শুক্রবার, ১৪ আগস্ট, ২০২৬

উদয় শংকর চাকমা: জীবন, শৈশব ও সাহিত্যযাত্রা

রাঙামাটির লংগদু উপজেলার প্রত্যন্ত শিলাছড়া গ্রাম। পাহাড়, অরণ্য আর মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপনের ভেতর ১৯৯৬ সালের ১ আগস্ট জন্ম নেন কবি উদয় শংকর চাকমা নিউটন। পিতা সুশীল জীবন চাকমা, মাতা শশীরাণী চাকমা। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি মেজো। কিন্তু তাঁর শৈশবের আকাশ খুব বেশিদিন নির্মেঘ থাকেনি। ছোটবেলাতেই হারিয়েছেন পিতাকে। আর যখন তিনি উচ্চমাধ্যমিকের প্রথম বর্ষের ছাত্র, তখন মৃত্যুর কাছে হারাতে হয় মাকেও। জীবনের একেবারে শুরুর প্রহরেই পরপর দুই অভিভাবককে হারানোর বেদনা তাঁর মনোজগতে যে গভীর রেখা এঁকে দিয়েছে, তা হয়তো তাঁর কবিতার নীরব পঙ্‌ক্তিগুলোর মধ্যেই সবচেয়ে বেশি পাঠ করা যায়।

পিতৃহারা হওয়ার পর পড়াশোনার পথ যেন থেমে না যায়, সেই দায়িত্ব আপন করে নিয়েছিলেন তাঁর কাকা বিমল কান্তি চাকমা। কাকার স্নেহ, আশ্রয় ও প্রেরণায় তিনি এগিয়ে চলেন শিক্ষার পথে। আর তাঁর শৈশবের আরেকটি বড় বিদ্যালয় ছিল ঘরের উঠোন—যেখানে পাঠ্যবইয়ের অক্ষরের পাশাপাশি দাদু-দিদার কণ্ঠে তিনি শুনেছেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে আসা গল্পের অমলিন ধারা।

বেভে কাত্তোল্যা ও কাত্তোলি-র মুখে শোনা মহাভারত, রামায়ণ, নানা চাঙমা পচ্জন বা রূপকথা, কাপ্ত বাধ–এর গল্প—এসব কেবল শৈশবের বিনোদন ছিল না; এগুলোই ছিল তাঁর কল্পনার প্রথম জানালা। লোকস্মৃতির সেই গল্পগুলো তাঁর মনের ভেতর বুনে দিয়েছিল ভাষা, সংস্কৃতি, ইতিহাস ও মানুষের জীবনকে দেখার এক নিজস্ব দৃষ্টি। পরবর্তীকালে যখন তিনি কলম হাতে নেন, তখন সেই শৈশবের গল্পেরা অদৃশ্যভাবে তাঁর শব্দের পাশে এসে দাঁড়ায়।

তাঁর শৈশব-কৈশোরের সময়টিও ছিল পাহাড়ের ইতিহাসের এক উত্তাল সময়। স্বাধীনতার পরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, ১৯৮৬ সালের সংঘাতের স্মৃতি, মানুষের উদ্বাস্তু হয়ে পড়া, অনিশ্চয়তা ও দুঃসহ জীবনযাপনের কথা তিনি শুনেছেন এবং সামাজিক বাস্তবতার ভেতর দিয়ে অনুভব করেছেন। শান্তিবাহিনীর সংগ্রাম ও সাধারণ মানুষের পাশে তাদের অবস্থানের নানা স্মৃতিও তাঁর বেড়ে ওঠার পরিবেশের অংশ। ফলে পাহাড়ের মানুষের জীবন তাঁর কাছে নিছক দূরের কোনো ইতিহাস নয়; তা তাঁর পারিবারিক স্মৃতি, সামাজিক অভিজ্ঞতা ও অনুভবের সঙ্গে মিশে থাকা এক জীবন্ত অধ্যায়।

এই জীবন-বাস্তবতার মধ্যেই শিক্ষার পথে তাঁর অগ্রযাত্রা। শিলাছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে সাধারণ বৃত্তি লাভ করেন। এরপর রাঙামাটির মোনঘর-এ ভর্তি হয়ে শিক্ষাজীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেন। ২০১১ সালে সেখান থেকে এসএসসি পাস করেন। পরে রাঙামাটি সরকারি কলেজে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একজন কর্মচারী হিসেবে কর্মরত।

তবে চাকরির পরিচয়ের আড়ালে তাঁর আরেকটি পরিচয় ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—তিনি একজন কবি ও সাহিত্যকর্মী। স্কুলজীবন থেকেই তাঁর হাতে উঠেছিল কবিতার খাতা। চারপাশের প্রকৃতি, মানুষের মুখ, ব্যক্তিগত অনুভব, স্মৃতি ও সমাজের নানা টানাপোড়েন তাঁর ভেতরে শব্দের জন্ম দিয়েছে। কবিতার পাশাপাশি তিনি লিখেছেন ছোটগল্প ও প্রবন্ধ। তাঁর লেখালেখি যেন নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন; আবার একই সঙ্গে নিজের সমাজ, সংস্কৃতি ও শিকড়ের সঙ্গেও এক গভীর সংলাপ।

এই সাহিত্যিক পথচলায় ১ জুন ২০১৭ একটি উল্লেখযোগ্য দিন। সে সময় তিনি ‘তারুম নাঙ’ নামে একটি লিটলম্যাগ প্রকাশ ও সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত হন। তরুণ বয়সে একটি লিটলম্যাগ প্রকাশ ও সম্পাদনা নিছক একটি সাহিত্যপত্র প্রকাশের ঘটনা ছিল না; বরং এটি ছিল তাঁর সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশকে সংগঠিত করার এক গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস। লিটলম্যাগের স্বল্প পরিসরের ভেতর দিয়ে নতুন লেখার জন্য জায়গা তৈরি করা, নিজস্ব ভাষা-সংস্কৃতির সাহিত্যচর্চাকে সামনে আনা এবং সমকালীন তরুণ লেখকদের সৃষ্টিকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার যে আকাঙ্ক্ষা এতে প্রতিফলিত হয়েছিল, তা তাঁর পরবর্তী সাহিত্যিক পথচলারও পূর্বাভাস বহন করে। কবিতা লেখার পাশাপাশি সম্পাদনা ও প্রকাশনার এই অভিজ্ঞতা তাঁকে সাহিত্যকে কেবল ব্যক্তিগত সৃষ্টির জায়গা হিসেবে নয়, একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক পরিসর হিসেবেও দেখতে শিখিয়েছে।

২০১৭ সালের সেই লিটলম্যাগ-পর্ব থেকে তাঁর সাহিত্যিক যাত্রা ধীরে ধীরে আরও পরিণত হয়েছে। ব্যক্তিগত অনুভূতির গণ্ডি পেরিয়ে তাঁর মনোযোগ বিস্তৃত হয়েছে সমাজ, সংস্কৃতি, ভাষা ও মানুষের জীবনবাস্তবতার দিকে। একজন কবির হাতে যেমন শব্দ জন্ম নেয়, তেমনি একজন সম্পাদক হিসেবে তিনি শব্দকে অন্যের কাছেও পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এই দুই ভূমিকার সমন্বয় তাঁর সাহিত্যিক পরিচয়কে করেছে আরও বহুমাত্রিক।

তাঁর সাহিত্যিক পথচলায় ২০২৫ সালও বিশেষ তাৎপর্যের। সে বছর চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালায় রচিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আন্নোয় খিয়্যে ডাইরীত্তুন’ প্রকাশের পরিকল্পনা করেন। বইটি প্রকাশের জন্য পূর্ণ প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন। কিন্তু অর্থনৈতিক সংকট এসে তাঁর সেই স্বপ্নের দরজায় থেমে দাঁড়ায়। শেষ পর্যন্ত বইটি প্রকাশিত হয়নি। তবু কোনো বই প্রকাশিত না হলেই তার স্বপ্নের মৃত্যু হয় না। কখনো কখনো একটি অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিও একজন কবির অন্তর্গত যাত্রার সবচেয়ে উজ্জ্বল সাক্ষী হয়ে থাকে। *‘আন্নোয় খিয়্যে ডাইরীত্তুন’*ও তেমনই এক স্বপ্নের নাম—যেখানে একজন কবির পাশাপাশি কথা বলে তাঁর মাতৃভাষা ও নিজস্ব বর্ণমালার প্রতি গভীর মমতা।

২০২৪ সালে তাঁর ব্যক্তিজীবনে যুক্ত হয় নতুন এক অধ্যায়। মীরা চাকমা-র সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। জীবনের নানা হারানো, পাওয়া, সংগ্রাম ও স্বপ্নকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর পথচলা অব্যাহত থাকে।

উদয় শংকর চাকমা নিউটনের জীবনকে যদি একটি দীর্ঘ কবিতা বলা হয়, তবে তার প্রথম স্তবকে আছে পিতৃ-মাতৃহারা এক শিশুর নিঃসঙ্গতা; পরের স্তবকে আছে কাকার আশ্রয়, দাদু-দিদার মুখে শোনা লোককথা, পাহাড়ের অস্থির সময় ও মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আর তার পরের পঙ্‌ক্তিগুলোয় আছে শিক্ষা, ‘তারুম নাঙ’ সম্পাদনার অভিজ্ঞতা, চাকরি, প্রেম, সাহিত্য এবং নিজের ভাষা-বর্ণমালায় সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা।

তাঁর কবিতার পথ তাই কেবল শব্দের পথ নয়—এ পথ স্মৃতির, শিকড়ের এবং আত্মপরিচয়ের। পাহাড়ের নীরব অরণ্য, হারিয়ে যাওয়া মানুষের দীর্ঘশ্বাস, লোককথার পুরোনো সুর, লিটলম্যাগের পাতায় তরুণ লেখার উচ্ছ্বাস এবং চাঙমা ভাষার নিজস্ব মাধুর্য—সব মিলিয়ে তাঁর সাহিত্যিক সত্তা ধীরে ধীরে নিজের একটি ভূগোল নির্মাণ করছে।

‘আন্নোয় খিয়্যে ডাইরীত্তুন’ আজও প্রকাশের অপেক্ষায়; কিন্তু তারও আগে কবি উদয় শংকর চাকমা নিউটনের জীবনই যেন এক অপ্রকাশিত কাব্য—যার প্রতিটি অধ্যায়ে আছে হারানোর বেদনা, বেঁচে থাকার সাহস, সম্পাদনার হাত ধরে সাহিত্যকে এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় এবং নিজের শিকড়কে শব্দে ধরে রাখার এক অনিঃশেষ স্বপ্ন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

উদয় শংকর চাকমা: জীবন, শৈশব ও সাহিত্যযাত্রা

রাঙামাটির লংগদু উপজেলার প্রত্যন্ত শিলাছড়া গ্রাম। পাহাড়, অরণ্য আর মানুষের সহজ-সরল জীবনযাপনের ভেতর ১৯৯৬ সালের ১ আগস্ট জন্ম নেন কবি উদয় শংকর চ...