“এ জাগা মাদি চিগোন দাঙর ছরা-ছুরি” - চাঙমা জনপদের মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসা এই জনপ্রিয় গানের পেছনে যে সৃষ্টিমান মানুষটির নাম জড়িয়ে আছে, তিনি সুদৃষ্টি চাঙমা মিলেন। গানটির সুর ও কণ্ঠে যখন পাহাড়ি জীবনের আবেগ ধ্বনিত হয়, তখন তার অন্তরালে ধরা পড়ে এক মানুষের দীর্ঘ জীবনপথ, শৈশবের মাতৃহারা বেদনা, অস্থির সময়ের অভিঘাত, সংগ্রামী জীবন এবং শেষ পর্যন্ত মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চার অবিচল সাধনা।
সুদৃষ্টি চাঙমার জীবন তাই কেবল একজন গীতিকারের জীবন নয়; এটি একই সঙ্গে একটি সময়ের, একটি সমাজের এবং এক সৃষ্টিশীল মানুষের জীবনকথা।
সুদৃষ্টি চাঙমা মিলেন জন্মগ্রহণ করেন ৩১ ডিসেম্বর ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে, বাবুছড়ার দাদন কারবারি পাড়ায়। পিতা বিনোদ বিহারী চাঙমা, যিনি পরবর্তীকালে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করে সুমনাচার মহাথেরো নাম ধারণ করেন। মাতা দ্বিআনি চাঙমা। চার ভাইয়ের মধ্যে তিনি কনিষ্ঠ- নক্ষত্র চাঙমা, কুক্ষেত্র চাঙমা, সুনীতি বিকাশ চাঙমা এবং সুদৃষ্টি চাঙমা মিলেন।
শৈশবের কোমল বয়সেই জীবনের প্রথম বড় শূন্যতার মুখোমুখি হন তিনি। মাত্র ছয় বছর বয়সে মাকে হারান। মায়ের স্নেহের ছায়া হারিয়ে যে শৈশব তাঁর সামনে উন্মুক্ত হয়েছিল, সেখানে জীবনকে খুব অল্প বয়সেই চিনতে শুরু করতে হয় তাঁকে।
তবু শিক্ষার পথ থেকে তিনি সরে যাননি। বাঘাইছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা। পরে বাবুছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। এরপর দিঘীনালা সরকারি হাই স্কুল থেকে ১৯৮৫ সালে এসএসসি পাস করেন।
শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি তখন থেকেই তাঁর ভেতরে জন্ম নেয় লেখার আকাঙ্ক্ষা। স্কুলের খাতায়-কলমে শুরু হওয়া সেই লেখালেখি পরবর্তী জীবনে নানা ঝড় পেরিয়েও তাঁর সঙ্গ ছাড়েনি।
তাঁর যৌবনকাল কেটেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের এক উত্তাল সময়ে। ১৯৮০-এর দশকে পাহাড়ের জনজীবনে রাজনৈতিক সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি, ভূমি হারানো এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিজ্ঞতা ক্রমেই তীব্র হয়ে উঠছিল। সরকারি উদ্যোগে সমতল থেকে বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসতি স্থাপন এবং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভূমি ও ঘরবাড়ি হারানোর বিভিন্ন ঘটনার ফলে সে সময় পাহাড়ের মানুষের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। এই সময়ের বাস্তবতাই তাঁর জীবনকে অন্য এক পথে নিয়ে যায়।
২১ মে ১৯৮৬, বুধবার, তিনি শান্তিবাহিনীতে যোগ দেন। সংগঠনে তিনি ‘মিলেন’ নামে পরিচিত হন। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তিনি সেকেন্ড লেফটেন্যান্টসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন এবং চিকিৎসাসেবার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।
এ ছিল তাঁর জীবনের এক কঠিন ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ অধ্যায়। পাহাড়ের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনও তখন একসূত্রে বাঁধা পড়ে। একদিকে সংগ্রামের বাস্তবতা, অন্যদিকে মনের গভীরে বেঁচে থাকা সাহিত্য ও সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষা, এই দুই স্রোত পাশাপাশি বয়ে চলে তাঁর জীবনে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরের পর তিনি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। জীবনের পথ বদলায়, কিন্তু লেখার অভ্যাসটি বদলায় না। অস্ত্রের সময় পেরিয়ে তাঁর হাতে আবারও ফিরে আসে কলম।
৪ মে ১৯৯২ সালে, ভারতের শরণার্থী জীবনে ভারতে লেবাছড়াতে তাঁর বিয়ে হয় রিনা চাঙমার সঙ্গে। রিনা চাঙমা দিঘীনালা বাবুছড়ার মোচমরা ছড়ার যোগেন্দ্র নাথ চাঙমা ও দেবমুখী চাঙমার পঞ্চম সন্তান।
তাঁদের সংসারে আসে দুই সন্তান, বার্জেস চাঙমা ও লটাস চাঙমা। পরবর্তীকালে পরিবারটি বাবুছড়ার নোয়াপাড়া গ্রামে স্থায়ীভাবে বসতি গড়ে। জীবনের এই পর্যায়ে সংগ্রামের পাশাপাশি পরিবার ও সৃষ্টিশীলতা তাঁর দিনযাপনের প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে।
সুদৃষ্টি চাঙমা মিলেনের সাহিত্যিক পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক তাঁর গান। তাঁর লেখা “এ জাগা মাদি চিগোন দাঙর ছরা-ছুরি” গানটি চাঙমা সমাজে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেছে। চিত্র চাঙমার কণ্ঠে গানটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
একটি জনপ্রিয় গান কখনো শুধু শব্দ ও সুরের সমষ্টি হয়ে থাকে না। মানুষের মুখে মুখে যখন কোনো গান বেঁচে থাকে, তখন সেটি ধীরে ধীরে সমষ্টিগত স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। সুদৃষ্টি চাঙমার এই গানও তেমনভাবেই চাঙমা সমাজের সাংস্কৃতিক পরিসরে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। তবে তাঁর সৃষ্টিশীলতা কেবল গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি চাঙমা ভাষায় নাটক, কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম রচনা করেছেন।
বর্তমানে তাঁর দুটি গ্রন্থ প্রকাশের অপেক্ষায় রয়েছে, ‘সিদ্ধার্থ গৃহত্যাগ’ এবং ‘সিদ্ধার্থ বাল্য জীবন ও বিদ্যা শিক্ষা’ একটি গ্রন্থ। দুটি বইই চাঙমা ভাষায় রচিত। পাশাপাশি তাঁর কাছে রয়েছে গানের একটি পাণ্ডুলিপি এবং কবিতার একটি পাণ্ডুলিপি।
এই অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপিগুলো তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যসাধনার নীরব সাক্ষী। জীবনের বহু প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি নিজের মাতৃভাষাকে লেখার ভাষা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। তাঁর কাছে ভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি স্মৃতি, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়েরও বাহন।
জীবনের শেষপ্রান্তে এসে তাঁর পথ সহজ হয়নি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন না হওয়া এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক-সামাজিক অনিশ্চয়তার প্রভাব তাঁর জীবনেও পড়েছে বলে তিনি মনে করেন। বর্তমানে তিনি অসুস্থ; সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে কোনো রকমে দিনাতিপাত করছেন। কিন্তু শরীর ক্লান্ত হলেও কলম থামেনি।
অসুস্থতা, অভাব এবং জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও তিনি লিখে যাচ্ছেন। প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা তাঁর দুটি গ্রন্থ এবং সংরক্ষিত গান ও কবিতার পাণ্ডুলিপি যেন সেই নীরব অথচ অবিচল সাধনারই চিহ্ন।
সুদৃষ্টি চাঙমা মিলেনের জীবনকে এক রেখায় আঁকা যায় না। তাঁর জীবনে যেমন আছে মাতৃহারা শিশুর নিঃসঙ্গতা, তেমনি আছে শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা; আছে পাহাড়ের সংঘাতময় সময়ের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, আবার আছে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসে সংসার ও সাহিত্যকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা।
সবশেষে তাঁর পরিচয় এসে মিশে যায় সৃষ্টির সঙ্গে। “এ জাগা মাদি চিগোন দাঙর ছরা-ছুরি” তাঁকে মানুষের মুখে পৌঁছে দিয়েছে; আর চাঙমা ভাষায় লেখা তাঁর নাটক, গ্রন্থ, গান ও কবিতা তাঁকে রেখে যাচ্ছে ভাষা ও সাহিত্যের বৃহত্তর ধারায়।
জীবনের ঝড় তাঁকে বহুবার পথ বদলাতে বাধ্য করেছে, কিন্তু মাতৃভাষার প্রতি তাঁর টানকে মুছে দিতে পারেনি। তাই তাঁর জীবনকথার সবচেয়ে গভীর উচ্চারণ হয়তো একটিই সময় বদলেছে, জীবন বদলেছে, পথ বদলেছে; কিন্তু সৃষ্টির কাছে তাঁর প্রত্যাবর্তন থামেনি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন