শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬

ম্যাকলিন চাকমা : পাহাড়ের ভাষা, মানুষের কবি -ইনজেব চাঙমা

কিছু কবি শব্দ লেখেন, কিছু কবি সময়কে লিপিবদ্ধ করেন; আর কিছু কবি আছেন, যাঁরা একটি ভূখণ্ডের আত্মাকে ভাষা দেন। তরুণ চাঙমা কবি ম্যাকলিন চাকমা সেই বিরল কণ্ঠগুলোর একজন। তাঁর কবিতায় পাহাড় কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; পাহাড় সেখানে কথা বলে, নদী স্মৃতি বহন করে, জুমের ধোঁয়া ইতিহাসের দীর্ঘশ্বাস হয়ে আকাশে মিশে যায়। তাঁর কাব্যে ফুল ফোটে কেবল বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে নয়, বরং মানুষের স্বপ্ন, বেদনা ও অস্তিত্বের অনিবার্য প্রতীক হয়ে। তাই তাঁর কবিতা পড়া মানে শুধু সাহিত্য পাঠ নয়; যেন পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির অন্তর্লোকের সঙ্গে এক নিবিড় আলাপ।

১৯৯৩ সালের ১০ অক্টোবর রাঙ্গামাটি জেলার বরকল উপজেলার সুভলং ইউনিয়নের হাজাছড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা অলঙ্গ কুমার চাকমা এবং মাতা অলকা দেবী চাকমার স্নেহধন্য সন্তান তিনি। ছোট বোন পপি চাকমাকে নিয়ে তাঁদের পরিবার। শৈশব কেটেছে পাহাড়ের বুক চিরে, জুমের পথ ধরে, বিরেচমরা পাহাড় থেকে ছোটহরিণার খুকিছড়া পর্যন্ত এক জুম থেকে আরেক জুমে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে। প্রকৃতির সেই অন্তরঙ্গ সংসর্গ তাঁর রক্তে মিশিয়ে দিয়েছে পাহাড়ের রং, ঝরনার সুর আর বনভূমির নৈঃশব্দ্য। পরবর্তীকালে সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর কবিতার প্রাণরস হয়ে উঠেছে।

তাঁর শিক্ষাজীবনের সূচনা নিজ গ্রামের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে বরুনাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত অধ্যয়ন শেষে মোনঘর আবাসিক বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। ২০১২ সালে এসএসসি সম্পন্ন করে ঢাকার মার্টিন লুথার কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। কুমিল্লা টিচার্স ট্রেনিং কলেজে বি.এড. অধ্যয়ন শুরু করলেও সাহিত্য ও জ্ঞানসাধনার গভীর আকর্ষণ তাঁকে নিয়ে যায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পালি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে, যেখানে তিনি স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

ম্যাকলিন চাকমা মূলত কবি; তবে তাঁর সাহিত্যসাধনা কেবল কবিতায় সীমাবদ্ধ নয়। ছোটগল্প, নাটক, গান, প্রবন্ধ—প্রতিটি শাখায় তিনি সমান স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করেন। তাঁর প্রকাশিত তিনটি চাকমা কাব্যগ্রন্থ—‘দেবংসি’ (২০১৮), ‘আচ্’ (২০১৯) এবং ‘নুও গরি ফাগুন এঝের’ (২০২০)—চাকমা ভাষার আধুনিক কাব্যধারায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। পাশাপাশি চাকমা, বাংলা ও ইংরেজি—তিন ভাষায় একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।

তাঁর কবিতায় পাহাড়ের প্রকৃতি যেমন জীবন্ত হয়ে ওঠে, তেমনি উচ্চারিত হয় আদিবাসী মানুষের জীবনসংগ্রাম, মাতৃভাষার মমত্ব, ইতিহাসের ক্ষত, প্রেমের নির্মলতা এবং ভবিষ্যতের প্রত্যাশা। তাঁর শব্দচয়ন সংযত, অথচ গভীর; ভাষা সহজ, কিন্তু ভাবের বিস্তার সুদূরপ্রসারী। এই কারণেই তাঁর কবিতা শুধু চাঙমা পাঠকের নয়, বৃহত্তর বাংলা সাহিত্যাঙ্গনেরও মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।

দেশের বিভিন্ন সাহিত্যপত্র, লিটল ম্যাগাজিন এবং জাতীয় দৈনিক কালের কণ্ঠ-এ তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ নিয়মিত প্রকাশিত হয়েছে। দেশের সীমানা অতিক্রম করে ভারতের সাহিত্যপত্রেও তাঁর কবিতা ও ছোটগল্প স্থান পেয়েছে। সাহিত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আদিবাসী শিক্ষার্থীদের সাহিত্যপত্র ‘রঁদেভু’-এর ১৭তম সংখ্যা এবং মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার স্মরণে প্রকাশিত ‘কেওক্রডং’-এর ২০২২ সংখ্যা তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘নুও গরি ফাগুন এঝের’ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার বাংলা বিভাগের একটি কোর্সে রেফারেন্স গ্রন্থ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া তাঁর সাহিত্যকীর্তির এক অনন্য স্বীকৃতি।

কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ইউনেস্কো ঢাকার একটি প্রকল্পে কাজ করেন। ইউনেস্কো প্রকাশিত Of Roots of Heritage: Tales from the Hills গ্রন্থে তাঁর একটি যৌথ গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একই গ্রন্থের পাঁচটি গল্প বাংলা থেকে চাকমা ভাষায় অনুবাদ এবং চাকমা ফন্টে লিপ্যন্তরের দায়িত্বও তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করেন। ২০২৩ সালে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কবিদের অংশগ্রহণে আয়োজিত আন্তর্জাতিক অনলাইন কবিতা পাঠ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ লাভ করেন। কানাডা, চীন, গ্রিস, ইরান, ফিলিপাইন, সার্বিয়া ও বাংলাদেশের কবিদের সঙ্গে একই মঞ্চে কবিতা পাঠ তাঁর সাহিত্যযাত্রাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে দেয়।

চাকমা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৮ সালে বরুনাছড়ি উচ্চ বিদ্যালয়, ২০২৫ সালে কাট্টলী বরুনাছড়ি ও ধামাইছড়া মৌজাস্থ চাকুরিজীবী কল্যাণ সমবায় সমিতি লিমিটেড এবং ২০২৬ সালে বাংলাদেশ আদিবাসী কবি, লেখক ও সাহিত্যিক ঐক্য পরিষদ আয়োজিত আদিবাসী সাহিত্য উৎসবে সম্মাননায় ভূষিত হন।

 
বর্তমানে তিনি মোনঘরে সহকারী প্রকাশনা ও যোগাযোগ কর্মকর্তা ও মোনঘর রেসিডেন্সিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ (চাঙমা ভাষা) শিক্ষকতা করছেন। পাশাপাশি চিটাগং হিল ট্র্যাক্টস রাইটার্স ইউনিয়ন-এর কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সহ-গবেষণা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

ম্যাকলিন চাকমার সাহিত্যজীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়ের আশ্রয়। তাঁর কবিতা পাহাড়ের বাতাসে জন্ম নেয়, ঝরনার জলে ধুয়ে যায়, মানুষের হৃদয়ে আশ্রয় খুঁজে নেয়। তিনি এমন এক কবি, যিনি শব্দ দিয়ে কেবল কবিতা নির্মাণ করেন না; নির্মাণ করেন একটি জাতির স্মৃতি, একটি ভূখণ্ডের চেতনা এবং ভবিষ্যতের প্রতি অবিচল বিশ্বাস। সময়ের প্রবাহে তাঁর সাহিত্যকর্ম নিঃসন্দেহে চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল মাইলফলক হয়ে বেঁচে থাকবে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

ম্যাকলিন চাকমা : পাহাড়ের ভাষা, মানুষের কবি -ইনজেব চাঙমা

কিছু কবি শব্দ লেখেন, কিছু কবি সময়কে লিপিবদ্ধ করেন; আর কিছু কবি আছেন, যাঁরা একটি ভূখণ্ডের আত্মাকে ভাষা দেন। তরুণ চাঙমা কবি ম্যাকলিন চাকমা সেই...