বর্ণের আলোয় স্বাধিকার: এক ভাষার সংগ্রাম থেকে অন্য ভাষার বঞ্চনা
ইতিহাসের পাতায় কোনো জাতির আত্মপরিচয়ের প্রথম ও প্রধান দলিল তার ভাষা। ১৯৫২ সালের এক রক্তঝরা ফাল্গুনে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ৫৬ ভাগ মানুষের বুকের ভাষা বাংলা, ৩৭ ভাগ মানুষ কথা বলে অন্যান্য ভাষায়, আর মাত্র ৭ ভাগ মানুষের মুখের ভাষা উর্দু, সেই উর্দুকেই তারা করতে চেয়েছিল রাষ্ট্রের একমাত্র লাঠি। সেখানে অন্যায্যভাবে উর্দুকে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টার প্রতিবাদেই অঙ্কুরিত হয়েছিল আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন। সেই ভাষার লড়াই, ত্যাগের বহ্নিশিখা এবং দীর্ঘ পথচলার পরিণতিতেই আজকের এই লাল-সবুজের মানচিত্র, সার্বভৌম এক রাষ্ট্র, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। যে ত্যাগের মহিমাকে বিশ্বমঞ্চে স্বীকৃতি দিয়ে ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের ইউনেস্কো ২১শে ফেব্রুয়ারিকে ঘোষণা করে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’। কিন্তু যে দেশের জন্মই হয়েছিল ভাষার অধিকারকে কেন্দ্র করে, সেই দেশেই কি সব ভাষার বর্ণমালা তাদের নিজস্ব নীড় খুঁজে পেয়েছে?
রাষ্ট্র গঠনের প্রারম্ভেই স্বাধীন বাংলাদেশের গণপরিষদে দাঁড়িয়ে পাহাড়ের অবিসংবাদিত নেতা, জুম্ম জাতির পিতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা এক ঐতিহাসিক সত্য উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি দৃপ্তকণ্ঠ অথচ গভীর বেদনায় বলেছিলেন—
“বাংলা আমার রাষ্ট্রভাষা, কিন্তু আমার মাতৃভাষা চাঙমা। আমি চাঙমা ভাষায় পড়াশোনা করতে চাই।”
এই বাক্যটি কেবল একজন ব্যক্তির দাবি ছিল না; এটি ছিল কোনো এক ভূখণ্ডের বহুভাষিক আত্মপরিচয়ের আকুল আবেদন। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, যে রাষ্ট্র নিজেই ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছিল, সেই রাষ্ট্র সেইদিন এই অমোঘ সত্যকে অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছিল। পাহাড়ের শিশুদের মনের ভেতরের এই দাবি বহু বছর ধরে কেবল প্রতিধ্বনি হয়েই ফিরে এসেছে, মূল স্রোতে মেশেনি।
কালক্রমে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি হলো, প্রতিশ্রুতি এল। ২০১০ সালের শিক্ষানীতিতে আদিবাসী শিশুদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষার কথা অন্তর্ভুক্ত করা হলো। কিন্তু নীতির কাগজ থেকে শ্রেণিকক্ষের বেঞ্চে সেই অধিকার পৌঁছাতে লেগে গেল আরও দীর্ঘ সময়।
২০১৭ সালে এসে প্রাক-প্রাথমিক পর্যায়ে পাঁচটি ভাষায় পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হলেও, অবকাঠামো, শিক্ষক ও সদিচ্ছার অভাবে সেই বইগুলো আজও সঠিক অর্থে শিশুদের হাত ধরে শ্রেণিকক্ষে প্রাণবন্ত হতে পারেনি। অন্যদিকে, ২০১৪ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালত বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় সর্বস্তরে সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড ও নামফলকে অন্যান্য ভাষার অযাচিত মিশ্রণ বন্ধের রায় দেন। একটি ভাষাকে স্বকীয়তায় বাঁচিয়ে রাখার এই তাড়না প্রশংসনীয়, তবে সেই একই সংবেদনশীলতা কি দেশের অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক ও আদিবাসীদের ভাষার ক্ষেত্রেও সমভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা ছিল না?
ভাষায় শুধু কথা বলা যায় না, ভাষাতে স্বপ্ন দেখা যায়, আত্মাকে স্পর্শ করা যায়। যখন একজন চাঙমা শিশু তার নিজের বর্ণমালায় প্রথম ”চুচ্যাঙ্যা- কা, গুজঙ্যা- খা, চান্দ্যা- গা” লিখতে শেখে না, তখন কেবল একটি বর্ণমালা হারিয়ে যায় না, বরং একটি ইতিহাস ও সংস্কৃতির শিকড় আলগা হয়ে যায়।
আজ তাই আবার মনে পড়ে যায় সেই ঐতিহাসিক দাবি, যা আজও ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে জবাব খোঁজে:
“আমি আমার চাঙমা ভাষায় পড়াশোনা করতে চাই!”
হে রাষ্ট্র, হে আমাদের এই প্রিয় মাতৃভূমি, আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন এই মাটির তলের সুর?
যে মাটি রক্তের বিনিময়ে ভাষার অধিকার অর্জন করেছে, সেই মাটি কি আরেকটি ভাষার স্বাভাবিক বিকাশকে বুকে জড়িয়ে নেবে না? শাসনের কঠোরতা নয়, মাতৃভাষার অধিকার হোক প্রতিটি শিশুর জন্মগত প্রাপ্তি। যেন দেশের প্রতিটি সন্তান নিজ নিজ মায়ের ভাষায় চোখ মেলে স্বপ্ন দেখতে পারে, অনুভবে ছড়িয়ে দিতে পারে তার সাহিত্যের আলো।
- জুলাই ২২, ২০২৬
পাহাড়ের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষার আওতায় আসুক
মানুষ জন্ম নেয় একটি ভূখণ্ডে, কিন্তু তার প্রকৃত জন্ম ঘটে একটি ভাষায়। মায়ের কণ্ঠে উচ্চারিত প্রথম শব্দ, ঘুমপাড়ানি গানের সুর, শৈশবের বিস্ময় আর প্রথম স্বপ্ন—সবকিছুরই নিবাস মাতৃভাষা। তাই ভাষা কেবল যোগাযোগের বাহন নয়; ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের আয়না, ইতিহাসের উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যতের অঙ্গীকার।
পাহাড়ের সকাল যেমন কুয়াশা ভেদ করে সূর্যের আলোয় উন্মোচিত হয়, তেমনি একটি শিশুর মনও জ্ঞানের আলোয় বিকশিত হয় তার নিজের ভাষার স্পর্শে। যে ভাষায় সে মায়ের মমতা অনুভব করে, প্রকৃতির রূপ চিনে, জীবনের প্রথম বিস্ময়কে নাম দেয়—সেই ভাষাই তার শিক্ষার সবচেয়ে স্বাভাবিক সোপান। অথচ কত নির্মম এই বাস্তবতা! পার্বত্য চট্টগ্রামের অসংখ্য শিশু বিদ্যালয়ের চৌকাঠ পেরিয়েই যেন নিজের ভাষাকে দরজার বাইরে রেখে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়। সেখানে শিক্ষা আছে, কিন্তু নিজের ভাষার উষ্ণতা নেই; বই আছে, কিন্তু আত্মপরিচয়ের প্রতিধ্বনি নেই।
একটি ভাষা হারিয়ে যায় না একদিনে। নদী যেমন হঠাৎ শুকিয়ে যায় না, তেমনি ভাষাও একদিনে বিলীন হয় না। অবহেলার দীর্ঘ ঋতু, নীরবতার অনন্ত অপেক্ষা আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ব্যবহারহীনতার অন্ধকারে ভাষা ধীরে ধীরে তার দীপ্তি হারায়। ভাষার সঙ্গে হারিয়ে যায় লোককথা, প্রবাদ, গান, বিশ্বাস, ইতিহাস, স্মৃতি এবং একটি জনগোষ্ঠীর পৃথিবীকে দেখার স্বতন্ত্র দৃষ্টি।
পাহাড়ের প্রতিটি ভাষা একটি জীবন্ত অরণ্যের মতো। তার প্রতিটি শব্দ একটি বৃক্ষ, প্রতিটি বর্ণ একটি পাতা, প্রতিটি লোকগাথা একটি ঝরনার কলধ্বনি। সেই অরণ্যকে রক্ষা করা মানে কেবল কয়েকটি ভাষাকে সংরক্ষণ করা নয়; রক্ষা করা মানে বাংলাদেশের বহুবর্ণ সাংস্কৃতিক আত্মাকে রক্ষা করা।
শিক্ষা যদি মানুষের মুক্তির পথ হয়, তবে সেই পথের প্রথম ইটটি অবশ্যই মাতৃভাষার হওয়া উচিত। কারণ শিশুর চিন্তার প্রথম জানালা খুলে যায় তার নিজের ভাষায়। যে শিশুকে তার মাতৃভাষায় শেখার অধিকার দেওয়া হয়, সে কেবল ভালো শিক্ষার্থীই হয় না; সে নিজের শিকড়কে ধারণ করে বিশ্বকে আলিঙ্গন করতে শেখে। শিকড় যত গভীর হয়, বৃক্ষ ততই আকাশের দিকে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে।
আজ প্রয়োজন আর কোনো প্রতিশ্রুতির নয়; প্রয়োজন বাস্তব উদ্যোগের। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিটি বিহার, মন্দির, ক্লাব, সরকারি, বেসরকারি, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কিন্ডারগার্টেন, বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। ভাষাভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক, প্রশিক্ষিত শিক্ষক, গবেষণা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে গড়ে তুলতে হবে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে কোনো শিশুকে নিজের ভাষা বিসর্জন দিয়ে জ্ঞানের পথে হাঁটতে না হয়।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের মহত্ত্ব তার অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, তার ভাষাগত বৈচিত্র্যকে কতটা সম্মান দিতে পারে—সেই সক্ষমতায়। পাহাড়ের শিশুরা যেন তাদের প্রথম অক্ষর লেখে নিজের ভাষায়, প্রথম কবিতা আবৃত্তি করে নিজের ভাষায়, প্রথম স্বপ্ন দেখে নিজের ভাষায়—এই আকাঙ্ক্ষা কোনো আবেগ নয়; এটি ন্যায়, এটি অধিকার, এটি একটি মানবিক রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।
আসুন, আমরা এমন এক ভবিষ্যৎ নির্মাণ করি, যেখানে পাহাড়ের প্রতিটি বিদ্যালয়ে মাতৃভাষা হবে জ্ঞানের প্রথম প্রদীপ। কারণ ভাষার আলো নিভে গেলে অন্ধকার নামে শুধু একটি জনগোষ্ঠীর জীবনে নয়; অন্ধকার নেমে আসে সমগ্র জাতির সাংস্কৃতিক আকাশে। আর যে জাতি তার প্রতিটি ভাষাকে সযত্নে লালন করে, ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তার কণ্ঠস্বরকেই দীর্ঘজীবী করে রাখে।।
- জুলাই ২০, ২০২৬
পাহাড়ের বুক চিরে জেগে ওঠা ত্রিশটি দীপশিখা
(নলবনিয়ার চাকমা তরুণদের উচ্চশিক্ষা জয়ের মহাকাব্য)
যে জাতির ভিটে কেড়েছে কাপ্তাইয়ের নীল সলিল, যে জাতির স্বপ্ন পিষেছে সেটেলার পুনর্বাসনের লৌহচাকা—সেই চাকমা জাতির ললাটে বিধাতা বুঝি হীরকের কলমে লিখে দিয়েছেন একটিমাত্র শব্দ: ‘মেধা’। পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ—শাসকের রং বদলায়, বদলায় না পাহাড়কে দাবিয়ে রাখার অপচেষ্টা। তবু পাহাড় নত হয় না। বরং শতাব্দীর শোষণ ডিঙিয়ে সে আকাশ ছোঁয় আপন শিরদাঁড়ার জোরে।
বাঘাইছড়ির অরণ্যচারী পথের শেষে ঘুমিয়ে আছে নলবনিয়া—একটি গ্রাম, না-কি একখণ্ড কবিতা? চারপাশে ধ্যানমগ্ন গিরিশ্রেণি, বুকের ওপর দিয়ে বয়ে চলে কাজালং স্রোতস্বিনী। এখানে ভোর হয় জুমের ধোঁয়ায়, সন্ধ্যা নামে কৃষকের কপালের ঘামে। বর্ষায় পথ ডোবে কর্দমাক্ত দীর্ঘশ্বাসে, শীতে হিম ঝরে টিনের চালে। কলেজ নেই, লাইব্রেরি নেই, আলোর চেয়ে অন্ধকারই বেশি।
তবু এই গ্রামের ঘরে ঘরে জ্বলে অন্য এক প্রদীপ—অক্ষরের প্রদীপ, স্বপ্নের প্রদীপ।
দুঃসময়ের মেঘে ঢাকা পার্বত্যের আকাশে হঠাৎই বেজে উঠল বাঁশি। ফেসবুকের পাতায় ভেসে এলো খবর , নলবনিয়ার ত্রিশটি ছেলেমেয়ে এবার দেশের নয়টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সিংহদ্বার পেরিয়েছে (১২ জুলাই ২০২৬ খ্রি. বরিবার)। কেউ শুনবে রোগীর হৃদস্পন্দন, কেউ গড়বে সেতু, কেউ লিখবে কোড, কেউবা লিখবে জাতির না-বলা ইতিহাস।
ভাবো একবার—যে গ্রামে কলেজে যেতে পাড়ি দিতে হয় কাজালং নদী, সেই গ্রামের সন্তানেরা আজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীর বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বরে পা রাখবে। এ কেবল ভর্তি নয়, এ এক নীরব বিপ্লব। এ কেবল সংখ্যা নয়, এ এক মহাকালের প্রতিশোধ।
এই অগ্ন্যুৎসবের সলতে কারা?
জুমের ধান বেচে যে মা ছেলের ফর্ম ফিলাপের টাকা জোগায়, সেই মা।
যে বাবা খালি পেটে লাঙল ঠেলে মেয়ের কোচিং ফি পাঠায়, সেই বাবা।
যে দাদা শহর থেকে ফিরে হ্যারিকেনের আলোয় অঙ্ক কষায়, সেই দাদা।
আর পুরো নলবনিয়া—যারা একবাক্যে উচ্চারণ করেছে, “আমরা হারব না”।
এখানে দারিদ্র্য অভিশাপ নয়, দীক্ষা। বঞ্চনা কান্না নয়, কণ্ঠ।
আমরা চাই, নলবনিয়ার এই দীপাবলি হোক পার্বত্যের দাবানল। প্রতিটি জুমঘর থেকে উঠে আসুক পাবলিকিয়ান, প্রতিটি মাচাং ঘর হোক পাঠশালা। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, বমসহ সকল জাতিসত্ত্বা—সব পরিচয় মিলে যাক একটিই পরিচয়ে: ‘শিক্ষিত পাহাড়’।
কারণ কলমের কালি দিয়েই শুকাতে হয় কাপ্তাইয়ের জল, ডিগ্রির সনদ দিয়েই রুখতে হয় উচ্ছেদের বুলডোজার।
হে রাষ্ট্র, নলবনিয়াকে ‘আদর্শ শিক্ষা গ্রাম’ ঘোষণা করো। এখানে কলেজ দাও, পাঠাগার দাও, ইন্টারনেট দাও। এই ত্রিশটি প্রদীপের জন্য বৃত্তি দাও, গবেষণার বৃত্ত দাও, ফিরে এসে যেন মাটির ঋণ শোধ করতে পারে তার কর্মসংস্থান দাও।
উন্নয়ন মানে কেবল কংক্রিটের সেতু নয়, উন্নয়ন মানে সম্ভাবনার সাঁকো বাঁধা।
আমাদের সাধ, এই তরুণেরা কেবল চাকরির বাজারে সনদ বেচবে না। তারা হবে জাতির কণ্ঠস্বর।
কেউ লিখবে নতুন ‘রাধামন ধনপুদি পালা ও বারমাস ’, কেউ সুর দেবে বিঝুর গানে বিশ্বমাতানোর মতো মূর্ছনা, কেউ আন্তর্জাতিক আদালতে দাঁড়িয়ে বলবে পাহাড়ের অধিকারের কথা, কেউ জুমের মাটিতে ফলাবে খরাসহিষ্ণু ধান।
তারা প্রমাণ করুক—শিক্ষা মানে শেকড় কাটা নয়, শেকড়কে আকাশে মেলে ধরা।
নলবনিয়ার ত্রিশটি দীপশিখা আজ ত্রিশটি ধ্রুবতারা। এই তারার আলোয় পথ দেখুক পার্বত্যের প্রতিটি শিশু। তাদের ছবি, নাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ছড়িয়ে দাও পাহাড় থেকে সমতলে। কারণ একটি ছবি হাজারো ঘুমন্ত চোখে স্বপ্ন বুনে দিতে পারে।
জেগে ওঠো, পাহাড়। জেগে ওঠো, বাংলাদেশ।
- জুলাই ১২, ২০২৬
শান্তির এক চিলতে রোদ এবং কুয়াশার আগ্রাসন
আজ ৯ জুলাই ২০২৬, বৃহস্পতিবার। গত এক সপ্তাহ ধরে অবিরাম বৃষ্টি হচ্ছে। এখন সামান্য বৃষ্টিতেই চারপাশ প্লাবিত হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠে যখন দেখি গত রাতের বন্যার পানি কিছুটা কমেছে, তখন মনের ভেতর এক দীর্ঘশ্বাস আর প্রশ্ন জেগে ওঠে, এমন তো আগে ছিল না! অতীতে এর চেয়েও অনেক বেশি বৃষ্টি হতো, কিন্তু প্রকৃতি ছিল সুরক্ষিত। চারিদিকে গাছপালা ছিল, নদী-নালা, খাল-বিলে ছিল মাছ, কাঁকড়া, ইজে (চিংড়ি) ও শামুকের প্রাচুর্য। আজ নদী-নালা ভরাট হয়ে গেছে, সবুজ প্রকৃতি ধ্বংসপ্রাপ্ত। প্রকৃতির এই বিপর্যয়ের সমান্তরালে পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের অধিকার এবং মর্যাদাও আজ বিপন্ন। আজ জুম্মদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম সম্মানটুকু যেন হারিয়ে গেছে; তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছে ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারি, পারস্পরিক অবিশ্বাস আর অপপ্রচার। এই সংকট একদিনে তৈরি হয়নি, এর পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক পটভূমি।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে পাহাড়ের দীর্ঘদিনের বারুদ আর বুলেটের গন্ধ মাখা অধ্যায়ের অবসান ঘটেছিল। অবরুদ্ধ উপত্যকায় উঁকি দিয়েছিল এক চিলতে শান্তির রোদ। কিন্তু সেই রোদ্দুর স্থায়ী হতে দেয়নি পাহাড়েরই কিছু বিভ্রান্ত সন্তান। প্রসিত বিকাশ খীসা, রবিশঙ্কর চাকমা ও সঞ্চয় চাকমাদের নেতৃত্বে পাহাড়ি গণপরিষদ, পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ এবং হিল উইমেন্স ফেডারেশনের একটি অংশ এই ঐতিহাসিক চুক্তিকে মেনে নিতে পারেনি। তারা জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ আর ‘আত্মসমর্পণের’ কাল্পনিক অভিযোগ তুলে পাহাড়ের বুকে আবার অশান্তির আগুন জ্বালিয়ে দিল।
পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের চটকদার স্লোগান তুলে তারা যে রাজনীতির সূচনা করল, তা জুম্ম জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলনের পরিবর্তে রূপ নিল নিজেদের ঘরের ভেতরেই এক আত্মঘাতী, রক্তক্ষয়ী সংঘাতে।
সেই বিরোধের আগুন শুধু মৌখিক আস্ফালনে সীমাবদ্ধ রইল না। অল্প সময়ের মধ্যেই পাহাড়ি জনপদ কেঁপে উঠল চেনা মানুষের বুলেটের শব্দে। শুরু হলো জুম্ম ভাইদের ওপর বর্বরোচিত হামলা, হত্যা, গুম আর মুক্তিপণের বাণিজ্য।
১৯৯৮ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, খাগড়াছড়ির স্টেডিয়াম প্রাঙ্গণ। যেখানে বুক ভরা আশা নিয়ে জুম্ম দামাল ছেলেরা অস্ত্র জমা দিচ্ছিল, সেখানেই নিরাপত্তার কঠোর প্রাচীর ভেদ করে কালো পতাকা আর ঘৃণার ব্যানার নিয়ে ঢুকে পড়েছিল পার্বত্য চুক্তিবিরোধীরা। প্রশাসনের প্রচ্ছন্ন মদদ ছাড়া সেই সুরক্ষিত দুর্গে প্রবেশ করা কি আদৌ সম্ভব ছিল? ১৯৯৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি বাঘাইছড়ি হাইস্কুল মাঠ , ৪ মে ধুধুকছড়া এবং ১৯৯৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি দেখেছিলাম কীভাবে ইতিহাসের নির্মম সাক্ষী হয়ে আমি নিজে দাঁড়িয়েছিলাম দীঘিনালা বড়াদম হাইস্কুল মাঠে, অস্ত্র জমাদান অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে শান্তিবাহিনীদের জুতার মালা প্রদর্শন ও চুক্তির সমর্থকদের ওপর ইটপাটকেল আর হিংস্র আক্রমণ চালানো হয়েছিল।
পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালের ২৬ ডিসেম্বর এই চুক্তিবিরোধী অংশটি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট’ (ইউপিডিএফ) নামে আত্মপ্রকাশ করে। স্বাধিকারের নামে জন্ম নেওয়া পর শেষ পর্যন্ত পাহাড়ের অভ্যন্তরীণ সশস্ত্র সংঘাত আর ভ্রাতৃহত্যার করা শুরু হয়।
জাতিসংঘের হাত ধরে ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর এক আলোচনা সভার মধ্য দিয়ে বিশ্বমঞ্চে 'আদিবাসী দিবস' পালনের বিষয়টি স্বীকৃতি লাভ করে। সেই থেকে প্রতি বছর ৯ আগস্ট পৃথিবীর প্রায় ৯০টি দেশে ৩৭০ বিলিয়ন মানুষ বিশ্ব আদিবাসী দিবস পালন করে আসছে। বাংলাদেশেও ২০০৪ সাল থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ আদিবাসী এই দিনটিতে নিজেদের অস্তিত্বের জানান দেয়।
অথচ চিন্তার এক চরম দেউলিয়াত্ব প্রকাশ পেল ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর, যেদিন ইউপিডিএফ-এর অংগ্য মারমা দাবি করে বসলেন (যুমনা টিভি সাক্ষাৎকার), ‘আদিবাসী’ শব্দ নাকি কেবলই এনজিওদের দেওয়া একটি 'টার্ম'! এর ধারাবাহিকতায়, ২০২৬ সালের ১৪ জুন এক অনলাইন আলোচনায় ইউপিডিএফ নেতা মাইকেল চাকমা যেভাবে জুম্ম জাতীয়তাবাদের মহানায়ক, আদিবাসীদের অধিকারের ধ্রুবতারা এম এন লারমার তীব্র ও কুৎসিত সমালোচনা করলেন, তাতে তাদের ভেতরের অন্ধকার রূপটি আর ঢাকা রইল না।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ১৯৯৯ সাল থেকেই ইউপিডিএফ তাদের নেতা-কর্মীদের নির্দেশ দিয়েছিল ১০ নভেম্বর ‘এম এন লারমা শহীদ দিবস’ পালন না করার। অথচ তারা এতদিন মিথ্যা অজুহাত দিয়ে আসছিল যে, ১০ নভেম্বর পালন করলে জেএসএস তাদের ওপর হামলা করে। আজ তাদের নেতা-কর্মীদের মুখ থেকেই জলছাপের মতো স্পষ্ট যে, তারা আসলে এম এন লারমার সেই কালজয়ী সাম্যবাদী ও অধিকার আদায়ের দর্শনকেই ধারণ করতে মানসিকভাবে নারাজ।
মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা কেবল পাহাড়ি জুম্মদের নেতা ছিলেন না; তিনি ছিলেন এই ভূখণ্ডের প্রতিটি শোষিত, লাঞ্ছিত এবং মেহনতি মানুষের অবিনাশী কণ্ঠস্বর। ১৯৭২ সালের ২৫ অক্টোবর, সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের খসড়া সংবিধানের ওপর দাঁড়িয়ে গণপরিষদের অধিবেশনে তিনি যে ঐতিহাসিক বক্তব্য দিয়েছিলেন, তা আজো বাতাসে প্রতিধ্বনিত হয়:
"মাননীয় স্পীকার সাহেব, ১৯৪৭ সালে কেউ কি চিন্তা করেছিলেন যে, পাকিস্তান ধ্বংস হয়ে যাবে? জনাব মোঃ আলী জিন্নাহ বলেছিলেন, 'Pakistan has come to stay'। নিয়তি অদৃষ্ট থেকে সেদিন নিশ্চয় উপহাস ভরে হেসেছিলেন। সেই পাকিস্তান অধিকার হারা বঞ্চিত মানুষের বুকের জ্বালায়, উত্তপ্ত নিঃশ্বাসে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। ...পাকিস্তানের সময় দীর্ঘ ২৪ বছর পর্যন্ত একটি কথাও বলতে পারিনি। আমাদের অধিকারকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দেওয়া হয়েছিল। সেই অধিকার আমরা পেতে চাই, এই চাওয়া অন্যায় নয়। সেই অধিকার এই সংবিধানের মাধ্যমে দেওয়া হয়নি।"
তিনি বুকভাঙা কান্না আর ক্ষোভ নিয়ে বলেছিলেন, কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের আলোয় আজ সারা দেশ ঝলমল করে, কলকারখানা চলে; অথচ সেই পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষকে উদ্বাস্তু করে, হাজার মানুষের জীবন বলি দিয়েও তাদের মানুষের মতো বেঁচে থাকার অধিকার দেওয়া হয়নি।
সংবিধানে পার্বত্য অঞ্চলের ইতিহাস ও অস্তিত্বকে অস্বীকার করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন:
"পার্বত্য চট্টগ্রাম হল বিভিন্ন জাতিসত্তার ইতিহাস। কেমন করে সেই ইতিহাস আমাদের সংবিধানের পাতায় স্থান পেল না, তা আমি ভাবতে পারি না। সংবিধান হচ্ছে এমন একটা ব্যবস্থা, যা অনগ্রসর জাতিকে, পিছিয়ে পড়া নির্যাতিত জাতিকে, অগ্রসর জাতির সংগে সমান তালে এগিয়ে নিয়ে আসার পথ নির্দেশ করবে। কিন্তু বস্তুতঃ পক্ষে এই পেশকৃত সংবিধানে আমরা সেই রাস্তার সন্ধান পাচ্ছি না।"
তিনি শুধু নিজের জাতির জন্য কাঁদেননি, তিনি সেদিন সংবিধানে অধিকার চেয়েছিলেন বাংলার কৃষক, শ্রমিক, মেথর, কামার, কুমার আর মাঝি-মাল্লাদের জন্য।
যে মানুষটি বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব মানবতার মঞ্চে শোষিত মানুষের অধিকারের কথা বলে গেছেন, সেই মহামানব এম এন লারমাকে আজ ইউপিডিএফ বা মাইকেল চাকমারা যেভাবে খাটো করার অপচেষ্টা করছেন, তা অত্যন্ত লজ্জাজনক ও আত্মঘাতী। তাদের এই আচরণ প্রমাণ করে, তারা জুম্ম জনগণের মুক্তি চায় না, তারা চায় চিরস্থায়ী বিভেদ। তারা অধিকারের আলো চায় না, চায় পাহাড়ে বন্দুকের নলের অন্ধকার রাজত্ব বজায় রাখতে।
প্রকৃতির ভারসাম্য হারিয়ে গেলে যেমন পাহাড়ের বুক ভাসিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত প্লাবন আসে, তেমনি রাজনীতির আদর্শিক ভারসাম্য হারালে সমাজ ভেসে যায় ভ্রাতৃঘাতী রক্তে। জুম্ম জনগণের যদি এই বাংলার বুকে মাথা উঁচু করে, আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে হয়, তবে এই কৃত্রিম বিভেদ আর অস্ত্রের রাজনীতি ভুলে এম এন লারমার সেই মহান আদর্শ আর অসাম্প্রদায়িক শোষিত মানুষের লড়াইয়ের পতাকাতলে একত্রিত হওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
- জুলাই ৯, ২০২৬
অবক্ষয়ের পুঁজিকাল ও বিপন্ন মাতৃভাষা: এক অন্তর্দহন
হৃদয়ের গহীন থেকে আজ এক তীব্র আর্তি ক্রমাগত চাবুক মারছে আমায়—"আমি আমার মাতৃভাষাকে কতটুকু ভালোবাসি?" এই প্রশ্ন যেন কোনো শান্ত নদী নয়, বরং এক অশান্ত মেঘের গর্জন, যা আমার আত্মসত্তাকে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়। ভাষা তো কেবল শুষ্ক ঠোঁটের কোনো যান্ত্রিক কথন নয়, কিংবা নয় কেবল দুটি মানুষের মাঝে আলগা যোগাযোগের সেতু। ভাষা হলো একটি জাতির শতাব্দীর রক্ত দিয়ে চেনা রূপ, তার ললাটের তিলক এবং তার অস্তিত্বের পরম আশ্রয়। অথচ আজ এই ঘোর কলিকালে, এই সর্বগ্রাসী পুঁজিতান্ত্রিক বাস্তবতায় আমরা আমাদের সেই পরম আশ্রয়কেই হারিয়ে ফেলছি। চাকমা তথা জুম্ম জাতির অন্তহীন উদাসীনতা আজ আমাদের সেই গৌরবের ইতিহাসকে এক চরম অস্তিত্বের সংকটের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
আমাদের এই তথাকথিত মাতৃভাষা প্রীতির স্বরূপ যেন আমাদেরই এক চিরন্তন চাঙমা প্রবাদের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা এক নির্মম পরিহাস:
"কোচপাং কলে গালত পরে, কোচ ন পাং কলেও গালত পরে।" (ভালোবাসি বললেও চড় খেতে হয়, না বললেও চড় খেতে হয়।)
আমরা আজ এক অদ্ভুত দ্বিমুখী চেতনার দোলাচলে দুলছি। হৃদয়ে ভাষা-প্রেমের অভিনয় করছি ঠিকই, কিন্তু সত্যকে বরণ করার সাহস হারিয়ে ফেলেছি। আমাদের এই মেকি ভালোবাসার রূপটি যেন আমাদেরই আরেক টুকরো লোকগাথার মতো—
"পধত পেলুং লাঙ, তাপ্পে-তুপ্পায় যাঙ।" (পথের মাঝে প্রেয়সীকে পেয়ে ক্ষণিক সোহাগ ছড়ানো, আর সে চোখের আড়াল হতেই তাকে বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে দেওয়া।)
আমরাও ভাষার সাথে ঠিক এই ক্ষণিকের চপল প্রেমিকের মতোই আচরণ করছি। উৎসবের মঞ্চে বা সস্তা আবেগের মুহূর্তে আমরা ভাষার চরণে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করি, কিন্তু দিনশেষে তাকে অবহেলা আর বিস্মৃতির ধূসর ধুলোয় ফেলে রেখে আপন সার্থান্বেষণে মগ্ন হই।
আজকের এই স্বর্ণ যুগে মানুষের বিবেক আর মূল্যবোধ যেন বাঁধা পড়েছে অর্থের নিগড়ে। যেখানে বস্তুগত লাভ নেই, সেখানে মানুষ আজ বড় বেশি নিঃস্পৃহ। আমাদের সমাজজীবনের এক নগ্ন সত্য আজ চোখের সামনে ভেসে ওঠে:
১। কোনো এক এনজিও যখন সভা কিংবা সেমিনারের ডাক দেয়, তখন মানুষের ঢল নামে। যেন এক বসন্তের কোকিলের মেলা! কারণ সেখানে মিলবে যাতায়াত ভাতা আর উপাদেয় চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়।
২। অথচ, যদি কোনো দরদী মানুষ নিঃস্বার্থভাবে সমাজের বা ভাষার সত্যিকার পুনর্জাগরণের জন্য একটি সভার আহ্বান করেন, তবে দেখা যায় সেই শূন্য প্রাঙ্গণে কেবল আহ্বানকারী একাকী দাঁড়িয়ে আছেন নিজের দীর্ঘশ্বাস বুকে নিয়ে। কারণ সেখানে কোনো নগদ প্রাপ্তি নেই।
হায়! আজ আমাদের প্রাণের ভাষার ভাগ্যাকাশও এই একই কুয়াশায় আচ্ছন্ন। যে ভাষা পরম মমতায় আমাদের শৈশবকে রাঙিয়েছিল, আজ পুঁজির বাজারে তার কোনো বিনিময় মূল্য নেই। যে ভাষা দিয়ে অর্থ বা প্রতিপত্তি অর্জন করা যায় না, এই বাণিজ্যিক দুনিয়ায় তা যেন এক অচল আধুলি। অর্থের অভাবে আজ আমাদের প্রাণের ভাষাও আমাদের কাছে মূল্যহীন, ব্রাত্য!
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—"অধিকার স্বত্বে যে জাতি উদাসীন, তার অস্তিত্ব মহাকালের গর্ভে বিলীন হতে বাধ্য।" ভাষার অধিকার কখনো যাযাবরের মতো যাচ্ঞা করে পাওয়া যায় না, তা ছিনিয়ে নিতে হয়। ভাষার এই পরম মাধুর্য আর তার গুরুত্ব কেবল বাঙালি জাতি অনুধাবন করতে পেরেছিল। তাই ১৯৫২-র ফাল্গুনে তারা রাজপথ রাঙিয়েছিল বুকের তাজা রক্তে। রক্তের বিনিময়ে তারা কিনেছিল তাদের মায়ের মুখের বুলি।
আজ যদি আমরা, জুম্মরা, আমাদের ভাষার সেই মহিমান্বিত রূপ আর তার অন্তর্নিহিত শক্তিকে বুঝতাম, তবে আমাদের এই দূরবস্থায় উপনীত হতে হতো না। আমাদের নিজস্ব সমৃদ্ধ বর্ণমালা থাকা সত্ত্বেও আজ আমাদের এই চরম মানসিক দৈন্যতা যে, নিজেদের ভাষার আঙিনায় আমরা আজ পরবাসী! আজ আমাদের লজ্জিত মস্তকে অন্যকে শুধাতে হয়—"অতিথি"-কে আমাদের ভাষায় কী বলে? কিংবা "অমুক" শব্দের প্রকৃত চাকমা প্রতিশব্দটি কী? এর চেয়ে বড় আত্মগ্লানি আর কী হতে পারে!
মহাকাল এখনো আমাদের সম্পূর্ণ গ্রাস করেনি, ছাইয়ের নিচে এখনো কিছু জ্বলন্ত অঙ্গার বাকি আছে। শুধু অন্তঃসারশূন্য আবেগ দিয়ে কিংবা চারু বাক্যের মায়াজাল বুনে একটি বিপন্ন ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় না। তার জন্য প্রয়োজন ত্যাগ, সাধনা আর শেকড়ের প্রতি অবিচল আনুগত্য।
তাই আসুন, এই মোহনিদ্রা আর আত্মকেন্দ্রিকতার দেয়াল ভেঙে ফেলি। "নিজর গারখ্যে দর গরি" আমরা বেরিয়ে পড়ি দিক-দিগন্তরে, দেশ থেকে দেশান্তরে। আমাদের নিজস্ব বর্ণমালার গৌরব, আমাদের সংস্কৃতির সুবাস ছড়িয়ে দিই প্রতিটি জুম্ম সন্তানের হৃদয়ে। মাতৃভাষাকে কেবল মুখের ভাষা নয়, তাকে করে তুলি আমাদের বেঁচে থাকার হাতিয়ার ও প্রতিবাদের ভাষা। তবেই রক্ষা পাবে আমাদের জাতিসত্তা, তবেই সার্থক হবে আমাদের এই পৃথিবীতে জুম্ম হিসেবে বেঁচে থাকা।
- জুলাই ০২, ২০২৬
ক্ষতবিক্ষত পাহাড়ের আর্তনাদ ও মুক্তির অন্বেষণ
পার্বত্য চট্টগ্রাম, বহু যুগ ধরে এক অসুস্থ, ক্ষতবিক্ষত জনপদ। এই ভূখণ্ডের ক্ষত কেবল উপশম হয়নি, সময়ের নির্মম আবর্তে তা আরও গভীর, আরও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। স্মৃতির পাতা উল্টালে দেখি এক দুঃসহ কাল—যখন পাহাড়ের মানুষকে দিনের আলো নিভে যাওয়ার আগেই রাতের আহার সেরে নিরাপদ আশ্রয়ে আত্মগোপন করতে হতো। নিস্তব্ধ রজনীতে কুকুরের করুণ আর্তনাদও বুকের রক্ত হিম করে দিত। ভয়ের সেই করাল গ্রাসে দিনকে মনে হতো দীর্ঘ এক যুগ, আর রাতকে মনে হতো অন্তহীন এক শতাব্দী। চারিদিকে কেবল থমথমে, নিস্পৃহ নীরবতা। তখন পাহাড়ের সরল প্রাণের কাছে চিরস্থায়ী আতঙ্কের প্রতিশব্দ ছিল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আর সেটেলার বাঙালি।
ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সেই ভয়ের রাজত্বে কিছুটা হলেও স্বস্তির হাওয়া বইয়ে দিয়েছিল। মানুষ আগের চেয়ে শিক্ষা-দীক্ষায় মন দিতে পেরেছে, ব্যবসা-বাণিজ্যের পথে পা বাড়িয়েছে, যদিও তা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল। কেউ কেউ ইট-কাঠের সুন্দর ঘর তুলেছে, অথচ জনসংখ্যার বিশাল অংশ আজও মৌলিক অধিকারের ন্যূনতম স্পর্শ থেকে বঞ্চিত। তবু স্বাধীনতা-উত্তর রক্তাক্ত অধ্যায়ের তুলনায় চুক্তি-পরবর্তী সময় নগণ্য হলেও জুম্ম জনগণের সামনে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছিল।
কিন্তু ইতিহাসের কী নিষ্ঠুর পরিহাস! পার্বত্য চুক্তিকে মনঃপূত না করে পাহাড়ের বুক চিরে জন্ম নিল ইউপিডিএফ। দীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের পর শান্তি বাহিনীর জীর্ণ-ক্লান্ত যোদ্ধারা যখন বন্দুক রেখে সন্তান-পরিজন নিয়ে একটু শান্তির নিঃশ্বাস ফেলতে চাইলেন, ঠিক তখনই ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’-এর চটকদার স্লোগান তুলে রণক্লান্ত সেই মানুষগুলোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল চুক্তি-বিরোধী এই সংগঠন। সূচনা হলো জুম্ম জাতীয় জীবনের সবচেয়ে অন্ধকার ও করুণ অধ্যায়—ভ্রাতৃঘাতী রক্তক্ষয়।
গত ২৮ বছরে এই ভ্রাতৃঘাতী যুদ্ধে কত শত মেধাবী তরুণের জীবন প্রদীপ নিভে গেছে, কতজনকে অন্ধকার কারাকক্ষে দিন গুনতে হয়েছে, তার নির্ভুল হিসাব মেলানো আজ দুষ্কর। কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, কত বাবার ভবিষ্যৎ অঙ্কুরেই ঝরে গেছে, কত সন্তান মাথার উপর থেকে শেষ ছায়াটুকুও হারিয়েছে। মুক্তির নামে বয়ে যাওয়া এই রক্তগঙ্গা ২৮টি বসন্ত পেরিয়েও থামেনি।
আজ আমার লেখার কারণে আমাকে বারবার অভিযুক্ত করা হয়, আমি নাকি কেবল ইউপিডিএফ-এর অন্ধ সমালোচক। শুধু অভিযোগ নয়, আমার প্রতিটি পোস্টে জমা হয় কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য আর নানাবিধ হুমকি, যা কোনো সভ্য সমাজে কাম্য নয়। আমাকে ‘জেএসএস’ তকমা দিয়ে খোঁজা হয় আমি কোন শাখার কর্মী। মূলত এই ভুল ধারণার অবসান ঘটাতেই আমার এই লেখা।
আমি কেন ইউপিডিএফ-এর সমালোচনা করি-
১। যে ‘পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে সংগঠনটির জন্ম, ২৮টি বছর পেরিয়েও তারা সরকারের ওপর কোনো কার্যকর রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। ২০২২ সালের ৯ জুন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলামের হাতে একটি দাবিনামা তুলে দেওয়া ছাড়া দৃশ্যমান কোনো রাজনৈতিক অর্জন নেই।
২। রাজনৈতিক কর্মসূচির নামে স্কুলপড়ুয়া কোমলমতি শিশুদের রাস্তায় নামিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করানো, অশালীন ভাষার প্ল্যাকার্ড-স্লোগান শেখানো—এটি কোনো রাজনৈতিক সচেতনতা নয়। এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মনে সহিংসতা ও ঘৃণার বীজ বপন করা। আমরা তো চিরকাল শিখে এসেছি, সন্তানের সামনে মা-বাবা ঝগড়া করে না। অথচ এখানে রাজনীতির নামে শিশুমনে হিংসা ও ধ্বংসের বিষ ঢালা হচ্ছে।
অন্যদিকে জেএসএস চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশ-বিদেশে একঝাঁক মুক্তিপাগল মানুষকে নিয়ে নিরলস কূটনৈতিক লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর জাতিসংঘের অধিবেশনে পার্বত্য চুক্তির বাস্তবায়নসহ অধিকারহারা মানুষের পক্ষে তারা সোচ্চার হচ্ছে।
জেএসএস যে ভুলের ঊর্ধ্বে বা ধোয়া তুলসীপাতা, তা বলছি না। কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে বড় কাজ করতে গেলে অনিচ্ছাসত্ত্বেও কিছু ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা অপরাধ নয়—অনিবার্য মূল্য। একটি বিশাল বটবৃক্ষের নিচে অন্য চারাগাছ সহজে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। বটগাছটি হয়তো তা জানে। কিন্তু সে এও জানে, তার একটি মহাজাগতিক দায় আছে—তার ডালে হাজারো পাখি বাসা বাঁধবে, ফল খেয়ে জীবন বাঁচাবে, আর ক্লান্ত পথিক তার ছায়ায় এসে দেহ-মন জুড়াবে।
আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি, পাহাড়ের প্রতিটি মানুষই ‘মুক্তিপাগল’। কিন্তু শুধু মুখে বড় বড় বুলি আর ফাঁকা স্লোগানে মুক্তি আসে না। বুদ্ধ বলে গেছেন—“দুঃখ যেমন আছে, দুঃখমুক্তির উপায়ও আছে।” বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় পার্বত্য চুক্তির কথা বলা এবং এর পূর্ণ বাস্তবায়ন দাবি করা ছাড়া পাহাড়ের মানুষের অধিকার আদায়ের আর কোনো যুক্তিযুক্ত ও বাস্তবসম্মত পথ নেই।
তাই ইউপিডিএফ-এর বন্ধুদের প্রতি আমার বিনীত আহ্বান, তুচ্ছ ও ভিত্তিহীন ইস্যু নিয়ে ব্যক্তি-বিদ্বেষ ছড়াবেন না, হুমকি-ধমকির সংস্কৃতি বন্ধ করুন। নিজেদের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য এবং মিশন-ভিশন নিয়ে নির্মোহ আত্মসমালোচনা করুন। এতে দল, দেশ ও জাতি, সবারই মঙ্গল হবে। যারা সত্যিকার অর্থে সমাজের জন্য কাজ করেন, তারা জানেন পার্বত্য চুক্তি কতটা গুরুত্বপূর্ণ এবং এর বাস্তবায়ন কতটা জরুরি।
এখন সিদ্ধান্ত আপনাদের। আমার এই সত্য উচ্চারণ ও লেখনীর পর আপনারা আমাকে কোন কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন? জাত-বিরোধী, নাকি দালালের তকমা দেবেন? আমি কেবল সত্য ও বাস্তবতার পক্ষে দাঁড়ানো এক নিঃসঙ্গ বন্দা।
চুক্তির পরবর্তী ২৮ বছরের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত আমাদের কী দিয়েছে? দিয়েছে শুধু লাশের মিছিল, মা-বোনের আহাজারি আর মেধার অপচয়। পূর্ণস্বায়ত্তশাসন হোক বা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, লক্ষ্য যাই হোক, যদি তার পথ রচিত হয় ভাইয়ের রক্তে, তবে সে মুক্তি কার জন্য?
পাহাড়কে আর রক্তাক্ত করবেন না। আত্মসমালোচনার আয়নায় নিজেদের দেখুন। কারণ পাহাড়ের প্রতিটি পাথর আজও ফিসফিস করে বলে, “চুক্তি বাস্তবায়নই শেষ কথা”।
- জুলাই ০২, ২০২৬
পাহাড়ের দেয়ালে ঠেকা পিঠ এবং জন ত্রিপুরার বিস্ফোরক সতর্কতা
"যে শান্তি জন্য রক্ত দিয়েছি, যে শান্তির জন্য শান্তি বাহিনী গঠন হয়েছিল, শান্তির জন্য অস্ত্র জমা দিয়েছিল, সে শান্তি আর পার্বত্য চট্টগ্রামে থাকবে না। তাই বলছি, প্রিয় বাংলাদেশ, প্রিয় সরকার, প্রিয় বাঙালি বন্ধুরা, প্রিয় পাহাড়ি বন্ধুরা, চোখ খুলুন আপনাদের। চোখ খোলার সময় এসে গেছে।"
গত ২৩ জুন ২০২৬, বান্দরবানের লামা উপজেলার নাজিরাম ত্রিপুরা পাড়ায় পাহাড়িদের ভূমি বেদখল, হামলা ও অগ্নিসংযোগের প্রতিবাদে আয়োজিত এক বিক্ষোভ সমাবেশে দাঁড়িয়ে কথাগুলো বলছিলেন জুম্ম তরুণদের প্রতিনিধি জন ত্রিপুরা। তাঁর এই বক্তব্য কেবল কোনো সাধারণ প্রতিবাদ নয়, বরং দীর্ঘ প্রায় তিন দশক ধরে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে পাহাড়ের তরুণ প্রজন্মের মনে জমে থাকা গভীর ক্ষোভ ও তীব্র বারুদের এক বিস্ফোরক বহিঃপ্রকাশ।
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত পাহাড়ের সেই ঐতিহাসিক চুক্তি আজো পূর্ণাঙ্গ আলোমুখ দেখেনি। ভূমি কমিশন কার্যকর না থাকায় প্রতিনিয়ত উচ্ছেদ হতে হচ্ছে আদিবাসীদের। এই চরম অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে জন ত্রিপুরা সমাবেশে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেন:
"এই লেখা পড়া আমাদের কাজে দিবে না, টাকা পয়সা আমাদের কাজেই দিবে না। যে বিল্ডিং আমাদের কাজেই দিবে না, যার কারণে আমি সম্পদ খুঁজি, সে সম্পদ যদি রাষ্ট্র নিরাপত্তা, দেশ, সরকার দিতে না পারে, আমাদের মা-বোনদের এই আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিতে না পারে তাহলে সেই আইন শৃঙ্খলা আমি চাই না। আমি নিজের নিরাপত্তা নিজেই তৈরি করবো। সেটি যদি বেআইনি পথে হয়, সেটি যদি অগণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয় আমি সেথার জন্য প্রস্তুত।"
জন ত্রিপুরার এই বক্তব্য আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার জন্য এক চরম সতর্কবার্তা। যখন একটি অঞ্চলের নাগরিকরা নিজেদের মৌলিক নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষায় আইনি ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলে, তখন তা সমগ্র দেশের স্থিতিশীলতাকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো সন্তু লারমার অবর্তমানে পাহাড়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর দেওয়া কঠিন হুঁশিয়ারি। জন ত্রিপুরা বলেন:
"আপনারে সর্তক করছি, সন্তু লারমা যদি মৃত্যু হয় তখন পার্বত্য চট্টগ্রাম কি অবস্থায় হয় তখন আপনারা বুঝতে পারবেন না। এই সন্তু লারমার কারণে পার্বত্য চট্টগ্রাম এখনই শান্তি বজায় রয়েছে। যেদিন সন্তু লারমা মারা যাবে সেদিন দেখবেন এ পার্বত্য চট্টগ্রাম আর নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। তখন বুঝবেন এই সরকার কি ভুল করেছে। ...অপেক্ষায় থাকবেন না সন্তু লারমা মৃত্যুর জন্য। এটি ভুল করবেন। তার বেঁচে থাকার অবস্থায় আমাদের শান্তি প্রতিষ্ঠায় করতে হবে। যদি সে মারা যায় পার্বত্য চট্টগ্রাম আর কোন দিন শান্তি হবে না।"
এই তরুণ নেতার বক্তব্য প্রমাণ করে, পাহাড়ের শান্তি আজ কতটা ভঙ্গুর সুতোয় ঝুলছে। শান্তিবাহিনীর অস্ত্র সমর্পণের পর দীর্ঘ ২৯ বছর পার হলেও শান্তি না আসায় তরুণদের পিঠ আজ দেয়ালে ঠেকে গেছে। জন ত্রিপুরা সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেছেন, এই মুহূর্তে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই দুঃখ ও ক্ষোভ না বুঝে যদি ভাবা হয় যে অস্ত্র দিয়ে পরিস্থিতি মোকাবেলা করা যাবে, তবে সেটি হবে "মস্তবড় বোকামি কাজ।"
সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই বাংলাদেশ সরকারের উচিত পাহাড়ের এই আর্তনাদ ও ক্ষোভের গভীরতা অনুধাবন করা। দমন-পীড়ন বা শক্তির ভাষা নয়, বরং সন্তু লারমার জীবদ্দশাতেই পার্বত্য চুক্তির যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং ভূমি কমিশনের কার্যকর ভূমিকার মাধ্যমেই কেবল পাহাড়ের এই সম্ভাব্য বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব। আর কতকাল পাহাড় এই উপেক্ষার আগুনে জ্বলবে? রাষ্ট্রকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
- জুন ২৫, ২০২৬
পাহাড়ি ঝরনার বাঁক ও একটি ক্লান্ত তরীর উপাখ্যান: পার্বত্য চুক্তির তিন দশক
১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বরের শীতের সকালটি ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে এক নতুন বসন্তের আবাহন। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যে পাহাড়ের বুক চিরে কেবল বুলেটের আর্তনাদ আর বারুদের গন্ধ বের হতো, সেখানে এক টুকরো শান্তির কপোত উড্ডয়ন করেছিল ‘পার্বত্য চুক্তি’র হাত ধরে। চুক্তির সেই ঐতিহাসিক দলিলটি ছিল পাহাড়ের জখম হওয়া বুকে এক পশলা উপশম। কিন্তু কালের নিয়মে, সময়ের দীর্ঘ নদী বেয়ে আজ যখন আমরা প্রায় তিন দশক পার করছি, তখন সেই শান্তির কপোত কি সত্যি নীড় খুঁজে পেয়েছে, নাকি তা কোনো চোরাবালিতে ডানা হারিয়ে ছটফট করছে—তা আজ এক বিরাট জিজ্ঞাসার মুখোমুখি।
সম্প্রতি পাহাড়ের এক তরুণ কণ্ঠের আক্ষেপ—যেখানে তিনি নেতৃত্বকে "মাঝনদীতে দিক হারানো এক বিকল ইঞ্জিনের জাহাজের" সাথে তুলনা করে জনগণকে সেই ভাঙা তরী মেরামতের ‘মেকানিক’ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন—তা আমাদের এক গভীর আত্মোপলব্ধির দোরগোড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়।
সমালোচকদের চোখে (অংহ্লাচি মারমা, তথ্য প্রচার সম্পাদক,পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ। গত কাল ২৩ জুন ২০২৬ Paharerkantho নামে পেজ থেকে এ বক্তব্য), বিশেষ করে তার দৃষ্টিতে, জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) আজ তার সেই পুরনো বৈপ্লবিক জৌলুস হারিয়ে এক ধূসর গোধূলিতে এসে দাঁড়িয়েছে। যে তরীটি একদা উত্তাল ঢেউ পাড়ি দিয়ে অধিকারের তীরে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখিয়েছিল, অস্ত্র সমর্পণের পর তা যেন আজ এক নিশ্চল পাথরের মতো জলের স্রোতে ভাসছে। অভিযোগ উঠেছে, বিপ্লবের আগুন যেখানে মশাল হওয়ার কথা ছিল, সেখানে তা ব্যক্তিস্বার্থ আর সুবিধাবাদের মৃদু আলোয় নিভে যাচ্ছে। আন্দোলনের নামে এক ধরনের মায়াজাল বা কুয়াশা তৈরি করে সাধারণ মানুষকে এক অনন্ত অপেক্ষায় বন্দি রাখা হয়েছে। তার দাবি, এই জরাজীর্ণ তরীর হাল পরিবর্তন করতে হবে; সাধারণ মানুষকেই হতে হবে সেই কারিগর, যারা আন্দোলনের এই মৃতপ্রায় ইঞ্জিনে নতুন করে প্রাণসঞ্চার করবে।
কিন্তু এই কঠোর ও নির্মম সমীকরণের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক পরম মানবিক ও ঐতিহাসিক সত্য, যা কেবল ক্ষোভের চোখে দেখা সম্ভব নয়। দীর্ঘ চব্বিশটি বছর যারা পাহাড়ের অরণ্যে, শ্বাপদসংকুল গুহায়, আকাশের নিচে রাত জেগে অধিকারের লড়াই করেছিলেন, সেই শান্তিবাহিনীর সৈনিকেরা তো রোবট ছিলেন না; তারা ছিলেন মানুষ। ১৯৯৭ সালের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তে তারা ছিলেন চূড়ান্তভাবে ‘রণক্লান্ত’।
দীর্ঘদিন পরিবার-পরিজনহীন, স্নেহের ছায়াবঞ্চিত এবং মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা সেই ক্লান্ত মানুষগুলো রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপর বিশ্বাস রেখেছিলেন। তারা চেয়েছিলেন যুদ্ধের বিভীষিকা মুছে ফেলে একটুখানি স্নেহের ওমের নিচে, আপনজনদের পাশে শান্তিতে বাঁচতে। এই শান্তিকামনা কোনো কাপুরুষতা বা সুবিধাবাদ নয়, এটি জীবনের এক চিরন্তন ও স্বাভাবিক ব্যাকুলতা। তারা তাদের শ্রেষ্ঠ যৌবন পাহাড়ের ধূলিকণায় উৎসর্গ করে অবশেষে এক টুকরো নিরাপদ, স্বাধীন আশ্রয়ের খোঁজে ঘরে ফিরেছিলেন।
জেএসএস যখন বন্দুকের নল ছেড়ে নিয়মতান্ত্রিক ও কূটনৈতিক লবিংয়ের টেবিলে বসে অধিকার আদায়ের দীর্ঘমেয়াদি লড়াইয়ে লিপ্ত, ঠিক তখনই পাহাড়ের আকাশে জমা হতে শুরু করে অন্য এক কালো মেঘ। চুক্তির কম-বেশী পাওয়া এবংকি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হওয়ার সুযোগে পাহাড়ের অন্দরে জন্ম নেয় চুক্তি-বিরোধী ও চরমপন্থী নতুন নতুন ধারা। ঘরের শত্রুরা যখন উগ্র মূর্তিতে অবতীর্ণ হলো, তখন পাহাড়ের সবুজ উপত্যকা আবারো এক রক্তাক্ত রণক্ষেত্রে পরিণত হলো। জেএসএস-কে তখন এক হাতে সামলাতে হয়েছে রাষ্ট্রের সাথে প্রতিশ্রুতির দরকষাকষি, আর অন্য হাতে লড়তে হয়েছে ঘরের ভেতরের ভাতৃঘাতী আত্মক্ষয়ী যুদ্ধ। এই দ্বিমুখী ঝড়ে তরীর গতি শ্লথ হওয়াটাই যেন ছিল প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম।
৯৭-এর চুক্তি-পরবর্তী জেএসএস-এর এই যাত্রাপথকে কেবল ‘ব্যর্থতা’ বা ‘সুবিধাবাদ’ বলে দাগিয়ে দেওয়া ইতিহাসের প্রতি অবিচার হবে। নদী যেমন তার চলার পথে কখনো শান্ত, কখনো খরস্রোতা, জেএসএস-এর আন্দোলনও তেমনি আজ এক দীর্ঘস্থায়ী শান্ত রাজনৈতিক পরিক্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তরুণ প্রজন্মের সেই ‘মেকানিক’ হওয়ার ডাকটিকে আমাদের ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতে হবে। তবে তা তরীটিকে ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য নয়, বরং (যদি) তার পাল ছিঁড়ে যাওয়া অংশটুকু জোড়া লাগানোর জন্য। পাহাড়ের মানুষের অধিকারের লড়াই কোনো ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষোভের বিষয় নয়, এটি অস্তিত্বের লড়াই। অতীতের ক্লান্তি ও বর্তমানের ক্ষোভকে একীভূত করে, নবীন ও প্রবীণের মেলবন্ধনে যদি এই জরাজীর্ণ তরীকে আবার সচল করা যায়, তবেই পাহাড়ে শান্তির সেই অধরা সূর্যটি একদিন সত্যি উদিত হবে।
- জুন ২৩, ২০২৬
বৃত্তবন্দী মানুষেরা
সেদিন ছিল ১৭ জুন ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, এক অলস বুধবার। চারদিকের আকাশ সকাল থেকেই মেঘের ঘন চাদরে ঢাকা। মাঝে মাঝে সেই মেঘের বুক চিরে সূর্য তার তেজস্বী উপস্থিতি জানান দিতে চাইছে বটে, কিন্তু তাতে আলো ছড়ানোর চেয়ে গুমোট ভ্যাপসা গরমই বাড়ছিল কেবল। প্রকৃতির এই অস্বস্তিকর আবহাওয়ার মাঝেই আমি ডুবে ছিলাম প্রিয় কাজে—চাকমা সাহিত্য পত্রিকা ‘চাদি’ ও চাঙমা সংবাদ পত্র “হিলর পচ্জন”র প্রকাশনা নিয়ে টেবিলজুড়ে আমার ব্যস্ততা।
বেলা ঠিক ১১:৫৬ মিনিটে হাতের মুঠোফোনটি তীব্র শব্দে কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে উঠল দীঘিনালা উপজেলার কবাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জ্ঞান চাকমা (নলেজ)-এর নাম। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে গম্ভীর ও কিছুটা তাড়া মেশানো কণ্ঠ ভেসে এল, "জেএসএস অফিসে আসো।"
সকালে স্রেফ নুন দিয়ে ভাত খাইয়ে আমার ছোট্ট মেয়ে জধা চাকমাকে সবেমাত্র ঘুম পাড়িয়েছিলাম। একটু ইতস্তত করে বললাম, "মেয়েটা ঘুমাচ্ছে তো, একটু পরে আসলে হয় না?" উত্তর এল সংক্ষিপ্ত ও অনমনীয়, "তাড়াতাড়ি আসলে ভালো হয়।"
মনটা কু ডাকল। একটা সংশয় মনের কোণে উঁকি দিল—কী এমন জরুরি দরকার, যা আমার জন্য অপেক্ষা করছে? আবার ভাবলাম, কদিন আগেই তো জেএসএস সাধারণ সম্পাদক সমীর দাকে আমাদের চাকমা লেখা (লেঘা) কোর্সটি চালু করার অনুরোধ করেছিলাম; হয়তো সেই বিষয়েই কোনো ইতিবাচক আলোচনা হবে।
সংশয় ঝেড়ে ফেলে মেয়েকে ঘুম থেকে তুলে কোলে নিলাম। সোজা রওনা হলাম অফিসের উদ্দেশ্যে। সেখানে গিয়ে দেখি জ্ঞান চাকমা নলেজ (সাংগঠনিক সম্পাদক, জেএসএস, দিঘীনালা থানা শাখা) এবং প্রদীপ চাকমা (দপ্তর সম্পাদক, জেএসএস, দিঘীনালা থানা শাখা) বসে আছেন, পাশে এক বয়োবৃদ্ধ মানুষ। উনার সাথে কি কথা যেন বলছেন। আমাদের দেখেই জ্ঞান চাকমা রূঢ় স্বরে বললেন, "মেয়েকে তার মায়ের কাছে দিয়ে এসো।" জধার মা দীঘিনালার লারমা স্কয়ারে বসে শাকসবজি বিক্রি করে। নিরুপায় হয়ে মেয়েকে তার মায়ের জিম্মায় রেখে দ্রুত আবার অফিসে ফিরে এলাম।
কিন্তু চেয়ারে বসতে না বসতেই ঘরের বাতাস যেন বিষিয়ে উঠল। কোনো ভূমিকা ছাড়াই জ্ঞান চাকমা আচমকা তর্জন-গর্জন শুরু করলেন, "তুমি একটা বেকুব, বেআক্কল! তোমার মতো মানুষকে মেরে ফেললে কী বা ক্ষতি হবে? বড়জোর জেএসএস থেকে বহিষ্কার হতে হবে, এই তো!" একের পর এক অপমানজনক গালিগালাজ ধেয়ে আসতে লাগল আমার দিকে।
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। আমতা আমতা করে বললাম, "আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। কী হয়েছে?" তিনি আরও ক্ষিপ্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, "তোমাকে সাইনবোর্ড দিতে কে বলেছে?" "কীসের সাইনবোর্ড? আমি তো কোথাও কোনো সাইনবোর্ড দিইনি!" আকাশ থেকে পড়লাম আমি। আমার বিস্ময়কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তিনি আরও জ্বলে উঠলেন, "তুমি না দিলে কে দেবে? তোমার সব কাজ আজ থেকে বন্ধ। তুমি আর কোনো কাজ করতে পারবে না এখানে। তুমি কি ত্রিদীপকে চেয়ারম্যান করতে চাও? মনে রেখো, এখানে আমি ছাড়া কেউ চেয়ারম্যান হতে পারবে না!"
তাঁর কথার রেশ কাটতে না কাটতেই প্রদীপ চাকমা রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন। আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, "তুমি কোন ইউনিয়নের লোক? কেন সেখানে কাজ করো?" এরপর জ্ঞানের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুমি কেন বহিষ্কার হবে হে? এই ইনজেবকে হাত-পা ভেঙে রেখে দিলে কী এমন হবে? কিচ্ছু হবে না!"
পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত করার চেষ্টা করে শামীল দা বললেন, "আমি তোমাকে বহুকাল ধরে চিনি। আচ্ছা, তুমি যদি সাইনবোর্ডটা দিয়েও থাকো, সেটা সরিয়ে নিলেই তো ঝামেলা চুকে যায়।"
আমি জোড়হাতে বিনীতভাবে বললাম, "দা, আমি তো কোনো পর মানুষ নই। সবার সহযোগিতা নিয়েই তো কাজ করছি। এটি শুধু আমার ব্যক্তির কাজ নয়। এই সাইনবোর্ড আমি দিইনি। আমি নিশ্চয়ই কোনো গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছি, এটা খতিয়ে দেখা দরকার। গত ২৩ মার্চ আমি যে তিনটি সাইনবোর্ড দিয়েছিলাম, তা তো জ্ঞান চাকমা নিজেই ভেঙে দিয়েছেন। তারপর থেকে তো আমি ওমুখো হইনি। তাছাড়া, তখন তো প্রয়োজন মনে করে এলাকার গণ্যমান্য সকলের সাথে পরামর্শ করে, অধিবেশনের সিদ্ধান্ত মোতাবেকই ‘অঝাপাত স্কয়ার’-এর সাইনবোর্ড দিয়েছিলাম। সেটা নিয়ে যখন জ্ঞান চাকমার এত আপত্তি, তখন আমি কেন আবার নতুন করে দিতে যাব?"
আমার যুক্তিপূর্ণ আত্মপক্ষ সমর্থন শেষ হতে পারল না। প্রদীপ চাকমা হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন, "কোনো কথা নয়! এখান থেকে উঠে যাও। আর যেন তোমাকে চোখের সামনে না দেখি। অন্যথায় লাঠি পেটা করে বের করে দেব!"
আর কোনো কথা না বাড়িয়ে, এক বুক অপমান আর লাঞ্ছনা নিয়ে আমি সেই তপ্ত ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। সুব্রত দার দোকানে বসে এক কাপ চা খেলাম, কিন্তু ভেতরের অস্বস্তিটা কমছিল না। সত্যটা যাচাই করতে নিজেই গেলাম সেই মোড়ে। গিয়ে দেখি, সত্যিই কোনো নতুন সাইনবোর্ড নেই।
জ্ঞান চাকমাকে ফোন করে জানালাম, "আমি তো কোনো সাইনবোর্ড দেখছি না।" তিনি ওপাশ থেকে নির্দেশ দিলেন, "পূর্ব কোণায়, মানে কবাখালী রোডের দিকে গিয়ে দেখো।"
সেখানে গিয়ে দেখলাম, একটি সাইনবোর্ড দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু সেটি তো নতুন নয়! সেটি তো সেই ২৩ মার্চে দেওয়া পুরোনো সাইনবোর্ডটিই, যা পূর্বেই স্থাপন করা হয়েছিল। আমি পুনরায় জ্ঞান চাকমাকে ফোন করে বললাম, "এটি তো ২৩ মার্চের দেওয়া পুরোনো সাইনবোর্ড, কোনো নতুন বোর্ড নয়।" উত্তরে জ্ঞান চাকমা তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, "আমার চোখে কি লের পড়েছে? এতদিন তো দেখিনি!" আমি দৃঢ়কণ্ঠে বললাম, "আমার কাছে প্রমাণ আছে, ছবি তোলা আছে। আপনি চাইলে দেখতে পারেন। আর যারা সাইনবোর্ড ভেঙ্গে দিয়েছে তাদের থেকে জিজ্ঞেস করে দেখেন তারা কয়টি ভেঙ্গে দিয়েছে আর আমি কয়টি সাইনবোর্ড দিয়েছি"
স্মৃতির পাতা হাতড়ালে মনে পড়ে, গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে দীঘিনালার গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয়েছিল—দীঘিনালা-বাঘাইছড়ি ও দীঘিনালা-বাবুছড়া সংযোগ সড়ক মোড়টির নাম দেওয়া হবে “অঝাপাত স্কয়ার”। সেই সামাজিক সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই গত ২৩ মার্চ আমি জয় চাকমাকে সাথে নিয়ে সেখানে সাইনবোর্ডটি স্থাপন করেছিলাম।
অথচ, সেই মহৎ উদ্যোগের পর থেকেই জ্ঞান চাকমা (নলেজ) বারবার আমাকে কটূক্তি করেছেন, হুমকি দিয়েছেন। এমনকি আমাকে জেএসএম বা ইউপিডিএফ করার ‘পরামর্শ’ দিয়ে নিজের ইউনিয়নে কাজ না করার জন্য লিখিত নোটিশ পর্যন্ত পাঠিয়েছেন।
আজকের পৃথিবী বিজ্ঞানের ডানায় ভর করে বহুদূরে এগিয়ে গেছে। ঘরে বসেই আমরা লহমায় হাতের মুঠোয় পেয়ে যাচ্ছি পুরো দুনিয়ার খবরাখবর। মানুষ মহাকাশ জয় করছে, সীমানা পেরিয়ে অজানাকে চিনছে। অথচ, আমরা? নিজস্ব ভাষা, সাহিত্য আর সংস্কৃতির সুতোয় যারা সমাজকে বাঁধতে চাই, তারা আজও কোন আদিম হিংসা আর সংকীর্ণতার বৃত্তে বন্দী হয়ে আছি? প্রগতির আলো কি তবে আমাদের এই বৃত্তের অন্ধকারকে কখনো স্পর্শ করতে পারবে না?
- জুন ২২, ২০২৬
পূর্ণস্বায়ত্তশাসনের নামে জনগণের বিরুদ্ধে রাজনীতি
পূর্ণস্বায়ত্তশাসন, শব্দটি একসময় অনেকের কাছে আশার প্রতীক ছিল। মনে হতো, এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সংগ্রাম। বিশ্বাস ছিল, যারা এই দাবি তোলে, তারা পার্বত্য চুক্তির সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে জনগণের জন্য নতুন রাজনৈতিক সম্ভাবনার দরজা খুলতে চায়। কিন্তু আজ প্রশ্ন একটাই, এই পূর্ণস্বায়ত্তশাসন কি আদৌ জনগণের জন্য, নাকি জনগণের বিরুদ্ধেই পরিচালিত একটি রাজনীতি?
২০২২ সালের ৯ জুন দুধুকছড়ার ঘটনা সেই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দেয়। একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা মেজর মোঃ এমদাদুল ইসলামের হাতে দাবিনামা তুলে দেওয়া কোনো রাজনৈতিক সংগ্রাম নয়, এটি প্রকাশ্য চাপ প্রয়োগ। সেদিনই বোঝা গিয়েছিল, পূর্ণস্বায়ত্তশাসন এখানে নীতির বিষয় নয়, এটি ভয় দেখানোর একটি কৌশল।
এরপর থেকে দৃশ্যপট আরও নগ্ন হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধারাবাহিক অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন শিক্ষার্থী, কবি–সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, সরকারি চাকরিজীবী, যারা কেউই অস্ত্রধারী নন, কেউই ক্ষমতাবান নন, শুধু ভিন্নমত পোষণ করেন। মতের অমিল মানেই দেশদ্রোহী, শত্রু, দালাল, কিংবা “জনবিরোধী”। এই রাজনীতিতে যুক্তির কোনো স্থান নেই, আছে শুধু লেবেল আর হুমকি (অন্য বিষয় উল্লেখ করলাম না। কেননা কোন মহৎ উদ্দেশ্যর কিছু ক্ষতি হয়)।
সবচেয়ে নৈতিকভাবে দেউলিয়া চিত্রটি দেখা যায়, স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করানো, অশালীন ভাষায় প্ল্যাকার্ড - স্লোগান শেখানো, এটি রাজনৈতিক সচেতনতা নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সহিংসতার ভাষায় দীক্ষিত করার চেষ্টা। আমরা তো শিখে এসেছি, সন্তানের সামনে মা–বাবা ঝগড়া করে না। অথচ এখানে রাজনীতির নামে শিশুদের মনে ”হিংসা, ধ্বংসাত্মক বিষ বপন" করা হচ্ছে।
১৯৯৮ সালের “পূর্ণস্বায়ত্তশাসন” শ্লোগান নিয়ে প্রতিষ্ঠিত দলটি আজ নিজেদের আয়নায় তাকালে কী দেখবে? জনগণের ঐক্য, নাকি জনগণের বিভাজন? মুক্তির রাজনীতি, নাকি ভয়ভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ?
একদিকে ঐক্যের কথা বলা হয়, “এগত্তর”র বুলি আওড়ানো হয়; অন্যদিকে স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের রাস্তায় নামিয়ে কুশপুত্তলিকা দাহ করানো, অশালীন ভাষায় প্ল্যাকার্ড - স্লোগান শেখানো, ভিন্নমতাবলম্বীদের সামাজিকভাবে চরিত্রহনন করা হয়। এই দ্বিচারিতা কোনো মুক্তিকামী আন্দোলনের লক্ষণ নয়, এটি ক্ষমতা রক্ষার রাজনীতির পরিচয়।
পূর্ণস্বায়ত্তশাসন জনগণের ন্যায্য দাবি হতে পারে। আর যে আন্দোলন প্রশ্নকে দমন করে, শিশুদের ব্যবহার করে, আর জনগণের ওপরই আক্রমণ চালায়, সে আন্দোলন মুক্তির পথ দেখায় না। বরং তা প্রমাণ করে, সমস্যার নাম স্বায়ত্তশাসন নয়; সমস্যার নাম সেই রাজনীতি, যা জনগণকে বাদ দিয়ে নিজেদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব কায়েম করতে চায়।
এই রাজনীতি বদলানো না গেলে, পূর্ণস্বায়ত্তশাসন শব্দটি ইতিহাসে আর অধিকার নয়, ভয়ের প্রতিশব্দ হিসেবেই লেখা থাকবে।
- জুন ১৩, ২০২৬
চাকমা বর্ণমালা: ঐতিহাসিক বিকাশ, বর্ণসংখ্যা বিতর্ক ও আধুনিক মান্যতা
ভূমিকা
চাকমা জনগোষ্ঠীর ভাষা ও বর্ণমালা দক্ষিণ এশিয়ার আদিবাসী ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভাষার লিখিত রূপ কোনো জাতির সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা, ধর্মীয় চর্চা ও জ্ঞানসংরক্ষণের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। চাকমা ভাষার নিজস্ব বর্ণমালা রয়েছে—এটি একটি প্রতিষ্ঠিত সত্য হলেও, বর্ণসংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ বিদ্যমান। এই প্রবন্ধে চাকমা বর্ণমালার সংখ্যা সংক্রান্ত ঐতিহাসিক বিতর্ক, ধর্মীয় ও সাহিত্যিক প্রেক্ষাপট এবং আধুনিক কালে এর মান্যতা ও প্রযুক্তিগত বিকাশ আলোচনা করা হয়েছে।
চাকমা বর্ণমালার সংখ্যা: গবেষণাগত মতভেদ
চাকমা বর্ণমালার সংখ্যা নির্ধারণে বিভিন্ন সময় ভিন্ন ভিন্ন গবেষণা পাওয়া যায়। ভাষাবিদ George Abraham Grierson তার বহুল আলোচিত গবেষণাগ্রন্থ Linguistic Survey of India-এ চাকমা ভাষার ৩৩টি বর্ণমালার উল্লেখ করেন।¹
পরবর্তীকালে সতীশ চন্দ্র ঘোষ চাকমা জাতি গ্রন্থে ৩৭টি বর্ণমালার কথা উল্লেখ করেন।²
আবার নোয়ারাম চাকমা তার পাঠ্যবই চাকমার বর্ণমালার পত্তম শিক্ষা-তে ৩৯টি বর্ণমালার উল্লেখ করেন।³
এই ভিন্নমতগুলো মূলত উচ্চারণভেদ, যুক্তধ্বনি ও আঞ্চলিক ব্যবহারের পার্থক্য থেকে উদ্ভূত বলে অনুমান করা যায়।
আধুনিক মান্যতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত
বর্ণসংখ্যা নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক নিরসনের লক্ষ্যে ২০০৭ সালে আয়োজিত একটি কর্মশালায় ভাষাবিদ, শিক্ষাবিদ ও চাকমা সমাজের প্রতিনিধিদের আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যে, চাকমা ভাষার জন্য ৩৩টি বর্ণমালাই প্রমিত ও ব্যবহারযোগ্য।⁴ বর্তমানে শিক্ষা, সাহিত্য ও লিখিত যোগাযোগে এই বর্ণমালাই ব্যবহৃত হচ্ছে।
ধর্মীয় ঐতিহ্য ও প্রাচীন সাহিত্য
চাকমারা একসময় তান্ত্রিক বৌদ্ধমতে বিশ্বাসী ছিলেন। এই ধর্মীয় ধারার অনুসারী লুরি বা পুরোহিতরা চাকমা বর্ণমালায় ধর্মগ্রন্থ “আঘরতারা” রচনা করেন, যা চাকমা জনগোষ্ঠীর প্রাচীনতম পুঁথি হিসেবে বিবেচিত।⁵
আঠারো শতকে (প্রায় ১৭৭৭ খ্রিষ্টাব্দে) চাকমা সাধক কবি শিবচরণ চাকমা বর্ণমালায় “গোজেনলামা” গীতি-কবিতা রচনা করেন।⁶ এসব সাহিত্যকর্ম থেকে প্রতীয়মান হয় যে চাকমা বর্ণমালার ব্যবহার বহু শতাব্দী পূর্ব থেকেই প্রচলিত।
প্রযুক্তিগত বিকাশ ও ডিজিটাল চর্চা
আধুনিক যুগে চাকমা বর্ণমালার প্রসারে প্রযুক্তির ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ২০০১ সালে মোস্তফা জব্বার চাকমা বর্ণমালার প্রথম সফটওয়্যার তৈরি করেন, যা চাকমা ভাষাকে ডিজিটাল মাধ্যমে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করে।⁷ এর ফলে ভাষাটি শিক্ষা ও প্রকাশনায় নতুন মাত্রা লাভ করে।
উপসংহার
চাকমা বর্ণমালা একটি প্রাচীন ও জীবন্ত ভাষাতাত্ত্বিক ঐতিহ্য। বর্ণসংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও ২০০৭ সালের প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বর্তমানে ৩৩টি বর্ণমালা মান্যতা পেয়েছে। প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল চর্চা পর্যন্ত—চাকমা বর্ণমালার ধারাবাহিক ব্যবহার এর ঐতিহাসিক গভীরতা ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা প্রমাণ করে।
________________________________________
রেফারেন্স / ফুটনোট তালিকা
1. Grierson, G. A. (1903). Linguistic Survey of India. Calcutta: Government of India Press.
2. ঘোষ, সতীশ চন্দ্র. (১৯০৯). চাকমা জাতি. কলকাতা।
3. চাকমা, নোয়ারাম. (১৯৫৯). চাকমার বর্ণমালার পত্তম শিক্ষা. রাঙামাটি।
4. চাকমা ভাষা বিষয়ক কর্মশালা প্রতিবেদন. (২০০৭). রাঙামাটি।
5. চাকমা ধর্মীয় পুঁথি: আঘরতারা (প্রাচীন পাণ্ডুলিপি)।
6. শিবচরণ চাকমা. (১৭৭৭ আনু.). গোজেনলামা (গীতি-কবিতা)।
7. প্রথম আলো. (২৫ ডিসেম্বর ২০১৩). “চাকমা বর্ণমালার সফটওয়্যার ও ডিজিটাল উদ্যোগ”।
- জুন ০১, ২০২৬
পাহাড়ি রাজনীতির বাঁক বদল: দীপেন দেওয়ানের মন্ত্রিত্ব ও সমকালীন সংকট
পার্বত্য চট্টগ্রামের ভূ-রাজনীতি ও ক্ষমতার সমীকরণ বরাবরই জটিল ও বহুমাত্রিক। এই সমীকরণের সাম্প্রতিকতম অধ্যায়ে যুক্ত হয়েছে এক নতুন নাটকীয়তা। রাঙামাটি (২৯৯) আসনের বিপুল ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের গুঞ্জন এখন চায়ের কাপ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক মহলে তুমুল ঝড় তুলেছে। আপাতদৃষ্টিতে একে ‘শারীরিক অসুস্থতাজনিত’ ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখানো হলেও, এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকা রাজনৈতিক চাপ, আদর্শিক দ্বন্দ্ব এবং ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির বাস্তবায়ন-সংক্রান্ত জটিলতা এক গভীর সংকটের ইঙ্গিত দেয়।
দীপেন দেওয়ানের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বেশ সুদৃঢ়। তাঁর পিতা সুবিমল দেওয়ান ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভায় প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় উপজাতীয় বিষয়ক উপদেষ্টা। পারিবারিক এই রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় দীপেন দেওয়ান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র মনোনয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন।
নির্বাচনী ফলাফল ছিল অভূতপূর্ব। রাঙামাটির ২১৩টি কেন্দ্রে তিনি মোট ২ লাখ ৫৯ হাজার ৯৮০ ভোট পেয়ে এক ঐতিহাসিক জয় সুনিশ্চিত করেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী পহেল চাকমার (ফুটবল প্রতীক) প্রাপ্ত ভোট ছিল মাত্র ৩০ হাজার ৯৯২। এই বিশাল ব্যবধানের জনরায় তাঁকে পাহাড়ের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং ফলশ্রুতিতে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের নীতিনির্ধারণী চাবিকাঠি লাভ করেন।
মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর দীপেন দেওয়ান পাহাড়ের শান্তি ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় সাহসী কিছু পদক্ষেপ নেন। ৯ এপ্রিল ২০২৬-এর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ফিরিয়ে আনার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন এবংপার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি নিয়ে বড় ধরনের ‘সুখবরের’ আভাস দেন।
একই সাথে তিনি পাহাড়ের প্রধান সামাজিক উৎসবের নামকরণে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবর্তন আনেন। দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত সম্মিলিত রূপ ‘বৈসাবি’ (বৈসু-সাংগ্রাই-বিজু)-র সীমাবদ্ধতা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই নামটিতে কেবল তিনটি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব স্পষ্ট ছিল। পাহাড়ের বাকি জাতিসত্তাগুলোর অধিকার ও সংস্কৃতি রক্ষার্থে তিনি ১১টি সম্প্রদায়ের নিজস্ব ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে বিজু, বৈসু, সাংগ্রাই, বিষু, চাংলান ও চাংক্রান নামে আলাদাভাবে উৎসব উদযাপনের ঘোষণা দেন। এটি ছিল পাহাড়ের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সর্বোচ্চ মর্যাদাদানের একটি ঐতিহাসিক প্রয়াস।
২১ মে ২০২৬ তারিখে ‘প্রথম আলো’ ও ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান পাহাড়ের টেকসই উন্নয়নের এক বাস্তবমুখী রূপরেখা তুলে ধরেন। ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’র ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদগুলোকে এড়িয়ে পাহাড়ে কোনো প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে তিনি সাফ জানিয়ে দেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিষদগুলো স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মডেল। দীপেন দেওয়ান অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে এই চুক্তি পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন, যা পাহাড়ের সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি।
১ জুন ২০২৬-এর নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো যখন মন্ত্রীর পদত্যাগের সিদ্ধান্তের কথা জানায়, তখন ‘অসুস্থতা’কে সামনে আনা হলেও বিশ্লেষকদের দৃষ্টি এর গভীরে। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং আঞ্চলিক পরিষদকে শক্তিশালী করার মতো মন্ত্রীর কিছু অবস্থান পাহাড়ের কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহল ও চুক্তি-বিরোধীদের তীব্র অসন্তোষের কারণ হতে পারে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও স্থিতিশীলতার প্রশ্নে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও চুক্তি-বিরোধী পক্ষগুলোর ভূমিকা সব সময়ই একটি সংবেদনশীল আলোচনার বিষয়। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিয়ে যে মনস্তাত্ত্বিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্ব দীর্ঘকাল ধরে চলে আসছে, তার চাপ হয়তো এই জননন্দিত মন্ত্রীর কাঁধে এসে পড়েছে। চুক্তি-বিরোধীদের অদৃশ্য চাপ এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের অভ্যন্তরীণ বিরোধের কারণেই হয়তো বিপুল জনসমর্থন থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সরে দাঁড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।
দীপেন দেওয়ানের পদত্যাগের এই সিদ্ধান্ত কেবল একজন ব্যক্তির সরে যাওয়া নয়, বরং তা পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রক্রিয়ার অগ্রযাত্রায় এক বড় ধাক্কা হতে পারে। বন্দুকের গর্জন, গুম আর হত্যাকাণ্ডের চোরাবালিতে হারিয়ে যাওয়া পাহাড়ি জনপদে যে শান্তির সুবাতাস বইতে শুরু করেছিল, তা যেন এই রাজনৈতিক পালাবদলে থমকে না যায়। পাহাড়ের ১১টি জুম্ম জাতির বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি রক্ষা এবং আঞ্চলিক পরিষদের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের যে স্বপ্ন দীপেন দেওয়ান দেখিয়েছেন, তা টিকিয়ে রাখাই হবে আগামী দিনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
- জুন ০১, ২০২৬
পাহাড়ে ধর্ষণ ও বিচারহীনতা: রাষ্ট্র কি শুনছে?
২৩ মে, ২০২৬। বান্দরবানের থানচি উপজেলা সদরের বুক চিরে বেরিয়ে এলো আর্তনাদ—পাঁচ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগ। পরদিন ২৪ মে, পুলিশের জালে ধরা পড়ল ষোলো বছরের এক কিশোর। ঘটনা মর্মান্তিক, নিঃসন্দেহে। কিন্তু পাহাড়ের বাতাসে ভেসে বেড়ানো প্রশ্নটা আরও গভীর: এটি কি নিছকই একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা, নাকি সবুজ পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা রক্তের দাগের আরও একটি নতুন বিন্দু?
পুলিশের খাতাই সাক্ষী দিচ্ছে—২০২৫ সালেই শুধু বান্দরবানে ১১টি শিশু আর দুই গৃহবধূর সম্ভ্রম লুণ্ঠিত হয়েছে। একই বছরের ৫ মে, জুমখেতে কাজ করতে গিয়ে চিংমা খিয়াং নামের এক নারী ফিরে আসেননি আর। তার নিথর দেহ পাওয়া গিয়েছিল ঝোপের আড়ালে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিনিয়া চাকমার কণ্ঠে তখনও শোনা গেছে সেই চিরচেনা বাক্য—“তদন্ত চলমান”। পাহাড় জানে, এই “চলমান” শব্দটির আড়ালে কত দীর্ঘশ্বাস, কত অন্ধকার রাত জমে থাকে। কত মামলার ফাইল ধুলোয় চাপা পড়ে, আর কত অপরাধী নতুন শিকারের খোঁজে বের হয়।
এই অন্ধকারের হিসেব রেখেছে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি প্রকাশিত তাদের বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদন বলছে—এক বছরে ২৬টি ঘটনায় ৩২ জন জুম্ম নারী ও শিশু ধর্ষণ, যৌন হয়রানি আর শারীরিক নির্যাতনের শিকার। সংখ্যা নয়, এ যেন পাহাড়ের প্রতিটি ঝরনার জলে মিশে যাওয়া অশ্রুর হিসেব। এ হিসেব বলে দেয়, জুম্ম নারীর শরীর আজও নিরাপদ নয়—না জুমখেতে, না ঘরের আঙিনায়।
তাই ২৫ মে, ২০২৬। রাঙামাটির রাজপথে নেমে এলো পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ আর হিল উইমেন্স ফেডারেশন। বিলাইছড়িতে ছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, থানচিতে শিশুকে ধর্ষণ, আর রাজধানীতে শিশু রামিসার হত্যাকাণ্ড—সব ক্ষোভ একসাথে গর্জে উঠল শ্লোগানে। দাবি একটাই, স্পষ্ট আর তীক্ষ্ণ: দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার।
কিন্তু প্রশ্নটা রয়েই যায়—এই মিছিল, এই শ্লোগান, এই কান্না—রাষ্ট্র কি শুনতে পায়? চাকমা প্রবাদ আছে—“এ্যাদো কিয়েত কুগুরে বুগানা”। যার অর্থ, ডেকে কোনো লাভ নেই, সে শুনেও শুনবে না। পাহাড়ের মানুষের কাছে রাষ্ট্রের ভূমিকা আজ সেই কুকুরের মতোই—ডাক শুনেও নির্বিকার।
অপরাধ যখন শাস্তি পায় না, তখন তা আর অপরাধ থাকে না, হয়ে ওঠে সংস্কৃতি। পাহাড়ে ধর্ষণ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি বিচারহীনতার এক স্থায়ী ব্যাধি। প্রতিটি দেরি করা বিচার, প্রতিটি ধামাচাপা দেওয়া মামলা অপরাধীর হাতে তুলে দিচ্ছে নতুন করে অস্ত্র। আর ধর্ষণের মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই এক পতাকা, এক মানচিত্রের কথা বলে, তবে তার প্রথম প্রমাণ দিতে হবে পাহাড়ের নারী ও শিশুর নিশ্বাসের নিরাপত্তা দিয়ে। কারণ পতাকা শুধু কাপড়ের টুকরো নয়, এটি ন্যায়বিচারের প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে পাহাড়ের প্রতিটি ঝিরি অভিমানে শুকিয়ে যাবে, প্রতিটি জুমঘর থেকে উঠবে প্রতিবাদের আগুন।
আর তখন প্রশ্নটা আরও কঠিন হয়ে ফিরে আসবে—রাষ্ট্র কি শুনছে? নাকি পাহাড়ের কান্না শুধু পাহাড়েই প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে যাচ্ছে?
তথ্যসূত্র: হিল ভয়েচ ও দৈনিক প্রথম আলো (২৫ মে ২০২৬)
- মে ২৫, ২০২৬
অধিকারের লড়াই ও সম্পর্কের দায়বদ্ধতা
মানবজীবনের পথচলা কখনো মসৃণ সরলরেখায় হয় না। আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থানে দাঁড়িয়ে নিজের দায়িত্বটুকু পালন করার আপ্রাণ চেষ্টা করি। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করে না, কেউ কাউকে আঘাত করতে চায় না। তবুও জীবনের কোনো এক অদ্ভুত মোড়ে এসে আমাদের এমন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে অবলীলাক্রমেই চেনা মানুষগুলোর সামনে নিজেকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে মায়াবদ্ধ মনে হয়। আজ হয়তো আমার জীবনের সেই কঠিন পরীক্ষার দিন।
বর্তমানে 'বর্গা শিক্ষক' শব্দবন্ধটি অনেকের বুকেই এক নীরব বেদনার জন্ম দিয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে আজ সবার মনেই এক গভীর দুঃখ ও হাহাকার বিরাজমান। শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি আত্মিক বন্ধন ও সামাজিক মেরুদণ্ড। যখন সেই মেরুদণ্ডে আঘাত লাগে বা কোনো টানাপোড়েন তৈরি হয়, তখন হৃদয়ের রক্তক্ষরণ হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই দুঃখ কোনো একক ব্যক্তির নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক চেতনার এক গভীর ক্ষত।
আমরা সবাই নিজের নিজের কাজ করছি, নিজের মতো করে সততার সাথে পথ চলছি। প্রত্যেকেই নিজ নিজ নিয়তি ও কর্তব্যের জালে বন্দি। কিন্তু নিয়তির পরিহাস এমনই যে, মাঝেমধ্যে নিজের হক বা দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও অন্যের চোখে অনিচ্ছাকৃতভাবেই অপরাধী সেজে যেতে হয়। অথচ আমরা বরাবর একে অপরের পাশে ছিলাম, সুখ-দুঃখে একাত্ম হয়েছি এবং ভবিষ্যতেও বরাবর একসাথেই থাকবো। সাময়িক কোনো ঝড় বা ভুল বোঝাবুঝি আমাদের এই দীর্ঘদিনের আত্মিক বন্ধনকে ছিঁড়ে ফেলতে পারে না।
আজকের দিনটি হয়তো আমার জন্য এক মহাসংকটের, এক নীরব আত্মদহনের। আজ হয়তো পরিস্থিতি আমাকে এমন এক কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করেছে যেখানে আমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য না থাকা সত্ত্বেও আমি অপরাধীর মতো স্তব্ধ হয়ে আছি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সাময়িক ভুল বোঝাবুঝি বা পারস্পরিক দূরত্ব আমাদের আসল লক্ষ্য নয়।
আমাদের আসল কাজ হলো অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। শোষণের বিরুদ্ধে, বঞ্চনার বিরুদ্ধে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের ন্যায্য পাওনা ও মর্যাদা ছিনিয়ে আনাই আমাদের মূল লড়াই।
এই অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নামতে গিয়ে যদি সাময়িকভাবে কাউকে 'অপরাধী'র রূপ ধারণ করতেও হয়, তবে সেই ত্যাগ বা গ্লানি মেনে নেওয়াও এক ধরণের বীরত্ব। এই মেঘ ক্ষণস্থায়ী। আমরা আবার একে অপরের হাত ধরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলবো। পারস্পরিক সহানুভূতি, ধৈর্য এবং নিজেদের অধিকারের প্রতি অবিচল থেকে আমরা এই কঠিন সময়কে পার করে যাবো। দিনশেষে আমাদের এই একতা এবং অধিকার আদায়ের জেদ-ই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
- মে ২২, ২০২৬
পার্বত্য চট্টগ্রামের মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির সংগ্রাম
একটি সভ্য সমাজের শ্রেষ্ঠতম মানদণ্ড হলো তার পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও নিঃস্বার্থ পরোপকারিতা। বর্তমান সময়ে একঝাঁক তরুণের নিঃস্বার্থ কর্মকাণ্ডে সেই সভ্যতারই প্রতিফলন ঘটছে। কারও পারিবারিক অসুস্থতায় রক্তের জোগান দেওয়া, অর্থসংকটে পড়া শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নেওয়া, কিংবা অগ্নিকাণ্ডে গৃহহীন পরিবারের মাথার ওপর নতুন ছাদ তৈরি করে দেওয়া—এই সবকিছুই এক পরম মানবিক সংস্কৃতির অংশ। আশার কথা হলো, এই পরার্থপরতা কোনো ধার করা সংস্কৃতি নয়; এটি আবহমান কাল ধরে আমাদের চাকমা সমাজের নিজস্ব ঐতিহ্যের মধ্যেই বিদ্যমান ছিল। কিন্তু বাহ্যিক সমাজ ও সংস্কৃতির এত অগ্রগতির পরও, একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও আমরা কি মানসিকভাবে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পেরেছি? গভীর অবলোকন বলে, বাহ্যিক আধুনিকতার আড়ালে আজও আমরা সামন্ততান্ত্রিক মানসিকতার এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দি রয়ে গেছি।
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, একসময় সামন্ততান্ত্রিক সমাজে সাধারণ মানুষের জন্য শিক্ষা ছিল এক দুর্লভ অধিকার। তৎকালীন দেওয়ানদের অন্ধ অনুকম্পা ও অনুমতি ছাড়া সাধারণ ঘরের সন্তানের শিক্ষালাভের কোনো সুযোগ ছিল না। শিক্ষার আলোকে প্রদীপ না ভেবে, নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হুমকিস্বরূপ মনে করা হতো। কিন্তু সময় স্থবির থাকে না। কৃষ্ণকিশোর চাকমার মতো দূরদর্শী ব্যক্তিত্বের আন্তরিক সহযোগিতা এবং পরবর্তীকালে এম এন লারমা ও সন্তু লারমার বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্বে জুম্ম সমাজ এক যুগান্তকারী রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যায়। তাঁদের আলোকেই আজ চাঙমা সমাজের অগণিত মানুষ দেশে-বিদেশে উচ্চশিক্ষায় দীক্ষিত হয়েছে, নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং বিশ্বমঞ্চে জাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে।
চাকমা তথা জুম্ম জাতির এই আত্মপ্রকাশের পথ কখনোই মসৃণ ছিল না। তৎকালীন ঔপনিবেশিক শাসক থেকে শুরু করে পরবর্তী শাসকরাও কখনোই চায়নি এই জুম্ম জনতা স্বাধিকার ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকুক। ফলে ব্রিটিশ আমলে চাকমা রাজ্যকে তিন ভাগে বিভক্ত করে এর শক্তিকে খর্ব করার চেষ্টা করা হয়। সেই ক্ষত শুকানোর আগেই পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে লাখো চাকমা মানুষকে নিজেদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করে এক নির্মম বাস্তুচ্যুত শরণার্থীতে পরিণত করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি; লাখ লাখ বাঙালি পুনর্বাসনের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনমিতি পরিবর্তন করে জুম্মদের নিজস্ব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার এক দীর্ঘমেয়াদি চক্রান্ত চলমান রয়েছে। ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তিও বাস্তবায়ন না হওয়াতে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান পুরোপুরি দিতে পারেনি।
আজ বরগাঙের পানি বহুদূর গড়িয়েছে, সমাজ আধুনিক হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার হার বেড়েছে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, কাঠামোগত সামন্তবাদ বিলুপ্ত হলেও আমাদের মনস্তত্ত্ব থেকে ‘সামন্ত চিন্তা’ দূর হয়নি। বর্তমানের তথাকথিত জনপ্রতিনিধি বা সমাজপতিদের আচরণে সেই পুরোনো দেওয়ানি মানসিকতার কুৎসিত প্রতিফলন প্রায়শই দৃশ্যমান হয়। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়:
•কোনো ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের মতাদর্শের সাথে সাধারণ মানুষের চিন্তা না মিললে, তাকে প্রাপ্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়।
•কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানের ব্যানারে সমাজপতির নাম সামান্য নিচে থাকলে বা বাদ পড়লে, তিনি অহংবোধে আঘাত পেয়ে হুমকি দিতে দ্বিধাবোধ করেন না।
শাসক নেই, রাজা-জমিদারের আইনি শাসন নেই, অথচ একশ্রেণীর সুবিধাবাদী মানুষ সমাজকে এখনো নিজেদের ব্যক্তিগত সামন্ততান্ত্রিক তালুক মনে করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। এই মনস্তাত্ত্বিক দাসত্ব এবং ক্ষমতার অপব্যবহারেরই চরম মূল্য চকাচ্ছে আজকের আর্তনাদমুখর পার্বত্য চট্টগ্রাম।
এই ঘোর অমাবস্যার মধ্যেও আশার আলো জ্বেলে রেখেছে আমাদের নতুন প্রজন্ম। যে তরুণরা আজ রাজনীতি বা ক্ষমতার লোভের ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে, তারাই আমাদের প্রকৃত মুক্তিদূত। সমাজের রক্তচক্ষু, রাজনৈতিক সংকীর্ণতা এবং তথাকথিত সমাজপতিদের অহংকারকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এই নিবেদিতপ্রাণ তরুণরাই ভাঙবে নব্য-সামন্তবাদের এই অদৃশ্য দেয়াল।
সামন্তবাদ কেবল কোনো শাসনব্যবস্থা নয়, এটি একটি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি। যতদিন না আমরা অন্যের মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে সম্মান জানাতে পারছি, যতদিন না ক্ষমতার লোভের ঊর্ধ্বে উঠে মানবতাকে স্থান দিতে পারছি, ততদিন বাহ্যিক আধুনিকতা অর্থহীন। তবে তারুণ্যের এই নিঃস্বার্থ পদচারণাই বলে দেয়—দিনবদল আসন্ন। এই নতুন প্রজন্মের হাত ধরেই পার্বত্য চট্টগ্রাম তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে এবং সামন্তবাদের অন্ধকার কাটিয়ে এক মুক্ত, সমতাভিত্তিক ও মানবিক সমাজে পদার্পণ করবে।
- মে ২০, ২০২৬
ঐতিহ্যের দর্পণে অধিকারের জয়গান
হৃদয়ের ঔদার্য আর সত্যের আলোয় যিনি প্রদীপ্ত, ক্ষমতার উচ্চাসনে বসেও তিনি মাটির মানুষকে ভুলে যান না। বর্তমান জাতীয় সংসদের মাননীয় ডেপুটি স্পিকার, প্রাজ্ঞ আইনবিদ ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সম্প্রতি তাঁর নির্বাচনী এলাকার আদিবাসী অধ্যুষিত জনপদে পা রেখে তেমন এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন। সবুজ পাহাড় আর অরণ্যঘেরা সেই জনপদের প্রান্তিক মানুষের দুঃখ-দুর্দশা স্বচক্ষে অবলোকনকালে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তাঁর কণ্ঠ থেকে নিঃসৃত হলো এক মহাসত্যের বাণী।
আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রাচীন গৌরব ও বর্তমান বঞ্চনার চিত্র তুলে ধরে তিনি দীপ্ত কণ্ঠে বলেন:
"প্রকৃতপক্ষে ওরাই এই মাটির আদি সন্তান, আদিবাসিন্দা। আজ অবহেলা আর তাচ্ছিল্যে অনেকে ওদের 'ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী' বলে আখ্যায়িত করেন। কিন্তু আমি বলি—ওরা ক্ষুদ্র নয়, ওরা হৃদয়ে ও ঐতিহ্যে অনেক বড়। মানবসভ্যতার ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যাবে, এই অঞ্চলে ওদেরই প্রথম পদাচারণা ঘটেছিল। সেই অমোঘ সত্যের আলোকেই আমি ওদের আদিবাসী বলি।"
আদিবাসীদের উন্নত জীবনবোধের প্রশংসা করে এবং আত্মোপলব্ধির এক বেদনাকাতর স্বরে ডেপুটি স্পিকার আরও যোগ করেন, "সংখ্যায় ওরা হয়তো আজ সংখ্যালঘু, কিন্তু ওদের মন-মানসিকতা, নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অনন্য উচ্চতায় মহিমান্বিত। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, আজ ওরা মৌলিক রাষ্ট্রীয় সুবিধা থেকে বঞ্চিত। ইতিহাসের এক নির্মম সত্য হলো, আমরা বাঙালিরা পরবর্তীতে এখানে এসে ওদের চিরকালীন চারণভূমি ও জায়গা দখল করে নিয়েছি।" তাঁর এই সত্যনিষ্ঠ ও সংবেদনশীল উচ্চারণ আদিবাসী মানুষের হৃদয়ে যেমন আশার আলো জ্বেলেছে, তেমনি সুধীসমাজে সৃষ্টি করেছে এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা।
ব্যারিস্টার কায়সার কামালের এই মানবিক ও সংবেদনশীল রূপটি আকস্মিক কোনো ঘটনা নয়; এটি তাঁর দীর্ঘদিনের আপসহীন ও ত্যাগের রাজনীতি থেকেই উৎসারিত। বিগত ফ্যাসিবাদবিরোধী দুঃসময়ে যখন চারদিকে ছিল ভীতির পরিবেশ, তখন তিনি বুকে সাহস বেঁধে বিএনপির হাজার হাজার নির্যাতিত নেতাকর্মীর পক্ষে আদালতের প্রাঙ্গণে বীরত্বের সাথে আইনি লড়াই লড়েছেন। বিশেষ করে, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এবং জননেতা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মিথ্যা মামলাগুলো মোকাবিলায় তাঁর বিশ্বস্ততা ও আইনি প্রজ্ঞা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। দলের অনেক সুপরিচিত আইনজীবী যখন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দ্বিধাগ্রস্ত ও কিংকর্তব্যবিমূঢ় ছিলেন, তখন ব্যারিস্টার কামাল একজন খাটি ও নিষ্ঠাবান জাতীয়তাবাদী সৈনিক হিসেবে নিজের ওপর অর্পিত পবিত্র দায়িত্ব পালন করেছেন পরম বিশ্বস্ততায়।
ত্যাগের এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর, দলীয় অবদানের যথাযোগ্য স্বীকৃতিস্বরূপ দলীয় মনোনয়নে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে মেধা ও নিষ্ঠার পুরস্কার হিসেবে প্রথমে ভূমি প্রতিমন্ত্রী এবং বর্তমানে জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকারের মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত হন।
সংসদের উচ্চাসনে আসীন হওয়ার পর থেকে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল ক্ষমতার মোহাতীত এক অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে অত্যন্ত দক্ষতা, ধৈর্য এবং সুষম নিরপেক্ষতায় তিনি সংসদের অধিবেশন পরিচালনা করছেন। তাঁর এই ন্যায়নিষ্ঠ ভূমিকা কেবল নিজ দলের মাঝেই নয়, বরং বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের হৃদয়েও গভীর শ্রদ্ধার আসন তৈরি করেছে। এমনকি কট্টর ও আপসহীন সরকারবিরোধী সমাজিক মাধ্যমকর্মী এবং ব্লগারদের মুখেও আজ তাঁর সংসদীয় নিরপেক্ষতার ভূয়সী প্রশংসা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
মাঠপর্যায়ে শোষিত ও বঞ্চিত মানুষের অধিকারের পক্ষে তাঁর এই বজ্রকণ্ঠ এবং সংসদের ভেতর তাঁর ন্যায়পরায়ণ ভূমিকা—উভয়ই প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল একজন রাজনীতিবিদ নন, বরং দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদী সমাজ বিনির্মাণের এক অতন্দ্র প্রহরী। তাঁর এই গৌরবময় কার্যক্রম দেশবাসীকে যেমন আনন্দিত করেছে, তেমনি এক আলোর দিশা দেখিয়েছে।
- মে ১৮, ২০২৬
পাহাড়ের দীর্ঘশ্বাস
পাহাড়ের অরণ্য যখন কুয়াশায় ঢাকা পড়ে, তখন তার নিস্তব্ধতার গভীরে লুকিয়ে থাকে দশকের পর দশক ধরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস। ১৯৭১ থেকে ১৯৯৭—এই দীর্ঘ ছাব্বিশটি বছর পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জনগণের জন্য কেবল একটি কালপঞ্জি ছিল না। তা ছিল এক অস্তিত্বহীনতার কালখণ্ড। যে মাটিতে জুম্ম জন্ম, সেই মাটিই তার জন্য হয়ে উঠেছিল এক নির্মম বধ্যভূমি আর সন্দেহের কণ্টকশয্যা।
সে সময় পাহাড়ের ঢালে কোনো জুম্ম যুবকের লম্বা চুল কিংবা অঙ্গে সবুজ শার্ট থাকাটাই ছিল অপরাধের পরোয়ানা। পোশাক আর অবয়ব দেখে মানুষকে ‘সন্ত্রাসী’ তকমা দেওয়ার সেই একপাক্ষিক বিচার ব্যবস্থা মানবিকতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছিল।
সাধারণ জীবনযাপনের অতি সামান্য উপকরণও হয়ে উঠত রাষ্ট্রীয় সন্দেহের বীজ। দশ কেজি চাল কিংবা একটি লাক্স সাবান কিনলেই জুটত ‘সন্ত্রাসী বাজার’ অথবা ‘শান্তিবাহিনীর গোপন রসদ’ সরবরাহের অভিযোগ। হাটে গিয়ে সদাই করাও ছিল এক অগ্নিপরীক্ষা। এই সন্দেহের আবর্তে পিষ্ট হয়ে কত প্রাণ অকালে জেলের অন্ধ প্রকোষ্ঠে হারিয়ে গেছে, তার হিসাব ইতিহাসের কোনো পাতায় লেখা নেই।
কোথাও গেলে কিংবা বাজারে গেলে ‘গোল ঘর’-এ নাম লেখাতে হতো। ‘গোল ঘর’ ছিল জুম্মদের জন্য এক বিভীষিকাময় তোরণ। সেখানে নাম এন্ট্রি করার অর্থ ছিল নিজের আত্মসম্মানকে বিসর্জন দেওয়া। প্রশ্নবাণে জর্জরিত হতে হতে যখন মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসত, তখন সামান্যতম সন্দেহে মিলত অবর্ণনীয় সাজা।
চেকপোস্টের সেই তল্লাশি কেবল দেহের ছিল না, তা ছিল এক জনগোষ্ঠীর মর্যাদার ওপর পদাঘাত। পরিধেয় বস্ত্র খুলে যখন নিজেকে প্রমাণ করতে হতো, তখন পাহাড়ের আকাশ-বাতাসও যেন অপমানে কুঁকড়ে যেত। সন্ধ্যা নামলে নিরাপত্তার খোঁজে মানুষ গ্রাম ছেড়ে গহিন অরণ্যে আশ্রয় নিত, কিন্তু শান্তির ছায়া মেলেনি কোথাও।
পাহাড়ের এই যন্ত্রণার শেকড় আরও গভীরে। পাকিস্তান আমলে কাপ্তাই বাঁধের মাধ্যমে যে উন্নয়নের জোয়ারের কথা বলা হয়েছিল, তা আসলে ছিল লক্ষাধিক চাকমার জন্য এক ‘মরণ-ফাঁদ’। নিজের বাস্তুভিটা জলমগ্ন হতে দেখে এক বিশাল জনগোষ্ঠী দেশান্তরী হতে বাধ্য হয়েছিল।
সেই থেকে শুরু হওয়া ‘পরবাসী’ জীবনের অভিশাপ আজও এই জনপদের ললাট থেকে মুছে যায়নি। নিজের দেশে থেকেও পরবাসী হওয়ার এমন নজির ইতিহাসে বিরল।
১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি মানুষের বুকে এক চিলতে আশার আলো জ্বালিয়েছিল। মানুষ ভেবেছিল, এবার হয়তো বুটের শব্দ কোনো ভোরে তাদের ঘুম ভাঙবে না।
কিন্তু নিয়তির পরিহাস আর রাজনৈতিক জটিলতায় সেই আশা কেবল এক দীর্ঘশ্বাসে পরিণত হয়েছে। চাকমাদের প্রচলিত সেই প্রবাদটি আজও কত সত্য—“চিলে সো মারিলে খেরান অলে নেযায়”। অর্থাৎ, চিল ছোঁ মারলে শিকার ধরতে না পারলেও অন্তত ঘাস ছিঁড়ে নিয়ে যায়। চুক্তি হলো সত্য, কিন্তু নতুন সংগঠন ইউপিডিএফ উদ্ভব আর ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত সেই ১৯৯৭-পূর্ববর্তী বিভীষিকাকেই যেন নতুন মোড়কে ফিরিয়ে আনল। এভাবে ২৮টি বসন্ত চলে গেল জুম্ম জাতির বুকে।
আজকের প্রজন্ম হয়তো জানে না সেই গোল ঘরের অপমান কিংবা ৫০০ গ্রাম সিদোল কেনার অপরাধে নির্যাতিত হওয়ার গল্প। কিন্তু পাহাড়ের ধুলিকণায় আজও সেই যন্ত্রণার ঘ্রাণ লেগে আছে।
চুক্তি পরবর্তী সময়েও মানুষ যখন নিজভূমে পরবাসীর মতো জীবন কাটায়, তখন প্রশ্ন জাগে—পাহাড়ের এই অন্তহীন রক্তক্ষরণ কি তবে কোনোদিন থামবে না? মলাটবদ্ধ ইতিহাসের বইয়ে নয়, বরং মানুষের যাপিত জীবনে যেদিন আত্মমর্যাদা আর প্রকৃত শান্তি ফিরে আসবে, সেদিনই হয়তো পাহাড়ের এই দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটবে।
আর সেই মুক্তির একমাত্র পথ হলো ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ ও যথাযথ বাস্তবায়ন। চুক্তির প্রতিটি ধারা—ভূমি কমিশন কার্যকর করা, আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদকে ক্ষমতায়ন, অস্থায়ী সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহার—বাস্তবায়িত না হওয়া পর্যন্ত পাহাড়ের মানুষের বুকে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস শেষ হবে না। কাগজের চুক্তিকে মাঠের বাস্তবতায় রূপ দিতে পারলেই কেবল কুয়াশা সরে গিয়ে পাহাড়ে নতুন ভোরের আলো ফুটবে।
- মে ১৭, ২০২৬
মেগা প্রকল্প নয়, আগে ন্যায্যতা
গত সোমবার (১১ মে ২০২৬) খাগড়াছড়ি সার্কিট হাউসে প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রী দীপেন দেওয়ান আবারও সেই পুরোনো প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছড়ালেন—মেগা প্রকল্প, পর্যটন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-যোগাযোগের উন্নয়ন। পাহাড়ের মানুষ এই কথাগুলো বহুবার শুনেছে। এতবার শুনেছে যে এখন আর এসব আশ্বাস উন্নয়নের বার্তা নয়—এগুলো সন্দেহের সংকেত।
প্রশ্ন একটাই:
এই উন্নয়ন কার জন্য? পাহাড়ের মানুষের জন্য, না পাহাড় দখলের জন্য?
পাহাড়ে তথাকথিত উন্নয়নের নামে কী হয়েছে, তা পাহাড়ের প্রতিটি মানুষ জানে। রাস্তা হয়েছে—কিন্তু তাতে পাহাড়ির চলার অধিকার নেই। পর্যটন কেন্দ্র হয়েছে—কিন্তু পাহাড়ি উচ্ছেদ হয়েছে। প্রকল্প হয়েছে—কিন্তু সিদ্ধান্তে পাহাড়ির মতামত নেই। উন্নয়ন এখানে মানে হয়েছে ভূমি হারানো, বন হারানো, জীবিকা হারানো। এগুলো উন্নয়ন নয়—এগুলো পরিকল্পিত বঞ্চনা।
১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি কোনো অনুগ্রহ ছিল না—এটি ছিল রাষ্ট্রের দায়। সেই দায় আজও রাষ্ট্র পালন করেনি। ভূমি কমিশন অকার্যকর, আঞ্চলিক পরিষদ ক্ষমতাহীন, সামরিক উপস্থিতি প্রশ্নাতীত। এই অবস্থায় মেগা প্রকল্পের কথা বলা মানে পাহাড়ের ক্ষততে লবণ ছিটানো।
চুক্তি বাস্তবায়ন ছাড়া পাহাড়ে উন্নয়ন নয়—এই বাস্তবতা অস্বীকার মানেই সংঘাতকে আমন্ত্রণ।
বিদেশি পর্যটক আনার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন—
যে মানুষ নিজের ভূমিতে নিরাপদ নয়, যে জনগোষ্ঠীর পরিচয় আজও সন্দেহের চোখে দেখা হয়, তাদের ঘাড়ে দাঁড়িয়ে কাদের পর্যটন হবে? পাহাড়কে সাজিয়ে দেখানোর আগে পাহাড়ের মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখুন।
পাহাড়ে উন্নয়ন মানে— ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা। জোরপূর্বক উচ্ছেদ বন্ধ করা। পাহাড়ি স্বশাসনের কার্যকর বাস্তবায়ন। সেনানির্ভর প্রশাসন থেকে বেরিয়ে আসা। এই মৌলিক প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গিয়ে উন্নয়নের বুলি কপচানো রাজনৈতিক ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয়।
পাহাড় কোনো পরীক্ষাগার নয়, পাহাড়ের মানুষ কোনো পরিসংখ্যান নয়। মেগা প্রকল্প দিয়ে পাহাড়ের সমস্যা ঢেকে রাখা যাবে না।
ন্যায্যতা ছাড়া উন্নয়ন হয় না। চুক্তি বাস্তবায়ন ছাড়া শান্তি আসে না। আর পাহাড়ের মানুষের সম্মতি ছাড়া কোনো উন্নয়ন গ্রহণযোগ্য নয়। এটাই শেষ কথা।
- মে ১৩, ২০২৬
লংগদুর ছাইচাপা অঙ্গার থেকে জেগে ওঠা দ্রোহের নাম — পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ
৪ঠা মে, ১৯৮৯। পার্বত্য চট্টগ্রামের আকাশে সেদিন সূর্য ডুবেছিল রক্তের আল্পনায়। লংগদুর সবুজ উপত্যকা মুহূর্তে পরিণত হয়েছিল ধূসর শ্মশানে। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়েছিল কেবল কাঠ-বাঁশের কুটির নয় — পুড়েছিল জুম্ম জাতির হাজার বছরের স্বপ্ন, পুড়েছিল বুদ্ধের করুণা-মাখা মূর্তি, পুড়েছিল মাতৃভাষার বর্ণমালা। শিশুর কান্না, জননীর আর্তনাদ আর বৃদ্ধের দীর্ঘশ্বাস মিশে সেদিন লংগদুর বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল।
ইতিহাস সাক্ষী, ৩২টি তাজা প্রাণ, ১১টি রক্তাক্ত শরীর, ৯টি গ্রাম (টিনটিলা, মানিকজোড় ছড়া, বাত্যাপাড়া, লংগদু বড়াদম, মহাজন পাড়া, সোনাই, বামে আটরকছড়া, ডানে আটরকছড়া ও করল্যাছড়ি)- ১০১১টি ভস্মীভূত নীড়, ২টি স্কুল ( সোনাই সরকারি প্রাথমিক স্কুল ও লংগদু সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, বড়াদম), ৬টি বিধ্বস্ত বিহার (টিনটিলা বনবিহার, মনোরমা বৌদ্ধ বিহার, আটরকছড়া, দশবল ধর্মরত্ন বৌদ্ধ বিহার, সোনাই বৌদ্ধ বিহার, সোনাই, করল্যাছড়ি বৌদ্ধ বিহার, বড়াদম বৌদ্ধ বিহার) — এই হলো রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট সেই ধ্বংসযজ্ঞের নির্মম পরিসংখ্যান। হাজারো জুম্ম সন্তান সেদিন উদ্বাস্তু হয়ে পথে নামে, কারও কারও ঠাঁই হয় কাঁটাতারের ওপারে।
কিন্তু ছাইচাপা পড়ে না অঙ্গার। লংগদুর সেই দগ্ধ ভূমির বুক চিরে, শহীদের রক্তস্নাত মাটিতে পা রেখে, ঠিক ১৬ দিন পর — ২০শে মে, ১৯৮৯ — জন্ম নিল এক দ্রোহ, এক শপথ, এক অনির্বাণ মশাল: পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ।
যে মিছিলে উচ্চারিত হয়েছিল প্রতিবাদের প্রথম শ্লোগান, যে দেয়ালে লেখা হয়েছিল অধিকার-এর প্রথম পঙক্তি, সে মিছিলের অগ্রভাগে ছিল পাহাড়ের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া তরুণ। তারা শপথ নিয়েছিল — এই রক্ত বৃথা যেতে দেবে না।
আজ পাহাড়ের গ্রামগুলো আর সেই আগের মতো নয়ন-ভোলানো সবুজ নয়। ভূমি-হারানো মানুষের চোখে শূন্যতা, ভাষা-হারানো শিশুর কণ্ঠে নীরবতা। উন্নয়নের নামে কর্ষিত হয় পাহাড়ের বুক, আর নির্বাসিত হয় তার আদিম সন্তান।
তবুও, হতাশার এই ধূসর মরুতে এক চিলতে ওয়েসিস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ। তাই জুম্ম জনতার প্রত্যাশা, পিসিপি যেন শহীদের ঋণ শোধ করে কলমে, কণ্ঠে আর কর্মে।
চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খুমি — প্রতিটি জাতির নিজস্ব বর্ণমালা আজ মৃত্যু-শয্যায়। মাতৃভাষার অক্ষরগুলো যেন লংগদুর ছাইয়ের নিচে চাপা পড়া সোনার মোহর। পিসিপি’র কাছে জনতার আকুতি: তোমরা সেই মোহর কুড়িয়ে আনো, বর্ণের মিছিলে মাতৃভাষাকে ফিরিয়ে দাও তার হারানো সিংহাসন।
একটি শিশু যখন নিজের লিপিতে ‘মা’ লিখতে শিখবে, সেদিনই লংগদুর একেকটি আত্মা শান্তি পাবে।
শহীদের নামগুলো যেন কেবল ৪ঠা মের পোস্টারে বন্দী না থাকে। লংগদু, লোগাং, নানিয়াচর, বাঘাইছড়ি তথা পার্বত্য চট্টগ্রামে — প্রতিটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের মৌখিক ইতিহাস, দলিল আর দীর্ঘশ্বাস সংগ্রহ করে আগামীকে জানাও। কারণ যে জাতি ইতিহাস ভোলে, সে জাতি আত্মপরিচয় হারায়।
প্রতিশোধের আগুনে নয়, প্রতিবাদের যুক্তিতে পাহাড়কে জাগাও। বিজ্ঞান, সাহিত্য, দর্শন আর রাজনীতির অস্ত্রে শান দাও জুম্ম তরুণকে। যাতে সে বিশ্ব-দরবারে মাথা উঁচু করে বলতে পারে — ‘আমি জুম্ম, আমি মানুষ, আমারও অধিকার আছে’।
ভূমি আমার মা। সেই মায়ের অধিকার ফিরিয়ে আনতে পিসিপি’কে হতে হবে বজ্রকণ্ঠ। পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, সাংবিধানিক স্বীকৃতি আর আত্মনিয়ন্ত্রণের দাবিতে রাজপথ যেন কখনো নীরব না হয়।
লংগদুর ছাই আজও উড়ে বেড়ায় পাহাড়ের বাতাসে। সেই ছাইয়ের গন্ধে মিশে আছে প্রতিশ্রুতি। পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ যদি তার জন্মলগ্নের শপথ ভুলে যায়, তবে শহীদের আত্মা আরেকবার মরবে।
কিন্তু যতদিন পাহাড়ের কোনো তরুণ নিজের বর্ণমালায় কবিতা লিখবে, যতদিন কোনো কিশোরী নিজের ভাষায় গান গাইবে, যতদিন মিছিলের অগ্রভাগে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম” শব্দটি ধ্বনিত হবে — ততদিন লংগদুর ঋণ শোধের পথ খোলা থাকবে।
পাহাড় আবার সবুজ হবে। কারণ রক্ত কখনো বৃথা যায় না। রক্ত বীজ হয়ে ফিরে আসে, ফুল হয়ে ফোটে, ফল হয়ে জন্ম দেয় নতুন ভোরের। পিসিপি, তুমি সেই ভোরের প্রথম আলোকরেখা হয়ো।
তথ্যসূত্র: ১৯৮৯ সালে ১৫ জুলাই জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত ও প্রচারিত প্রতিবেদন।
- মে ০৪, ২০২৬
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী নৃগোষ্ঠী: হাজার বছরের ইতিহাস ও সমসাময়িক বাস্তবতা
পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের এক অনন্য ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক জনপদ। এই অঞ্চলের নৃগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিতর্ক সৃষ্টির অপচেষ্টা হলেও, দেশি-বিদেশি প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও নৃবিজ্ঞানীদের গবেষণা এবং দালিলিক প্রমাণ নিশ্চিত করে যে, এখানকার আদিবাসীরা এই ভূমির সাথে হাজার বছরের শিকড়ে আবদ্ধ। বিশেষ করে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ অন্যান্য নৃগোষ্ঠীর ধারাবাহিক ইতিহাস এই অঞ্চলের ভূমিজ সত্তার অকাট্য প্রমাণ দেয়।
চাকমা রাজবংশের ইতিহাস কোনো আধুনিক উদ্ভাবন নয়, বরং এটি দশম শতাব্দী থেকে বিদ্যমান একটি সুদীর্ঘ রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। ১০০০-১০২০ খ্রিস্টাব্দে রাজা বিজয় সিং এই রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক এইচ. এইচ. রিসলি (H.H. Risley) তাঁর ১৮৯১ সালে প্রকাশিত "The Tribes and Castes of Bengal" গ্রন্থে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন:
"চাকমারা পার্বত্য চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৃগোষ্ঠী এবং তারা নিজেদের এই ভূখণ্ডের আদি বাসিন্দা বলে দাবি করে, যাদের দশম শতাব্দী থেকে একটি নিরবচ্ছিন্ন রাজবংশীয় ইতিহাস রয়েছে।"
ড. নাগেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য তাঁর "The Chakma Race" (১৯৭৪) বইতে এই যুক্তিতে আরও যোগ করেন যে, চাকমারা আরাকান থেকে আসা কোনো অভিবাসী গোষ্ঠী নয়। বরং আরাকানের সাথে তাদের যে ঐতিহাসিক যোগাযোগ, তা ছিল একটি সাময়িক গৌণ ঘটনা মাত্র। তাদের মূল সভ্যতা অন্তত দশম শতাব্দী পর্যন্ত বিস্তৃত।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অন্যান্য প্রধান নৃগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাসও একইভাবে প্রাচীন।
• মারমা: প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী ড. গিয়াস উদ্দিন চৌধুরী (১৯৯২) দেখিয়েছেন যে, মারমারা মূলত চতুর্দশ শতাব্দী থেকেই এই অঞ্চলে বসবাস করছে। তাদের সাথে আরাকানের যোগসূত্র প্রধানত সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত, যা কোনোভাবেই অভিবাসন বা বহিরাগত বসতি স্থাপন হিসেবে গণ্য নয়।
• ত্রিপুরা: ঐতিহাসিক সি.ই. বাকল্যান্ড (১৯০৬) তাঁর গ্যাজেটিয়ারে লিখেছেন, ত্রিপুরারা ব্রিটিশ আমল শুরু হওয়ার বহু আগে থেকেই এখানে বসবাস করছে। সমতলের ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে তাদের সম্পর্ক থাকলেও পাহাড়ে তাদের অবস্থান বহু শতাব্দীর।
• ম্রো: ডক্টর রবার্ট উইনস্টেড (১৯১৭) তাঁর গবেষণায় আরও বিস্ময়কর তথ্য দিয়েছেন। তাঁর মতে, ম্রোরা সম্ভবত পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাচীনতম অধিবাসী, যারা এমনকি চাকমাদের আগমনের আগে থেকেই এই পাহাড়ের আদিম জনপদ গড়ে তুলেছিল।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল চাকমা-মারমাদের আবাস নয়, বরং এটি বহু জাতি ও ভাষার মিলনস্থল। ১৮৩০-এর দশকের ব্যাপটিস্ট মিশনারি রেকর্ড থেকে জানা যায় যে, বম জনগোষ্ঠী অনেক আগে থেকেই দক্ষিণ পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রকৃতিপূজারী হিসেবে বসবাস করছিল। ড. নাসির উদ্দীনের (২০০১) গবেষণা মতে, খুমি, খিয়াং, লুসাই এবং অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর উপস্থিতি প্রাগৈতিহাসিক যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। ভাষাগত দিক থেকেও এই বৈচিত্র্য অনন্য। ড. হাসান আহমেদ (২০০৮) তাঁর সমাজতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে, তঞ্চঙ্গ্যা ভাষা চাকমা ভাষা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এর নিজস্ব ব্যাকরণ ও উচ্চারণ পদ্ধতি রয়েছে, যা প্রমাণ করে এই প্রতিটি জাতি নিজস্ব স্বকীয়তা নিয়ে এখানে শতাব্দীর পর শতাব্দী টিকে আছে।
একটি ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে যে, বখতিয়ার খিলজির বাংলা বিজয়ের মাধ্যমে এই অঞ্চলের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমূল বদলে গিয়েছিল। তবে ঐতিহাসিক আব্দুল করিম (১৯৯২) তাঁর "History of Bengal: Mughal Period" গ্রন্থে স্পষ্ট করেছেন যে, বখতিয়ার খিলজির অভিযান মূলত বাংলা ও বিহারের সমতল অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। মধ্যযুগ জুড়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম স্বাধীন উপজাতীয় রাজাদের মাধ্যমেই শাসিত হয়েছে এবং বখতিয়ার খিলজি কখনোই পার্বত্য চট্টগ্রামে পা রাখেননি।
বিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামের এই সুপ্রাচীন জনতাত্ত্বিক কাঠামো এক বড় সংকটের মুখে পড়ে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (১৯৯২) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের (২০০১) প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশির দশক থেকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় হাজার হাজার বাঙালি সেটেলারদের সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর ফলে আদিবাসীদের নিজস্ব ভূমি থেকে বিচ্যুতি, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং সাংস্কৃতিক ধ্বংসযজ্ঞের মতো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।
প্রফেসর জেমস জে. ফ্রিডারস (২০০২) এই পরিস্থিতিকে 'রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় উপনিবেশায়ন' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, আদিবাসীদের 'অভিবাসী' হিসেবে প্রমাণের যে রাজনৈতিক বয়ান তৈরি করা হয়েছে, তা মূলত তাদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার একটি ঔপনিবেশিক হাতিয়ার মাত্র।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসীদের ইতিহাস কোনো অস্পষ্ট ধারণা নয়, বরং এটি রিসলি, বাকল্যান্ড বা আব্দুল করিমের মতো পণ্ডিতদের দ্বারা স্বীকৃত দালিলিক সত্য। তাদের নিজস্ব ভাষা, রাজবংশ এবং ভূমি অধিকার হাজার বছরের পুরনো। এই সত্যকে অস্বীকার করা কেবল ইতিহাস বিকৃতি নয়, বরং একটি প্রাচীন সভ্যতার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার শামিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত শান্তি ও উন্নয়নের জন্য এই ঐতিহাসিক সত্যকে গ্রহণ করে আদিবাসীদের ভূমির অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা অপরিহার্য।
- মে ০৩, ২০২৬
অমর কান্তি চাকমার রক্তে লেখা এক ইতিহাস
পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস শুধু পাহাড়, ঝরনা আর সবুজের গল্প নয়। এই মাটির প্রতিটি ইঞ্চিতে মিশে আছে হাজারো অমর কান্তির স্বপ্নভঙ্গের রক্ত। দিঘীনালার বাঘাইছড়ার নোয়া পাড়া গ্রামের দিনমজুর অমর কান্তি চাকমার জীবন সেই ইতিহাসেরই এক নিষ্ঠুর দলিল। যার শ্রমে দু-বেলা ভাত জুটত, যার চোখে ছিল সন্তানের মুখ দেখে দুঃখ ভোলার স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন ১৫ জুন ১৯৯২ সালে সেনাবাহিনীর বেয়নেটে খুন হয়।
অমর কান্তি চাকমা ছিলেন পেশায় দিনমজুর। দিন আনেন দিন খান — যে দিন কাজ নেই, সে দিন চুলাও জ্বলে না। তবুও স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার ছিল অপেক্ষার। অপেক্ষা এক নতুন প্রাণের, এক নতুন ভোরের। বছরের পর বছর আর্থিক টানাপোড়েন সয়েও তারা বিশ্বাস করত, সন্তানের মুখ দেখলে সব কষ্ট মুছে যাবে। ১৫ জুন ১৯৯২, সেই প্রতীক্ষিত দিনটি এল। ভোর থেকে স্ত্রীর প্রসব বেদনা শুরু। যন্ত্রণার মধ্যেও দুজনের চোখে আনন্দ — আজই তাদের কোল জুড়ে আসবে ফুটফুটে শিশু।
সকাল আটটা। নোয়া পাড়ার অদূরে শান্তিবাহিনী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। একজন সেনা সদস্য আহত হয় — এই খবর ছড়িয়ে পড়তেই গোটা এলাকায় আতঙ্ক নেমে আসে। পার্বত্য এলাকার মানুষ জানে, সংঘর্ষের পর কী হয়। প্রতিশোধের নামে গ্রামের পর গ্রাম জ্বলে, নিরীহ মানুষের রক্তে মাটি ভেজে। পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে সবাই যে যেদিকে পারে পালায়। কিন্তু অমর কান্তি পালাতে পারেননি। প্রসব বেদনায় কাতর স্ত্রীকে ফেলে কোন স্বামী পালায়? তাই তিনি অদৃষ্টের উপর ভরসা করে স্ত্রীর হাত ধরে বসে থাকেন, মিথ্যা সান্ত্বনা দেন — “ভয় নেই, কিছু হবে না”।
ঠিক তখনই বাবু ছড়া জোনের তৎকালীন জোন কমান্ডার লে. কর্নেল শাহার উদ্দীনের নেতৃত্বে একদল সেনা সদস্য নোয়া পাড়ায় ঢোকে। অসহায় অমর কান্তির উপর তারা ঝাঁপিয়ে পড়ে। প্রসব বেদনায় কাতর স্ত্রীর চোখের সামনে তাকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। যে ঘরে কিছুক্ষণ পর নতুন প্রাণের কান্না শোনার কথা, সে ঘর ভরে যায় রক্তের গন্ধে। স্বামীর নিথর দেহের পাশে শুয়ে থাকা সেই মা না পারলেন চিৎকার করতে, না পারলেন বাধা দিতে। তার গর্ভের শিশুটি পৃথিবীতে এল পিতার রক্তে ভেজা মাটিতে পা রেখে।
সেই দিন যে শিশুটি জন্ম নিল, তার কাছে বিধবা মা কী জবাব দেবে? পিতার রক্তের দাগ কি সে মুছতে পারবে? ইতিহাস বলে — না, পারবে না। কারণ এই রক্ত শুধু অমর কান্তির নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের হাজারো শিশু জন্ম নিয়েছে বাবার লাশের পাশে, মায়ের চোখের জলে। এই রক্ত তাদের পরিচয়, তাদের দায়। এই দায় ব্যক্তিগত প্রতিশোধের নয়, এটি ঐতিহাসিক দায় — অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর দায়। যে কালো হাত পাহাড়ের মানুষের অধিকার কেড়ে নেয়, সেই হাত ভেঙে দেওয়ার দায়। হারিয়ে যাওয়া অধিকারের সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনার দায়।
অমর কান্তি চাকমা চলে গেছেন, কিন্তু রেখে গেছেন একটি প্রশ্ন। পিতার রক্তের উপর জন্ম নেওয়া সেই শিশুরা আজ বড় হয়েছে। তারা বুকের ভেতর পুষে রেখেছে অপরিমেয় শক্তি। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ী জনপদের প্রতিটি ঘরে ঘরে এখনও সেই ১৫ জুন ফিরে আসে। অমর কান্তির মতো হাজারো নাম না জানা দিনমজুরের আত্মত্যাগ মনে করিয়ে দেয় — ন্যায়বিচার না আসা পর্যন্ত এই অপেক্ষার শেষ নেই। আমরাও সেই দিনটির অপেক্ষায়, যেদিন পাহাড়ের মাটিতে আর কোনো শিশুকে পিতার রক্তের উপর জন্ম নিতে হবে না।
তথ্যসূত্র: স্যাটেলাইট. ৬ অক্টোবর ১৯৯২
- মে ০৩, ২০২৬
চাঙমা বর্ণমালা: আত্মবিস্মৃত জাতির নিরব আত্মসমর্পণ
চাঙমা বর্ণমালা নিয়ে আজ যে প্রশ্ন—“এ থেকে লাভ কী?”—এটি আসলে সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্নগুলোর একটি। কারণ এই প্রশ্নের ভেতরেই লুকিয়ে আছে এক জাতির নিজের শিকড়কে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা করার মানসিকতা। যে জাতি নিজের লিপিকেই “অপ্রয়োজনীয়” ভাবতে শেখে, তাকে আর বাইরে থেকে ধ্বংস করার প্রয়োজন পড়ে না—সে নিজেই নিজের ইতিহাস মুছে ফেলে।
বাস্তবতা আরও নির্মম। চাঙমা সমাজের বিপুল অংশ আজ নিজেদের বর্ণমালা চিনে না। এটিই কোনো সাধারণ অজ্ঞতা নয়—এটি একটি সাংস্কৃতিক পতনের দলিল। আর যাঁদের আমরা ‘সচেতন’ বলি, তাঁদের বড় অংশই এই বিচ্ছিন্নতার বাইরে নন। প্রশ্ন তাই তীক্ষ্ণভাবে ফিরে আসে—যে নিজের বর্ণমালাই পড়তে জানে না, সে কোন অর্থে সচেতন?
একসময় এই জাতির জীবন ছিল নিজস্ব লিপিতে বোনা। কবিতা, বারমাস, পালাগান, এমনকি দৈনন্দিন হিসাব—সবই লেখা হতো নিজেদের বর্ণমালায়। ভাষা ছিল জীবনের শ্বাস, আর লিপি ছিল তার দৃশ্যমান শরীর। কিন্তু সেই শরীরকে আমরা ধীরে ধীরে অস্বীকার করেছি। চাঙমা রাজবাড়ি-এর ঐতিহাসিক সাংস্কৃতিক পরিসর থেকে শুরু হয়ে, গৌরিকা-এর মতো বাংলা-নির্ভর প্রকাশনার বিস্তারে যে প্রবণতা গড়ে ওঠে, তা একসময় সাংস্কৃতিক দাসত্বের রূপ নেয়। বাংলা শেখা দোষ নয়—কিন্তু নিজের বর্ণমালাকে বিসর্জন দিয়ে অন্য ভাষার ছায়ায় আত্মপরিচয় খোঁজা নিঃসন্দেহে পরাজয়ের নামান্তর।
আজ প্রযুক্তির যুগে চাঙমা বর্ণমালা লেখা সবচেয়ে সহজ। ডিজিটাল ফন্ট, মোবাইল, কম্পিউটার—সবই হাতের মুঠোয়। তবুও আমরা লিখি না। কারণ সমস্যাটি প্রযুক্তির নয়, মানসিকতার। যে মানসিকতা নিজের লিপিকে গুরুত্বহীন মনে করে, তাকে কোনো প্রযুক্তি উদ্ধার করতে পারে না।
এখানে দায় চাপিয়ে দেওয়ার খেলা দীর্ঘদিন ধরে চলছে—রাষ্ট্রের দিকে, সমাজের দিকে, নীতিনির্ধারকদের দিকে। রাষ্ট্রের অবহেলা সত্য, সামাজিক উদাসীনতাও সত্য। কিন্তু সবচেয়ে কঠিন সত্য হলো—আমরা নিজেরাই এই পরাজয়কে স্বাভাবিক করে নিয়েছি। নিজেরাই নিজেদের ভাষাকে “ঐচ্ছিক সংস্কৃতি” বানিয়ে ফেলেছি। এই আত্মসমর্পণের চেয়ে ভয়ংকর আর কিছু নেই।
জাতপ্রেম, দেশপ্রেম যদি কেবল বক্তৃতা, দিবস আর স্লোগানে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা কেবল আত্মপ্রবঞ্চনা। নিজের বর্ণমালাকে প্রতিদিনের জীবনে ফিরিয়ে না আনা মানে—নিজের ইতিহাসকে চুপচাপ কবর দেওয়া।
আজ প্রশ্ন তাই আর নিরীহ নয়। প্রশ্ন এখন সরাসরি আঘাত করে—আমরা কি নিজেরাই নিজের বর্ণমালার কফিন বহন করছি না? কারণ সত্য হলো, কোনো জাতিকে ধ্বংস করতে বাইরে থেকে আক্রমণ প্রয়োজন হয় না, যদি সেই জাতি নিজেই নিজের ভাষাকে অব্যবহৃত করে তোলে।
চাঙমা বর্ণমালা আজ আমাদের সামনে কেবল একটি লিপি নয়—এটি একটি পরীক্ষা। এই পরীক্ষা উত্তীর্ণ না হলে, আমরা ধীরে ধীরে শুধু ভাষাহীনই নই, ইতিহাসহীন এক নামমাত্র পরিচয়ে পরিণত হব।
- মে ০১, ২০২৬
১ মে: অধিকার, শান্তি ও শ্রমের এক ঐতিহাসিক সমাপতন
সত্যের এক সহজাত শক্তি আছে; একে সাময়িকভাবে অবদমিত করে রাখা গেলেও শেষ পর্যন্ত তা আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হয়। ঠিক তেমনি, অন্যায়ের ভিত যতই গভীর হোক না কেন, তা কখনো চিরস্থায়ী হতে পারে না। ইতিহাসের এই অমোঘ সত্যই আমাদের শেখায় অতীতকে মূল্যায়ন করতে এবং বর্তমানকে অনুধাবন করতে। বিশেষ করে ২০২৬ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রেক্ষাপটে ১ মে তারিখটি এক অনন্য ঐতিহাসিক সমাপতনের নাম, যেখানে প্রশাসনিক দলিল, আধ্যাত্মিক শান্তি এবং শ্রমের অধিকার মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম কেবল একটি ভৌগোলিক ভূখণ্ড নয়, বরং এটি ১১টি জুম্ম জাতিগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি ও দীর্ঘ ইতিহাসের এক জীবন্ত সংগ্রহশালা। এই অঞ্চলের প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামোর বিবর্তনে ১৯০০ সালের 'Chittagong Hill Tracts Regulation' একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ১ মে তারিখে কার্যকর হওয়া এই আইনটি এই অঞ্চলের ভূমি অধিকার এবং স্বতন্ত্র প্রশাসনিক সত্তার ঐতিহাসিক ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। সময়ের পরিক্রমায় এই আইনের প্রয়োগ নিয়ে নানা বিতর্ক বা আলোচনা থাকলেও, এটি যে এই অঞ্চলের ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
এই দিনটির গুরুত্ব আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয় শুভ বুদ্ধ পূর্ণিমা। গৌতম বুদ্ধের জন্ম, বোধি লাভ এবং মহাপরিনির্বাণের স্মৃতিবিজড়িত এই তিথিটি বিশ্বজুড়ে শান্তি, অহিংসা ও করুণার বাণী প্রচার করে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীর কাছে এটি কেবল একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং তাদের সাংস্কৃতিক ও জাতিগত পরিচয়ের এক গভীর আধ্যাত্মিক বহিঃপ্রকাশ। বুদ্ধের প্রদর্শিত মৈত্রী ও সাম্যের পথ আজও আমাদের এই অঞ্চলে শান্তি ও সহাবস্থানের প্রেরণা জোগায়।
এই আধ্যাত্মিক ও ঐতিহাসিক আবহের সাথে যুক্ত হয়েছে বিশ্বব্যাপী পালিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। শিকাগোর শ্রমিকদের রক্তঝরা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সভ্যতার প্রতিটি ইট ও পাথরে মিশে আছে শ্রমজীবী মানুষের ঘাম। শ্রমের ন্যায্য অধিকার, সামাজিক মর্যাদা এবং শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের যে ডাক মে দিবস দেয়, তা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের ন্যায়বিচারকামী মানুষের জন্য চিরকাল প্রাসঙ্গিক।
১ মে তারিখটি যখন এই তিনটি ভিন্ন মাত্রাকে ধারণ করে, তখন তা আর কেবল একটি সাধারণ ছুটির দিন থাকে না। এটি হয়ে ওঠে একটি বহুমাত্রিক চেতনার প্রতীক:
• ন্যায়বিচার: যা ১৯০০ সালের রেগুলেশনের আইনি কাঠামোর সাথে যুক্ত।
• শান্তি: যা বুদ্ধের বাণীর মাধ্যমে অন্তরে প্রবেশ করে।
• অধিকার: যা মে দিবসের সংগ্রামী চেতনার মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়।
এই ত্রিমাত্রিক চেতনা আমাদের শেখায় বৈচিত্র্যকে সম্মান করতে এবং মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে।
পরিশেষে বলা যায়, ১ মে আমাদের সামনে এক গভীর আত্মজিজ্ঞাসা ছুড়ে দেয়। সত্যকে ধারণ করে এবং অন্যায়কে বর্জন করে আমরা কেমন সমাজ গড়তে চাই? পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমগ্র বিশ্বের জন্য এই দিনটির শিক্ষা হলো—শান্তি, ন্যায্যতা এবং পারস্পরিক সহাবস্থানই একটি স্থিতিশীল ও মানবিক সমাজ গঠনের একমাত্র পথ। যেখানে মানুষের পরিচয় হবে তার মানবিকতায়, আর সমাজ পরিচালিত হবে সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে।
- মে ০১, ২০২৬
পার্বত্য চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিন: দুই দশকের সাহিত্যিক মানচিত্র (১৯৭২–১৯৯১)
‘লিটল ম্যাগাজিন’—এই শব্দবন্ধটির কোনো যুৎসই বাংলা প্রতিশব্দ আজও স্থির হয়নি। একে ‘ক্ষুদে সাহিত্যপত্র’ বলা গেলেও, তাতে এর বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি, বিদ্রোহী মনন ও সৃজনশীল দায়বদ্ধতার সম্পূর্ণ প্রতিফলন ঘটে না। বাংলা সাহিত্যের পরিসরে ‘লিটল ম্যাগাজিন’ আজ চেয়ার–টেবিলের মতোই পরিচিত ও স্বীকৃত এক সাংস্কৃতিক পরিভাষা। প্রাবন্ধিক আবদুল মান্নান সৈয়দের ভাষায়, লিটল ম্যাগাজিন হলো সেই অপ্রতিষ্ঠানিক, অ-ব্যবসায়িক এবং প্রতিবাদী চেতনা-উদ্ভূত প্রকাশনা, যা মূলধারার সাহিত্যচর্চার বাইরে দাঁড়িয়ে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও মননের চারপাশে আবর্তিত হয়।
বাংলা সাহিত্যে ষাটের দশকে ঢাকাকেন্দ্রিক যে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল, তার ঢেউ পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে লাগে স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই। ১৯৭২ সাল থেকে এই অঞ্চলে লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশের প্রথম সুস্পষ্ট চিহ্ন পাওয়া যায়। দুর্গম ভৌগোলিক বাস্তবতা, প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্যপত্রিকার অনুপস্থিতি এবং সাংস্কৃতিক অবহেলার মধ্যেই পার্বত্য জনপদের তরুণরা তাদের সৃজনশীল অভিব্যক্তির আশ্রয় খুঁজে নেয় এই ক্ষুদ্র অথচ তাৎপর্যপূর্ণ প্রকাশনাগুলোতে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, সদ্য গড়ে ওঠা শিক্ষক সমাজ এবং সচেতন তরুণদের হাত ধরেই এখানে লিটল ম্যাগাজিন আন্দোলনের যাত্রা শুরু হয়। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও গতানুগতিকতার বাইরে নতুন কিছু করার তাড়না থেকেই জন্ম নেয় এসব সাহিত্যপত্র।
গবেষণালব্ধ তথ্যানুযায়ী, ১৯৭২ থেকে ১৯৯১—এই দুই দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলা থেকে মোট ২৮৯টি লিটল ম্যাগাজিন ও সাহিত্য সংকলনের সন্ধান পাওয়া যায়। বিষয়বস্তু ও প্রকাশক সংগঠনের প্রকৃতি অনুযায়ী এই বিপুল প্রকাশনাধারাকে সাতটি প্রধান শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠন থেকে প্রকাশিত হয় ৭৮টি সংকলন; ক্রীড়া, সামাজিক ও কল্যাণমূলক সংগঠন থেকে ৫৬টি; রাজনৈতিক ও ছাত্র সংগঠন থেকে ৩৫টি; বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠান থেকে ৩৮টি; শিশু ও কিশোর সংগঠন থেকে ১৩টি; এবং অন্যান্য ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে প্রকাশিত হয় মোট ৬৯টি সংকলন। এই সংখ্যাতাত্ত্বিক বিস্তারই প্রমাণ করে, পার্বত্য চট্টগ্রামের সাহিত্যচর্চা কতটা প্রাণবন্ত ও বহুমাত্রিক ছিল।
এই আন্দোলনে কয়েকটি সংগঠনের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭২ সালে রাঙ্গামাটি থেকে প্রকাশিত জুভাপ্রদের উদ্যোগে সন দেওয়ান সম্পাদিত ‘বিজু’ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রথম লিটল ম্যাগাজিন হিসেবে ইতিহাসে স্থান করে নেয়। প্রকল্পনা সাহিত্যাঙ্গন সর্বাধিক আটাশটি প্রকাশনা বের করে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে; শাহরীয়ার রুমী সম্পাদিত ‘রৌদ্রদগ্ধের গান’ এবং নন্দলাল শর্মা সম্পাদিত ‘প্রথম আশার রশ্মি’ এই ধারার স্মরণীয় সংকলন। জুম পাহাড়ের ঐতিহ্য, জীবনবোধ ও সাহিত্যচর্চাকে কেন্দ্র করে জুম ঈসথেটিকস কাউন্সিল (জাক) এক গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ভূমিকা পালন করে। অপরদিকে, ১৯৮৮ সালে গঠিত বান্দরবান সাহিত্যাঙ্গন ‘রক্তাক্ত একুশে’ ও ‘অরণ্য কমল’-এর মতো মানসম্পন্ন সংকলনের মাধ্যমে এই আন্দোলনকে সমৃদ্ধ করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিনগুলো কেবল কবিতার খাতা বা সৃজনশীল পরীক্ষাগার ছিল না; এগুলোর ভেতর গভীরভাবে উপস্থিত ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা ও প্রতিবাদী চেতনা। বিঝু, বিহু, বিষু, সাংগ্রাই ও বৈসুকের মতো আঞ্চলিক উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত বহু সংকলন পাহাড়ি জনজীবনের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্যকে তুলে ধরে। ‘সপ্তবর্ণ’, ‘রেঁনেসা’, ‘পাজন’-এর মতো সংকলনে এই উৎসবচেতনার শিল্পিত প্রতিফলন দেখা যায়। আবার ‘পাহাড়িকা গুঞ্জন’ বা ‘পাহাড়ী’-র মতো সংকলনে উঠে আসে জাতিসত্তা, আঞ্চলিক ইতিহাস এবং পাহাড়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট নিয়ে গবেষণামূলক প্রবন্ধ। একুশে ফেব্রুয়ারি ও বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে প্রকাশিত সংকলনগুলোতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তরুণদের সংগ্রামী মনন ও প্রতিবাদী স্বর।
তবে এই আন্দোলনের পথচলা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। প্রধান অন্তরায় ছিল অর্থনৈতিক সংকট। উদ্যোক্তারা ছাত্রজীবন শেষ করার পর বাস্তব জীবনের চাপে পড়ে অনেক সময় সংগঠন ধরে রাখতে পারেননি। ফলে বহু লিটল ম্যাগাজিন দীর্ঘজীবী হয়নি। মুদ্রণ ব্যয় কমাতে সাইক্লোস্টাইল বা ফটোস্ট্যাটে ছাপিয়ে নামমাত্র মূল্যে প্রকাশ ছিল সাধারণ ঘটনা। যথাযথ সংরক্ষণের অভাব, সম্পাদকের নাম বা প্রকাশকাল অনুল্লেখিত থাকার কারণে আজ গবেষকদের কাছে বহু মূল্যবান তথ্য দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে।
তবু এসব সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করেই পার্বত্য চট্টগ্রামের বাংলা সাহিত্যচর্চার বিকাশে লিটল ম্যাগাজিনগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। আজকের বহু প্রতিষ্ঠিত পাহাড়ি কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিকের সাহিত্যযাত্রার প্রথম পাঠশালা ছিল এই ক্ষুদ্র সাহিত্যপত্রগুলো। ১৯৭২ থেকে ১৯৯১—এই দুই দশকের লিটল ম্যাগাজিনসমূহ পার্বত্য জনপদের সাহিত্যিক জাগরণ, সাংস্কৃতিক আত্মপরিচয় ও সৃজনশীল প্রতিরোধের এক অমূল্য ঐতিহাসিক দলিল হয়ে আজও আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
________________________________________
তথ্যসূত্র:
নন্দলাল শর্মা, পার্বত্য চট্টগ্রামের লিটল ম্যাগাজিন
- এপ্রিল ৩০, ২০২৬
ঝার বাজ্যেই হরিং ধাবানা
চাঙমা প্রবাদ— “ঝার বাজ্যেই হরিং ধাবানা”—এর অর্থ, ছোট্ট বিষয়ে বড়সড় কাজ সাধন করা। সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতায় এই প্রবাদটির প্রাসঙ্গিকতা ভয়াবহভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গত ৬ এপ্রিল ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে রাঙামাটি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মানবাধিকারকর্মী ও চাকমা সার্কেলের উপদেষ্টা রাণী ইয়েন ইয়েনকে দেওয়া একটি তথাকথিত “সতর্কপত্র” তারই জ্বলন্ত প্রমাণ।
রাঙামাটির জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট নাজমা আশরাফী কোনো নির্দিষ্ট আইন উল্লেখ না করেই “আইন মেনে চলার” নির্দেশ দিয়ে যে নোটিশ প্রদান করেছেন, তা প্রশাসনিক শালীনতার পরিপন্থী এবং স্পষ্টতই ক্ষমতার অপব্যবহার। এই নোটিশের মাধ্যমে একজন নাগরিককে ভীত করা হয়েছে, কিন্তু তার বিরুদ্ধে কী অপরাধ, কোন আইনে, কীভাবে—তার কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা নেই।
এই বিষয়ে প্রথম আলো (আজ প্রতিবেদন)-কে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় বিশিষ্ট মানবাধিকারকর্মী নূর খান যথার্থভাবেই মন্তব্য করেছেন যে, এই চিঠি মানুষের কণ্ঠরোধের একটি পরোক্ষ প্রচেষ্টা এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে অতীতেও এ ধরনের দমনমূলক চর্চা চালু ছিল। তাঁর ভাষায়, “আমরা ক্রমান্বয়ে পূর্বের দিকেই ফিরে যাচ্ছি”—যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো—রাণী ইয়েন ইয়েন তাঁর আইনজীবীর মাধ্যমে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে নোটিশের লিখিত জবাব পাঠালেও প্রশাসন দাবি করেছে যে তারা সেটি পায়নি। অথচ সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সারা হোসেন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ই–মেইলের মাধ্যমে জবাব পাঠানো হয়েছে এবং নোটিশটি “অস্পষ্ট, অস্বচ্ছ ও ভিত্তিহীন অভিযোগে ভরা”, যা কার্যত মানহানির শামিল।
তিনি যথার্থভাবেই প্রশ্ন তুলেছেন—একটি দমনমূলক সময় থেকে বেরিয়ে আসার কথা যখন বলা হচ্ছে, তখন কেন আবার ভয়ভীতি প্রদর্শনমূলক অস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হবে?
রাঙামাটি জেলা প্রশাসন যেখানে রাণী ইয়েন ইয়েনকে “ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর” অভিযোগে নোটিশ দিচ্ছে, সেখানে একই অভিযোগকে কেন্দ্র করে অগাস্টিনা চাকমা ও চঞ্চনা চাকমার বিরুদ্ধে ঢাকা ও তিন পার্বত্য জেলায় সেটেলার বাঙালিদের বিক্ষোভ মিছিল রাষ্ট্রের নীরবতায় আরও ভয়ংকর রূপ নিয়েছে।
খাগড়াছড়িতে অনুষ্ঠিত একটি বিক্ষোভে সাম্প্রদায়িক ও হত্যার হুমকিমূলক স্লোগান— “একটা একটা সন্তু ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর”—উচ্চারিত হওয়া কেবল আইনশৃঙ্খলার ব্যর্থতাই নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতার নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্ন হলো, বাকস্বাধীনতার অভিযোগে একজন আদিবাসী নারী মানবাধিকারকর্মী নোটিশ পান, অথচ প্রকাশ্য হত্যার হুমকি দেওয়া উগ্র গোষ্ঠীগুলো নির্বিঘ্নে রাস্তায় নামে—এ কেমন ন্যায়বিচার?
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল চেতনা ছিল বাকস্বাধীনতা ও মানবিক মর্যাদা রক্ষা। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখছি, পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে উগ্রপন্থী ও মৌলবাদী অপশক্তির তৎপরতা ক্রমেই বাড়ছে। রাণী ইয়েন ইয়েনকে দেওয়া নোটিশ স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেয়—এই অপশক্তিগুলোর চাপ রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে।
এটি শুধু একজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়; এটি পার্বত্য অঞ্চলের জুম্ম জনগোষ্ঠীর সামষ্টিক কণ্ঠরোধের একটি কৌশল হিসেবেই প্রতীয়মান হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মৌলিক বৈশিষ্ট্যই ছিল এই অঞ্চলকে জুম্ম অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তার স্বাতন্ত্র্য রক্ষায় আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা। কিন্তু আজ সেই চুক্তির চেতনাকে উপেক্ষা করে উগ্রবাদী ও মৌলবাদী শক্তিকে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে জুম্ম জনগণের বাকস্বাধীনতা ও ন্যূনতম মৌলিক অধিকার হরণ করা হলে, এই অঞ্চল অনিবার্যভাবেই অস্থিতিশীলতার দিকে ধাবিত হবে।
বস্তুতপক্ষে, এই ধরনের নোটিশ ও দমনমূলক আচরণ মানুষকে মানুষ হিসেবে সম্মান দেখানোর শামিল নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো—প্রতিটি নাগরিককে তার ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা, ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া নয়। সরকারকে অবশ্যই এই পথ থেকে সরে আসতে হবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের যে আশঙ্কাজনক ধারা তৈরি হচ্ছে, তা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। অন্যথায়, “ঝার বাজ্যেই হরিং ধাবানা”—এই প্রবাদটি কেবল কথায় নয়, বাস্তব ইতিহাসের নির্মম সত্য হয়ে উঠবে।
- এপ্রিল ২৭, ২০২৬
“আমাদের সংগ্রাম অদম্য, আমাদের লক্ষ্য অবিচল”
পাহাড় কেবল মাটি-পাথরের স্তূপ নয়; এটি একটি সভ্যতা, একটি সংস্কৃতি, একটি জাতিসত্তার পরিচয়। যুগ যুগ ধরে চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বঞ্চনা, ভূমি বেদখল ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার। “যতই ভয় দেখাও, দমিয়ে রাখা যাবে না; পাহাড় জাগছে তার অধিকারের দাবিতে!”—রাণী ইয়ান ইয়ানের এই উচ্চারণ সেই জাগরণেরই প্রতিধ্বনি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ যখন অধিকার আদায়ে রুখে দাঁড়ায়, তখন তা আর নিছক দাবি থাকে না, হয়ে ওঠে অস্তিত্বের সংগ্রাম।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস গৌরবের, আবার বেদনারও। তাদের নিজস্ব সামাজিক কাঠামো, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও শাসনরীতি ছিল শতাব্দীপ্রাচীন। কিন্তু উপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোতে ধীরে ধীরে তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমি অধিকার খর্ব হয়েছে। উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ, বন ও পর্যটন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ, এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব পাহাড়ি জীবনকে ক্রমশ কোণঠাসা করেছে। রাণী ইয়ান ইয়ান স্পষ্ট করে বলেছেন—এই শোষণের বিরুদ্ধে পাহাড় আজ জেগেছে, কারণ অধিকার হারানোর জন্য নয়, আদায়ের জন্য তারা লড়তে শিখেছে।
রাণী ইয়ান ইয়ানের ঘোষণায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর চারটি মৌলিক দাবি উঠে এসেছে। এগুলো কোনো করুণা নয়, বরং সাংবিধানিক ও মানবিক অধিকার:
১. ঐতিহ্যবাহী ভূমি অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা: প্রথাগত জুমচাষ, বন ও গ্রামের সামাজিক মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া; ভূমি কমিশন কার্যকর করা
২. ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ: মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান রক্ষা, উৎসব ও রীতিনীতির স্বীকৃতি
৩. স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকারে প্রকৃত ক্ষমতায়ন, সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব
৪. শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের ন্যায্য অংশ: পাহাড়ের ভূ-প্রকৃতি উপযোগী শিক্ষা-স্বাস্থ্য অবকাঠামো, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ, কর্মসংস্থানে কোটা বাস্তবায়ন
“শুনুন হে জেলা প্রশাসক!”—এই সম্বোধন কেবল একজন কর্মকর্তার প্রতি নয়, সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি। প্রতিবাদের আগুন ভয় দেখিয়ে নেভানো যাবে না। পাহাড়ি জনগণের এই জাগ্রত চেতনা উপেক্ষা করলে তা নতুন ইতিহাস রচনা করবে—যে ইতিহাস হবে অধিকার আদায়ের। তাই প্রশাসনকে যৌক্তিক দাবিসমূহ অনুধাবন করে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আলোচনার দরজা খোলা আছে, কিন্তু নিষ্ক্রিয়তা বা দমন-পীড়ন গ্রহণযোগ্য নয়।
এই লড়াই আবেগের নয়, অস্তিত্বের। “বুকের রক্ত দিয়ে হলেও আমাদের অধিকার রক্ষা করব”—এই পঙক্তি প্রমাণ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী আর পিছু হটবে না। তাদের সংগ্রাম অদম্য কারণ লক্ষ্য অবিচল: মর্যাদা ও সম-অধিকার নিয়ে বাঁচা। রাষ্ট্রের মূল স্রোতে থেকেও নিজস্ব পরিচয়ে বিকশিত হওয়ার অধিকার তাদের জন্মগত।
রাণী ইয়ান ইয়ানের বক্তব্য একটি ঘোষণাপত্র—নিপীড়নের বিরুদ্ধে, আত্মমর্যাদার পক্ষে। পাহাড়ের অধিকার মানে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যের সুরক্ষা। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভাষা, রাজনীতি ও অর্থনীতির অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। পাহাড় জেগেছে। এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই জাগরণকে সম্মান জানিয়ে ন্যায়ভিত্তিক সমাধানে এগিয়ে আসা।
- এপ্রিল ২৫, ২০২৬
বাকস্বাধীনতা ও অধিকারের লড়াই
একটি স্বাধীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের মৌলিক অধিকার হলো তার স্বাধীন মতপ্রকাশ। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সত্য যে, যখনই কেউ নিজের ন্যায্য অধিকার বা সিস্টেমের ত্রুটি নিয়ে কথা বলে, তখনই তাকে 'সতর্কবার্তা' বা 'রাষ্ট্রদ্রোহের' তকমা দিয়ে মুখ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়। রাঙামাটি জেলা প্রশাসকের সাম্প্রতিক চাঙমা রাণী ইয়েন ইয়েনকে সতর্কবার্তা বা এ জাতীয় প্রশাসনিক পদক্ষেপগুলো আমাদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করিয়ে দিয়েছে—আমরা কি সত্যিই একটি স্বাধীন দেশে বাস করছি, নাকি ভিন্নমতের কণ্ঠরোধ করার সেই পুরনো ঔপনিবেশিক সংস্কৃতিতেই আটকে আছি?
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, শোষক গোষ্ঠী সবসময়ই সত্য উচ্চারণকারীকে 'সন্ত্রাসী' বা 'রাষ্ট্রদ্রোহী' হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত—বাংলার দামাল ছেলেরা যখনই অধিকারের কথা বলেছে, তখনই তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী তাদের রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। বঙ্গবন্ধু থেকে শুরু করে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা, সবার বিরুদ্ধেই একসময় রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা ছিল। আজ বাংলাদেশ স্বাধীন। কিন্তু পরিহাসের বিষয় হলো, ৫৪ বছর পরেও স্বাধীন বাংলাদেশে নিজের অধিকারের কথা বললে সেই একই 'রাষ্ট্রদ্রোহ' বা 'সতর্কবার্তা'র মুখোমুখি হতে হয়। যে কালচার পাকিস্তানি শাসনামলে ছিল, তার প্রতিফলন স্বাধীন বাংলাদেশে কাম্য নয়।
জেলা প্রশাসন বা রাষ্ট্রের যেকোনো অঙ্গের দায়িত্ব হলো নাগরিকের অধিকার রক্ষা করা, অধিকার হরণ করা নয়। একজন নাগরিক যখন তার জীবন, জীবিকা বা আঞ্চলিক সমস্যা নিয়ে কথা বলেন, তখন তাকে আইনি ভয় দেখানো বা সতর্কবার্তা দেওয়া স্পষ্টতই বাকস্বাধীনতার পরিপন্থী। সংবিধানে স্বীকৃত 'বাক ও ভাবপ্রকাশের স্বাধীনতা' কোনো দয়া নয়, বরং এটি নাগরিকের জন্মগত অধিকার। অধিকারের কথা বলা যদি রাষ্ট্রদ্রোহ হয়, তবে বুঝতে হবে গণতন্ত্রের সংজ্ঞাটিই সেখানে সংকটাপন্ন।
বর্তমান যুগে দাঁড়িয়ে একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তা পরিমাপ করা হয় সেই রাষ্ট্রের নাগরিকরা কতটা নির্ভয়ে কথা বলতে পারে তার ওপর ভিত্তি করে। ভয়ের সংস্কৃতি বা 'কালচার অফ ফিয়ার' তৈরি করে সাময়িকভাবে কাউকে চুপ করানো যেতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা রাষ্ট্রের জন্য মঙ্গলজনক নয়। সমালোচনাই হলো গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। সমালোচনাকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করলে রাষ্ট্রের মৌলিক স্তম্ভগুলোই দুর্বল হয়ে পড়ে।
দেশ স্বাধীন হয়েছে শোষণের শৃঙ্খল ভাঙার জন্য, নতুন কোনো শৃঙ্খলে আবদ্ধ হওয়ার জন্য নয়। রাঙামাটি বা দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষ যখন তার অধিকারের কথা বলে, তখন তা রাষ্ট্রদ্রোহ নয় বরং দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মনে রাখা উচিত, তারা জনগণের সেবক, মালিক নন। বাকস্বাধীনতাকে রুদ্ধ করে কোনো দেশ উন্নত হতে পারে না। আমরা এমন এক বাংলাদেশ চাই যেখানে অধিকারের কথা বললে হাতে 'সতর্কবার্তা' নয়, বরং 'সমাধান' এসে পৌঁছাবে।
- এপ্রিল ২৫, ২০২৬
পাহাড়ের ভোর, তবুও আঁধার
পার্বত্য চট্টগ্রামের সুউচ্চ পাহাড়গুলোতে যখন ভোরের প্রথম আলো এসে পড়ে,তখন প্রকৃতির সেই স্নিগ্ধতা জুম্ম নারী ও শিশুদের মনে প্রশান্তিআনেনা; বরং নিয়ে আসে এক অজানা শঙ্কা জাতিসংঘের আদিবাসী বিষয়ক স্থায়ী ফোরামের ২৫তম অধিবেশনে পিসিজেএসএস- এর প্রতিনিধি অগাস্টিনা চাকমা যখন বলেন- ”তারা জানে না পরবর্তী হামলা থেকে বেঁচে থাকতে পারবে কিনা"—তখন সভ্যতার সব আস্ফালন থমকে দাঁড়ায়।পাহাড়ের বুক চিরে প্রবহমান ঝর্ণার শব্দের চেয়েও সেখানে এখন ভারী হয়ে উঠেছে মানুষের হাহাকার।
১৯৯৭ সালের সেই ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি ছিল এক দীর্ঘ যুদ্ধের অবসানে শান্তির নীল নকশা। সেখানে প্রতিশ্রুতি ছিল আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের, স্বপ্ন ছিল নিজের ভূমির মালিকানা ফিরে পাওয়ার আর সংকল্প ছিল নিজস্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সুরক্ষা। কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টেছে, সময় গড়িয়েছে, অথচ সেই প্রতিশ্রুতির শিকলগুলো আজ জীর্ণ। অগাস্টিনা চাকমার বক্তব্যে উঠে এসেছে এক রূঢ় সত্য—চুক্তির সেই প্রতিশ্রুতিগুলো আজ ভাঙা কাঁচের মতো ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পাহাড়ি পথে, যা প্রতিনিয়ত জুম্ম প্রান্তিক মানুষের রক্ত ঝরাচ্ছে।
আমরা সমতলে বসে যে সূর্যোদয়কে নতুনের আবাহন মনে করি, পাহাড়ে সেই সূর্যোদয় বয়ে আনে অনিশ্চয়তা। সেখানে প্রতিদিন ভোর হয় ঠিকই, কিন্তু জুম্ম জীবনের আকাশে অন্ধকারের ঘনঘটা কাটে না। সহিংসতা আর বঞ্চনা সেখানে নিত্যসঙ্গী। যে ভূমিতে তাদের পূর্বপুরুষের হাড় মিশে আছে, সেই ভূমি আজ তাদের কাছে পরবাসী। এই অস্তিত্বের সংকট কেবল লাঞ্ছনা নয়, বরং একটি জাতির শিকড় উপড়ে ফেলার নামান্তর।
অগাস্টিনা চাকমার এই সাহসী উচ্চারণ আমাদের স্তব্ধ করে দেয়, কিন্তু একইসাথে আমাদের ভেতরের ঘুমন্ত বিবেককে নাড়া দেয়। এই প্রগাঢ় অন্ধকার দূর করার দায়ভার আজ বর্তমান প্রজন্মের। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, শোষণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো সচেতনতা এবং ঐক্য। "পাহাড়ের এই দীর্ঘস্থায়ী অন্ধকার দূর করতে হলে সেই প্রজন্মকে জেগে উঠতে হবে, যাদের হৃদয়ে নিজের শিকড়ের প্রতি টান আছে।"
শেকড়হীন মানুষ যেমন ঝড়ে টিকে থাকতে পারে না, তেমনি নিজের অধিকার ও সংস্কৃতি সম্পর্কে উদাসীন জাতি কখনো মুক্তি পায় না। পাহাড়ের প্রতিটি জুম্ম নারী ও শিশুর চোখে যে অনিশ্চয়তার ছায়া, তা মোছার জন্য প্রয়োজন এক নতুন জাগরণ—যে জাগরণ কেবল চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন নয়, বরং মানুষের মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্ব নিশ্চিত করবে।
অগাস্টিনা চাকমা কেবল এক প্রতিনিধি নন, তিনি পাহাড়ের কণ্ঠস্বর। তাঁর সেই "সুন্দর অথচ বেদনাবিধুর" কথাগুলো আজ ধূলিকণায় মিশে যেতে দেওয়া চলে না। পাহাড়ের চূড়ায় ভোরের সত্যিকারের আলো তখনই পৌঁছাবে, যখন প্রতিটি শিশু নির্ভয়ে ঘুম থেকে উঠবে এবং প্রতিটি নারী ঘরে ফেরার নিশ্চয়তা পাবে। শিকড়ের টানে, অস্তিত্বের লড়াইয়ে নতুন প্রজন্মকে সেই মশাল হাতে নিতে হবে যা এই দীর্ঘ অন্ধকারকে চিরতরে নির্বাসিত করবে।
অন্ধকার যতই গভীর হোক, পাহাড়ের বুক চিরে সত্যের সূর্য একদিন উদিত হবেই—এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।
- এপ্রিল ২৪, ২০২৬
একটি জনপদের অস্তিত্ব রক্ষার মহাকাব্য
পাহাড় কি তবে তার শেষ নিঃশ্বাসটুকুও হারিয়ে ফেলবে? আজ এই প্রশ্নটি কেবল ধূলিকণা বা মেঘের আনাগোনা নয়, বরং এক আদিম জনপদের অস্তিত্বের সংকটে থমকে দাঁড়িয়ে থাকা আর্তনাদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিভৃত অরণ্য আর মেঘের আড়ালে যে মানুষগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী পরম মমতায় প্রকৃতিকে আগলে রেখেছে, আজ তারা নিজ ভূমিতেই পরবাসী হওয়ার আশঙ্কায় কম্পমান। শতবর্ষী এক রক্ষাকবচ—Chittagong Hill Tracts Regulation, 1900—আজ যেন এক অদৃশ্য ঘাতকের নজরে পড়েছে। একে রক্ষা করা আজ কেবল আইনি লড়াই নয়, বরং একটি বিলীয়মান সংস্কৃতির শেষ দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বাঁচার লড়াই।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলেও এই সত্যটি স্বীকৃত ছিল যে—পাহাড় আলাদা, পাহাড়ের মানুষ আলাদা। তাদের জীবনদর্শন ও প্রথাগত অধিকারকে সম্মান জানাতেই ১৯০০ সালের শাসনবিধি প্রণীত হয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে যে ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার মূল ভিত্তিই ছিল এই বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামোকে স্বীকৃতি দেওয়া। এই চুক্তি কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পাহাড়ের মানুষের স্বকীয়তা ও ভূমি অধিকার রক্ষার এক পবিত্র অঙ্গীকার। ১৯০০ সালের বিধিমালাকে দুর্বল করার অর্থ হলো সেই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল চেতনাকে অস্বীকার করা এবং শান্তির পথকে কণ্টকাকীর্ণ করা।
১৯৭৫ পরবর্তী ইতিহাস পাহাড়ের জন্য ছিল এক দীর্ঘশ্বাসের অধ্যায়। জোরপূর্বক বসতি স্থাপন আর ভূমি জবরদখলের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার সামনে একমাত্র ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই ১৯০০ সালের বিধিমালা এবং পরবর্তীতে পার্বত্য চুক্তি। তবুও আজ সেই ভিত্তিমূলে আঘাত হানার পাঁয়তারা চলছে। যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত—Supreme Court of Bangladesh—ইতিমধ্যেই এই আইনকে বৈধ ঘোষণা করেছে, তখন পুনরায় 'রিভিউ'-এর আড়ালে কিসের ইঙ্গিত? এটি কি তবে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, নাকি পাহাড়ের শেষ সম্বলটুকু গ্রাস করার কোনো সুনিপুণ নীল নকশা?
পাহাড়ের মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে নয়। আমরা প্রশ্ন তুলছি—আমরা কি এই স্বাধীন রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক, নাকি কেবল মাটির নিচের খনিজ সম্পদের পাহারাদার? যদি ভূমির অধিকারই না থাকে, যদি চুক্তির বাস্তবায়ন না ঘটে, তবে এই নাগরিকত্বের সংজ্ঞা কী?
“উন্নয়ন যদি হয় উচ্ছেদ, শান্তি যদি হয় নীরবতা—তবে সেই উন্নয়ন ও শান্তি পাহাড়ের জন্য এক একটি দীর্ঘশ্বাস।”
রাষ্ট্রের নিকট আবেদন—পাহাড়কে কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত হিসেবে দেখবেন না, একে ভালোবাসুন এর বৈচিত্র্যময় মানুষের হৃদস্পন্দন দিয়ে। পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং ১৯০০ সালের শাসনবিধির সুরক্ষা আজ সময়ের দাবি। ভূমি, বন আর সম্পদ যদি আপনাদের কাম্য হয়, তবে আগে সেই মানুষের অধিকার নিশ্চিত করুন যারা যুগ যুগ ধরে এই পাহাড়কে বুকের রক্ত দিয়ে আগলে রেখেছে। অন্যথায়, এই রাষ্ট্রের বৈচিত্র্যের অহংকার ধূলিসাৎ হবে। পাহাড় যদি তার স্বকীয়তা হারায়, তবে বাংলাদেশও হারাবে তার আত্মার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আগামীকালের (২৩ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.) রায় কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়; এটি ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়া এক অমোঘ জবাব। এটি নির্ধারণ করবে এই ভূখণ্ডে কি আজ ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অবশিষ্ট আছে, নাকি শুধুই পেশিশক্তির আস্ফালন চলবে। মনে রাখবেন, ১৯০০ সালের শাসনবিধির ওপর আঘাত মানে কেবল একটি আইনের মৃত্যু নয়—এটি একটি জাতির হৃদপিণ্ডে এবং ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূলে সরাসরি করা আঘাত।
পাহাড় তার শেষ নিঃশ্বাসটুকু বাঁচাতে চায়; রাষ্ট্র কি সেই শ্বাসটুকু ফিরিয়ে দেওয়ার ঔদার্য দেখাবে?
- এপ্রিল ২২, ২০২৬
পাহাড়ে মর্ডানিজম: সংস্কৃতি যখন পণ্য হয়ে ওঠে
পাহাড়ে আজ যে ‘মর্ডানিজম’ দেখা যাচ্ছে, তা আসলে আধুনিক হওয়ার চেষ্টা নয়। এটি হলো সাজানো-গোছানো এক নতুন উপনিবেশ। বাইরে থেকে দেখতে সুন্দর, ভেতরে ভেতরে শোষণের পুরোনো কাঠামোই কাজ করছে।
‘রুটস ফেস্টিভ্যাল’-এর মতো আয়োজনগুলোতে পাহাড়ি সংস্কৃতি জীবনের অংশ হিসেবে নয়, মঞ্চের সাজ হিসেবে হাজির হয়। সমতল থেকে আনা শিল্পীরা এসে পাহাড়িদেরই শেখান তাদের সংস্কৃতি কীভাবে দেখাতে হবে। এখানে সংস্কৃতি আর মানুষের দৈনন্দিন জীবন নয়—এটি আলো, ক্যামেরা আর দর্শকের জন্য বানানো পণ্য।
এই উৎসবগুলোতে আদিবাসী মানুষ আর মানুষ থাকে না। তাদের পোশাক, খাবার, নাচ, শরীর, হাসি—সবকিছু ‘এথনিক আকর্ষণ’ হিসেবে বিক্রি হয়। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, পাংখুয়া, ম্রো, খুমী, ........তারা যেন জীবন্ত মানুষ নয়, বরং প্রদর্শনীর সামগ্রী।
তাদের কথা বলার ভাষাও নিজের থাকে না। কী বলা যাবে, কী বলা যাবে না—সব আগেই ঠিক করা। যাতে বাজারে সমস্যা না হয়, যাতে প্রশ্ন না ওঠে। প্রতিবাদের জায়গায় থাকে ‘নান্দনিকতা’, আর সেই নান্দনিকতায় আগুন নিভে যায়।
এই সাংস্কৃতিক আয়োজনের পেছনে থাকে এক শ্রেণির এলিট—যারা বিদেশে পড়াশোনা করে ‘মাল্টিকালচারালিজম’ শিখে আসে, এনজিওর প্রজেক্ট চালায়, ফান্ড আনে, উৎসব বানায়। পাহাড়ি মধ্যবিত্ত এই চকচকে সংস্কৃতিতে মুগ্ধ হয়। অনেক লেখক-শিল্পীও সেখানে যুক্ত হয়ে পড়েন।
এখানেই সবচেয়ে বড় ভণ্ডামি। যারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে নারীর অধিকারের কথা বলেন, তারাই আবার এই সংস্কৃতির বাজারের অংশ। তারা নারীবাদের ভাষা নেয় পশ্চিম থেকে, ‘অথেনটিক’ পরিচয় নেয় পাহাড় থেকে, আর স্বাদ নেয় সমতলের সংস্কৃতি থেকে। এটা শুধু দ্বিচারিতা নয়—এটা রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতা।
এই সংস্কৃতি পুঁজির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারে না, কারণ সে নিজেই পুঁজির ভাষায় কথা বলে। পাহাড়ে যেখানে মানুষ প্রতিদিন ভূমি, ভাষা, নিরাপত্তা আর অস্তিত্বের জন্য লড়ছে—সেখানে শিল্পীর কাজ কি শুধু উৎসব সাজানো?
রাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ে বসতি স্থাপন, সামরিকীকরণ আর উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ চালাচ্ছে। এই বাস্তবতার ভেতরে শিল্পের ভাষা আলাদা না হলে, তা সত্যিকার শিল্প হয় কীভাবে?
রাষ্ট্র যেমন পাহাড়িদের ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বানিয়েছে, তেমনি এই সাংস্কৃতিক এলিট পাহাড়কে বানিয়েছে ‘থিম’। নিরাপদ, সুন্দর, বাজারে বিক্রির মতো। তাহলে শাসক আর এই শিল্পীর মধ্যে পার্থক্য কোথায়?
সংস্কৃতি যদি মুক্তির কথা না বলে, যদি প্রতিরোধের শক্তি না হয়—তবে তা কেবল সাজঘর। পাহাড় কোনো ফেস্টিভ্যালের বিষয় নয়। পাহাড় হলো এক রক্তাক্ত রাজনৈতিক বাস্তবতা।
এই বাস্তবতার মুখোমুখি না দাঁড়ালে কোনো মর্ডানিজমই আধুনিক নয়।
তা শুধু উপনিবেশের নতুন পোশাক।
- এপ্রিল ২০, ২০২৬
লিটল ম্যাগাজিন: ভাষা ও নির্ভিক সংগ্রাম
লিটল ম্যাগাজিনকে শুধু ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড় করানো একটি মঞ্চ ভাবলে তার অর্ধেক পরিচয় আড়ালে থেকে যায়। সে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও গভীরে গিয়ে সে প্রশ্ন তোলে ভাষার প্রতি, অভ্যাসের প্রতি, পিঠ চাপড়ানোর সংস্কৃতির প্রতি। গড়পড়তা সাহিত্যের আবহাওয়া, 'দাদা-দিদি'দের বলয়, প্রাতিষ্ঠানিক রুচির শাসন— সবকিছুর দিকেই লিটল ম্যাগাজিন আঙুল তোলে। তার অস্তিত্বের শর্তই হলো অসম্মতি। সবসময় যে তাকে মলাটবদ্ধ ম্যাগাজিন হতে হবে তাও নয়। একটা লিফলেট, একটা দেয়াললিখন, একটা জেরক্স করা প্যামফ্লেটও নিজের চরিত্রগুণে লিটল ম্যাগাজিন হয়ে উঠতে পারে। ইতিহাস অন্তত সেই সাক্ষ্যই দেয়।
লিটল ম্যাগাজিনের আন্তর্জাতিক ইতিহাস দেখলে বোঝা যায়, তার জন্ম সংকট ও সংঘাতের গর্ভে। ১৮৪০ সালের আমেরিকা। গৃহযুদ্ধের আর মাত্র দুই দশক বাকি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ক্ষমতাকে প্রশ্ন তোলার বাতাবরণ তৈরি হচ্ছে। সেই সময় বস্টন থেকে প্রকাশিত হয় 'দ্য ডায়াল'। র্যালফ ওয়াল্ডো এমারসন ও মার্গারেট ফুলার সম্পাদিত এই পত্রিকাকে প্যামফ্লেট বললেও ভুল হয় না। ট্রান্সেন্ডেন্টালিস্ট আন্দোলনের মুখপত্র হয়ে 'দ্য ডায়াল' প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম, ইউরোপকেন্দ্রিক চিন্তা ও বস্তুবাদী জীবনের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, ছোট্ট এই পত্রিকার হাত ধরেই লিটল ম্যাগাজিনের ধারণার জন্ম।
এরও প্রায় পঞ্চাশ বছর পর ১৮৯৬ সালে লন্ডনে আর্থার সাইমনসের সম্পাদনায় বেরোয় 'দ্য স্যাভয়'। ভিক্টোরিয়ান যুগের কপট নৈতিকতা ও রক্ষণশীল রাজনীতির বিরুদ্ধে এই পত্রিকা তীব্র প্রতিবাদ তোলে। অব্রে বিয়ার্ডসলির অলংকরণ, ইয়েটসের কবিতা, সাইমনসের প্রবন্ধ— সব মিলিয়ে 'দ্য স্যাভয়' হয়ে উঠেছিল প্রতিষ্ঠানের আতঙ্ক। ক্ষমতার ভিত কাঁপিয়ে দেওয়ার যে সাহস, তা লিটল ম্যাগাজিনের জন্মগত বৈশিষ্ট্য।
বিংশ শতকের শুরুতে ১৯১২ সালে হেরিয়েট মনরো ও এজরা পাউন্ডের হাতে শিকাগো থেকে পথচলা শুরু করে 'পোয়েট্রি: এ ম্যাগাজিন অফ ভার্স'। অলংকার-সর্বস্ব কবিতার ধারণা ভেঙে এই পত্রিকাই ইমেজিজম, আধুনিকতাবাদের বীজ বপন করে। টি এস এলিয়টের 'দ্য লাভ সং অফ জে. আলফ্রেড প্রুফ্রক' প্রথম ছাপা হয় এই পত্রিকাতেই।
বিশ্বসাহিত্যের এই ধারার সমান্তরালে বাংলাতেও লিটল ম্যাগাজিন নিজের পথ কেটে নেয়। ১৯১৪ সালে প্রমথ চৌধুরীর সম্পাদনায় প্রকাশিত 'সবুজপত্র'কে বাংলার প্রথম সচেতন লিটল ম্যাগাজিন বলা চলে। 'সবুজপত্র' শুধু একটি পত্রিকা ছিল না, ছিল একটি আন্দোলন। সাধু ভাষার এলিটিজম ভেঙে চলিত ভাষাকে সাহিত্যের মর্যাদা দেওয়া, যুক্তি ও মননের চর্চাকে প্রাধান্য দেওয়া— এই পত্রিকার হাত ধরেই বঙ্গ সাহিত্যে আধুনিকতার বোধ তৈরি হয়। আজও অনেকেই যে কোনো পরীক্ষামূলক পত্রিকাকে আদর করে 'সবুজপত্র' বলে ডাকেন।
ষাটের দশকে এই ধারায় সবচেয়ে বড় বিস্ফোরণ ঘটায় হাংরি আন্দোলন। মলয় রায়চৌধুরী, সুবিমল বসাক, দেবী রায়, ফাল্গুনী রায়, বাসুদেব দাশগুপ্তেরা একজোট হয়ে প্রচলিত সমস্ত ধারণাকে নস্যাৎ করেন। তাঁদের হাতিয়ার ছিল 'হাংরি বুলেটিন' সহ নানা লিটল ম্যাগাজিন। শ্লীল-অশ্লীলের ধারণা, কবিতার বিষয়, ভাষার ব্যাকরণ— সমস্ত বাঁধন ভেঙে তাঁরা শব্দকে মুক্তি দেন। মার্কিন বিট প্রজন্মের অ্যালেন গিন্সবার্গ ও জ্যাক কেরুয়াকের প্রভাব তাঁদের উপর পড়েছিল, কিন্তু হাংরিদের প্রতিবাদ ছিল একেবারে এদেশের মাটি, রাষ্ট্র ও সমাজকে ঘিরে। মলয় রায়চৌধুরীর 'প্রচণ্ড বৈদ্যুতিক ছুতার' কবিতার জন্য মামলা, গ্রেফতার— এসবই প্রমাণ করে রাষ্ট্রযন্ত্রের কাছে লিটল ম্যাগাজিন কতটা ভয়ের কারণ হতে পারে।
হাংরি আন্দোলনের পথ ও পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। অনেকেই তাঁদের ভাষা ও ভঙ্গিকে গ্রহণ করতে পারেননি। কিন্তু এই আন্দোলন বাংলা কবিতা ও গদ্যের যে জমাট বরফ ভেঙে দিয়েছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
লিটল ম্যাগাজিনের সবচেয়ে জরুরি কাজ বোধহয় ভাষাকে তার প্রাতিষ্ঠানিক ছায়া থেকে মুক্ত করা। সেই মুক্তির লড়াই আজও চলছে। তার সাম্প্রতিক উদাহরণ চাঙমা ভাষার লিটল ম্যাগাজিন 'চাদি'। নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর চাঙমা ভাষা ও চাঙমা বর্ণমালায় এই পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়। মূলধারার প্রকাশনা শিল্প যেখানে সংখ্যালঘু ভাষার সাহিত্যকে জায়গা দেয় না, সেখানে নিজের হরফে, নিজের ভাষায় ১৪টি সংখ্যা প্রকাশ করা নিজেই এক রাজনৈতিক উচ্চারণ। এটি কেবল সাহিত্যচর্চা নয়, ভাষা বাঁচানোর লড়াই এবং আত্মপরিচয়ের দৃঢ় ঘোষণা।
তথ্য: দৈনিক প্রথম আলো, ২২ জুলাই ২০২২
- এপ্রিল ১৮, ২০২৬
অঝাপাত স্কোয়ার: চাঙমা ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় এক সংগ্রামী পথচলা
চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালার প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং নিজ সংস্কৃতি সংরক্ষণের দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে ২০০৪ সাল থেকে আমার এক দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং পথচলা শুরু হয়। চংড়াছড়ি হাই স্কুলে (যা তখন জুনিয়র হাই স্কুল ছিল) প্রথম চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা কোর্স চালু করি, বিদ্যালয়টি ২০০০ সালের দিকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই উদ্যোগের ফলস্বরূপ, ২০০৪-২০০৫ সালে বাজেই ছড়া বেসরকারি প্রাইমারি বিদ্যালয়ে আরও দুটি ব্যাচ শুরু হয়। তবে, আঞ্চলিক রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং ওয়ান ইলেভেনের মতো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আমার এই কাজ সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।
২০০৭ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে জীবন বাঁচাতে আমি আমার বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হই। সে সময়ে দিঘীনালার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক ছিল এবং জনমনে ছিল চরম আতঙ্ক। কুদুকছড়ি গ্রামে আত্মগোপন অবস্থায় আমি প্রাইভেট টিউশনির পাশাপাশি চাঙমা ভাষা কোর্স চালু রাখি। জান্দিমুড়ো নামক এক গ্রামে টিউশনির সাথে চাঙমা লেখা শেখানোর কাজও চালিয়ে যাই। সে সময় আমি এক বছরে মাত্র ৭ হাজার টাকা ভাতা পেতাম। দুই বছর সেখানে কাজ করার পর, ২৫ হাজার টাকার বিনিময়ে পাশের গ্রাম শিবঙ্গ পাড়ায় টিউশনির উদ্দেশ্যে পাড়ি জমাই। ২০১০ সালে আমার শ্বশুর হেডম্যান সুশীল জীবন চাকমার সহযোগিতায় আমি গ্রামে ফিরে আসার সুযোগ পাই।
গ্রামে ফিরে আমার মূল কাজ হয়ে দাঁড়ায় টিউশনি ও বাগান করা এবং তার সাথে চাঙমা লেখা শেখানো। কিন্তু মেরুং ইউনিয়নের পরিস্থিতি তখনো ভালো ছিল না। দিনের পর দিন উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তায় কেটে যেতে থাকে। এমনই এক কঠিন সময়ে আমার চাচা সরল কুমার চাঙমা, চাচাতো ভাই মন্তু চাঙমা এবং মন্তু চাঙমা ছেলে রিপন চাঙমাকে অপহরণ করা হয়। অপহরণ করেন রাজিব বাবু। প্রীতি দা তখন আমাকে দিঘীনালায় চলে আসার পরামর্শ দেন, কারণ গ্রামে থাকাটা অনিরাপদ ছিল। তাঁর কথা ভেবে ২০১৪ সালের দিকে আমি দিঘীনালায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করি।
এরই মধ্যে ২০০৯ সালের দিকে আমার স্ত্রী পাঁচ শতক জায়গা কিনে একটি বাড়ি তৈরি করেছিল। দিঘীনালায় আসার পর এক নতুন সমস্যার মুখোমুখি হই। একটি আনলকড নাম্বার থেকে বারবার কল আসছিল। অবশেষে একবার কল রিসিভ করলে অপর প্রান্ত থেকে আমাকে আমার শ্বশুরবাড়িতে (চংড়াছড়ি সুশীল হেডম্যান পাড়া) গিয়ে দেখা করতে বলা হয়। বিষয়টি প্রথমে সাধারণ মনে হলেও, সেখানে গিয়ে জানতে পারি আমাকে আরও একটি গ্রামে, বড়াদমে যেতে হবে। মনে উদ্বেগ নিয়ে বাবা, চাচাতো ভাই এবং স্ত্রীর বড় ভাইকে সঙ্গে নিয়ে বড়াদমের দিকে রওনা দিই। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগেই আবার জানানো হয় যে, চামিনি ছড়াতে যেতে হবে। ভরা দুপুরে এই বারবার দিক পরিবর্তনের কারণে আমি কিছুটা বিরক্ত হয়ে ফিরে যেতে চাইলেও, দাদা আমাকে বুঝিয়ে রাজি করান। অবশেষে একটি পাহাড় পার হতে না হতেই আরও একটি ফোন আসে – এবার খামার পাড়ার অমুক বাড়িতে যেতে হবে। সেদিনের সেই মানসিক কষ্টের ঢেউ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন।
অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে যখন পৌঁছালাম, তখন দেখতে পেলাম রাজিব বাবুকে, যাকে আমি 'বনোই' বলে ডাকি। আমার শ্বশুর বাবা জানান যে, তিনি রাজিব বাবুকে আশ্রয় দিয়েছেন, কারণ তাঁর বাবার বিরুদ্ধে মানুষ মেরে ফেলার অভিযোগ ছিল এবং দুজন নিরপরাধ মানুষ মারা গিয়েছিল। এই ঘটনা 'উন্দ্রিক বাব আ ফাগারা' নামে কিংবদন্তি হয়ে আছে। সেখানে আমাকে প্রথম প্রশ্ন করা হয়, কেন আমি রাঙামাটিতে যোগাযোগ করেছি। এর আগে আমার ও বাবার ফোন কেড়ে নিয়ে চেক করা হয়। এরপর ৪০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ছয় মাসের জন্য আমার শ্বশুরবাড়িতে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
২০১৫ সালে গৃহবন্দী জীবন শেষ হওয়ার পর গ্রামের খারাপ পরিস্থিতির কারণে আমি গ্রামে না গিয়ে সরাসরি দিঘীনালায় চলে আসি। যদিও গ্রামে বাগান-বাগিচা ছিল, আমি সেখানে ফিরিনি। আমার উদ্দেশ্য ছিল ২০২০ সালের দিকে মাতৃভাষা নিয়ে কাজ শুরু করা এবং বাগান-বাগিচার কাজ শেষ করে দিঘীনালায় এসে সমাজের ও মাতৃভাষার জন্য আরও ভালোভাবে কাজ করা। কিন্তু ভাগ্য হয়তো অন্য কিছু চেয়েছিল; আমার ইচ্ছামতো কিছুই ঘটেনি।
দিঘীনালায় এসে আমি পূর্ণোদ্যমে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা শিক্ষা কোর্স শুরু করি ২০১৫ সালে। ২০১৯ সালের দিকে আমার মনে হয় দিঘীনালায় একটি 'অঝাপাত স্কোয়ার' প্রতিষ্ঠা করা যায় কিনা। একদিন কেভি দা, এলিন্সে এবং শতরুপাদির বাড়িতে গিয়ে প্রস্তাব দিলে তিনি আঞ্চলিক দলের সহযোগিতা নিতে বলেন। কিন্তু তাদের প্রতি আমার ভুল ধারণার কারণে আমি তাঁর পরামর্শ গ্রহণ করতে পারিনি, কারণ আমার মনে হতো তারা আমাকে সন্দেহের চোখে দেখে।
পরে ২০১৯ সালের দিকে পেলে বাবু সুভাষ বাবু হাতে এক লাখ টাকা নিঃশর্ত সহযোগিতা করেন, যা আমাকে সাহস যোগায়। এই সাহসে ভর করে একদিন আমি সভাপতি রোমান দা, জ্ঞান চাঙমা (চেয়ারম্যান) সহ আরও কয়েকজনের কাছে অঝাপাত স্কোয়ারের প্রস্তাব দিই। ত্রিদিব দা সবসময় ছায়ার মতো আমার পাশে ছিলেন। সকলের পরামর্শক্রমে ২০২২ সালের ১৭ই এপ্রিল সাইনবোর্ড লাগানো হয় – "অঝাপাত স্কোয়ার"। তবে কয়েক দিন যেতে না যেতেই জ্ঞান চাঙমা আমাকে ফোন করে সাইনবোর্ডটি দ্রুত খুলে ফেলার নির্দেশ দেন। আমি তখন খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদে ছিলাম; বিকেলে ফিরে ত্রিদিব দাকে সঙ্গে নিয়ে সাইনবোর্ডটি খুলি।
এভাবে দিন কাটতে থাকে, কিন্তু অঝাপাত স্কোয়ার নামটি আমার মন থেকে মুছে যায়নি। সবসময় এটি মনে পড়ত। অবশেষে ২০২৬ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি এলাকার মায়মুরুব্বিদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয় যে, দিঘীনালার বাবুছড়া ও বাঘাইছড়ি সড়কের সংযোগ মোড়টির নাম 'অঝাপাত স্কোয়ার' হবে। এই সিদ্ধান্ত অনুসারে, ২০২৬ সালের ২৩শে মার্চ আবার সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়।
কিন্তু বেশি স্থায়ী হলো না। সে রাত ৯:৪৪ মিনিটে ত্রিদিব দা ফোন করে জানান যে কবাখালী ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আমার সাথে কথা বলতে চান। আমি জ্ঞানকে ফোন করলেও সে রিসিভ করেনি। ৯:৫৯ মিনিটে একটি অচেনা নাম্বার থেকে কল আসে, সমীর দাদার কণ্ঠস্বর শুনতে পাই। তিনি জানতে চাইলেন আমি সাইনবোর্ড লাগিয়েছি কিনা। আমি বিনীতভাবে জানালাম যে, ২০১৭ সাল থেকে এটি আমার দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা, ২০২২ সালে একবার চেষ্টা করেও খুলতে হয়েছিল, আর এবার সকলের সম্মতিতে আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই এটি করেছি।
২৪শে মার্চ ২০২৬, সকাল ১১:০২ মিনিটে সুবরণ চাঙমা ফোন করে জেএসএস অফিসে আসতে বলেন। অফিসে গিয়ে জানতে পারলাম তারা মিন্টু দোগানে আছেন। সেখানে গিয়ে আমাকে অকথ্য ভাষায় অপমান করা হয়। চেয়ারম্যান বলেন, "আমি যতদিন চেয়ারম্যান থাকব, ততদিন আমার ইউনিয়নে কাজ করতে পারবে না। অন্য ইউনিয়নে কাজ না করে শুধু আমার ইউনিয়নে কেন কাজ করো। ইউপিডিএফ করো, জেএসএস করো। বেয়াদব। মানুষ চোখে দেখ না।" শামীল চাকমা ব্যঙ্গ করে "অঝাপাত, এ পাত..." বলতে থাকেন। আমার মনে হয় প্রীতি দা এই অপমান সহ্য করতে পারেননি। তিনি বলেন, "ইনজেব চাঙমা তো কারো ক্ষতি করার জন্য কাজ করছে না। যে জায়গা জিয়া স্কোয়ার, হাদি স্কোয়ার হতে পারে, তার দায় কে নেবে?" সেদিন বিকেলে বাড়ি ফিরে জানতে পারলাম, রাতের বেলা সাইনবোর্ডটি ভেঙে দেওয়া হয়েছে। এরপর বিকেলে দুজন লোক নোটিশ নিয়ে আসে – জ্ঞান চাঙমার পাঠানো নোটিশ।
এই ঘটনাপ্রবাহ আমার ব্যক্তিগত সংগ্রাম এবং মাতৃভাষার প্রতি আমার অঙ্গীকারের এক জীবন্ত দলিল। শত বাধা, অপমান ও ক্ষতির সম্মুখীন হয়েও অঝাপাত স্কোয়ারের স্বপ্ন আমার মনে অমলিন। এই স্কোয়ারটি শুধুমাত্র একটি নাম নয়, এটি চাঙমা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য আমার নিবেদন এবং প্রতিরোধের প্রতীক।
২৬ মার্চ ২০২৬। জেএসএস অফিসে ত্রিদিব দা সহ গেলাম। নোটিশ বিষয়ে কথা বলার জন্য। অফিসে যাবার আগে জ্ঞান চাঙমাকে দেখে তার কাছে গেলাম। বলল, দা, যাবে কিনা অফিসে। তিনি তারাতারি বললেন, তুমি যাকে দেখেছো তার কাছে যাও। তোমাকে দেখলে রাগ হয় আমার। তোমাকে আমি মারবো। ইত্যাদি ইত্যাদি।
এরপর অফিসে গেলাম। সেখানে নিশিত বাবু আ সমির বাবু ছিল। কিছুক্ষণ পরে বাবুছড়া, দিঘীনালা, মেরুং ইউনিয়নে চেয়ারম্যান উপস্থিত হয়। সবকথা বলার শেজে বুঝা গেল, যে অঝাপাত সাইনবোর্ড দিয়েছি সে সাইনবোর্ড জ্ঞান চাঙমা ভেঙ্গে দিয়েছে। তারাদের অভিযোগ,
১। সেটির নাম মাইন রিসোর্ট আর কোন নাম হতে পারেনা।
২। সাইনবোর্ড দেওয়ার আগে তাদেরকে জানানো হয়নি।
এতে আমাদের যুক্তি মাইনি রির্সোট একটি প্রতিষ্ঠান। ঐটাই থাকবে। সবাই যখন সম্মিতি দিয়েছিল আর কাহারো কাছ থেকে অনুমতি প্রয়োজনবোধ করছিনা। কেনান, এতে ব্যক্তি কাহারো স্বার্থকতা নেই। এটি সার্বজননি।
আমার আর বুঝতে বাকি ছিল না যে তারা সেনাবাহিনী এজেন্ট হয়ে কাজ করছে। যদিও আগে ধারণা ছিল তা স্পষ্ট নয়। এখন আয়না মতো পরিষ্কার হলো। তার সাথে তাল মেলিয়ে বাবুছড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান গগনবিকাশ চাঙমা। জানিনা জাতি কি এ সমস্ত দালালিদের নিয়ে কি অস্ত্বিত্ব রক্ষা করতে পারবে?
- এপ্রিল ১৬, ২০২৬
চাকমা সমাজে চুঙুলং পূজার গুরুত্ব ও সামাজিক বৈধতা
চাকমা জাতির আদি সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিনীতিতে চুঙুলং পূজা এক অনন্য ও অপরিহার্য স্থান দখল করে আছে। সূর্যবংশীয় ঐতিহ্যের ধারক হিসেবে এই পূজা কেবল একটি আচার নয়, বরং এটি একটি দম্পতিকে সামাজিকভাবে স্বামী-স্ত্রীর স্বীকৃতি দেওয়ার একমাত্র বৈধ পথ।
চাকমা সমাজে বিশ্বাস করা হয় যে, পরমেশ্বর ও পরমেশ্বরীর আশীর্বাদ ছাড়া কোনো দাম্পত্য জীবন সার্থক হতে পারে না। বিবাহকালীন সময়ে এই দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে পূজা নিবেদন করাই হলো চুঙুলং। এটি সম্পাদিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো যুগলকে সামাজিকভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে গণ্য করা হয় না। প্রাচীন প্রথা অনুযায়ী, এই পূজা সম্পন্ন হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত দম্পতির একত্র বসবাস বা সহবাসকে অবৈধ ও সামাজিক আইনবিরুদ্ধ মনে করা হয়।
চাকমা সাহিত্যের কালজয়ী 'রাধামন-ধনপদি' পালা গানে চুঙুলং-এর গুরুত্ব স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। এই আখ্যান থেকে আমরা দেখি যে, বিবাহ কেবল ঘটা করে অনুষ্ঠান করা বা 'জোড়া বানা' (বিবাহের প্রস্তুতিমূলক আচার) সম্পন্ন করার নাম নয়।
ধনপদি যখন এক মহাজনের ছেলের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে যাচ্ছিলেন এবং বিয়ের প্রাথমিক সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছিল, তখনও কিন্তু সমাজ তাকে বিবাহিত বলে মেনে নেয়নি।
বিবাহের চূড়ান্ত লগ্নে রীতি অনুসারে ভোরে যখন ধনপদি 'চুঙুলং পানি' আনতে যান, তখন সেই পবিত্র কলস নিয়ে তিনি তার প্রকৃত প্রেমিক রাধামনের গৃহে উপস্থিত হন।
রাধামন ও ধনপদির এই সাহসী পদক্ষেপের পর গ্রামে যে সালিশ বসেছিল, সেখানেও জয় হয়েছিল তাদেরই। সালিশের রায় প্রমাণ করে যে:
শুধুমাত্র বিয়ের আয়োজন বা অন্য কোনো লৌকিকতা বিবাহকে পূর্ণতা দেয় না।
চুঙুলং পূজার জন্য আনা জল বা এই আচারের সংকল্প যার সাথে সম্পন্ন হয়, সমাজ তাকেই বৈধ জীবনসঙ্গী হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
ধনপদি রাধামনের গৃহে চুঙুলং কলস নিয়ে ওঠার মাধ্যমে এটি নিশ্চিত হয় যে, তার বিবাহের আধ্যাত্মিক ও আইনি বৈধতা রাধামনের সাথেই যুক্ত হয়েছে।
পরিশেষে বলা যায়, চাকমা সমাজ ব্যবস্থায় চুঙুলং পূজা হলো একটি পবিত্র রক্ষাকবচ এবং সামাজিক শৃঙ্খলার মূল চাবিকাঠি। রাধামন-ধনপদি পালার মাধ্যমে এই শিক্ষাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, চুঙুলং ব্যতিরেকে বিবাহ অসম্পূর্ণ। এটি কেবল একটি ধর্মীয় আচার নয়, বরং এটিই বিবাহের চূড়ান্ত আইনগত ও সামাজিক ছাড়পত্র, যা যুগ যুগ ধরে চাকমা সমাজের নীতি ও আদর্শ হিসেবে প্রচলিত রয়েছে।
- এপ্রিল ১৫, ২০২৬
অঝাপাতের প্রদীপ, চাঙমা সাহিত্যের শিকড় থেকে শিখরযাত্রা- ইনজেব চাঙমা
চাঙমা সাহিত্য কেবল শব্দের বিন্যাস নয়, এটি এক জাতির আত্মপরিচয়ের দীপ্ত উচ্চারণ। এককালে এই সাহিত্য চর্চা হতো নিজস্ব অঝাপাত বা চাঙমা বর্ণমালায়। “গোজেন লামা”, “মা-বাবর বারমাস”, “লক্ষীপালা” কিংবা “চান্দবি”—এসব গ্রন্থ ছিল পাহাড়ি জনপদের প্রকৃত হৃদস্পন্দন। অঝাপাতের হরফে লেখা পুঁথিগুলো একসময় ঘরে ঘরে উচ্চারিত হতো; গানে-কথায় বয়ে চলত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
কালের নির্মম স্রোতে নিজস্ব লিপির ব্যবহার ক্ষীণ হয়ে আসে। জীবনের তাগিদে ও রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার চাপে চাঙমা মনন আশ্রয় নেয় বাংলা বর্ণমালায়। তবে ভাষা তার মাধুর্য হারায়নি, বরং সেজেছে নতুন বসনে।
১৯৩৬ সাল—চাঙমা সাহিত্যের আধুনিক যাত্রার এক মাইলফলক। চাঙমা রাজবাড়ি থেকে প্রকাশিত “গৈরিকা” পত্রিকায় বাংলা হরফে প্রথম আধুনিক চাঙমা কবিতা লেখেন চিত্রশিল্পী সুনানু চুণিলাল দেওয়ান। তাঁর পথ ধরে কলম ধরেন সুনানু মুকুন্দ চাঙমা ও সুনানু সলিল রায়। সেই যে শুরুর যাত্রা, তারপর আর থামেনি।
সত্তরের দশক ছিল চাঙমা সাহিত্যের নবজাগরণ। চাঙমা ভাষায় নতুন গান, কবিতা ও নাটক কেবল রচিতই হয়নি, বরং নিয়মিত মঞ্চস্থ হতে থাকে। সাহিত্যের এই ধারায় যোগ হয় নতুন মাত্রা—উপন্যাস। সুনানু আর্য্যমিত্র চাঙমা-র ৪টি চাঙমা উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই ভাষার গদ্য সাহিত্যের ভিত্তি আরও মজবুত হয়। পরবর্তীতে কম্পিউটারে ব্যবহারোপযোগী চাঙমা ফন্ট উদ্ভাবিত হওয়ার পর নিজস্ব বর্ণমালাও আবার মুদ্রণের আলোয় ফেরার সুযোগ পায়।
এই সমৃদ্ধ ধারাকে সময়ের সাথে শাণিত করেছেন একঝাঁক কালজয়ী স্রষ্টা: দীপংকর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, ড. ভগদত্ত খীসা, সুহৃদ চাঙমা ও কবিতা চাঙমা। মৃত্তিকা চাঙমা, প্রমোদ বিকাশ কার্বারী (ফেলাযেয়া চাঙমা), বীর চাঙমা ও কৃষ্ণ চন্দ্র চাঙমা। রণজিত দেওয়ান, সমিত রায়, চিরজ্যোতি চাঙমা, শান্তিময় চাঙমা ও ঝিমিত ঝিমিত চাঙমা প্রমুখ।
তাঁদের ছড়া, কবিতা, গীত ও নাটক চাঙমা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে করেছে ঐশ্বর্যময়। সম্প্রতি জাবারাং ভাষা বিকাশ উদ্যোগ ও কক ক্রিয়েটিভিটিস-এর যৌথ প্রয়াসে প্রকাশিত “আবেদি” (১২তম কবিতা সংকলন) প্রমাণ করে অঝাপাত মরেনি, সে ফিরছে নতুন প্রজন্মের হাতে।
যদিও ২০২৬ সালের বিঝু উৎসবে নতুন কোনো গ্রন্থের সুবাস সেভাবে পাওয়া যায়নি, তবু চাঙমা সাহিত্য একাডেমির “হিলর পচ্জন” ও “চাদি” পত্রিকা দুটি নিয়মিত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখছে। তবে সাফল্যের আড়ালে কিছু বেদনার ক্ষতও রয়ে গেছে। কবি উদয় শংকর চাঙমার “আন্নো খেইয়্যা ডাইয়িরে” কবিতাগ্রন্থটি কেবল অর্থাভাবে আলোর মুখ দেখতে পারছে না। প্রকাশ পেলে হয়তো এবারের বিঝু আরও রঙিন এবং জাতির কণ্ঠস্বর আরও শাণিত হতো।
চাঙমা সাহিত্য অঝাপাতে জন্ম নিয়ে বাংলা হরফের নৌকায় চড়ে আধুনিকতার সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। আজ সে আবার ফিরতে চাইছে নিজের লিপির ঘরে। এই ফেরার পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়—আর্থিক দৈন্য, প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা আর পাঠকের সংকট তো রয়েছেই। তবু যতদিন “হিলর পচ্জন”-এর পাতা উল্টাবে কোনো কিশোর, যতদিন “চাদি”-তে ছাপা হবে নতুন কবিতা, ততদিন চাঙমা সাহিত্যের প্রদীপ নিভবে না।
ভাষা মরে না, সে কেবল অপেক্ষায় থাকে—একটি যোগ্য উচ্চারণের এবং একজোড়া মমতাভরা হাতের, যে তাকে আবার লিখবে অঝাপাতে, পড়বে এবং ভালোবাসবে। চাঙমা সাহিত্য তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, সে এক সোনালী ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।
ধর্ম:
১. ধাম্মাপাদা- ভিক্ষু তি রতন জ্যোতি
২. উদ্যান - ভিক্ষু তি রতন জ্যোতি
উপন্যাস-
1. “ফেবো” লেঘিয়্যা সুনানু দেবপ্রিয় চাঙমা, যুনিও নানান পত্রিকাত উপন্যাস ইজেবে কোই কয় আজলে ইবে এক্কো ছোটগল্প। ফগদাঙ- ২০০৪
2. “মেগুল দেবা আহ্’ঝি” লেঘিয়্যা সুনানু সুরোজ কান্তি চাঙমা, ফগদাঙি: কল্পতুরু রাঙামাত্যা, ফগদাঙ: ২০১৯ খ্রি.
3. “মনবি” লেঘিয়্যা: সুনানু আর্য্যমিত্র চাঙমা, ফগদাঙি: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খগাড়াছড়ি; ফগদাঙ: ২০১৯ খ্রি.
4. তুই এভে ভিলে লেঘিয়্যা: শ্যামলকান্তি তলুকদার
5. “তিন ফাগারা “ সুনানু আর্য্যমিত্র চাঙমা – ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
6. ”অমা কবি“- সুনানু আর্য্যমিত্র চাঙমা
7. মালাচান- সুনানু আর্য্যমিত্র চাঙমা
ম্যাগাজিন:
1. “মা ভাচ (মাতৃভাষা)” ফগদাঙি: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খগাড়াছড়ি।
2. “চাদি” ১ – ১১ পয়ধে (চাঙমা সাহিত্য পত্রিকা): ফগদাঙি- নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ; ফগদাঙ: ২০২২ খ্রি. ১০ নভেম্বর। ইবে ধারাদিঘলী ফগদাঙ অই যার।
3. “তারুম” কাবিদ্যাঙ: উদয় শংকর চাঙমা, রাঙামাত্যা ফগদাঙ: ১ জুলাই ২০১৭ খ্রি. ২ পয়ধে সং ফগদাঙ।
কবিদে:
1. “ফুল বারেঙ” লেঘিয়্যা- সুনানু আলোময় চাঙমা, ফগদাঙি: কল্পতুরু, রাঙামত্যা, ফগদাঙ: ২০১৮ খ্রি.
2. “ধেবা কুল্যা নাগরি” লেঘিয়্যা: সুনানু সোহেল তালুদার ফগদাঙি: পূর্ণিমা প্রেস, খাগাড়াছড়ি; ফগদাঙ ২০১৯ খ্রি.
3. এচ্যা বিঝুত মা গঙ্গিত তরে দ্বিবে বিঝু ফুল - তরুণ কুমার চাঙমা
4. “জুম চাব” – কাবিদ্যাঙ ইনজেব চাঙমা
5. “আহ্’ভিল্যাচ” লেঘিয়্যা” বিনয় বিকাশ তালুতদার, ফগদাঙি: ২০১৮ খ্রি.
6. “আহ্’লি গাদিয়্যা মালি ফুল” প্রিয়দর্শী চাঙমা
7. মেঘ সেরে মোন’ চুক” সুনানু মৃত্তিকা চাঙমা, ঢাকা বই মেলা ২০১১ খ্রি.
8. নুঅ গরি ফাগোন এযের- ম্যাকলিন চাঙমা
9. ধনপুদি” – সুনানু ইনজেব চাঙমা (ফগদাঙ: নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ- ১ আগষ্ট ২০২২খ্রি.)
10. উত্তিপুত্তি - সুনানু ইনজেব চাঙমা (ফগদাঙ: নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ- ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩খ্রি.)
11. পুগবেল (চাঙমা কবিদ্যা সংকলন)- কাবিদ্যাঙ, ইনজেব চাঙমা; ফগদাঙ: নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ (২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪)
12. আবেদি (চাঙমা কবিদ্যা সংকলন)- ২০২৫ খ্রি.
ছড়া:
1. “জুনিপুক” লেঘিয়্যা: সুনানু শ্যামল তালুকদার, ফগদাঙি: কধা ফগদাঙি, ফগদাঙ: ২০১৭ খ্রি.
2. “ওলি ওলি” কাবিদ্যাঙ: ব্যারিষ্টার সুনানু দেবাশীষ রায় আ সুনানু দেবপ্রিয় চাঙমা
3. মিল কধা নকবাচ” মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন আ জাবারাং
পত্রিকা
1. “করোদি” কাবিদ্যাং সুভাশীষ চাঙমা, ২০১৫ খ্রি তিন পয়ধে সং ফগদাঙ।
2. চাঙমা সাহিত্য পত্রিকা “চাদি” – কাবিদ্যাঙ-ইনজেব চাঙমা ধারাদিঘলী ফগদাঙ অর।
চিজি বই
১. (১) শব্দ কোই,
২. (২) তারুম আ রানজুনি- ইনজেব চাঙমা, সোনামণি চাঙমা, তুহিন চাঙমা।
৩. (১) চিজি অংক তারা,
৪. (২) অঝাপাদর ছড়া,
৫. (৩) এয’ অংক শিঘি- শান্তি চাঙমা, শ্রেয়সী চাঙমা, কে.ভি. দেবাশীষ।
৬. (১) ছড়া বই-
৭. (২) এক সমারে ভালক্কানি- প্রসন্ন কুমার চাঙমা, প্রিয়সী চাঙমা, মণি চাঙমা।
৮. (১) চাঙমা শব্দ বই-
৯. (২) চিজির তালমিলতি কধা- সম্ভুমিত্র চাঙমা, পরেশ চাঙমা, এলিয়েন্স চাঙমা।
১০. (১) হ্’েমান আ পেইক
১১. (২) মনর সবন- জ্ঞানদর্শী চাঙমা, এজেন্সী চাঙমা, পুর্ণাঙ্গ চাঙমা।
১২. (১) আমা ফল পাগোর আ গুলগুলি-
১৩. (২) চিজির অহ্’রক বই- আর্য্যমিত্র চাঙমা, কুশলী চাঙমা, লক্ষীপতি চাঙমা।
১৪. ইক্কুল’ অক্ত- ভবেশ মিত্র চাঙমা, লুসী চাঙমা, নীল চন্দ্র চাঙমা।
অনুবাদ বই
রাজা আ কংজরি
মিলে ফুতবলার আনাই আ আনুচিং মারমা
বাক আ সিংহ
মেলাত আহ্’রা-আহ্’রি
শিয়াল্যা আ ত বোবুয়া
আনাচ মাধাত এ্যাইল মুকুট
রাঙা বল
আহ্’ওচ
মাচ তোগেয়্যা
বঙ্গবন্ধু অসমাপ্ত অত্নজীবনী
অভিধান:
3. চাঙমা-বাঙলা কধাতারা- জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর- ১৯৭৩
4. চাঙমা কধা ভান্ডাল- সি. আর চাকমা- ১৯৮৭
5. চাকমা ডিক্সসিনারি- পিবি কারবারি – ১৯৯৩
6. চাঙজ্জা – ২০০৬
7. দভাকাধি- TSUBP – ২০০৭
8. চাকমা শব্দ ভান্ডাল – আর্য্যমিত্র চাঙমা- ২০১১
- এপ্রিল ১৫, ২০২৬
খদা আগুন ও চাঙমা সমাজ
চাঙমা ভাষায় "খদা" শব্দের অর্থ অশুভ, অমঙ্গল। "খদা আগুন লুরো" বলতে বোঝায় অশুভ আগুন। গ্রামে কেউ অমঙ্গল কিছু দেখলে, বিপদের আভাস পেলে মুরুব্বিরা বলে ওঠেন "খদা আগুন"। এটি সতর্কবার্তা। একটি সাংস্কৃতিক সংকেত যে সমাজের ভিতরে কিছু পুড়ছে, কিছু ভুল হচ্ছে।
আমাদের চাঙমা সমাজটাও কি আজ সেই খদা আগুনে রূপ নিচ্ছে? আমরা ৮০% শিক্ষিত দাবি করি, অথচ সমাজজুড়ে বিভাজন, অবিশ্বাস, স্বার্থের আগুন। তাহলে এই শিক্ষা কি আসলেই জাতির মেরুদণ্ড হচ্ছে, নাকি আমরা শুধু সার্টিফিকেট কুড়াচ্ছি?
শিক্ষা মানে কেবল পড়তে পারা বা ডিগ্রি নেওয়া নয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, "শিক্ষা হলো সেই যা আমাদের কেবল তথ্য দেয় না, জীবনের সঙ্গে সঙ্গতি স্থাপন করায়"।
দিক সার্টিফিকেটধারী প্রকৃত শিক্ষিত
দৃষ্টিভঙ্গি চাকরি ও পদ আমার অধিকার দায়িত্ব ও সেবা আমার কর্তব্য
সমাজের প্রতি আমি আলাদা, আমি উঁচু আমি সমাজের অংশ, সমাধানের অংশ
বিভেদ দেখলে পক্ষ নিয়ে আগুনে ঘি ঢালে যুক্তি দিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা করে
সংস্কৃতি নিয়ে পুরনো সব বাতিল, নয়তো অন্ধ অনুকরণ শিকড় চেনে, সময়ের সাথে মেলায়
ফলাফল ব্যক্তি উন্নতি, সমাজে ফাটল ব্যক্তি ও সমাজ একসাথে আগায়
আজ চাঙমা সমাজে অনেক গ্র্যাজুয়েট, মাস্টার্স, পিএইচডি। কিন্তু গ্রামে দুই বাড়ির ঝগড়া মেটাতে শিক্ষিত ছেলেটা এগিয়ে আসে না। ভোট আসলে শিক্ষিত যুবকটাই দলীয় বিভাজনের পোস্টার লাগায়। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে শিক্ষিত মানুষটাই অন্য গোত্রকে হেয় করে কথা বলে। তাহলে ডিগ্রি থাকলেই কি আমরা মেরুদণ্ড সোজা রাখতে পারছি?
খদা আগুনের লক্ষণ-
১. রাজনৈতিক বিভাজন: একসময় জুম্ম জাতীয়তাবাদ ছিল ঐক্যের মন্ত্র। এখন এক গ্রামে তিনটা দল, চারটা মত। নেতা হতে চায় সবাই, ত্যাগ করতে চায় না কেউ। ফলে বাইরের শক্তি সুযোগ নেয়। এটা খদা আগুন, কারণ ঘর পুড়লে সবাই পোড়ে।
২. অর্থনৈতিক বিভাজন: শিক্ষিত হয়ে চাকরি পেয়ে অনেকে গ্রাম ছাড়ে, শহরে সেটেল হয়। টাকা হলে আত্মীয় ভুলে যায়। আবার গ্রামে যারা থাকে, তাদের ছোট করে দেখে। ধনী-গরিবের দেয়াল উঠে, যা আগে চাঙমা সমাজে এত প্রকট ছিল না। সুন্দর, সুস্থ জুমচাষের সংস্কৃতি ভেঙে ব্যক্তিকেন্দ্রিক লোভ ঢুকছে।
৩. ধর্মীয় বিভাজন: বৌদ্ধ ধর্ম চাঙমার প্রাণ। কিন্তু এখন থেরবাদ, বনবিহার-বৌদ্ধ বিহার,বনভান্তে প্রধান শিষ্য কে , অন্যান্য গুরুবাদ নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়ি। ফেসবুকে শিক্ষিত ছেলেরাই একে অন্যকে "ভণ্ড" বলে গালি দেয়। ধর্ম শান্তির কথা বলে, আমরা ধর্ম দিয়ে অশান্তি ডেকে আনছি। এটাই খদা আগুন।
৪. সামাজিক বিভাজন: দল, উপদল,গোঝা বা গোষ্ঠী নিয়ে অহংকার, জাতি-বেজাতি দ্বন্দ্ব তালিকা লম্বা। বিজু, সাংগ্রাইয়ের মতো উৎসবেও এখন রাজনৈতিক ব্যানার টানাটানি হয়।
কেন এমন হলো? রোগের শিকড়-
• মূল্যবোধহীন শিক্ষা: আমাদের স্কুল-কলেজ নম্বর দেয়, মানুষ বানায় না। জুম্ম ইতিহাস, গর্জন তলার চেতনা, উবগীত — এগুলো পাঠ্যে নেই। ফলে শিকড় কাটা শিক্ষিত তৈরি হচ্ছে।
• ব্যক্তিস্বার্থের উত্থান: বিশ্বায়নের যুগে "আমি" বড় হয়ে গেছে, "আমরা" ছোট হয়ে গেছে। সার্টিফিকেট সেই "আমি"কে আরও ধারালো করেছে।
• নেতৃত্বের সংকট: প্রকৃত মুরুব্বি, কার্বারী, হেডম্যানের জায়গায় এখন ফেসবুক নেতা। যার গলা বড়, সেই নেতা। ত্যাগ ও প্রজ্ঞার দাম কমে গেছে।
• দায়মুক্তি: "সমাজ গোল্লায় যাক, আমি তো ভালো আছি" — এই মনোভাব। শিক্ষিত মানুষটাই সবচেয়ে বেশি নীরব থাকে অন্যায় দেখলে।
খদা আগুন লকলকিয়ে ওঠে তখনই, যখন জাতির মেরুদণ্ডে ঘুণ ধরে। সার্টিফিকেট তখন দেয়ালের শোভা মাত্র, অন্তরের আলো নয়। এই আগুন নেভাতে হলে শিক্ষাকে কেবল কালির অক্ষর থেকে মুক্তি দিয়ে রক্তের অঙ্গীকারে আনতে হবে। শপথ নিতে হবে, মাথা উঁচু রাখার, হাত প্রসারিত করার, আর শিকড় আঁকড়ে ধরার।
অরণ্যে দাবানল লাগলে সর্বাগ্রে নিজের কুটিরটুকু রক্ষা করতে হয়। তেমনি সমাজের খদা আগুন নেভাতে হলে প্রথমে নিজের অন্তরের আঁধার দূর করতে হয়।
জুমের মাটিতে যে শিশু জন্মায়, তার কণ্ঠে যেন প্রথম বুলি হয় মা ভাষার। তার কর্ণে যেন প্রথম মন্ত্র হয় রাধামন-ধনপুদির কাহিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে হাঁটলেও তার চরণ যেন ভুলে না যায় গর্জন তলার ধূলি। যে শিক্ষা তাকে শিকড় থেকে উপড়ে আনে, সে শিক্ষা মেরুদণ্ড নয়, সে তো পঙ্গুত্বের শিকল।
নিজেকে সুধাও, আমার বিদ্যা কি কেবল নিজের উদরপূর্তির জন্য, নাকি যে পাহাড় আমায় ধারণ করেছে, তার ঋণ শোধের জন্য? যে কলম আমি ধরেছি, সে কলম দিয়ে কি আমি শুধু দরখাস্ত লিখব, নাকি আমার জাতির ইতিহাসও লিপিবদ্ধ করব? প্রদীপ নিজে না জ্বললে সে কি পারে অন্যের পথ আলো করতে?
জাতির মহীরুহ জন্ম নেয় গৃহের উঠোনে। যে গৃহে সন্তানকে কেবল প্রথম হওয়ার দৌড় শেখানো হয়, সহমর্মিতার মন্ত্র শেখানো হয় না, সে গৃহেই খদা আগুনের প্রথম স্ফুলিঙ্গ জন্মে।
সন্ধ্যা নামলে জোনাকির আলোয় আজু - বেভে কোল ঘেঁষে বসুক শিশু। শুনুক, কেমন করে উব গীদ গেয়ে আমাদের পূর্বপুরুষেরা দুঃখ ভুলত। পচ্জন শুনিয়ে ঘুম পরাত। জানুক, বিঝু মানে শুধু নবস্ত্র নয়, ফুল নিবেদনে পুরাতন গ্লানি মুছে ফেলার ব্রত। বুঝুক, কিয়াংয়ে দান দিলেই পূণ্য হয় না, যদি পাশের বাড়ির অনাহারী শিশুটির ক্রন্দন কর্ণে না পৌঁছায়।
মৈত্রী, করুণা, মুদিতা, উপেক্ষা: এই চার ব্রহ্মবিহার যদি পারিবারিক শিক্ষার ভিত্তি না হয়, তবে ডিগ্রির পর্বত গড়েও আমরা নৈতিকতায় বামনই থেকে যাব।
চাঙমা সমাজ একদিন একতার বীণায় সুর তুলত। আজ সেই বীণার তার ছিঁড়ে গেছে। দল, উপদল, গোঝা, গুরুবাদ, বুদ্ধ-বন: বিভেদের শত খণ্ডে আমরা বিচ্ছিন্ন। খদা আগুন এই বিচ্ছিন্নতার শুষ্ক কাষ্ঠেই দাউদাউ করে জ্বলে।
হে শিক্ষিত যুবক, তোমার লেখনী থামাক এই বিষবাষ্প। ফেসবুকের প্রান্তরে যখন দেখো ভ্রাতা ভ্রাতাকে কটু কথা বলছে, তুমি সেখানে বিবেকের সেতু হও। উৎসবের আঙিনায় যখন দেখো রাজনীতির ধ্বজা উড়ছে, তুমি সেখানে সংস্কৃতির চন্দ্রাতপ টাঙিয়ে দাও। মনে রেখো, তর্জনীর আস্ফালনে আগুন বাড়ে, করপুটের মিনতিতে আগুন নেভে।
বিঝুর পাজন যেমন বহু শাক-সবজি মিশ্রণে অমৃত হয়, তেমনি বহু মতের মিলনেই জাতি মহৎ হয়। ভিন্নতা থাকুক, বিদ্বেষ নয়।
আমাদের পাঠশালা, মহাবিদ্যালয় যেন শুধু নম্বরের কারখানা না হয়। সেখানে সরস্বতীর সাথে যেন কল্পতরুরও আবাহন হয়।
পাঠ্যক্রমের পত্রে পত্রে থাকুক জুম্ম পাহাড়ের রক্তাক্ত ইতিহাস। থাকুক চাকমা রাজাদের গৌরবগাথা, থাকুক মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার স্বপ্নের কথা। ছাত্র যখন শেক্সপিয়র পড়বে, তখন যেন সে শিবচরণ চাঙমাকেও চেনে। যখন সে নিউটন আওড়াবে, তখন যেন সে নিজের জাতির নবজাগরণের সূত্রও খোঁজে।
কিয়াংয়ের চত্বর কেবল ধর্মীয় স্থান নয়, হোক জ্ঞানের মুক্তাঙ্গন। সপ্তাহান্তে সেখানে বসুক জ্ঞানচক্র। শিক্ষিত তরুণ শেখাক আধুনিক বিজ্ঞান, মুরুব্বি শেখাক জীবনের দর্শন। এই বিনিময়েই খদা আগুনের বিপরীতে প্রজ্ঞার হোমানল জ্বলবে।
শিক্ষা যদি ভীরুতার নামান্তর হয়, তবে সে শিক্ষা ক্লীবের ভূষণ। মেরুদণ্ডের অর্থই হলো মাথা নত না করা।
ভূমি আমার মা। সেই মায়ের অঙ্গচ্ছেদ হলে নীরব থাকা কিসের শিক্ষা? সংবিধানের পাতায় আমার অস্তিত্বের স্বীকৃতি না থাকলে কলমের কালি দিয়ে কী হবে? পার্বত্য চুক্তির প্রতিশ্রুতি ধুলায় লুটালে আমার ডিগ্রি কি আমায় মুক্তি দেবে?
হে শিক্ষিত, তুমি ব্যবসায়ী হও, বিজ্ঞানী হও, কিন্তু সবার আগে হও প্রহরী। তোমার পাহাড়ের, তোমার ভাষার, তোমার অস্তিত্বের। দশটি চাকরির পেছনে ছোটার চেয়ে একটি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা শ্রেয়। কারণ স্বাবলম্বনই সর্বোত্তম প্রতিরোধ।
প্রাচীন প্রবচন বলে, "যে আগুন লাগায়, নেভানোর জল তার কলসিতেই থাকে"। চাঙমা সমাজের এই খদা আগুন আমরাই লাগিয়েছি, আমাদের লোভে, আমাদের অনৈক্যে, আমাদের আত্মবিস্মৃতিতে।
তাই নেভানোর দায়ও আমাদেরই। কলসি আমাদের শিক্ষা। কিন্তু কলসি যদি শূন্য হয়, কেবল বাইরে কারুকার্য থাকে, তবে আগুন নিভবে না। কলসি পূর্ণ করতে হবে ত্যাগের জলে, ঐক্যের জলে, আত্মপরিচয়ের সুপেয় স্রোতে।
শিক্ষা যেদিন মেরুদণ্ডের শপথ নেবে, সেদিন খদা আগুন রূপান্তরিত হবে ধুনির আগুনে। সে আগুনে ঘর পোড়ে না। সে আগুনে শীত কাটে, অন্ন ফোটে, আর অন্ধকারে পথ দেখায়।
এসো, সেই শুভ আগুনের প্রতীক্ষায় আমরা সবাই নিজ নিজ কলসি কাঁখে তুলি।
- এপ্রিল ১২, ২০২৬
অঝাপাতের প্রদীপ: চাঙমা সাহিত্যের শিকড় থেকে শিখরযাত্রা
চাঙমা সাহিত্য কেবল শব্দের বিন্যাস নয়, এটি এক জাতির আত্মপরিচয়ের দীপ্ত উচ্চারণ। এককালে এই সাহিত্য চর্চা হতো নিজস্ব অঝাপাত বা চাঙমা বর্ণমালায়। “গোজেন লামা”, “মা-বাবর বারমাস”, “লক্ষীপালা” কিংবা “চান্দবি”—এসব গ্রন্থ ছিল পাহাড়ি জনপদের প্রকৃত হৃদস্পন্দন। অঝাপাতের হরফে লেখা পুঁথিগুলো একসময় ঘরে ঘরে উচ্চারিত হতো; গানে-কথায় বয়ে চলত প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
কালের নির্মম স্রোতে নিজস্ব লিপির ব্যবহার ক্ষীণ হয়ে আসে। জীবনের তাগিদে ও রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার চাপে চাঙমা মনন আশ্রয় নেয় বাংলা বর্ণমালায়। তবে ভাষা তার মাধুর্য হারায়নি, বরং সেজেছে নতুন বসনে।
১৯৩৬ সাল—চাঙমা সাহিত্যের আধুনিক যাত্রার এক মাইলফলক। চাঙমা রাজবাড়ি থেকে প্রকাশিত “গৈরিকা” পত্রিকায় বাংলা হরফে প্রথম আধুনিক চাঙমা কবিতা লেখেন চিত্রশিল্পী সুনানু চুণিলাল দেওয়ান। তাঁর পথ ধরে কলম ধরেন সুনানু মুকুন্দ চাঙমা ও সুনানু সলিল রায়। সেই যে শুরুর যাত্রা, তারপর আর থামেনি।
সত্তরের দশক ছিল চাঙমা সাহিত্যের নবজাগরণ। চাঙমা ভাষায় নতুন গান, কবিতা ও নাটক কেবল রচিতই হয়নি, বরং নিয়মিত মঞ্চস্থ হতে থাকে। সাহিত্যের এই ধারায় যোগ হয় নতুন মাত্রা—উপন্যাস। সুনানু আর্য্যমিত্র চাঙমা-র ৪টি চাঙমা উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার মধ্য দিয়ে এই ভাষার গদ্য সাহিত্যের ভিত্তি আরও মজবুত হয়। পরবর্তীতে কম্পিউটারে ব্যবহারোপযোগী চাঙমা ফন্ট উদ্ভাবিত হওয়ার পর নিজস্ব বর্ণমালাও আবার মুদ্রণের আলোয় ফেরার সুযোগ পায়।
এই সমৃদ্ধ ধারাকে সময়ের সাথে শাণিত করেছেন একঝাঁক কালজয়ী স্রষ্টা: দীপংকর শ্রীজ্ঞান চাঙমা, ড. ভগদত্ত খীসা, সুহৃদ চাঙমা ও কবিতা চাঙমা। মৃত্তিকা চাঙমা, প্রমোদ বিকাশ কার্বারী (ফেলাযেয়া চাঙমা), বীর চাঙমা ও কৃষ্ণ চন্দ্র চাঙমা। পরমানন্দ চাঙমা, রণজিত দেওয়ান, সমিত রায়, চিরজ্যোতি চাঙমা, শান্তিময় চাঙমা ও ঝিমিত ঝিমিত চাঙমা প্রমুখ।
তাঁদের ছড়া, কবিতা, গীত ও নাটক চাঙমা সাহিত্যের ভাণ্ডারকে করেছে ঐশ্বর্যময়। সম্প্রতি জাবারাং ভাষা বিকাশ উদ্যোগ ও কক ক্রিয়েটিভিটিস-এর যৌথ প্রয়াসে প্রকাশিত “আবেদি” (১২তম কবিতা সংকলন) প্রমাণ করে অঝাপাত মরেনি, সে ফিরছে নতুন প্রজন্মের হাতে।
যদিও ২০২৬ সালের বিঝু উৎসবে নতুন কোনো গ্রন্থের সুবাস সেভাবে পাওয়া যায়নি, তবু চাঙমা সাহিত্য একাডেমির “হিলর পচ্জন” ও “চাদি” পত্রিকা দুটি নিয়মিত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখছে। তবে সাফল্যের আড়ালে কিছু বেদনার ক্ষতও রয়ে গেছে। কবি উদয় শংকর চাঙমার “আন্নো খেইয়্যা ডাইয়িরে” কবিতাগ্রন্থটি কেবল অর্থাভাবে আলোর মুখ দেখতে পারছে না। প্রকাশ পেলে হয়তো এবারের বিঝু আরও রঙিন এবং জাতির কণ্ঠস্বর আরও শাণিত হতো।
চাঙমা সাহিত্য অঝাপাতে জন্ম নিয়ে বাংলা হরফের নৌকায় চড়ে আধুনিকতার সমুদ্র পাড়ি দিয়েছে। আজ সে আবার ফিরতে চাইছে নিজের লিপির ঘরে। এই ফেরার পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়—আর্থিক দৈন্য, প্রাতিষ্ঠানিক উদাসীনতা আর পাঠকের সংকট তো রয়েছেই। তবু যতদিন “হিলর পচ্জন”-এর পাতা উল্টাবে কোনো কিশোর, যতদিন “চাদি”-তে ছাপা হবে নতুন কবিতা, ততদিন চাঙমা সাহিত্যের প্রদীপ নিভবে না।
ভাষা মরে না, সে কেবল অপেক্ষায় থাকে—একটি যোগ্য উচ্চারণের এবং একজোড়া মমতাভরা হাতের, যে তাকে আবার লিখবে অঝাপাতে, পড়বে এবং ভালোবাসবে। চাঙমা সাহিত্য তাই শুধু অতীতের স্মৃতি নয়, সে এক সোনালী ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি।
- এপ্রিল ১১, ২০২৬
কাপ্তাই হ্রদ এক নীল দর্পণে হাজারো অশ্রুবিন্দু
পার্বত্য চট্টগ্রামের বুকে নীল জলরাশির বিস্তার নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাপ্তাই লেক। বাইরের মানুষের কাছে এটি অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। কিন্তু চাকমা সহ পাহাড়ের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর কাছে এই লেকের প্রতিটি ঢেউ একেকটি দীর্ঘশ্বাস। এটি শুধু জলাধার নয়, এটি একটি জাতির বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস, চোখের পানির দলিল।
ইতিহাসের পাতায় ১৯৬০-এর দশক এক বিষাদময় অধ্যায়। উন্নয়নের করাল গ্রাসে সেদিন কয়েক লক্ষ মানুষকে তাদের পৈতৃক ভিটেমাটি থেকে উৎখাত করা হয়েছিল। এই নির্বাসন বা ‘বরপরং’ কেবল স্থান পরিবর্তন ছিল না, তা ছিল শেকড় থেকে ছিন্ন হওয়ার নামান্তর। সেই হারানো মানুষেরা ভারতের অরুণাচল, মিজোরাম ও ত্রিপুরার বন্ধুর পথে পথে ঘুরে বেরিয়েছে; আজও তারা পরবাসে নিদারুণ কষ্টে তাদের অস্তিত্বের প্রদীপ জ্বালিয়ে রাখছে। যে হ্রদে আজ সূর্যের আলো ঝিলমিল করে, তার নিচেই তলিয়ে গেছে কয়েক প্রজন্মের সোনালি স্মৃতি আর শত শত গ্রামের চিহ্ন।
সময়ের পরিক্রমায় এই হ্রদকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে নতুন জীবনযাত্রা। নীল জলে জাল ফেলে মানুষ জীবিকা নির্বাহ করছে, জলপথের সহজ যাতায়াতে জীবন হয়েছে কিছুটা গতিশীল। কিন্তু এই বাহ্যিক সুবিধা কি সেই গভীর ক্ষতকে উপশম করতে পেরেছে? মাছ আর পানির প্রাচুর্য কি ভিটেমাটি হারানোর হাহাকার মুছে দিতে পারে? প্রবন্ধের ছত্রে ছত্রে উঠে আসে সেই অমীমাংসিত সত্য—পেটের খিদে হয়তো মিটছে, কিন্তু মনের গহিনে ভূমি হারানোর শঙ্কা আজও অমোঘ।
আধুনিকতার নামে পর্যটন আজ এক ভয়ংকর রূপ নিয়ে আবির্ভূত হয়েছে। সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু পাহাড়ের মানুষের ভূমি অধিকার আজও সুদূরপরাহত। পর্যটন বিকাশের রঙিন মোড়কে আদিবাসীদের ভূমি থেকে বিচ্যুত করার এক সুক্ষ্ম ও কুটিল প্রক্রিয়া চলছে। সাজেকের বুকে ত্রিপুরারা আজ ভূমিহীন হওয়ার পথে, পাংখোয়া আর লুসাইরা অভিমানী মেঘের মতো দেশান্তরিত হয়ে মিশে গেছে মিজোরামের পাহাড়ে। কাজল তালুকদারের কণ্ঠে সেই ভীতিই প্রতিধ্বনিত হয়েছে—ছলচাতুরীর আশ্রয়ে যেভাবে জমি কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, তাতে একদিন হয়তো নিজেদের পাহাড়েই পরবাসী হতে হবে পাহাড়ের সন্তানদের।
ব্রিটিশ আমলের ১৯০০ সালের আইন (1900 Act) পাহাড়ের মানুষের জন্য ছিল এক সুরক্ষাবর্ম। এটি ছিল তাদের ঐতিহ্য ও ভূমির অধিকার রক্ষার দলিল। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, সেই ঐতিহাসিক অধিকারও আজ হরণের অপচেষ্টা চলছে। ভূমি যদি সুরক্ষার আইনি ভিত্তি হারায়, তবে পাহাড়ের মানুষের অস্তিত্ব বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়বে।
কাপ্তাই হ্রদের জল নীল হলেও এর ভেতরে মিশে আছে আদিবাসীদের লোনা জল। ভূমিহীন মানুষ ডানা ভাঙা পাখির মতো দিশেহারা। তাই উন্নয়ন যেন কেবল কংক্রিটের দালান আর বিলাসিতার পর্যটনে সীমাবদ্ধ না থাকে; উন্নয়ন হতে হবে মানুষের অধিকারকে সম্মান জানিয়ে। যদি পার্বত্যবাসীর ভূমির সুরক্ষা নিশ্চিত করা না হয়, তবে এই ক্ষোভ ও বঞ্চনার আগুন একদিন পাহাড়ের শান্তিকে গ্রাস করবে। কাপ্তাই হ্রদের শান্ত জল আমাদের মনে করিয়ে দেয়—শেকড় ছাড়া কোনো মহীরুহ যেমন বাঁচতে পারে না, ভূমি ছাড়া কোনো জাতিও তেমনি টিকে থাকতে পারে না।
[গতকাল (১০ এপ্রিল ২০২৬) রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কাজল তালুকদার এক অনুষ্ঠানে এসব মন্তব্য করেন। তাঁর বক্তব্যে পাহাড়ের মানুষের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বেদনা ও শঙ্কার প্রতিধ্বনি উঠে এসেছে।]
- এপ্রিল ১০, ২০২৬
লোগাং: রক্তের নদীর ধারে দাঁড়িয়ে
আজ ১০ই এপ্রিল।
আজ এমন এক দিনের কথা বলতে হয়, যেদিন পাহাড় কেবল পাহাড় ছিল না—পাহাড় ছিল ক্ষতবিক্ষত স্মৃতি।
পাহাড়ের ভেতরে, খাগড়াছড়ি জেলার পানছরি উপজেলায়, একটি নদী আছে—লোগাং। সেই নদীর পাড়ে গড়ে উঠেছিল একটি গুচ্ছগ্রাম। সবুজে মোড়া সেই জনপদে একসময় ছিল ছয়শোর কাছাকাছি কাঁচা ঘর, পরিবার, শিশুদের হাসি, নারীদের শ্রম, আর পাহাড়ি জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ।
সময়টা ১৯৯২ সাল। সামরিক শাসনের পতনের পর দেশ নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি, প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। পাহাড়ের মানুষের জীবনে কিন্তু সেই পরিবর্তনের কোনো আলো পৌঁছায়নি।
ঘটনার সূচনা ছিল একেবারেই সাধারণ। গ্রামের একটু দূরে, দুই পাহাড়ি কিশোরী ঘাস কাটতে গিয়েছিল। আশপাশে কেউ ছিল না। সেখানেই হাজির হয় কয়েকজন বাঙালি সেটেলার যুবক। উত্যক্ত করার চেষ্টা, অসৎ উদ্দেশ্যের প্রকাশ—এক পর্যায়ে পরিস্থিতি আত্মরক্ষার সীমা ছাড়িয়ে যায়। হাতে থাকা দা দিয়ে আঘাত লাগে এক যুবকের। পরে সে খাগড়াছড়ি হাসপাতালে মারা যায়।
এই মৃত্যুকে কেন্দ্র করেই রটানো হয় মিথ্যা অভিযোগ—গুচ্ছগ্রামে শান্তিবাহিনী ঘাঁটি গেড়েছে, তারাই নাকি হত্যার জন্য দায়ী।
১০ই এপ্রিল, দুপুরবেলা। কয়েকশ বাঙালি সেটেলার, তাদের সঙ্গে অস্ত্রধারী ভিডিপি, আনসার ও বিডিআর—লোগাং গ্রাম ঘিরে ফেলে। নির্দেশ দেওয়া হয়: সবাই ঘরের ভেতরে ঢুকবে।
তারপর শুরু হয় পরিকল্পিত ধ্বংস।
এক এক করে প্রতিটি ঘরে আগুন লাগানো হয়। যারা ভয়ে ঘর ছেড়ে বেরোতে চেয়েছে, তারা আর ফিরে আসেনি। কেউ গুলির মুখে পড়েছে, কেউ দেশীয় অস্ত্রের আঘাতে নিথর হয়েছে। কেউ আবার ঘরের ভেতরই আটকা পড়ে আগুনে প্রাণ হারিয়েছে। শিশু, নারী, বৃদ্ধ—কেউ রেহাই পায়নি।
গ্রামের মাত্র আড়াইশ মিটার দূরে ছিল বিডিআর ক্যাম্প। নিরাপত্তার প্রতীক যারা, তারা সেদিন নীরব ছিল না—প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা হামলাকারীদের পাশেই দাঁড়িয়েছিল।
এই হত্যাকাণ্ডে কতজন প্রাণ হারিয়েছিল—তার কোনো নির্ভুল সংখ্যা নেই।
পরদিন খাগড়াছড়ি স্থানীয় সরকার পরিষদের চেয়ারম্যানকে আংশিক এলাকা দেখতে দেওয়া হয়। তিনি ১৩৮টি মৃতদেহ দেখতে পান। একজন বাঙালি চিকিৎসক বলেন, তিনি প্রায় ৩০০ পর্যন্ত গুনতে পেরেছিলেন — তারপর আর পারেননি।
সাড়ে পাঁচশোর মতো ঘর ভস্মীভূত হয়। যারা বেঁচে গিয়েছিল, তারা সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পরই কেবল অনেকে ফিরতে পারে।
এই হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতার বর্ণনা উঠে এসেছে Amnesty International-এর প্রতিবেদনে, এবং বিপ্লব রহমানের পাহাড়ে বিপন্ন জনপদ গ্রন্থে—প্রত্যক্ষদর্শীদের কণ্ঠে।
ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যেই ঢাকা থেকে সাংবাদিক, আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীদের একটি দল লোগাংয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। সেই দলে ছিলেন আনু মুহাম্মদ, সারা হোসেনের মতো মানুষ। কিন্তু পানছরির এক সামরিক ক্যাম্পেই তাঁদের আটকে দেওয়া হয়। লোগাংয়ে যাওয়ার অনুমতি মেলেনি।
সে সময় পাহাড় জুড়ে চলছিল বিঝু উৎসবের প্রস্তুতি। কিন্তু সেই বছর পাহাড়ি ছাত্র ও তরুণরা বিঝু বর্জনের ডাক দেয়। উৎসব হয়নি। আনন্দের জায়গায় ছিল শোক।
আজও প্রতিবছর বিঝু আসে। আমরা উৎসব করি। কিন্তু ফুল বিজুর দিনে, লোগাং নদীর জলে আমরা কয়েক ফোঁটা চোখের জল মিশিয়ে দিই।
আজ থেকে ৩৪ বছর আগে, এই দিনেই, পানছরির লোগাং গ্রাম চাকমাদের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল। গাঢ় সবুজ অরণ্যের বুকে এক ছোপ লাল—একটি পতাকার মতোই, কিন্তু সে পতাকা ছিল মৃত্যু আর বেদনার।
তরুণ বাঙালি বন্ধুরা, আপনাদের কাছে বিনীত অনুরোধ—এই ঘটনাটি মনে রাখবেন।
এটা আপনাদের ব্যক্তিগত অপরাধ নয়, কিন্তু ইতিহাসের দায়। কী করবেন জানি না—শুধু ভুলে যাবেন না।
লোগাং নামে একটি পাহাড়ি নদী আছে—অ লোগাং।
সেদিন সে নাম কেবল অর্থ ছিল না, বাস্তবতা ছিল।
পহেলা বৈশাখের পাঁচ দিন আগে, এক ফোঁটা চোখের জল ফেলবেন—আপনাদের কয়েকশ পাহাড়ি ভাইবোনের স্মরণে।
এইটুকু তো নিশ্চয়ই পারবেন।
আজ লোগাং গণহত্যার ৩৪ বছর।
আজ পাহাড় আবার উৎসবের পথে হাঁটছে—বিঝু, বৈসু, সাংগ্রাই, বিষু, বিহু, চাংক্রান—জীবনের উৎসবে।
কিন্তু সেই উৎসবের স্রোতের নিচে এখনো বইছে এক নীরব রক্তের নদী—লোগাং।
তথ্য: জুম্ম সংবাদ বুলেটিন
- এপ্রিল ১০, ২০২৬
শান্তির সুখবর, নাকি পুরোনো ক্ষতের ওপর নতুন প্রলেপ?
“পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তি নিয়ে সুখবর আসবে”—মন্ত্রীর কণ্ঠে উচ্চারিত এই বাক্য খবরের কাগজের শিরোনামে যেন এক টুকরো রোদ্দুর হয়ে ঝরে পড়ে। অথচ সেই রোদ পাহাড়ের গহিনে পৌঁছায় না। সেখানে বহুকাল ধরে জমে থাকা ছায়া, দীর্ঘশ্বাস আর না-শুকানো রক্তের দাগ। স্বাধীনতার ঊষালগ্ন থেকে জুম্ম জনগোষ্ঠীর মাথার ওপর দিয়ে যে রাষ্ট্রীয় লাঙলের ফলা চলেছে, তার ফসল কি সত্যিই শান্তি? নাকি সেই লাঙলের প্রতিটি টানে তাদের স্বর্গভূমি তিলে তিলে শ্মশানের নীরবতা ধারণ করেছে?
শান্তি কোনো মঞ্চের মাইকে ঘোষিত পঙ্ক্তি নয়। শান্তি কোনো প্রজ্ঞাপনের কালিতে লেখা অনুচ্ছেদ নয়। শান্তি হলো সেই নদী, যা ন্যায়ের উৎস থেকে উৎসারিত হয়ে সম্মানের উপত্যকা পেরিয়ে আত্মপরিচয়ের সাগরে গিয়ে মেশে।
যখন বিচারহীনতার রাত্রি ফুরায় না, যখন নিজভূমে পরবাসী হয়ে বাঁচতে হয়, যখন মাতৃভাষার শব্দগুলো রাষ্ট্রের দরজায় কড়া নেড়ে ফিরে আসে—তখন ‘শান্তি’ শব্দটি কেবল একটি ধ্বনিমাত্র। তার ভেতরে প্রাণ থাকে না।
পার্বত্য মন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্বকীয় কৃষ্টি-সংস্কৃতি রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, “পাহাড়ি-বাঙালি ভেদাভেদ নেই।” আহা, কী স্নিগ্ধ উচ্চারণ!
কিন্তু পাহাড়ের বুক চিরে শুনুন। কর্ণফুলী কি সেই সমতার কলকল গায়? সাজেকের মেঘ কি আজও নিঃসংকোচে জুমঘরে নেমে আসে?
বাস্তবের পাহাড় বলে ভিন্ন কথা। যেখানে সম্মতিহীন মানচিত্রে ভূমি অধিগ্রহণের কালো দাগ পড়ে, যেখানে ‘নিরাপত্তা’ নামের লৌহকপাট সংস্কৃতির উঠানে ঝুলে থাকে, সেখানে ‘ভেদাভেদ নেই’ এই বাক্যটি রাজনীতির সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো একটি ছবি হয়ে যায়। ছবির ভেতর জীবন নেই।
উনিশশো সাতানব্বই সালের দুই ডিসেম্বর। একটি কলম, একটি কাগজ, একরাশ স্বপ্ন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হলো। পাহাড় ভেবেছিল, এই বুঝি তার দীর্ঘ রাত্রির অবসান।
অথচ আটাশটি বসন্ত পার হয়ে গেল। চুক্তির অক্ষরগুলো কাগজের কারাগারে বন্দি রয়ে গেল। ভূমি কমিশন নামের ঠোঁটে হাসি নেই, কাজ নেই। তার টেবিলে জমে থাকা হাজার হাজার দরখাস্ত ধুলোর সঙ্গে মিশে পুরাণ হয়ে যাচ্ছে। স্বায়ত্তশাসনের প্রতিশ্রুতি আজও দূরের পাহাড়চূড়ায় মেঘের মতো ভাসে। ধরা দেয় না। আর অস্থায়ী ক্যাম্পের ‘অস্থায়ী’ শব্দটি স্থায়ী হতে হতে পাহাড়ের অভিধানে নতুন অর্থ লিখেছে।
এই ক্ষতবিক্ষত বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আবার যখন “সুখবর”-এর ডমরু বাজে, তখন পাহাড়ের বুক কেঁপে ওঠে। এ বুঝি নতুন সুর, নাকি পুরোনো রাগিণীর পুনরাবৃত্তি?
শান্তিরও রঙ আছে। যদি শান্তির রঙ হয় একরঙা, যদি শান্তির অর্থ হয় সবাইকে একই ছাঁচে ঢেলে নেওয়া, যদি শান্তির নাম হয় রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের শিকলকে ফুল দিয়ে সাজানো—তবে সে শান্তি জুম্ম জনগোষ্ঠীর জন্য শান্তি নয়। সে এক সুনিপুণ অভিশাপ।
জুম্ম মানুষের শান্তি অন্যরকম। তাদের শান্তি হলো জুমের আগুন নেভার পর নিশ্চিন্ত ঘুম। তাদের শান্তি হলো নিজের বাগানের আমগাছে নিজের অধিকার। তাদের শান্তি হলো বিজু, সাংগ্রাই, বৈসাবিতে বন্দুকের ছায়া ছাড়া নাচের অধিকার। তাদের শান্তি হলো আদালতে নিজের ভাষায় কান্নার অর্থ বোঝাতে পারা।
শান্তি আসে না ভাষণে। শান্তি আসে ফিরিয়ে দেওয়ায়। শান্তি আসে ভূমির দলিল ফিরিয়ে দিলে।
শান্তি আসে চুক্তির প্রতিটি অক্ষরকে পাহাড়ের পাথরে, নদীর স্রোতে, মানুষের ঘরে প্রাণ দিলে।
শান্তি আসে যখন রাষ্ট্র পাহাড়কে ‘সমস্যা’র চোখে না দেখে ‘সম্পদে’র চোখে দেখে। যখন সে বোঝে, বাংলাদেশের মানচিত্র কেবল সমতলের সবুজে নয়, পাহাড়ের বুনো ফুলেও আঁকা।
এই সত্য ছাড়া যেকোনো “সুখবর” কেবল পুরোনো ক্ষতের ওপর নতুন প্রলেপ। প্রলেপে ক্ষত ঢাকে, কিন্তু ভেতরে পচন ধরে। আর সেই পচনের গন্ধ একদিন ইতিহাসের পাতায় লেখা থাকবে এই বলে—
স্বাধীনতার পর থেকে একটি জাতির মাথার ওপর দিয়ে হালচাষ চলেছিল। আর তাদের স্বর্গভূমি তিলে তিলে শ্মশান হয়েছিল। ক্ষত সারাতে হলে আগে প্রলেপ সরাতে হয়। আলো আর হাওয়া লাগাতে হয়। তারপরই কেবল শান্তি নামের বনফুল ফোটে।
- এপ্রিল ০৯, ২০২৬
দিঘীনালার আকাশে বিঝুর রঙ
বিঝু আসে কেবল ক্যালেন্ডারের পাতায় নয়—বিঝু আসে স্মৃতিতে, শিকড়ে, রক্তের ভেতর বহমান এক ইতিহাস হয়ে। দিঘীনালার আকাশে যখন রঙিন বেলুন উড়ে উঠল, তখন তা নিছক একটি মেলার উদ্বোধন ছিল না; ছিল শতাব্দীর সংগ্রাম, টিকে থাকার লড়াই এবং জাতিগত স্মৃতির এক অনুচ্চারিত ঘোষণা।
৮ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি. বিকাল ৫টা ৩০ মিনিটে দিঘীনালায় অনুষ্ঠিত বিঝু মেলার শুভ উদ্বোধন যেন সেই ইতিহাসেরই এক দৃশ্যমান রূপ। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জেএসএস (এমএন লারমা গ্রুপ)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বিমল কান্তি চাঙমা এবং চাঙমা জাতির ঐতিহ্যবাহী নেতৃত্বের প্রতীক ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়। সভাপতিত্ব করেন বোয়ালখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান চয়ণ বিকাশ চাঙমা। সঞ্চালনায় ছিলেন সমীর চাঙমা, আর স্বাগত বক্তব্যে ইতিহাস ও ভাষার সেতুবন্ধন ঘটান চাঙমা ভাষা গবেষক আনন্দ মোহন চাঙমা।
বক্তৃতায় বিমল কান্তি চাঙমা স্মরণ করিয়ে দেন—বিঝু মানে শুধু হাসি-খুশির উৎসব নয়; বিঝু মানে ইতিহাস। তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত সেই অমোঘ সত্য—“চাঙমা যেখানে, সেখানেই বিঝু”—একটি বাক্যের ভেতরেই ধারণ করে পাহাড়, জঙ্গল, নদী আর মানুষের অবিরাম যাত্রার কাহিনি। একসময় দিঘীনালা ছিল গভীর অরণ্য—হিংস্র প্রাণীর আবাস, ভয় আর অনিশ্চয়তার নাম। বাঘের থাবায় প্রাণ হারিয়েছে কত মানুষ; তবু মানুষ থামেনি। প্রতিকূল প্রকৃতি ও বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে, অনাবাদী জমিকে আবাদে রূপান্তর করে, জীবনকে আঁকড়ে ধরে চাঙমারা আজও টিকে আছে। সেই টিকে থাকার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়েই তারা আজও বিঝু উদযাপন করে।
চাঙমা রাজা ব্যারিস্টার দেবাশীষ রায়ের কণ্ঠে উঠে আসে ইতিহাসের আরও গভীর এক অধ্যায়। তিনি স্মরণ করান ১৯১৪ সালের ঘটনা—রাজা ভূবন মোহন রায়-এর আমলে ব্রিটিশ শাসকরা মিঙিনি রিজার্ভ এলাকায় জুম চাষ বন্ধ করতে সৈন্য পাঠাতে উদ্যত হয়েছিল। তখন রাজা দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, “সৈন্য লাগবে না—এটা আমাদের বিষয়।” সেই আত্মমর্যাদাপূর্ণ ঘোষণাই জন্ম দেয় প্রতিবাদের। সান্তু চাকমা (কারবারি)-র নেতৃত্বে জুমচাষিরা ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। শেষপর্যন্ত ব্রিটিশ সরকার বাধ্য হয় জুম চাষ মেনে নিতে। এই সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অঞ্চলটি চাঙমা সার্কেলের অংশ হয়ে ওঠে—মাটি পায় তার মালিকানা, মানুষ পায় তার অধিকার।
রাজা আরও বলেন, সময় বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে। অনেকেই নতুন প্রজন্মকে নিয়ে হতাশ; কিন্তু তিনি আশাবাদী। তাঁর চোখে আজকের তরুণরা আগের চেয়ে বেশি জ্ঞানী, বেশি সচেতন। লাল-সবুজ পতাকা হাতে ঋতুপূর্ণা চাঙমা, মনিকা চাঙমা ও রূপনা চাঙমা, কিংবা বিশ্বমুখী যাত্রায় সুরাকৃষ্ণ চাঙমা—তারা কেবল ব্যক্তি নয়; তারা একটি জাতির মুখ, একটি ইতিহাসের প্রতিনিধি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর যখন দিঘীনালা, খাগড়াছড়ি, গুইমারা ও রাঙ্গামাটি জ্বলছিল, তখন এই নতুন প্রজন্মই রাজপথে নেমে এসেছিল—ন্যায়, অধিকার ও অস্তিত্বের পক্ষে।
বিঝুর মানবিক দর্শন এই প্রেক্ষাপটে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একসময় বিঝু মানে ছিল ঘরে ঘরে আদর-স্নেহের আদান-প্রদান—বুড়বুড়িদের গোসল করানো, হাঁস-মুরগি আদার দেওয়া, গরিব-দুঃখীদের ধান-চাল দিয়ে সহায়তা করা। এই সহমর্মিতা, এই সামাজিক বন্ধনই বিঝুর প্রকৃত প্রাণ। উৎসবের চাকচিক্য বদলাতে পারে, সময়ের সঙ্গে রীতিও বদলাতে পারে; কিন্তু এই মূল্যবোধ হারিয়ে গেলে বিঝু কেবল একটি আয়োজন হয়ে থাকবে—আত্মাহীন এক অনুষ্ঠান।
উল্লেখ্য, ২০১৯ খ্রি. চাঙমা সাহিত্য একাডেমির উদ্যোগে দিঘীনালায় বিঝু মেলার সূচনা হয়, যা আজও ধারাবাহিকভাবে চলমান। দিঘীনালার বিঝু মেলা তাই শুধু আনন্দের আয়োজন নয়—এ এক জীবন্ত ইতিহাস, এক চলমান সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে একটি নীরব আহ্বান—
শিকড় ভুলে যেও না; কারণ শিকড়েই আছে তোমার পরিচয়, তোমার শক্তি, তোমার বিঝু।
- এপ্রিল ০৮, ২০২৬
বই পড়েই বাঁচবে ভাষা, জাগবে জাতি
ভাষার প্রাণটা ঠিক কোথায় থাকে—এই প্রশ্নটা আজ আমাদের নতুন করে ভাবতে হচ্ছে।
বর্ণমালা শিখলেই কি ভাষা বাঁচে? ব্যাকরণের নিয়ম মুখস্থ করালেই কি একটি জাতির ভাষা সমৃদ্ধ হয়?
দীর্ঘদিন মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে চাঙমা সাহিত্য একাডেমি একটি মৌলিক সত্য উপলব্ধি করেছে—ভাষার আসল শক্তি থাকে পাঠকের হৃদয়ে। থাকে বই পড়ার অভ্যাসে। বই ছাড়া ভাষা কেবল অক্ষরের কাঠামো হয়, প্রাণ পায় না।
এই উপলব্ধি থেকেই ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুরু হয় বই পড়া আন্দোলন। এই উদ্যোগের উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচালক সুনানু জিতেন চাঙমা। প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দিঘীনালা উপজেলা সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নবকমল চাঙমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কাচালং সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ সুনানু দেবপ্রসাদ দেওয়ান, চাঙমা ঔপন্যাসিক আর্য্যমিত্র চাঙমা ও চাঙমা সাহিত্য একাডেমি সুনানু ত্রিদিব কান্তি চাঙমা।
এই আন্দোলন যে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়, তার প্রমাণ মেলে পরবর্তী কার্যক্রমে।
২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দিঘীনালা সরকারি কলেজে বই পড়া আন্দোলনের শুভ উদ্বোধন করেন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা পদকপ্রাপ্ত মাচাং মথুরা বিকাশ ত্রিপুরা। প্রধান অতিথি হিসেবে ছিলেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ সুনানু তরুন কান্তি চাঙমা। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সুনানু ড. রুপন চাঙমা ও সাবেক শান্তি বাহিনী সুনানু দীপঙ্কর প্রসাদ চাঙমা।
এরপর ২০২৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দিঘীনালার প্রতিটি উচ্চ বিদ্যালয়ে “শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ” শীর্ষক সেমিনারের মাধ্যমে বইয়ের গুরুত্ব শিক্ষার্থীদের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। উদ্দেশ্য একটাই—পাঠক তৈরি করা।
মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে একাডেমির কর্মীরা একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। অনেক শিক্ষার্থী বর্ণমালা শিখলেও বই পড়ার সুযোগ ও উপকরণের অভাবে সেই দক্ষতা ধরে রাখতে পারে না। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা মানুষ তৈরি করে না; বই পড়াই মানুষকে চিন্তাশীল করে তোলে।
বই পড়া কেবল জ্ঞান অর্জনের বিষয় নয়, এটি আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। একজন শিক্ষার্থী যখন নিজের ভাষায় লেখা গল্প পড়ে, নিজের জাতির ইতিহাস জানে, নিজের সংস্কৃতির কথা আবিষ্কার করে—তখন তার ভেতরে জন্ম নেয় আত্মমর্যাদা। তখন সে আর নিজের পরিচয় নিয়ে সংকুচিত হয় না।
এই কারণেই চাঙমা সাহিত্য একাডেমির লক্ষ্য এখন দ্বিমুখী—একদিকে বর্ণমালা ও ভাষা শিক্ষার কাজ অব্যাহত রাখা, অন্যদিকে বই পড়ার গভীর ও স্থায়ী অভ্যাস গড়ে তোলা। এজন্য প্রয়োজন সহজপাঠ্য সাহিত্য, প্রয়োজন গ্রামে গ্রামে ছোট পাঠাগার, বই পড়ার আড্ডা ও পাঠচক্র।
আমরা যদি সত্যিই ভাষা বাঁচাতে চাই, তবে কেবল দিবস পালন বা বক্তৃতা যথেষ্ট নয়। ভাষা বাঁচে তখনই, যখন কেউ আগ্রহ নিয়ে বইয়ের পাতা ওল্টায়।
একটি জাতি জাগে তখনই, যখন তার তরুণেরা পাঠক হয়ে ওঠে।
পরিবর্তনের চাবিকাঠি বই।
আর বই পড়ার অভ্যাসই পারে ভাষাকে বাঁচাতে, জাতিকে জাগাতে।
আজই সময়—বইয়ের দিকে ফিরি,
নিজের ভাষার দিকে ফিরি,
নিজের অস্তিত্বের দিকে ফিরি।
- এপ্রিল ০৭, ২০২৬
অবিনাশী চাঙমা জাতিসত্তা
ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে কিছু জাতি জন্ম নেয় কেবল টিকে থাকার জন্য নয়, বরং প্রতিকূলতার ললাটে জয়ের তিলক এঁকে দেওয়ার জন্য। চাকমা জাতি সেই অদম্য প্রাণশক্তিরই এক অবিনশ্বর নাম। যে জাতির ধমনিতে প্রবাহিত হয় দ্রোহ আর বীরত্বের রক্তধারা, তাদের বিনাশ নেই। আজ সময়ের দাবি হলো সেই রক্তঋণ শোধ করা—নিজস্ব ভাষা, বর্ণমালা আর সংস্কৃতির দীপশিখাকে প্রজ্বলিত রাখার মাধ্যমে।
চাকমা জাতির ইতিহাস কোনো সাধারণ খতিয়ান নয়, এটি নিরন্তর সংগ্রামের এক মহাকাব্য। মোগলদের দাপট কিংবা ব্রিটিশদের কূটকৌশল—কোনো কিছুই এই পাহাড়ী অরণ্যের সন্তানদের মেরুদণ্ডকে নত করতে পারেনি। পাকিস্তান শাসনামলে কাপ্তাইয়ের কৃত্রিম জলরাশি দিয়ে যখন এক বিশাল জনপদকে ডুবিয়ে মারার নীল নকশা করা হয়েছিল, তখনো তারা ফিনিক্স পাখির মতো ধ্বংসস্তূপ থেকে জেগে উঠেছিল। পরবর্তীকালে স্বাধীন বাংলাদেশেও জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এই জাতির স্বকীয়তা মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে বারবার। কিন্তু ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চুক্তির মধ্য দিয়ে এই ভূমি ও মানুষের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
আমাদের এই আত্মপরিচয় রক্ষার লড়াইয়ে সবচাইতে ধ্রুপদী ও সাহসী উচ্চারণ ধ্বনিত হয়েছিল মহান সংসদের পবিত্র আঙিনায়। যখন একক পরিচয়ের দোহাই দিয়ে ক্ষুদ্রতর জাতিসত্তাগুলোকে বিলীন করে দেওয়ার চেষ্টা চলছিল, তখন জাতির অবিসংবাদিত নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা -
"আমি একজন চাকমা। আমাদের নিজস্ব ভাষা আছে, বর্ণমালা আছে। আমি কোনোদিন নিজেকে বাঙালি বলিনি।"
তাঁর এই অকুতোভয় ঘোষণা কেবল একটি বাক্য ছিল না; এটি ছিল হাজার বছরের লালিত সংস্কৃতির অহংকার এবং অস্তিত্ব রক্ষার এক অমোঘ অঙ্গীকার। তিনি শিখিয়ে গেছেন, নাগরিকত্ব আর জাতিসত্তা এক নয়। আমরা এদেশের নাগরিক, কিন্তু আমাদের হৃদস্পন্দনের ভাষা ও বর্ণমালা আমাদের একান্তই নিজস্ব। লারমার সেই তেজস্বী আদর্শ আজও আমাদের ধমনিতে প্রবহমান।
একটি জাতির আত্মপরিচয় নিহিত থাকে তার ভাষায়। আমাদের নিজস্ব বর্ণমালা কেবল কতগুলো রেখা নয়, বরং এটি আমাদের পূর্বপুরুষদের চিন্তা ও দর্শনের প্রতিচ্ছবি। যখন চাপিয়ে দেওয়া হয় ভিন্ন কোনো সত্তা, তখন আমাদের রক্ষা কবচ হয়ে দাঁড়ায় আমাদের ভাষা। নিজস্ব সংস্কৃতি থেকে বিচ্যুত হওয়া মানে হলো নিজের শিকড় কেটে ফেলা। তাই আমাদের বর্ণমালাকে কেবল অক্ষরের ফ্রেমে বন্দি না রেখে তাকে সাহিত্যের মূলধারায় এবং আধুনিক জ্ঞানের চর্চায় গ্রহণ করতে হবে।
হে আগামীর কাণ্ডারিরা, তোমরা কেবল এক একজন শিক্ষার্থী নও; তোমরা হলে জাতির গর্বের প্রতীক এবং হারানো অধিকার পুনরুদ্ধারের অগ্রদূত।
আধুনিক বিশ্বের জ্ঞান-বিজ্ঞানে নিজেকে সজ্জিত করো, কিন্তু হৃদয়ের মণিকোঠায় গেঁথে রাখো সেই প্রাচীন পাহাড়ী সুর।
নিজের ইতিহাস ও বর্ণমালা নিয়ে নিবিড় পড়াশোনা করো, যাতে কোনো মিথ্যা তথ্য তোমাদের শেকড়কে উপড়ে ফেলতে না পারে।
চাকমা জাতির প্রতিটি সন্তানের শিরায় যে রক্ত বহমান, তা কোনো পরাজয় চেনে না। যারা বারবার মৃত্যুঘণ্টা উপেক্ষা করে ফিরে এসেছে, তাদের নিঃশেষ করার সাধ্য কারও নেই। এখন সময় নিজেকে চেনার, নিজের স্বকীয়তাকে বিশ্বের দরবারে সগৌরবে মেলে ধরার। লারমার সেই স্পর্ধাকে হৃদয়ে ধারণ করে তোমরা এগিয়ে চলো; মনে রেখো, বীরের জাতি কখনো পথ হারায় না, তারা পথ তৈরি করে। শিক্ষা কেবল জীবিকা নয়—শিক্ষা হলো আত্মপরিচয়ের বাতিঘর। সেই বাতিঘরের আলো জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব তোমাদেরই। ইতিহাস তোমাদের দিকে তাকিয়ে আছে, ভবিষ্যৎ তোমাদের নামে ডাকছে। এগিয়ে চলো—ভাষার জন্য, সংস্কৃতির জন্য, জাতিসত্তার মর্যাদার জন্য।
- এপ্রিল ০৩, ২০২৬
সংস্কৃতি হারানোর দায় কার?
একটি গাছ যেমন চেনা যায় তার শাল ও ফল দিয়ে, তেমনি একটি জাতি চেনা যায় তার সংস্কৃতি দিয়ে। সংস্কৃতি কোনো আলগা বিষয় নয়; এটি একটি জাতির পরিচয়, আত্মমর্যাদা ও জীবনবোধের সমষ্টিগত প্রতিফলন। চাঙমা জাতিসত্তার ক্ষেত্রেও সংস্কৃতি ছিল আমাদের শক্ত ভিত্তি। কিন্তু আজ বাস্তবতা বলছে—আধুনিকতার নামে সেই সংস্কৃতি ক্রমেই অপসংস্কৃতির ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে।
একসময় চাঙমা সংস্কৃতি ছিল সংযত, মার্জিত ও স্মার্ট। সামাজিক আচরণে ছিল শালীনতার স্পষ্ট সীমারেখা। আমাদের মায়েরা, ঠাকুরমারা পারিবারিক ও সামাজিক পরিসরে নিজেদের আচরণে ছিলেন সচেতন। শ্বশুর-শ্বাশুড়ির সামনে বা জনসমক্ষে শিশুকে দুধ পান করানোর ক্ষেত্রেও ছিল সামাজিক শালীনতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। সে সময় দেহ নয়, মূল্যবোধই ছিল সংস্কৃতির মূল বাহন।
আজ সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। বর্তমান প্রজন্মের একটি অংশ আধুনিকতার ভুল ব্যাখ্যায় নিজেদের শিকড় থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। আধুনিক হওয়া আর অসংযত হওয়া—এই দুইয়ের পার্থক্য আমরা ধীরে ধীরে ভুলে যাচ্ছি। ফলে শালীনতা, সংযম ও সামাজিক সংবেদনশীলতা অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
তবে এই পরিবর্তনের দায় এককভাবে কোনো ব্যক্তি বা কোনো নারীকে দেওয়া অন্যায় হবে। এই লেখা কোনো মায়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়, কোনো নারীর স্বাধীনতার বিরোধিতাও নয়। বরং এটি একটি আত্মসমালোচনামূলক স্বীকারোক্তি। কারণ, আমরাই—আমরা সবাই—অধিকারের কথা বলতে বলতে, প্রগতির কথা বলতে বলতে নিজেদের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির অনেক মূল্যবান উপাদান হারিয়ে ফেলেছি।
অধিকার অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দায়িত্ব ছাড়া অধিকার সংস্কৃতিকে শক্তিশালী করে না; বরং দুর্বল করে। সংস্কৃতি রক্ষা মানে কাউকে বেঁধে রাখা নয়, বরং নিজের পরিচয়কে সচেতনভাবে বহন করা। আধুনিকতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের প্রয়োজন ছিল সাংস্কৃতিক বাছবিচার—যা আমরা অনেক ক্ষেত্রে করতে ব্যর্থ হয়েছি।
সংস্কৃতি কখনো স্থবির থাকে না; সময়ের সঙ্গে তার রূপ বদলায়। কিন্তু পরিবর্তন আর অবক্ষয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে। আধুনিকতার সঙ্গে সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটাতে না পারলে আমরা কেবল অনুকরণপ্রবণ এক সমাজে পরিণত হব—যেখানে নিজস্বতা থাকবে না।
আজ তাই প্রশ্নটা অন্য কাউকে নয়, নিজেকেই করা জরুরি—আমরা কি আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে একটি শিকড়সমৃদ্ধ পরিচয় দিতে পারছি? নাকি আধুনিকতার মোড়কে নিজেরাই সেই শিকড় কাটছি? সংস্কৃতি রক্ষার দায় কোনো একক প্রজন্মের নয়; এটি আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই আত্মজিজ্ঞাসা শুরু হোক—এটাই সময়ের দাবি।
- এপ্রিল ০৩, ২০২৬
রাষ্ট্রের ভাষা আছে, আদিবাসীর ভাষা নেই
রাষ্ট্র কথা বলে। সংবিধান কথা বলে। উন্নয়ন কথা বলে। কিন্তু বাংলাদেশের আদিবাসীরা যখন কথা বলতে চায়, তখন রাষ্ট্র কানে তুলা গুঁজে রাখে। কারণ তারা যে ভাষায় কথা বলে, সে ভাষা রাষ্ট্রের কাছে “অপ্রয়োজনীয়”, “অলাভজনক”, “পিছিয়ে থাকা”—এই তকমাগুলোই যেন তাদের একমাত্র পরিচয়।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম The Guardian বলছে, আগামী ১০০ বছরে পৃথিবী থেকে অন্তত তিন হাজার ভাষা বিলুপ্ত হবে। এই ভবিষ্যদ্বাণী কোনো দূরদেশের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের বাস্তবতা। কারণ এখানে রাষ্ট্রীয় অবহেলা, শিক্ষা-নীতির একচোখা দৃষ্টি আর প্রশাসনিক অনীহার কারণে আদিবাসী ভাষাগুলো প্রতিদিন একটু একটু করে মারা যাচ্ছে।
ভাষা গবেষণা সংস্থা Summer Institute of Linguistics জানায়, পৃথিবীতে এমন ৫১টি ভাষা আছে যেগুলোর শেষ একজন বক্তা এখনো জীবিত। প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশে কতটি ভাষা এই তালিকায় ঢোকার অপেক্ষায়? রাষ্ট্র কি কখনো সেই হিসাব কষেছে?
পরিসংখ্যান নির্মম: পৃথিবীর জীবিত ভাষার মাত্র ৬ শতাংশ ভাষায় কথা বলে বিশ্বের ৯৪ শতাংশ মানুষ। আর বাকি ৯৪ শতাংশ ভাষায় কথা বলে মাত্র ৬ শতাংশ মানুষ। বাংলাদেশের আদিবাসী ভাষাগুলো এই ক্ষমতাহীন ৯৪ শতাংশের দলে। সংখ্যায় তারা অনেক, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তারা প্রায় অদৃশ্য।
বাংলাদেশের Chittagong Hill Tracts কিংবা সমতলের আদিবাসী অধ্যুষিত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া একটি শিশু যখন স্কুলে যায়, তখন তার প্রথম পাঠই হয় আত্মবিচ্ছেদের পাঠ। মাতৃভাষা নয়—তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় প্রভাবশালী ভাষা। শিশুটি শেখে, নিজের ভাষা “অকাজের”, “ঘরের ভেতরের”, “পিছিয়ে থাকা”। এভাবেই রাষ্ট্র এক প্রজন্মকে শেখায়—নিজেকে অস্বীকার করতে।
Living Tongues Institute for Endangered Languages-এর গবেষক Gregory Anderson বলেন, “যখন কোনো জনগোষ্ঠী মনে করে যে তাদের ভাষা অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের পথে বাধা—তখনই সেই ভাষা বিলুপ্তির পথে হাঁটে।” বাংলাদেশে এই ধারণা রাষ্ট্র নিজেই তৈরি করে দিয়েছে। চাকরি, আদালত, প্রশাসন, শিক্ষা—সবখানেই আদিবাসী ভাষা অনুপস্থিত। তাহলে মানুষ শিখবে কীভাবে যে তাদের ভাষার মূল্য আছে?
একটি শিশু কাঁদে, কারণ সে বলতে পারে না তার কষ্টের ভাষা। রাষ্ট্রের কাঠামোয় আদিবাসীর অবস্থাও তাই। তারা চিৎকার করে—কখনো জমির জন্য, কখনো ভাষার জন্য, কখনো অস্তিত্বের জন্য। কিন্তু রাষ্ট্র সেই কান্নাকে “উন্নয়ন-বিরোধী”, “বিচ্ছিন্নতাবাদী”, “অযৌক্তিক দাবি” বলে দমিয়ে দেয়।
ভাষাহীন মানুষ মানে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষ। যার ভাষা নেই, তার ইতিহাসও থাকে না রাষ্ট্রের খাতায়। তার জ্ঞানকে বলা হয় লোককথা, তার দর্শনকে কুসংস্কার। এভাবেই রাষ্ট্র ধীরে ধীরে আদিবাসীদের মানুষ নয়, সমস্যায় পরিণত করে।
অথচ ইতিহাস প্রমাণ করে—ভাষা ফেরানো যায়। হিব্রু ও আইনু ভাষা আজ জীবন্ত, কারণ রাষ্ট্র সেখানে দায়িত্ব নিয়েছে। বাংলাদেশে কেন তা সম্ভব নয়? কেন এখনো আদিবাসী ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম করা “ঝুঁকিপূর্ণ” মনে হয়? কেন সংবিধানের বহুত্ববাদ কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ?
আদিবাসী ভাষা রক্ষা কোনো অনুগ্রহ নয়। এটি রাষ্ট্রের দায়। মাতৃভাষায় শিক্ষা, প্রশাসনিক স্বীকৃতি, গবেষণা ও লিখিত চর্চার সুযোগ—এসব রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া ভাষা বাঁচে না।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই বহুভাষিক, বহুজাতিক হওয়ার সাহস রাখে, তবে তাকে আগে আদিবাসীদের ভাষা ফিরিয়ে দিতে হবে। না হলে একদিন ইতিহাস প্রশ্ন করবে—তোমাদের উন্নয়ন কার ভাষায় লেখা হয়েছিল, আর কাদের ভাষা চুপ করিয়ে দেওয়া হয়েছিল?
ভাষা মারা গেলে মানুষ শুধু চুপ করে না—মানুষ ধীরে ধীরে রাষ্ট্র থেকেও মুছে যায়।
- মার্চ ৩১, ২০২৬
অস্তিত্বের বর্ণমালা: আমার কণ্টকাকীর্ণ পথ ও রূঢ় বাস্তবতা
জলবায়ুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর রূপ বদলায়—এ কথা ধ্রুব সত্য। কিন্তু সময়ের আবর্তে মানুষের মনস্তত্ত্ব, দায়বদ্ধতা আর সম্পর্কের সমীকরণগুলোও যে এতটা নাটকীয়ভাবে বদলে যেতে পারে, তা আমার দীর্ঘ চব্বিশ বছরের পথচলা না হলে অজানা থেকে যেত। ২০০৪ সালে যখন মাতৃভাষা রক্ষার পবিত্র ব্রত নিয়ে যাত্রা শুরু করি, তখন ভেবেছিলাম পাহাড়ি জনপদের আঞ্চলিক রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও ভাষার প্রশ্নে আমরা সবাই এক মোহনায় মিলিত হব। কিন্তু অভিজ্ঞতার ঝুলি আজ বলছে—আদর্শের মুখোশ পরা মানুষের আসল রূপ চিনতে দীর্ঘ সময়ের দহন প্রয়োজন।
আমার এই যাত্রার বীজ বপন করা হয়েছিল ২০০৪ সালে। মেরুং, চংড়াছড়ি হাই স্কুলে চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালা শিক্ষার প্রথম ব্যাচ চালুর মধ্য দিয়ে যে আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত হয়, তা ক্রমে বাজেইছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। ২০০৬ সাল নাগাদ যখন আঞ্চলিক দল জেএসএস-এর ভাঙন শুরু আর দেশে ১/১১-এর জরুরি অবস্থা জারি হয়, তখন চারদিকের অস্থিরতা আমার কাজেও ছায়া ফেলে। ২০০৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এক ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আমি কুদুকছড়িতে বোনের বাড়িতে আশ্রয় নিই। শারীরিক যন্ত্রণা সত্ত্বেও থামেনি আমার পাঠদান। সেখান থেকে জান্দিমুড়, শিবঙ্গপাড়া (২০০৮-২০১০) হয়ে প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে আমি ফিরে আসি দিঘীনালার।
২০১৫ সাল থেকে দিঘীনালায় পূর্ণ শক্তিতে নিজেকে নিয়োজিত করি। লক্ষ্য ছিল একটাই—চাঙমা ভাষা, বর্ণমালা ও সাহিত্যের পুনর্জাগরণ। এই দীর্ঘ যাত্রায় স্নেহ, মমতা, ভালোবাসা আর আর্থিক, মানসিক সহযোগিতা আমাকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। ভাষা রক্ষায় দীর্ঘ মিছিলে পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন একঝাঁক নিঃস্বার্থ ভাষাপ্রেমী। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আজ পর্যন্ত প্রায় ১৬ হাজার অধিক শিক্ষার্থীকে চাঙমা বর্ণমালার প্রাথমিক পাঠ দিতে সক্ষম হয়েছি। আমাদের এই কাজ বিভিন্ন এনজিও ও সামাজিক সংগঠনের দৃষ্টি কেড়েছে, অর্জিত হয়েছে সম্মাননা। কিন্তু এই সাফল্যের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে কিছু দহনগাথা, যা বলতে দ্বিধা জাগলেও ইতিহাসের প্রয়োজনে বলা জরুরি।
২৪ ডিসেম্বর ২০১৫, দিঘীনালা সাংস্কৃতিক একাডেমি হলরুমে ৩৯৭ জন শিক্ষার্থীর সার্টিফিকেট প্রদান অনুষ্ঠানের পর এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই। ডিজিএফআইরা সিভি ও সার্টিফিকেটের ফটো কপি চাওয়া এবং পরবর্তীতে গবেষক সুনানু আনন্দ মোহন চাঙমার বাড়িতে গিয়ে তথ্যানুসন্ধান আমাদের কাজের স্বাভাবিক পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
১১ সেপ্টেম্বর ২০১৫, মেরুং, লাম্বাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক সুনানু দীপাংশু চাকমার কক্ষ দিতে অস্বীকৃতি এবং ২০১৮ সালের ২৮ এপ্রিল বাবুছড়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষকের "টেবিল ভেঙে যাবে" এমন হাস্যকর অজুহাতে কক্ষ না দেওয়া আমাদের শিক্ষার প্রতি অনুদার মানসিকতাকেই ফুটিয়ে তোলে।
২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, বাবুছড়া ফ্রেন্ডশিপ স্কুলের অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ইউএনও জনাব শেখ শহিদুল ইসলাম এবং উদ্বোধক হিসেবে উপজেলা চেয়ারম্যান সুনানু নবকমল চাঙমা উপস্থিত থাকলেও, কেবল ব্যানারে নাম না থাকার অভিমানে বাবুছড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সুনানু পরিতোষ চাঙমা অনুষ্ঠান ত্যাগ ও হুমকি প্রদান ছিল অত্যন্ত অনভিপ্রেত।
এপ্রিল- ৫, ২০১৭-তে লক্ষীছড়ি উপজেলায় কোর্স উদ্বোধনের আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে প্রদীপ দা অপমানিত হন উপজেলা চেয়ারম্যান সুনানু সুপার জ্যোতি চাঙমা কাছ থেকে এবং আমাকেও ফোনে কটু কথা শুনতে হয়। ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি মালছড়ি সরকারি কলেজে কোর্স পরিচালনায় ছাত্রলীগের কিছু নেতার বাধা ও প্ল্যাকার্ড ছিঁড়ে ফেলার ঘটনা আমাদের সাংস্কৃতিক দেউলিয়াত্বকেই প্রমাণ করে।
১০ ডিসেম্বর ২০২৪, বাবুছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কাছে সহযোগিতা নয় হাজার টাকার চাইতে গেলে তাঁর মন্তব্য (সার্টিফিকেট প্রদান অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে)—"দিপুলক্ষ চাঙমা থাকলে আমি থাকবো না"—আমাকে গভীরভাবে আহত করেছে। এমনকি ২০২৫ সালে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় বিঝু ও সাহিত্য মেলা রাজনৈতিক অজুহাতে আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। আর ২০২৬ সালের ২৪ মার্চ দিঘীনালার কবাখালী ইউনিয়ন পরিষদ অফিস থেকে "অঝাপাত স্কোয়ার" নামক সাইনবোর্ড স্থাপন সংক্রান্ত নোটিশ হাতে পাওয়া, যেন এই দীর্ঘ সংগ্রামের প্রতিটি পদক্ষেপে নতুন নতুন বাধার সম্মুখীন হওয়ারই এক করুণ পরিণতি।
আমার এই লেখাটি কোনো অভিযোগপত্র নয়; এটি মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার নির্যাস। লেখাটি কেবল আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সারাংশও নয়, এটি এই সত্যেরই প্রমাণ যে, ভিন্ন ভাষাভাষীরা অনেক সময় মাতৃভাষা রক্ষায় যতটা আন্তরিক হন, আমাদের নিজেদের সমাজের কিছু মানুষ ততটা হন না। কিন্তু তবুও, পথচলা থামবে না। কারণ মাতৃভাষা কেবল কিছু শব্দের সমষ্টি নয়, এটি আমাদের পরিচয়, আমাদের ইতিহাস, আমাদের অস্তিত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই বিশ্বাস বুকে নিয়ে, সকল বাধা অতিক্রম করে মাতৃভাষা রক্ষার এই যুদ্ধে আমি লড়ে যাবো, চিরকাল।
- মার্চ ৩০, ২০২৬
সমাজবিভাজনের দায় কার? চাঙমা সমাজে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও বিবর্তনের ইতিহাস-
সমাজবিভাজন কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার ফসল। পার্বত্য চট্টগ্রামের চাঙমা সমাজের বর্তমান প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক যে—এই বিভাজনের দায় কার? রাষ্ট্র, রাজনীতি, নাকি সমাজের ভেতরকার নেতৃত্ব? বৌদ্ধধর্ম বা শাস্ত্রীয় বিষয়ে অগাধ পাণ্ডিত্য না থাকলেও একজন সচেতন ও দায়বদ্ধ সমাজিক মানুষ হিসেবে এই সত্যের অনুসন্ধান করা আজ সময়ের দাবি। চাঙমা সমাজের ধর্মীয় ইতিহাস ও ভিক্ষুসমাজের ভূমিকা পর্যালোচনা করলে এই বিভাজনের শিকড় খুঁজে পাওয়া সম্ভব।
চাঙমা সমাজে ধর্মীয় বিবর্তনের সূচনা হয় রাণী কালিন্দীর শাসনামলে। সেই সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে হীনযান মতবাদের ভান্তেদের আবির্ভাব ঘটে, যার আগে এই অঞ্চলে মূলত মহাযান বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ছিল। এই পরিবর্তনটি কেবল একটি আধ্যাত্মিক মতাদর্শের বদল ছিল না, বরং এর সামাজিক ও সাংগঠনিক প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্ত চাঙমা সমাজের ধর্মীয় কার্যক্রম মূলত 'লুরী' সম্প্রদায়ের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হতো।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে প্রিয়রত্ন ভিক্ষুর আবির্ভাব চাঙমা সমাজে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। তিনি কেবল ধর্মীয় সাধনায় নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং স্বধর্মের উন্নয়ন, শিক্ষার বিস্তার এবং দরিদ্র ও অবহেলিত শিশুদের জন্য জ্ঞানার্জনের সুযোগ সৃষ্টি করে এক নতুন জাগরণের সূচনা করেন। তাঁর হাত ধরে একটি শক্তিশালী ভিক্ষু সংঘ গড়ে ওঠে, যারা নৈতিকতা ও শিক্ষার আলো সমাজের তৃণমূল স্তরে পৌঁছে দেয়। এই সময়ে ধর্ম কেবল পূজা-পার্বণে সীমাবদ্ধ না থেকে একটি সমাজ সংস্কারের শক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল।
পরবর্তীকালে বনভান্তের আবির্ভাবে বৌদ্ধধর্মীয় চেতনা আরও বিস্তৃত হয়। তাঁর ধ্যান-সাধনা, কঠোর জীবনাচার এবং ত্যাগের আদর্শ অগণিত মানুষকে আকৃষ্ট করে। তবে এই জাগরণের সমান্তরালেই শুরু হয় এক গভীর দ্বন্দ্বের অধ্যায়। একদিকে যেমন আধ্যাত্মিকতার প্রসার ঘটে, অন্যদিকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ভেতর বিভাজনের বীজ রোপিত হতে থাকে।
ধীরে ধীরে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আধ্যাত্মিক সাধনার কেন্দ্র হওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রদর্শনের ক্ষেত্রে পরিণত হয়। এর বাস্তব উদাহরণ দেখা যায় নাম পরিবর্তনের রাজনীতির মধ্য দিয়ে। পানছড়ি পথের ‘দেওয়ান পাড়া বৌদ্ধ বিহার’ রূপান্তরিত হয় ‘দেওয়ান পাড়া বন বিহার’-এ। একইভাবে ‘রাঙ্গাপানিছড়া বৌদ্ধবিহার’ (বাবুছড়া যাওয়ার পথে) হয়ে যায় ‘রাঙ্গাপানিছড়া বন বিহার’। বনভান্তের জীবদ্দশায় শৃঙ্খলা বজায় থাকলেও তাঁর প্রয়াণের পর শুরু হয় চরম নেতৃত্ব ও কর্তৃত্বের লড়াই। "প্রধান শিষ্য কে হবেন?" কিংবা "কার কর্তৃত্বে বিহার চলবে?"—এই প্রশ্নে বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এরপর ঘ্যাংঘর নিয়ে যে বিভাজনের কাহিনি আজ প্রচলিত, তা সমাজের ঐক্যের মূলে কুঠারাঘাত করেছে।
সমাজ বিভাজনের এই করুণ পরিণতির দায় থেকে তথাকথিত সাধক, সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুসমাজ সম্পূর্ণ মুক্ত নন। যখন আধ্যাত্মিক নেতৃত্ব ত্যাগের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার লড়াই বা দখলদারির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে, তখন তাঁরাই হয়ে ওঠেন বিভাজনের প্রধান কারিগর। চাঙমা সমাজের বর্তমান বিভক্ত বাস্তবতাকে বুঝতে হলে আজ কঠোর আত্মসমালোচনার প্রয়োজন। ধর্ম যদি সত্যিই মুক্তির পথ হয়, তবে তার বাহকদের হতে হবে ঐক্যের প্রতীক। অন্যথায়, আধ্যাত্মিকতার মুখোশে সমাজ ভাঙার এই ঐতিহাসিক দায় তাঁদের কাঁধেই বর্তাবে।
- মার্চ ২৬, ২০২৬
চাকমা জাতির দুঃখিনী বর্ণমালা: দীর্ঘ সংগ্রাম, বঞ্চনা ও আগামীর সম্ভাবনা
২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি দৈনিক দৈনিক সমকাল-এ প্রকাশিত “চাকমাদের দুঃখিনী বর্ণমালা” শীর্ষক
লেখায় সাংবাদিক ও লেখক রাজিব নূর চাকমা জাতির ভাষা ও বর্ণমালার করুণ বাস্তবতাকে গভীর সংবেদনশীলতায় তুলে ধরেছেন। একটি জাতির গর্ব, তার ইতিহাস, সমৃদ্ধ ভাষা, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে নিজস্ব বর্ণমালা। অথচ কালের পরিক্রমায় সেই বর্ণমালাই আজ চাকমা জাতির জন্য হয়ে উঠেছে দুঃখিনী।
রাজিব নূর তাঁর লেখায় একাদশ শ্রেণির ছাত্রী এন্তি চাকমার সঙ্গে সাক্ষাতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। চাকমা ভাষায় কথা বলতে পারলেও নিজের ভাষার বর্ণমালা লিখতে না পারায় এন্তির লজ্জা যেন একটি প্রজন্মের নীরব আত্মস্বীকার। বরকল থেকে রাঙামাটিতে পড়তে আসা এন্তির গল্প কেবল ব্যক্তিগত নয়—এটি একটি জাতিগত বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।
২০১৫ সালের ১৪ থেকে ২৩ জানুয়ারি তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলা—রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি—ঘুরে শতাধিক শিক্ষিত চাকমা নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন চাকমা সমাজের সর্বজনমান্য অনন্তবিহারী খীসা, জনসংহতি সমিতির এমএন লারমা গ্রুপের প্রধান সুধাসিন্ধু খীসা, পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সভাপতি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান গৌতম দেওয়ান, জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক মঙ্গলকুমার চাকমা, জুম ঈস্থেটিকস কাউন্সিলের সভাপতি মিহির বরণ চাকমা, সহ-সাধারণ সম্পাদক গঙ্গামানিক চাকমা, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক তুষারশুভ্র তালুকদার, মোনঘর শিশুসদনের শিক্ষক ও লেখক মৃত্তিকা চাকমা, সাংবাদিক-লেখক হরিকিশোর চাকমা, সাংবাদিক বুদ্ধজ্যোতি চাকমা, আদিবাসী বিষয়ক গবেষক তন্দ্রা চাকমা, আদিবাসী নেতা দীপায়ন খীসা, শিল্পী কালায়ন চাকমা এবং ইউপিডিএফের সংগঠক রিকু চাকমা।
এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে বেদনাদায়ক তথ্য ছিল—নিজের নাম মাতৃভাষার বর্ণমালায় লিখতে পারলেন মাত্র দু’জন। তাঁদের একজন মৃত্তিকা চাকমা, অন্যজন রিকু চাকমা। অনন্তবিহারী খীসা, সুধাসিন্ধু খীসা ও গৌতম দেওয়ান স্বীকার করেন—ছোটবেলায় বর্ণমালা শিখলেও এখন তা আর ব্যবহারযোগ্য নয়।
এই সংকট নতুন নয়; এর ইতিহাস দীর্ঘ। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৮৬১–৬২ সালে চন্দ্রঘোণা বোর্ডিং স্কুলে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি চাকমা ও মারমা ভাষা চালু হয়েছিল। পরে ১৯৩৭–৩৮ সালে মিলান সাহেব রাঙামাটিতে এবং ১৯৫৯ সালে নোয়ারাম চাকমা রচিত “চাকমার পত্থম শিক্ষা” গ্রন্থটি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান শিক্ষা বোর্ড থেকে পাঠ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। কিন্তু সামন্ত সমাজব্যবস্থার বাস্তবতায় মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা তখনও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।
দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি এবং ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতিতে মাতৃভাষায় শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১৭ সালে পাঁচটি আদিবাসী ভাষায় পাঠ্যবই ছাপা হলেও তা কার্যকরভাবে শিক্ষাব্যবস্থায় আলো দেখেনি। আশার আলো আবারও অমাবস্যায় ঢাকা পড়ে যায়।
এই দুঃখ যদি বর্তমান প্রজন্ম উপলব্ধি না করে, তবে চাকমা ভাষা ও বর্ণমালার স্থান খুব শিগগিরই জীবন্ত সমাজ থেকে সরে গিয়ে জাদুঘরে সীমাবদ্ধ হবে। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ চীনা, জাপানি কিংবা ইংরেজি শেখে—এটা বাস্তব। কিন্তু প্রয়োজন কেবল অর্থনৈতিক নয়; সবচেয়ে বড় প্রয়োজন জাতিগত আত্মপরিচয়ের শিকড়ে পৌঁছানো। আর তার প্রথম শর্ত নিজের ভাষা ও বর্ণমালার জ্ঞান অর্জন।
তবু আশার কথা আছে। আজ প্রযুক্তি আমাদের হাতের মুঠোয়। একসময় কঠিন হলেও চাকমা বর্ণমালা এখন ডিজিটাল মাধ্যমে সহজলভ্য। তাই বিশ্বাস করা যায়—বর্তমান প্রজন্ম আত্মনিয়োগ করলে এই দুঃখিনী বর্ণমালাকে রাহুদশা থেকে মুক্ত করা সম্ভব। ভাষা বাঁচলে জাতি বাঁচে, আর বর্ণমালা বাঁচলেই ভাষার সত্যিকারের মুক্তি।
- মার্চ ২২, ২০২৬
বর্ণমালার নামে আত্মপ্রবঞ্চনা: জুম্ম রাজনীতির ব্যর্থতার নগ্ন সত্য
জুম্ম জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ যে গভীর অন্ধকারের দিকে ধাবিত হচ্ছে—তা বোঝার জন্য বিশেষ কোনো দূরদর্শিতা প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু নিজের দিকে সৎভাবে তাকানোর সাহস। আজ জুম্ম সমাজ গর্ব করতে ভালোবাসে। বুক ফুলিয়ে বলে— “আমাদের বর্ণমালা আছে, আমাদের সংস্কৃতি আছে, আমাদের ঐতিহ্য আছে।” কিন্তু এই উচ্চকণ্ঠ গর্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যর্থতা।
প্রশ্ন একটাই—এই বর্ণমালার বাস্তব মালিক কারা? সমাজের কতজন মানুষ তা পড়তে, লিখতে কিংবা দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করতে পারেন? যদি সংখ্যাটা নগণ্য হয়, তবে এই গর্ব আসলে কিসের? এটি কি আত্মপরিচয়ের প্রকাশ, নাকি আত্মপ্রবঞ্চনার রাজনীতি?
ভাষা ও বর্ণমালা কোনো অলংকার নয়, যা শ্লোগানে ঝুলিয়ে রাখা যায়। এগুলো ক্ষমতার প্রশ্নের সঙ্গে জড়িত। যে জাতি নিজের ভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে না, নিজের বর্ণমালাকে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠা করতে পারে না—সে জাতি মূলত ক্ষমতাহীন। জুম্ম সমাজ আজ সেই ক্ষমতাহীনতার মধ্যেই দাঁড়িয়ে আছে।
সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ব্যর্থতা হলো—মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে না পারা। এটি কোনো সাংস্কৃতিক দুর্বলতা নয়, এটি সরাসরি রাজনৈতিক অক্ষমতা। নেতৃত্ব, সংগঠন ও আন্দোলনের ব্যর্থতা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পার হয়ে গেল, কিন্তু শিশুদের জন্য নিজেদের ভাষায় পাঠ্যবই, শিক্ষক, পাঠক্রম গড়ে তোলার মতো ন্যূনতম রাজনৈতিক চাপও সৃষ্টি করা গেল না। অথচ মঞ্চে উঠে সংস্কৃতির কথা বলতে আমরা ক্লান্ত হই না।
আজ জুম্ম শিশু অন্য ভাষায় স্বপ্ন দেখতে শেখে, অন্য বর্ণমালায় নিজের নাম লিখতে শেখে। রাষ্ট্র তাকে সেই ভাষাই শেখাচ্ছে—যা তার নয়। আর আমরা নির্বিকার দর্শকের মতো তাকিয়ে থাকি। পরে আবার সভা-সেমিনারে দাঁড়িয়ে বলি— “আমাদের ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে।” ভাষা হারায় না; ভাষাকে হারিয়ে যেতে দেওয়া হয়।
এখানে দায় শুধু রাষ্ট্রের নয়—জুম্ম রাজনৈতিক নেতৃত্বেরও। যারা বছরের পর বছর অধিকার রাজনীতির কথা বলে, তারা কি একবারও ভাষা ও বর্ণমালাকে আন্দোলনের কেন্দ্রে এনেছে? নাকি এটি শুধু আবেগি বক্তৃতার উপকরণ হয়েই থেকে গেছে? সংস্কৃতি রক্ষা যদি কেবল উৎসব আর পোস্টারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা রাজনীতি নয়—তা লোকদেখানো নাটক।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—এই আত্মপ্রবঞ্চনাকেই আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে উত্তরাধিকার হিসেবে দিয়ে যাচ্ছি। আমরা তাদের শিখাচ্ছি গর্ব করতে, কিন্তু শিখাচ্ছি না লড়তে। শিখাচ্ছি অতীত স্মরণ করতে, কিন্তু শিখাচ্ছি না বর্তমান বদলাতে।
সোজা কথা—যে সমাজ নিজের বর্ণমালাকে শিক্ষার ভাষা করতে পারে না, সে সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকার হবেই। গর্ব দিয়ে সেই অন্ধকার ঢেকে রাখা যায় না। এখন সময় এসেছে কঠিন প্রশ্ন তোলার—আমরা কি সত্যিই আমাদের বর্ণমালা চাই, নাকি শুধু তার নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক ও সামাজিক দায় এড়াতে চাই?
এই প্রশ্নের উত্তর না বদলালে, জুম্ম ভবিষ্যৎ বদলাবে না।
- মার্চ ২১, ২০২৬
চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ : চাকমা লোকসাহিত্য, ঐতিহাসিক উচ্ছেদ ও সমকালীন বাস্তবতার আন্তঃসম্পর্ক
চাকমা জনগোষ্ঠীর লোকসাহিত্যে “চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ” একটি গুরুত্বপূর্ণ গীতিকাহিনী, যা চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে চাকমাদের ঐতিহাসিক স্থানচ্যুতির স্মৃতিকে ধারণ করে। এই গবেষণামূলক প্রবন্ধে চাদিছাড়া পলাহকে একটি লোকগীতি হিসেবে নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও ঐতিহাসিক বয়ানের প্রতীকী রূপ হিসেবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পাশাপাশি, গত প্রায় ৫৫ বছরে পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা জনগোষ্ঠীর বাস্তব উচ্ছেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই পালাহের অন্তর্নিহিত ভাবার্থের তুলনামূলক পাঠ উপস্থাপন করা হয়েছে। ব্যক্তিগত সাক্ষ্য ও সমকালীন ঘটনার আলোকে প্রবন্ধটি যুক্তি প্রদান করে যে, চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ মূলত একটি জাতিগত ট্রমার সাংস্কৃতিক রূপায়ণ, যা অতীত ও বর্তমানকে সংযুক্ত করে।
লোকসাহিত্য কোনো জনগোষ্ঠীর কেবল নান্দনিক প্রকাশ নয়; এটি তাদের ইতিহাস, ভয়, প্রত্যাশা ও বেদনার বহিঃপ্রকাশ। চাকমা সমাজে প্রচলিত “চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ” তেমনই একটি লোকগীতি, যা চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে চাকমাদের ঐতিহাসিক প্রস্থান বা পালিয়ে যাওয়ার স্মৃতিকে ধারণ করে।
এই প্রবন্ধের উদ্দেশ্য হলো চাদিগাঙ ছাড়া পালাহকে একটি সাহিত্যিক নিদর্শন হিসেবে নয়, বরং একটি সামাজিক–ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে পাঠ করা। একই সঙ্গে, সমকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা জনগোষ্ঠীর বাস্তব উচ্ছেদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে এই গীতিকাহিনীর ভাবগত মিল ও পার্থক্য বিশ্লেষণ করা।
চাকমা সমাজে একটি প্রচলিত বিশ্বাস রয়েছে যে, চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ যেখানে-সেখানে গাওয়া যায় না। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, কোনো গ্রামে এই পালাহ গাওয়া হলে সেই গ্রাম একসময় চাকমাদের হাতছাড়া হয়ে যায় বা সবাইকে গ্রাম ছেড়ে যেতে হয়। ফলে পালাহটি অনেক ক্ষেত্রে অমঙ্গলসূচক সাংস্কৃতিক চিহ্ন হিসেবে বিবেচিত।
লোকসংস্কৃতির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়, এই ধরনের বিশ্বাস সাধারণত দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে জন্ম নেয়। বাস্তব উচ্ছেদের স্মৃতি সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রতীকী ব্যাখ্যায় রূপান্তরিত হয়ে লোকবিশ্বাসে পরিণত হয়। চাদিগাঙ ছাড়া পালাহও সেই ধারার অন্তর্ভুক্ত বলে অনুমান করা যায়।
গত প্রায় ৫৫ বছরে চাকমা জনগোষ্ঠী বারবার উচ্ছেদের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। এই সময়ে কত গ্রাম যে চাকমারা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছে, তার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে ঐতিহাসিকভাবে জানা যায়, বহু পরিবারকে নিজস্ব ভূমি, ঘরবাড়ি ও জীবিকা ছেড়ে উদ্বাস্তু জীবন বেছে নিতে হয়েছে।
এক পর্যায়ে বহু চাকমা পরিবারকে ভারতে প্রায় ১০–১২ বছর শরণার্থী হিসেবে বসবাস করতে হয়েছে। যারা স্বদেশে অবস্থান করেছিলেন, তারাও স্থায়ী নিরাপত্তা ও ভূমির নিশ্চয়তা পাননি। ফলে উদ্বাস্তু জীবন চাকমা সমাজের একটি দীর্ঘস্থায়ী বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।
এখানে লক্ষণীয় যে, যেসব গ্রাম থেকে চাকমারা উচ্ছেদ হয়েছেন, সেসব স্থানে চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ গাওয়া হয়েছিল—এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। অর্থাৎ লোকবিশ্বাসে পালাহ গাওয়ার সঙ্গে উচ্ছেদের যে সম্পর্ক কল্পনা করা হয়, বাস্তব ইতিহাসে তার সরাসরি সমর্থন নেই।
চাদিগাঙ ছাড়া পালাহে যে স্থানচ্যুতি, অনিশ্চয়তা ও বেদনার চিত্র পাওয়া যায়, তা সমকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, লংগদু অঞ্চলের সাম্প্রতিক ঘটনাবলি চাকমা সমাজের একই ধরনের অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
যদি এই ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে নতুন কোনো গীতিকাহিনী রচিত হতো—ধরা যাক “লংগুদু পালাহ”—তবে তা সম্ভবত চাদিগাঙ ছাড়া পালাহের মতোই করুণ ও বেদনাবহ হতো। এ থেকে বোঝা যায়, লোকসাহিত্য কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; বরং চলমান বাস্তবতার সাংস্কৃতিক প্রতিফলন।
গবেষণার ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সাক্ষ্য অনেক সময় বৃহৎ সামাজিক বাস্তবতার মানবিক রূপ উন্মোচন করে। লংগদু অঞ্চলে তিনটিলা গ্রামের কার্বারী অশ্বিনী কুমার চাকমার অভিজ্ঞতা সে রকমই একটি দৃষ্টান্ত।
১৯৮৯ সালের ৪ মে তার বাড়িঘর ও পুরো গ্রাম পুড়ে যায়। দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করে তিনি আবার জীবন গড়ে তুলেছিলেন। কিন্তু জীবনের শেষভাগে এসে আবার একই ধরনের ধ্বংসের মুখোমুখি হন। তিনি অক্লেশে যে কথাগুলো বলেন, তার অন্তরালে রয়েছে গভীর হতাশা ও নিঃশেষিত সম্ভাবনার বোধ।
এই সাক্ষ্য দেখায় যে, উচ্ছেদ কেবল একটি রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক ঘটনা নয়; এটি মানুষের জীবনের সময়বোধ, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অস্তিত্বের অর্থকেই ভেঙে দেয়।
চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ চাকমা সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ লোকগীতি হলেও এর তাৎপর্য কেবল সাংস্কৃতিক নয়। এটি একটি জাতিগত স্মৃতি, যা বারবার সংঘটিত উচ্ছেদের অভিজ্ঞতাকে প্রতীকী ভাষায় ধারণ করে। বাস্তব ইতিহাসে পালাহ গাওয়ার সঙ্গে উচ্ছেদের সরাসরি সম্পর্ক না থাকলেও, উচ্ছেদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতাই এই লোকগীতিকে জন্ম দিয়েছে।
এই গবেষণা প্রবন্ধের বিশ্লেষণ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, চাদিগাঙ ছাড়া পালাহ অতীতের কাহিনী নয়; এটি বর্তমানের জীবন্ত দলিল। প্রশ্ন থেকে যায়—এই পালাহ কি ভবিষ্যতেও কেবল বেদনার পুনরাবৃত্তি হিসেবেই রয়ে যাবে, নাকি কোনো এক সময় এটি ইতিহাসের স্মারক হয়ে উঠবে?
- মার্চ ১৯, ২০২৬

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন