দীপনা চাঙমা দীপু: দুঃখের ভেতরও যে কলম থামে না - ইনজেব চাঙমা
চাঙমা সাহিত্যভুবনে নারী লেখকের সংখ্যা এখনও অপ্রতুল। সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক দায়িত্ব, অর্থনৈতিক সংকট এবং জীবনের নানা প্রতিকূলতা অতিক্রম করে যাঁরা নিজের ভাষা, সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে বুকে ধারণ করে নিরন্তর লিখে চলেছেন, কবি দীপনা চাঙমা দীপু তাঁদেরই একজন। তিনি শুধু কবি নন—গল্পকার, ছোটগল্পকার, সাহিত্যকর্মী এবং সর্বোপরি মাতৃভাষা চাঙমার প্রতি গভীর দায়বদ্ধ এক নিরলস লেখক। তাঁর সাহিত্যযাত্রার সঙ্গে মিশে আছে একজন নারীর সংগ্রাম, একজন মায়ের দায়িত্ব এবং একজন লেখকের অদম্য স্বপ্ন।
দীপনা চাঙমা দীপুর জন্ম ১৯৮৬ সালের ২১ অক্টোবর খাগড়াছড়ি সদর উপজেলার ভাইবোনছড়া ইউনিয়নের মণিগ্রামে। পিতা পারুল বিকাশ চাঙমা ও মাতা মৃণাদেবী চাঙমার সংসারে দুই বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। (তাঁর বড় বোন ভারতে শরণার্থী জীবনে স্বর্গে গমন করেন।) জন্মের পরপরই পার্বত্য চট্টগ্রামের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে তাঁর পরিবারকে শরণার্থী হিসেবে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়। সেখানে প্রায় তিন মাস অবস্থানের পর তাঁরা আবার নিজ দেশে ফিরে আসেন। জীবনের শুরুতেই বাস্তুচ্যুতি ও অনিশ্চয়তার যে ছায়া তাঁকে স্পর্শ করেছিল, পরবর্তী জীবনের নানা অভিজ্ঞতার সঙ্গে তার এক অদৃশ্য যোগসূত্র যেন থেকে যায়।
শৈশব ও কৈশোর পেরিয়ে তিনি শিক্ষাজীবনে বিএসএস ডিগ্রি অর্জন করেন। স্কুলজীবনে লেখালেখির তেমন সুযোগ বা পরিসর তিনি পাননি, কিন্তু শব্দের প্রতি এক অদৃশ্য আকর্ষণ তাঁর ভেতরে ধীরে ধীরে জন্ম নিয়েছিল। সেই আকর্ষণই কলেজজীবনে এসে প্রকাশের পথ খুঁজে নেয়। ঢাকায় প্রকাশিত একটি লিটলম্যাগ “কথোপকথন” এ বিভাগে নিয়মিত ও ‘চাঙমা সাহিত্য পত্রিকা’-য় লেখালেখির মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্যজীবনের আনুষ্ঠানিক সূচনা। সেই যে কলম হাতে নিয়েছিলেন, তা আর থামেনি।
তাঁর কাছে লেখা নিছক মনের ভাব প্রকাশের কোনো ব্যক্তিগত অবকাশ নয়। লেখা তাঁর কাছে নিজের জাতিসত্তা, মাতৃভাষা, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের কথা বলার এক শক্তিশালী মাধ্যম। বাংলা ভাষায় লেখার পাশাপাশি নিজের মাতৃভাষা চাঙমাকে তিনি সাহিত্যচর্চার অন্যতম প্রধান অবলম্বন করেছেন। কবিতা, গল্প ও ছোটগল্পে তিনি তুলে ধরেছেন চাঙমা সমাজের মানুষ ও তাদের জীবনযাপন, আনন্দ-বেদনা, প্রেম-বিরহ, প্রকৃতি, সামাজিক টানাপোড়েন এবং প্রতিদিনের বাস্তব অভিজ্ঞতার বহুমাত্রিক ছবি।
দীপনার লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি তার জীবনঘনিষ্ঠতা। তাঁর সৃষ্টিতে কৃত্রিমতার চেয়ে বাস্তবতার স্পর্শ বেশি। চারপাশের মানুষ, তাদের হাসি-কান্না, সম্পর্কের টানাপোড়েন, অভাব, স্বপ্ন ও বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা তাঁর লেখার উপাদান হয়ে ওঠে। প্রতিদিনের দেখা জীবন কখনো কবিতার পঙ্ক্তি, কখনো গল্পের চরিত্র, আবার কখনো ছোটগল্পের নিঃশব্দ বেদনা হয়ে তাঁর কলমে ফিরে আসে। তাঁর সাহিত্য তাই কেবল কল্পনার ফুল ফোটায় না; সেখানে মাটির গন্ধ আছে, মানুষের দীর্ঘশ্বাস আছে, আছে জীবনের অনুচ্চারিত কথার প্রতিধ্বনি।
তাঁর কবিতা, গল্প ও ছোটগল্প বিভিন্ন পত্রপত্রিকা, সাহিত্যসংকলন এবং অনলাইন মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে এখনও তাঁর কোনো একক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু একজন লেখকের সাহিত্যিক মূল্য কেবল প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। অনেক সময় দীর্ঘদিনের নীরব সাধনা, অবিচল লেখালেখি এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও সৃষ্টিশীলতার ধারাবাহিকতাই হয়ে ওঠে একজন লেখকের প্রকৃত পরিচয়।
২০২৩ সালে নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে প্রকাশিত যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘পুগবেল’-এ তাঁর কবিতা প্রকাশিত হয়। একক গ্রন্থের অপেক্ষায় থাকা একজন কবির জন্য এটি ছিল নিঃসন্দেহে একটি স্মরণীয় সাহিত্যিক অর্জন।
সাহিত্যের পাশাপাশি দীপনা চাঙমা দীপু চাঙমা সমাজের সংবাদ, সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চার সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছেন। ‘হিলর পচ্জন’-এর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি শুধু নিজের সাহিত্যচর্চার পরিসরেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণেও ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর এই সম্পৃক্ততা প্রমাণ করে, সাহিত্য তাঁর কাছে নিছক ব্যক্তিগত আত্মপ্রকাশ নয়; এটি সমাজ, সংস্কৃতি ও মাতৃভাষার প্রতি এক গভীর দায়বদ্ধতার নাম।
তবে দীপনা চাঙমা দীপুর জীবনকাহিনির সবচেয়ে বেদনাবিধুর অধ্যায় তাঁর ব্যক্তিজীবন। দিঘীনালার বাবুছড়া ইউনিয়নের নুনছড়ি গ্রামের জেলাস চাঙমার সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় দুই সন্তান, শ্রাবণ চাঙমা ও কার্তিকা চাঙমা। এক ছেলে ও এক মেয়েকে নিয়ে সংসার যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছিল, তখন স্বামীর দীর্ঘ অসুস্থতা তাঁদের জীবনে নেমে আসে গভীর দুর্যোগ হয়ে। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা, সংসারের ব্যয় এবং সন্তানদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব, সবকিছু একসঙ্গে বহন করতে হয়েছে দীপনাকে।
দীপনার জীবন যেন আরও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। জীবিকার তাগিদে কখনো তাঁকে রাস্তার পাশে বসে পাজন ও তরিতরকারি বিক্রি করতে হয়েছে। সংসারের প্রয়োজন তাঁকে নানা ধরনের কাজের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যে হাত কবিতার শব্দ লিখেছে, সেই হাতই সংসার চালানোর জন্য জীবিকার সামগ্রী সাজিয়েছে। যে চোখ সাহিত্যের স্বপ্ন দেখেছে, সেই চোখই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে রাত কাটিয়ে যাচ্ছেন। জীবন কখনো তাঁকে কবির জন্য আলাদা কোনো অবকাশ দেয়নি। তবু তাঁর কলম থামেনি।
অভাব এসেছে, নিঃসঙ্গতা এসেছে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা বারবার তাঁকে নত করতে চেয়েছে, কিন্তু সাহিত্যচর্চার প্রতি তাঁর গভীর ভালোবাসা তাঁকে থামতে দেয়নি। নুনছড়ি গ্রামের ছোট্ট সংসারে দুই সন্তানকে নিয়ে প্রতিদিনের জীবনসংগ্রাম চালিয়েও তিনি লিখে চলেছেন। তাঁর কাছে তাই লেখালেখি শুধু সাহিত্যচর্চা নয়, এ যেন বেঁচে থাকারও এক অনন্য ভাষা।
কেউ কেউ অবসর থেকে সাহিত্য লেখেন; আর কেউ কেউ লেখেন জীবনের গভীর ক্ষত থেকে। তাঁর শব্দের ভেতর তাই কেবল কাব্যিক সৌন্দর্য নেই; আছে জীবনের উত্তাপ। আছে একজন নারীর সংগ্রাম, একজন মায়ের মমতা এবং একজন লেখকের অদম্য স্বপ্ন।
দীপনার সাহিত্যিক সত্তার আরেকটি উজ্জ্বল দিক তাঁর মাতৃভাষাপ্রীতি। তিনি নিজের ভাষাকে পেছনে ফেলে অন্য কোনো ভাষার ছায়ায় বড় হতে চাননি, বরং চাঙমা ভাষাকেই সঙ্গে নিয়ে নিজের সাহিত্যিক পথ নির্মাণ করতে চেয়েছেন। চাঙমা ভাষায় তাঁর লেখালেখি তাই ব্যক্তিগত সাহিত্যসাধনার পাশাপাশি মাতৃভাষার অস্তিত্ব রক্ষারও এক নীরব প্রয়াস। একটি ভাষা তখনই সত্যিকার অর্থে বেঁচে থাকে, যখন সেই ভাষায় মানুষ স্বপ্ন দেখে, ভালোবাসে, কাঁদে, কথা বলে এবং সাহিত্য সৃষ্টি করে। দীপনা তাঁর কলমের মাধ্যমে সেই বেঁচে থাকার কাজটিই করে চলেছেন।
হয়তো তাঁর ঘরে বইয়ের তাক এখনও পূর্ণ হয়নি। হয়তো তাঁর নামে একক কাব্যগ্রন্থের মলাট এখনও প্রকাশকের ছাপাখানা থেকে বেরিয়ে আসেনি। কিন্তু একজন লেখকের জীবন কি কেবল মলাটবন্দি বইয়ের সংখ্যায় পরিমাপ করা যায়? দীপনার জীবনের প্রতিটি দিনই যেন এক একটি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি। সেখানে আছে অভাবের অক্ষর, শোকের বাক্য, মাতৃত্বের মমতা, সংগ্রামের দীর্ঘ অধ্যায় এবং আশার কিছু অনুচ্চারিত পঙ্ক্তি। তাঁর জীবনই যেন তাঁর প্রথম গ্রন্থ,যার প্রতিটি পৃষ্ঠায় লেখা আছে বেঁচে থাকার ইতিহাস।
দীপনা চাঙমা দীপু তাই শুধু একজন কবির নাম নয়; তিনি এক সংগ্রামী নারীর নাম, এক মায়ের নাম, এক সাহিত্যকর্মীর নাম এবং এক মাতৃভাষাপ্রেমী লেখকের নাম। প্রতিকূলতার কাছে পরাজিত না হয়ে যিনি শব্দকে সঙ্গী করেছেন, দুঃখকে করেছেন সৃষ্টির উপাদান, আর জীবনসংগ্রামকে রূপ দিয়েছেন সাহিত্যের অনিঃশেষ প্রেরণায়।
দুঃখ তাঁকে থামাতে পারেনি, অভাব তাঁর স্বপ্ন কেড়ে নিতে পারেনি, সংসারের ভার তাঁর কলমকে স্তব্ধ করতে পারেনি। বরং জীবনের যত কঠিন পথ তিনি অতিক্রম করেছেন, তাঁর লেখার ভেতর তত গভীর হয়েছে মানুষের প্রতি মমতা, সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং নিজের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসা।
চাঙমা সাহিত্যের অঙ্গনে দীপনা চাঙমা দীপুর পথচলা এখনও দীর্ঘ হওয়ার অপেক্ষায়। তাঁর একক গ্রন্থের মলাট হয়তো সময়ের কাছে এখনও ঋণী, কিন্তু তাঁর কলম ইতিমধ্যেই বলে দিয়েছে, সাহিত্য শুধু কাগজে লেখা হয় না; কখনো কখনো একজন মানুষের সমগ্র জীবনই হয়ে ওঠে একটি দীর্ঘ কবিতা। আর দীপনা চাঙমা দীপুর জীবন, সেই অসমাপ্ত কবিতারই এক বেদনাময়, সংগ্রামী অথচ দীপ্ত অধ্যায়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন