বুধবার, ২২ জুলাই, ২০২৬

কবি ও শিশুসাহিত্যিক আলোময় চাকমা: সংগ্রাম, স্বপ্ন ও সাহিত্যসাধনার এক আলোকিত জীবন- ইনজেব চাঙমা

 

পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্যভুবনে যাঁরা নীরবে অথচ নিষ্ঠার সঙ্গে চাঙমা ভাষা ও সাহিত্যের বিকাশে অবদান রেখে চলেছেন, তাঁদের মধ্যে কবি, শিশুসাহিত্যিক ও শিক্ষক আলোময় চাকমা অন্যতম। সংগ্রামী জীবন, সমাজসচেতন দৃষ্টিভঙ্গি এবং মাতৃভাষার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা তাঁর সাহিত্যচর্চাকে দিয়েছে স্বতন্ত্র মাত্রা। একসময় পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সঙ্গে যুক্ত থেকে রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পথ চললেও, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে শিক্ষা ও সাহিত্যকে জীবনব্রত হিসেবে গ্রহণ করেন। সেই থেকে তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি নিরলসভাবে চাঙমা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন।

 কবি আলোময় চাকমা ১৯৭৩ সালের ১৭ নভেম্বর রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রত্যন্ত বাকছড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুবিলাস চন্দ্র চাকমা ও মাতা রত্নমুখী চাকমার পাঁচ সন্তানের মধ্যে তৃতীয়। তিনি মূলিম্যা গোজা ও পজা গুত্তিভুক্ত।
বর্তমানে তিনি স্ত্রী রাঙ্গু চাকমা এবং দুই কন্যা, যাত্রী চাকমা ও টিকা চাকমাকে নিয়ে খাগড়াছড়ির মহালছড়ি উপজেলা সদরসংলগ্ন মনাটেক গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
 
শৈশবেই গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের সূচনা। পরে জুনিয়র বাকছড়ি মুখ স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। পরবর্তীতে খাগড়াছড়ি পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনে থেকে কমলছড়ি উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করেন। এরপর সিঙ্গিনালা উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হয়ে ১৯৮৯ সালে এসএসসি এবং ১৯৯১ সালে মহালছড়ি মহাবিদ্যালয় থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির একজন বেসামরিক সক্রিয় সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় তাঁর সাংগঠনিক নাম ছিল ‘উদাস’। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির পর তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন এবং নতুনভাবে জীবনকে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে শিক্ষা ও সমাজগঠনের কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
 
২০০০ সালে তিনি সাবেক্ষ্যং করল্যাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘ দুই দশক সেখানে দায়িত্ব পালনের পর ২০২০ সালে বদলি হয়ে বর্তমানে দেওয়ানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি যেমন শিশুদের আলোকিত ভবিষ্যৎ নির্মাণে কাজ করে চলেছেন, তেমনি একজন সাহিত্যিক হিসেবে মাতৃভাষা ও সংস্কৃতির বিকাশেও নিরবচ্ছিন্ন অবদান রেখে চলেছেন।
 
আলোময় চাকমার সাহিত্যযাত্রার সূচনা ছাত্রজীবনেই। ১৯৮৭–৮৮ সালে তৎকালীন ‘কজমা বোই-অ চাগ’ পাঠাগারের দেয়ালিকা ‘সেরাংমেরাং’-এ তাঁর প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম কবিতা ‘রাঙা স্ববন’ পাঠ করে সংগঠক আনন্দ প্রকাশ চাকমা তাঁর প্রতিভা চিনে নেন এবং লেখালেখিতে উৎসাহ ও প্রেরণা জোগান। সেই অনুপ্রেরণাই তাঁকে আজকের আলোময় চাকমা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
 
পরবর্তী সময়ে তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে ‘বিঝু সংকলন’, ‘আহলপালনি’, ‘আদিবাসী মেলা’, ‘লেখক সম্মেলন স্মারকগ্রন্থ’, ‘চাদি’-সহ অসংখ্য সাহিত্যসংকলনে। এছাড়া বরকল উপজেলার ‘বনযোগী ছড়া কিশোর-কিশোরী ক্লাব’ প্রকাশিত সংকলন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘রঁদেভু’, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘হিলি ওয়েভস’ লিটল ম্যাগাজিনেও তিনি নিয়মিত লিখে আসছেন। অনলাইনভিত্তিক ‘জুম জার্নাল’, ‘উঠান’ সহ বিভিন্ন সাহিত্যভিত্তিক ওয়েবসাইটেও তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। পাশাপাশি ‘ফুলবারেঙ’ নামে তাঁর ব্যক্তিগত সাহিত্যপৃষ্ঠায়ও তিনি নিয়মিত সাহিত্যচর্চা করেন।
 
গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, গান ও ছড়া, সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ থাকলেও তিনি মূলত কবি ও শিশুসাহিত্যিক হিসেবেই অধিক পরিচিত। শিশু-কিশোরদের জন্য সহজ, নির্মল ও মূল্যবোধসম্পন্ন সাহিত্য রচনায় তিনি বিশেষ সুনাম অর্জন করেছেন।
 
তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো— ‘ফুলবারেঙ’ (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৫), ‘হক্কেং হক্কেং’ (ছড়াগ্রন্থ, ২০১৭), ‘তিন্নোমুরি’ (ছড়াগ্রন্থ, ২০১৮), ‘মনপুদি’ (কাব্যগ্রন্থ, ২০১৯) এবং ‘নাউরি’ (ছড়াগ্রন্থ, ২০২০)। তাঁর অধিকাংশ গ্রন্থ ঢাকা ও রাঙামাটির স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত হয়েছে।
 
সাহিত্যসাধনায় অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ২০১৯ সালের ১৬ মার্চ বৈশালী অনুত্তর যুব একজধা পরিষদ (বায়েপ) থেকে সম্মাননা লাভ করেন। তাঁর সৃজনশীলতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও মিলেছে—ভারতের মিজোরামে অষ্টম শ্রেণির চাকমা ভাষার পাঠ্যপুস্তকে তাঁর কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। একইভাবে বাংলাদেশেও তাঁর কবিতা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছে, যা তাঁর সাহিত্যকর্মের গুণগত মান ও গ্রহণযোগ্যতার উজ্জ্বল স্বীকৃতি। 
 
সংগ্রাম থেকে সৃজনে, রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে শিক্ষার আলোকবর্তিকায় এবং ব্যক্তিজীবন থেকে জাতিসত্তার সাহিত্যভুবনে—আলোময় চাকমার পথচলা সত্যিই অনন্য। তাঁর সাহিত্য শুধু নন্দনচর্চার অনুষঙ্গ নয়; এটি চাঙমা জাতিসত্তার ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও আত্মপরিচয় রক্ষার এক অবিচল প্রয়াস। ভবিষ্যতেও তাঁর কলম চাঙমা সাহিত্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে, এটাই সকলের প্রত্যাশা।
 
বি.দ্র.: কবি আরো অপ্রকাশিত ৩/৪টি ছড়া ও কাব্যগ্রন্থ রয়েছে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

𑄃𑄨𑄥𑄴𑄎𑄬𑄝𑄴 𑄌𑄋𑄴𑄟𑄢𑄴 𑄛𑄳𑄢𑄝𑄧𑄚𑄴𑄙𑄧

  𑄘𑄬𑄠𑄣𑄧𑄖𑄴 𑄛𑄨𑄖𑄴 𑄝𑄎𑄚 𑄃 𑄎𑄧𑄚𑄴 𑄖𑄳𑄢𑄨𑄛𑄪𑄢 𑄃𑄪𑄌𑄴𑄇𑄢𑄨 " 𑄡𑄬 𑄥𑄚𑄴𑄘𑄨𑄖𑄳𑄠𑄭 𑄣𑄮 𑄘𑄨𑄣𑄧𑄁 , 𑄡𑄬 ...