বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

চাঙমা ভাষার লেখকদের নিরুৎসাহিত নয়, উৎসাহিত করাই সময়ের দাবি - ইনজেব চাঙমা

 

কোনো ব্যক্তিকে ‘কবি’ বলা যাবে কি না, এ নিয়ে সাহিত্যিক বা একাডেমিক আলোচনা হতেই পারে। একজন কবির কবিত্ব, তাঁর সৃষ্টির পরিমাণ, মান, প্রকাশনা কিংবা সাহিত্যিক অবদান নিয়েও প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। কিন্তু সেই আলোচনারও একটি পরিমিতি, সৌজন্য ও বৃহত্তর সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা থাকা প্রয়োজন।  বিশেষ করে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালার বর্তমান বাস্তবতায় বিষয়টি আরও সংবেদনশীল।
 
আজকের বাস্তবতা হলো, চাঙমাদের নিজস্ব ভাষা ও বর্ণমালা থাকা সত্ত্বেও চাঙমা ভাষায় নিয়মিত লেখালেখির চর্চা অত্যন্ত সীমিত। বর্ণমালার সঙ্গে নতুন প্রজন্মের পরিচয়ও দিন দিন দুর্বল হয়ে পড়ছে। চর্চার অভাবে অনেক তরুণ-তরুণীর কাছেই নিজস্ব বর্ণমালা অপরিচিত হয়ে উঠছে। এটি হয়তো আমাদের জন্য অপ্রিয় সত্য, কিন্তু এই সত্যকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
 
এমন বাস্তবতায় কেউ যখন চাঙমা ভাষায় লিখতে শুরু করেন, কবিতা লেখার চেষ্টা করেন, নিজের ভাবনা নিজের মাতৃভাষায় প্রকাশ করেন, তখন তাঁর প্রথম প্রয়োজন কঠোর বিচার নয়, বরং উৎসাহ। কারণ আজ যে তরুণটি দু-একটি কবিতা লিখছে, আগামী দিনে সেই হয়তো আরও ভালো লিখবে, আরও বেশি লিখবে এবং অন্যদেরও চাঙমা ভাষায় লিখতে অনুপ্রাণিত করবে।
 
একজন নতুন লেখকের লেখাকে সাহিত্যিক বিচারে দুর্বল মনে হলে তা নিয়ে গঠনমূলক আলোচনা করা যায়। কিন্তু তাঁর মাতৃভাষায় লেখার উদ্যোগকে খাটো করা বা তাঁর লেখার সংখ্যা দিয়ে তাঁর ভাষাচর্চার গুরুত্বকে অস্বীকার করা দীর্ঘমেয়াদে আমাদের নিজেদের ভাষার জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে।
‘কবি’ অভিধাটি নিয়ে বিতর্কের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো—চাঙমা ভাষায় আমরা কতজনকে লিখতে উৎসাহিত করছি? কতজন তরুণকে চাঙমা বর্ণমালা শেখাচ্ছি?  কতজন নতুন লেখককে আমরা বলছি, ‘লিখুন, ভুল হলেও লিখুন; আপনার ভাষায় লিখুন’?  চাঙমা ভাষার ভবিষ্যৎ শুধু প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিকদের হাতে নয়; বরং যারা আজ প্রথমবার মাতৃভাষায় একটি কবিতা, গল্প, নিবন্ধ কিংবা ছোট্ট কোনো অনুভূতি লিখতে বসেছে, তাদের হাতেও নিহিত।
 
তাই কোনো লেখকের কবিত্ব নিয়ে মতভেদ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই মতভেদ যেন চাঙমা ভাষায় লেখার আগ্রহকে নিরুৎসাহিত না করে। একজন লেখককে ‘কবি’ বলা হলো কি না, সেটি সময় ও সাহিত্যই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে। কিন্তু একজন মানুষ মাতৃভাষায় লিখতে শুরু করলেন, এই ঘটনাটিই ভাষার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে মূল্যবান।
 
আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, ভাষা কেবল ব্যাকরণ, অভিধান কিংবা বর্ণমালার সমষ্টি নয়। ভাষা বেঁচে থাকে মানুষের মুখে, কলমে, বইয়ে, গানে, কবিতায় এবং নতুন প্রজন্মের সৃষ্টিশীলতায়। সুতরাং চাঙমা ভাষার একজন লেখককে নিয়ে বিতর্ক করার আগে আমাদের ভাবা উচিত—তাঁকে থামিয়ে দিচ্ছি, নাকি আরও লিখতে উৎসাহিত করছি? কারণ আমাদের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সংকট ‘কে কবি’- এই প্রশ্ন নয়; বরং আগামী প্রজন্মের হাতে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা আদৌ কতটা জীবন্ত থাকবে, সেই প্রশ্ন।
 
তাই আসুন, কবির অভিধা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি চাঙমা ভাষায় যারা লিখছেন, তাদের উৎসাহ দিই। ভুল হলে সংশোধন করি, দুর্বল হলে উন্নতির পথ দেখাই, কিন্তু কলমটি থামিয়ে না দিই। কারণ একটি ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার সবচেয়ে শক্তিশালী উপায় হলো, সেই ভাষায় মানুষকে লিখতে শেখানো এবং লিখতে উৎসাহিত করা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

চাঙমা ভাষার লেখকদের নিরুৎসাহিত নয়, উৎসাহিত করাই সময়ের দাবি - ইনজেব চাঙমা

  কোনো ব্যক্তিকে ‘কবি’ বলা যাবে কি না, এ নিয়ে সাহিত্যিক বা একাডেমিক আলোচনা হতেই পারে। একজন কবির কবিত্ব, তাঁর সৃষ্টির পরিমাণ, মান, প্রকাশনা ক...