বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

কবি সরোজ কান্তি চাঙমা: চাঙমা সাহিত্য ও সংগীতের এক নিবেদিত প্রাণ - ইনজেব চাঙম

 

চাঙমা সাহিত্য ও সংস্কৃতির আকাশে এমন কিছু নক্ষত্র আছেন, যাঁদের আলো কখনো কোলাহল সৃষ্টি করে না, অথচ নিভৃত দীপ্তিতে একটি জাতির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে আলোকিত করে রাখে। কবি সরোজ কান্তি চাঙমা তেমনই এক নির্মোহ সাহিত্যসাধক। তিনি একই সঙ্গে গীতিকার, সুরকার, কবি, ঔপন্যাসিক ও লেখক—একজন বহুমাত্রিক স্রষ্টা, যাঁর সৃজনযাত্রা চাঙমা ভাষা ও সংস্কৃতির অস্তিত্বকে আরও দৃঢ় ও প্রাণময় করে তুলেছে।
 
তিনি বিশ্বাস করেন, মাতৃভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস, অনুভূতি ও ভবিষ্যতের ভিত্তি। তাই সাহিত্যচর্চাকে তিনি ব্যক্তিগত খ্যাতির নয়, বরং জাতিসত্তার দায়বোধের জায়গা থেকে গ্রহণ করেছেন। নীরবে, নিরলসভাবে তিনি লিখে চলেছেন—কখনো কবিতায়, কখনো গানে, কখনো গল্পে, আবার কখনো উপন্যাসে।
চাঙমা সংগীতের ভুবনে তাঁর নাম উচ্চারিত হয় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। তাঁর রচিত বহু গান আজও পাহাড়ের জনপদে মানুষের কণ্ঠে কণ্ঠে ধ্বনিত হয়। বিশেষ করে—
“মোনো জুমো তুগুনোত উদিনেই,
চেরোপালা রিনি চাং...
দুরোর পানিয়ানে ডাগে মরে,
কালাবি ভারি গুরি মনত উদে তরে।”
এই গানটি কেবল একটি জনপ্রিয় সংগীত নয়; এটি চাঙমা জনজীবনের আবেগ, স্মৃতি ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক জীবন্ত অনুষঙ্গ। তাঁর সুর ও কথার মাধুর্য লোকজ অনুভূতিকে এমনভাবে ধারণ করেছে যে গানটি আজ মানুষের হৃদয়ের সম্পদে পরিণত হয়েছে।
 
সংগীতের পাশাপাশি সাহিত্যেও তাঁর অবদান গভীর তাৎপর্যপূর্ণ। চাঙমা ভাষা ও চাঙমা বর্ণমালায় রচিত তাঁর উপন্যাস ‘মেঘুলো দেবার আহ্জি’ চাঙমা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক। এমন এক সময়ে, যখন ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ভাষায় মৌলিক সাহিত্য রচনা নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি, তখন তিনি মাতৃভাষায় উপন্যাস লিখে প্রমাণ করেছেন—চাঙমা ভাষাও গভীর জীবনবোধ, শিল্পসৌন্দর্য ও সৃজনশীলতার শক্তিশালী বাহন হতে পারে। তাঁর এই প্রয়াস কেবল একটি গ্রন্থ প্রকাশের ঘটনা নয়; এটি একটি ভাষার সাহিত্যিক সম্ভাবনার সাহসী ঘোষণা।
 
১৯৭১ সালের ২০ জুলাই রাঙামাটি পার্বত্য জেলার নান্যাচর উপজেলার প্রত্যন্ত এগারাল্যা ছড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা বিরাজ মোহন চাঙমা এবং মাতা বিজয় বালা তালুকদার। শৈশব থেকেই প্রকৃতি, লোকজ সংস্কৃতি ও সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ গড়ে ওঠে। পাহাড়ের নিসর্গ, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং মাতৃভাষার মমত্ববোধ তাঁর সৃষ্টিশীল মননকে ক্রমে পরিণত করেছে।
 
তিনি সিঙ্গিনালা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন এবং রাঙ্গুনিয়া ডিগ্রি কলেজ থেকে স্নাতক (বিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি নান্যাচর উপজেলার বাকছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। শিক্ষকতা তাঁর পেশা হলেও সাহিত্য তাঁর আজীবনের সাধনা। শ্রেণিকক্ষে তিনি যেমন শিশুদের হাতে জ্ঞানের আলো তুলে দেন, তেমনি লেখনির মাধ্যমে একটি ভাষা ও সংস্কৃতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্নও লালন করেন।
 
ব্যক্তিজীবনে তিনি শর্মিতা চাঙমার জীবনসঙ্গী। তাঁদের এক পুত্র দীঘোল চাঙমা এবং এক কন্যা নিষ্ঠা বৃত্তি চাঙমা। পরিবার, শিক্ষকতা ও সাহিত্য—এই তিন ধারাকে সমান্তরালভাবে বহন করেই তিনি তাঁর সৃজনযাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।
 
এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা একটি হলেও তার সাহিত্যিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ‘মেঘুলো দেবার আহ্জি’-এর পাশাপাশি চাঙমা ভাষায় রচিত তাঁর অসংখ্য কবিতা, ছোটগল্প ও গান বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন ও প্রকাশনায় স্থান পেয়েছে। তাঁর প্রায় বিশটি গান প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে দশটি ধর্মীয় সংগীত। কিন্তু অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে তাঁর বহু কবিতা, গান ও ছোটগল্প এখনো প্রকাশের আলোর মুখ দেখেনি। অপ্রকাশিত সেই পাণ্ডুলিপিগুলো যেন সময়ের কাছে নীরব অপেক্ষায় থাকা একেকটি অমূল্য সম্পদ।
বাংলাদেশে আদিবাসী লেখকদের জন্য প্রকাশনার পথ আজও সহজ নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁদের নিজস্ব অর্থায়নে বই প্রকাশ করতে হয়। ফলে বহু প্রতিভাবান সাহিত্যিকের সৃষ্টিকর্ম পাণ্ডুলিপির ভাঁজেই বন্দি থেকে যায়। কবি সরোজ কান্তি চাঙমাও সেই কঠিন বাস্তবতার এক নীরব সাক্ষী। অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর সাহিত্যসাধনাকে থামিয়ে দিতে পারেনি; বরং প্রতিকূলতার মধ্যেই তিনি সৃষ্টি করে চলেছেন ভাষা ও সংস্কৃতির এক অমূল্য ভাণ্ডার। তাঁর অপ্রকাশিত রচনাগুলো শুধু ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, সমগ্র চাঙমা জাতিসত্তার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার।
 
একজন সাহিত্যিকের প্রকৃত পরিচয় তাঁর খ্যাতিতে নয়, তাঁর সৃষ্টির স্থায়িত্বে। সরোজ কান্তি চাঙমার সাহিত্য ও সংগীত সেই স্থায়িত্বেরই প্রতিশ্রুতি বহন করে। তিনি প্রমাণ করেছেন, নিবেদিত সাধনা কখনো বৃথা যায় না; একটি ভাষার জন্য একজন মানুষের একাগ্র ভালোবাসাও ইতিহাস নির্মাণ করতে পারে।
চাঙমা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করার যে নীরব অভিযাত্রায় তিনি নিজেকে উৎসর্গ করেছেন, তা নিঃসন্দেহে গভীর শ্রদ্ধার দাবিদার। তাঁর মতো সাহিত্যসাধকদের যথাযথ মূল্যায়ন, প্রকাশনার সুযোগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা নিশ্চিত করা গেলে চাঙমা সাহিত্য আরও বিকশিত হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তখন শুধু একটি ভাষাই উত্তরাধিকারসূত্রে পাবে না; পাবে তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় এবং সাহিত্যিক গৌরবের এক সমৃদ্ধ ভাণ্ডার। আর সেই ভাণ্ডারের নির্মাতাদের অন্যতম উজ্জ্বল নাম হয়ে থাকবে—কবি সরোজ কান্তি চাঙমা।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

পদ নয়, ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এক মানুষ - ইনজেব চাঙমা

  ইনজেব চাঙমা ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে কিছু সিদ্ধান্ত কাগজের ফাইলে বন্দী থাকে না, ফাইলের হলুদ পাতায় শুকিয়ে যায় না। তারা রক্তে-অশ্রুতে, দীর্...