একটি সাহিত্যভূমির পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস নির্মাণ করতে গেলে শুধু কয়েকজন লেখক, কয়েকটি বই কিংবা পরিচিত কিছু প্রকাশনার দিকে তাকালে চলে না। তার সঙ্গে দেখতে হয় ভাষার বিবর্তন, বর্ণমালার ব্যবহার, পত্রপত্রিকার জন্ম, ছোট কাগজের উত্থান, অনুবাদচর্চা, অভিধান নির্মাণ, শিশু-কিশোর সাহিত্য এবং সেইসব মানুষের নিরলস শ্রম- যাঁরা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রত্যাশা ছাড়াই একটি ভাষার অক্ষরকে বাঁচিয়ে রেখেছেন।
চাঙমা বর্ণমালার সাহিত্যচর্চা সেই অর্থে কোনো বিচ্ছিন্ন বা প্রান্তিক উপাখ্যান নয়। এটি চাঙমা জাতিসত্তার ভাষিক ও সাংস্কৃতিক অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত একটি ধারাবাহিক প্রয়াস। এই বর্ণমালায় লেখা প্রতিটি বই, প্রতিটি পত্রিকা, প্রতিটি কবিতা কিংবা ছড়া আসলে একটি অক্ষরকে জীবিত রাখার সংগ্রামের দলিল।
চাঙমা ভাষার সাহিত্যচর্চার ইতিহাস কেবল আধুনিক মুদ্রিত বইয়ের ইতিহাস নয়। মৌখিক ঐতিহ্য, লোককথা, গান, ছড়া, ধর্মীয় পাঠ ও সামাজিক স্মৃতির দীর্ঘ ধারার ওপর দাঁড়িয়ে আধুনিক লিখিত সাহিত্যচর্চা বিকশিত হয়েছে। চাঙমা বর্ণমালায় মুদ্রিত গ্রন্থ প্রকাশের মধ্য দিয়ে সেই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে দৃশ্যমান সাহিত্যিক রূপ পেয়েছে।
ধর্মীয় সাহিত্যেও এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা রয়েছে। ভিক্ষু ত্রি রতন জ্যোতির “ধাম্মাপাদা ” ও “উদান” চাঙমা ভাষা ও বর্ণমালায় ধর্মীয় সাহিত্যচর্চার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
উপন্যাসের ক্ষেত্রেও চাঙমা বর্ণমালায় প্রকাশিত বেশ কিছু কাজের সন্ধান পাওয়া যায়। দেবপ্রিয় চাঙমার ফেবো (২০০৪)—যদিও এর উপন্যাস হিসেবে শ্রেণিবিন্যাস নিয়ে বিতর্ক রয়েছে- এই ধারার আলোচনায় উল্লেখযোগ্য। এরপর সুরোজ কান্তি চাঙমার মেগুল দেবা আহ্’ঝি (২০১৯), আর্য্যমিত্র চাঙমার মনবি (২০১৯), শ্যামলকান্তি তালুকদারের তুই এভে ভিলে প্রভৃতি রচনা চাঙমা ভাষার লিখিত কথাসাহিত্যের পরিসরকে বিস্তৃত করেছে। পরবর্তী সময়ে মনবি (২০২০), তিন ফাগালা (২০২৩), অঃমা কবি (২০২৩) এবং মালাচান (২০২৪)-এর মতো কিশোর উপন্যাসও এই ধারাকে সমৃদ্ধ করেছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়- সাহিত্যচর্চা শুধু প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য সীমাবদ্ধ থাকেনি; শিশু-কিশোরদের জন্যও চাঙমা ভাষায় পাঠ্য ও সৃজনশীল সাহিত্য নির্মাণের চেষ্টা হয়েছে। ভাষার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে এই ধারার গুরুত্ব অপরিসীম।
চাঙমা বর্ণমালায় কবিতা ও ছড়ার চর্চা সম্ভবত সবচেয়ে প্রাণবন্ত ধারাগুলোর একটি। আলোময় চাঙমার ফুল বারেঙ (২০১৮), সোহেল তালুকদারের ধেবা কুল্যা নাগরি (২০১৯), বিনয় বিকাশ তালুকদারের আহ্’ভিল্যাচ (২০১৮), প্রিয়দর্শী চাঙমার আহ্’লি গাদিয়্যা মালি ফুল, মৃত্তিকা চাঙমার মেঘ সেরে মোন’চুক (ঢাকা বইমেলা, ২০১১), ম্যাকলিন চাঙমার নুঅ গরি ফাগোন এযের- এসব প্রকাশনা চাঙমা কবিতার বৈচিত্র্যময় প্রবাহের সাক্ষ্য বহন করে।
তরুণ কুমার চাঙমার ‘এচ্যা বিঝুত মা গঙ্গিত তরে দ্বিবে বিঝু ফুল’ও এই সাহিত্যপ্রবাহের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ।
এ ধারায় ইনজেব চাঙমার ধনপুদি (১ আগস্ট ২০২২), উত্তিপুত্তি (২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩), পুগবেল—চাঙমা কবিদ্যা সংকলন (২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪) এবং আবেদি—চাঙমা কবিদ্যা সংকলন (২০২৫) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। একই সঙ্গে জুম চাব পত্রিকা সম্পাদনার মধ্য দিয়েও চাঙমা ভাষার সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
ছড়ার জগতেও রয়েছে আলাদা সৃজনধারা। শ্যামল তালুকদারের জুনিপুক (২০১৭), দেবাশীষ রায় ও দেবপ্রিয় চাঙমার ওলি ওলি, এবং মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন ও জাবারাং-এর মিল কধা নকবাচ—এসব প্রকাশনা শিশু-কিশোর সাহিত্য ও ভাষাচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
চাঙমা বর্ণমালার সাহিত্যচর্চার ইতিহাস লিখতে গেলে সাময়িকপত্র ও লিটলম্যাগের কথা বাদ দেওয়া সবচেয়ে বড় অসম্পূর্ণতাগুলোর একটি হবে। কারণ, একটি ভাষার সাহিত্যিক বিকাশ শুধু গ্রন্থে নয়, ছোট কাগজের পাতাতেও সবচেয়ে জীবন্তভাবে ধরা পড়ে।
মা ভাচ (মাতৃভাষা), ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, খাগড়াছড়ি থেকে প্রকাশিত একটি উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা।
নোয়ারাম চাঙমা সাহিত্য সংসদ প্রকাশিত চাদি—যার ১ম থেকে ১৪তম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে- চাঙমা সাহিত্যচর্চার ধারাবাহিকতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এর প্রকাশনা শুরু হয় ১০ নভেম্বর ২০২২। একইভাবে উদয় শংকর চাঙমা সম্পাদিত তারুম (১ জুলাই ২০১৭; ২য় সংখ্যা সহ) চাঙমা সাময়িকপত্রের ইতিহাসে স্মরণযোগ্য।
এসব পত্রিকা কেবল সাহিত্য প্রকাশের মাধ্যম ছিল না; এগুলো ছিল ভাষা, সংস্কৃতি, চিন্তা, সৃজনশীলতা ও আত্মপরিচয়ের ছোট ছোট আশ্রয়স্থল। একটি ভাষার সাহিত্যিক পরিসর কতটা জীবন্ত- তার অন্যতম নির্ভরযোগ্য মাপকাঠি হলো সেই ভাষায় নিয়মিত ছোট কাগজ প্রকাশিত হচ্ছে কি না।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি চাঙমা বর্ণমালায় সংবাদপত্র প্রকাশের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। সুভাশীষ চাঙমা সম্পাদিত করোদি ২০১৫ সালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী সময়ে হিলর পচ্জন-এর প্রথম থেকে সপ্তম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে; সম্পাদনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইনজেব চাঙমা ও শান্তি জীবন চাঙমা।
একটি ভাষার সংবাদপত্র কেবল খবর পরিবেশন করে না; এটি ভাষাটিকে দৈনন্দিন ব্যবহারের উপযোগী করে তোলে। সংবাদ, সম্পাদকীয়, মতামত, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঘটনাবলি যখন নিজস্ব বর্ণমালায় লেখা হয়, তখন ভাষাটি কেবল ঘরের কথ্য ভাষা হিসেবে থাকে না—তা হয়ে ওঠে জনপরিসরের ভাষা।
চাঙমা বর্ণমালায় শিশুদের জন্য প্রকাশিত বইয়ের ধারাটিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শব্দ কোই, তারুম আ রানজুনি, চিজি অংক তারা, অঝাপাদর ছড়া, এয’ অংক শিঘি, ছড়া বই, এক সমারে ভালক্কানি, চাঙমা শব্দ বই, চিজির তালমিলতি কধা, হেমান আ পেইক, মনর সবন, আমা ফল পাগোর আ গুলগুলি, চিজির অহ্’রক বই, ইক্কুল’ অক্ত—এসব প্রকাশনা শিশুদের ভাষা শেখা, পড়ার অভ্যাস তৈরি এবং মাতৃভাষার সঙ্গে প্রাথমিক পরিচয় গভীর করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এসব কাজের সঙ্গে শান্তি চাঙমা, শ্রেয়সী চাঙমা, কে.ভি. দেবাশীষ, প্রসন্ন কুমার চাঙমা, প্রিয়সী চাঙমা, মণি চাঙমা, সম্ভুমিত্র চাঙমা, পরেশ চাঙমা, এলিয়েন্স চাঙমা, জ্ঞানদর্শী চাঙমা, এজেন্সী চাঙমা, পূর্ণাঙ্গ চাঙমা, আর্য্যমিত্র চাঙমা, কুশলী চাঙমা, লক্ষীপতি চাঙমা, ভবেশ মিত্র চাঙমা, লুসী চাঙমা ও নীল চন্দ্র চাঙমাসহ সংশ্লিষ্ট লেখক-সম্পাদকদের অবদান স্মরণযোগ্য।
ভাষার বিকাশে অনুবাদের গুরুত্ব অপরিসীম। অন্য ভাষার সাহিত্য, গল্প ও জ্ঞানকে নিজের ভাষায় রূপান্তরিত করার মধ্য দিয়ে একটি ভাষা নতুন শব্দ, নতুন ভাবনা ও নতুন প্রকাশভঙ্গি অর্জন করে।
২০১৭ সালে প্রকাশিত চিজিদাঘি লায় অনুবাদধারার একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন। এতে রাজা ও কংজরি, মিলে ফুতবলার আনাই আ আনুচিং মারমা, বাক আ সিংহ, মেলাত আহ্’রা-আহ্’রি, শিয়াল্যা আ ত বোবুয়া, আনাচ মাধাত এ্যাইল মুকুট, রাঙা বল, আহ্’ওচ, মাচ তোগেয়্যাসহ বিভিন্ন রচনা চাঙমা ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। এসব অনুবাদে শুভ্র জ্যোতি চাঙমা, আনন্দ মোহন চাঙমা ও ইনজেব চাঙমার ভূমিকা রয়েছে বলে সংগৃহীত তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া আর্য্যমিত্র চাঙমার অনুবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী চাঙমা ভাষায় নিয়ে আসার প্রয়াসও অনুবাদসাহিত্যের পরিসরকে বিস্তৃত করেছে।
একটি ভাষার সাহিত্য যত গুরুত্বপূর্ণ, তার অভিধানও ততটাই গুরুত্বপূর্ণ। অভিধান ছাড়া ভাষার শব্দভাণ্ডার, অর্থ, উচ্চারণ ও ব্যবহারিক বৈচিত্র্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সংরক্ষণ করা কঠিন।
চাঙমা ভাষার অভিধান ও শব্দভাণ্ডার নির্মাণের ধারায় চাঙমা-বাংলা কধাতারা (জুমিয়া ভাষা প্রচার দপ্তর, ১৯৭৩), সি. আর. চাকমার চাঙমা কধা ভান্ডাল (১৯৮৭), পি. বি. কারবারির চাকমা ডিক্সসিনারি (১৯৯৩), চাঙজ্জা (২০০৬), TSUBP-এর দভাকাধি (২০০৭), চাকমা শব্দভাণ্ডার (২০১১) এবং ভাচ আলাম (২০১৫) উল্লেখযোগ্য।
অভিধান নির্মাণের এই প্রচেষ্টাগুলো প্রমাণ করে যে চাঙমা ভাষাকে শুধু আবেগের জায়গা থেকে নয়, গবেষণা, শব্দসংগ্রহ, ব্যাকরণ, অনুবাদ ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার মধ্য দিয়েও সংরক্ষণের চেষ্টা হয়েছে।
এতসব প্রকাশনা, লেখক, সম্পাদক, অনুবাদক ও প্রকাশকের উপস্থিতির পরও যখন ‘পাহাড়িদের সাহিত্যচর্চা’র মতো বিস্তৃত আলোচনায় চাঙমা বর্ণমালায় প্রকাশিত সাহিত্য ও সাময়িকপত্রের ধারাটি যথেষ্টভাবে উঠে আসে না, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- এই অক্ষরগুলোর ইতিহাস কোথায়? এই পত্রিকাগুলোর কথা কোথায়? সেইসব লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশকদের কথা কোথায়, যাঁরা নিভৃতে চাঙমা বর্ণমালার প্রদীপটি জ্বালিয়ে রেখেছেন?
কোনো গবেষণা বা প্রবন্ধে সব তথ্য একসঙ্গে স্থান পাবে—এমন দাবি করা হয়তো বাস্তবসম্মত নয়। তথ্যের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার পরিধি কিংবা সূত্রের প্রাপ্যতার প্রশ্ন থাকতে পারে। কিন্তু যখন আলোচনার বিষয় ‘পাহাড়িদের সাহিত্যচর্চা’, তখন চাঙমা বর্ণমালায় প্রকাশিত গ্রন্থ, লিটলম্যাগ, সংবাদপত্র ও সাময়িকপত্রের ধারাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা হলে আলোচনাটি অনিবার্যভাবেই অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বিশেষ করে লেখাটির উপসংহারেই যখন বলা হয়েছে যে পাহাড়িদের সাহিত্য গ্রন্থ ও সাময়িকপত্র প্রকাশের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত বিকশিত হচ্ছে, তখন প্রশ্নটি আরও তীব্র হয়ে ওঠে- চাঙমা বর্ণমালায় প্রকাশিত সাময়িকপত্র ও লিটলম্যাগের দীর্ঘ ধারাটি সেই বিকাশের ইতিহাসে যথাযথ স্থান পেল না কেন?
সাহিত্য-ইতিহাস কোনো ব্যক্তিগত পরিচয়ের খাতা নয়। এটি কারও ঘনিষ্ঠতার পুরস্কারও নয়। সাহিত্য-ইতিহাস হলো সময়ের কাছে দায়বদ্ধ এক স্মৃতির নথি। সেখানে পরিচিত-অপরিচিত, ঘনিষ্ঠ-দূরবর্তী- সবাইকে বিচার করতে হয় তাঁদের সৃষ্টিকর্ম, প্রকাশনা, গবেষণা ও অবদানের আলোকে।
এখানে যে তালিকা দেওয়া হলো, তা কোনোভাবেই চাঙমা বর্ণমালার সাহিত্যচর্চার পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থপঞ্জি নয়। এটি সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত একটি প্রাথমিক তালিকা। এর বাইরে আরও বহু গ্রন্থ, লিটলম্যাগ, পত্রিকা, কবিতা, ছড়া, অনুবাদ, অভিধান ও লেখকের কাজ থাকতে পারে। পুরোনো প্রকাশনা, ব্যক্তিগত সংগ্রহ, স্থানীয় গ্রন্থাগার, লেখক-সম্পাদকদের ব্যক্তিগত আর্কাইভ এবং হারিয়ে যাওয়া ছোট কাগজ অনুসন্ধান করলে তালিকাটি আরও সমৃদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তাই এই লেখার উদ্দেশ্য কাউকে ছোট করা নয়; বরং একটি অনুপস্থিত ইতিহাসকে দৃশ্যমান করার আহ্বান। ভুল-ত্রুটি থাকলে তা সংশোধনের সুযোগও উন্মুক্ত থাকা উচিত। কারণ সাহিত্য-ইতিহাস কোনো চূড়ান্ত তালিকা নয়- এটি ক্রমাগত অনুসন্ধান, সংযোজন ও সংশোধনের মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়।
চাঙমা বর্ণমালার সাহিত্যচর্চা আজকের কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। ধর্মীয় সাহিত্য থেকে উপন্যাস, কবিতা থেকে ছড়া, লিটলম্যাগ থেকে সংবাদপত্র, শিশু-কিশোর বই থেকে অনুবাদ এবং অভিধান থেকে শব্দভাণ্ডার- বিভিন্ন পথে এই অক্ষর তার নিজস্ব সাহিত্যভুবন নির্মাণ করে চলেছে।
এই সাহিত্যভুবনের ইতিহাস লিখতে গেলে কেবল বড় প্রকাশনা নয়, ছোট কাগজের পাতাকেও দেখতে হবে; শুধু প্রতিষ্ঠিত লেখক নয়, নীরবে লিখে যাওয়া মানুষটির নামও স্মরণ করতে হবে; শুধু বই নয়, একটি বর্ণমালাকে বাঁচিয়ে রাখার শ্রমকেও মূল্য দিতে হবে।
চাঙমা বর্ণমালার প্রতিটি অক্ষর তাই কেবল একটি ভাষার চিহ্ন নয়- এটি স্মৃতি, আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও অস্তিত্বের সাক্ষ্য। সেই অক্ষরে লেখা প্রতিটি বই সময়ের কাছে একটি ছোট্ট জবানবন্দি। হয়তো তার প্রচার কম, পাঠকসংখ্যা কম, প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতিও কম; কিন্তু তার ঐতিহাসিক মূল্য কোনো অংশে কম নয়।
ইতিহাসের পাতায় কোনো অক্ষরকে অনুপস্থিত রাখলেই সেই অক্ষর মুছে যায় না। বরং কখনো কখনো সেই অনুপস্থিতিই ইতিহাসের অসম্পূর্ণতার সবচেয়ে স্পষ্ট সাক্ষ্য হয়ে ওঠে।
চাঙমা বর্ণমালার সাহিত্যচর্চার ইতিহাস তাই আর নীরব প্রান্তে পড়ে থাকার বিষয় নয়। তাকে মূলধারার সাহিত্য-ইতিহাসের আলোচনায় ফিরিয়ে আনতে হবে- তথ্য দিয়ে, দলিল দিয়ে, গবেষণা দিয়ে এবং সর্বোপরি সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা দিয়ে।
কারণ, যে জাতি নিজের অক্ষরের ইতিহাস সংরক্ষণ করে, সে শুধু তার অতীতকে বাঁচায় না—ভবিষ্যৎ প্রজন্মের হাতে তুলে দেয় নিজের ভাষায় স্বপ্ন দেখার অধিকার।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন