“পাহাড়ী ছাত্র-ছাত্রী দল, জ্ঞান মশাল জ্বালিয়ে এগিয়ে চল”, লাক লাক রাঙাবেল জ্বলিবো”, “এক্কো রেত্তো এল, স্ববনে কাদি গেল”, “জুম্মবী কমলে আহ্দিবে ম ধাগত”, “রেত্তো জনম্মুঅ ন থেব”, “এ্যাল এ্যাল আমাদেজ' মোন মুরোউন”, “কৃষ্ণচুড়ো রঙে পত্থান রাঙেয়্যে”, “এল' এল' বারিঝে রিনি চা পরাণী”, “এই শহরর নাঙান রাঙামাত্যে”, “বেইন বুনের গাভুরি থুরচুমা লারিনে”, “হিল্ল মিলাবো জুমত যায়দে”, “তুই একদিন আহ্’রে যেবেগোই সাগরত”—
চাকমা সংগীতের ভুবনে এমন অসংখ্য গান রয়েছে, প্রথম পঙ্ক্তি উচ্চারিত হলেই চাকমা সংগীতপ্রেমীদের হৃদয়ে আজও এক অনির্বচনীয় আবেগের ঢেউ জেগে ওঠে। পাহাড়ের সবুজ, জুমচাষের জীবন, কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি, প্রেম-বিরহ, প্রকৃতি, স্বপ্ন এবং জাতিসত্তার গভীর অনুভব—সবকিছু যেন একসূত্রে গাঁথা হয়েছে তাঁর গানের কথা ও সুরের জগতে। আধুনিক চাকমা সংগীতের এই স্মরণীয় সৃষ্টিগুলোর পেছনে যে সৃজনশীল মনন কাজ করেছে, তিনি হলেন আধুনিক চাকমা সাহিত্য, গবেষণা ও সংগীতের অন্যতম অগ্রপথিক সুগত চাকমা (ননাধন)।
যে মানুষ কলমকে কেবল সাহিত্যসৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে নয়, বরং একটি জাতির ইতিহাস, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের বাহন হিসেবে ধারণ করেন, তাঁর কর্ম সময়ের সীমানা অতিক্রম করে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়। সুগত চাকমা (ননাধন) সেই বিরলপ্রজ সাহিত্যসাধকদের একজন, যিনি কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা, ইতিহাসচর্চা এবং গীতরচনার মাধ্যমে চাকমা সাহিত্যকে আধুনিকতার এক নতুন উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মে যেমন শিল্পের সৌন্দর্য রয়েছে, তেমনি রয়েছে ইতিহাসের অনুসন্ধান, ভাষাবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি এবং জাতিসত্তার গভীর আত্মবোধ।
১৯৫১ সালের ২৪ মার্চ পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটিতে সুগত চাকমার জন্ম। শৈশব থেকেই তিনি পাহাড়ের অপরূপ প্রকৃতি, কাপ্তাই হ্রদের বিস্তৃত জলরাশি, জুমচাষের জীবনধারা, লোকঐতিহ্য এবং চাকমা সমাজের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের মধ্যে বেড়ে ওঠেন। পাহাড়ের প্রকৃতি তাঁর কাছে নিছক সৌন্দর্যের বিষয় ছিল না; বরং তা হয়ে উঠেছিল জীবন, স্মৃতি, সমাজ ও ইতিহাসকে বোঝার এক জীবন্ত পাঠশালা। পরবর্তী সময়ে তাঁর কবিতা, গান ও গবেষণাকর্মে পাহাড়ি জীবনের যে গভীর প্রতিফলন দেখা যায়, তার শিকড় খুঁজে পাওয়া যায় এই শৈশবের অভিজ্ঞতার মধ্যেই।
শিক্ষাজীবনে সুগত চাকমা ছিলেন মেধাবী ও অধ্যবসায়ী। ১৯৭৭ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে এম.এসসি. ডিগ্রি অর্জন করেন। বিজ্ঞানের কঠোর যুক্তিবাদী ও বিশ্লেষণী পদ্ধতি তাঁর চিন্তার জগতে গভীর প্রভাব ফেলে। পরবর্তীকালে ভাষা, ইতিহাস ও সংস্কৃতির গবেষণায়ও তাঁর এই বিশ্লেষণী দৃষ্টিভঙ্গির স্বাক্ষর পাওয়া যায়।
ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ তাঁকে একসময় গবেষণার বিস্তৃত জগতে নিয়ে যায়। ২০০২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট থেকে “পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা ও উপভাষার শ্রেণীকরণ” বিষয়ে গবেষণা করে এম.ফিল. ডিগ্রি অর্জন করেন। বিজ্ঞানশিক্ষায় অর্জিত বিশ্লেষণী মনন এবং ভাষা-সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগের এই সমন্বয় তাঁর গবেষণাকে দিয়েছে স্বাতন্ত্র্য ও গভীরতা।
১৯৭০-এর দশকের সূচনালগ্নেই সুগত চাকমা সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। এটি ছিল আধুনিক চাকমা সাহিত্যের বিকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, গবেষণা ও ইতিহাসচর্চাকে একই সৃজনধারায় প্রবাহিত করে চাকমা সাহিত্যকে নতুন মাত্রা প্রদান করেন। আধুনিক চাকমা কবিতার ইতিহাসে তাঁকে অন্যতম অগ্রগামী এবং শক্তিশালী রোমান্টিক কবি হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়।
তাঁর কবিতায় প্রেম ও প্রকৃতির মাধুর্য যেমন অনুরণিত হয়েছে, তেমনি জাতিসত্তা, ভাষা, ইতিহাস, সংস্কৃতি, আত্মমর্যাদা এবং অস্তিত্ব রক্ষার চেতনাও গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। সহজ, সুরময় ও আবেগঘন ভাষার সঙ্গে গবেষণালব্ধ জ্ঞানের সংমিশ্রণ তাঁর সাহিত্যকে করেছে স্বতন্ত্র।
সুগত চাকমার সাহিত্যজীবনের অন্যতম শক্তিশালী দিক তাঁর গবেষণাকর্ম। ১৯৭৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিকীতে প্রকাশিত ‘চাকমাদের ইতিহাস’ প্রবন্ধ তাঁকে একজন সম্ভাবনাময় গবেষক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। পরবর্তীকালে ‘শাক্য থেকে চাকমা, মগধ থেকে রাঙ্গামাটি’ প্রবন্ধে তিনি চাকমা জাতি ও ভাষার উৎপত্তি বিষয়ে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন, যা গবেষক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়।
তাঁর গবেষণার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি ইতিহাসকে কেবল ঘটনাপঞ্জি হিসেবে দেখেননি। ভাষা, সংস্কৃতি, সমাজ, লোকবিশ্বাস, ঐতিহ্য ও নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের সমন্বিত আলোকে তিনি ইতিহাসকে অনুধাবনের চেষ্টা করেছেন। ফলে তাঁর রচনাগুলো পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চায় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত।
১৯৭৮ সালে তিনি তৎকালীন উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, বর্তমান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙামাটি- এর সহকারী পরিচালক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি গবেষণা, প্রকাশনা, লোকসংস্কৃতি সংরক্ষণ, শিল্পী গঠন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে একই প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে তিনি অবসর গ্রহণ করেন। তবে অবসর তাঁর সৃজনশীল জীবনের সমাপ্তি ঘটাতে পারেনি। প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নিলেও ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও গবেষণার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা অব্যাহত থাকে।
তিনি কেবল একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছিলেন না; ছিলেন একজন দূরদর্শী সাংস্কৃতিক পরিকল্পনাবিদও। তাঁর উদ্যোগ ও সহযোগিতায় পার্বত্য অঞ্চলের ভাষা, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। বহু শিল্পী, গবেষক ও সাহিত্যিক তাঁর উৎসাহ, দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতায় নিজেদের সৃজনশীল পথকে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ পেয়েছেন।
দেশের গণ্ডি পেরিয়েও সুগত চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রামের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরেছেন। ২০০৮ সালে থাইল্যান্ডের আয়ুথিয়ায় অনুষ্ঠিত UNESCO Award of Excellence কর্মশালায় UNDP-CHTDF-এর প্রতিনিধি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। একই বছরের ডিসেম্বরে ভিয়েতনামের হ্যানয়ে অনুষ্ঠিত Promoting and Preservation of Cultural Diversity এবং ASEM Conference-এ প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে অংশ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক পরিসরে উপস্থাপন করেন।
সুগত চাকমার রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের পরিসর বিস্তৃত। তাঁর উল্লেখযোগ্য প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে—
- চাঙমা-বাঙলা কধাতারা (চাকমা-বাংলা অভিধান) (১৯৭৩)
- রংধং — চাকমা কবিতার গ্রন্থ (১৯৭৮)
- চাকমা পরিচিতি (১৯৮৩)
- বাংলাদেশের উপজাতি (১৯৮৫)
- পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতীয় ভাষা (১৯৮৮)
- চাকমা রূপকথা (১৯৯৫)
- চাকমা ও ঢাক ইতিহাস আলোচনা (২০০০)
- বাংলাদেশের উপজাতি ও আদিবাসীদের সমাজ, সংস্কৃতি ও আচার-ব্যবহার (২০০০; দ্বিতীয় সংস্করণ ২০০২)
- বাংলাদেশের চাকমা ভাষা ও সাহিত্য (২০০২)—চাকমা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসভিত্তিক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আকরগ্রন্থ
- আদিবাসী জনগোষ্ঠী (২০০৭)—বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির প্রকাশনা; অন্যতম সম্পাদক
- পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি (২০০৯)—পার্বত্য অঞ্চলের নৃগোষ্ঠীগুলোর সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগ্রন্থ
- ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সামাজিক প্রথা ও রীতিনীতি: চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরা (২০১১)
- খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার চাকমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থা (২০১৯)
এই গ্রন্থসম্ভার থেকে স্পষ্ট হয়- সুগত চাকমার সাহিত্যচর্চা কোনো একক শাখায় সীমাবদ্ধ ছিল না। ভাষা, ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি, লোককথা ও নৃতত্ত্ব-বহু শাখাকে তিনি একই জ্ঞানভুবনের অংশ হিসেবে দেখেছেন।
তবে সুগত চাকমার সৃষ্টিশীল পরিচয়ের সবচেয়ে আবেগময় অধ্যায়গুলোর একটি তাঁর গীতরচনা। তিনি আধুনিক চাকমা গানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গীতিকার। তাঁর গানে পাহাড়ি জনজীবনের সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ, প্রকৃতির রূপমাধুর্য, জাতিগত স্মৃতি ও মানবিক অনুভূতি এক অপূর্ব শিল্পরূপ লাভ করেছে।
তাঁর গানের ভাষায় যেমন প্রেমের কোমলতা আছে, তেমনি আছে পাহাড়ের মাটির গন্ধ। কোথাও কাপ্তাইয়ের জলরাশি, কোথাও জুমের জীবন, কোথাও প্রিয়জনের স্মৃতি, আবার কোথাও জাতিসত্তার গভীর আকুলতা, সব মিলিয়ে তাঁর গান হয়ে উঠেছে চাকমা জীবনের এক সাংস্কৃতিক দলিল।
এই কারণেই তাঁর বহু গান কেবল গান হয়ে থাকেনি; প্রজন্মের স্মৃতির অংশ হয়ে উঠেছে। সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, সংগীতের উপস্থাপনার ধরন বদলেছে—কিন্তু তাঁর গানের আবেগ ও আবেদন আজও অম্লান।
সাহিত্য, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের ব্যস্ত জীবনের পাশাপাশি সুগত চাকমার ব্যক্তিজীবনও ছিল পারিবারিক বন্ধন ও সহযাত্রিতায় সমৃদ্ধ। ১৫ জুলাই ১৯৮০ খ্রিস্টাব্দে তিনি শীলা চাঙমার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। দীর্ঘ জীবনের পথচলায় শীলা চাঙমা তাঁর সহধর্মিণী ও সহযাত্রী হিসেবে পাশে থেকেছেন।
তাঁদের পারিবারিক জীবনে রয়েছে এক পুত্র ও এক কন্যা। পুত্র সুবর্ণ চাঙমা, যিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিদপ্তরে উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত। কন্যা শ্রাবস্তী চাঙমা, যিনি জাতিসংঘের সহায়তাধীন চিকিৎসা কার্যক্রমে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের নিজ নিজ কর্মজীবনের প্রতিষ্ঠা সুগত চাকমার পারিবারিক মূল্যবোধ, শিক্ষার প্রতি তাঁর গুরুত্ব এবং প্রজন্ম গড়ে তোলার দীর্ঘ সাধনারই এক উজ্জ্বল প্রতিফলন।
একজন সাহিত্যিকের জীবন কেবল তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে না; তাঁর চিন্তা, মূল্যবোধ ও জীবনদর্শনও পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে প্রবাহিত হয়। সেই অর্থে তাঁর পরিবারও তাঁর জীবনসাধনার ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সুগত চাকমা (ননাধন) এমন একজন সাহিত্যসাধক, যাঁর পরিচয় কোনো একটি অভিধায় ধারণ করা কঠিন। তিনি একই সঙ্গে কবি, গীতিকার, গবেষক, ইতিহাসচর্চাকারী, ভাষাবিশারদ, সম্পাদক ও সাংস্কৃতিক সংগঠক। তাঁর কলমে যেমন প্রেম ও প্রকৃতি কথা বলেছে, তেমনি কথা বলেছে ইতিহাস, জাতিসত্তা, ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্বের প্রশ্ন।
তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, সাহিত্য ও গবেষণাকে তিনি কখনো বিচ্ছিন্ন করেননি। তাঁর কাছে সাহিত্য ছিল অনুভবের ভাষা, আর গবেষণা ছিল সেই অনুভবের শিকড় অনুসন্ধানের পথ। ফলে তাঁর সৃষ্টিকর্মে আবেগ ও যুক্তি, সৌন্দর্য ও ইতিহাস, কাব্য ও গবেষণা পাশাপাশি চলেছে।
তাঁর কলমে পাহাড় কেবল প্রকৃতির প্রতীক নয়; এটি ইতিহাসের স্মৃতি, ভাষার আত্মা, সংস্কৃতির ধারক এবং জাতিসত্তার প্রতিচ্ছবি। তাঁর গবেষণা কেবল একাডেমিক সম্পদ নয়; ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভাষা, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাঁর গান কেবল বিনোদনের উপাদান নয়; তা চাকমা সমাজের অনুভূতি, স্মৃতি ও জীবনযাত্রার এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক দলিল।
একজন সৃষ্টিশীল মানুষের প্রকৃত মূল্যায়ন তাঁর জীবদ্দশার প্রশংসায় নয়, বরং তাঁর সৃষ্টির দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবের মধ্যে নিহিত। সেই বিচারে সুগত চাকমা (ননাধন) আধুনিক চাকমা সাহিত্য, গবেষণা ও সংগীতের ইতিহাসে এক অনিবার্য নাম।
তাঁর জীবন ও কর্মের দিকে ফিরে তাকালে মনে হয়, একটি জাতির ভাষা ও সংস্কৃতিকে ভালোবাসা মানে শুধু অতীতকে স্মরণ করা নয়; বরং ভবিষ্যতের জন্য তার অস্তিত্বকে সংরক্ষণ করা। সুগত চাকমা সেই দায়িত্বই পালন করেছেন তাঁর কলমে, গবেষণায়, গানে এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে।
তাই সুগত চাকমা (ননাধন) শুধু একজন কবি নন, শুধু একজন গবেষক নন, শুধু একজন গীতিকারও নন- তিনি আধুনিক চাকমা সাংস্কৃতিক জাগরণের এক নিবেদিত নির্মাতা। তাঁর সৃষ্টিকর্ম যতদিন বেঁচে থাকবে, ততদিন পাহাড়ের ভাষা, গান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর নামও শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় উচ্চারিত হবে। সময়ের স্রোত বহু নামকে মুছে দেয়, কিন্তু যাঁরা একটি জাতির স্মৃতি ও স্বপ্নকে শব্দে, সুরে ও জ্ঞানে সংরক্ষণ করে যান, তাঁদের আলো সহজে নিভে না। সুগত চাকমা (ননাধন) সেই অম্লান আলোরই একজন বাহক।
