শিক্ষা দিবস: শিকড়হীন শিক্ষার দায় কার? - ইনজেব চাঙমা


আজ শিক্ষা দিবস। ২০২৬ সালের প্রতিপাদ্যThe Power of Youth in Co-Creating Education”, অর্থাৎ “শিক্ষাপ্রক্রিয়া সৃষ্টিতে যুবসমাজের ভূমিকা”। প্রতিপাদ্যের কেন্দ্রে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা, শিক্ষার্থী ও যুবসমাজ যেন কেবল শিক্ষার গ্রহীতা না হয়ে শিক্ষাব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণে সক্রিয় অংশীদার হয়।

কথাটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজকের শিক্ষার্থীই আগামী দিনের সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। তাদের সৃজনশীলতা, চিন্তা ও শক্তিকে কাজে লাগাতে পারলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই সমাজ নির্মাণ সম্ভব।

কিন্তু প্রশ্ন হলোযে তরুণ নিজের শিকড়কেই চিনতে শেখেনি, সে কীভাবে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে?দেশের পাহাড়ি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস্তবতায় এই প্রশ্নটি আরও কঠিন। উচ্চশিক্ষিত হওয়ার দৌড়ে আমাদের অনেক তরুণ বাংলা ও ইংরেজিতে দক্ষ হওয়ার চেষ্টা করছে—এটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয়। কিন্তু একই সঙ্গে অনেকে নিজের মাতৃভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাস এবং নিজস্ব বর্ণমালা থেকে ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছে।

একজন শিক্ষার্থী যদি বিশ্বের নানা ভাষা শিখতে পারে, কিন্তু নিজের মায়ের ভাষায় একটি বই পড়তে না পারে; যদি আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারে, অথচ নিজের জনগোষ্ঠীর বর্ণমালা চিনতে না পারে, তাহলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্যের মাপকাঠি নিয়ে প্রশ্ন তোলা কি অন্যায়?

মাইকেল মধুসূদন দত্তের ‘বঙ্গভাষা’ কবিতার আত্মঅনুশোচনা আজও আমাদের সামনে আয়না হয়ে দাঁড়ায়- 

“হে বঙ্গ, ভাণ্ডারে তব বিবিধ রতন;
তা সবে, (অবোধ আমি!) অবহেলা করি…”

নিজের ভাষা ও সাহিত্যকে অবহেলা করার পর যে আত্মবোধ তাঁর মধ্যে জন্মেছিল, সেটিই আমাদের জন্য বড় শিক্ষা। তাঁর মাতৃভাষা-চেতনার আলোকে বলা যায়অন্যের জ্ঞান অর্জন শিক্ষার অংশ, কিন্তু নিজের ভাষা ও শিকড়কে বিস্মৃত হওয়া শিক্ষার পূর্ণতা নয়।

তাই আজকের শিক্ষা দিবসে শুধু বক্তৃতার মঞ্চে যুবসমাজের ক্ষমতার কথা বললেই হবে না। প্রশ্ন করতে হবেআমরা কি তাদের নিজেদের ভাষায় চিন্তা করার সুযোগ দিচ্ছি? নিজের বর্ণমালা শেখার সুযোগ দিচ্ছি? নিজের সাহিত্য পড়ার পরিবেশ তৈরি করছি?

যদি না দিই, তাহলে শিক্ষা দিবসের আয়োজন যত বড়ই হোক, কোথাও একটি মৌলিক ঘাটতি থেকেই যাবে। শিক্ষা কেবল পরীক্ষায় ভালো ফল করার নাম নয়। শিক্ষা মানুষকে তার পৃথিবীকে চিনতে শেখায়। সেই পৃথিবীর প্রথম দরজা তার মাতৃভাষা। নিজের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে জানার মধ্য দিয়ে একজন তরুণ নিজের পরিচয়, ইতিহাস ও সমাজকে বুঝতে শেখে। সেখান থেকেই তৈরি হয় আত্মবিশ্বাসী নাগরিকত্ব।

বিশ্বায়নের যুগে বহুভাষিক হওয়া শক্তি; কিন্তু মাতৃভাষা হারানো কোনো অর্জন নয়। বাংলা ও ইংরেজি শিখতে হবে, বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে, কিন্তু তার বিনিময়ে নিজের ভাষাকে বিসর্জন দিতে হবে কেন?

শিক্ষার নামে যদি শিকড় কাটা পড়ে, সেই শিক্ষার দায় শুধু শিক্ষার্থীর নয়; পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং রাষ্ট্রকেও সেই দায় নিতে হবে। তাই আজ শিক্ষা দিবসে আনুষ্ঠানিকতার প্রশ্ন নয়, কাজের প্রশ্ন সামনে আসুক।

একজন তরুণ নিজের মাতৃভাষায় একটি বই পড়ুক। একজন শিক্ষার্থী নিজের বর্ণমালা শিখুক। একটি বিদ্যালয়ে মাতৃভাষায় পাঠচর্চার ব্যবস্থা হোক। একটি হারিয়ে যেতে বসা সাহিত্যকর্ম নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছাক। একটি জনগোষ্ঠীর ভাষা যেন শুধু ঘরের কথোপকথনে নয়, বই, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতেও বেঁচে থাকে।

সভা হবে, সেমিনার হবে, মিছিল হবে, হতেই পারে। কিন্তু শিক্ষা দিবসের সবচেয়ে বড় উদযাপন হবে সেদিন, যেদিন একজন শিক্ষিত তরুণ গর্বের সঙ্গে বলতে পারবে, আমি বিশ্বকে জানি, কিন্তু আমার নিজের ভাষাকেও জানি।

শিক্ষিত হবো, শিকড়হীন নয়। আধুনিক হবো, মাতৃভাষাবিমুখ নয়। বিশ্বকে জানবো, নিজেকে ভুলে নয়।কারণ যে শিক্ষা মানুষকে তার নিজের শিকড়ের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে, সেই শিক্ষাকে শুধু বিস্তৃত বলা যায়; পূর্ণাঙ্গ বলা যায় কি?

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

জ্ঞান কীর্তি চাকমা : চাঙমা চলচ্চিত্র আন্দোলনের এক নিবেদিত সংস্কৃতিসাধক - ইনজেব চাঙমা

বৃত্তবন্দী মানুষেরা- ইনজেব চাঙমা

হেমা চাকমা: পাহাড়ের মাটি থেকে তারুণ্যের সাহসী উচ্চারণ - ইনজেব চাঙমা