শিক্ষিত মানুষ কি সত্যিই শিক্ষিত? প্রশ্নটি খুব সাধারণ। অথচ এর উত্তর খুঁজতে গেলেই আমরা যেন এক গভীর অন্ধকারের সামনে দাঁড়িয়ে যাই। ঘরে ঘরে আজ শিক্ষিত মানুষের অভাব নেই। দেওয়ালে ঝুলছে একের পর এক সার্টিফিকেট, নামের পাশে যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন ডিগ্রি, পরিচয়ের সঙ্গে বাড়ছে শিক্ষাগত যোগ্যতার তালিকা। কিন্তু সেই শিক্ষার কতটুকু মানুষের আচরণে, কথায়, বিবেকে কিংবা মানবিকতায় ফুটে উঠছে—সেই হিসাবটি যেন কেউ রাখে না।
আমরা কাগজে শিক্ষিত হচ্ছি, কিন্তু হৃদয়ে কতটা? আমরা অক্ষর চিনতে শিখছি, কিন্তু মানুষ চিনতে শিখছি তো? আমরা বইয়ের পাতা মুখস্থ করছি, কিন্তু জীবনের পাতাগুলো পড়তে পারছি তো?
আজকাল কখনো কখনো মনে হয়, সার্টিফিকেট যেন শিক্ষার পরিচয়পত্র নয়—অহংকারের অলংকার হয়ে উঠেছে। যার নামের পাশে যত বেশি ডিগ্রি, তার কণ্ঠে কখনো কখনো তত বেশি আত্মম্ভরিতা। অথচ সত্যিকারের জ্ঞান তো মাথা উঁচু করার আগে মাথা নত করতে শেখায়। জ্ঞান যার গভীর, তার বিনয়ও তত গভীর।
সমুদ্র কখনো তার গভীরতার শব্দ করে না। বিশাল বৃক্ষ কখনো নিজের ছায়ার বিজ্ঞাপন দেয় না। আকাশ কখনো তার বিশালত্ব নিয়ে গর্ব করে না। প্রকৃত বড়ত্বের সবচেয়ে সুন্দর পরিচয়, নীরবতা। মানুষের ছায়া যখন অস্বাভাবিকভাবে দীর্ঘ হয়ে যায়, তখন বুঝতে হয়, সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। জীবনের অহংকারও অনেকটা তেমন। অহংকারের ছায়া যত দীর্ঘ হয়, পতনের সূর্য ততই অস্তমুখী হয়।
তবু মানুষ অহংকার করে- তার অর্থ নিয়ে, তার ক্ষমতা নিয়ে, তার পদ নিয়ে, তার সৌন্দর্য নিয়ে, তার জ্ঞান নিয়ে, এমনকি তার সার্টিফিকেট নিয়েও। কিন্তু মানুষ কি কখনো ভেবে দেখে—
যে জ্ঞান আমাকে অন্যকে ছোট করতে শেখায়, সে জ্ঞান কি সত্যিই জ্ঞান? যে শিক্ষা আমাকে বিনয়ী করতে পারে না, সে শিক্ষা কি সত্যিই শিক্ষা?
সিদ্ধার্থের কথা মনে পড়ে। যে মানুষটির সামনে ছিল রাজপ্রাসাদের সমস্ত সুখ, মাথার ওপর ছিল রাজমুকুটের সম্ভাবনা, চারপাশে ছিল ঐশ্বর্যের অঢেল আয়োজন—তিনি একদিন সেই সবকিছুর মায়া পেছনে ফেলে বেরিয়ে গেলেন। রাজ্য ছেড়েছিলেন, প্রাসাদ ছেড়েছিলেন, পরিচিত পৃথিবী ছেড়েছিলেন- খুঁজেছিলেন এমন এক সত্য, যা মানুষের অন্তরকে মুক্ত করতে পারে।
তিনি বুঝেছিলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাসাদও মানুষের অস্থির মনকে শান্ত করতে পারে না, যদি সেখানে সত্যের আলো না থাকে। ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা একই শিক্ষা পাই।
রামায়ণ থেকে মহাভারত- কত রাজ্য ধ্বংস হয়েছে, কত পরিবার ভেঙে গেছে, কত স্বপ্ন মাটিতে মিশে গেছে! অথচ সব ধ্বংসের শুরু তলোয়ারের ঝলকে হয়নি। অনেক ধ্বংসের শুরু হয়েছিল একটি কথা থেকে। একটি কুমন্ত্রণা থেকে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত থেকে।
কৈকেয়ীর কানে মন্ত্রার কথাগুলো পৌঁছেছিল- আর তার পরিণতিতে রামের বনবাস। রাবণের কাছে পৌঁছেছিল ভুল পরামর্শ, আর তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল অন্ধ অহংকার—শেষ পর্যন্ত সোনার লঙ্কাও রক্ষা পেল না। দুর্যোধন শুনেছিল শকুনির কূটবুদ্ধির কথা। বিবেকের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলাফল- কুরুক্ষেত্রের প্রান্তরে রক্তাক্ত হয়ে পড়েছিল এক বিশাল বংশের অহংকার। ইতিহাস তাই শুধু অতীতের গল্প নয়। ইতিহাস হলো সময়ের রেখে যাওয়া আয়না। সে আয়নায় আমরা চাইলে অন্যের মুখ দেখতে পারি, আবার চাইলে নিজের মুখটিও দেখতে পারি। দুঃখ শুধু একটাই- আমরা ইতিহাস পড়ি, কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা গ্রহণ করি না।
আমরা রাবণের পতনের গল্প বলি, কিন্তু নিজের অহংকারের দিকে তাকাই না। আমরা দুর্যোধনের ভুল নিয়ে কথা বলি, কিন্তু নিজের চারপাশের কুমন্ত্রণাকে প্রশ্ন করি না। আমরা রামের বনবাসের কথা জানি, কিন্তু ভুল কথা শুনে নিজের জীবনে কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছি- সেই প্রশ্নটি করি না। তাহলে আমাদের শিক্ষার আলো কোথায়?
শিক্ষা তো শুধু পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়ার নাম নয়। শিক্ষা হলো, কথা বলার আগে ভাবতে শেখা অন্যের কথা শোনার পর সত্য-মিথ্যা যাচাই করতে শেখা। ভুল করলে মাথা নত করে বলতে শেখা—“আমি ভুল করেছি।” শিক্ষা হলো এমন এক আলো, যে আলো প্রথমে অন্যের পথ নয়—নিজের ভেতরের অন্ধকারকে আলোকিত করে। আমাদের ঘরে সার্টিফিকেট থাকুক, ডিগ্রি থাকুক, জ্ঞানের ভাণ্ডার থাকুক—কিন্তু তার সঙ্গে যদি একটু বিনয় থাকে, একটু মায়া থাকে, একটু বিবেক থাকে, একটু মানবিকতা থাকে, তাহলেই সেই শিক্ষা পূর্ণতা পায়। কারণ জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে কেউ জিজ্ঞেস করবে না—তোমার কতগুলো সার্টিফিকেট ছিল?
মানুষ মনে রাখবে- তুমি কেমন মানুষ ছিলে। তোমার কথায় কেউ ভেঙে পড়েছিল, নাকি সাহস পেয়েছিল। তোমার জ্ঞানে কেউ অপমানিত হয়েছিল, নাকি আলোকিত হয়েছিল। তোমার উপস্থিতিতে কেউ ছোট হয়ে গিয়েছিল, নাকি নিজেকে মূল্যবান মনে করেছিল। সার্টিফিকেট দেয় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শিক্ষিত হওয়ার স্বীকৃতি দেয় মানুষের হৃদয়।
তাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন আরেকটি সার্টিফিকেট নয়, একটু আত্মজিজ্ঞাসা। নিজেকে একবার নিঃশব্দে প্রশ্ন করা, “আমি কতটা শিক্ষিত?” নয়, “আমার শিক্ষা আমাকে কতটা মানুষ করেছে?” হয়তো সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই আমরা একদিন বুঝতে পারব, ডিগ্রির চেয়ে বড় জ্ঞান আছে, জ্ঞানের চেয়ে বড় বিনয় আছে, আর সবকিছুর ঊর্ধ্বে আছে, মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা। সেই শিক্ষাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা। সেই সার্টিফিকেটই সবচেয়ে মূল্যবান, যার কোনো কাগজ লাগে না।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন