পাহাড়ের সকাল যেমন কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের আলোয় উন্মোচিত হয়, তেমনি একটি শিশুর মনও জ্ঞানের আলোয় বিকশিত হয় তার নিজের ভাষার স্পর্শে। যে ভাষায় সে মায়ের মমতা অনুভব করে, প্রকৃতির রূপ চিনে, জীবনের প্রথম বিস্ময়কে নাম দেয়—সেই ভাষাই তার শিক্ষার সবচেয়ে স্বাভাবিক সোপান। অথচ কত নির্মম এই বাস্তবতা! পার্বত্য চট্টগ্রামের অসংখ্য শিশু বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়েই যেন নিজের ভাষাকে দরজার বাইরে রেখে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। সেখানে শিক্ষা আছে, কিন্তু নিজের ভাষার উষ্ণতা নেই; বই আছে, কিন্তু আত্মপরিচয়ের প্রতিধ্বনি নেই।
একটি ভাষা হারিয়ে যায় না একদিনে। নদী যেমন হঠাৎ শুকিয়ে যায় না, তেমনি ভাষাও একদিনে বিলীন হয় না। অবহেলার দীর্ঘ ঋতু, নীরবতার অনন্ত অপেক্ষা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যবহারহীনতার অন্ধকারে ভাষা ধীরে ধীরে তার দীপ্তি হারায়। ভাষার সঙ্গে হারিয়ে যায় লোককথা, প্রবাদ, গান, বিশ্বাস, ইতিহাস, স্মৃতি এবং একটি জনগোষ্ঠীর পৃথিবীকে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টি।
পাহাড়ের প্রতিটি ভাষা একটি জীবন্ত অরণ্যের মতো। তার প্রতিটি শব্দ একটি বৃক্ষ, প্রতিটি বর্ণ একটি পাতা, প্রতিটি লোকগাথা একটি ঝরনার কলধ্বনি। সেই অরণ্যকে রক্ষা করা মানে কেবল কয়েকটি ভাষাকে সংরক্ষণ করা নয়; রক্ষা করা মানে বাংলাদেশের বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক আত্মাকে রক্ষা করা।
শিক্ষা যদি মানুষের মুক্তির পথ হয়, তবে সেই পথের প্রথম ইটটি অবশ্যই মাতৃভাষার হওয়া উচিত। কারণ শিশুর চিন্তার প্রথম জানালা খুলে যায় তার নিজের ভাষায়। যে শিশুকে তার মাতৃভাষায় শেখার অধিকার দেওয়া হয়, সে কেবল ভালো শিক্ষার্থীই হয় না; সে নিজের শিকড়কে ধারণ করে বিশ্বকে আলিঙ্গন করতে শেখে। শিকড় যত গভীর হয়, বৃক্ষ ততই আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।
আজ প্রয়োজন আর কোনো প্রতিশ্রুতির নয়; প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগের। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি বিহার, মন্দির, ক্লাব, সরকারি, বেসরকারি, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কিন্ডারগার্টেন, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, গবেষণা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হবে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে কোনো শিশুকে নিজের ভাষা বিসর্জন দিয়ে জ্ঞানের পথে হাঁটতে না হয়।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের মহত্ত্ব তার অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, তার ভাষাগত বৈচিত্র্যকে কতটা সম্মান দিতে পারে—সেই সক্ষমতায়। পাহাড়ের শিশুরা যেন তাদের প্রথম অক্ষর লেখে নিজের ভাষায়, প্রথম কবিতা আবৃত্তি করে নিজের ভাষায়, প্রথম স্বপ্ন দেখে নিজের ভাষায়—এই আকাঙ্ক্ষা কোনো আবেগ নয়; এটি ন্যায়, এটি অধিকার, এটি একটি মানবিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।
আসুন, আমরা এমন এক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করি, যেখানে পাহাড়ের প্রতিটি বিদ্যালয়ে মাতৃভাষা হবে জ্ঞানের প্রথম প্রদীপ। কারণ ভাষার আলো নিভে গেলে অন্ধকার নামে শুধু একটি জনগোষ্ঠীর জীবনে নয়; অন্ধকার নেমে আসে সমগ্র জাতির সাংস্কৃতিক আকাশে। আর যে জাতি তার প্রতিটি ভাষাকে সযত্নে লালন করে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তার কণ্ঠস্বরকেই দীর্ঘজীবী করে রাখে।।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন