পাহাড়ের প্রত্যন্ত জনপদে কিছু মানুষের জন্ম হয়- যাদের জীবনকে কেবল ব্যক্তিগত জীবনের আয়নায় দেখলে তার প্রকৃত অর্থ ধরা পড়ে না। তাঁদের জীবন জড়িয়ে থাকে মাটি, মানুষ, ভাষা, সংস্কৃতি ও আগামী প্রজন্মের স্বপ্নের সঙ্গে। সোহেল তালুকদার তেমনই এক নীরব স্বপ্নচারী- যিনি নিজের সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও জ্ঞান, সাহিত্য, সমাজসেবা ও মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসাকে জীবনের পথচলার অবলম্বন করে নিয়েছেন।
সনদপত্র অনুযায়ী সোহেল তালুকদারের জন্ম ১০ আগস্ট ১৯৯৪। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার মহালছড়ি উপজেলার ১ নম্বর সদর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ২৫৪ নম্বর কেরেঙ্গানাল মৌজার হেমন্ত পাড়ার এক সাধারণ পরিবারে তাঁর জন্ম। পিতা শুদ্ধধন তালুকদার, মাতা প্রীতি রেখা চাকমা। তিন ভাইয়ের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ। পাহাড়ের যে জনপদে জীবনযাত্রা আজও প্রকৃতির খেয়াল, দুর্গম পথ আর সীমিত সুযোগের সঙ্গে প্রতিদিন বোঝাপড়া করে, সেই হেমন্ত পাড়াই তাঁর শৈশবের প্রথম বিদ্যালয়- আর সেই মাটিই তাঁর স্বপ্নের প্রথম ঠিকানা।
সোহেলের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কালাচান পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে- যে সময় প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারি ব্যবস্থায় পরিচালিত হতো। সেখানেই প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ শেষ করেন তিনি। এরপর বটতলী মিউনিসিপ্যাল মডেল হাই স্কুলে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়ন করেন। অষ্টম শ্রেণিতে তাঁর শিক্ষাজীবনের আরেকটি অধ্যায় রচিত হয় পার্বত্য বৌদ্ধ মিশনে।
পরবর্তীতে জগনাতলী উচ্চ বিদ্যালয়ে নবম ও দশম শ্রেণির পাঠ সম্পন্ন করে ২০১০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। এরপর খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজ থেকে ২০১৪ সালে এইচএসসি এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একই কলেজ থেকে ২০২০ সালে বিএসএস/ডিগ্রি অর্জন করেন।
শিক্ষার এই পথ তাঁর কাছে কেবল পরীক্ষার সনদ অর্জনের পথ ছিল না; বরং নিজের অন্ধকার থেকে আলোয় উঠে আসার এক ব্যক্তিগত অভিযাত্রা। আর সেই আলো একদিন যেন তাঁর নিজের মধ্যে আটকে না থাকে- সেটিই পরবর্তীকালে তাঁর সমাজভাবনার অন্যতম প্রধান আকাঙ্ক্ষায় পরিণত হয়।
সোহেল তালুকদারের জীবনচর্চায় ধর্মীয় অনুভব ও সাহিত্যিক মনন পাশাপাশি এগিয়েছে। ২০১৩ সালে তিনি কল্পতরু পরিষদ, গোলাবাড়ি আর্য অরণ্য ভাবনা কুটির, বড়নাল, সাক্রোছড়া, কমলছড়ি, খাগড়াছড়ির সাহিত্য সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সেই সময় থেকেই তাঁর ভেতরে শব্দের প্রতি এক ধরনের টান জন্ম নেয়। শব্দ তাঁর কাছে শুধু বাক্য গঠনের উপকরণ নয়- শব্দ হয়ে ওঠে অনুভূতির আশ্রয়, স্মৃতির বাহন এবং জাতিসত্তার এক নীরব দলিল।
নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেয়ে সমাজের জন্য কিছু করার আকাঙ্ক্ষাই সোহেলকে বারবার মানুষের কাছে ফিরিয়ে নিয়েছে। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি Young Chakma Welfare Association (YCWA)-এর কোষাধ্যক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর সমাজভাবনা আরও সুসংগঠিত রূপ পেতে থাকে।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২১ সালে তাঁর উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় হেমন্ত পাড়া সমাজ সেবা সংঘ। তাঁকে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
দুর্গম একটি গ্রামের ছোট ছোট প্রয়োজনকে সামনে রেখে সংগঠনটি নানা কাজ করেছে- রাস্তা ও পথ পরিষ্কার, ফলজ চারা বিতরণ, নদীতে সাঁকো নির্মাণ, গজ্যা-পজ্যা বিঝু সময়ে বয়স্কদের গোসল করানোসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ড। এসব কাজের আড়ালে ছিল বড় কোনো প্রচারের আকাঙ্ক্ষা নয়; ছিল নিজের মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানোর সহজ মানবিক তাগিদ।
একটি গ্রামের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ, পারস্পরিক সহযোগিতা, বন্ধুত্ব ও শ্রদ্ধাবোধই এই উদ্যোগকে প্রাণ দিয়েছে। সোহেলের কাছে সমাজসেবা তাই কোনো পদবির বিষয় নয়; এটি মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করার এক মানবিক সাধনা।
তাঁর সমাজসেবামূলক জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় সম্ভবত হেমন্ত পাড়া গণপাঠাগার। ২০২২ সালের মার্চে স্থানীয় মানুষ এবং আশপাশের পাড়ার মানুষের সম্মিলিত সহযোগিতায় তাঁর উদ্যোগে পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
কেউ দিয়েছেন শ্রম, কেউ অর্থ, কেউ গাছ, কেউবা প্রয়োজনীয় উপকরণ- এভাবেই একটি ছোট্ট স্বপ্ন ধীরে ধীরে বাস্তবের রূপ পেয়েছে। পাঠাগারটির সভাপতি হিসেবে সোহেল আজও দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
এই পাঠাগারের পেছনে তাঁর যে স্বপ্ন, সেটি আরও গভীর। হেমন্ত পাড়া একটি দুর্গম গ্রাম। এখানকার অধিকাংশ পরিবার জেলে ও কৃষিনির্ভর। শিক্ষার সুযোগ সীমিত; উচ্চশিক্ষায় পৌঁছানোর পথও দীর্ঘ ও কঠিন। আশপাশের অনেক গ্রামে যেখানে সরকারি চাকরিজীবী বা প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী রয়েছেন, সেখানে হেমন্ত পাড়ার মানুষ এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। এই বাস্তবতাই সোহেলের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে- একটি গ্রামের ভাগ্য কি বদলাতে পারে না? তিনি বিশ্বাস করেন, পারে। আর সেই পরিবর্তনের প্রথম দরজা হতে পারে একটি বই।
তাই তাঁর কাছে হেমন্ত পাড়া গণপাঠাগার কোনো ইট-কাঠের ঘর নয়; এটি তাঁর স্বপ্নের বাতিঘর। তিনি চান, এই পাঠাগারের বইয়ের পাতায় চোখ রেখে গ্রামের কোনো শিশু একদিন বড় স্বপ্ন দেখতে শিখুক। যে গ্রাম থেকে এখনো উচ্চশিক্ষিত মানুষ বা সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা নেই বললেই চলে, সেই গ্রাম থেকেই একদিন যেন চিকিৎসক, শিক্ষক, প্রশাসক, সাহিত্যিক কিংবা গবেষক বেরিয়ে আসে।
পাঠাগারকে ঘিরে কবিতা আবৃত্তি, বই পাঠ, সুন্দর হাতের লেখা, বিঝু উপলক্ষে খেলাধুলা এবং বিভিন্ন সৃজনশীল প্রতিযোগিতার আয়োজন তাঁর সেই স্বপ্নকে আরও প্রাণবন্ত করে তুলেছে। এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠায় তৎকালীন ইউএনও জোবাইদা আক্তার এবং সমাজসেবা কর্মকর্তা শামসুল আলমের গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতার কথাও তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
সোহেলের সাহিত্যিক সত্তা সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে তাঁর কাব্যচর্চায়। ২০১৯ সালে বিঝু উপলক্ষে প্রকাশ করেন ‘ধেবাহুল্ল্যা নাগরী’ কাব্যগ্রন্থ। বইটি প্রকাশের জন্য কোনো বড় পৃষ্ঠপোষকের দ্বারস্থ হননি তিনি; নিজের টিউশনির অর্থ সঞ্চয় করে নিজস্ব অর্থায়নেই বইটি প্রকাশ করেছিলেন।
তরুণ বয়সের সেই প্রকাশনা নিয়ে আজ তাঁর নিজের মধ্যেই রয়েছে নির্মোহ আত্মসমালোচনা। তিনি মনে করেন, তখনকার গ্রন্থটি যথেষ্ট পরিণত, সুন্দর কিংবা অর্থবহ হয়ে উঠতে পারেনি; অনেকটা আবেগ ও তাড়নার বশেই প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এই উপলব্ধি তাঁর সাহিত্যিক পরিণতিরই পরিচয়। কারণ নিজের সৃষ্টির সীমাবদ্ধতা যে লেখক দেখতে পান, তাঁর সামনে পরবর্তী সৃষ্টির দরজা আরও প্রশস্ত হয়।
তাই ‘ধেবাহুল্ল্যা নাগরী’কে নতুনভাবে সম্পাদনা, সংযোজন ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে পুনরায় প্রকাশ করার স্বপ্ন তিনি লালন করে চলেছেন। তাঁর সৃষ্টির ঝুলিতে রয়েছে আরও কিছু অপ্রকাশিত সাহিত্যকর্ম—একটি ছড়াগ্রন্থ, ‘চাকমা শব্দের অন্ত্যমিল অভিধান’ এবং ‘পরসাল্য’ নামের একটি কাব্যগ্রন্থ। এসব পরিকল্পনা তাঁর সাহিত্যিক স্বপ্নের বিস্তৃতি ও সৃজনশীলতার গভীরতার পরিচয় বহন করে।
এ ছাড়া তাঁর দুটি গান—“ধেবাকুল্যা গাবরি নাঙান তার নাগরি, চিত ন’ ভিজে মনত মর তরে দিক্কুং ধরি” এবং “ঝর যনি এযেই ত’ মিয়্যা কিয়োঘান ভিজিবো ঝরত”—এখনও প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে। গান, কবিতা, ছড়া, অভিধানসহ সাহিত্যের নানা শাখায় তাঁর বিচরণ প্রমাণ করে, চাকমা ভাষা ও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করার সাধনা তাঁর সৃষ্টিশীল জীবনের অন্যতম প্রধান অঙ্গ। তাঁর এই নিরন্তর প্রয়াস চাকমা ভাষার বিকাশ, সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার সাহিত্যিক ঐতিহ্য পৌঁছে দেওয়ার এক মূল্যবান স্বপ্নেরই প্রতিফলন।
মানুষের জীবনে স্বপ্ন থাকে, আবার সেই স্বপ্নের পাশে থাকে বাস্তবতার কঠিন দেয়াল। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে বিবাহিত জীবনে প্রবেশ করেন সোহেল তালুকদার। বর্তমানে তিনি দুই সন্তানের জনক- তিরোচ তালুকদার ও ধীরা তালুকদার।
সংসারের দায়িত্ব, জীবিকার সংগ্রাম ও দৈনন্দিন জীবনের নানা টানাপোড়েন তাঁর সাহিত্যচর্চার অবকাশকে সংকুচিত করেছে। একসময় যে কলম আরও অনেক কথা বলতে চেয়েছিল, যে মন চাকমা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে আরও দূর যেতে চেয়েছিল, জীবনের ব্যস্ততা তাকে অনেকটাই থামিয়ে দিয়েছে। তবু স্বপ্নটি মরে যায়নি।
সাহিত্যচর্চার আকাঙ্ক্ষা আজ হয়তো নিভু নিভু প্রদীপের মতো; কিন্তু সেই প্রদীপের শিখা এখনো জ্বলছে। সময় ও সুযোগ পেলে নিজের স্বজাতির ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির জন্য আরও কিছু করার ইচ্ছা তাঁর অন্তরে অটুট।
সোহেল তালুকদারের জীবনকে যদি এক বাক্যে বলতে হয়, তবে বলা যায়- তিনি বড় কিছু পাওয়ার চেয়ে নিজের চারপাশে কিছু রেখে যেতে চান।
তিনি জানেন, তাঁর সামর্থ্য সীমিত। জানেন, জীবন সবসময় স্বপ্নের অনুকূলে চলে না। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। নিজের টিউশনি করে উপার্জিত অর্থে বই প্রকাশ করেছেন, নিজের গ্রামে সমাজসেবা সংগঠন গড়েছেন, মানুষের সহযোগিতায় পাঠাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন, শিশুদের হাতে বই তুলে দিয়েছেন, চাকমা বর্ণমালা শেখানোর কাজে যুক্ত হয়েছেন। এই ছোট ছোট কাজগুলোই আসলে বড় স্বপ্নের বীজ।
হেমন্ত পাড়ার মাটিতে তাঁর যে স্বপ্ন বোনা হয়েছে, তার ফল হয়তো আজই দেখা যাবে না। কিন্তু কোনো একদিন সেই পাঠাগারের একটি বই হাতে নিয়ে কোনো শিশু যদি উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন দেখে, কোনো তরুণ যদি চাকমা ভাষায় কবিতা লেখে, কোনো শিক্ষার্থী যদি নিজের গ্রামের সীমা পেরিয়ে পৃথিবীর বৃহত্তর অঙ্গনে পৌঁছে যায়- তবে সোহেল তালুকদারের এই নীরব সাধনা সার্থক হবে।
কারণ মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য সবসময় নিজের অর্জনে মাপা যায় না; কখনো কখনো তার সত্যিকারের মূল্য নির্ধারিত হয়- সে কতজনের মনে স্বপ্ন জাগিয়ে যেতে পেরেছে, কতটি অন্ধকার ঘরে আলোর একটি প্রদীপ রেখে যেতে পেরেছে।
সোহেল তালুকদার সেই প্রদীপ জ্বালিয়ে যাওয়ারই এক নিরলস পথিক। তাঁর হাতে হয়তো বিপুল সম্পদ নেই, নেই প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতার কোনো বড় পরিচয়; আছে কেবল মানুষের প্রতি মমতা, ভাষার প্রতি ভালোবাসা, সাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ এবং নিজের গ্রামকে একটু আলোকিত করে যাওয়ার এক গভীর স্বপ্ন।
আর পাহাড়ের দুর্গম মাটিতে কখনো কখনো একটি ছোট্ট প্রদীপই হয়ে ওঠে দীর্ঘ অন্ধকার ভেদ করার প্রথম আলো।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন