বুধবার, ২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

প্রগতি খীসা: প্রতিকূলতার পথ পেরিয়ে সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে এক অভিযাত্রা - ইনজেব চাঙমা

জীবন কখনো সরলরেখায় এগিয়ে চলে না কখনো তা কণ্টকাকীর্ণ পথ, কখনো অন্ধকার গিরিপথ, আবার কখনো প্রতিকূলতার বুক চিরে উঠে আসা আলোর রেখা মানুষের জীবনকে বুঝতে হলে শুধু তার সাফল্যের দিকে তাকালে চলে না; জানতে হয় সেই সাফল্যের পেছনে থাকা দীর্ঘ সংগ্রাম, বঞ্চনা, স্বপ্ন অদম্য পথচলার ইতিহাস প্রগতি খীসার জীবনও তেমনই এক পাঠক্রমযেখানে পারিবারিক ঐতিহ্য, শিক্ষার সাধনা, সাহিত্যচর্চা, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং প্রতিকূলতার সঙ্গে নিরন্তর লড়াই পরস্পরের সঙ্গে মিশে গেছে

প্রগতি খীসা জন্মগ্রহণ করেন মার্চ ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলার রাঙ্গামাটি সদর উপজেলার ৫৯ নম্বর বন্দুকভাঙ্গা মৌজার দুরখেয়া গ্রামে পিতা কংশসুর খীসা এবং মাতা তনুপতি খীসা পাহাড়, নদী, ঝরনা প্রকৃতির নিবিড় সান্নিধ্যে তাঁর শৈশবের শিকড় বিস্তৃত তাঁর মাতৃপরিবারের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে চাকমা সমাজের একটি ঐতিহ্যবাহী বংশপরম্পরা তাঁর মা তনুপতি খীসার জন্ম বেড়ে ওঠা চেঙীনদীর তীরে, বুড়িঘাটের অনতিদূরের ছোট মহাপ্রুম গ্রামে চাকমা গোজাগোষ্ঠীর বিবেচনায় তিনি ওয়াংজাগোজা কালাহাঙারা গোষ্ঠীর রনুখাঁ দেওয়ানের রক্তসম্পর্কীয় সদস্য ছিলেন ফলে প্রগতির পারিবারিক পরিচয়ের সঙ্গে পাহাড়ের সামাজিক-ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের একটি গভীর যোগসূত্রও বিদ্যমান

তাঁদের পরিবার ছিল বড় পরিবার ভাই-বোনের মধ্যে ছিলেনচন্দ্র হংস খীসা, সুনীতি বিকাশ খীসা, সুমিত্রা খীসা, পদ্মশোভা খীসা, জ্ঞান বিকাশ খীসা, প্রগতি খীসা, জ্যোৎস্না দেবী খীসা এবং বিজয় খীসা তাঁদের বোন সুমিত্রা খীসা অকালেই, ১৯৮১ সালে, যৌবন বয়সে মৃত্যুবরণ করেন এই অকালবিয়োগও পারিবারিক জীবনে রেখে যায় গভীর শূন্যতার স্মৃতি

প্রগতি খীসার পারিবারিক ইতিহাসের আরেকটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায় তাঁর পিতামহ স্বর্গীয় নবীনা খীসাকে ঘিরে তিনি ছিলেন গ্রামের কার্বারী বা গ্রামপ্রধান কার্বারী হিসেবে স্থানীয় সমাজে তাঁর ছিল বিশেষ মর্যাদা এবং দায়িত্ব সেই সূত্রে চাকমা রাজপরিবারের সঙ্গেও তাঁদের পরিবারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল

পারিবারিক স্মৃতিতে সংরক্ষিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো১৯৫৮ সালে নবীনা খীসার সাদর আমন্ত্রণে তৎকালীন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায় তাঁদের আতিথ্য গ্রহণ করেন সে সময় তিনি বন্দুকভাঙ্গার বিরেজমরা তানজাং জলপ্রপাত বন্দুককানা মোন (যমচুগ) দর্শন করেন বহু বছর পর ২০২১ সালে চাকমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ও বিরেজমরা তানজাং দর্শন করেন এবং তাঁদের বাড়িতে রাত্রিযাপন করেন এই ঘটনাগুলো শুধু একটি পরিবারের স্মৃতি নয়; এর মধ্যে পাহাড়ের সামাজিক সম্পর্ক, আতিথেয়তা এবং ঐতিহ্যের একটি ধারাবাহিকতাও প্রতিফলিত হয় এই ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার বুকে নিয়েই প্রগতি খীসার বেড়ে ওঠা কিন্তু ঐতিহ্যের মর্যাদা থাকলেও তাঁর শিক্ষাজীবন ছিল সহজ মসৃণ নয়

জীবনের প্রথম পাঠ শুরু হয় করল্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এরপর তিনি মাচ্ছ্যা পাড়া (চারিখ্যং) নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়, বন্দুকভাঙ্গা থেকে ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন

পরবর্তী সময়ে রাঙ্গামাটির শাহ (বহুমুখী) উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে ১৯৯০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন এরপর রাজানগর রাণীরহাট কলেজ থেকে ১৯৯২ সালে এইচএসসি পাস করেন উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি চট্টগ্রামের নোয়াপাড়া ডিগ্রি কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং ১৯৯৫ সালে দ্বিতীয় বিভাগে বি.. ডিগ্রি অর্জন করেন

তাঁর শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা এখানেই থেমে থাকেনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে এম.. অধ্যয়নরত অবস্থায় ভদন্ত সুমনালঙ্কার মহাথেরের আহ্বানে তিনি খাগড়াছড়ির পিবিএম আবাসিক স্কুলে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক হয়ে ওঠার এই পরিবর্তন তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক এর পাশাপাশি ধর্মীয় পালি শিক্ষার প্রতিও তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ পালি সংস্কৃত শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা থেকে বিনয় উপাধি পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন

তবে তাঁর নিজের ভাষায়, কার্বারী পরিবারের সন্তান হয়েও তাঁর পড়াশোনার সময়টি সঙ্গত কারণে সুখকর ছিল না নানা প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে তাঁকে শিক্ষার পথ এগিয়ে নিতে হয়েছে তাই তাঁর শিক্ষাজীবনের সাফল্য কেবল কয়েকটি সনদ অর্জনের ইতিহাস নয়; এটি অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস এবং প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করার এক নীরব কাহিনি

প্রগতি খীসার সাহিত্যচর্চার শুরু স্কুলজীবন থেকেই শৈশব-কৈশোরে যে অনুভব, প্রকৃতি জীবনবোধ তাঁর মনে সঞ্চিত হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে সেগুলোই কবিতার ভাষা পেয়েছে পাহাড়ের প্রকৃতি, মানুষের জীবন, ভালোবাসা, বেদনা, স্বপ্ন সামাজিক বাস্তবতা তাঁর সাহিত্যচিন্তার পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে তাঁর প্রকাশিত একক কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে. মনচিদ আহ্ঙী যায় . জুম পাহাড়ের সংলাপ . বেদনার পদাবলি

তাঁর কবিতা বিভিন্ন সংকলন সাহিত্যপত্রে স্থান পেয়েছে রান্ন্যাফুল কাব্যগ্রন্থে প্রকাশিত চাকমা শ্রেষ্ঠ কবিতার সংকলন, উপজাতীয় কালচারাল ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত পার্বত্য চট্টগ্রামের বিংশ শতাব্দীর কবিতা গ্রন্থ এবং ত্রিপুরা রাজ্য থেকে প্রকাশিত চাকমা সাহিত্যপত্র মাদি-তে তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়েছে কলকাতার বোধিভারতী বৌদ্ধ সাহিত্যপত্রেও তাঁর সাহিত্যকর্ম প্রকাশের উল্লেখ পাওয়া যায় এছাড়া বাংলা একাডেমি কর্তৃক ২০২৬ সালে প্রকাশিত চাকমা সাহিত্যবিষয়ক গ্রন্থেও তাঁর কবিতা স্থান পেয়েছে

কবিতার পাশাপাশি বিভিন্ন সাহিত্য সাময়িকীতে তাঁর বহু মননশীল কবিতা, প্রবন্ধ নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে ফলে তিনি শুধু কবি নন; সাহিত্যচর্চার বিস্তৃত পরিসরেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে

সাহিত্যের পাশাপাশি সংগীতের প্রতিও প্রগতি খীসার রয়েছে গভীর অনুরাগ ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বেতার, রাঙ্গামাটি আঞ্চলিক কেন্দ্রে আধুনিক গানের তালিকাভুক্ত গীতিকার হিসেবে অন্তর্ভুক্তি তাঁর সৃজনশীল জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য অর্জন শব্দ সুরের জগতে তাঁর এই সম্পৃক্ততা তাঁর বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে আরও সমৃদ্ধ করেছে

১৯৯৮ সালে বনিতা চাকমার সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক জীবন শুরু হয় দাম্পত্য জীবনে তাঁদের তিন পুত্রসন্তানপ্রমী খীসা, অতীন্দ্রিয় খীসা কৌশিক এবং পত্থম খীসা সাহিত্য, শিক্ষা সামাজিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি পরিবারও তাঁর জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন ব্যক্তিজীবনের দায়িত্ব এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে সমান্তরালে এগিয়ে নেওয়া তাঁর জীবনযাত্রার একটি উল্লেখযোগ্য দিক

প্রগতি খীসার কর্মপরিসর কেবল সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয় বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত থেকে তিনি দায়িত্ব পালন করেছেন ২০০২ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত তিনি চাকমা রাজবিহার, রাঙ্গামাটির কার্যনির্বাহী পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এরপর ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত রাজবন বিহারের উপাসক-উপাসিকা পরিষদের সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য ছিলেন

তিনি তাঞ্জাং শিল্পীগোষ্ঠী, রাঙ্গামাটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন একইভাবে পার্বত্য শিক্ষা সহায়ক ফাউন্ডেশন ট্রাস্ট, রাঙ্গামাটির সভাপতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বৌদ্ধ এসোসিয়েশনের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন বর্তমানে তিনি CHT Writers Union-এর উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হিসেবে যুক্ত আছেন এসব দায়িত্বের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট হয়ে ওঠেসাহিত্য তাঁর কাছে শুধু ব্যক্তিগত সৃষ্টির ক্ষেত্র নয়, বরং সমাজ সংস্কৃতির প্রতি দায়বদ্ধতারও একটি মাধ্যম

সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মাননা লাভ করেছেন তাঁর এই স্বীকৃতিগুলো ব্যক্তিগত অর্জনের পাশাপাশি পাহাড়ের সাহিত্য সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁর অবদানেরও স্বীকৃতি বহন করে

প্রগতি খীসার জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ কবিতা বলা হয়, তবে তার প্রতিটি স্তবকে রয়েছে সংগ্রামের ছাপ, শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা, ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার এবং সৃষ্টিশীলতার আলো কার্বারী পরিবারের ঐতিহ্য তাঁকে দিয়েছে শিকড়ের পরিচয়; প্রতিকূল শিক্ষাজীবন তাঁকে দিয়েছে দৃঢ়তা; সাহিত্য তাঁকে দিয়েছে আত্মপ্রকাশের ভাষা; আর সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড তাঁকে দিয়েছে মানুষের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ

তাঁর জীবন তাই কেবল একজন কবি বা শিক্ষিত মানুষের ব্যক্তিগত জীবনকথা নয় এটি পাহাড়ের এক প্রজন্মের সংগ্রাম, স্বপ্ন সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়েরও একটি প্রতিচ্ছবি জীবনের শুরুতে যে পথ ছিল বন্ধুর, সেই পথেই তিনি ধীরে ধীরে নিজের জন্য নির্মাণ করেছেন আলোর সিঁড়ি প্রতিকূলতা তাঁকে থামাতে পারেনি; বরং প্রতিটি বাধা তাঁর পথচলাকে আরও দৃঢ় করেছে তাই প্রগতি খীসার জীবন-পাঠক্রম শেষ হয়ে যায় কোনো একটি ডিগ্রি, পদ বা পুরস্কারে নয়এটি চলমান, যেমন পাহাড়ের ঝরনা চলতে থাকে আপন গতিতে

শিকড় থেকে উঠে এসে শব্দের ভুবনে নিজের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রেখে যাওয়াএই হলো প্রগতি খীসার জীবনযাত্রার মূল সুর

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

প্রগতি খীসা: প্রতিকূলতার পথ পেরিয়ে সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতির অঙ্গনে এক অভিযাত্রা - ইনজেব চাঙমা

জীবন কখনো সরলরেখায় এগিয়ে চলে না । কখনো তা কণ্টকাকীর্ণ পথ , কখনো অন্ধকার গিরিপথ , আবার কখনো প্রতিকূলতার বুক চিরে উঠে আসা আল...