পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়, অরণ্য আর নদীঘেরা জনপদে বেড়ে ওঠা এক তরুণের নাম শ্লোক চাঙমা। মাতৃভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর মমত্ববোধকে হৃদয়ে ধারণ করে তিনি ধীরে ধীরে নিজেকে যুক্ত করেছেন সমাজ ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে। তাঁর পথচলা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি নিজের ভাষা ও শিকড়কে ভালোবাসার এক নীরব প্রত্যয়ের গল্প।
৩১ অক্টোবর ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলার ভক্ত কার্বারি পাড়া গ্রামে শ্লোক চাঙমার জন্ম। তাঁর পিতা মিত্র সাধন চাকমা এবং মাতা দিপ্তা চাঙমা। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। শৈশব থেকেই পার্বত্য জনপদের প্রকৃতি, মানুষ ও জীবনযাত্রার সঙ্গে তাঁর নিবিড় পরিচয় গড়ে ওঠে। সেই পরিচয়ের ভেতরেই জন্ম নেয় সমাজ ও মানুষের প্রতি তাঁর দায়বোধ।
শিক্ষাজীবনে তিনি রাবতা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে দিঘীনালা সরকারি কলেজ থেকে আইএ সম্পন্ন করেন। কলেজজীবনেই তাঁর মধ্যে সামাজিক চেতনার বিকাশ ঘটে। পড়াশোনার পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি সমাজ উন্নয়নমূলক নানা কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেন। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তী সময়ে তাঁর সাংগঠনিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ভিতকে আরও দৃঢ় করে।
শ্লোক চাঙমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ২০১৯ সালে, যখন তিনি চাঙমা সাহিত্য একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হন। সেই থেকে ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি তাঁর ভালোবাসা ক্রমশ কর্মে রূপ নিতে থাকে। সংগঠনের নানা কার্যক্রমে সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন একজন নিবেদিতপ্রাণ সাংস্কৃতিক কর্মী। বর্তমানে তিনি চাঙমা সাহিত্য একাডেমি কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেও শ্লোক চাঙমা তাঁর নিজস্ব পদচিহ্ন রেখে চলেছেন। তাঁর রচিত ‘মা ভাচ শিঘি’ নাটিকাটি তাঁর সৃজনশীলতার একটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশ। নাটকের পাশাপাশি কবিতাতেও রয়েছে তাঁর বিচরণ। ‘আবেদি’ নামে একটি যৌথ কাব্যগ্রন্থে তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে; গ্রন্থটি KOK Creatives-এর উদ্যোগে প্রকাশিত। তাঁর সাহিত্যচর্চায় ব্যক্তিমানসের অনুভবের পাশাপাশি শিকড়, সমাজ ও সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতার ছাপও লক্ষ করা যায়।
তবে শ্লোক চাঙমার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাজগুলোর একটি হলো চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা শিক্ষা কার্যক্রম। লংগদু উপজেলায় তিনি চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা কোর্স পরিচালনা করছেন। একটি ভাষা শুধু কথার বাহন নয়—তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে মাতৃভাষা ও নিজস্ব বর্ণমালাকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করেছেন।
তরুণ বয়সেই শ্লোক চাঙমার এই পথচলা যেন নিজের শিকড়ের দিকে ফিরে যাওয়ার এক নিরন্তর যাত্রা। সমাজসেবা থেকে সংগঠন, সংগঠন থেকে সাহিত্য, আর সাহিত্য থেকে মাতৃভাষার সংরক্ষণ- তাঁর কর্মজীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন একই স্রোতে এসে মিলেছে। সেই স্রোতের নাম ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা।
আজকের দিনে যখন পৃথিবীর বহু ক্ষুদ্র ভাষা ও সংস্কৃতি অস্তিত্ব রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি, তখন শ্লোক চাঙমার মতো তরুণদের উদ্যোগ আশার আলো জ্বালায়। তাঁর হাতে বর্ণমালার অক্ষর শুধু লেখা হয়ে ওঠে না- তা হয়ে ওঠে শিকড়ের স্মৃতি, আত্মপরিচয়ের ভাষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে রেখে যাওয়া এক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
শ্লোক চাঙমার এই যাত্রা এখনও চলমান। সামনে তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে আরও বিস্তৃত সাহিত্যকর্ম, সাংগঠনিক দায়িত্ব এবং মাতৃভাষার সেবায় আরও গভীর সম্পৃক্ততার সম্ভাবনা। পাহাড়ের নীরব মাটিতে জন্ম নেওয়া এই তরুণের কলম ও কর্ম যেন আগামী দিনে চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের আকাশে আরও কিছু উজ্জ্বল অক্ষর লিখে যায়, এই প্রত্যাশাই রইল।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন