বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬

সিন্ধু কুমার চাকমা: সংগ্রামের আগুন থেকে কলমের আলো - ইনজেব চাঙমা

পাহাড়ের ইতিহাস কেবল পাহাড়, নদী, অরণ্য আর মেঘের গল্প নয়। এই ইতিহাসের পাতায় মিশে আছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস, রক্তের দাগ, হারানোর বেদনা, অধিকার আদায়ের আকাঙ্ক্ষা এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা এক অদম্য সংগ্রামের স্মৃতি। সেই ইতিহাসেরই এক নীরব অথচ প্রত্যয়ী সাক্ষী সিন্ধু কুমার চাকমা, যাঁর জীবনের এক অধ্যায় লেখা হয়েছে সংগ্রামের উত্তাপে, আর পরবর্তী অধ্যায় লেখা হচ্ছে কলমের কালিতে।

১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার পানছড়ি উপজেলার চেঙ্গী ইউনিয়নের তারাবন জীতেন্দ্র লাল কার্বারী পাড়ায় তাঁর জন্ম। পিতা দিন রঞ্জন চাকমা, মাতা বিরোজা চাকমা। শৈশব থেকেই তিনি বেড়ে উঠেছেন পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির ও সংঘাতময় বাস্তবতার মধ্যে। ১৯৭১-এর পরবর্তী সময়ের মুক্তিবাহিনী দ্বারা পানছিড়তে হত্যা, সহিংসতা, গ্রাম পোড়ানো, মানুষের ওপর নেমে আসা নিপীড়ন এবং পরবর্তী সামরিক অভিযানের অভিঘাত তাঁর কিশোর মনে গভীর রেখাপাত করে। চারপাশের সেই বাস্তবতা ধীরে ধীরে তাঁর ভেতরে জন্ম দেয় প্রতিবাদী মনন, সংগ্রামী চেতনা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস।

সময়ের স্রোতে সেই চেতনা তাঁকে নিয়ে যায় আরও কঠিন এক পথে। ১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে ছাত্রজীবনেই তিনি তৎকালীন পার্বত্য পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে শান্তিবাহিনীতে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। পরবর্তী দীর্ঘ প্রায় এক যুগ তাঁর জীবন কেটেছে সশস্ত্র সংগ্রামের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে। পাহাড়ের দুর্গম পথ, অনিশ্চিত দিন, ভয় ও প্রত্যাশার দ্বন্দ্ব, সবকিছুই তাঁর জীবনকে অন্য এক অভিধানে লিখে দেয়। সে অভিধানে ছিল সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, স্বপ্ন এবং একটি জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও অধিকারের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু ইতিহাস কখনো একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না।

১৯৯৭ খ্রিস্টাব্দের ২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তাঁর জীবনে আসে এক নতুন বাঁক। দীর্ঘ সংঘাতের পথ পেরিয়ে তিনি ফিরে আসেন স্বাভাবিক জীবনে। তবে সংগ্রাম থেকে তাঁর প্রত্যাবর্তন ছিল না আত্মসমর্পণ; বরং সংগ্রামের ভাষা বদলে যাওয়ার এক নতুন অধ্যায়। হাতে অস্ত্রের পরিবর্তে উঠে আসে কলম। পাহাড়ের পথের বদলে তিনি প্রবেশ করেন শব্দের পথে। সেই পথেই তিনি খুঁজে নেন নিজের দ্বিতীয় জীবন।

গণতান্ত্রিক আন্দোলন, পাহাড়ের মানুষের অধিকার, ইতিহাস, পরিচয় ও আত্মমর্যাদার প্রশ্ন তাঁর লেখার কেন্দ্রে স্থান পায়। একই সঙ্গে কবিতার কোমল জগৎও তাঁকে আকর্ষণ করে। চাকমা ও বাংলা, দুই ভাষায় তিনি লিখেছেন। তাঁর কাছে ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জাতির স্মৃতি, আত্মপরিচয় ও অস্তিত্বের ধারক। তাই মাতৃভাষায় লেখালেখির মধ্য দিয়ে তিনি যেন নিজের শেকড়কেও আঁকড়ে ধরে রেখেছেন।

বিভিন্ন ম্যাগাজিন, স্মরণিকা এবং যৌথ কাব্যগ্রন্থে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে। প্রবাহণ, পহর ফুদোক, কাচালং, উন্মেষ, কাব্যের বেলাভূমি, ৩৩০ কবির কবিতা, বসন্তের বাঁশী, শ্রাবণের মেঘ, বর্ণালী, লেখনী, ৫০০ কবির কবিতা, চব্বিশের আন্দোলন, হৃদয়ের দহণ, হেমন্তের সন্ধ্যা, ফাগুনের কাব্য মেলা, মনের অজান্তে, শিকল ভাঙার গান, রক্তাক্ত মানচিত্রের স্বাধীনতা, অগ্নির প্রহর, জ্বলন্ত অগ্নিশিখা, কবিতার কলি, কবির মননে কবিতা, কাব্যের পঙ্‌ক্তিমালা, শ্রাবণের সন্ধ্যা, বাত্তোপেকসহ বহু সংকলনে তাঁর সাহিত্যকর্মের পরিচয় পাওয়া যায়।

তবে সিন্ধু কুমার চাকমার লেখকসত্তার সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয় তাঁর একক গ্রন্থসমূহে। তাঁর বইয়ের নামগুলোর মধ্যেই যেন তাঁর জীবনদর্শনের প্রতিধ্বনি শোনা যায়, পাহাড়ের আন্দোলন এবং অধিকারের বাস্তবতা, পাহাড়ের রক্তাক্ত গেরিলা যুদ্ধের ইতিহাস, আদিবাসী স্বীকৃতির যৌক্তিকতা ও প্রতিবন্ধকতা, মুক্তি বাহিনী থেকে শান্তি বাহিনী ও পাহাড়ে সশস্ত্র সংগ্রাম এবং মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বিপ্লবী জীবন ও দর্শন (প্রকাশের পথে)

২০২৪ সালে প্রকাশিত পাহাড়ের আন্দোলন এবং অধিকারের বাস্তবতা তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতার এক গুরুত্বপূর্ণ লিখিত দলিল। এর পর ২০২৫ সালে প্রকাশিত পাহাড়ের রক্তাক্ত গেরিলা যুদ্ধের ইতিহাস তাঁর জীবনের এক দীর্ঘ অধ্যায়কে শব্দের মধ্যে সংরক্ষণের প্রয়াস। আদিবাসী স্বীকৃতির যৌক্তিকতা ও প্রতিবন্ধকতা গ্রন্থে তিনি পরিচয় ও স্বীকৃতির প্রশ্নকে যুক্তির আলোকে দেখতে চেয়েছেন। আর মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার বিপ্লবী জীবন ও দর্শন নিয়ে তাঁর কাজ যেন তাঁর নিজের জীবন ও চিন্তার সঙ্গেও এক গভীর আত্মিক সংলাপ।

কারণ মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা কেবল একটি নাম নন; পাহাড়ের রাজনৈতিক ইতিহাসে তিনি একটি চিন্তার প্রতীক। তাঁর জীবন ও দর্শনকে ধারণ করে লিখতে গিয়ে সিন্ধু কুমার চাকমা যেন নিজের সময়কেও নতুন করে পাঠ করেন।

তাঁর লেখায় ইতিহাস শুধু অতীতের গল্প হয়ে থাকে না। ইতিহাস হয়ে ওঠে প্রশ্ন। সেই প্রশ্ন, কেন একটি জনগোষ্ঠীকে নিজের পরিচয়ের জন্য সংগ্রাম করতে হয়? কেন মাতৃভাষা ও সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার জন্য লড়াই করতে হয়? কেন পাহাড়ের মানুষের অধিকার বারবার রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, একটি প্রজন্মের অভিজ্ঞতা যদি লিখে না রাখা হয়, তবে পরবর্তী প্রজন্ম কীভাবে জানবে তাদের পথের ইতিহাস? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতেই হয়তো তিনি লিখে চলেছেন।

তাঁর জীবনসঙ্গী সম্পর্কিত অধ্যায়ও তাঁর জীবনের ব্যক্তিগত পরিসরের অংশ। ১৯৯২ সালে তিনি ছন্দা চাঙমাকে বিবাহ করেন। পরবর্তীতে ২০০০ সালে গেভলিন চাঙমার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। গেভলিন চাঙমার গর্ভে তাঁদের একমাত্র সন্তান কাবিলের জন্ম হয়। ছন্দা চাঙমা নিঃসন্তান।

জীবনের এই দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আজ তিনি এসে দাঁড়িয়েছেন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে। নানা অসুস্থতা, আর্থিক অনটন এবং জীবনের প্রতিকূলতা তাঁকে ঘিরে থাকলেও তাঁর কলম থেমে নেই। চাঙমা কবিতার পাণ্ডুলিপি এখনও যেন তাঁর টেবিলের ওপর অপেক্ষমাণ- প্রকাশের আলো দেখার আশায়।

এই দৃশ্যটি নিছক একজন লেখকের আর্থিক সংকটের ছবি নয়; এটি আমাদের সাহিত্য-সমাজের প্রতিও একটি প্রশ্ন ছুড়ে দেয়। যে মানুষটি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, সময়ের ইতিহাস এবং একটি জনগোষ্ঠীর স্মৃতিকে শব্দে ধরে রাখার চেষ্টা করছেন, তাঁর সৃষ্টির মূল্যায়ন ও সংরক্ষণের দায়িত্ব কার?

সিন্ধু কুমার চাকমার জীবন তাই একই সঙ্গে সংগ্রাম ও সৃষ্টির জীবন। একসময় তিনি পাহাড়ের সংঘাতময় বাস্তবতার মধ্যে দিয়ে হেঁটেছেন; আজ তিনি সেই বাস্তবতার সাক্ষ্য বহন করে হাঁটছেন সাহিত্যের পথে। একসময় তাঁর হাতে ছিল সংগ্রামের অস্ত্র; আজ তাঁর হাতে কলম। কিন্তু লক্ষ্যটির ভেতরে একটি গভীর ধারাবাহিকতা রয়েছে, মানুষের কথা বলা, ইতিহাসকে ধরে রাখা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নিজের সময়ের সত্যটুকু পৌঁছে দেওয়া।

জীবনের শেষ প্রান্তে নয়, বরং এক নতুন সৃজনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। শরীর ক্লান্ত হতে পারে, অর্থের অভাব হতে পারে, প্রকাশনার পথ দুর্গম হতে পারে, তবু একজন সত্যিকারের লেখকের ভেতরের শব্দের নদী সহজে শুকিয়ে যায় না। সিন্ধু কুমার চাকমা সেই নদীরই একজন যাত্রী।

তাঁর কলমে পাহাড় কখনো রক্তাক্ত, কখনো সবুজ; কখনো ক্ষতবিক্ষত ইতিহাস, কখনো স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ। তাঁর কবিতায় মানুষ কথা বলে, তাঁর প্রবন্ধে ইতিহাস প্রশ্ন তোলে, আর তাঁর গ্রন্থে একটি সময় নিজের মুখ দেখতে পায়।

অতএব, সিন্ধু কুমার চাকমাকে শুধু একজন কবি বা লেখক হিসেবে দেখলে তাঁর পরিচয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তিনি এক সময়ের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বাহক, এক সংগ্রামী জীবনের সাক্ষী এবং কলমের মাধ্যমে ইতিহাস সংরক্ষণে নিবেদিত একজন লেখক। তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো কোনো একটি বই নয়, বরং তাঁর দীর্ঘ জীবনের অভিজ্ঞতাকে পরবর্তী প্রজন্মের হাতে তুলে দেওয়ার এই নিরন্তর প্রয়াস। আগুন থেকে যে মানুষটি বেরিয়ে এসেছেন, তিনি আজ আলো জ্বালাতে চান শব্দ দিয়ে। আর সেই আলোর নাম- ইতিহাস, সাহিত্য ও সংগ্রামের স্মৃতি।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

সিন্ধু কুমার চাকমা: সংগ্রামের আগুন থেকে কলমের আলো - ইনজেব চাঙমা

পাহাড়ের ইতিহাস কেবল পাহাড়, নদী, অরণ্য আর মেঘের গল্প নয়। এই ইতিহাসের পাতায় মিশে আছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস, রক্তের দাগ, হারানোর বেদনা, অধিকার আদা...