। এরপর পুজগাংমুখ উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে ২০১৮ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ২০২০ সালে চট্টগ্রাম সরকারি মহিলা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

পাহাড়ের নিভৃত পল্লি থেকে দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠে পৌঁছানোর এই যাত্রা নিছক শিক্ষাগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি আত্মবিশ্বাস, অধ্যবসায় স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার গল্প। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বহুমাত্রিক পরিবেশে এসে তাঁর চিন্তার পরিধিও আরও বিস্তৃত হয়েছে। স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, বৈষম্য, অধিকার, শিক্ষা, সংস্কৃতি সামাজিক ন্যায়বিচার, বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর আগ্রহ ক্রমে সক্রিয় সামাজিক চেতনায় রূপ নেয়।

হেমা চাকমার ব্যক্তিত্বের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি হলো তাঁর মানবিক দায়বদ্ধতা। মানুষের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য এবং অবহেলার বিরুদ্ধে তাঁর কণ্ঠ সোচ্চার। তিনি মনে করেন, সমাজের পিছিয়ে থাকা মানুষকে কেবল সহানুভূতি নয়, প্রয়োজন সম্মান, সুযোগ ন্যায্য অধিকার। অনাথ, অসহায় দরিদ্র মানুষের জীবন তাঁকে নাড়া দেয়। তাঁদের জীবনসংগ্রামকে গল্প, সাহিত্য সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের সামনে তুলে ধরার আকাঙ্ক্ষা তাঁর মানবিক সত্তার পরিচয় বহন করে।

শুধু মানবাধিকারের প্রশ্নেই নয়, শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রেও তাঁর আগ্রহ গভীর। পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার সুযোগ, সচেতনতা জ্ঞানচর্চার প্রয়োজনীয়তা তিনি উপলব্ধি করেন। স্বাস্থ্য অর্থনীতি সম্পর্কেও সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির বিষয়টি তাঁর কর্মকাণ্ডের অন্যতম ক্ষেত্র। ফলে তাঁর সামাজিক চিন্তা কোনো একটি বিষয়ের মধ্যে আবদ্ধ নয়; বরং মানুষের সামগ্রিক জীবনমান মর্যাদাকে কেন্দ্র করে বিস্তৃত।

হেমার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় একজন সংস্কৃতিমনস্ক তরুণী হিসেবে। চাকমা ভাষা বর্ণমালা তাঁর কাছে কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এগুলো তাঁর জাতিসত্তার স্মৃতি আত্মপরিচয়ের বাহক। চাকমা হরফ বা বর্ণমালা নিয়ে গবেষণা চর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ নিজের সাংস্কৃতিক শিকড়কে জানার এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তা পৌঁছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।

সংগীত, নৃত্য, কবিতা লেখা আবৃত্তি তাঁর সৃজনশীলতার নানা দিক। প্রকৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসাও এই সৃজনশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। পাহাড়ের বাতাস, বৃষ্টি, নদী, অরণ্য মানুষের জীবন, এসব তাঁর অনুভূতির জগতে নানা রঙে প্রতিফলিত হয়। কখনো তিনি কবিতায়, কখনো গানে, কখনো বক্তব্যে, আবার কখনো সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ করেন।

সাহিত্যের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক ক্রমশ দৃঢ় হয়েছে। Kok Creativities-এর উদ্যোগে প্রকাশিত আবেদি নামে যৌথ কাব্যগ্রন্থে তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে। বিশেষ তাৎপর্যের বিষয়, সংকলনটি সম্পূর্ণ চাকমা বর্ণমালায় প্রকাশিত হয়েছে। এই অংশগ্রহণ তাঁর কাছে শুধু কবি হিসেবে আত্মপ্রকাশ নয়; বরং নিজস্ব লিপি ভাষার প্রতি ভালোবাসাকে সৃজনশীলতার মাধ্যমে প্রকাশ করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

হেমার রাজনৈতিক সামাজিক চেতনার ক্ষেত্রেও রয়েছে দৃঢ়তা। জুম্ম জাতীয়তাবাদ, আত্মপরিচয় আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার বিষয়ে তাঁর অবস্থান আপসহীন বলে তাঁর পরিচিতজনদের বর্ণনায় উঠে আসে। বৈষম্যবিরোধী মনোভাব এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী অবস্থান তাঁর চিন্তার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। ২০২৫ সালের ডাকসু নির্বাচনে তিনি কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং নির্বাচিত হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত ফলাফলে হেমা চাকমার প্রাপ্ত ভোট ,৯০৮ এবং তাঁকে নির্বাচিত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডাকসুর নির্বাচনী যাত্রা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পাহাড়ের প্রত্যন্ত গ্রামের একজন তরুণী দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোর একটির কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদে প্রতিনিধিত্বের সুযোগ অর্জন করেছেন, এটি নিঃসন্দেহে তাঁর শিক্ষাজীবন সামাজিক সম্পৃক্ততার একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন। তাঁর এই সাফল্য পাহাড়ের অনেক তরুণ-তরুণীর কাছেও উচ্চশিক্ষা নেতৃত্বের নতুন সম্ভাবনার প্রতীক হয়ে উঠেছে। সংবাদ প্রতিবেদনে তাঁর নির্বাচিত হওয়ার বিষয়টিকে পানছড়ি পাহাড়ের মানুষের জন্য গৌরবের ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

তবে হেমা চাকমাকে শুধু একটি নির্বাচনী পরিচয়ে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাঁর জীবনযাত্রার বিস্তৃত পরিসরে রয়েছে সামাজিক যোগাযোগ, সাংস্কৃতিক চর্চা, কবিতা, সংগীত, নৃত্য, ভাষা বর্ণমালা নিয়ে আগ্রহ, প্রকৃতিপ্রেম এবং মানুষের জীবন নিয়ে ভাবনা। তিনি বিজ্ঞানমনস্ক; যুক্তি অনুসন্ধিৎসাকে গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে তাঁর মধ্যে রয়েছে প্রবল কৌতূহল, হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনের সন্ধান থেকে শুরু করে ধাঁধা সমাধান, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো কিংবা মাছ ধরার মতো স্বাভাবিক আনন্দের মধ্যেও তাঁর জীবনের প্রাণবন্ত সত্তাটি প্রকাশ পায়।

ব্যক্তিত্বের দিক থেকে হেমা আবেগী, জেদী কখনো কখনো রাগী। কিন্তু তাঁর এই আবেগের মধ্যেই রয়েছে গভীর মমতা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর কঠোরতা এবং মানুষের কষ্টের প্রতি তাঁর কোমলতা, এই দুই বিপরীত বৈশিষ্ট্য মিলেই তাঁর ব্যক্তিত্বকে স্বতন্ত্র করেছে। বিতর্কে তিনি নির্ভীক, বক্তব্যে অকপট এবং নিজের বিশ্বাসের জায়গায় দৃঢ়। তাঁর কাছে নীরব থাকা অনেক সময় অন্যায়ের প্রতি সম্মতির মতো; তাই প্রয়োজন হলে তিনি প্রশ্ন করেন, কথা বলেন এবং নিজের অবস্থান তুলে ধরেন।

হেমা চাকমার জীবনকে যদি একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে তার উৎস পাহাড়ের একটি ছোট্ট জনপদ, আর তার স্রোত আজ বিস্তৃত হয়েছে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, মানবাধিকার সামাজিক নেতৃত্বের নানা ভূখণ্ডে। তাঁর জীবনের পথ এখনও দীর্ঘ। সামনে আরও শিক্ষা, আরও অভিজ্ঞতা, আরও সংগ্রাম এবং আরও সৃজনশীলতার সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে।

পাহাড়ের মাটি থেকে উঠে এসে জাতীয় পরিসরে নিজের পরিচয় তৈরি করা কোনো সহজ যাত্রা নয়। এই পথের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন সাহস, অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। হেমা চাকমার মধ্যে সেই সম্ভাবনার অনেকগুলো উপাদান ইতিমধ্যেই দৃশ্যমান।

তাঁর হাতে যেমন কবিতার কলম, তেমনি কণ্ঠে প্রতিবাদের ভাষা; তাঁর চোখে যেমন পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি, তেমনি ভবিষ্যৎ সমাজের স্বপ্ন। নিজের ভাষা বর্ণমালার প্রতি ভালোবাসা তাঁকে শেকড়ের কাছে রাখে, আর শিক্ষা যুক্তিবোধ তাঁকে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নেয়। এই দুইয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠতে পারে একজন পূর্ণাঙ্গ মানবিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব।

হেমা চাকমার গল্প তাই কেবল একজন তরুণীর জীবনী নয়; এটি পাহাড়ের এক প্রজন্মের স্বপ্ন, সংগ্রাম সম্ভাবনারও প্রতিচ্ছবি। যে প্রজন্ম নিজের পরিচয় ভুলে যেতে চায় না, অথচ বিশ্বজ্ঞান থেকেও বিচ্ছিন্ন থাকতে চায় না; যে প্রজন্ম সংস্কৃতিকে ভালোবাসে, কিন্তু কুসংস্কারকে নয়; যে প্রজন্ম অধিকার চায়, কিন্তু তার সঙ্গে শিক্ষা, যুক্তি মানবিকতাকেও সামনে রাখতে চায়, হেমা চাকমা সেই প্রজন্মেরই এক সাহসী প্রতিনিধি।

পাহাড়ের পথ কখনোই সরল নয়। তবু পথ যত দুর্গমই হোক, স্বপ্ন যদি অটুট থাকে, তবে ছোট্ট একটি পাড়ার মেয়ে একদিন দেশের বৃহত্তর পরিসরে নিজের কণ্ঠ পৌঁছে দিতে পারে। হেমা চাকমার জীবন সেই সম্ভাবনারই এক চলমান অধ্যায়, যার পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলো কি করবে-হবে এখনও লেখা বাকি …………….। 

তথ্য: ইন্দ্রলাল চাঙমা, প্রধান শিক্ষক পুজগাঙমুখ উচ্চ বিদ্যালয়, পানছড়ি।  

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা

পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু পাহাড় , অরণ্য আর নদীর ভূগোল নয় ; এটি ইতিহাস , সংস্কৃতি , ভাষা , আত্মপরিচয় এবং অধিকার - চেতনার এক দীর্ঘ অ...