সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬

এসএসসি ফলাফল পাহাড়ের দীর্ঘশ্বাস - ইনজেব চাঙমা

 

আজ ১০ আগস্ট ২০২৬। ক্যালেন্ডারের পাতায় দিনটি হয়তো আর দশটি দিনের মতোই। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের কাছে আজকের দিনটি যেন দুটি ভিন্ন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে আমাদের, একটিতে দেখা যাচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল, অন্যটিতে সাজেক কলেজ প্রতিষ্ঠার অনিশ্চয়তা। একটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ক্ষত দেখাচ্ছে, অন্যটি সেই ক্ষতের গভীরে জমে থাকা দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাস।
 
দুটি ঘটনা আলাদা নয়। একই সুতোয় বাঁধা। একটির নাম শিক্ষাবঞ্চনা, অন্যটির নাম অধিকারবঞ্চনা। এসএসসি-২০২৬-এর ফলাফল যেন পাহাড়ের আকাশে হঠাৎ নেমে আসা এক বিষণ্ন মেঘ।
খাগড়াছড়িতে পাসের হার মাত্র ৩৪.৯৯ শতাংশ; গত বছর ছিল ৬০.৭৭ শতাংশ। রাঙামাটিতে ৪১.১৭ শতাংশ, গত বছর ৫৬.৫৫ শতাংশ। বান্দরবানে ৪৭.৮৮ শতাংশ, গত বছর ছিল ৬৩.১২ শতাংশ। খাগড়াছড়ির তিনটি বিদ্যালয়ে পাসের হার শূন্য।
 
এই শূন্যের দিকে তাকালে কেবল পরীক্ষার খাতা দেখা যায় না; দেখা যায় কতগুলো শিশুর থমকে যাওয়া স্বপ্ন, কত মায়ের নীরব দীর্ঘশ্বাস, কত বাবার অসহায় মুখ, কত দূর পাহাড়ি পথ পেরিয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীর ক্লান্ত পা। একটি ফলাফল কখনো কেবল একটি সংখ্যা নয়। সংখ্যার পেছনে থাকে মানুষের জীবন।
 
গত ২৫ আগস্ট ২০২৩ দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত হয়েছিল—“খাগড়াছড়িতে শিক্ষক সংকটে মাধ্যমিকের পাঠদান ব্যাহত”। তিন বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু পাহাড়ের বিদ্যালয়ের সেই দীর্ঘশ্বাস কি থেমেছে? সম্প্রতি রিঝেংচির ফেসবুক লাইভে সাজেকের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের যে চিত্র উঠে এসেছে, সেটিও যেন সেই পুরোনো প্রশ্নেরই নতুন প্রতিধ্বনি। বিদ্যালয় আছে, শিশুরা আছে, বই আছে, কিন্তু পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই। বর্গা শিক্ষক দিয়ে চলছে পাঠদান। কী অদ্ভুত আমাদের রাষ্ট্রচিত্র!
 
যে শিশুটিকে আমরা ভবিষ্যতের বাংলাদেশ বলি, তার বিদ্যালয়েই যদি ভবিষ্যৎ নির্মাণের কারিগর না থাকে, তবে সেই ভবিষ্যৎ আমরা কোথায় তৈরি করছি? পাহাড়ের শিশুটি জন্মের পর প্রথম যে শব্দটি শোনে, তা বাংলা নয়। তার মায়ের মুখে যে ভাষা, তার দাদির গল্পে যে ভাষা, তার পাহাড়-জঙ্গল-নদীর সঙ্গে যে ভাষার সম্পর্ক—বিদ্যালয়ের দরজায় পা রাখার পর সেই ভাষা অনেক সময় হঠাৎ অচেনা হয়ে যায়।
 
পাহাড়ে বহু ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাস। জুম্ম জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা বাংলা নয়। অথচ শিশুটিকে শিক্ষার প্রথম সিঁড়িতেই এমন একটি ভাষার মুখোমুখি হতে হয়, যা তার ঘরের ভাষা নয়। শিশুর কাছে বিদ্যালয় হওয়ার কথা ছিল তার পৃথিবীকে বড় করে দেখার জানালা। অথচ ভাষার অমিল কখনো কখনো সেই জানালার কাচেই কুয়াশা জমিয়ে দেয়।
 
মাতৃভাষা কেবল কথার বাহন নয়; মাতৃভাষা মানুষের প্রথম চিন্তা, প্রথম স্বপ্ন, প্রথম কান্না, প্রথম আনন্দ। একটি শিশুর চিন্তার ভাষাকে পাশ কাটিয়ে তার মেধার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো কি সম্ভব? তাই পাহাড়ের শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের কথা বলতে গেলে মাতৃভাষার প্রশ্নকে পাশ কাটানোর কোনো সুযোগ নেই।
শিক্ষক কেবল একটি চাকরির পদ নয়। একজন শিক্ষক একটি প্রজন্মের নির্মাতা। কিন্তু সেই শিক্ষক নিয়োগের পথ যদি অনিয়ম, দুর্নীতি কিংবা অর্থের কাছে বন্দী হয়ে যায়, তবে তার অভিঘাত শুধু একটি নিয়োগে সীমাবদ্ধ থাকে না। তার ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়ে একটি শিশুর ভবিষ্যতের ওপর, বাংলাদেশের ওপর।
 
পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা অভিযোগ ও প্রশ্ন রয়েছে। লাখ লাখ টাকার ঘুষের অভিযোগ যদি সমাজে কিংবদন্তির মতো ছড়িয়ে পড়ে, তবে সেটি শুধু দুর্নীতির গল্প নয়, এটি একটি সমাজের নৈতিক বিপর্যয়ের গল্প। যে অর্থ দিয়ে একজন শিক্ষক কেনা হয়, তার মূল্য পরিশোধ করে একটি প্রজন্ম। আর যে শিক্ষক যোগ্যতার বদলে অর্থের বিনিময়ে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করেন, তার হাতে বই থাকলেও শিক্ষার আলো কতটা থাকে, সে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
 
পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের কার্যকারিতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্ন রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধান, শ্রদ্ধেয় জ্যোতিরেন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা) আঞ্চলিক পরিষদকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অথর্ব ও অকার্যকর করে রাখার অভিযোগ করেছেন।
 
রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে কেউ এটিকে গ্রহণ করতে পারেন, কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন। কিন্তু পাহাড়ের মানুষের একটি প্রশ্ন থেকেই যায়, যে প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য তৈরি, সেগুলো যদি মানুষের কাছে অর্থবহ না হয়, তবে মানুষ যাবে কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আমাদের যেতে হয় সাজেকে। সাজেক—পাহাড়ের বুকের ওপর বিস্তৃত এক জনপদ। সেখানে প্রায় অর্ধলক্ষ মানুষের বসবাস। অথচ সেই জনপদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষার জন্য একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রশ্নই আজ বিরোধ, মামলা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছে।
 
কলেজের জায়গা নিয়ে বিরোধ থাকতে পারে। আইনি প্রশ্ন থাকতে পারে। বন বিভাগের দায়িত্ব ও আইনও আছে। এসব প্রশ্নের সমাধান আইন ও আলোচনার পথেই হওয়া উচিত। কিন্তু সেই সব প্রশ্নের মাঝখানে যে প্রশ্নটি কি আমরা শুনছি?
 
আজ সকালে স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের কর্মকর্তারা সেখানে গেলে বাবু চাকমা যে প্রশ্নগুলো তুলেছেন, সেগুলো শুধু তাঁর একার প্রশ্ন নয়। এগুলো সাজেকের বহু মানুষের বুকের ভেতর জমে থাকা প্রশ্ন। সাজেকের মানুষ কলেজ চাইলে তাদের অপরাধ কোথায়? তাদের সন্তানও তো এই দেশের সন্তান। তাদেরও তো স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে। ঘরের ভাত খেইয়ে তাদেরও তো একজন ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন থাকতে পারে, একজন শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন থাকতে পারে, একজন প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন থাকতে পারে, কিংবা বই হাতে নিয়ে নিজের সমাজের গল্প পৃথিবীকে বলার স্বপ্ন থাকতে পারে।
 
তবে কলেজের দরজা যদি তাদের নাগালের বাইরে থাকে, তাহলে স্বপ্নের দরজাও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
সাজেকের বর্তমানকে বুঝতে হলে অতীতের দিকে তাকাতেই হবে। কাপ্তাই বাঁধের জল যখন মানুষের ঘর, জমি ও স্মৃতির ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছিল, তখন বহু জুম্ম পরিবার তাদের পূর্বপুরুষের ভিটেমাটি হারিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ভূমি হারানো ও বসতি সংকটের এবং পার্বত্য চট্টগ্রামর বাঙ্গালিদের পাহাড়ী বা জুম্মদের জায়গায় পূর্ণবাসন করার বাস্তবতায় বহু মানুষ পাহাড়ের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেে সাজেকে ছড়িয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছে।
 
তাই বাবু ধন চাকমার প্রশ্নটি নিছক আবেগের প্রশ্ন নয়, “আমরা যদি আমাদের পূর্বপুরুষের জায়গা ফিরে পায় বা কাপ্তায় বাঁধ খুলে দাও আমি আমার জায়গাতে চলে যাব।"
 
এই প্রশ্নের উত্তর কেবল প্রশাসনিক ফাইলে লেখা যাবে না। এর উত্তর খুঁজতে হবে ইতিহাসের পাতায়, মানুষের স্মৃতিতে এবং রাষ্ট্রের নীতিতে। মানুষ তার হারানো ভূমির কথা ভুলে যায় না। নদী যেমন তার পুরোনো পথ মনে রাখে, মানুষও তেমনি মনে রাখে তার পূর্বপুরুষের ভিটা।
 
শিক্ষা দয়া নয়। শিক্ষা অনুগ্রহ নয়। শিক্ষা কোনো বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রের উপহারও নয়। শিক্ষা হলো মানুষের অধিকার। সাজেকের শিশুর অধিকার যেমন, ঢাকার শিশুর অধিকারও তেমন। সমতলের শিশুর হাতে বই থাকলে পাহাড়ের শিশুর হাতেও বই থাকার কথা, মাতৃভাষায় বই। শহরের সন্তান কলেজে যাওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারলে পাহাড়ের সন্তানও সেই স্বপ্ন দেখবে—এটাই স্বাভাবিক।
 
অস্বাভাবিক হলো, একটি শিশুকে তার ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে শিক্ষার সুযোগ থেকে পিছিয়ে রাখা। এই জায়গাতেই এসে প্রশ্নটি আবার পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির দিকে ফিরে যায়। পাহাড়ের সংকট কেবল বিদ্যালয় বানিয়ে সমাধান হবে না। কেবল শিক্ষক নিয়োগ করেও হবে না। কেবল কলেজ প্রতিষ্ঠা করেও হবে না। ভূমি, প্রশাসন, স্থানীয় সরকার, শিক্ষা, নিরাপত্তা, উন্নয়ন—সবকিছু পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত।
যে সমাজে ভূমির প্রশ্ন অমীমাংসিত, সেখানে মানুষের মনে স্থিরতা আসে না। যে সমাজে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান কার্যকর নয়, সেখানে মানুষের আস্থা জন্মায় না। যে সমাজে মাতৃভাষা শিক্ষার যথাযথ মর্যাদা পায় না, সেখানে শিক্ষার আলোও সম্পূর্ণভাবে পৌঁছায় না।
 
তাই পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ ও কার্যকর বাস্তবায়ন শুধু রাজনৈতিক দাবি নয়; এটি পাহাড়ে একটি স্থিতিশীল, আস্থাপূর্ণ ও মানবিক পরিবেশ নির্মাণের অন্যতম পূর্বশর্ত।
 
আজকের এসএসসি ফলাফল আমাদের সামনে একটি আয়না ধরেছে। সেই আয়নায় আমরা দেখেছি পাহাড়ের শিক্ষাব্যবস্থার ভঙ্গুর মুখ। সাজেক কলেজের অনিশ্চয়তা আমাদের সামনে আরেকটি আয়না ধরেছে। সেখানে আমরা দেখেছি মানুষের অধিকার কত সহজে প্রশাসনিক জটিলতা, বিরোধ ও অনিশ্চয়তার ভেতর হারিয়ে যেতে পারে। কিন্তু পাহাড়ের শিশুরা তো কোনো সংখ্যা নয়। ৩৪.৯৯ শতাংশ, ৪১.১৭ শতাংশ, ৪৭.৮৮ শতাংশ—এই সংখ্যাগুলোর পেছনে আছে হাজারো মুখ। আছে তাদের স্বপ্ন। আছে মায়ের আশা। আছে বাবার কষ্ট। আছে একটি পাহাড়ের ভবিষ্যৎ। তাই আজ আমাদের প্রশ্ন হওয়া উচিত, কেন তারা ফেল করল—শুধু এই প্রশ্ন নয়; কেন তাদের এত কম সুযোগ দেওয়া হলো, সেই প্রশ্নও করতে হবে।
 
কেন সাজেকে কলেজ নেই—শুধু সেই প্রশ্ন নয়; কেন একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্যও পাহাড়ের মানুষকে এত দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়, সেই প্রশ্নও করতে হবে।
 
পাহাড়ের শিশুর হাতে বই তুলে দেওয়া কোনো দয়া নয়। সাজেকের সন্তানকে কলেজে পড়ার সুযোগ দেওয়া কোনো অনুগ্রহ নয়। মাতৃভাষায় শিক্ষা নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা নয়। এসবই মানুষের অধিকার। আর যে রাষ্ট্র তার প্রত্যন্ততম শিশুটির চোখের স্বপ্নটুকুও রক্ষা করতে পারে, সেই রাষ্ট্রই সত্যিকার অর্থে সভ্য।
 
আজ পাহাড় আমাদের কাছে সেই সভ্যতারই পরীক্ষা নিচ্ছে। এসএসসির ফলাফল সেই পরীক্ষার খাতা খুলে দিয়েছে। তাই আজ আর একটি প্রশ্ন—
আমরা কি পাহাড়ের সন্তানদের জন্য সমান ভবিষ্যৎ লিখতে প্রস্তুত?

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তুফান চাঙমা : তুলির ভেতর পাহাড়ের আত্মকথা - ইনজেক চাাঙমা

পাহাড়কে দূর থেকে দেখলে তার সৌন্দর্যই চোখে পড়ে, সবুজের স্তরে স্তরে নেমে আসা ঢেউ, মেঘের ছায়ায় আচ্ছন্ন উপত্যকা, ঝরনার স্বচ্ছ জলধ্বনি, জুমের ঢাল...