রবিবার, ২৬ জুলাই, ২০২৬

মাতৃভাষার প্রদীপ ও বর্ণমালার রূপকার

ইনজেব চাঙমা 
“একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল কিছু শব্দের বিলুপ্তি নয়; হারিয়ে যায় একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের দীর্ঘ উত্তরাধিকার।”

ইতিহাসের প্রতিটি সময়ে এমন কিছু মানুষ জন্ম নেন, যাঁরা ব্যক্তিগত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের সীমা অতিক্রম করে নিজেদের জীবনকে একটি বৃহত্তর আদর্শের কাছে সমর্পণ করেন। তাঁদের হাতে কোনো রাষ্ট্রক্ষমতা থাকে না, থাকে না বিপুল অর্থসম্পদ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব; কিন্তু তাঁদের নীরব শ্রমই একদিন একটি ভাষাকে নতুন প্রাণ দেয়, একটি বিলীয়মান বর্ণমালাকে পুনর্জাগরিত করে এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয়কে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
 
পার্বত্য চট্টগ্রামের চাঙমা ভাষা, অঝাপাত বর্ণমালা এবং সমকালীন চাঙমা সাহিত্য-সংস্কৃতির ইতিহাসে এমনই এক নিবেদিতপ্রাণ সাধকের নাম ইনজেব চাঙমা। তিনি কেবল একজন লেখক নন; তিনি ভাষাসংগ্রামী, সংগঠক
, সম্পাদক, পাঠাভ্যাস আন্দোলনের উদ্যোক্তা এবং মাতৃভাষা পুনর্জাগরণের এক নিরলস কর্মযোদ্ধা।
১৯৮১ সালে ১৯ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রামের চাঙমা সার্কেলের ২৯ নম্বর ছোটমেরুং মৌজার বাজেইছড়া গ্রামের এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ইনজেব চাঙমা। পিতা তরুণী কুমার চাঙমা ও মাতা বিজয়শোভা চাঙমার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ।
 
পাহাড়, জুমক্ষেত, বনভূমি, ঝিরিপথ এবং বৌদ্ধ সংস্কৃতির আবহে তাঁর শৈশব গড়ে ওঠে। প্রকৃতিই ছিল তাঁর প্রথম শিক্ষক; লোকগাথা ছিল তাঁর প্রথম সাহিত্য; আর মাতৃভাষার উচ্চারণ ছিল তাঁর প্রথম আত্মপরিচয়।
১৯৯২-৯৪ সালে গৃহশিক্ষক দীপায়ন চাঙমা (বীর)’র কাছে অঝাপাত বর্ণমালা শেখার পর তাঁর জীবনে এক গভীর উপলব্ধির জন্ম হয়। তিনি বুঝতে পারেন—একটি ভাষা যতদিন মুখে বেঁচে থাকে, ততদিন তার অস্তিত্ব টিকে থাকে; কিন্তু তার নিজস্ব বর্ণমালা হারিয়ে গেলে সেই ভাষার ইতিহাস, সাহিত্য ও সভ্যতাও ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যায়। সেই দিন থেকেই মাতৃভাষা ও অঝাপাত সংরক্ষণ তাঁর জীবনের ব্রত হয়ে ওঠে।
ইনজেব চাঙমার ব্যক্তিজীবন সুখ ও বেদনার এক গভীর সংমিশ্রণ। তাঁর প্রথম স্ত্রী ছিলেন ২৯ নম্বর ছোটমেরুং মৌজার হেডম্যান সুশীল জীবন চাঙমার কন্যা। এই দাম্পত্যজীবনে জন্ম নেয় কন্যা কালজয়ী চাঙমা, যিনি বর্তমানে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে অধ্যয়নরত, এবং পুত্র আর্যঋদ্ধি মানব জ্যোতি চাঙমা, ৯ম শ্রেণি।
 
কিন্তু জীবনের নির্মম বাস্তবতা তাঁকে অকালেই স্ত্রীর মৃত্যুশোকের মুখোমুখি দাঁড় করায়। সেই ব্যক্তিগত বিপর্যয় তাঁকে ভেঙে দেয়নি; বরং আরও গভীরভাবে ভাষা ও সংস্কৃতির কাজে নিমগ্ন করেছে।
 
পরবর্তীকালে তিনি পানছড়ি উপজেলার ধুদুকছড়া গ্রামের প্রদ্যুত চাঙমা মেয়ে মাদ্রি দেবী চাঙমাকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে গ্রহণ করেন। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় কন্যা জধা চাঙমা। সংসারের দায়িত্ব, কৃষিকাজ, আর্থিক সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিক সংগ্রামের মধ্য দিয়েও তিনি মাতৃভাষার প্রতি তাঁর অঙ্গীকার থেকে কখনো বিচ্যুত হননি।
 
২০০৪ সালে ইনজেব চাঙমা উপলব্ধি করেন—ভাষাকে কেবল ভালোবাসা যথেষ্ট নয়; তাকে টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন শিক্ষা, পাঠক, লেখক, গ্রন্থ, পাঠাগার এবং সংগঠিত সাংস্কৃতিক আন্দোলন।
 
এই উপলব্ধি থেকেই প্রতিষ্ঠা করেন নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ এবং সাঙু পাঠাগার। পরবর্তীকালে সংগঠনটি নতুন পরিচয়ে আত্মপ্রকাশ করে চাঙমা সাহিত্য একাডেমি নামে।
 
তাঁর উদ্যোগে পার্বত্য চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং ভারতের ত্রিপুরা পর্যন্ত বিস্তৃত হয় অঝাপাত ও চাঙমা ভাষা শিক্ষা কার্যক্রম। বিভিন্ন তথ্য অনুযায়ী, তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে, এক ঝাঁক ভাষাপ্রেমিদের স্বেচ্ছাশ্রমে প্রায় ষোল হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী মাতৃভাষা ও অঝাপাত বর্ণমালার প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছে—যা চাঙমা ভাষা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
 
ইনজেব চাঙমার সাহিত্যকর্ম বিস্তৃত হয়েছে ভাষা শিক্ষা, শিশুসাহিত্য, কবিতা, নাটক, অনুবাদ, গান এবং সম্পাদনার নানা ক্ষেত্রে।
 
ভাষা শিক্ষা: পত্থম আদিপুদি (২০১৫), ম বই (২০১৭), সাঙু (২০১৮) ও অঝাপাত (২০২১)।
শিশুসাহিত্য: কব্দ কোই, তারুম আ জানজুনি ও লোবিয়ত (সবগুলো ২০১৮)
কাব্যগ্রন্থ: উত্তিপুত্তি (২০২৩) ও ধনপুদি (২০২৩)। 
 
নাট্যরচনা: প্রকাশিত তাঁর নাটিকা “জুয়া মানে জিংকানি নাচ” এবং “মা ভাচ ” মাতৃভাষা ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে নাট্যরূপে উপস্থাপনের উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা।
 
নিজস্ব সাহিত্য রচনার পাশাপাশি ইনজেব চাঙমা বিশ্বসাহিত্যের বিভিন্ন শিশুতোষ গল্প চাঙমা ভাষায় অনুবাদ(যৌথ) করেছেন। রাজা আ কংজরি, বাক আ সিংহ, মেলাত হারা-হারি, শিয়াল্যা আ ত বোবুয়া, রাঙা বল, আহ্'ওচ, মাচ তোগেয়্যাসহ বহু অনুবাদগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি চাঙমা শিশুদের সামনে বিশ্বসাহিত্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন।
 
একজন লেখকের পাশাপাশি তিনি একজন সম্পাদকও। নবীন সাহিত্যিকদের জন্য তিনি সম্পাদনা করেছেন চাদি, হিলর পচ্জন (চাঙমা সাংবাদ পত্র), জুম, হিল চাদিগাঙ, মেদেনি এবং চাঙমা কবিতা সংকলন ‘পুগবেল’।
 
এই পত্রিকাগুলো কেবল সাহিত্য প্রকাশের মাধ্যম নয়; এগুলো চাঙমা ভাষার নতুন লেখক সৃষ্টির উর্বর ক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
 
ইনজেব চাঙমার বিশ্বাস—একটি ভাষা বইয়ের মধ্য দিয়েই দীর্ঘজীবী হয়। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি খাগড়াছড়ি জেলায় ‘শিঙোর’ নামে বারোটি দেয়ালিকা প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি শুরু করেন বইপাঠ আন্দোলন, পাঠচক্র, গ্রামীণ পাঠাগার গঠন, সাহিত্যসভা এবং বিদ্যালয়ভিত্তিক পাঠাভ্যাস কর্মসূচি।
তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস—
“যে সমাজ বই পড়ে না, সে সমাজ কোনো ভাষাকেই দীর্ঘদিন বাঁচিয়ে রাখতে পারে না।”
এই দর্শনই তাঁর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু।
দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে কৃষিকাজ, সংসার এবং ভাষা আন্দোলনের ভার একসঙ্গে বহন করেছেন ইনজেব চাঙমা। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা তাঁর সাহিত্যসাধনাকে থামাতে পারেনি, কিন্তু বহু মূল্যবান পাণ্ডুলিপি এখনো প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে।
 
অপ্রকাশিত রচনার মধ্যে রয়েছে—
• একটি চাঙমা ছোটগল্পগ্রন্থ • একটি চাঙমা কাব্যগ্রন্থ • একটি চাঙমা প্রবন্ধগ্রন্থ • বাংলা ভাষায় তিনটি প্রবন্ধগ্রন্থ।
এই পাণ্ডুলিপিগুলোর প্রকাশ কেবল একজন লেখকের স্বপ্নপূরণ নয়; বরং চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যভাণ্ডারের গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হবে।
 
ইনজেব চাঙমার জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—একজন মানুষের নিষ্ঠা কখনও কখনও একটি জাতির সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ নির্মাণে নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। সীমিত সম্পদ, ব্যক্তিগত শোক, আর্থিক সংকট এবং সামাজিক প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি যে দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন, তা নিছক ব্যক্তিগত সাফল্যের ইতিহাস নয়; এটি একটি ভাষার পুনর্জাগরণের ইতিহাস।
 
তিনি প্রমাণ করেছেন, ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; ভাষা একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, চিন্তা, বিশ্বাস এবং ভবিষ্যতের ধারক। তাই তাঁর কর্মজীবন মূলত এক অবিরাম সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ইতিহাস—বিস্মৃতির বিরুদ্ধে স্মৃতির, নীরবতার বিরুদ্ধে উচ্চারণের, এবং বিলুপ্তির বিরুদ্ধে অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রাম।
সময়ের বিচারে ইনজেব চাঙমার কর্মের পূর্ণ মূল্যায়ন হয়তো এখনও সম্পন্ন হয়নি। কিন্তু ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় চাঙমা ভাষা ও অঝাপাত বর্ণমালার পুনর্জাগরণের যে অধ্যায় রচিত হবে, সেখানে তাঁর নাম একনিষ্ঠ ভাষাসাধক, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং মাতৃভাষার প্রদীপরক্ষক হিসেবে অনিবার্যভাবেই উচ্চারিত হবে।
 
তথ্য ও প্রচার বিভাগ
চাঙমা সাহিত্য একাডেমি
দিঘীনালা, চাঙমা সার্কেল।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

মাতৃভাষার প্রদীপ ও বর্ণমালার রূপকার

ইনজেব চাঙমা  “একটি ভাষা হারিয়ে যাওয়া মানে কেবল কিছু শব্দের বিলুপ্তি নয়; হারিয়ে যায় একটি জাতির স্মৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের দ...