বাংলাদেশের সমকালীন চিত্রকলায় যে কজন শিল্পী পাহাড়ি জনপদের ইতিহাস, প্রকৃতি, মানুষের জীবনসংগ্রাম এবং অস্তিত্বের সংকটকে বিশ্বদরবারে এক অনন্য শিল্পভাষায় উপস্থাপন করেছেন, তাঁদের মধ্যে জয়তু চাকমা একটি উজ্জ্বল নাম। তাঁর শিল্পকর্মে যেমন ধরা পড়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের সবুজ পাহাড়, জুমজীবনের ছন্দ, মাচাং ঘর, কাপ্তাই হ্রদের জলরাশি ও মানুষের স্বপ্ন, তেমনি ফুটে ওঠে বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, ইতিহাসের নীরব আর্তনাদ এবং একটি জাতিসত্তার অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। তিনি শুধু একজন চিত্রশিল্পী নন; তিনি পাহাড়ের স্মৃতি, মানুষের বেদনা এবং ইতিহাসের এক শিল্পিত ভাষ্যকার।
জয়তু চাকমার জন্ম ১৭ জানুয়ারি ১৯৮৯ সালে রাঙামাটি জেলার দুর্গম মোবাছড়ি গ্রামে। যদিও শিক্ষাগত সনদপত্রে তাঁর জন্মতারিখ ১০ জানুয়ারি ১৯৯০ হিসেবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। বাবা প্রভাত কিশোর চাকমা এবং মা বুদ্ধমালা চাকমার দুই সন্তানের মধ্যে তিনি ছিলেন কনিষ্ঠ। বড় ভাই সুদীর্ঘ চাকমা ছিলেন পরিবারের অন্যতম আশার প্রদীপ। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাঁর অকালমৃত্যু পুরো পরিবারকে গভীর শোকে নিমজ্জিত করে। বড় ভাইয়ের সেই শূন্যতা জয়তু চাকমার মনোজগতে এক গভীর ক্ষতের জন্ম দেয়। জীবনের ক্ষতি, বিচ্ছেদ, অনিশ্চয়তা ও অস্তিত্বের যে অনুভূতি তাঁর ক্যানভাসে এত তীব্রভাবে প্রতিফলিত হয়, তার পেছনে এই ব্যক্তিগত বেদনারও এক নীরব প্রভাব কাজ করে।
কাপ্তাই হ্রদের বুক চিরে নৌকায় করে পৌঁছাতে হয় তাঁর জন্মভূমি মোবাছড়িতে। আজও যেখানে আধুনিক সভ্যতার অনেক সুবিধা পুরোপুরি পৌঁছায়নি, সেই প্রকৃতিনির্ভর পাহাড়ি পরিবেশই ছিল তাঁর প্রথম বিদ্যালয়। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন অন্যরকম। বাংলা, ইংরেজি কিংবা অঙ্কের খাতা ভরে উঠত না শুধু লেখায়; বরং প্রতিটি পাতা ভরে যেত পাহাড়, নদী, নৌকা, জুমখেত, জুমিয়া, মাচাং ঘর আর কাপ্তাই হ্রদের অসংখ্য রেখাচিত্রে। শুধু খাতা নয়, হাতে যে কাগজই পেতেন, সেখানেই ফুটিয়ে তুলতেন নিজের কল্পনার জগৎ। শিল্পের প্রতি এই সহজাত আকর্ষণের জন্য কখনো বাবা-মায়ের বকুনি শুনতে হয়নি; বরং তাঁদের অকুণ্ঠ উৎসাহ ও ভালোবাসাই তাঁর শিল্পী হয়ে ওঠার পথকে দৃঢ় করেছে।
প্রতি শুক্রবার তাঁর বাবা নিজ হাতে নৌকা চালিয়ে তাঁকে নিয়ে যেতেন রাঙামাটি চারুকলা একাডেমিতে। সেখানেই বিশিষ্ট শিল্পী রতিকান্ত তঞ্চঙ্গ্যার সান্নিধ্যে তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিল্পশিক্ষার সূচনা হয়। সেই ছোট্ট শিল্পযাত্রাই একদিন তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পৌঁছে দেবে—তখন হয়তো কেউ তা কল্পনাও করেননি।
তিনি নোয়াদম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পরে বন্দুকভাঙা উচ্চ বিদ্যালয় এবং রানী দয়াময়ী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর রাঙামাটি সরকারি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে। সেখানে পেইন্টিং বিভাগে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে শিক্ষক ঢালী আল মামুন ও অলোক রায়ের শিল্পদর্শন তাঁর চিন্তা ও সৃষ্টিশীলতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। পরবর্তীতে ভারত সরকারের আইসিসিআর (ICCR) বৃত্তি লাভ করে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং সেখান থেকেও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। আন্তর্জাতিক শিল্পচর্চার অভিজ্ঞতা তাঁর শিল্পকে আরও সমৃদ্ধ ও বহুমাত্রিক করে তোলে।
দেশে ফিরে তিনি ঢাকাকে কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিলেও তাঁর হৃদয়ের ঠিকানা আজও পাহাড়। তাঁর ক্যানভাসে বারবার ফিরে আসে জন্মভূমির প্রকৃতি, মানুষের জীবন, ইতিহাস এবং হারিয়ে যাওয়া জনপদের স্মৃতি।
জয়তু চাকমার শিল্পের সবচেয়ে বড় অনুষঙ্গ কাপ্তাই হ্রদ। তাঁর কাছে এই হ্রদ কেবল প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের প্রতীক নয়; এটি উন্নয়নের নামে বাস্তুচ্যুত হাজারো মানুষের হারিয়ে যাওয়া ভিটেমাটি, ডুবে যাওয়া স্মৃতি এবং অব্যক্ত কান্নার প্রতীক। ষাটের দশকে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের ফলে অসংখ্য গ্রাম, কৃষিজমি ও বসতি পানির নিচে তলিয়ে যায়। তাঁর পূর্বপুরুষদের বাড়িও সেই প্লাবনের শিকার হয়েছিল। যদিও তিনি সেই ভয়াবহ ঘটনা প্রত্যক্ষ করেননি, পরিবারের প্রবীণদের মুখে শোনা সেই ইতিহাস তাঁর শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে।
তাঁর এক আলোচিত শিল্পকর্মে ত্রিভুজাকৃতির একটি ফ্রেমের মধ্যে গোলাকার জলরাশির নিচে ডুবে থাকা মানুষের শুধু একটি হাত দৃশ্যমান। সেই হাত যেন পানির নিচ থেকে ইতিহাসকে সাক্ষ্য দিতে চায়। যেন বলতে চায় হারিয়ে যাওয়া গ্রামগুলোর গল্প, বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস এবং অধিকারহারা একটি জনগোষ্ঠীর অব্যক্ত বেদনার ইতিহাস। এই প্রতীকী শিল্পভাষাই তাঁকে সমকালীন বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে এক স্বতন্ত্র উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করেছে।
তাঁর শিল্পে পাহাড়ের প্রকৃতি যেমন স্থান পায়, তেমনি স্থান পায় আদিবাসী মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, পরিচয়ের সংকট, পরিবেশ ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি, সামাজিক বৈষম্য এবং মানবাধিকারের প্রশ্ন। তিনি বিশ্বাস করেন, শিল্প কেবল রঙ ও রেখার সমাবেশ নয়; শিল্প হলো মানুষের স্মৃতি সংরক্ষণের এক নীরব দলিল, ইতিহাসের বিকল্প ভাষা এবং প্রতিবাদের এক নান্দনিক মাধ্যম।
এই শিল্পভাবনার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিস্বরূপ জয়তু চাকমা জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) আয়োজিত আন্তর্জাতিক শিল্প প্রতিযোগিতায় বিশ্বের নির্বাচিত আটজন সংখ্যালঘু শিল্পীর একজন হিসেবে সম্মাননা অর্জন করেন। সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি সেই সম্মান গ্রহণ করেন। এই অর্জন কেবল তাঁর ব্যক্তিগত সাফল্য নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনসংগ্রামেরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।
তবে জয়তু চাকমার স্বপ্ন শুধু একজন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিল্পী হয়ে ওঠা নয়। তাঁর হৃদয়ের গভীরে লালিত সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা—একদিন রাঙামাটিতে স্থায়ীভাবে ফিরে এসে একটি আধুনিক, আন্তর্জাতিক মানের শিল্প স্টুডিও ও সৃজনশীল শিল্পকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা। তিনি বিশ্বাস করেন, পাহাড়ে প্রতিভার কোনো অভাব নেই; অভাব শুধু সুযোগের। তাই তিনি চান, তাঁর স্টুডিও হবে নবীন শিল্পীদের জন্য শিক্ষা, গবেষণা, প্রদর্শনী ও সৃজনশীল চর্চার এক মুক্তাঙ্গন। সেখানে পাহাড়ের তরুণ-তরুণীরা শিল্পচর্চার সুযোগ পাবে, নিজেদের প্রতিভা বিকাশের পথ খুঁজে পাবে এবং দেশ-বিদেশে শিল্পের মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও জীবনকে তুলে ধরতে সক্ষম হবে। তিনি মনে করেন, শিল্প কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়; এটি একটি সমাজকে জাগিয়ে তোলার শক্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার নির্মাণের অন্যতম মাধ্যম।
আজ জয়তু চাকমা বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে এক অনন্য উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত। তাঁর প্রতিটি চিত্রকর্ম পাহাড়ের নীরব ভাষা, কাপ্তাইয়ের জলরাশি, হারিয়ে যাওয়া বসতির স্মৃতি এবং মানুষের অমলিন সংগ্রামের দলিল হয়ে উঠেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন—একজন শিল্পী শুধু ছবি আঁকেন না; তিনি সময়কে ধারণ করেন, ইতিহাসকে সংরক্ষণ করেন এবং মানুষের না-বলা কথাগুলোকে রঙের ভাষায় বিশ্বমানবতার সামনে তুলে ধরেন।
জয়তু চাকমার শিল্পযাত্রা তাই কেবল একজন সফল চিত্রশিল্পীর জীবনী নয়; এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের মানুষ, প্রকৃতি, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামের এক অনবদ্য শিল্পগাথা। তাঁর তুলির প্রতিটি আঁচড়ে জীবন্ত হয়ে ওঠে পাহাড়ের আত্মা, মানুষের বেদনা এবং ভবিষ্যতের স্বপ্ন—যে স্বপ্নে শিল্প হয়ে ওঠে ইতিহাসের সাক্ষী, মানবতার ভাষা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য এক অমূল্য উত্তরাধিকার।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন