বৃহস্পতিবার, ৬ আগস্ট, ২০২৬

বিঝু মেলার পথে, একটি না-ভোলা দিনের দিনলিপি- ইনজেব চাঙমা

 

এখনো সেই দিনটির কথা ভুলতে পারি না। সময় অনেক দূর এগিয়ে গেছে, কত ঘটনা এসেছে-গেছে, কত মানুষ আমাদের থেকে দূরে সরে গেছে; শুধু সে দিনটির জন্য। তাই হয়তো হৃদয়ের গভীরে এমনভাবে গেঁথে আছে, মনে হয়, হয়তো সারাজীবনই সঙ্গে থাকবে। মনে হয়, এ ক্ষত শুকোবার নয়, এ স্মৃতি আমৃত্যু বয়ে বেড়াতে হবে।
 
আমাদের সংগঠনের উদ্দেশ্য কখনো শুধু ভাষা ও সাহিত্যচর্চার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। ভাষার সঙ্গে সাহিত্য, আর সাহিত্যের সঙ্গে সংস্কৃতি, এই তিনটি বিষয়কে আমরা একই সূত্রে দেখতে চেয়েছি। কারণ ভাষা হারালে সাহিত্য হারায়, সাহিত্য হারালে সংস্কৃতির স্মৃতিও ধীরে ধীরে মুছে যায়। অথচ আধুনিকতার নামে আমরা নিজেরাই কখনো কখনো নিজেদের সংস্কৃতিকে বিসর্জন দিচ্ছি। এই বাস্তবতাই আমাদের গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল।
সেই বেদনা থেকেই জন্ম নিয়েছিল একটি স্বপ্ন। সিদ্ধান্ত হয়েছিল, শহরের আলো-ঝলমলে মঞ্চে নয়, আমাদের যেতে হবে প্রান্তে, তৃণমূলে, যেখানে এখনো সংস্কৃতি নিঃশ্বাস নেয়। প্রতিটি উপজেলায় গিয়ে নতুন প্রজন্মের চোখে তুলে ধরতে হবে আত্মপরিচয়ের আয়না। আর সেই স্বপ্নযাত্রার প্রথম প্রদীপ জ্বলবে নানিয়ারচরে, বিঝু ও সাহিত্য মেলা ২০২৪-এর হাত ধরে।
 
স্বপ্নকে বাস্তব করতে আমি পাড়ি জমালাম নানিয়ারচরে। সেখানে এক সপ্তাহ, সে যেন এক ঘোরলাগা সময়। সকাল থেকে সন্ধ্যা, নান্যাচর উপজেলা থেকে কার্বারীর উঠোন, হেডম্যানের বৈঠকখানা থেকে চেয়ারম্যানের দপ্তর, মুরুব্বিদের পায়ের কাছে বসে শুনেছি তাঁদের কথা। যারা সভায় আসতে পারেননি, তাঁদের বাড়ির দরজায় গিয়ে কড়া নেড়েছি। মানুষের মতামত চেয়েছি, সহযোগিতা চেয়েছি, মানুষ দু'হাত ভরে দিয়েছে। একটু একটু করে গড়ে উঠছিল আমাদের মেলার ভিত।
 
এমনই এক আলোচনায় আমাদের এক সহকর্মী প্রস্তাব রাখলেন, যেহেতু বিঝু ও সাহিত্য মেলা, বিষয়টি স্থানীয় ইউপিডিএফ-কে অবগত করা উচিত।
 
প্রস্তাবটি শুনেই আমার বুকের ভেতর পুরনো এক ক্ষত চিনচিন করে উঠলো। মুখে কিছু বললাম না, কিন্তু মনে পড়ে গেল লক্ষ্মীছড়ির সেই দিনটির কথা।
 
লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান সুপাল জ্যোতি দাকে আমন্ত্রণ জানাতে গিয়ে প্রদীপ দা সমস্যা পড়লেন। পরে তিনি আমাকে ফোন ধরিয়ে দিলেন। আমি বিনয়ের সাথে সমস্ত পরিকল্পনা খুলে বলার পরও ওপাশ থেকে তীক্ষ্ণ প্রশ্ন ছুটে এলো, "তুমি কে? দিঘীনালা থেকে লক্ষ্মীছড়িতে চাকমা ভাষার কাজ করতে আসবে?" শুধু তাই নয়, দিঘীনালা নাকি চুর, জুয়া — কত কী! (তাঁর সম্পূর্ণ কথা রেকর্ড করলাম) আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। একজন জনপ্রতিনিধি, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রের মুখে এমন ভাষা আমি প্রত্যাশা করিনি। অথচ আমরা তো লক্ষীছড়ি সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান প্রবীল দা সহ সকলের সাথে আলোচনা করেই এগিয়েছিলাম। তখন মিথুন দা বেঁচে ছিলেন। আমরা মিথুন দা সহ হুয়োং বইও বাহ্, রেগা ক্লাবে বসে মাতৃভাষা নিয়ে স্বপ্ন বুনেছিলাম। সে সূত্রে ধরে আমি মিথুন দাকে বিষয়টি জানালে তিনি শুধু মৃদু হেসে বলেছিলেন, "তুমি তোমার প্ল্যান অনুসারে কাজ করো।"
 
সেদিন রাত প্রায় দশটা। চাঙমা সাহিত্য পত্রিকার জন্য একটি কবিতা টাইপ করছি, হঠাৎ ফোনের রিং। স্ক্রিনে লক্ষ্মীছড়ি উপজেলা চেয়ারম্যানের নম্বর। ধরতেই ওপাশ থেকে ক্লান্ত, অনুতপ্ত কণ্ঠ, "সরি দা, মর ভুল অয়ে। তুই আয়, মাত্তর মুই সময় দি ন' পারঙর। ঢাকাত কাম আঘে।"
 
আমি গিয়েছিলাম। প্রবীণ দা ছিলেন। ভাষা কোর্সের উদ্বোধন হয়েছিল। কাজটি শেষ পর্যন্ত হয়েছিল।
নানিয়ারচরের মিটিঙে বসে সেই কাঁটাটাই আবার বিঁধছিল। তবু আমি নীরব রইলাম। নীরবে সম্মতি দিলাম। বরং বললাম, তাঁদের জন্যও একটি বাজেট রাখা হোক। আমার স্পষ্ট মনে আছে, প্রায় ৫০ হাজার টাকার একটি বাজেট আবেদন ইউপিডিএফ-এর সুকৃতি দা কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল।
 
প্রাথমিক কাজ সেরে আমরা পাঁচজন গেলাম রাঙ্গামাটি, চাকমা রাজাকে আমন্ত্রণ জানাতে। কর্তা আমন্ত্রণ গ্রহণ করলেন। ৮ মার্চ ২০২৪ উদ্ধোধন। আমি বাড়ি ফিরলাম।
 
সুপায়ন চাকমা নেতৃত্বে একটি দল গেল সেখানকার ইউপিডিএফ পরিচালক সুকৃতি চাকমার সাথে দেখা করতে। সেখানে ছিল নানিয়ারচরের বিভিন্ন ক্লাবের সদস্যরা। আলোচনার এক পর্যায়ে সুপায়ন যখন কথা বলছিল, সুকৃতি দা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বলে উঠলেন, "ইনজেব চাকমা থেকে জেএসএস-এর গন্ধ পাওয়া যায়।"
কথাটা সুপায়ন মন খারাপ করে আমাকে জানালো। শুনে আমার ভেতরটা কেঁপে উঠলো। ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য কাজ করতে এসে আমি কখন গন্ধের রাজনীতিতে ঢুকে পড়লাম?
আমি তাঁর নম্বর জোগাড় করে ফোন করলাম। সরাসরি বললাম, "দা, তুমি নাকি আমার মধ্যে জেএসএস-এর গন্ধ পাও? তাই তোমার সাথে কথা বলতে চাই।" তিনি খানিকটা অপ্রস্তুত হলেন। বললেন, ফোনে নয়, সামনাসামনি বসতে হবে।
 
প্রথমে ২ এপ্রিল দিন ধার্য হলো, আমি অনুরোধ করলাম ২৫ মার্চ করতে, কারণ ৮ এপ্রিল আমাদের মেলার উদ্বোধন। অবশেষে ২৯ মার্চ দেখা করার দিন ঠিক হলো।
 
সেই ২৯ মার্চ, সেই না-ভোলা দিন। সুকৃতি দা বিঝু ও সাহিত্য মেলার জন্য সম্মতি দিলেও শেষ পর্যন্ত করা গেলনা। তা আলোচনা করতে চাইব না এখানে। তবে এ কথা বলে রাখা ভালো, অনুষ্ঠান করতে না পেরে অনেককে ভুল বোঝানো হয়েছিল। সেদিন অনেক কথার ভিড়ে সুকৃতি দা, প্রজ্ঞা তাপস ও সুহাস চাকমার প্রসঙ্গ টানলেন। বললেন, তাঁরা যা বলেন, তা সত্য বলেন; যা করেন, ন্যায়ের পক্ষেই করেন। আমি শুধু কান পেতে শুনেছিলাম। 
 
আজ সময় বদলেছে। কালের চাকা ঘুরেছে। আজ দেখি, সেই প্রজ্ঞা তাপসই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইউপিডিএফ, সুহাস চাকমা সহ অনেকের সেদিনের সেই ঘটনার বিবরণ তুলে ধরছেন। আজ এই পরিবর্তনের সামনে দাঁড়িয়ে আমি শুধু একটি প্রশ্নের মুখোমুখি হই, সেসময় যা সত্য ছিল, আজ তা মিথ্যে হয়ে গেল? নাকি আজ যা সত্য বলে লেখা হচ্ছে, সে সময় তা-ই ছিল প্রকৃত সত্য?
এই প্রশ্নের উত্তর আমি আজও খুঁজে ফিরি। বিঝু ও সাহিত্য মেলা হলো না , আর তাই হয়তো, এখনো সেই দিনটির কথা ভুলতে পারি না।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

  ইলন চাকমা,  বিশ্বসাহিত্যের স্বপ্নে এক তরুণ অক্ষরযাত্রী- ইনজেব চাঙমা “ একটি ভাষার অক্ষরে যখন একটি জাতির স্বপ্ন জেগে ওঠে , ...