পাহাড় কি তবে তার শেষ নিঃশ্বাসটুকুও হারিয়ে ফেলবে? আজ এই প্রশ্নটি কেবল ধূলিকণা বা মেঘের আনাগোনা নয়, বরং এক আদিম জনপদের অস্তিত্বের সংকটে থমকে দাঁড়িয়ে থাকা আর্তনাদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের নিভৃত অরণ্য আর মেঘের আড়ালে যে মানুষগুলো শতাব্দীর পর শতাব্দী পরম মমতায় প্রকৃতিকে আগলে রেখেছে, আজ তারা নিজ ভূমিতেই পরবাসী হওয়ার আশঙ্কায় কম্পমান। শতবর্ষী এক রক্ষাকবচ—Chittagong Hill Tracts Regulation, 1900—আজ যেন এক অদৃশ্য ঘাতকের নজরে পড়েছে। একে রক্ষা করা আজ কেবল আইনি লড়াই নয়, বরং একটি বিলীয়মান সংস্কৃতির শেষ দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে বাঁচার লড়াই।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলেও এই সত্যটি স্বীকৃত ছিল যে—পাহাড় আলাদা, পাহাড়ের মানুষ আলাদা। তাদের জীবনদর্শন ও প্রথাগত অধিকারকে সম্মান জানাতেই ১৯০০ সালের শাসনবিধি প্রণীত হয়েছিল। পরবর্তীতে দীর্ঘ দুই দশকের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে যে ১৯৯৭ সালের ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, তার মূল ভিত্তিই ছিল এই বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামোকে স্বীকৃতি দেওয়া। এই চুক্তি কেবল একটি রাজনৈতিক দলিল নয়, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে পাহাড়ের মানুষের স্বকীয়তা ও ভূমি অধিকার রক্ষার এক পবিত্র অঙ্গীকার। ১৯০০ সালের বিধিমালাকে দুর্বল করার অর্থ হলো সেই ঐতিহাসিক চুক্তির মূল চেতনাকে অস্বীকার করা এবং শান্তির পথকে কণ্টকাকীর্ণ করা।
১৯৭৫ পরবর্তী ইতিহাস পাহাড়ের জন্য ছিল এক দীর্ঘশ্বাসের অধ্যায়। জোরপূর্বক বসতি স্থাপন আর ভূমি জবরদখলের যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, তার সামনে একমাত্র ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল এই ১৯০০ সালের বিধিমালা এবং পরবর্তীতে পার্বত্য চুক্তি। তবুও আজ সেই ভিত্তিমূলে আঘাত হানার পাঁয়তারা চলছে। যখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত—Supreme Court of Bangladesh—ইতিমধ্যেই এই আইনকে বৈধ ঘোষণা করেছে, তখন পুনরায় 'রিভিউ'-এর আড়ালে কিসের ইঙ্গিত? এটি কি তবে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা, নাকি পাহাড়ের শেষ সম্বলটুকু গ্রাস করার কোনো সুনিপুণ নীল নকশা?
পাহাড়ের মানুষ উন্নয়ন চায়, কিন্তু নিজের অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে নয়। আমরা প্রশ্ন তুলছি—আমরা কি এই স্বাধীন রাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ নাগরিক, নাকি কেবল মাটির নিচের খনিজ সম্পদের পাহারাদার? যদি ভূমির অধিকারই না থাকে, যদি চুক্তির বাস্তবায়ন না ঘটে, তবে এই নাগরিকত্বের সংজ্ঞা কী?
“উন্নয়ন যদি হয় উচ্ছেদ, শান্তি যদি হয় নীরবতা—তবে সেই উন্নয়ন ও শান্তি পাহাড়ের জন্য এক একটি দীর্ঘশ্বাস।”
রাষ্ট্রের নিকট আবেদন—পাহাড়কে কেবল ভৌগোলিক সীমান্ত হিসেবে দেখবেন না, একে ভালোবাসুন এর বৈচিত্র্যময় মানুষের হৃদস্পন্দন দিয়ে। পার্বত্য চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন এবং ১৯০০ সালের শাসনবিধির সুরক্ষা আজ সময়ের দাবি। ভূমি, বন আর সম্পদ যদি আপনাদের কাম্য হয়, তবে আগে সেই মানুষের অধিকার নিশ্চিত করুন যারা যুগ যুগ ধরে এই পাহাড়কে বুকের রক্ত দিয়ে আগলে রেখেছে। অন্যথায়, এই রাষ্ট্রের বৈচিত্র্যের অহংকার ধূলিসাৎ হবে। পাহাড় যদি তার স্বকীয়তা হারায়, তবে বাংলাদেশও হারাবে তার আত্মার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
আগামীকালের (২৩ এপ্রিল ২০২৬ খ্রি.) রায় কেবল একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়; এটি ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে দেওয়া এক অমোঘ জবাব। এটি নির্ধারণ করবে এই ভূখণ্ডে কি আজ ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রের দেওয়া প্রতিশ্রুতি অবশিষ্ট আছে, নাকি শুধুই পেশিশক্তির আস্ফালন চলবে। মনে রাখবেন, ১৯০০ সালের শাসনবিধির ওপর আঘাত মানে কেবল একটি আইনের মৃত্যু নয়—এটি একটি জাতির হৃদপিণ্ডে এবং ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির মূলে সরাসরি করা আঘাত।
পাহাড় তার শেষ নিঃশ্বাসটুকু বাঁচাতে চায়; রাষ্ট্র কি সেই শ্বাসটুকু ফিরিয়ে দেওয়ার ঔদার্য দেখাবে?

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন