পাহাড় কেবল মাটি-পাথরের স্তূপ নয়; এটি একটি সভ্যতা, একটি সংস্কৃতি, একটি জাতিসত্তার পরিচয়। যুগ যুগ ধরে চট্টগ্রামের পাহাড়ি জনগোষ্ঠী বঞ্চনা, ভূমি বেদখল ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার। “যতই ভয় দেখাও, দমিয়ে রাখা যাবে না; পাহাড় জাগছে তার অধিকারের দাবিতে!”—রাণী ইয়ান ইয়ানের এই উচ্চারণ সেই জাগরণেরই প্রতিধ্বনি। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ যখন অধিকার আদায়ে রুখে দাঁড়ায়, তখন তা আর নিছক দাবি থাকে না, হয়ে ওঠে অস্তিত্বের সংগ্রাম।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ইতিহাস গৌরবের, আবার বেদনারও। তাদের নিজস্ব সামাজিক কাঠামো, ভূমি ব্যবস্থাপনা ও শাসনরীতি ছিল শতাব্দীপ্রাচীন। কিন্তু উপনিবেশিক আমল থেকে শুরু করে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোতে ধীরে ধীরে তাদের ঐতিহ্যবাহী ভূমি অধিকার খর্ব হয়েছে। উন্নয়নের নামে উচ্ছেদ, বন ও পর্যটন প্রকল্পে জমি অধিগ্রহণ, এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব পাহাড়ি জীবনকে ক্রমশ কোণঠাসা করেছে। রাণী ইয়ান ইয়ান স্পষ্ট করে বলেছেন—এই শোষণের বিরুদ্ধে পাহাড় আজ জেগেছে, কারণ অধিকার হারানোর জন্য নয়, আদায়ের জন্য তারা লড়তে শিখেছে।
রাণী ইয়ান ইয়ানের ঘোষণায় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর চারটি মৌলিক দাবি উঠে এসেছে। এগুলো কোনো করুণা নয়, বরং সাংবিধানিক ও মানবিক অধিকার:
১. ঐতিহ্যবাহী ভূমি অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা: প্রথাগত জুমচাষ, বন ও গ্রামের সামাজিক মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া; ভূমি কমিশন কার্যকর করা
২. ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সংরক্ষণ: মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান রক্ষা, উৎসব ও রীতিনীতির স্বীকৃতি
৩. স্বায়ত্তশাসন ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ: পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন, স্থানীয় সরকারে প্রকৃত ক্ষমতায়ন, সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব
৪. শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও উন্নয়নের ন্যায্য অংশ: পাহাড়ের ভূ-প্রকৃতি উপযোগী শিক্ষা-স্বাস্থ্য অবকাঠামো, বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ, কর্মসংস্থানে কোটা বাস্তবায়ন
“শুনুন হে জেলা প্রশাসক!”—এই সম্বোধন কেবল একজন কর্মকর্তার প্রতি নয়, সমগ্র রাষ্ট্রযন্ত্রের প্রতি। প্রতিবাদের আগুন ভয় দেখিয়ে নেভানো যাবে না। পাহাড়ি জনগণের এই জাগ্রত চেতনা উপেক্ষা করলে তা নতুন ইতিহাস রচনা করবে—যে ইতিহাস হবে অধিকার আদায়ের। তাই প্রশাসনকে যৌক্তিক দাবিসমূহ অনুধাবন করে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আলোচনার দরজা খোলা আছে, কিন্তু নিষ্ক্রিয়তা বা দমন-পীড়ন গ্রহণযোগ্য নয়।
এই লড়াই আবেগের নয়, অস্তিত্বের। “বুকের রক্ত দিয়ে হলেও আমাদের অধিকার রক্ষা করব”—এই পঙক্তি প্রমাণ করে পাহাড়ি জনগোষ্ঠী আর পিছু হটবে না। তাদের সংগ্রাম অদম্য কারণ লক্ষ্য অবিচল: মর্যাদা ও সম-অধিকার নিয়ে বাঁচা। রাষ্ট্রের মূল স্রোতে থেকেও নিজস্ব পরিচয়ে বিকশিত হওয়ার অধিকার তাদের জন্মগত।
রাণী ইয়ান ইয়ানের বক্তব্য একটি ঘোষণাপত্র—নিপীড়নের বিরুদ্ধে, আত্মমর্যাদার পক্ষে। পাহাড়ের অধিকার মানে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যের সুরক্ষা। অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ভূমি, ভাষা, রাজনীতি ও অর্থনীতির অধিকার পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হবে। পাহাড় জেগেছে। এখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব সেই জাগরণকে সম্মান জানিয়ে ন্যায়ভিত্তিক সমাধানে এগিয়ে আসা।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন