“বিঝু গেল, বিঝু এল,
ফাওন গেল, ফাওন এল—
তুইওদ তুই ন’ এলে চম্পা,
তুই কুধু গেলে।”
চাঙমা ভাষার জনপ্রিয় এই গানের পঙ্ক্তিতে ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে মিশে আছে অপেক্ষা, ভালোবাসা ও বিরহের অনুভূতি। বিঝু ও ফাল্গুন আসে-যায়, সময় এগিয়ে চলে, অথচ প্রতীক্ষিত মানুষটির দেখা মেলে না। সহজ-সরল ভাষায় গভীর আবেগ প্রকাশের এই ক্ষমতাই কবি কিশলয় চাঙমার সৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
চাঙমা সাহিত্যজগতে কিশলয় চাঙমা একজন কবি ও গীতিকার হিসেবে সুপরিচিত। শৈশব থেকেই কবিতার প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ, যা পরবর্তীকালে নিয়মিত সাহিত্যচর্চায় পরিণত হয়। চাঙমা ভাষায় প্রথম সনেট রচনার কৃতিত্বও তাঁর সঙ্গে যুক্ত। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি, মানুষের জীবন, সামাজিক বাস্তবতা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাঁর সৃষ্টির প্রধান অনুষঙ্গ। নিজের মাতৃভাষাকে সৃজনের মাধ্যম করে তিনি পাহাড়ের জীবন ও মানুষের অনুভূতিকে সাহিত্যে রূপ দিয়েছেন। তাঁর এই নিরন্তর প্রয়াস চাঙমা ভাষার সাহিত্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
কিশলয় চাঙমার সার্টিফিকেট অনুযায়ী, তাঁর জন্ম ৭ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ (১৯৭০, ফাল্গুন/এপ্রিল) সালে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মাটিরাঙ্গা থানার বলিপাড়া গ্রামে। তাঁর পিতা সুধীর কুমার চাঙমা এবং মাতা চিবনবি চাঙমা।
তাঁরা ছিলেন ২ ভাই ও ৩ বোন। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে কিশলয় চাঙমা দ্বিতীয়। পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সময় তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এবং পাহাড়ি সমাজের জীবনযাত্রা। এসব অভিজ্ঞতা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যিক ভাবনায় প্রভাব ফেলেছে।
তাঁর শিক্ষাজীবনের শুরু মাটিরাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনার পাশাপাশি কবিতা লেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ তৈরি হয়। প্রকৃতি ও চারপাশের জীবন তাঁকে ভাবতে শেখায়, আর সেই ভাবনাই ধীরে ধীরে কবিতার ভাষা পেতে থাকে।
১৯৮৫ সালে শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি রাঙামাটিতে যান এবং সেখানে সুপরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মোনঘরে পড়াশোনা করেন। মোনঘরে থাকাকালে তাঁর সাহিত্যিক প্রতিভার বিকাশ ঘটে। লেখালেখির মাধ্যমে তিনি একাধিকবার পুরস্কৃত হন।
ছাত্রজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জনগুলোর একটি হলো ফ্যামিলি প্ল্যানিং কর্তৃক আয়োজিত কবিতা রচনা প্রতিযোগিতায় অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে রাঙ্গামাটি জেলায় প্রথম স্থান অর্জন। এই স্বীকৃতি তাঁর সাহিত্যচর্চায় নতুন উৎসাহ সৃষ্টি করে।
কিশলয় চাঙমার কবিতার প্রধান বিষয় পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন। পাহাড়, নদী, বন, ঝরনা কিংবা ঋতু তাঁর কবিতায় কেবল দৃশ্যপট হিসেবে উপস্থিত হয় না; এগুলোর সঙ্গে মানুষের অনুভূতি, স্মৃতি ও জীবনযাত্রার সম্পর্কও তিনি তুলে ধরেন।
চাঙমা সমাজের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, উৎসব, সামাজিক সম্পর্ক, মানুষের সুখ-দুঃখ এবং প্রেম-বিরহ তাঁর কবিতায় বিভিন্নভাবে প্রকাশ পেয়েছে। ফলে তাঁর রচনায় ব্যক্তিগত অনুভূতির পাশাপাশি একটি জনগোষ্ঠীর জীবন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও প্রতিফলন ঘটে।
তাঁর দেশাত্মবোধের ভিত্তিও এই মাটি ও মানুষের প্রতি গভীর সম্পর্ক। পার্বত্য চট্টগ্রাম তাঁর কাছে শুধু জন্মভূমি নয়; এটি তাঁর স্মৃতি, অনুভব ও আত্মপরিচয়ের অংশ। সেই কারণে তাঁর কবিতায় স্বদেশপ্রেম কোনো আলাদা বিষয় হয়ে ওঠে না, বরং জীবনবোধের স্বাভাবিক প্রকাশ হিসেবে আসে।
কিশলয় চাঙমার সাহিত্যিক পরিচয়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো চাঙমা ভাষায় প্রথম সনেট রচনার কৃতিত্ব তাঁর সঙ্গে যুক্ত। প্রচলিত কাব্যরীতিকে নিজের মাতৃভাষায় প্রয়োগের এই উদ্যোগ চাঙমা কবিতার প্রকাশভঙ্গিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে।
এতে তাঁর সৃজনশীলতা ও নতুন কাব্যরীতি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষার মানসিকতার পরিচয় পাওয়া যায়। মাতৃভাষাকে শুধু দৈনন্দিন যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে নয়, আধুনিক ও বৈচিত্র্যময় সাহিত্য সৃষ্টির ভাষা হিসেবেও প্রতিষ্ঠা করার আকাঙ্ক্ষা তাঁর কাজে প্রতিফলিত হয়েছে।
কবিতার পাশাপাশি গান রচনাতেও কিশলয় চাঙমার আগ্রহ রয়েছে। তাঁর জনপ্রিয় গানের পঙ্ক্তিতে ঋতু, প্রেম ও অপেক্ষার মতো সার্বজনীন অনুভূতি চাঙমা জীবন ও সংস্কৃতির অনুষঙ্গের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
“বিঝু গেল, বিঝু এল...” গানটির মধ্য দিয়ে সময়ের প্রবাহ এবং প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষার যে আবেগ প্রকাশ পেয়েছে, তা শ্রোতার কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্য হয়েছে। তাঁর গানগুলোতে ভাষার সরলতা ও অনুভূতির স্বাভাবিক প্রকাশ বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
তাঁর সাহিত্যজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলো প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘মোনবী’। গ্রন্থটি প্রকাশের মাধ্যমে তিনি সাহিত্যসচেতন মহলে পরিচিতি লাভ করেন এবং প্রশংসা অর্জন করেন।
‘মোনবী’-তে তাঁর কাব্যভাবনা, ভাষার ব্যবহার এবং জীবন ও প্রকৃতির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। এটি তাঁর দীর্ঘদিনের সাহিত্যচর্চাকে পাঠকের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি তাঁর সৃষ্টিশীলতার বড় একটি অংশ এখনও অপ্রকাশিত। বর্তমানে তাঁর কাছে চাঙমা ভাষায় কবিতা ও গানের তিনটি পাণ্ডুলিপি রয়েছে। আর্থিক সংকটের কারণে সেগুলো প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
একজন সাহিত্যিকের সৃষ্টিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রকাশনার সুযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিশলয় চাঙমার অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো প্রকাশিত হলে চাঙমা ভাষার সাহিত্য ও গানের ভাণ্ডার আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। তাঁর দীর্ঘদিনের সৃষ্টিশীল শ্রমও বৃহত্তর পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ পাবে।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি কিশলয় চাঙমা পারিবারিক জীবনেও দায়িত্বশীল। তাঁর স্ত্রী সুচরিতা চাঙমা। তাঁদের সন্তানদের মধ্যে রয়েছেন কন্যা বনরূপা চাঙমা, যিনি সিভিল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কর্মজীবনে যুক্ত, এবং পুত্র বেবিলন চাঙমা।
পরিবার ও জীবনের নানা দায়িত্বের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যচর্চা অব্যাহত রেখেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতিকে সৃষ্টির মাধ্যমে ধারণ করার চেষ্টা তাঁর সাহিত্যিক নিষ্ঠার পরিচয় বহন করে।
কিশলয় চাঙমার সাহিত্যিক গুরুত্ব শুধু একটি কাব্যগ্রন্থ বা কয়েকটি জনপ্রিয় গানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর বিশেষত্ব হলো—তিনি নিজের মাতৃভাষায় সমকালীন জীবন, প্রকৃতি, অনুভূতি ও সংস্কৃতিকে প্রকাশ করার চেষ্টা করেছেন।
চাঙমা ভাষায় সনেট রচনা তাঁর সৃজনশীলতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। অন্যদিকে কবিতা ও গানে পাহাড়ি সমাজজীবনের নানা অনুষঙ্গ তুলে ধরে তিনি নিজস্ব সাহিত্যিক স্বর নির্মাণ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনাগুলো চাঙমা ভাষার সাহিত্যভাণ্ডারের সম্ভাবনাকেই নির্দেশ করে।
কিশলয় চাঙমার সাহিত্যজীবন শুরু হয়েছিল শৈশবের কবিতা লেখা দিয়ে। ছাত্রজীবনের পুরস্কার, মোনঘরের সাহিত্যচর্চা, চাঙমা ভাষায় সনেট রচনার প্রয়াস এবং ‘মোনবী’ প্রকাশের মধ্য দিয়ে সেই পথ ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে।
তাঁর সৃষ্টিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি উঠে এসেছে প্রেম, বিরহ, সংস্কৃতি ও স্বদেশচেতনা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তিনি এসব অনুভূতিকে নিজের মাতৃভাষায় প্রকাশ করেছেন।
অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর তিনটি পাণ্ডুলিপি এখনও প্রকাশের অপেক্ষায়। যথাযথ সহযোগিতা পেলে এসব সৃষ্টি পাঠকের কাছে পৌঁছাতে পারে এবং চাঙমা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারে।
বিঝু আসে, ফাল্গুন আসে, সময়ের স্রোত এগিয়ে যায়। কিন্তু কবির সৃষ্ট শব্দ থেকে যায়। কিশলয় চাঙমার সাহিত্যসাধনার মূল্যও সেখানেই—নিজের মাটি, মানুষ ও ভাষার স্মৃতিকে তিনি শব্দে ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। সেই প্রয়াস তাঁকে চাঙমা সাহিত্যজগতে স্বতন্ত্র ও স্মরণীয় করে রাখবে।
তথ্যসূত্র
১. রাণ্যাফুল — কবিতা গ্রন্থ।
২. কবির সাক্ষাৎকার — কবির জীবন, সাহিত্যচর্চা ও সৃষ্টিকর্ম সম্পর্কিত তথ্য।
৩. কবির সাক্ষাৎকার গ্রহণে সহযোগিতা করেছেন সোহেল চাঙমা, কার্বারি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন