মানবজীবনের পথচলা কখনো মসৃণ সরলরেখায় হয় না। আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থানে দাঁড়িয়ে নিজের দায়িত্বটুকু পালন করার আপ্রাণ চেষ্টা করি। কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল করে না, কেউ কাউকে আঘাত করতে চায় না। তবুও জীবনের কোনো এক অদ্ভুত মোড়ে এসে আমাদের এমন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে অবলীলাক্রমেই চেনা মানুষগুলোর সামনে নিজেকে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে মায়াবদ্ধ মনে হয়। আজ হয়তো আমার জীবনের সেই কঠিন পরীক্ষার দিন।
বর্তমানে 'বর্গা শিক্ষক' শব্দবন্ধটি অনেকের বুকেই এক নীরব বেদনার জন্ম দিয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে আজ সবার মনেই এক গভীর দুঃখ ও হাহাকার বিরাজমান। শিক্ষকতা কেবল একটি পেশা নয়, এটি একটি আত্মিক বন্ধন ও সামাজিক মেরুদণ্ড। যখন সেই মেরুদণ্ডে আঘাত লাগে বা কোনো টানাপোড়েন তৈরি হয়, তখন হৃদয়ের রক্তক্ষরণ হওয়াটাই স্বাভাবিক। এই দুঃখ কোনো একক ব্যক্তির নয়, এটি আমাদের সামষ্টিক চেতনার এক গভীর ক্ষত।
আমরা সবাই নিজের নিজের কাজ করছি, নিজের মতো করে সততার সাথে পথ চলছি। প্রত্যেকেই নিজ নিজ নিয়তি ও কর্তব্যের জালে বন্দি। কিন্তু নিয়তির পরিহাস এমনই যে, মাঝেমধ্যে নিজের হক বা দায়িত্ব পালন করতে গিয়েও অন্যের চোখে অনিচ্ছাকৃতভাবেই অপরাধী সেজে যেতে হয়। অথচ আমরা বরাবর একে অপরের পাশে ছিলাম, সুখ-দুঃখে একাত্ম হয়েছি এবং ভবিষ্যতেও বরাবর একসাথেই থাকবো। সাময়িক কোনো ঝড় বা ভুল বোঝাবুঝি আমাদের এই দীর্ঘদিনের আত্মিক বন্ধনকে ছিঁড়ে ফেলতে পারে না।
আজকের দিনটি হয়তো আমার জন্য এক মহাসংকটের, এক নীরব আত্মদহনের। আজ হয়তো পরিস্থিতি আমাকে এমন এক কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য করেছে যেখানে আমার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য না থাকা সত্ত্বেও আমি অপরাধীর মতো স্তব্ধ হয়ে আছি। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সাময়িক ভুল বোঝাবুঝি বা পারস্পরিক দূরত্ব আমাদের আসল লক্ষ্য নয়।
আমাদের আসল কাজ হলো অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। শোষণের বিরুদ্ধে, বঞ্চনার বিরুদ্ধে এবং বৈষম্যের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নিজের ন্যায্য পাওনা ও মর্যাদা ছিনিয়ে আনাই আমাদের মূল লড়াই।
এই অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নামতে গিয়ে যদি সাময়িকভাবে কাউকে 'অপরাধী'র রূপ ধারণ করতেও হয়, তবে সেই ত্যাগ বা গ্লানি মেনে নেওয়াও এক ধরণের বীরত্ব। এই মেঘ ক্ষণস্থায়ী। আমরা আবার একে অপরের হাত ধরে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলবো। পারস্পরিক সহানুভূতি, ধৈর্য এবং নিজেদের অধিকারের প্রতি অবিচল থেকে আমরা এই কঠিন সময়কে পার করে যাবো। দিনশেষে আমাদের এই একতা এবং অধিকার আদায়ের জেদ-ই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন