“জয় জয় বুদ্ধ পতাকা…” বনভান্তের রচিত এই ভক্তিগীতির সুর যখন রণজিৎ দেওয়ানের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়, তখন তা শুধু একটি ধর্মীয় গান হয়ে থাকে না, পাহাড়ি মানুষের বিশ্বাস, ভক্তি ও আত্মিক অনুভবের এক অনুরণনে পরিণত হয়।
“কোই কোই জুমত যেবং…” জুমের ঢালে, পাহাড়ের মাটিতে, বৃষ্টি ও রৌদ্রের সঙ্গে মানুষের যে জীবনযাত্রা, সেই জীবনকে তিনি গানের ভাষা দিয়েছেন।
“ও মোর সোনার দেচ্ছান…” নিজের দেশ ও মাটির প্রতি ভালোবাসা তাঁর কণ্ঠে যখন সুর পায়, তখন দেশপ্রেম হয়ে ওঠে মাটির গন্ধমাখা এক ব্যক্তিগত অনুভূতি। আর ঘর, জমি ও আপন ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের বেদনা যখন তাঁর গানে উঠে আসে—
“হরিঙে মোন থেদ একটি গাভুরি…” তখন সেই সুরে যেন পাহাড়ের এক দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়।
শুধু এই কয়েকটি গানের মধ্যেই নয়, প্রতিটি গানের রণজিৎ দেওয়ানের শিল্পীসত্তার বিস্তৃত পরিসর ধরা পড়ে। ধর্ম থেকে জুমজীবন, দেশপ্রেম থেকে ঘরহারা মানুষের বেদনা, সংগ্রাম তাঁর গানের বিষয় হয়ে উঠেছে মানুষের জীবন। তাঁর সুরে চেঙে, মাইনী, কাচালং, সাঙ্গু ও মাতামুহুরীর জলধ্বনি; তাঁর কথায় পাহাড়ের ফুল, অরণ্য, জুম, প্রেম, বিরহ, উৎসব, ধর্ম ও মানুষের স্বপ্ন।
রণজিৎ দেওয়ানের নিজের লেখা ও সুর করা গানের সংখ্যা তিন শতাধিক। সব গান তাঁর নিজের কণ্ঠে পরিবেশিত না হলেও এসব সৃষ্টির মধ্য দিয়ে তিনি চাকমা সংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর গান কখনো মানুষকে প্রেমের আবেশে ভাসিয়েছে, কখনো ধর্মীয় অনুভবে নিমগ্ন করেছে, কখনো প্রকৃতির কাছে ফিরিয়ে নিয়েছে, আবার কখনো সময়ের কঠিন সংগ্রাম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
এই কারণেই রণজিৎ দেওয়ানকে কেবল একজন গায়ক হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। তিনি গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং চাকমা সংগীতের এক গুরুত্বপূর্ণ পথিকৃৎ। এবং বিখ্যাত চাঙমা গীতিকারদের গান তাঁর সুরারোপ। তাঁর কণ্ঠে পাহাড়ের মানুষ নিজেদের জীবনকে শুনেছে; তাঁর গানে একটি ভূখণ্ড তার নিজস্ব সংস্কৃতি, স্মৃতি ও স্বপ্নকে চিনেছে।
রণজিৎ দেওয়ানের শিল্পীজীবনকে বুঝতে হলে ফিরে যেতে হয় ষাটের দশকের শেষভাগ ও সত্তরের দশকের শুরুর পার্বত্য চট্টগ্রামে। সে সময় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি, নৃত্য ও সংগীতকে বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ ছিল সীমিত। সেই বাস্তবতার মধ্যেই পাহাড়ের বুক থেকে গড়ে উঠতে থাকে নতুন সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত।
এই ধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাম ‘গিরিসুর শিল্পীগোষ্ঠী’। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর শিল্পীদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই শিল্পীগোষ্ঠী পাহাড়ি সাংস্কৃতিক জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। গান, সুর, নৃত্য ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে পাহাড়ি মানুষ নিজেদের জীবন ও অনুভূতিকে নতুনভাবে প্রকাশের সুযোগ পায়।
গিরিসুরের হাত ধরে পাহাড়ি সমাজে সৃষ্টি হয় এক ধরনের সাংস্কৃতিক নবজাগরণের আবহ। প্রেম, প্রকৃতি, পাহাড়, নদী, জুম ও মানুষের জীবন নিয়ে রচিত হতে থাকে নতুন গান। পাহাড়ের বুক দিয়ে যেন একটি রঙিন সুরের নদী প্রবাহিত হয়।
এই স্রোত তৈরিতে গিরিসুরের প্রতিটি শিল্পীরই কমবেশি অবদান ছিল। তবে তাঁদের মধ্যে রণজিৎ দেওয়ানের ভূমিকা ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তাঁর কণ্ঠ, সৃষ্টিশীলতা ও সাংস্কৃতিক সক্রিয়তা সেই সময়ের পাহাড়ি সংগীতকে একটি স্বতন্ত্র পরিচয় দিতে সহায়তা করে।
তাঁর নাম উচ্চারণ করলেই বহু মানুষের মনে ফিরে আসে একটি সময়, যখন পাহাড়ের তরুণেরা গান শুনত, গান গাইত, প্রেমে পড়ত, স্বপ্ন দেখত এবং নিজেদের জীবনকে নিজেদের ভাষা ও সুরে প্রকাশ করার চেষ্টা করত। রণজিৎ দেওয়ানের গান সেই প্রজন্মের স্মৃতির সঙ্গে এমনভাবে মিশে আছে যে কয়েক দশক পরেও তাঁর গান শুনলে ফিরে আসে সেই তরুণ বয়স, সেই পাহাড়, সেই নদী, সেই মানুষ।
রণজিৎ দেওয়ান ১৯৫৩ সালের ৮ আগস্ট রাঙামাটি জেলার রাঙ্গাপানি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা যোগেন্দ্র কুমার দেওয়ান এবং মাতা লালনা দেওয়ান। ব্রিটিশ আমলে মৌজা পরিচালনার সুবিধার্থে তাঁর পিতা রাঙ্গাপানিতে এসে বসতি স্থাপন করেন। সেই সূত্রে তাঁদের পরিবারের সঙ্গে রাঙ্গাপানির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। যোগেন্দ্র কুমার দেওয়ান ১৯৯০ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।
ছয় ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে রণজিৎ দেওয়ান সবার বড়। তাঁর দুই বড় বোন ইতোমধ্যে মৃত্যুবরণ করেছেন। ছোট বোন ও তৃতীয় ভাই কানাডাপ্রবাসী; অন্যরা বিভিন্ন পেশায় যুক্ত। বৃহৎ পরিবারের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে শৈশব থেকেই তাঁর জীবনে পারিবারিক দায়িত্ববোধের একটি স্বাভাবিক ভার ছিল।
১৯৭১ সালে তিনি রাঙামাটি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। ছাত্রজীবনেই সংগীতের প্রতি গভীর আকর্ষণের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা তাঁর মধ্যে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
রণজিৎ দেওয়ানের সংগীতজীবনের শুরু কোনো প্রাতিষ্ঠানিক সংগীতশিক্ষালয়ে নয়; শুরু হয়েছিল এক শিশুর বিস্ময় থেকে। ছয়-সাত বছর বয়স থেকেই গান তাঁর মনে অদ্ভুত কৌতূহল সৃষ্টি করে। রেডিও কিংবা গ্রামোফোনে গান শুনে তিনি গুনগুন করে সেই সুর অনুসরণ করার চেষ্টা করতেন। গ্রামোফোনের রেকর্ড বাজলে শিশুমনে প্রশ্ন জাগত, এত ছোট একটি যন্ত্রের ভেতরে এত মানুষ কীভাবে গান করছে? সেই বিস্ময় ধীরে ধীরে স্বপ্নে পরিণত হয়।
১৯৬১ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় এক আত্মীয়ার বিয়েতে পাওয়া ‘ভারতীয় বাংলা গান’ নামের একটি গানের বই তাঁর সংগীতজীবনের আরেকটি দরজা খুলে দেয়। বইয়ের গান দেখে দেখে তিনি নিজের মতো করে সুর দিয়ে গাইতেন। তখনও তিনি জানতেন না, গানগুলো ইতোমধ্যে সুরারোপিত ও রেকর্ড করা হয়েছে। হারমোনিয়াম পর্যন্ত ভালোভাবে দেখা হয়নি, তবু সংগীতের প্রতি সহজাত আকর্ষণ তাঁকে নিজের মতো করে গান শেখার পথ দেখিয়েছিল।
১৯৬১-৬২ সালে রাঙামাটির তৎকালীন পাকিস্তান আর্টস কাউন্সিলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানগুলোও তাঁর মনে গভীর ছাপ ফেলে। জয়শ্রী রায়, তৃপ্তি তালুকদার, জয়তী রায়, বিমলেন্দু দেওয়ান প্রমুখ শিল্পীর গান শুনতে তিনি আগ্রহ নিয়ে ছুটে যেতেন। শিশু বলে সব সময় অনুষ্ঠানের ভেতরে ঢোকার সুযোগ মিলত না। বাইরে দাঁড়িয়ে গান শুনতে শুনতেই তাঁর মনে জন্ম নেয় এক দৃঢ় সংকল্প— একদিন তিনিও গান করবেন, মানুষ তাঁর গান শুনবে।
তাঁর সংগীতশিক্ষার পথ সহজ ছিল না। সেই সময় বর্তমানের মতো সংগীত শেখার সুযোগ ছিল সীমিত। পারিবারিক পরিবেশেও সংগীতচর্চার অনুকূল পরিস্থিতি ছিল না। তবু তিনি থেমে থাকেননি। সুরেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, সুনীতি বিকাশ বড়ুয়া, কল্যাণ মিত্র বড়ুয়া ও হিমাংশু বিশ্বাসের মতো ব্যক্তিদের কাছ থেকে তিনি যতটুকু সম্ভব সংগীত শিখেছেন। গানের পাশাপাশি তবলা শেখারও তাঁর আগ্রহ ছিল।
একসময় সংগীতচর্চা নিয়ে পারিবারিক আপত্তির মুখে পড়তে হয় তাঁকে। তাঁর বাবা এমনকি তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করার কথাও বলেছিলেন। কিন্তু রণজিৎ ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দুদিন অনশনের পর শেষ পর্যন্ত তাঁর বাবা সম্মতি দেন।
তাঁর কাছে গান ছিল না নিছক বিনোদন। গান ছিল জীবনযাপনের অংশ। পড়া মুখস্থ হলে টেবিল চাপড়ে গুনগুন করা, ভাত খাওয়ার সময় গান, স্নানের সময় গান, পথে চলতে গান, জীবনের প্রতিটি অবকাশ যেন তাঁর কাছে সংগীতের আরেকটি দরজা।
তাঁর মনে তখন একটি বিশ্বাস ক্রমেই দৃঢ় হচ্ছিল— অন্যেরা গান লিখতে পারে, সুর করতে পারে, গাইতে পারে; তিনি কেন পারবেন না?
রণজিৎ দেওয়ানের সংগীত-আদর্শের অন্যতম প্রেরণা ছিলেন ভূপেন হাজারিকা। মেহেদী হাসান, মোহাম্মদ রফি, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কিশোর কুমার, মান্না দে, শ্যামল মিত্র, লতা মঙ্গেশকর, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ও আশা ভোঁসলের মতো শিল্পীদের গানও তাঁর সংগীতবোধকে প্রভাবিত করেছে।
তবে তাঁর প্রকৃত প্রেরণা ছিল সাধারণ মানুষ। মানুষের ভালোবাসা, মানুষের জীবন এবং মানুষের জাগরণ ছিল তাঁর গানের কেন্দ্রে।
তাঁর নিজের ভাষায়, তাঁর লক্ষ্য ছিল গান গেয়ে জাতিকে জাগানো। সেই কারণে তাঁর গান নিছক বিনোদনের সীমা ছাড়িয়ে মানুষের জীবন, সমাজ ও সময়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছে।
প্রতিমা চাকমা, যাঁকে তিনি স্নেহভরে ‘হুক্কিমা’ হিসেবে স্মরণ করেছেন, তাঁর সংগীতজীবনের বিশেষ অনুপ্রেরণার উৎস ছিলেন। তিনি রণজিৎকে ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন এবং নিয়মিত গান করার জন্য উৎসাহ দিতেন।
রণজিৎ দেওয়ানের শিল্পীজীবনের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় তাঁর বেতার-অভিষেক। ১৯৭৩ সালে ঢাকায় বাংলাদেশ বেতারের ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের অনুষ্ঠানে এবং ১৯৭৪ সালে চট্টগ্রাম বেতারের লোকসংগীত অনুষ্ঠানে তিনি চাকমা গান পরিবেশন করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি চাকমা সম্প্রদায়ের প্রথম বেতার শিল্পী।
১৯৭৭ সালে জেলা গণসংযোগ দপ্তরের ভ্রাম্যমাণ পল্লীগায়ক হিসেবে তাঁর কর্মজীবনের সূচনা হয়। এরপর ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের ‘পাহাড়িকা’ অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বেতারের মাইক্রোফোন তাঁর কণ্ঠকে পাহাড়ের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর শ্রোতামণ্ডলীর কাছে পৌঁছে দেয়। চাকমা ভাষার গান তখন আর কেবল স্থানীয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের বিষয় রইল না; বেতারের তরঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করল।
চাকমা গান ও ধর্মীয় সংগীতের প্রচার-প্রসারেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তিনিই প্রথম চাকমা গানের ক্যাসেট প্রকাশ করেন।
এককসহ তাঁর চাকমা গানের ক্যাসেটের সংখ্যা আটটি। নিজের লেখা ও সুর করা গানের সংখ্যা তিন শতাধিক। সব গান তাঁর নিজের কণ্ঠে পরিবেশিত না হলেও গীতিকার ও সুরকার হিসেবে তাঁর সৃষ্টির বিস্তার চাকমা সংগীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
রণজিৎ দেওয়ানের গানের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য তাঁর ভূগোলবোধ। তাঁর গানে নদী কেবল নদী নয়, ফুল কেবল ফুল নয়, জুম কেবল কৃষিকাজ নয়।
চেঙে, মাইনী, কাচালং, সাঙ্গু ও মাতামুহুরী তাঁর গানে হয়ে ওঠে স্মৃতি ও অনুভূতির নদী। নাকশা ফুল, ভেইক ফুল, করুক ফুল, ছদরক ফুলসহ পাহাড়ের নানা ফুল তাঁর গানে হয়ে ওঠে প্রকৃতি ও জীবনের প্রতীক।
‘কোই কোই জুমত যেবং’-এর মতো গানে জুমজীবনের কথা উঠে আসে। ‘ও মোর সোনার দেচ্ছান’-এ ফুটে ওঠে দেশ ও মাটির প্রতি ভালোবাসা। আর ‘হরিঙে মোন থেদ একটি গাভুরি’-র মতো গানে ধরা পড়ে ঘরহারা মানুষের বেদনা। তাঁর গানে কখনো মানুষ সংগ্রামী হয়, কখনো ভাবনার গভীরে ডুবে যায়। কখনো চোখে জল আসে, আবার কখনো বেঁচে থাকার স্বপ্ন জেগে ওঠে। এই কারণেই তাঁর গান একই সঙ্গে প্রেমের গান, প্রকৃতির গান, মানুষের গান এবং সময়ের গান।
রণজিৎ দেওয়ানের সংগীতজীবনের সঙ্গে ধর্মীয় চেতনার একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর কণ্ঠে বনভান্তের রচিত ‘জয় জয় বুদ্ধ পতাকা’ বিশেষভাবে পরিচিতি লাভ করে। ধর্মীয় সংগীতের মধ্য দিয়ে তিনি পাহাড়ি বৌদ্ধ সমাজের বিশ্বাস, ভক্তি ও আধ্যাত্মিক অনুভূতিকে সুরের ভাষায় ধারণ করেছেন।
কিন্তু বনভান্তের প্রভাব শুধু তাঁর গানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাঁর ব্যক্তিজীবনেও এর একটি গভীর ছাপ পড়েছিল।
বনভান্তের দেশনা শুনে রণজিৎ দেওয়ানের মনে সংসার ও জীবনের অর্থ সম্পর্কে এক বিশেষ উপলব্ধি তৈরি হয়। সেই আধ্যাত্মিক প্রভাব থেকেই তিনি চিরকুমার থাকার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে তাঁর ব্যক্তিজীবনের এই সিদ্ধান্তকে তাঁর ধর্মীয় অনুরাগ ও জীবনদর্শনের একটি অংশ হিসেবেই দেখা যায়।
সংসারী জীবনের প্রচলিত আকাঙ্ক্ষার পরিবর্তে তিনি নিজেকে সংগীত, ধর্ম, সমাজ ও সংস্কৃতির কাজে নিবেদিত রাখার পথ বেছে নেন। তাঁর জীবনে তাই গান কেবল শিল্পচর্চা নয়, অনেকটা সাধনারও রূপ পেয়েছে।
এই দিকটি তাঁর জীবনকে আরও স্বতন্ত্র করে তোলে। একদিকে তিনি প্রেম, বিরহ ও মানুষের আবেগ নিয়ে গান লিখেছেন; অন্যদিকে ধর্মীয় বিশ্বাস ও আত্মিক উপলব্ধিকে ধারণ করেছেন। ব্যক্তিজীবনে সেই দ্বৈত অভিজ্ঞতারই এক অনন্য সমন্বয় দেখা যায়।
রণজিৎ দেওয়ান গিরিসুর ও গিরিঝংকার শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সংগীতের পাশাপাশি নৃত্য ও চারুকলার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। পরবর্তীতে সংগীত, নৃত্য ও চারুকলাবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ফিবেক একাডেমির প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন।
চাকমাদের ঐতিহ্যবাহী বিঝু নৃত্যকে নতুনভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগেও তাঁর ভূমিকা ছিল। বিভিন্ন সময়ে বিটিভি, সিটিভি, এনটিভি ও একুশে টেলিভিশনে তিনি সংগীত পরিবেশন করেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির প্রেক্ষাপটে তাঁর রচিত ও সুরারোপিত ‘চেঙে-মেইনী-কাচালং’ গানটিও বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
তাঁর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান তাঁকে সম্মানিত করেছে; এর মধ্যে ফিবেক একাডেমি ও রাঙামাটি শিল্পকলা একাডেমির নাম উল্লেখযোগ্য।
রণজিৎ দেওয়ানের জীবন শুধু মঞ্চ ও বেতারের জীবন নয়। ছাত্রজীবনেই তিনি সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হন। তৎকালীন পাহাড়ি ছাত্র সমিতির কেন্দ্রীয় কমিটিতে তিনি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং পরে সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২-৭৩ মেয়াদে কেন্দ্রীয় কমিটির সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক এবং ১৯৭৩-৭৪ মেয়াদে সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি কাজ করেন।
আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে জনমত গঠনের উদ্দেশ্যে পাহাড়ি ছাত্র সমিতির সাংগঠনিক সফরেও তিনি অংশ নেন। চেঙ্গী-মাইনী ভ্যালির প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে তাঁকে বক্তৃতার পাশাপাশি গানও পরিবেশন করতে হয়েছে।
ফলে তাঁর কাছে গান ও বক্তব্য কখনো আলাদা হয়ে ওঠেনি। মানুষের কাছে পৌঁছানোর দুটি ভাষা, একটি কথা, অন্যটি সুর। পরবর্তী সময়ে তিনি জেএসএসের রাজনীতির সঙ্গেও যুক্ত হন।
সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে রণজিৎ দেওয়ান রাঙামাটিতে ছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সন্তু লারমার নির্দেশে একটি বিপ্লবী শিল্পীদল গড়ে তোলার দায়িত্বও তিনি পালন করেন। প্রায় দেড় বছর কার্যক্রম চলার পর নানা বাস্তবতায় উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
১৯৭৮ সালের শেষদিকে চাকমা ভাষার অনুষ্ঠান পরিচালনার উদ্দেশ্যে তিনি চট্টগ্রাম শহরে চলে যান। ১৯৮১ সালের ৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম ত্যাগ করে আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ার পথে তিনি বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র পরিচালনার প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন। পরবর্তী সময়ের ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত ও পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তাঁর সেই পরিকল্পনা পূর্ণতা পায়নি।
প্রায় চার বছর পর ১৯৮৫ সালের শেষদিকে তিনি স্বদেশে ফিরে আসেন। জন্মদাত্রী মাকে নিয়ে দেশে ফেরার সেই প্রত্যাবর্তন তাঁর জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। এরপর পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পর্যন্ত সময়টি তাঁর জীবনে কেটেছে ভয়, শঙ্কা, আশা ও নিরাশার এক জটিল সময়ের মধ্য দিয়ে।
১৯৯০-এর গণআন্দোলন ও সাধারণ নির্বাচনের পর দেশে গণতান্ত্রিক পরিবেশের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলে পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘদিনের সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান নিয়েও নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণে বিলম্ব ও অনিশ্চয়তা তাঁর সময়ের সামাজিক বাস্তবতার অংশ হয়ে থাকে। এই দীর্ঘ অস্থির সময়ও তাঁর গান থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল না। বরং সময়ের অভিঘাত তাঁর সৃষ্টিকে আরও মানুষের কাছাকাছি নিয়ে আসে।
রণজিৎ দেওয়ানের জীবনকে শুধু একজন গায়কের জীবন হিসেবে দেখলে তাঁর অবদানের পূর্ণতা ধরা যায় না। তিনি এমন এক সময়ে গান করেছেন, যখন পাহাড়ি ভাষা ও সংস্কৃতির নিজস্ব প্রকাশের ক্ষেত্র ছিল সীমিত। সেই সময়ে তাঁর কণ্ঠ, কলম ও সুর চাকমা সংগীতকে একটি স্বতন্ত্র প্রকাশভঙ্গি দিয়েছে।
গ্রামোফোনের প্রতি বিস্মিত শিশুটি একদিন বেতারের মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়েছে। মঞ্চে গান করেছে। ক্যাসেট প্রকাশ করেছে। শত শত গান লিখেছে ও সুর দিয়েছে। শিল্পীগোষ্ঠীর সঙ্গে কাজ করেছে। সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে নেতৃত্ব দিয়েছে। ধর্মীয় দেশনা থেকে জীবনদর্শনের শিক্ষা নিয়েছে। আবার সময়ের প্রয়োজনে সংগঠকের ভূমিকাও নিয়েছে।
তাঁর গান তাই তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের সীমা অতিক্রম করে একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে পরিণত হয়েছে। কয়েক দশকের তরুণ প্রজন্ম তাঁর গান শুনে প্রেম চিনেছে, পাহাড় চিনেছে, জুমের জীবন চিনেছে, মানুষের বেদনা চিনেছে। তাঁর সুরে কেউ ফিরে পেয়েছে শৈশবের পাহাড়, কেউ হারানো দিনের স্মৃতি, কেউবা সংগ্রামী, কেউবা নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক টুকরো স্বর।
এই কারণেই রণজিৎ দেওয়ানের গান আজও কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; তা পাহাড়ি মানুষের সাংস্কৃতিক স্মৃতির জীবন্ত অংশ। চেঙে-মাইনী-কাচালংয়ের জল যেমন পাহাড়ের বুক চিরে বহমান, তেমনি তাঁর গানও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রবাহিত হয়ে চলেছে।
তাঁর গানে পাহাড় আছে, পাহাড়ের মানুষ আছে, আছে প্রেম ও বেদনা, আছে ধর্ম ও প্রকৃতি, আছে জুমের জীবন, আছে অধিকার হারা নির্যাতীত ও নিপিড়ীত মানুষের সংগ্রাম, আছে ইতিহাস ও স্বপ্ন। আর তাঁর ব্যক্তিজীবনে আছে আরও একটি স্বতন্ত্র অধ্যায়, বনভান্তের দেশনা শুনে সংসারজীবনের পরিবর্তে চিরকুমার থাকার সিদ্ধান্ত এবং নিজেকে সংগীত, ধর্ম ও মানুষের সংস্কৃতির সাধনায় নিবেদিত করা।
এইসব অভিজ্ঞতা মিলিয়েই রণজিৎ দেওয়ানের জীবন এক অনন্য সাংস্কৃতিক আখ্যান। রণজিৎ দেওয়ান শুধু একজন শিল্পীর নাম নয়; তিনি একটি সময়ের নাম, একটি সুরের নাম, একটি সাংস্কৃতিক স্মৃতির নাম, একটি সংগ্রামী নাম, পাহাড়ের গানে এক জীবন্ত কিংবদন্তির নাম।
তথ্যসূত্র: ইন্টু মণি চাঙমা সাক্ষাৎকার, আইপিনিউজবিডি.কম, হিলফিল্ম//২০২২ ও আমার ব্যক্তিগত ফোনালাপ।
বি.দ্র.: লেখাটিতে তথ্যগত অসংগতি, অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অসম্পূর্ণতা থাকতে পারে। কোনো কোনো বক্তব্য আপনার জানা তথ্য বা মতের সঙ্গে নাও মিলতে পারে। তাই লেখাটিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না দেখে, নিজস্ব জ্ঞান ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের আলোকে যাচাই করে প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন ও পরামর্শ দিয়ে সহায়তা করার অনুরোধ রইল। 01516-195366

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন