বুধবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৬

ছাপামণি চাকমা: রেখার ভাঁজে স্বপ্নের আলপনা - ইনজেব চাঙমা

পাহাড়ের নীলাভ সবুজে, প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী গ্রামে আগস্ট ২০০৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন ছাপামণি চাকমা, স্নেহের ডাকনাম ছাবাক্কো পিতা শ্যামল কান্তি চাকমা এবং মাতা ঊষারাণী চাকমা। দুই ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছোট। জীবনের প্রথম প্রহরেই তাঁকে মুখোমুখি হতে হয়েছিল এক গভীর শূন্যতারমাত্র চার বছর বয়সে, ২০০৭ সালে তিনি হারান তাঁর প্রিয় পিতাকে।

শৈশবের যে বয়সে একটি শিশুর পৃথিবী আবর্তিত হয় বাবা-মায়ের স্নেহ, নিরাপত্তা নির্ভরতার চারপাশে, সেই বয়সেই ছাপামণির জীবনে নেমে আসে পিতৃহারা হওয়ার বেদনা। বাবার স্নেহময় হাত মাথার ওপর থেকে সরে গেলেও মায়ের ভালোবাসা, সাহস নিরলস যত্ন তাঁকে জীবনের পথে এগিয়ে যেতে শক্তি জুগিয়েছে। পিতৃহীনতার সেই বেদনাকে হৃদয়ে ধারণ করেই তিনি ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন নিজের স্বপ্নের পৃথিবী।

বর্তমানে ছাপামণি চাকমা খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের অনার্স তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। ইতিহাস তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের বিষয় হলেও শিল্প যেন তাঁর অন্তরের নিজস্ব ভাষা। ছবি আঁকা তাঁর শখ, তাঁর আনন্দ এবং অনুভূতি প্রকাশের এক নীরব মাধ্যম। রঙ রেখার সমন্বয়ে মানুষের মুখাবয়ব ফুটিয়ে তোলার মধ্যেই তিনি খুঁজে পান এক অন্যরকম প্রশান্তি।

ছাপামণির ছবি আঁকার গল্পটি শুরু হয়েছিল শৈশবের এক ছোট্ট অথচ তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা থেকে। শিশু শ্রেণিতে পড়ার সময় নতুন বই হাতে পেয়ে বইয়ের পাতায় ছাপা ছবিগুলোর প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হয়। ছবির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর মনে জন্ম নেয় নিজে ছবি আঁকার আকাঙ্ক্ষা।

একদিন যোগ-বিয়োগ শেখা শেষ করে তিনি মায়ের কাছে আবদার করলেন, একটি মানুষের ছবি এঁকে দিতে। মা স্নেহভরে তাঁর জন্য একটি মানুষের ছবি এঁকে দিলেন। ছোট্ট ছাপামণি মায়ের আঁকা সেই ছবিটির দিকে গভীর মনোযোগে তাকিয়ে রইলেন। তারপর পেন্সিল হাতে নিয়ে মায়ের আঁকা রেখাগুলো অনুসরণ করে নিজেই আঁকার চেষ্টা শুরু করলেন।

সেদিনের সেই শিশুসুলভ অনুকরণই যে একদিন তাঁর শিল্পীসত্তার প্রথম পদচিহ্ন হয়ে উঠবে, তা হয়তো তখন কেউ ভাবেনি।

পিতাকে হারানোর পর মা ঊষারাণী চাকমাই হয়ে ওঠেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। মায়ের ভালোবাসার সঙ্গে ছিল স্নেহমিশ্রিত শাসন। মা বলতেন, বেল যখন রাঙা হয়ে ডুবে যাবে, তখন পড়তে বসো।

সন্ধ্যার আকাশে যখন সূর্যের শেষ আলো পাহাড়ের গায়ে লেগে ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেত, তখন মায়ের কথা মনে করে ছাপামণি বই নিয়ে বসতেন। কিন্তু পড়াশোনার ফাঁকে, অবসরে কিংবা সুযোগ পেলেই তাঁর পেন্সিল ছুটে যেত কাগজের পাতায়। কোথাও মানুষের মুখ, কোথাও কোনো অবয়ব, কোথাও শুধুই রেখার খেলা, এভাবেই অজান্তে তিনি নিজের ভেতরের শিল্পীসত্তাকে লালন করতে থাকেন।

শৈশবের সেই আঁকিবুঁকি একসময় বন্ধুদেরও নজরে আসে। সহপাঠী সঙ্গীরা তাঁর আঁকা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে নিজেদের ছবিও আঁকিয়ে নিতে চাইত। বন্ধুরা আবদার করত, আর ছাপামণি হাসিমুখে তাদের আবদার পূরণ করতেন। কারও মুখের ছবি, কারও কল্পনার অবয়ব, ছোট ছোট অনুরোধই তাঁকে আরও বেশি আঁকতে উৎসাহিত করত।

এভাবেই অনুশীলনের মধ্য দিয়ে তাঁর হাতের রেখা হয়ে ওঠে দৃঢ়, চোখ হয়ে ওঠে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণে অভ্যস্ত এবং মন হয়ে ওঠে শিল্পের প্রতি আরও নিবেদিত।

আজ তাঁর শৈশবের সেই ইজিবিজি আর নিছক আঁকিবুঁকি নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রেখা পেয়েছে পরিমিতি, ছায়া পেয়েছে গভীরতা, আর প্রতিকৃতিগুলো পেয়েছে জীবন্ত অভিব্যক্তি। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন মানুষ, গুণী, জ্ঞানী বিশিষ্ট মানুষের মুখাবয়ব আঁকেন। একটি মুখের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ব্যক্তিত্ব অনুভূতিকে রেখা ছায়ার মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টাই তাঁর শিল্পচর্চার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

ছাপামণির জীবন কেবল পড়াশোনা শিল্পচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। নিজের সাংস্কৃতিক শিকড় চাঙমা সমাজের ভাষা-সাহিত্যের প্রতিও তাঁর রয়েছে গভীর অনুরাগ। সেই দায়বোধ থেকেই তিনি যুক্ত হয়েছেন চাঙমা সাহিত্য একাডেমির কর্মকাণ্ডে।

বর্তমানে তিনি চাঙমা সাহিত্য একাডেমির কেন্দ্রীয় কমিটির শিক্ষা, সাংস্কৃতিক ক্রীড়া সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শিক্ষা, সংস্কৃতি সৃজনশীলতার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করার কাজে তাঁর অংশগ্রহণ তাঁর বহুমাত্রিক ব্যক্তিসত্তাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

ছাপামণি চাকমার জীবনকে যদি একটি ক্যানভাসের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে সেখানে যেমন রয়েছে শৈশবের পিতৃবিয়োগের গভীর ছায়া, তেমনি রয়েছে মায়ের ভালোবাসার উজ্জ্বল আলো। মাত্র চার বছর বয়সে বাবাকে হারানোর যে বেদনা তাঁর শৈশবকে স্পর্শ করেছিল, তা তাঁর পথচলার প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং সেই বেদনার মধ্য দিয়েই তিনি শিখেছেন জীবনের প্রতি দৃঢ় থাকতে, নিজের স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরতে।

মায়ের হাতে প্রথম আঁকা একটি মানুষের ছবি দেখে যে ছোট্ট মেয়েটির মনে ছবি আঁকার স্বপ্ন জেগেছিল, আজ সেই হাতেই ফুটে ওঠে জ্ঞানী-গুণী মানুষের মুখ। শৈশবের সেই পেন্সিল আজ তাঁর আত্মপ্রকাশের ভাষা।

ছাপামণি চাকমা তাই শুধু একজন শিক্ষার্থী নন; তিনি একজন সম্ভাবনাময় তরুণ শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী এবং স্বপ্নবান প্রজন্মের প্রতিনিধি। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের ক্যানভাসে কখনো কখনো দুঃখের গাঢ় ছায়া নেমে আসে, কিন্তু মানুষের ইচ্ছাশক্তি, ভালোবাসা সৃজনশীলতা সেই ছায়ার মধ্যেও নতুন রঙের জন্ম দিতে পারে।

একদিন যে শিশুটি মায়ের আঁকা একটি মানুষের ছবি দেখে পেন্সিল হাতে নিয়েছিল, আজ সে নিজেই মানুষের মুখে গল্প আঁকে। তার প্রতিটি রেখায় যেন শৈশবের স্মৃতি, মায়ের স্নেহ, হারানোর বেদনা আর আগামী দিনের স্বপ্ন একসঙ্গে কথা বলে।

ছাপামণির হাতে তাই শুধু পেন্সিল নেই, আছে এক টুকরো স্বপ্নের ক্যানভাস; যেখানে প্রতিটি রেখা তাঁর জীবনকে নতুন করে আঁকে, আর প্রতিটি ছবি হয়ে ওঠে তাঁর নীরব আত্মকথন।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ছাপামণি চাকমা: রেখার ভাঁজে স্বপ্নের আলপনা - ইনজেব চাঙমা

পাহাড়ের নীলাভ সবুজে , প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার বঙ্গলতলী গ্রামে ৭ আগস্ট ২০০৩ সালে জন্মগ্রহণ করেন ছ...