সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬

তুফান চাঙমা : তুলির ভেতর পাহাড়ের আত্মকথা - ইনজেক চাাঙমা

পাহাড়কে দূর থেকে দেখলে তার সৌন্দর্যই চোখে পড়ে, সবুজের স্তরে স্তরে নেমে আসা ঢেউ, মেঘের ছায়ায় আচ্ছন্ন উপত্যকা, ঝরনার স্বচ্ছ জলধ্বনি, জুমের ঢালে মানুষের নিত্যদিনের ব্যস্ততা। কিন্তু পাহাড়ের গভীরে যে জীবন, সে জীবন কেবল দৃশ্যের নয়; তার আছে দীর্ঘ ইতিহাস, আছে হারানোর বেদনা, আছে সংস্কৃতির উত্তরাধিকার, আছে শেকড় আঁকড়ে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। সেই জীবনকে কেবল চোখে দেখা যায় না, তাকে অনুভব করতে হয় হৃদয়ের অন্তর্গত কোনো গোপন প্রদেশে।

আর যখন কোনো শিল্পীর তুলিতে সেই অনুভব রঙ ও রেখার ভাষা পায়, তখন ক্যানভাস আর নিছক ক্যানভাস থাকে না, তা হয়ে ওঠে একটি জনপদের স্মৃতি, একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয়, ইতিহাসের নীরব দলিল এবং অস্তিত্বের এক গভীর উচ্চারণ।

পার্বত্য চট্টগ্রামের জুম্ম জীবনগাথাকে শিল্পের ভাষায় দেশে-বিদেশে প্রথম সুদূর বিস্তারে তুলে ধরার পথিকৃৎ চিত্রশিল্পী চুণীলাল দেওয়ান। তাঁর পরবর্তী প্রজন্মে সেই শিল্প-ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হয়ে, কিন্তু নিজের স্বতন্ত্র ভাষা ও সময়ের আধুনিক প্রযুক্তিকে সঙ্গী করে, এগিয়ে চলেছেন তরুণ শিল্পী তুফান চাঙমা। তাঁর তুলিতে পাহাড় কেবল প্রকৃতির সৌন্দর্যের অনুষঙ্গ নয়; পাহাড় সেখানে মানুষের জীবন, সংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য, আনন্দ-বেদনা এবং না-বলা কথার এক দীর্ঘ কাব্য।

খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলার দীঘিনালার উদাল বাগান, পাহাড়ের বুকের সেই ছোট্ট জনপদেই তুফান চাঙমার শৈশবের প্রথম আলো ফুটেছিল। পিতা অশ্বথামা চাকমা, মাতা শোভারাণী চাকমা। জন্ম ১৭ জুলাই ১৯৯৬ খ্রি.। দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছোট; বড় ভাই কনিস্ক চাকমা।

শৈশবের চারপাশে যে প্রকৃতি, যে মানুষ, যে জীবনযাপন, যে সংস্কৃতি তাঁকে ঘিরে ছিল, তা-ই অজান্তে তাঁর শিল্পীসত্তার ভিত নির্মাণ করেছিল। পাহাড়ের গ্রাম তাঁর কাছে কোনো দূরবর্তী দৃশ্য ছিল না; ছিল তাঁর নিজের জীবন। জুমের ঢাল, মজা ঘর, মানুষের মুখ, উৎসবের রঙ, পোশাকের বুনন, পাহাড়ি জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ, সবকিছুই ধীরে ধীরে তাঁর অন্তর্লোকে জমা হতে থাকে স্মৃতির অমোচনীয় রেখায়।

প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ তিনি নেন উদাল বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরে উদাল বাগান উচ্চ বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকের পাঠ শেষ করেন। জীবনের পরবর্তী অধ্যায় তাঁকে নিয়ে যায় বৃহত্তর শিক্ষাজগতের দিকে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১৫–১৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক অধ্যয়ন তাঁর চিন্তার জগতকে আরও প্রসারিত করে।

তারপর যেন তাঁর যাত্রাপথের দিগন্ত আরও দূরে সরে যায়। ইরাসমাস মুন্ডুস স্কলারশিপের অধীনে ২০২৪–২৬ সেশনে তিনি উচ্চশিক্ষার সুযোগ লাভ করেন ইউরোপের তিনটি প্রতিষ্ঠানে, বেলজিয়ামের লুকা স্কুল অব আর্টস, ফিনল্যান্ডের আলটো ইউনিভার্সিটি এবং পর্তুগালের লুসোফোনা ইউনিভার্সিটিতে। উদাল বাগানের পাহাড়ি গ্রাম থেকে ইউরোপের শিল্পশিক্ষার আন্তর্জাতিক পরিসর, এই পথচলা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রমাণ করে, শেকড়ের গভীরে দাঁড়িয়েও দিগন্তের দিকে তাকানো যায়।

তুফানের শিল্পীজীবনের প্রথম প্রেরণা এসেছিল প্রকৃতি থেকে। ছোট্ট তুফানের তুলিতে বারবার ফিরে এসেছে পাহাড়ি গ্রামের পরিচিত রূপ, মানুষের জীবন, রীতি ও সংস্কৃতির সরল সৌন্দর্য। কিন্তু শিল্পী যত পরিণত হয়েছেন, তাঁর দৃষ্টিও তত গভীর হয়েছে।

প্রকৃতির বাহ্যিক সৌন্দর্য থেকে তাঁর শিল্প ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে মানুষের অন্তর্জীবনে। এখন তাঁর ছবিতে শুধু পাহাড়ের সবুজ নেই; আছে পাহাড়ের মানুষের ইতিহাস। শুধু ঝরনার জলধারা নেই; আছে অশ্রুর অদৃশ্য ধারা। শুধু উৎসবের রঙ নেই; আছে বঞ্চনার বিবর্ণতা। শুধু সংস্কৃতির নান্দনিক প্রকাশ নেই; আছে সেই সংস্কৃতিকে টিকিয়ে রাখার সংগ্রামও।

তাঁর ক্যানভাসে চাকমা সংস্কৃতি, ইতিহাস, সংগ্রাম ও ঐতিহ্য যেন নতুন করে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। মানুষের পোশাক, জীবনাচার, সামাজিক সম্পর্ক, উৎসব, শ্রম, বিশ্বাস ও দৈনন্দিনতার মধ্য দিয়ে তিনি নির্মাণ করেন পাহাড়ের এক বহুমাত্রিক জীবনচিত্র।

কিন্তু তাঁর শিল্পের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক সম্ভবত সেখানে, যেখানে সৌন্দর্যের আড়াল ভেদ করে উঠে আসে অপ্রিয় বাস্তবতা। পাহাড়ি মানুষের দুঃখ, দুর্দশা, বঞ্চনা, হতাশা ও না-বলা কষ্ট তাঁর ছবিতে কখনো সরাসরি, কখনো প্রতীকের আড়ালে কথা বলে। যে কথাগুলো উচ্চারণ করার মতো কণ্ঠ অনেক সময় পাওয়া যায় না, তাঁর তুলিই যেন সেসব কথার ভাষা হয়ে ওঠে। তাই তুফানের ছবি দেখা মানে কেবল ছবি দেখা নয়; কখনো কখনো তা একটি নীরব মানুষের মুখোমুখি দাঁড়ানো।

তুফান চাঙমার শিল্পদর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গভীর উপলব্ধি—“আমাদের নিয়ে কথা বলার মানুষ নেই।” এই উপলব্ধি নিছক আক্ষেপ নয়; বরং তাঁর শিল্পীজীবনের এক নৈতিক ভিত্তি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার উদ্দেশ্যে যখন তিনি বৃহত্তর সমাজে প্রবেশ করলেন, ছবি আঁকার মাধ্যমে যখন তাঁর পরিচিতি বাড়তে লাগল, তখন তাঁর মনে জন্ম নিল এক নতুন দায়িত্ববোধ। তিনি উপলব্ধি করলেন, তাঁর হাতে এমন একটি ভাষা আছে যা শব্দের সীমা অতিক্রম করতে পারে। সেই ভাষা হলো ছবি।

তিনি ভাবলেন, যদি তাঁর কণ্ঠস্বর দিয়ে সব কথা বলা সম্ভব না হয়, তবে তাঁর তুলিই কথা বলুক। যদি তাঁর জনগোষ্ঠীর জীবনকে অনেকে দেখতে না চায়, তবে তিনি সেই জীবনকে ক্যানভাসে দৃশ্যমান করে তুলবেন। যদি ইতিহাসের কিছু অধ্যায় নীরবতার অন্ধকারে চাপা পড়ে থাকে, তবে রঙ ও রেখার মধ্য দিয়ে তিনি সেই নীরবতার দরজা খুলবেন। এই জায়গাতেই তুফান একজন সাধারণ চিত্রকর থেকে শিল্পী হয়ে ওঠেন। কারণ শিল্পী শুধু সৌন্দর্য আঁকেন না; তিনি সময়কেও আঁকেন। তিনি মানুষের হাসির পাশাপাশি কান্নার রেখাও পড়েন। তিনি দৃশ্যমানের পাশাপাশি অদৃশ্যকেও দৃশ্যমান করার চেষ্টা করেন।

২০১৪ সালে পরিকল্পিতভাবে ফেসবুকে যুক্ত হন তুফান। প্রথম দিকে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকেই নিজের আঁকা ছবি প্রকাশ করতেন। কিন্তু শিল্পকে আরও বিস্তৃত পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁকে নতুন পথে নিয়ে যায়। বন্ধুদের পরামর্শে ২০২০ সালে তিনি তৈরি করেন ‘Tufan’s Artbin’ নামের একটি পেইজ। সেখান থেকেই তাঁর শিল্পযাত্রা যেন পেল নতুন এক জানালা। পাহাড়ের একটি ছোট্ট গ্রামে বসে আঁকা ছবি মুহূর্তেই পৌঁছে যেতে লাগল বহুদূরের মানুষের কাছে। এ যেন প্রযুক্তির সঙ্গে শেকড়ের এক অভিনব সংলাপ।

যে পাহাড় বহুদিন ধরে মূলধারার চোখে কখনো রহস্য, কখনো পর্যটনের দৃশ্য, কখনো রাজনৈতিক বিতর্কের ভূগোল হিসেবে উপস্থিত হয়েছে, তুফান সেই পাহাড়কে মানুষের জীবন দিয়ে পরিচয় করিয়ে দিতে চান। তিনি চান, পাহাড়কে শুধু দেখা নয়—বোঝা হোক।

সময়ের সঙ্গে শিল্পের মাধ্যমও বদলায়। তুফান সেই পরিবর্তনকে ভয় পাননি। বরং প্রযুক্তিকে তিনি নিজের সংস্কৃতির নতুন বাহন করে নিয়েছেন। টিউশনির অর্থ সঞ্চয় করে কেনা আইপ্যাড তাঁর কাছে নিছক একটি প্রযুক্তি-যন্ত্র নয়। এটি যেন তাঁর হাতে উঠে আসা নতুন এক ক্যানভাস, যার সীমানা কাগজের চার প্রান্তে আবদ্ধ নয়। ডিজিটাল শিল্পের মাধ্যমে তিনি পাহাড়ের জীবনকে নতুন নান্দনিকতায় তুলে ধরছেন। আধুনিক প্রযুক্তির ভাষায় তিনি কথা বলছেন প্রাচীন সংস্কৃতির। বিশ্বায়নের যুগে দাঁড়িয়ে নিজের শেকড়ের গল্প বলছেন পৃথিবীর মানুষের কাছে।

এখানে তাঁর শিল্পের একটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে, তিনি আধুনিকতাকে গ্রহণ করেছেন, কিন্তু নিজের পরিচয়কে বিসর্জন দিয়ে নয়। বরং আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছেন নিজের পরিচয়কে আরও সুদূরে পৌঁছে দিতে।

তুফানের ছবি কখনো কখনো পাহাড়ের এক ধরনের বিকল্প ইতিহাস হয়ে ওঠে। যে ইতিহাস বইয়ের পাতায় সম্পূর্ণ লেখা নেই, যে মানুষের জীবন সংবাদপত্রের শিরোনামে খুব কম আসে, যে বেদনার গল্প অনেক সময় জনপরিসরের আলোচনায় স্থান পায় না, তাঁর শিল্প সেখানে সাক্ষ্য দেয়।

তিনি পাহাড়ের মানুষকে কেবল ‘প্রকৃতির সন্তান’ হিসেবে দেখান না; তিনি তাঁদের ইতিহাসের মানুষ হিসেবে দেখেন। তাঁদের আছে স্মৃতি, স্বপ্ন, হারানোর বেদনা, সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যতের আকাঙ্ক্ষা। এই কারণে তাঁর শিল্পে পাহাড় কখনো নিস্তব্ধ নয়। তার সবুজের ভেতরে কথা আছে, নদীর স্রোতে কথা আছে, মানুষের চোখে কথা আছে, পোশাকের বুননে কথা আছে, উৎসবের রঙে কথা আছে, আছে সুদীর্ঘ পাহাড়ের সংগ্রামে কথা এমনকি নীরবতার মধ্যেও আছে দীর্ঘ এক আর্তনাদ। তুফান সেই আর্তনাদ শুনতে পান। তারপর তা রঙে অনুবাদ করেন।

তুফান চাঙমার শিল্পীসত্তার স্বীকৃতি এসেছে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন পরিসর থেকে। ২০২৩ সালে তিনি অর্জন করেন Minority Artist Award। ২০২৪ সালে লাভ করেন OHCHR Prince Claus Seed Award। পুরস্কার শিল্পীর পথচলার শেষ কথা নয়। কিন্তু কখনো কখনো পুরস্কার হয়ে ওঠে সেই কণ্ঠস্বরের স্বীকৃতি, যা দীর্ঘদিন বৃহত্তর সমাজের কানে পৌঁছায়নি। তুফানের ক্ষেত্রে এসব স্বীকৃতি তাই ব্যক্তিগত অর্জনের সীমানা অতিক্রম করে পাহাড়ের সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে বৃহত্তর পরিসরে দৃশ্যমান করার প্রয়াসেরও স্বীকৃতি হয়ে ওঠে।

তুফান চাঙমার স্বপ্ন কেবল নিজের শিল্পীজীবনের সাফল্যে থেমে নেই। তাঁর আকাঙ্ক্ষা আরও বৃহৎ দেশের সীমানা অতিক্রম করে আন্তর্জাতিক শিল্পাঙ্গনে পাহাড়ের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও জীবনকে পরিচিত করে তোলা। তিনি চান না তাঁর সংস্কৃতি কারও কাছে অজানা থেকে যাক। চান না পাহাড়ের মানুষ বিশ্বের কাছে অদেখা, অনুচ্চারিত কিংবা উপেক্ষিত হয়ে থাকুক। তাঁর এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে জড়িয়ে আছে নতুন প্রজন্মের প্রতি এক গভীর দায়বোধ। তিনি তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিতে চান- আধুনিক হও, কিন্তু শেকড়হীন হয়ো না; পৃথিবীকে জানো, কিন্তু নিজেকে ভুলে নয়; সংকীর্ণতার দেয়াল ভাঙো, কিন্তু নিজের ইতিহাসকে মুছে দিয়ে নয়। কারণ শেকড় শুধু অতীতের স্মৃতি নয়; শেকড়ই ভবিষ্যতের শক্তি।

চুণীলাল দেওয়ানের তুলিতে যে জুম্ম জীবনগাথা শিল্পের ভাষায় দেশে-বিদেশে পরিচিতির পথ পেয়েছিল, তুফান চাঙমার শিল্পে তারই এক নতুন উত্তরযাত্রা লক্ষ করা যায়। তবে এই উত্তরাধিকার অনুকরণের নয়। বরং সময়ের সঙ্গে ভাষা বদলে যাওয়ার উত্তরাধিকার। চুণীলালের ক্যানভাসের পর যে পৃথিবী বদলেছে, সেই পরিবর্তিত পৃথিবীতে তুফান ডিজিটাল প্রযুক্তি, সমকালীন শিল্পচিন্তা ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার অভিজ্ঞতাকে সঙ্গে নিয়ে পাহাড়ের গল্প বলছেন নতুন ভাষায়।

একসময় পাহাড়ের কথা পৌঁছাতে সময় লাগত; এখন একটি ডিজিটাল ছবির মাধ্যমে তা মুহূর্তে পৌঁছে যেতে পারে পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তুফান সেই সম্ভাবনাকে নিজের সংস্কৃতির জন্য কাজে লাগাচ্ছেন। তাই তাঁর শিল্পে আমরা একই সঙ্গে দেখি অতীতের শেকড় এবং ভবিষ্যতের দিগন্ত।

একজন সত্যিকারের শিল্পী কখনো একা ছবি আঁকেন না। তাঁর সঙ্গে আঁকে তাঁর সময়, তাঁর সমাজ, তাঁর স্মৃতি এবং তাঁর মানুষের জীবন। তুফান চাঙমার ক্ষেত্রেও তাই। উদাল বাগানের মাটি থেকে উঠে আসা এই তরুণ শিল্পী আজ তাঁর ক্যানভাসে ধারণ করছেন পাহাড়ের এক বিস্তৃত জীবনভুবন। তাঁর ছবিতে যেমন আছে পাহাড়ের সৌন্দর্য, তেমনি আছে মানুষের দীর্ঘশ্বাস; যেমন আছে সংস্কৃতির রঙ, তেমনি আছে ইতিহাসের ক্ষত; যেমন আছে উৎসবের উচ্ছ্বাস, তেমনি আছে বঞ্চনার বিষণ্ন ছায়া। তাঁর তুলির রেখা তাই কেবল রেখা নয়, এ যেন স্মৃতির অক্ষর। তাঁর রঙ কেবল রঙ নয়, এ যেন একটি জনগোষ্ঠীর অনুভূতির রক্তমাংস। তাঁর ক্যানভাস কেবল ক্যানভাস নয়, এ যেন পাহাড়ের মানুষের এক নীরব আত্মজীবনী।

তুফান জানেন, সব কথা মুখে বলা যায় না। কিছু কথা রঙে বলতে হয়, কিছু কথা রেখায়, কিছু কথা নীরবতায়। তাই তিনি নিজের শিল্পকে করেছেন তাঁর মানুষের কণ্ঠস্বর। তাঁর স্বপ্ন, পাহাড়ের গল্প পাহাড়ের গণ্ডি পেরিয়ে পৃথিবীর কাছে পৌঁছাক; তাঁর সংস্কৃতি অদেখা না থাকুক; তাঁর ইতিহাস বিস্মৃতির অন্ধকারে হারিয়ে না যাক। আর নতুন প্রজন্মের প্রতি তাঁর যে আহ্বান, নিজের শেকড়কে ভুলে যেও না; তা কেবল একটি প্রজন্মের জন্য নয়, প্রতিটি সংস্কৃতির জন্যই এক চিরন্তন সত্য।

মানুষ যত দূরেই যাক, যত বড় পৃথিবীই জয় করুক, শেষ পর্যন্ত তার পরিচয়ের প্রথম আলো জ্বলে থাকে সেই মাটিতেই, যেখানে তার শৈশবের প্রথম পদচিহ্ন পড়েছিল। তুফান চাঙমা সেই মাটিকে সঙ্গে নিয়েই বিশ্বপথে হাঁটছেন। তাঁর হাতে তুলি, আর সেই তুলির ডগায় যেন ধীরে ধীরে লেখা হয়ে চলেছে পাহাড়ের আত্মকথা।

 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

তুফান চাঙমা : তুলির ভেতর পাহাড়ের আত্মকথা - ইনজেক চাাঙমা

পাহাড়কে দূর থেকে দেখলে তার সৌন্দর্যই চোখে পড়ে, সবুজের স্তরে স্তরে নেমে আসা ঢেউ, মেঘের ছায়ায় আচ্ছন্ন উপত্যকা, ঝরনার স্বচ্ছ জলধ্বনি, জুমের ঢাল...